নেটখাতা

May 28, 2016

শংগঠনের নতুন ধাঁচা – চলো ভাই দিলীপ করি

চন্দ্রবিন্দুর গানের খুচরো পান ধার করে বলা যায়, সংগঠন আসলে বেজায় রকমেরই শংগঠন। চলো ভাই, একটা শং বানাই, গাজনের শং, ভজনের শং, পূজনের শং। কখনও লেনিনের শং, কখনও হো-চি-মিনের শং, কখনও দিলীপের শং। দিলীপ সিংহর শং সাজায় একটু নতুন একটা ধাঁচা, পুরো লতুন ধাঁচার ধূপের গন্ধ। এটাই দিলীপ কাম বিজেপির ইউএসপি। হাড়মুড়মুড়ি ব্যাপারটা দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারে ছিল একটা ব্যারাম – দিলীপ সেটাকে, হয়ত তার ঠাকুরদা মোদির লাইনেই, মোদির একটা ছবি দেখেছিলাম নেটে, বন্দুকপুজোয় রত – একটা বাজনার আরামে এনে দিল। পুলুশকে তুলে নাও : আমরা এই বাজনার আরাম দেব পশ্চিমবঙ্গকে।

আমি যখন শেষ আমরা ছিলাম, এই জীবনের বাল্যকালেই বলা যায়, সোয়ামি-ইস্তিরির মত আমরা না, শংগঠনের আমরা, তখন এই শংগঠন আমিও করেছি। চলো নানা মন্ত্র নানা যন্ত্র দিয়ে একটা শং বানাই। আমরা বানাতাম মার্ক্স লেনিন গুয়েভারা এরকম করতে করতে একদম শেষ ধাপে এসে অমিতাভ নন্দীদের শং। চলো বানাও, খাড়া করো, তারপর একটাই কাজ, সুখে শান্তিতে বংশানুক্রমে প্রণামী খাও, শং-এর পাদদেশে থালায় যা পড়বে। কখনও সে প্রণামী মাল্লু কখনও তা চুল্লু – এক কথায় পাওয়ার।

সেসব সর্বহারা মার্কা শং এখন ফ্যাশনের বাইরে। চলো এখন হাড়মুড়মুড়ি শং বানাই। ঠিকই আছে, ভারতের গল্প, বর্ষ বর্ষ জুড়ে ভরতের বাচ্চাদের গল্প। জীবনের পাটক্ষেতে যে বেজন্মার বাচ্চারা আসিতেছে চলে – জন্ম দেবে জন্ম দেবে বলে, জন্ম দিতে হয় যাহাদের, জন্ম দিয়া আসিয়াছে যারা। তাহাদের আদিপুরুষ তো সেই ভরত – শকুন্তলার বেজন্মা, তার বাপ যাকে নেয়নি। এখন হলে অবশ্য ইশকুলে বা পাসপোর্টে তাতে কোনও ঘাপলা হত না। কিন্তু তখনকার সেই আদি বেজন্মা তার নিজের নামে একটা দেশ গড়ে তুলল – জিস দেস কে বাসী হুঁ। মোদীর দেশ দিলীপের দেশ আরএসএসের দেশ আমার দেশ তোমার দেশ আদি বেজন্মার ডেরিভেটিভের ডেরিভেটিভের ডেরিভেটিভ বেজন্মাদের দেশ। এই হাঘরে হাভাতে হাবাপ-দের দেশে দিলীপই জম্পেশ – চলো, এবার দিলীপ করি।


December 6, 2014

কুকুরের কান্না, চিৎকার

আজ সকালে আমাদের পাড়ার কুকুরগুলোর একটা অনেকক্ষণ ধরে হাউ হাউ করে চীৎকার করছিল। শুনছিলাম, আর ভাবছিলাম, কেন করে? এটা ঘটছিল একটা দেজাভুর, ফিরে-দেখার, মত। এই পাড়ায় আমরা এসেছিলাম বাহাত্তর সাল নাগাদ, তখন আমি ছেলেমানুষ, ইশকুলে পড়ি। সেই সময় একদিন এই পাড়াতে আসার পরপরই ঠিক এমনটা ঘটেছিল। জীবনে প্রথমবার, খেয়াল করে, এই কান্নার আওয়াজটা শুনেছিলাম। কান্না না ডাক না চীৎকার — সবকিছুই। শুনতে খুব করুণ লাগে। কিন্তু কুকুরগুলোর পরিস্থিতেতে খুব করুণাকর কোনও উপাদান থাকে না বোধহয়, কোনও যন্ত্রণা বা বেদনা বা অমন কিছু, অন্তত জানতে বা বুঝতে পারিনি কখনো।

সেই ছোটবেলাতে খুব অবাক হয়েছিলাম, কুকুরটা এমন করছে কেন। কুকুর খুব ভালবাসি বলে নিজের বুকে কেমন মোচড়াচ্ছিল। তারপর থেকে কত বার কত জনকে জিগেশ করেছি, কুকুরেরা অমন করে কেন মাঝে মাঝে, কোনও প্রশ্ন মিটে যাওয়ার মত উত্তর পাইনি। বহু পরে, তখন আমি বিয়ে করেছি, যুবক, সমরেশদা বা লাডলিদা, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরিতে ছিলেন, লিখতেনও প্রতিক্ষণ-এ, বলেছিলেন, সে নব্বই টব্বই হবে, কুকুরেরা চাঁদ ওঠা ব্যাপারটাকে ঠিক বুঝতে পারে না, তাই জ্যোৎস্না উঠলে অমন করে।

তারপরে আবার কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। কুকুরকে বা কুকুরদের অমন করতে শুনলে প্রশ্নটা মাঝেমাঝেই ফেরত এসেছে। লাডলিদার উত্তরটা, যেদিন শুনেছিলাম, সেদিনের মতই, খুব একটা সঠিক লাগেনি। কিন্তু চাঁদের সঙ্গে কোনও একটা সম্পর্ক নিশ্চয়ই উনি অভিজ্ঞতায় পেয়েছেন, তাই বলেছিলেন।

তারপর আবার বহুবছর কেটে গেছে। লাডলিদা কোথায় আছেন কেমন আছেন সেই প্রসঙ্গও মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে বহুবছর, পরবর্তী অনেক বছরের ভিড়ে। যেমন হয়। আজ সকালে আবার শুনলাম ওই কান্না। ছোটবেলার সেই সকালেরই যেন একটা ফিরে দেখা।

শীত পড়ছে। ঠান্ডায় আমার কষ্ট হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে শরীরটা যেন নড়তেই চায় না। আড়ষ্ট ব্যথাব্যথা, যেমন আমার চিরকালই। গত পনরো কুড়ি বছর আবার অভ্যেস দাঁড়িয়ে গেছে, সকালে ঘুম থেকে উঠেই এসে কম্পিউটারের সামনে বসা, রাতে কোনও মেল এসে থাকলে সেটা পড়া, আর সব কাজই তো আজকাল করি মোটামুটি এই কম্পিউটারকেন্দ্রিক, সেই সবে ক্রমে ঢুকে যাওয়া। তেমনি বসেছিলাম, মেশিন তো চালানোই থাকে, মাউস ঘুরিয়ে জাগালাম, দুটো ব্যক্তিগত মেল এসেছিল, তার উত্তর দিলাম। নিজের এই জবুথবুপনাকে একটা আলগা বিরক্তি সহ অনুভব করছিলাম, তখনই কুকুরটা ডাকতে শুরু করল।

বাংলায় কোনও শব্দ আছে বলে তো জানি না, ইংরিজিতে বোধহয় এটাকেই হাউল বলে। নেকড়েরাও নাকি করে। শুনিনি কখনও, পড়েছি, নেকড়ে আর কোথায় দেখব? কোথাওই তো তেমন যাইনি আমি কখনও। আজকে হঠাৎ মাথায় এল, ছোটবেলায় সে উপায় ছিল না, তখন তো কম্পিউটারের কেউ নামই শোনেনি, ছোটদের পত্রিকায় কল্পবিজ্ঞান জাতীয় বিষয়ে ছাপা হত কখনও কখনও, আমরা বাচ্চারা পড়তাম। আজ নেটে খুঁজলাম একটু। তেমন কিছু একটা পেলামও না। শুধু এটাই কেউ কেউ বলছে যে নেকড়ে থেকে কুকুরেরা আসায় তাদের প্রাগৈতিহাসিক অভ্যেশ থেকে করে। কেন করে?

