(এই লেখাটা আদৌ এই ব্লগের জন্যে নয়। ‘রোয়াক’ পত্রিকার জন্যে লেখা। এবং এর আগের ব্লগের লেখাটা হুবহু তুলে দিয়ে, সেটাকে ঘিরে আলোচনা। সম্পাদক সোমনাথ মুখোপাধ্যায়ের অনুমতি নিয়ে এখানে একটা আগাম ই-প্রতিলিপি সেঁটে দেওয়া হল, হুবহু যে আকারে ‘রোয়াক’-এ পাঠানো হয়েছে।)
ত্রাস এবং তার বিপরীত উল্লাস
সতেরোই মে, রবিবার, ২০০৯ লোকসভা ভোটের ফলপ্রকাশের পরের দিন, সকালে, যথেষ্ট বেলা, কিন্তু ওর গলায় ঘুম তখনো কাটেনি, সোমনাথ ফোন করল। রোয়াকের একটা সংখ্যা বার করব। আমি শোনামাত্রই সাবধান হয়ে গেলাম, তুই তো জানিস, আমি কেউ লিখতে বললে লিখতে পারিনা।
বেশ ভদ্র গলায়, সংযত, শান্ত, মানে আরও বিপজ্জনক, সোমনাথ বলল, আরে আগে পুরোটা শোনো না। তুমি আগে পুরোটা শুনে নাও।
সেই পুরোটা শোনার ফলাফল এই লেখাটা। আমি জানি, বিষয়টা যদি জরুরি হয়, আর এই বিষয়টা সত্যিই জরুরি, লেখা যার কাজ তার লিখতে পারা উচিত, ‘লেখা মাথায় আসা’ ইত্যাদি কোনও বাড়তি নাটক যোগ না-করে। কিন্তু আমি সত্যিই পারিনা। ভাবনার কোনও সূত্র সত্যিই আয় বলা মাত্র আসে না আমার। তাই খুব তাগিদে পড়লে পুরোনো কোনও ভাবনার সূত্রকেই ব্যবহার করতে হয়।
আটই মে দিনটা ছিল গরম এবং আর্দ্রতার ভারে ভারী, তার মধ্যে প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছিলাম সারাটা দিন। তারপর বাড়ি ফিরেই কিছু কথোপকথন ঘটেছিল কিছু লোকের সঙ্গে, যার কিছু প্রতিক্রিয়া মাথার ভিতর কিলবিল করছিল, কিন্তু সেদিন নয় ঘন্টারও বেশি একটানা পরিশ্রমের পর, আর বয়সও তো হচ্ছে, সত্যিই, বহু চেয়েও আমি ব্লগ লিখতে বসতে পারিনি। গায়ে জল ঢেলে এসে শুয়ে পড়েছিলাম।
কিন্তু প্রসঙ্গগুলো এতই চাপ ফেলছিল মাথায় যে ঘুমোতেও পারছিলাম না, বারবার ঘুম আলগা হয়ে যাচ্ছিল, ধাক্কা দিচ্ছিল ওগুলো। শেষে তিনটে নাগাদ উঠে পড়লাম, এবং ব্লগটা লিখতেই হল। লিখে তবে সাড়ে পাঁচটায় শুতে গেছিলাম। ddts.randomink.org/blog নেট-ঠিকানায় আমার ৯ই মে, ২০০৯ তারিখের এন্ট্রি, নাম ‘লক্ষ্মণের আবেদন এবং কিছু উল্লাস’। এই লেখাটার চিন্তাসূত্র ওটাই, লেখাটা তুলে দেওয়া যাক।
লক্ষ্মণের আবেদন এবং কিছু উল্লাস – ৯ মে, ২০০৯, ভোর ৫টা ২৭ মিনিট
গতকাল সারাদিন ওই বিচ্ছিরি গরম, তার মধ্যে কলেজে বসে নিজের লেখার প্রুফ দেখে দেখে সংশোধনগুলো ল্যাপটপে তুলে গেছি সারাদিন। সে এক ভয়ানক ক্লান্তিকর ব্যাপার। তারপরে বনগাঁ লোকালের ওই বিকট ভিড়ে বাড়ি ফিরেছি। ফিরতেই মা বলল, আমার এক বন্ধু, সচরাচর যে খুব বেশি ফোন করেনা, বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল। অবাক হলাম। শুধু একার নয় অনেকের ঘামে ভেজা জামা পিঠ থেকে খুলেই ফোন করলাম।
ওর গলাটাই ছিল ভিন্ন, দেখেছ, কী ঘটছে। একটা উল্লাস, একটা আরাম। আমি বললাম কী ঘটছে? আরে লক্ষ্মণ শেঠ রিপোল চেয়েছে। ও, আমি বললাম, তখনও খুব একটা ধাতস্থ হইনি, আর মানু বাড়ি না-থাকায় চা বসিয়ে এসেছি, কিন্তু চা তখনও হাতে নেই। ঘটেছে কী? আমি জিগেশ করলাম।
আরে, প্রচুর কিছু ঘটেছে, সিপিএম এতদিন যা করত, এবার সেটা সিপিএমকে কেউ ফেরত দিচ্ছে।
কী, খুব ভায়োলেন্স হয়েছে?