আর একটা জিনিসও মাথায় এল। বাংলায় কোনও শব্দ বোধহয় নেই। নেই কেন? কম্পিউটারেই রাখা অভিধান থেকে দেখলাম, ইংরিজি হাউল শব্দটা এসেছে মধ্যযুগের ইংরিজি শব্দ হুলেন থেকে। তার মানে খুব প্রাচীন শব্দ নয়। তাহলে বাংলায় নেই কেন? রেখা টেখাকে জিগেশ করে দেখতে হবে, হিন্দিতে আছে কিনা। ওদের বিশেষ্য ভাঁড়ারটা তো বোধহয় বাংলার চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ। থাকতে পারে।

যতদূর জানি, সেই কৌষিতকী উপনিষদের শ্লোকের আলোচনা থেকে, একাধিক লেখায় ব্যবহারও করেছি, সালাবৃক বা হায়না বলে ওখানে উল্লেখ করা হয়েছিল কুকুরকেই। যারা ঘোড়া এবং লোহার সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল ভারতে, আর্যদের পোষা। ইন্দ্র যে কুকুরদের মুখে সিন্ধু সভ্যতার তিনশিংযুক্ত দেবতার অনুগামী যোগীদের মেরে মেরে রক্তাক্ত শরীরে বিতরণ করেছিলেন।

তাহলে? যথেষ্ট প্রাচীন যুগেই ভারতে কুকুর এসেছে। ওই কান্নার কোনও প্রতিশব্দ বাংলায় নেই কেন? বাঙালি কুত্তা কি কাঁদে না? তা তো ঠিক নয়। আমার গোটা জীবনটা তার সাক্ষী, আমি নিজেই শুনেছি। আজও কাঁদছিল। আবার বছর চল্লিশেক আগেও কাঁদত। আমার স্মৃতি আছে।

জীবনের বোধহয় এটাই ভাঁড়ার। এই সব না মেটা রহস্যরা। এখন তো খুব সমাপ্তির কথা মাথায় আসে। তাই ভাবছিলাম, এটা নিয়েই বোধহয় শেষ হতে হবে। তারপর কী হবে, তাও জানি না। আমার কোনও ধর্মবিশ্বাসও নেই। পোড়াবে না কবর দেবে, কী করবে, তাতে কিছু এসেও যায় না, ভাবিও না। কিন্তু সমাপ্তিটাকে মাঝেমাঝেই ভাবি। মাথার মধ্যে এই রহস্য বোধহয় ভরাই থাকবে।

কুকুরেরা যদি তাদের জিনগত প্রাগৈতিহাসিকতা থেকে কাঁদে, কাঁদে আজও, তাহলে আমরা কী করি? দাঁত খেঁচাই, মুখব্যাদান করি? নিজের মুখ ভেটকে ভেটকে একটু খেয়াল করার চেষ্টা করলাম, আমি কি অমন করে থাকি, যখন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কখনও কথা বলি, বা আমার কলেজের প্রিন্সিপালের সঙ্গে, কে জানে? বোধহয় না। কিন্তু জিনগত স্মৃতি তো আমারও আছে, নিশ্চয়ই, আমাদের পাড়ার ওই কুকুরটার মতই। কী সেগুলো?

April 22, 2012

ব্যাঙতন্ত্র এবং ঠাম্মা-ব্যাঙ

আমার এক সহকর্মী দিন চারেক আগে আমায় রাতে ফোন করলেন, “দেখছিলে আজ সিপিএমদের, টিচার্স-রুমে — আজ কেমন গলা বেরিয়েছিল, এতদিন পর?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, নতুন বর্ষার জল পড়ায় এঁদো পুকুরের ব্যাঙের মত তো?” সে অবাক হয়ে জানাল, “ওমা তোমারও ব্যাঙের কথা মাথায় এল? আমারও তাই এসেছিল।”

ব্যাঙের তুলনাটা মাথায় আসা খুব বিচিত্র কিছু নয়। দলবদ্ধ আস্ফালন তৈরি করা, যার থেকে কিছুই বোঝা যাবে না। বোঝা যাবে না কারুরই একার আস্ফালন। বোঝার কিছু বোধহয় নেইও। সিপিএম-এর যে কারুরই কথা শুনলে বোঝা যায়, তিনি সবচেয়ে বুদ্ধিমান, সব চক্রান্ত তৈরি হওয়ার আগে থেকে সমাধা হওয়ার পর অব্দি তার জানা, এবং তাঁর এই কথন আর কিছুই নয়, গর্দভ জনগণ যারা নানাবিধ অপপ্রচারে ফেঁসে আছে, তাদের একটু সত্যিকারের সত্যি বুঝিয়ে দেওয়ার লোকশিক্ষা তৈরি করার চেষ্টা করছেন তিনি। সাহেব সৈন্যরা যেমন সাদা-মানুষের-দায়ভার, হোয়াইট-মেনস-বার্ডেন, নিয়ে ‌এইসব ভারত ইত্যাদি কলোনিতে আসত, পুণ্য অর্জনের জন্যে, অন্য কিছু নয়। তেমনি এই সিপিএমরাও এই মাটির পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন আমাদের একটু বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যে, আসল সত্যটা কী।

আগে এসব শুধু বুদ্ধ, গৌতম ইত্যাদি নেতাদের মধ্যে দেখতাম। তাদের সন্তানাদিতে ক্রমে পরিকীর্ণ হয়েছিল এই পৃথিবী, যদিও বিধানসভায় তৃণমূল জেতার পর থেকে তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না একেবারেই। সত্যিই তারা বর্ষার নবধারাজলে সিঞ্চিত ও রোমাঞ্চিত হয়ে তাদের ব্যক্তিগত সব কুয়ো থেকে বেরিয়ে আসছেন, একদম দিগ্বিদিক পুরো ডেকে ডেকে হেজে দিচ্ছেন। টেলিভিশন চ্যানেল থেকে কলেজের টিচার্স-রুম অব্দি। তবে এটা ঠিকই, গৌতম-বুদ্ধবাদীরা আজকাল তেমন মারধর করছেন না, বা, পারছেন না, শুধু ডেকে যাচ্ছেন। এবং এইখানটাতেই ভারি চটে যাচ্ছি।

কলেজের টিচার্স রুমেও সেদিন না বলে পারলাম না, “কোন ইতরামিটা তৃণমূল করছে, যার শুরুটা তোমাদের হাতে নয়?” একজন বললেন, “এতটা কিন্তু হয়নি কখনও।” তাকে না-বলে পারলাম না, “তোমাদের হাতে তোমাদের ক্ষমতায় যদি পাঁচটা খুন হয়ে থাকে তোমাদের উত্তরসূরী শুরু করছে ছয় নম্বর থেকে, সংখ্যাজগতে তো পাঁচের পরে ছয়ই আসে, সংখ্যার লজিকে”। আমার এক সহকর্মী বললেন, “চৌঁত্রিশের পরে ফের এক থেকে না-গুণে, পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ করে গুণে দেখো, পুরোটা মিলে যাবে।” আমি যোগ করার চেষ্টা করলাম, দেখো, এই আলোচনাটা যে টিচারদের মত নখদন্তহীন লোলচর্মদের মধ্যে ঘটতে পারছে, এটাও এই পঁয়ত্রিশতম বছরের অবদান। এর আগে কলকাতার সিকি দুয়ানি নয়া পয়সা নেতাদের দেখেও প্রিন্সিপালদের উঠে দাঁড়াতে হত। যা‌, মোটের উপর প্রিন্সিপাল জাতিটাকেই ঠেলে দিয়েছিল একটা অন্ধকার অপদার্থ অশিক্ষার মধ্যে, এমন অবস্থায় যেখানে আমার সব পরিচিতরাই মাস্টারমশাই হওয়া সত্ত্বেও আমি এমন একজনকেও চিনিনা, আত্মসম্মানবোধ এবং প্রিন্সিপাল হওয়ার বাসনা একই সঙ্গে যার মধ্যে বহমান। এই নিয়ে আগেও আলোচনা করেছিলাম এই ব্লগে — সিপিএম এবং শিক্ষা সাক্ষরতা। এখন তাদের যখন ধরে ধরে পেটাচ্ছে, সেটা মন্দ না ভাল তা স্থিরনিশ্চিত হওয়া খুবই কঠিন। কারণ, এক, ঘোমটার ভিতর থেকে উলঙ্গ সত্যটা বাইরে আসছে, হেগেলীয় ভাষায় যাকে বলে ইমানেন্ট এক্সপ্লিসিট হচ্ছে, লোকের কাছ থেকে চৌঁত্রিশ বছর ধরে গোপন রাখা সত্যটা প্রকাশিত হচ্ছে, আর দুই, যে সব লোক সিপিএমের নেতাদের বাড়ির বাজার করে দিয়ে প্রিন্সিপাল হয়েছে, এবং এখন সেই একই অনায়াস দক্ষতায় অন্য অনেক নেতাদের বাড়ির বাজার করে দিচ্ছে, তাদের পেটানো হয়ত আইনবিরোধী হতে পারে, কিন্তু অভ্যন্তরীন অন্য নৈতিকতায় তাকে খুব অন্যায় বলে বোধ হয় না, যেমন, গীতায় আছে যে আত্মীয়কে হত্যা করে তাকে মেরে ফেলাটা নিধন নয়, বধ, যেমন পশুবধ হয়, তা বেআইনি বটে, কিন্তু আমরা খুব অন্যায় মনে করি কি? বরং চৌত্রিশ বছরের অবরুদ্ধ অনুভূতি প্রকাশিত হোক না সমাজের নিউরোসিস-এর আকারে, বরং তা এবার চিকিৎসিত হতে পারবে।

কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই, ওই তুমুল ব্যাঙ ডাকার শব্দে কাউকেই কিছু শোনানো গেল না। সেই সশব্দ ব্যাঙতন্ত্র কোথাও তো একটা গণতন্ত্রেরও চিহ্ন, কারণ, আগেই বললাম, তৃণমূল ইত্যাদি নিয়ে যে আলোচনাটা চলছিল, সিপিএম আমলে সিপিএমকে নিয়ে তার ধারে কাছে কিছুও টিচার্সরুমে চলাটা ছিল কল্পনারও বাইরে। তাই, গণতন্ত্র না হোক, ব্যাঙতন্ত্রই সই।


আমার ওই সহকর্মীর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতেই, ওই ব্যাঙের প্রসঙ্গে মাথায় এসে গেল, এটা নিয়ে একটা ব্লগ লেখা যায়। আর তার একটু পরেই, চলে এল আমাদেরই একটা চিরাচরিত গল্প। কোথায় পড়েছি, ছোটবেলায়, পঞ্চতন্ত্রে না ঈশপে, তাও মনে করতে পারছি না।

গল্পটা এক ব্যাঙ-ঠাম্মাকে নিয়ে। তার নাতি-নাতনিরা তাঁকে দেখে অবাক হত, ওমা এত বড় কখনও হওয়া যায়, হওয়া সম্ভব? কিন্তু সেই ঠাম্মার আয়তনগত হেজেমনি একদিন আক্রান্ত ও চূর্ণ হল, যখন নাতিনাতনিরা কাছের মাঠে একদিন একটি বলদকে দেখল এবং ফিরে এসে ঠাম্মাকে জানাল। ঠাম্মা বিস্মিত হয়ে গেলেন, তাঁর চেয়েও বড় কিছু কি সত্যিই হওয়া সম্ভব? ঠাম্মার এটা সততই মনে হল, কারণ ঠাম্মা ব্যাঙ কোনওদিনই তাঁর কুয়োর বাইরে যান নি। কিছুই দেখেননি। তিনি পেটের ভিতর দম আটকে আটকে নিজের ভুঁড়ি ক্রমে ফোলাতেই থাকলেন। এর চেয়েও বড়? এর চেয়েও বড়? …

শেষে ফুলতে ফুলতে তিনি ফেটেই গেলেন।

শেষ কিছুদিন মমতার ক্রিয়াকলাপ দেখে মনে হচ্ছে, বোধহয়, যা শুনেছি, অধীর চৌধুরী যা বলেছেন, হার্মাদ থেকে উন্মাদদের হাতে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ, তার সঙ্গে একমত হওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। আজকে এঁদোপুকুরের ব্যাঙেরা তাদের পাঁকমাখা চীৎকার ফের শুরু করার জোরটা পেয়ে গেল এত তাড়াতাড়ি তার জন্যে ইতিহাসের কাছে দায়ী থাকবেন মমতা নিজেই। ঔদ্ধত্য আর আত্মরতিতে ঋদ্ধ সিপিএমের গৌতম বুদ্ধের এই নয়া বৌদ্ধধর্ম তিনি যত বেশি প্রসারিত প্রবাহিত ও উচ্চারিত করে তুলবেন, ততই তিনি এগোতে থাকবেন নিজের বিনাশের দিকে, এবং রাজ্যেরও। পার্ক স্ট্রিট থেকে কাটোয়া, নোনাডাঙ্গা থেকে বন্ধ-রোখা, ঠিক সেই একই রকম শরীরি বলপ্রয়োগে যেমন করে সিপিএম বন্ধ করত, তিনি কী প্রমাণ করতে চাইছেন — তিনি গৌতমবুদ্ধের চেয়েও বেশি বৌদ্ধ? তা হলে কী হল এত কিছু করে সিপিএম জমানার বিরুদ্ধে এত বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়ায়? ব্যাঙ-ঠাম্মা হতে চাইছেন? তিনি কেন এই আত্মবিনাশের পথে হাঁটছেন, আমি জানি না।

ভয় লাগছে হয়তো ইতিহাসে আমাদের জন্যে বরাদ্দ আছে এখন হয় হার্মাদ নয় উন্মাদ কোনও এক ধরনের স্বৈরতন্ত্রই। আতঙ্ক হচ্ছে এই কারণে যে সিপিএম তো নিজেকে বিশ্বাসই করিয়ে ফেলেছে, নিজের কোনও কারণে নয়, করাতের চালনাতেই সমস্যা, কংগ্রেস থেকে কেন্দ্রে সমর্থন তুলে নেওয়াতেই সে হেরেছে, ওটা না ঘটলে সে তো হারতও না, শাসনটা তো সে ঠিকই চালাচ্ছিল। অর্থাৎ, এই সিপিএম ফিরে আসবে আরও আরও নতুন নন্দীগ্রাম সিঙ্গুরের প্রতিশ্রুতি, এবং অমিতাভ নন্দী ও লক্ষ্মণ শেঠদের নিয়েই, কারণ সে তো তাদের মিথ্যা মামলায় আক্রান্ত বলে মনে করে। সে কোন সিপিএম যা আমাদের চেনা সিপিএম-এর চেয়েও ভয়ঙ্কর?

April 14, 2012

শিক্ষা শিক্ষাহীনতা ও কুশিক্ষা

আমার নিজের ভিতর থেকেই একটা গভীর বিরূপতা আমি চিরকালই বোধ করি শিক্ষার প্রতি। মুখে যেটা বলি প্রায়ই, শিক্ষা দিয়ে মানুষ শিক্ষিত বদমাইস হয়, শিক্ষিত রকমে চুরি করতে এবং পা চাটতে পারে। এটা তো আপাতত একটা গোদা এবং গাজোয়ারি যুক্তি বলে শোনাচ্ছে। কিন্তু আদতে এটা ততটা গাজোয়ারি এবং গোদা নয়। অনেক ভেবেছিও আমি এটা নিয়ে। আমার পরিচিত শিক্ষিত বদমাইসদের প্রতি আমার যতটা গা-ঘিনঘিন করে, কখনওই সেটা অশিক্ষিতদের প্রতি করে না।

আমার মাস্টারিজীবনের একদম গোড়ায় আমি কিছুদিন পড়িয়েছিলাম, পুরুলিয়ার মানবাজার কলেজে। সেখানের অনেককে, কলেজের ক্যাজুয়াল কর্মী প্রফুল্লকে, ওখানের আমার এক প্রাক্তন ছাত্রের বাবা-মাকে মনে করে আমার এই শিক্ষাবিরোধিতার পক্ষে আমি উজ্জ্বল সব উদাহরণও পেয়ে যেতাম, আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি মানুষ যাদের দেখেছি, ভালবাসায় যত্নে আতিথেয়তায় — এবং এই গোটাটা মিলিয়ে মানবিক সংস্কৃতিতে — তার মধ্যেই পড়েন এই মানুষগুলো। অথচ যাকে শিক্ষা বলি আমরা তার নিরিখে এরা যথার্থ শূন্য। বিশুদ্ধ নিরক্ষর। আমার খুব নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বা পরিজনদের মধ্যে যে কজন মানুষকে সত্যিই নকল করার মত লাগে, আবার নকল করা অসম্ভবও লাগে, তাদেরও কারুরই শিক্ষাটা কোনও মুখ্য জায়গা নয় একেবারেই।

মমতা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই, বেশ কয়েকবার নিজের মধ্যেই মনে হচ্ছিল নিজের এই অভ্যস্ত শিক্ষাবিরোধী অবস্থান থেকে কি শিক্ষাপন্থী হয়ে উঠতে হবে এই বুড়ো বয়সে? তাহলে কি নিজের ভিতর থেকেই কোথাও একটা মেনে নিতে হবে যে মানুষ হয়ে ওঠায় শিক্ষারও একটা গুরুত্বের জায়গা আছে? এবং এতদিন ধরে একটা চিন্তার সঙ্গে ঘর করার পর সেটার অনুপস্থিতিটাও তো একটা বেদনার হয়ে দাঁড়ায়। তাই একটু খারাপও লাগছিল এটা ভেবে।

চূড়ান্ত উত্তরটা পেলাম এই মিনিট পাঁচেক আগে। টেলিভিশনে অম্বিকেশ মহাপাত্রর, সেই মাস্টারমশাই যাকে প্রহার মৃত্যুভয় ও জেল দিয়েছিল গতকাল রাত্রে এই তৃণমূল শাসন ও সরকার, একটি ইমেল ফরোয়ার্ড করার দোষে, সঙ্গে কথা বলছিলেন এক সাংবাদিক। সাংবাদিকটি জিগেশ করলেন, আপনার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে সেই তৃণমূল কর্মীরা যারা আপনাকে মেরেছিল ও পুলিশে দিয়েছিল। আপনার এতে প্রতিক্রিয়া?