সেটা বড় কথা না, লক্ষ্মণ শেঠ রিপোল চেয়েছে, সত্যি আমি নানা চ্যানেলে যতবার দেখছি, দেখতেই যে কী আরাম লাগছে। দেখো না, যদি টিভি থেকে ইউটিউবে তুলে দিতে পারো, তুমি তো জানো এসব। বারবার দেখব, সবাইকে দেখাব।
আরে ধ্যাত, আমার কোনও ক্যাপচার কার্ড নেই। ইত্যাদি ইত্যাদি, কথোপকথন চলল। আমার এই বন্ধুর এই আরামটা বোঝা যায়না, নন্দীগ্রামের দিনের এবং রাতের অধ্যায়টা না বলে-দিলে। ওর দাদা থাকেন হলদিয়ায়, বৃদ্ধ মানুষ। অনেক আগে একসময় এক ভাবে গ্রামের কৃষি রাজনীতির সঙ্গে যোগও ছিল, তাই একরকম একটা আবেগের সংযোগ চাষ এবং চাষীর সাথে রয়ে গেছে এখনও ওর সেই দাদার। সিপিএমের নন্দীগ্রাম দখলের রাতে হলদিয়ায় যখন প্রচুর মদ মাংস এবং বাজি উপভোগ চলছিল, সেটা ঘটছিল ওঁর বাড়ির পিছনেই। উনি ফোন করে হাউহাউ করে কাঁদছিলেন, আর ফোনের মধ্যেই বাজি ফাটার শব্দ এবং তাণ্ডবের নাদ পাওয়া যাচ্ছিল। তাই এক ভাবে, কৃষি থেকে নন্দীগ্রাম থেকে বহু বহু দূরে বসেও আমার ওই বন্ধু জড়িয়ে গেছিল গোটাটার সঙ্গে। আমরাও।
জড়িয়ে যাওয়ার আরও উপাদান ছিল। আমাদের আর এক বন্ধুর স্ত্রী কাজ করে কর্পোরেট অফিসে। তার এক সহকর্মী ওদিন ওদের বাড়ি আসে। ওদের বাড়িতে থাকা কালীনই সেই সহকর্মীর সেলফোনে তার ভাইয়ের ফোন আসে, যে কম্পিউটার নিয়ে পড়ে, এবং তখন গ্রামে গিয়েছিল। দাদা ওরা মারছে রে, পুঁতে দিচ্ছে। এবং তার দাদার প্রতিক্রিয়াটা ঘটছিল ওদের চোখের সামনে।
তাই এই গোটা আরামটা আমার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছিল, কোথাও একটা ভাল লাগছিল। সিপিএমের একটি কর্মীকে চিনি, সেইরকম হাতে গোনা দুচারজনের একজন, সিপিএম অথচ বদমাইস নয়, চোর নয়। তার কথা মনে পড়ছিল। মাঝে সে একদিন বলেছিল, সিপিএমের মধ্যেও ওর বিরুদ্ধে কম বিক্ষোভ নেই, কোঅর্ডিনেশন কমিটি থেকে, বারই জুলাই কমিটি থেকে ওর বিরুদ্ধে একমত সিদ্ধান্ত গেছিল, কিন্তু টাকা, ও তো কোটি কোটি টাকা দেয়। এই ছেলেটির কাছেই শুনেছিলাম, আরও একটি ঘটনা, পার্টির থেকেই খেজুরির ক্যাম্পে যেতে হয়েছিল ওকে, গন্ডগোলের পর সিপিএমের ঘরছাড়া লোকেরা সেখানে আছে তখন, সেখানকার অভিজ্ঞতা। জানেন, কী খাচ্ছে ওরা — চাল ডালের খুদ, একসঙ্গে সিদ্ধ করা, তাতে পোকা, পচা গন্ধ, রাঁধছে যেখানে সেখানেও দাঁড়াতে ঘেন্না করছে, আর এরা তো তৃণমূলের না, আমাদেরই লোক, আর ওখান থেকে জেলা অফিসে এসে দেখলাম, নেতারা দুরকম মাছ, চাটনি, মিষ্টি দই দিয়ে খাচ্ছে, আমি এসে সেদিন রাতে খেতে পারিনি, জানেন, আমরা তো বড়লোক কোনওদিনই নই, কিন্তু ওরকম খাবার আমরা জীবনে খাইনি।
এই সব সমস্ত কিছু মিলে আমার মধ্যেও কাজ করছিল। যখন জোতদারদের পার্টি হয়ে নয়, নিজেই একধরণের জোতদারি হয়ে যাওয়াটাই রাজনীতির ভবিতব্য।
আমার কিছু পুরনো ছাত্রছাত্রী, বুঝতেই পারছিলাম, তারাও এক সঙ্গে আজ মজা পাচ্ছে, তাদের ফোন করলাম। তাদের একজন চেঁচিয়েই উঠল, আরে এতক্ষণ ধরে ভাবছি, তোমার ফোন আসছে না কেন। ওই শোনো, শুনতে পাচ্ছ? আমি কান খাড়া করেও ভাল বুঝতে পারলাম না, ওদেরই একজন পিছনে কিছু একটা বলে চেঁচাচ্ছে। কী চেঁচাচ্ছে ও?