মাস্টারমশাই মাত্র দুতিনটে বাক্যে উত্তর দিলেন। তার মধ্যে একটা মাথায় গেঁথে গেল। দেখুন, যারা গ্রেপ্তার হয়েছিল, তারা তো আমার পরিচিত ও প্রতিবেশী — এতে তো আনন্দ পাওয়ার কিছু নেই।

আমরা সকলেই জানি পরশু রাত থেকে মাস্টারমশাইয়ের উপর কী চলছে। তার পরেও এই প্রতিক্রিয়াটা আমায় কেমন স্তম্ভিত করে দিল। এটাকে কী বলব? এটা তো শিক্ষা নয়, শিক্ষিত মানুষ তো রোজই দেখি কোটি কোটি। তাহলে এটা কী? হয়তো এটাই শিক্ষা।

আর এর উল্টোদিকে যে তৃণমূল শাসন ও সরকার — সে অর্থে তো তারাও কেউ অশিক্ষিত নয়। শিক্ষিত না হলে তো অন্তত কম্পিউটার চালানো, ইমেল খোলা, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, বা মাইকে বক্তৃতা করে চেঁচানো যায় না, “অন্যায় করেছে তো তার শাস্তি পাবে”। অনেকে টিভিতে বলছিলেন এটা মমতার তথা তৃণমূলের অশিক্ষা। না অশিক্ষা নয়, ওটা কুশিক্ষা।

মাস্টারমশাই অম্বিকেশবাবু, আমিও মাস্টারমশাই, বেশ বয়সও হয়ে গেছে, তাও আমাকেও আপনি আজ শেখালেন, কী ভাবে ভাবতে হয়, সারারাত পুলিশের লক-আপে কাটানোর পরের দিনও। আমি এখন থেকে আপনাকে নকল করার চেষ্টা করব। তবে কতটা পারব জানি না।

April 13, 2012

ভগবান ও মমতা — কী ভাল এবং ফর্সা

আজকের গোটা লেখাটাই চুরি করা। কারণ এত অসুস্থ ও অবিস্রস্ত লাগছে গোটাটায় যে নিজে লেখার অবস্থায় নেই। সুমনের গান থেকে চুরি করা নামটা। এবং গুরুচণ্ডালী সাইটের (guruchandali.com) ভাটিয়ালিতে সিকি বলে একজনের লেখা দেখে মুগ্ধ হয়ে সেটাই চুরি করলাম। শুধু একদম শেষে ‘মমতা কী ফর্সা’ এই তিনটে শব্দই মোটে আমার।

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

মমতা কী ভাল! মমতা কী দরদী! মমতা কী মিষ্টি! মমতা কী ফর্সা!

January 20, 2010

রু-এর হাতেখড়ি

আজ সরস্বতী পুজো। সকালে রু-এর হাতেখড়ি দিল আমার বন্ধু, শুভা চক্রবর্তী। সে আবার আমার পরিচিত মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে পণ্ডিতও বটে। হাতেখড়ি দেওয়ার এর চেয়ে ভাল আর কে হতে পারে?

হাতেখড়ির অপেক্ষা। মণিপুরী ওড়না কেটে বানানো শাড়ি চোলি পরে, টিপ এঁকে।

হাতেখড়ির অপেক্ষা

হাতেখড়ি চলছে। অ অক্ষর পরমব্রহ্ম, ভক্তিসহকারে চলছে।

অ চলছে

অ সমাপ্ত হল।

অ সমাপ্ত।

এখন হাতেখড়ি সমাপ্ত। তার মানে শ্লেটটার উপর মালিকানা কায়েম।

এখন শ্লেটটা ওর

Filed under: ব্যক্তিগত, মানুষ — dd @ 1:18 pm

January 4, 2010

একটা মিশ্র দুপুর

আজ আমার ক্লাস ছিল না। দুপুরে গেছিলাম ইনসিওরেন্সের প্রিমিয়াম জমা দিতে, চৌরঙ্গি রোডে। সেখান থেকে বেরিয়ে রাস্তার উপরেই একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। কয়েকটি বছর ত্রিশ পঁয়ত্রিশের ছেলে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল, পরিকল্পনা করছিল একটি পিকনিকের। এবং অনবরত মুখ খারাপ করছিল। ছেলেগুলির পোষাক আশাক বেশ মহার্ঘ, এবং কথা থেকে যা বুঝছিলাম, ওই সামনাসামনি অফিসগুলোয় কাজ করে, কোনও গাড়ির সেলসে যতদূর সম্ভব। ওখানে একটা বেজায় বড় গাড়ির সেলস সেন্টার আছেও, ঠিক রেমন্ডস-এর আগে, এক্সাইডের মোড় থেকে এগোতে। ছেলেগুলি সকলেই বাঙালি। এবং ইংরিজি উচ্চারণও মোটেই শিক্ষিত কিছু নয়, অত্যন্ত গড়, অথচ ইংরিজি শব্দ বলছিল বড়ই বেশি। সে তো অবশ্য বলেই আজকাল। এবং পিকনিকের পরিকল্পনার সূত্রে শুধুই নানা খাবার, আরও খাবার, আরও আরও তৈলাক্ত এবং তৈলাক্ততর খাবার, এগুলোই যেন উচ্চারণের মাধ্যমে অনুভব করে চলছিল ছেলেগুলো। অথচ প্রত্যেকেরই গোটা সম্মুখভাগ জুড়ে এক একটি বেশ নধর আকারের ভুঁড়ি।

তিনটি মেয়ে, এরা বরং অনেক স্বাভাবিক, এরাও বাঙালি এসে দাঁড়াল ওই চায়ের দোকানেই। এরাও কথা বলছিল বাংলাতেই। এবং এতটা কাছে প্রায় গায়ের পাশে মেয়ে তিনটির উপস্থিতি সত্ত্বেও এদের মুখখারাপের দিকচক্রবাল একটুও বদলাল না, খাবারের আলোচনার কামুক যৌনতায় এরা তখন এতটাই মগ্ন। বেশ বিরক্তি লাগছিল আর গা-রিরি করছিল। আবার এটা যে মূর্খতা সেটাও বুঝছিলাম। এরকমই হয় সেলসের ছেলেপিলেরা, ছেলে তো নয় ঠিক, বর্তুল পিলেরা। একমাত্র দেখেছি ওষুধের সেলসের ছেলেরা, মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ নাম ওদের পেশার, কখনও কখনও একটু আলাদা হয়।

যা হয়, বিরক্তিটা ক্রমে ভিতরে চারিয়ে যেতে থাকে, নিজের উপরেই রাগ হতে থাকে। কিন্তু কিছু করারও থাকে না, নিজেদের এই ক্ষয় ও জীর্ণতা নিয়ে আর একবার একটু বিষণ্ণ, দুঃখিত এবং ক্লান্ত হওয়া ছাড়া। ওই নিয়েই এসে রবীন্দ্রসদন ইস্টিশনে মেট্রোয় উঠলাম। সেখানে একটা ছেলেকে দেখলাম, তার কাঁধের ব্যাগের গোটা ফিতে জুড়ে খাকির উপর নীল মার্কারে রেখা রাহুল রাহুল। আবার ব্যাগের অন্য দুটো উল্লম্ব ভাবে ঝোঝুল্যমান ফিতেতে লেখা এসটিওপি-ও, অন্যটিতে এসটিওপি-কে। মানে দুটো মিলিয়ে হচ্ছে দুবার স্টপ এবং একবার ওকে। আবার ব্যাগের গায়েও লেখা অনেককিছু, রাহুল ইজ গোয়িং ওকে, ইত্যাদি।

ছেলেটি অনকেক্ষণ ধরেই খেয়াল করছিল আমি ওকে দেখছি, এবং বোধহয় আমার মুখের রেখায় কিঞ্চিত মজার উপস্থিতিও টের পাচ্ছিল, একটা অস্বস্তিও পাচ্ছিল। ক্রমে আমি ওর সঙ্গে আলাপ জমালাম, ‘তোমার নাম কি রাহুল’ এই দিয়ে শুরু করে। ছেলেটি দমদম মেট্রোপলিটান স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে। ওকে আমি ওর ব্যাগলিখনের একটু ইংরিজির ত্রুটিও সংশোধন করে দিলাম। জিগেশ করলাম, ব্যাগে এত কিছু লিখেছিস, মা বকেনি? ও হেসেই বলল, না, মাথা নাড়িয়ে।

অবাক হলাম আমি দমদমে নামতে নামতে। ছেলেটি যাওয়ার আগে, তার আগে বেশ কিছুক্ষণ আমি এসে দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমায় বলল, “আসি”। আমি তো ছেলেপিলেই চরাই, সত্যিই এতটা সৌজন্য আমি আশাই করিনি ওই বয়সের একটি ছেলের কাছে। বেশ লাগল। অবাকও হলাম। অবাক হওয়ার মত আর একটা জিনিস আমার জন্য অপেক্ষা করছিল তখনও, দমদম পাঁচ নম্বর প্লাটফর্মে। মেট্রো থেকে নেমে দেখলাম মাঝেরহাট-দত্তপুকুর লোকাল দিয়েছে ওখানে। সিঁড়ির দিকে হাঁটলাম।