শুনতে পাচ্ছ না, যুদ্ধের দামামা বেজে গেছে, বলে চেঁচাচ্ছে।
রাখ তো, তোদের টিভি দেখে যুদ্ধের দামামা, বললাম ওদের। বললাম বটে, কিন্তু ওদের উল্লাসটাও পাচ্ছিলাম। ওরা বেশ কয়েকজন এনজিও করে, গ্রাম এলাকায় একশো দিন কাজ পাওয়ার মানুষের সুযোগ কী ভাবে রাজ্য সরকারের দপ্তরগুলো চেপে রাখে, কারণ সেটা থেকে পার্টি বা পঞ্চায়েতের লোকেরা টাকা মারতে পারে না, সরাসরি ওই টাকাটা পোস্ট অফিসে আসে, সেটা ওদের কাছেই শুনেছি। ওরা একাধিক জায়গায় গরিব চাষী বা শ্রমিকদের সমবায় বানানোরও চেষ্টা করছে। তাই ওদের আনন্দটা ধরতেও পারছিলাম।
ওদের যেটা বললাম, সেটা আমিও মনে করি, লক্ষ্মণ শেঠের এই রিপোল চাওয়ার ঘটনায় সত্যিই একটা আখ্যানের ন্যায়, পোয়েটিক জাস্টিস আছে। যে ছবিটা মাথায় আসে সেটা একজন ভয়ানক রাবণের, মুখে হাতে শরীরে রক্ত, নিল ডাউন হয়ে বসে আছে, আর বলছে, স্যার দেখুন না আমায় ভ্যাংচাচ্ছে।
উল্লাসের নির্মাণ প্রক্রিয়া - একটা চলমান ত্রাসের গল্প
কাল সোমনাথের ওই লেখার প্রস্তাবের পর থেকেই খুব চাপে ছিলাম, আরও বিষয়টার জীবন্ততা নিয়ে তো কোনও প্রশ্ন থাকতে পারে না, বা এই পুরোটাকে ঘিরে আমার প্রতিক্রিয়া নিয়েও। তাহলে লিখতে পারব না কেন, এতদিন ধরে তো কম লিখিনি, তাহলে এত পাঁজা পাঁজা লিখে লাভ কী, প্রয়োজনের দিনে যদি একটা হাজার দুয়েক শব্দের লেখাও লিখতে না-পারি।
আসলে আমার মধ্যে অন্য একটা বিপন্নতাও কাজ করে, একটা লজ্জ্বাবোধ। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যেদিন সিঙুর গেছিলাম, মিছিলে হেঁটেছিলাম, সেটা তো আমার রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার প্রায় দুই দশক পরে, বড় আলোড়িত লাগছিল সেদিন, ভিতরে ভিতরে, এবং ওই হাঁটতে হাঁটতেই আমার মধ্যে একটা লজ্জ্বা এবং ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় তৈরি হয়েছিল। যদি এরা জেনে ফেলে যে আমিও সিপিএম ছিলাম? যদি জানতে পারে, নিজের প্রায় শৈশব থেকে বারো বছরেরও বেশি সময় ধরে সমস্ত আবেগ ও আগ্রহ নিয়ে, পার্টি হোলটাইমার হব শুধু এই আকাঙ্খাকে ঘিরে রাজনীতি করে গেছি? শুধুমাত্র দুইজন নেতার অপছন্দই আমায় পিপলস ডেমক্রাসির হোলটাইমার হয়ে দিল্লী চলে যাওয়া থেকে আটকেছিল, সেই এমএসসি বয়সে। মানুষ হিসাবে এরা অত্যন্ত নোংরা স্তরের, কিন্তু আজ এদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞই লাগে আমায় সেদিন এরা অপছন্দ করেছিল বলে।
ষোল তারিখ যখন সারাদিন একটিবারের জন্যেও টিভির সামনে থেকে নড়তে পারছিলাম না, শুধু টিভিকে না টিভি দেখতে থাকা নিজেকেও দেখছিলাম। সিঙুর থেকে ঘুরে আসার পর থেকে যেখানেই যখনই কথা উঠত, অচেনা কারুর সঙ্গে, চেনারা তো এটা জানেও, আমি প্রথমেই অকপটে স্বীকার করে নিতাম। জানিয়ে না-দিয়ে পারতাম না, এই ধ্বংসের দায়ভাগে অংশীদার আমিও। আমি আর কে ছিলাম, কতটুকু ছিলাম, কিন্তু একটা কাঠবিড়ালির বাদামখোলার মত করে হলেও, আর আমার দিক থেকে তো সেটা একশো শতাংশই ছিল, যে সেতু বেয়ে গণহত্যাকারী আর গণধর্ষকরা গেছিল, সেই সেতুতে তো খোলামকুচি আমারও আছে। আমার আগ্রহ আর আবেগ আর মূর্খতা আর কী-জানি-কী তো তার প্রস্তুতির ইতিহাসে মিশে ছিল। কবীর সুমন বলছিল, আপনারা সিপিএমরা, গণহত্যাকারীরা, গণধর্ষকরা শুনুন … ইত্যাদি, আর আমার বুকে এসে সেটা লাগছিল। সুমনের মধ্যে তো একটা নাটুকেপনা চিরকালই থাকে, কিন্তু যা বলছিল সেটা তো মিথ্যে না। নিজেকেই কেমন ঘেন্না লাগছিল।
ঘেন্না হচ্ছিল, আবার মন-খারাপও লাগছিল। মধ্যমগ্রাম নিউব্যারাকপুরের আমাদের ছোটবেলায় চালু ছিল নিছক কলোনি সংস্কৃতি। রিফিউজি পুনর্বাসনের পর্চার জমিতে গড়ে ওঠা লোকালয় আসলে একটা পরিবর্ধিত রিফিউজি কলোনির সংস্কৃতি নিয়েই লাগু ছিল, রিফিউজি কলোনির বিপন্নতা, রিফিউজি কলোনির ঐক্যবোধ, রিফিউজি কলোনির আত্মীয়তা, এই নিয়েই আমরা বড় হচ্ছিলাম। সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে কী ভাবে যেন রাজনীতিও শুরু হয়ে গেছিল। তখন তো তত্ত্ব বলে যে কিছু হয় তাও জানতাম না। আর আমি যতটুকু যা তত্ত্ব পড়েছি বা লিখেছি তাতে তো আজও মনে হয় না যে, সেই খুব সরল জায়গাটার খুব একটা সংশোধনেরও প্রয়োজন আছে। আমার তো আজও মনে হয়, সেই কলোনি এলাকার সেদিনের সেই সিপিএম রাজনীতিটাই আমি আজও করে চলেছি, আমার সাহিত্যে, আমার রাজনৈতিক অর্থনীতিতে, আমার লিনাক্সে।
কিন্তু এটাও তো ঠিক, সেই রাজনীতি থেকেই কোনও একদিন এই পিশাচের জন্ম হয়েছিল। মজার কথা এই যে, ঠিক কী প্রক্রিয়ায় জন্ম হয়েছিল পিশাচ জন্মানোর এই প্রক্রিয়ার, সেটা আমি আজও ভাল বুঝতে পারিনি। আশি বা একাশির এক শীতের রাত্তিরে আমার আরও তিন বন্ধুর সঙ্গে আমাদের দিকে কারবালা বলে একটা জায়গায় গিয়েছিলাম, যেতে যেতে আমরা বি টি রণদিভেকে নিয়ে কথা বলছিলাম, পি সুন্দরাইয়াকে নিয়ে, তার সন্নিহিত এলাকার তত্ত্ব নিয়ে। তখন ওই দিকটা প্রায়জঙ্গল একটা জলাভূমি ছিল, সেদিন সেই জনহীন জলায় একটু একটু মেঘ মেশা আকাশে চাঁদের বাখারির শীর্ণ জ্যোৎস্নায় একটা মায়া নেমেছিল, কোনও এক পরী। কী যে একটা অনুভূতি হয়েছিল, আমার কেমন কৃতজ্ঞ লাগছিল ওই মুহূর্তটার প্রতি, যেমন হয়, এক একটা ঘটনার সময়ই মনে হতে থাকে, ভাগ্যিস জন্মেছিলাম, নইলে তো এই অভিজ্ঞতাটা হত না। এতটাই দাগ কেটে গেছিল মাথায় যে সেদিন রাতে ঠিক করে নিয়েছিলাম, তখন যে উপন্যাসটা লেখার পরিকল্পনাটা মাথায় ঘুরছিল, সেটা সত্যিই কোনওদিন লেখা হলে ওই তিনজনকে নিয়ে ওই রাতটাকে উৎসর্গ করব। এর অনেক বছর পরে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছিল, ‘তপন বিশ্বাসের খিদের বত্রিশ ঘন্টা’ তখন খুব কষ্টও হয়েছিল সিদ্ধান্তটা বদলাতে, আরও কমবয়সের আবেগের মমতা তো, কিন্তু আমার সেই তিন কমরেড বন্ধুর একজন ততদিনে মদের ব্যবসার স্থায়ী আয়গ্রাহী, আর একজন নানা ইস্কুল কমিটির মাতব্বর, ইত্যাদি। তাই সেটা আর সম্ভবও নয়।