ট্রেনে উঠে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসলাম। খুব নিকটে কোনও চৈনিক সেলফোনের সাঙ্গীতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত নেই এটা দেখেও ভারি আরাম হল। এই সময় দেখছিলাম, একটি মেয়ে, আর তার সঙ্গে তার মা, খুব খুঁজে বেড়াচ্ছে কিছু একটা ট্রেনে। মা সম্পর্কটা ডাক থেকে মালুম হল, মেয়েটি বেশ উজ্জ্বল দেখতে, ছাপা সিন্থেটিক হলুদ সাদা সালওয়ার কুর্তা পরনে, সঙ্গে মায়ের চেহারায় বরং কায়িক শ্রম ও ক্লেশের ছাপটা বেশ প্রকট, প্রথম দেখলে মা-মেয়ে বলে মনেই হয় না। মেয়েটার মুখটা ভারি মিষ্টি, নরম। ছোটখাট চেহারা, বাঙালি সৌন্দর্য বলতে ঠিক যেমনটা ছোটবেলা থেকে মাথায় গেঁথে আছে একদম সেরকম। ওরা কী খুঁজছে এত সেটা ভাবছিলাম।

এইসময় ওরা উঠে এল, আমাদের কামরাতেই। এবং একটি মানুষ, সামনে ঝুড়ি আর বস্তাটা না-থাকলেও যাকে ওই ধরনের একজন ছোট পুঁজির ব্যবসায়ী বলে আন্দাজ করে নিতে পারতাম এমনই চেহারা তার। লুঙ্গি পরনে, মুখটা একটু ভাঙাচোরা, কাঁচাপাকা গোঁফ। তরকারির ভেন্ডার, কমলালেবু বিক্রেতা এমনটা বললেই যে ধরনের চেহারা মাথায় আসে।

ওই মেয়েটি এবং তার মা দুজনেই এসে এই লোকটির সঙ্গে বসল। এই লোকটি এবং মায়ের সঙ্গে, তখনও মা বলে আমি নিশ্চিত নই, মেয়েটির মুখ চোখের শিক্ষা ও উজ্জ্বলতার এতটাই ফারাক যে আমি বেশ সকৌতূহল দেখছিলাম। মেয়েটির মা কয়েকটি কমলালেবু কিনলেন, ওর বাবাকে দিলেন, বাবা ঝুড়িটায় ঢোকাতে যাচ্ছেন দেখে মা-টি বললেন, “এখন খাইলে দুইটা পাইতা, বাড়ি গ্যালে তো একটা পাবা কেবল”, অন্যান্য কথাতেও ওদের ফরিদপুরের দেশের ভাষার, পরে জানলাম সেটা কথার সূত্রে, পরিপূর্ণ উপস্থিতি। অথচ মেয়েটির কথায় ওরকম কোনও টানই নেই। কলকাতার যে কোনও একটা কলেজের যে কোনও একটি ছাত্রীর মত তার কথোপকথন।

এই যে মেয়েটির সঙ্গে এত ফারাক বাবা-মার, এটা আমায় এতটাই সপ্রশ্ন করছিল যে শেষ অব্দি আমার ঠিক সামনে বসা ওর মা-কে জিগেশ করলাম, আপনার মেয়ে? মা সায় দিলেন। জিগেশ করলাম কী পড়ে? আলাপ শুরু হল। মেয়েটিকে জিগেশ করায় উত্তর দিল, ও মতিঝিল কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। কী বিষয়, জিগেশ করলাম আমি। ও বলল, ফিলসফি। বিষয়ের নামটা বাংলায় বললে আমার আর একটু পছন্দ হত, কিন্তু ফিলসফি শব্দটা ও সত্যিই ফিলসফিই বলল, সচরাচর অভ্যস্ত ফিলজফি নয়। পাস কী জিগেশ করায় সেগুলোর নামের উচ্চারণও বেশ সুন্দর।

ওর মা পাশ থেকে বললেন যে, ওই ফুলের ব্যবসা করেই ছেলেমেয়েদের মানুষ করার চেষ্টা করেন। তারা থাকেন ক্যান্টনমেন্টের রেল লাইনের পাশের ঝুপড়িতে।

আমি ওনাকে না-বলে পারলাম না, মেয়ে আপনার সত্যিই মানুষ হচ্ছে দিদি। এত সুন্দর একটা মেয়ে, আমার সত্যিই মনে হচ্ছিল, বাড়িতে কোনও তেমন বয়সের ভাইপো টাইপো থাকলে তার সঙ্গে সম্মন্ধ করতাম। লেখাপড়াটায় যথাযথ হওয়াটাই বড় কথা না, মা-বাবার বাস্তবতায় কায়িক শ্রমের উপস্থিতিটা এতটাই প্রকট যে মেয়েটি সেটা জানে না তা হতেই পারে না, অথচ তা নিয়ে কোনও সঙ্কোচ নেই। সত্যিই মনটা পুরো ভরে উঠছিল। লেখাপড়াটাও যে ভাল করেই করে নিজের এই দুই দশকের মাস্টারির অভিজ্ঞতায় সেটা ভালই বুঝতে পারছিলাম। মনে মনে আশীর্বাদ করছিলাম, ভাল বাঙালি মেয়ে হ, ভাল বাঙালি মা হ, তোর বাচ্চারাও শিক্ষিত হোক, ইত্যাদি।

লাবণি হালদার বলে মেয়েটিকে আমার নাম, কলেজের নাম দিতেও খুব ভাল লাগল। যদি কখনও ওর কোনও কাজে লাগতে পারি। তখনই ভাবছিলাম, ভাল কিছু তো ব্লগে লেখাই হয় না, আজ ওকে নিয়ে ব্লগ লিখব, ওকে আর রাহুলকে নিয়ে। ভাল ব্লগ। তখনও আমি জানিনা, এর পরে আরও একটা অভিজ্ঞতা আছে যা আমায় উল্লেখ করতে হবে ব্লগে।

বেশ ভাল ফুরফুরে মনে ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরছিলাম। ঠিক গলির মুখে এসে রাস্তার উল্টোদিকে আটকে গেলাম। এসএফআইয়ের একটা মিছিল যাচ্ছে। বোধহয় এপিসি কলেজের, বা মধ্যমগ্রাম বয়েজের ছেলেপিলেও হতে পারে, যেরকম সব কম বয়সের ছেলে। তাদের একদম প্রথমদিকের দুই সারি ছেলে স্বাধীনতা গনতন্ত্র সমাজতন্ত্র ইত্যাদি নিয়ে স্লোগান দিচ্ছে। এবং অন্যরা ঠিক কী করছে সেটা বলা খুব কঠিন। সবচেয়ে কাছাকাছি এটাই আসবে যে তারা একটা প্রতিযোগিতায় নেমেছে, একটা বাংলা বাক্যে কতবার পুং যৌনাঙ্গ ভরে দেওয়া যায়, এবং তার খুব নিকটাত্মীয় শব্দদের। লাকাঁ একবার লিখেছিলেন সমাজতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষার কথা। আর এটা শুনতে শুনতে এটাই আমার মাথায় এল, তাপসী মালিক বা অন্য এই জাতীয় ধর্ষণগুলো তো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। এই ভাষার রূপারোপ যে রাজনৈতিক সক্রিয়তায় ঘটবে তাতে তো ওগুলোই ঘটার কথা।

কিন্তু শেষ অব্দি তো এটাই সত্য যে এই শিক্ষার আবহ, রাজনীতির প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়েও তো রাহুল তার সৌজন্য হারিয়ে না-ফেলার, এবং আমি তাকে সমালোচনার পরও, দায়িত্বশীলতা ধরে রাখতে পারে। লাবণি পারে তিন ভাইবোনের দিদি হয়ে তাদের পড়ানোর পরেও, তাদের দারিদ্রের পরও, তার জীবন্ততা বজায় রাখতে। কোথাও বোধহয় সব কিছু এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

January 2, 2010

সাহেবদের পিণ্ডদান আর কেন?