সিপিএম রাজনীতির প্রতি আমার প্রতিক্রিয়াটা অনেকটা এইরকম। এরকম কী করে হল, আচ্ছা এরকম হয়ে গেল যখন, এটা হওয়ার সম্ভাবনাটা তৈরি হচ্ছিলই, আমার মূর্খতার জন্যেই আমি ধরতে পারিনি — এর পরেই, এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে প্রশ্নটা নিজের মধ্যে জেগে ওঠে, তাহলে কি আমিও এরকম? হতে তো পারে, আমার বুদ্ধিতে আমি ধরতে পারছি না, কিন্তু আসলে আমিও বিষাক্ত, ঠিক করে বুঝতে পারছি না।
আমাকে যারা চেনে তারা জানে, আমার ব্যক্তিজীবনে, আমার পারিবারিক অভিজ্ঞতায় একটা চূড়ান্ত অসফলতা আছে। স্তরে স্তরে বার বার। সেগুলোকে মিলিয়ে নিজের একটা বিষাক্ততার সম্ভাবনা আমার মাথায় ঘোরেই। বছর কয়েক আগে যখন বিষমানুষের গল্প লিখেছিলাম, এর একটা প্রভাব তার ভিতর কাজ করেছিল, মনে আছে।
তাই ১৬ই মে, সারাদিন টিভির সামনে থেকে যে নড়তে পারছিলাম না, তার ভিতরে একটা বেদনার নেশাও ছিল। আমার মধ্যে একটা মরবিডিটি চিরকালই আছে বোধহয়, খুব ছোটবেলায় পায়ে যখন কোনও কাঁটা ফুটে যেত, অনেকদিন ধরে একটা গভীর ব্যথা সেখানে রয়ে যেত, কেমন একটা উপভোগও করতাম। বোধহয় সেই একই অনুভূতি হচ্ছিল সেদিনও। আর বারবার নানা ফোন আসছিল, নানা জনের। আমি কেমন ভয় পাচ্ছিলাম, বহু বছরের একটা ত্রাস, তার সঙ্গে বসবাস করে এসেছি এত বছর, আমার বাড়িতে এসে সিপিএম যখন ফেইনম্যানস লেকচার্স আর ভ্যান গখের ছবি আর আরও নানা বহু বই ছিঁড়েছিল, বাড়ির লাইট ভেঙেছিল, তখন একটা ত্রাস এসেছিল। সেই ত্রাসটার সাথে বসবাস করতে করতে ঘরকন্না করতে করতে সেটাই তো জীবনপ্রক্রিয়া হয়ে গেছে, হঠাৎ সেটা অন্তর্হিত হয়ে যাওয়ায় একটা অনিশ্চয়তাও বোধহয় জন্ম নিচ্ছিল মাথায়।
আমার এক সহকর্মী বন্ধু, বয়সে অনেক ছোট, সিপিএম করত, নন্দীগ্রামের পর পার্টি মেম্বারশিপ ড্রপ করেছে, ওকে একবার জিগেশ করছিলাম, তোদের পার্টির আমার প্রতি এই অ্যালার্জিটা কেন, আমি যাই করি তাই অপছন্দ করে? ও বলেছিল, ওটা কিছু নয়, সিপিএম আসলে এখন তেমন যে-কেউকেই অস্বস্তি পায় যে সিপিএমকে ভয় পায় না।
এটা হয়তো সুখশ্রাব্য, কিন্তু সত্যি তো নয়। ওকেও বলেছিলাম সেটা। আমিও তো মর্মান্তিক ভয় পাই। আমার চেহারাটা বিরাট বলে, বা হয়ত আমার কথার ভঙ্গীর কারণে সেটা বোঝা যায় না, কিন্তু ভয় তো বেজায় পাই আমিও। আমার বাড়িতে ওদের ভাঙচুরের পরে ফোনের আওয়াজেও আমি কেঁপে উঠতাম, বমি হয়ে যেত প্রায়ই। তারপরে একটু একটু করে অনেকগুলো বছর চলে গেছে, আমি সেটার সঙ্গে বাঁচতে শিখে নিয়েছি, ভয়টা অনেক গভীর গোপন অন্দরে চলে গেছে। আর খুব বোকা ইগোর লোকদের যেমন হয়, কী করে জানি একটা ঠিক করে নেয়, ভয় পাই আর না-পাই যা ঠিক লাগছে সেটা তো বলতেই হবে, সেরকম কিছু বোকামি, যেন আমার কথা বলা আর না-বলা দিয়েই সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত হবে। অথচ আমার কাছে যারা আসে তাদের আবার আমিই শেখাই, চুপ করে থাকো, যা করার সেটা করো, কিন্তু চুপ, কথা বলে কী হয়। নিজে আমরা মাস্টারি করে যেটা শেখাই সেটা নিজে করাটা যে কী শক্ত। তাই, হয়ত, আমায় দেখে ভয়টা বোঝা যায় না, কিন্তু ভয়টা আছেই। নিঃশব্দ বলেই সেটা আরও গভীর, একটা ত্রাস। যারা অনেক বকে, গবগব করে ভয়টাও উগরে দেয় তারা তো বেঁচে যায়, গোপন ভয় ভিতরে চারিয়ে যায়, ক্ষয় করে চলতে থাকে ভিতরে ভিতরে। ইতিহাসের গল্প বলে একটা গল্প লিখেছিলাম, সেটা পড়ে সৈকৎ বলেছিল, ওর তিনচারদিন ধরে গা ছমছম করেছিল, সেটা আসলে নিজের এই ভয় থেকে চুরি করে। এতটা জ্যান্ত বলেই ওটা একজন পাঠক অব্দি পৌঁছতে পেরেছিল।
আমার এক পুরোনো মাস্টারমশাইয়ের কাছে গেছিলাম, কিছু ফিল্ম দিতে, এই ১০ই মে, নির্বাচনের ফল প্রকাশেরও ছয় দিন আগে, তিনিও বলছিলেন একই কথা, আসলে তো একটা অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে, তুমি ওদের বিরুদ্ধে হয়ত পাড়ার পুকুর নিয়ে একটা কথা বললে, এতে তোমার চাকরির জায়গায় একটা ফাইল গায়েব হয়ে গেল। তোমার সঙ্গে কোনও শত্রুতা হল, রণে বনে জঙ্গলে পার্টি অফিসে ঠিকাদারের ঠেকে সব জায়গায় এদের প্রতিটি লোক এক বাক্যে বলতে থাকবে, তুমি কী খারাপ, তোমার বাবা খারাপ, মা খারাপ, নিয়ত খারাপ, এবং এই বিষয়ে যাবতীয় তথ্য সরকারি দপ্তরে আছে, ইত্যাদি, ইত্যাদি, একদিন তুমিও বিশ্বাস করে ফেলবে। ইডিওলজি বিষয়টা ওদের উঠে গেছে, তার জায়গা নিয়েছে কাউকে মারার বিষয়ে এই ঐক্যবদ্ধতা। এ এমন একটা জিনিস এর প্রতি ত্রাস না-হয়ে কোনও উপায় নেই।
গত কদিন ধরে কোমরে একটা ব্যথা হচ্ছিল, আজকে ডাক্তারবাবুর কাছে গেলাম, সকালে, বারাসাতে হেলাবটতলা মোড়ে। যাওয়ার সময়ে মধ্যমগ্রাম চৌমাথা থেকে একটা ভ্যানে উঠলাম। ভ্যানে উঠতে গিয়েই মনে পড়ল, গত তিনমাস ধরে আমি যেটা করে যাচ্ছিলাম, ইলেকশনের কিছুদিন আগে অব্দি, রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটা বোঝার স্বার্থে, এখন তো জ্যান্ত রাজনীতির সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগই আমি হারিয়ে ফেলেছি। পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় থেকেই মনে হচ্ছিল, একটা কোনও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চলছে, তার গন্ধটা যেন বাতাসে ছিল। কিন্তু ওই ত্রাস তো তার বাধ্যতামূলক নৈঃশব্দে সবটাই গোপন করছিল। কী করে বোঝা যায়, কী করে বোঝা যায়, এমনটা কদিন ভাবার পর একটা পদ্ধতি আবিষ্কার করলাম।
মানুষ ভয় পাচ্ছে কথা বলতে, কিন্তু তার চেনা মানুষের সঙ্গে সে তো কথা বলে, আর সবচেয়ে বড় চেনা আর কী হয়, ভয়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধতা ছাড়া? ঠিক সেই জায়গাটাকেই ধরার চেষ্টা করলাম, প্রশ্নটার কাঠামোটাকেই বদলালাম। আপনাদের ওখানে রাজনীতির অবস্থা কী, এই প্রশ্নটা আর না-করে প্রশ্নটাকে দাঁড় করালাম, আপনাদের এলাকায় সিপিএম এবার হারবে তো, ঝাড় খাবে তো?