সেই পঁচিশে ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে এখনও চলছে সাহেবদের পিণ্ডদান। কবে সাহেবরা এসেছিল, চলে গেছে, তাদের কিছু বাল-বাচ্চা আর বেজম্মা পয়দা করে, এখনও চলছে তাদের পিণ্ডদান। কত হাজার টাকার বাজি যে পুড়ল, কত মদের বোতল ইত্যাদিতে কত টাকা যে গেল, তার ইয়ত্তা নেই।

আর আজ সকালেই এলেন বিমলবাবু বলে এক জন। তিনি আমার কাছে মাঝেসাঝে আসেন প্রায় সতের আঠার বছর হল। প্রথমবার তাদের কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, শ্রমিকদের জন্য সাহায্য চাইতে এসেছিলেন। তারপর কতগুলো বছর গড়িয়ে গেল। তিন তিনবার সোদপুরের কাছেই তাদের বস্ত্র-কারখানা বন্ধ হল, এবং খোলার নাটক, আবার বন্ধ।

ওনার প্রতি আমার একটা অপরাধবোধও আছে। বছর দশেক আগে ওনার মেয়ের বিয়ের জন্য কিছু দিতে পারি কিনা জানতে এসেছিলেন, মেয়ের বিয়েতে যেতে বলেছিলেন। আমি ঠিকও করেছিলাম যাব, সোদপুর যাওয়ার পথে গির্জাতে নেমে তার পাশে ওনার বাড়ির রাস্তার নির্দেশ লিখে নিয়েছিলাম, পুরোনো খাতার পিছনে সেই নির্দেশ আজও আছে। আমি ঠিক করেছিলাম, একটা বেশ লাল শাড়ি কিনে, যদি কিছু টাকাও দিতে পারি তাই নিয়ে যাব।

তারপর সেই বছরেই, এই শীতেই, ডিসেম্বরে হল আমার সেই পেটব্যথা। অসহ্য একটা ব্যথা, দম অব্দি বন্ধ হয়ে আসে, আমি ভ্রূণর ভঙ্গীতে কুঁকড়ে শুয়ে থাকি, কিছু করার থাকে না আর। অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে। সবারই এক মত, ওটা মন থেকে আসে। অনেক ভেবেছি। দুটো কারণ থাকতে পারে, এই ডিসেম্বরে শীতের কারণে পেটে একটা খারাপ অবস্থা সৃষ্টি হয়, তার সঙ্গে বোধহয় যুক্ত হয় আমার দুটো মূল স্মৃতি। এক, আমার ছোটবেলায় প্রতিটি বড়দিন ছিল খুব বেদনার।

পঁচিশে ডিসেম্বর বড়দিন, আর তার দুদিন বা এক দিন আগে রেজাল্ট বেরোত। আমার রেজাল্ট বেরোনো মানেই একটা ভয়ঙ্করতা, মা পুরো তাণ্ডব করত, কেন আমি যত ভাল ছেলে তত ভাল রেজাল্ট করিনি — কান্নাকাটি, চেঁচামেচি, অনেক প্রতিশ্রুতি — সেই প্রতিশ্রুতি দেওয়াকালীনই, যে সামনের বছর ভাল করে পড়ব, আমার অপরাধবোধ, কারণ সেই মুহূর্তেই আমি জানি, যে সামনের বছরও একই ভাবে বিড়াল দেখলে আমি লাফাব, একই ভাবে রাস্তার দিকে লোকের দিকে আমি চেয়ে থাকব, একই ভাবে পড়ার খাতায় বন্দুকের ছবি আঁকব — মানে, এক কথায়, একই ভাবে আমি ফাঁকি মারব। ক্রমে, ছোটবেলা আর কৈশোর জুড়ে আমি বড়দিন, ওই হলদে কমলা সিনকাগজ মোড়া কেক, এগুলোকেই কেমন একটা বিতৃষ্ণা নিয়ে দেখতে শুরু করেছিলাম।

এরপরের একটা বড় ডিসেম্বর-স্মৃতি হল মহম্মদের জন্ম। মহম্মদ যখন পেটে এল, ঠিক সেই সময়টায় ওর জন্মটা আমি চেয়েছিলাম না। তখনও তো আমি ওই ম্যাজিকটা আমি টের পাইনি। মহম্মদ আমার প্রথম বাচ্চা। তারপর যখন পেটের মধ্যে নড়তে শুরু করল, সেই অদ্ভুত আবছায়া সোনোগ্রাফি ছবিতেই আমি ফুলোফুলো গাল আর গাবদা কান আবিষ্কার করতে শুরু করলাম, তার আবার কোনও মানেই নেই, কারণ ওসব বোঝা যায় না, তখন তো গল্পটা একদম অন্য। মহম্মদ জন্মেছিল সাতই জানুয়ারি, তাই ৯১-এর ডিসেম্বরে চলছিল তারই তোড়জোড়। সেই আনন্দিত উত্তেজনাটা ঘটছিল, আর মাঝেমাঝে মনেও পড়ছিল, এই জন্মটাই গোড়ার দিকে আমি চাইনি।

যখন থেকে মহম্মদ আমার থেকে আলাদা থাকতে শুরু করল, সেই আলাদা থাকাটাও এল একটা শীতে, ওই ডিসেম্বরের একটু একটু অপরাধবোধ মেশা উত্তেজনাটা আমার বারবার মনে পড়ত। আর হয়ত এইসব মিলিয়েই ওই পেটের ব্যথাটা আসে, যেবার যেবার আসে, এই ডিসেম্বরেই। বিমলবাবুর মেয়ের বিয়ের সময়েও তাই হল, পেটের ব্যথাটা এমন লাট করে দিল আমায় যে আমার মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল। অনেকদিন বাদে ফের উনি আসা অব্দি মনেই পড়েনি।

আজ সকালে এসেছিলেন ওই ষাট বছরের বৃদ্ধ, দারিদ্র আর সময়ের অত্যাচারে আশি বছরেরও বেশি লাগে দেখতে। বৌ মারা গেছেন, মেয়েটা অবশ্য জামাইয়ের কাছে শান্তিতেই আছে। একটা দোকান করেছেন, সেটা কিনে রেখেছিলেন দুই দশক আগে, যখন চাকরি করতেন, খুব সস্তায় চেনা একজনের কাছে পেয়েছিলেন। এক শালা মারা গেছেন, তার বৌ লোকের বাড়ি কাজ করে, তার ছেলেটাকে এনে নিজের কাছে রেখেছেন। সেও খেতে পায়, ওনারও দোকানের কাজে সাহায্য করে।

ট্রেড ইউনিয়ন নিয়েও কত কিছু বললেন, কী ভাবে নেতারা সব টাকা মেরে দিল। ওরা শ্রমিকরা কিছু করতেও পারলেন না। সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন পৃথিবীর দেশে দেশে মাফিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের ক্ষমতার কাছে ওরা শ্রমিকরা আর কী-ই বা পারেন। কিছু টাকাই পেলেন না ওরা। এখন একটা টিমটিমে দোকানে বিস্কুট আর লজেন্স বিক্রি করে দুটো মানুষের গ্রাসাচ্ছাদন করেন।আমার কাছে এসেছিলেন যদি কিছু সাহায্য করতে পারি: তার “ক্যাপিটাল তো নেই, কী হবে?” আমি আর কী-ই বা সাহায্য পারি?

এগুলো শুনতে শুনতেই মাথায় আসছিল, গত দুদিনের এই ফুটানি, আর সাহেবচাটা বর্ষশেষে মাঝরাত্তিরে বাজি ফাটিয়ে ‘হ্যাপপি নিউইয়ার’ করা। সকালে প্রদীপ্তকে ফোন করেছিলাম, ও তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি বেলা আটটাতেও। আমায় বলল, গতকাল রাত সাড়ে তিনটে অব্দি মদ খেয়েছিলাম। সেটা শুনেও মন খারাপ হল। কত টাকা নষ্ট, শরীর নষ্ট, সময় নষ্ট। কী বলব বুঝতে পারলাম না, পরে মনে হল, আজ বিকালে ও কলেজে আসবে আমার সঙ্গে দেখা করতে, তখন বলব, এখন থেকে মদ খাওয়ার কথা মনে এলেই সেই টাকাটা রেখে দিতে, ওর বাগবাজারের পার্কটার পাশেপাশেই কত বাচ্চাকাচ্চা এই শীতে বিনা খাবারে বিনা জামাকাপড়ে রাত কাটায়, পরে ওই টাকাটা থেকে তাদের কিছু কিনে দিতে পারবে। একটা মানুষের হলেও, এক মিলিমিটার হলেও, সেই কষ্টটুকু তো কমবে।

আমাদের এই মধ্যমগ্রাম এলাকা তো ছিল কলোনি এলাকা। সেখানে আমাদের কৈশোর প্রথম যৌবন অব্দিও তো দেখেছি সম্প্রদায়ের একটা বোধ কাজ করত। সেই লোকগুলো তো সব মরে যায়নি, তাহলে সেই বোধটা অন্তর্হিত হয়ে গেল কেন, কী করে, কবে? চলে যাওয়া সাহেবদের পিণ্ডদান না করে এই টাকাটা এই বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার শ্রমিকদের, দুঃস্থদের জন্য কিছু করা যায় না? আমাদের কলেজের সামনে শোভাবাজার মেট্রো ইস্টিশনের চারদিকে ফুটপথে বাস করে কত মানুষ। সেই রকম এক বৃদ্ধাকে দেখি রোজই, কত বাচ্চা। কাল আমার বাচ্চা যখন ঢাকুরিয়া ইস্টিশনে ললিপপ খাচ্ছিল, আর একটা বাচ্চা ওই শীতেই প্ল্যাটফর্মে হেঁটে বেড়াচ্ছিল, পাছা থেকে গোটাটা ল্যাংটো। সাহেবদের ওই পিণ্ডিটা এদের স্থানান্তরিত করা যায় না কোনও মতেই? আমরা এরকম অমানুষ হয়ে গেলাম কেন?