এবং মজার কথা এই প্রশ্নটার সাফল্যে নিজেই অবাক হলাম। রিক্সা-ভ্যান যারা চালান তারা নানা জায়গা থেকে আসেন, কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক বর্গটা সবারই এক। সচরাচর আমি ইস্টিশন অব্দি হেঁটে যাই, কারণে অকারণে ভ্যান চড়া শুরু করলাম, এবং চেষ্টা করতাম ফাঁকা ভ্যান পাওয়ার। প্রায় তিনমাস জুড়ে প্রতিদিন আমি এটা করে গেছি, দিনে কমপক্ষে একজন, এবং অনেকদিন তিন বা চারজনকেও। এবং ফলটা আমার নিজের কাছেও অবিশ্বাস্য লাগল। প্রত্যেকটার ফল একই। আমার বাড়িতে যারা চাল নিয়ে আসেন, মুড়ি, বা কোনও মজুর বা মিস্তিরি, তাদের সঙ্গেও একই। রীতিমত আরাম ও উৎসাহে তারা তাদের সিপিএম বিরোধিতা উজাড় করে দিতে শুরু করলেন। একদিনই এর উল্টো ফল পেয়েছিলাম ওই তিনমাসে, বারাসত যাওয়ার পথে একটা অটোয়। কিন্তু সেটাও আমার ধারণা, ছেলেটা চুপ করে গেল, হয়ত অটোয় নম্বর থাকে এটা ওর মাথায় ছিল, সম্পূর্ণ নামহীন হওয়া যায় না। বা হয়ত ও সত্যিই সিপিএম, কে জানে।
আমার দু-একজন সহকর্মীকেও এই পরীক্ষাটার কথা বলেছিলাম, তারাও যতটুকু করেছিল, একই ফল পায় বলেই শুনেছি।
তাই আজ সকালে, সোমনাথের লেখাটার কথা মাথায় ছিল, আবার কথা তুললাম। একই ফল পেলাম। ভ্যান চালকের ঘর ময়নায়, বসিরহাট নির্বাচনক্ষেত্রে। কথা বলতে বলতে তিনি জানাচ্ছিলেন, কী ভাবে বর্ধমান থেকে মেরে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়, ইত্যাদি। এরা শুধু টাকা চায়, টাকা।
আমিও নানা কথা বলতে শুরু করলাম তাকে, কলেজের মাস্টারমশাই হিসাবে আমার অভিজ্ঞতা, কী ভাবে শুধুমাত্র অযোগ্য লোকদেরই শিক্ষার উচ্চপদে আসীন করা হয়, কারণ তারাই একমাত্র সম্পূর্ণ নির্বাক ভাবে টাকা চুরি এবং যা-খুশি করে চলার অংশ হবে, ইত্যাদি।
মূল ঘটনাটা ঘটল এর পরে। রবার ফ্যাক্টরি স্টপ থেকে এক মহিলা উঠলেন ভ্যানে। আমরা তখন এতই মগ্ন আমাদের এই সিপিএম চর্চায় যে ভাল করে খেয়ালই করিনি। হঠাৎ করে, ওই ভ্যান চালককে আমি তখন বলছি, কিন্তু এখনও তো এরা শেষ হয়নি, আমার মধ্যে জানার কৌতূহল কাজ করছিল, পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে কী ভাবছেন ওরা। মহিলাটি পাশ থেকে বলে উঠলেন, হয়নি তো, হবে, হবে, একদম নিকেশ হয়ে যাবে।
মহিলাটিকে খেয়াল করলাম, একটা হলুদ কালো ছাপা শাড়ি পরনে, গরিব অশিক্ষিত মুখ, হাতে কিছু কাগজ। আমি ওঁকে বললাম, দিদি ধরে নিন, সিটের পিছনের আংটাটা দেখালাম। মহিলাটি প্রচণ্ড উত্তেজিত। একই বাক্যে, দুবার, গলা প্রায় চীৎকারে চলে যেতে যেতে উনি সামলে নিলেন। কত কিছু বলে চললেন উনি।
আমার সোয়ামির প্রতিবন্ধীর কাগজ, দিনের পর দিন আমারে ঘোরাচ্ছে। টাকা চায়। আরে টাকাই যদি দিতি পারব, প্রতিবন্ধীর কাগজ দিয়ে করব কী?
হঠাৎ আমার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। আমার দিদিমাও ছিল খুলনার মেয়ে, বাগধারা ওইরকম, পুবির মাটি শিবির ঘর, মুগির ডালি ঘি দিলি খিরির তার হয়। ওনার ওই উজ্জ্বল হলুদ কালো শাড়ি, ঘাম জমা গলার শির ফুলে উঠতে উঠতেই সামলে নেওয়া, ওনার জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী বর, দুই বাচ্চা গোটাটাই মাথার মধ্যে আমি দেখতে শুরু করলাম, কেমন একটা আত্মীয়তা, ছোটবেলার সেই কলোনি আত্মীয়তা।
মহিলাটি ভ্যান থামাতে বললেন ডাকবাংলা মোড়ে এসে। ভ্যান আবার চালু হচ্ছে, আমি কিছু না-ভেবেই বললাম, আসি দিদি, নিজেও ভাবিনি এটা আমি বলতে যাচ্ছি। উনিও বোধহয় একটু অবাক হলেন, অন্যমনস্ক ভাবে মাথা নাড়িয়ে সায় দিলেন।
কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার অন্য একটা ঘটনার কথা মনে পড়ল। বিরাশিই হবে বোধহয়, আমি দিল্লি যাচ্ছিলাম, জনতা এক্সপ্রেসে। কানপুরের ওখানে বোধহয় কিছু একটা ঘটেছিল। আমাদের ট্রেনটা আটকে গেছিল একটা অদ্ভুত জায়গায়, দুপাশে শুখা জমি, লোকালয়ও বহু দূরে। রাত নামছিল। কামরার সবাই বেশ ভয় পেয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করে কেউ একটা বললেন, এটা গাজিয়াবাদের কাছাকাছি কোথাও। ওই গাজিয়াবাদ শব্দটা গোটাটাই বদলে দিল। আমি ঠিক মনে করতে পারছি না, দেশহিতৈষী বা ওইরকম কোথাও এর কদিন আগেই কোনও লেখায় গাজিয়াবাদে সিপিএম রাজনীতির প্রসার নিয়ে একটা কোনও লেখা বেরিয়েছিল। আর আমি কোনওদিনই কিছু চিনিনা, কোথাও তো তেমন যাওয়ারও সুযোগ হয়নি, শুধু নামটা মনে ছিল। সেই মুহূর্তে আমার গোটা ভয়টা কমে গেল, মনে হল, এই তো নিকটেই কোথাও আমার কমরেডরা আছে, নিজের আত্মীয়স্বজন হলেও ওই অনুভূতিটা হত না।
আজ ভ্যানের ওই মহিলার প্রতি আমার ওই প্রতিক্রিয়াটায় এক সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠল, আমার আত্মীয়তার উৎস, একটা ত্রাস, এবং ত্রাসবিরোধী ঐক্যবদ্ধতাটা। ওই ভ্যানচালকের কথাটা মনে পড়ল, কিছুই শেষ হয়নি, এবার হবে।
শেষ যে হয়নি এর প্রমাণ তো এই লেখাটা নিজেও। এই গোটা লেখাটা জুড়ে, লক্ষ্মণের লেখাটা থেকে, প্রতিটি খুঁটিনাটি আমায় সচেতনভাবে বদলাতে হয়েছে, আমার এই লেখার কারণে কেউ যেন বিপদে না পড়ে যায়। আমার সমস্ত লেখার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে লাগিয়ে বিকল্প খুঁটিনাটি বানিয়ে তুলতে হয়েছে, যাতে ঘটনার মূল আবেদনটাও থাকে, আবার কেউ বিপদে পড়ে না-যায়। ওই মহিলাটি চীৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলেন আত্মীয় সান্নিধ্যে, আমাদের কথোপকথনই তাঁর কাছে পৌঁছে দিয়েছিল, আমরা তার আত্মীয়, ত্রাসহীন হয়ে কথা বলতে পারছিলেন। আমরা কবে ত্রাসহীন হয়ে লিখতে পারব?