December 19, 2009

The Pain of Living in Madhyamgram

I write my blog in Bangla, but this blog is actually a big quotation: an entire email sent by one of my senior neighbors to the MP of the constituency under which Madhyamgram comes. He forwarded a copy to me after I requested him to do that on phone when he told me about it. There is really an appeal in the letter which would go amiss if I translate the letter to Bangla. This gentleman, who wrote this mail, I know him for around six years, and I carry a regard towards him: he talks very little and reads a lot. Let me quote the entire letter. Though I call him ‘dada’, he is much more senior to me to be an elder brother. The mail has one or two construction errors, but I am not correcting them, they hardly matter in grasping the sense.


From: Asit Kumar Banerjee <asitkbanerjee@gmail.com>
Date: Sat, Dec 19, 2009 at 10:13 AM
Subject: An Appeal from a Senior Citizen about Loud-speakers
To: “Dr. Kakoli Ghosh Dastidar” <winkakoli@rediffmail.com>
Cc: madhyamgrammunicipality@vsnl.net, chmgram@yahoo.net,
wbpcbnet@wbpcb.gov.in, narayans@wbpcb.gov.in

Dear Dr. Ghosh Dastidar

I am a common citizen in your constituency, living in an apartment
near Sodepur Road, Madhyamgram. I am a senior citizen in that sense,
retired through VR after working in a responsible post for around 29
years. My wife and me we live in our apartment, my children working
elsewhere. We seek for a peaceful life, untroubled and all.

Last afternoon I was listening to what you were saying in the
Environment Fair (’Paribesh Sachetanata Mela’) organized by the
Madhyamgram Municipality. I liked what you said, but, obviously you
could speak in much more details. These days I too read a lot of
environment through the Internet, my daughter presented me a computer
last year. Having nothing else to do, and being a lonely kind of
person, I use it a lot.

What I want to tell you is not just my opinion, but I have talked with
quite a few in my age-group, some other like me who suffer from the
noise-pollution thing in Madhyamgram. But, obviously, we are quite
afraid to speak in open. You know the political environment in this
state better than me. In fact that I am using my email id to send you
this mail without being afraid is only possible because this is my
formal name that I used in my office and hardly anyone around knows
it.

For years, different local clubs, and obviously political bodies
disguised behind them are going on using the central route of
Madhyamgram in a very noisy way. They cover all the lamp-posts with
loudspeakers. And then, all through the day, they go on blasting
messages. We have no where else to go but just go on listening to
them. This is a regular thing in Madhyamgram, even my relations who
come from somewhere else, ask in a surprised way, is some festival
always going on here? I say, no festival, it is noise-politics.

Some time back, I made an online petition to the Chief Minister of
West Bengal. As you can understand that hardly created any permanent
result. The link of the petition is here:

http://www.ipetitions.com/petition/madhyamgram-sound/

Not just the loudspeakers on the central road that go on blasting day
and night, there are functions too. And it is unfortunate but true
that in two particular localities of Madhyamgram, that are
Subhashpally and Bankimpally, even local councillors are involved too
in these functions, implicitly or explicitly, and some of them are
from your own party too.

Anyway, what happened this year was even stranger than before. The
very local government body, the Municipality (I have kept them and the
Pollution Control Board in CC of this mail) started using the same
procedure. They started using the lamppost loudspeakers the very same
way the local goon-politicians do. I was really startled.

You can understand, if the local government itself started using these
measures, the whole vulgarity becomes legitimized. And, after some
time these atrocities go on inflating and inflating. Just think about
the fair, where you were quite justly trying to help people understand
the issue of environment, was itself corroding the sound-environment.

And this is just a stupid prejudice of some people that through
loudspeakers you can reach more men. On the contrary, if you speak too
loud, people do consider it more as a noise. Through your ideas and
actions you can reach people, not loudspeakers, you must be knowing it
better than me.

So, it is an appeal on my part, please stop this use of lamp-posts as
loudspeaker stands in Madhyamgram. At least not on part of local
government. Just give me one example, my wife is just a few months
short of seventy, and she can hardly move due to rheumatic problems.
She remains most of the day on her bed, adjacent to two windows. And
unfortunately, due to the loudspeakers of Madhyamgram, most of the
times these windows have to be kept closed. Just think about it, it is
not a tall demand for an elderly woman to want to keep the windows
open, but the unfortunate thing is that, by being a citizen of
Madhyamgram, she can hardly do it. Can you imagine the continuous
torture that we go on enduring?

Expecting a lot from you

A K Banerjee,
Madhyamgram

November 24, 2009

একটি প্রায়স্প্যাম পিডিএফ এবং অগ্রদানী বামুনেরা

আজ দুপুরে সাতবার পেলাম একই ফাইল, প্রায় পরপর, একটি পিডিএফ। প্রথমে মনে হল কেউ স্প্যাম করছে? তারপর, পিডিএফ-টা খুলে দেখলাম, নিচে যার নাম, ‘তপন দাস’, এবং পিডিএফ-টিতে যা লেখা আছে তারও নিচে সেই একই নাম, ‘তপন দাস’, এবং লেখাটার যা চরিত্র তাতে স্প্যাম বলে মনেও হল না। যতদূর মনে হয়, কেউ একটা আবেগের আতিশয্যে, বা কম্পিউটারে অত্যধিক দক্ষতাবশত এটা করে থাকবেন।

লেখাটার শিরোনাম, ‘এই জন্যই কি আমরা সিঙ্গুর নন্দীগ্রামে একসাথে পথ হেঁটেছিলাম?’ লেখাটা থেকে এখানে প্রতিলিপি করে সেঁটে দেওয়া যেত, অন্তত কিছুটা অংশ, কিন্তু কোনও এক অদ্ভুত প্রাক-ইউনিকোড রকমে লেখা সেটা, পিডিএফ থেকে এইচটিএমএলে পরিবর্তিত করে নিলে সেটা জঞ্জাল হয়ে যাচ্ছে, ইউনিকোডে যা আমরা প্রায়ই করে থাকি। মানে নিজস্ব ফন্টে নিজস্ব নিয়মে লেখা টেক্সটা। আমি পরে দেখছি, মন্তব্যে পিডিএফটা জুড়ে দেওয়া যায় কিনা। কলকাতা ৩২ থেকে তপন দাসের পাঠানো পিডিএফটার মধ্যে একটা আবেগ আছে যে আবেগটা আমাকেও ছুঁচ্ছে। আসছি সেই কথায়। এর আগেও আমার ব্লগে আগেই লিখেছিলাম মাউন্ট ব্যাটন সাহেব-অ, সাধের ব্যাটন কার হাতে থুইয়া গেলা-অ, ২২শে জুলাই, ২০০৯, সেই প্রসঙ্গটাই আর এক বার প্রখরতর হয়ে ফিরে এল এই অগ্রদানী বামুনদের আলোচনায়।

খুব কম লোকের সঙ্গেই আমার রাজনীতি নিয়ে সরাসরি কথা হয়, নিজে নিজে একা একা বাঁচি প্রায়। তাই আমার কোনও রাজনৈতিক মতামতের কতটুকু মূল্য আছে জানি না, কিন্তু আমার যা মনে হয়েছে আমার চেনা একজন মানুষও খুব আশা করে, মানে সেই অর্থে ‘সদর্থক’ রকমে তৃণমূলকে ভোট দেননি। বা এগারোতেও দেওয়ার কথা তেমন ভাবছেন না। এখানে একটা শব্দই অর্থপূর্ণ, তা হল সিপিএম। সিপিএম-এর প্রতি ঘেন্না, যে কোনও মূল্যে সিপিএম তাড়াও — এই জায়গা থেকেই তাঁরা ভোট দিয়েছেন বলে আমার মনে হয়েছে। বা এগারোতেও দেবেন বলে ভাবছেন। লোকজনের মন সরাসরি প্রশ্ন করে জানা যায় না, বরং একদম অন্যরকম কোনও মন্তব্যে তার প্রতিক্রিয়া কী হচ্ছে এখান থেকে তাদের মন বোঝা যায়।

এই উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার দিন আমাদের টিচার্স রুমে আমি একটা মন্তব্য করেছিলাম একদমই ওই লোকের মন পরখ করার উদ্দেশ্যে। একজন যেই জানাল, সিপিএম দশে গোল্লা, এক আধজন পুরো সংবাদটা শুনতে চাইল, একজন আমার দিকে চেয়ে আমার কোনও মতামত চাইল। আমি বললাম, ধুর, এই বাই ইলেকশন নিয়ে আমার কোনও আগ্রহ নেই, এগারোর বাইবাই ইলেকশনে কী হয় সেটাই আগ্রহ। এবং আমি নিশ্চিত, এটা শোনামাত্র টিচার্স রুমের প্রত্যেকের মুখই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

এবং ওই বাক্যে বলুন, বা, বাক্যের পরবর্তী আলোচনায় বা উত্তেজনায়, আসলে কোথাও তৃণমূল নেই। সিপিএম আছে। ভয়ানক বিকট এবং কুৎসিত রকমে। আগেকার দিনে যেমন বলা হত, সিপিএমের পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়ে গেছে — এই বাক্যটা দিয়েই কেবলমাত্র মানুষের সিপিএম-ঘেন্নার সেই অনিবার্যতাটা প্রকাশ করা যায়।

এবং ষোলই মে লোকসভা নির্বাচনের ওই ফলাফল কোথাও একটা গতি সৃষ্টি করেছিল, সমাজজীবনের। সেটা এমনকি আমার মত সমাজবিমুখ মানুষও বুঝতে পারছিল। একটা বড় জায়গায় বক্তৃতা করার নেমন্তন্ন, যারা করল তারা জানাল, দেখো ষোলই মের আগে হলে তো তোমায় করতে পারতাম না, প্লিজ এসো। বহুদিনের বকেয়া কিছু প্রোমোশন হয়ে গেল, যাদের চেষ্টায় হল তাদের একজন বলল, এই ষোলই মের আগে হলে কি হত নাকি এরকম? এই ধরনের।

এবং সেখানেও কোথাও তৃণমূল নেই। আছে সিপিএম। সিপিএম-এর বিরুদ্ধে জনসমক্ষে মুখ খুলতে পারছি — এই আরাম দেখতে পাচ্ছিলাম আমি লোকের মুখেচোখে। সবাই-ই তো বীর হতে চায়, শুধু ভয়ে হতে পারে না।

এবং ষোলই মের পরে তো সত্যিই সিপিএমের কুষ্ঠ থেকে পাবলিক রকমেই মাংস খসে খসে পড়তে শুরু করল। বহু জায়গায় জোনাল কমিটি অব্দি জুড়ে দিতে হচ্ছে, কারণ লোক নেই। পার্টির মধ্যে শুদ্ধীকরণ প্রক্রিয়া চালু করা হবে — স্থগিত হয়ে গেল, কারণ, সেই প্রক্রিয়া চালু করা হবে যাদের হাত দিয়ে এমন সর্বসম্মত রকমে শুদ্ধ গুটিকয়েক লোকও যোগাড় হচ্ছে না। জমি মাফিয়ার টাকা কে নিয়েছে আর কে নেয়নি তাই নিয়ে যুদ্ধ। নানা খবরই কানে আসছিল। এর মধ্যে আবার যোগ হল বুদ্ধকে বলি করা। হুগলীর এক নেতা সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা করলেন, তিনি কারুর চুলের মুঠি ধরে কালীঘাট নিয়ে যেতে পারতেন চাইলেই। এই আপাতদৃষ্টিতে গালাগালের বক্তব্যটাকে দ্বিতীয়বার পড়লেই টের পাওয়া যায় তিনি ঝিকে মেরে বৌকে শিক্ষা দিতে চাইছেন, চুলের মুঠিটা তিনি যার টানতে চান তিনি আর যাই হোক কালীঘাটে থাকেন না।

এই রকম সব হচ্ছিল। আর কেমন একটা ঘাবড়ে যাচ্ছিলাম ভিতরে ভিতরে। ‘৮৯-এ পার্টি যখন ছাড়লাম তখনই সেটা অবাসযোগ্য রকমের দূষিত হয়ে গেছে, ব্যবসায়ীদের দালালদের কাছ থেকে টাকা খাওয়ার ঘটনায় কেউ আর রাগ তো দূরের কথা অবাকও হয় না, ততদিনেই। কিন্তু এরকমটা ঠিক ভাবিনি। এ কেমন ওয়াকওভার। এবং ভেবে দেখুন, তৃণমূল তো কোথাও নেই-ই, তার মানে এটা সিপিএম-ঘেন্নার শূন্যতার কাছে সিপিএমের ওয়াকওভার। এবং এই শূন্যতাই তো তাই যা সিপিএমকে এরকম করেছে। সেটা তো তবু এসেছিল একটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে। শুধু মাত্র ঘেন্নার শূন্যতা থেকে তৃণমূল এত বড় একটা ওয়াকওভার পেয়ে যাচ্ছে — কেমন একটা বুদ্ধু লাগছিল নিজেকেই, এরকমটা যে হবে তা তো কোনওদিন ভাবিনি।

সেই শূন্যতার রানী হওয়া থেকে তৃণমূলকে হয়তো বাঁচিয়ে দিল এই অগ্রদানী বামুনেরা। বাংলা সাহিত্যে দুটো জায়গায় খুব বড় আকারে রাজানুগৃহীত ব্রাহ্মণের প্রতি বিতৃষ্ণা উচ্চারিত হওয়ার কথা এই মুহূর্তেই মনে পড়ছে। একটা শ্রীকান্ত উপন্যাসে, রাজলক্ষ্মীর সেই জমিদারি কেনার রাঙামাটি গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের প্রতি সশ্রদ্ধতা। আর একটা তো অবশ্যেই তারাশঙ্করের গণদেবতা-পঞ্চগ্রামে। বিশ্বেশ্বরের পিতামহের প্রতি সশ্রদ্ধতা। বিশ্বেশ্বর-ই তো ছিল সেই কমুনিস্ট যুবকের নাম, না কি বিশ্বনাথ? ভাল মনে করতে পারছি না।

এই সশ্রদ্ধতা আমার মধ্যেও আছে। রাজানুগৃহীত ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণ-ই নয় বলে আমি নিজেই মনে করি। আর অগ্রদানী বামুন আরও এক কাঠি বাড়া, সে পিণ্ড ভোগ করে। এই পিণ্ডটা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুরে সিপিএম-নিহত মানুষের পিণ্ড।

যে চারজনের পরামর্শের বিনিময়ে মাসে পঞ্চাশ হাজার বেতন এবং আরও নানা উপরি বখশিশ পাওয়ার কথা শুনলাম, তা যদি সত্যিও হয়, এ নিয়ে সিপিএমের কিছু বলার নেই। সিপিএম রাজনীতির সমান স্তরের ভয়ানকতার কাছাকাছিও নয় এইসব উঞ্ছবৃত্তি। কিন্তু আমরা যারা সিপিএম-ও নই, তৃণমূলই নই, ওই তপন দাসের মত আমাদের অনেকেরই এটা বেশ খারাপ লেগেছে, সমস্ত অর্থেই। এবং সেখানে টাকার অঙ্কটা গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই, আমাদের মত গরিব দেশে। প্রায় দুই দশক চাকরি করার পরও আমার মাইনে, আমি তো ভাল চাকরি করি, ওর থেকে অনেক কম। এবং সেটা পাওয়া যাচ্ছে পরামর্শ দিয়ে। অন্য কারুর কী মনে হচ্ছে জানি না, ব্যক্তিগত ভাবে আমার এটাকে একরকম হাড় বলেই মনে হচ্ছে, রাজনীতির টেবিল থেকে পায়ায় বাঁধা ব্রাহ্মণের দিকে হাড় ফেলা হচ্ছে।

যে চারজনকে নিয়ে এই প্রশ্ন উঠছে, তার মধ্যে অর্পিতা পালের নাম আমি কখনও শুনিনি, এখন শুনেছি, কিন্তু এই মুহূর্তেও মনে করতে পারছি না, কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে আমার এটা সত্যিই খুব অভাবিত এবং বেদনার লেগেছে শাঁওলি মিত্রের বেলাতেই। তার কারণের অনেকটাই নিতান্ত ব্যক্তিগত। আমি চিরদিনেরই পাষণ্ড। খুব ছোটবেলার পর থেকেই আমার কোনও ঠাকুর দেবতা নেই। কিন্তু সেখানে খুব স্থায়ী এবং অনড় দুটো চেয়ারে আসীন দুইজন মানুষ শাঁওলি মিত্রের মা আর বাবা। জানি এর মত বোকামো কিছু হয় না, বাবা-মা দিয়ে সন্তানকে বোঝার চেষ্টা করা, কিন্তু এটা ঠিক যুক্তি দিয়ে হচ্ছে না। আমার কষ্ট হচ্ছে। কষ্ট তো যুক্তি মেনে হয় না। জানি না, ওই দুজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন তো জানি না, হয়তো জানলে সেখানেও নানা ভাঙচুর থাকত, জানি না। এই জন্যেই খুব বেশি জানতে নেই। এর পর থেকেই শম্ভু মিত্রের অয়দিপাউসের কথা মনে পড়লেই, আমাদের স্মৃতি তো ওরকমই হয়, নানা নানা সংযোগের সূত্র ধরে চলে, আমার মনে পড়ে যাবে রেলের কথা, তৃণমূলের কথা — কী বিশ্রী।

তবে মোটের উপর এটা বোধহয় ভালই হল। শূন্যতার ফাঁকা মাঠে ওয়াকওভারের জয় কোনও গনতন্ত্রের পক্ষেই ভাল নয়।

Next Page »

Powered by WordPress