নেটখাতা

November 17, 2009

জলপাইগুড়ির টাটা চা বাগান নিয়ে নেটে অন্যত্র

এই ব্লগে ঠিক এর আগের লেখাটা — বুড়িয়ার, মানে শর্মিষ্ঠার, চিঠিটা এবং তার সঙ্গে আমার যোগ করা ভূমিকা নিয়ে, প্রথমে আসে গুরুচণ্ডালী ওয়েবসাইটে

এখন গুরুচণ্ডালীতেই আসছে জলপাইগুড়িতে টাটার নেওড়ানদী চা বাগানে পরপর কী ঘটে চলেছে তার ডাইরি

নেওড়ানদী চা বাগানের শ্রমিকদের এই আন্দোলন নিয়ে দুটো ইংরিজি ওয়েবসাইটের লিংকও পেয়েছি। প্রথমটা আইইউএফ-এর

আর একটা র‍্যাডিকাল নোটসের

আরও একটা, এখানে মন্তব্য আছে অনেক।

November 11, 2009

জলপাইগুড়ির টাটা চা-বাগান

এই ব্লগে, ২৯শে অক্টোবরের লেখায়, মধ্যমগ্রামের শেষহীন পুজো এবং জলপাইগুড়ির টাটা চা-বাগান, বুড়িয়ার চিঠির সূত্রে জলপাইগুড়ি টাটা চা-বাগানের প্রসঙ্গ এসেছিল। এর আগেও আমার ব্লগে ওর কথা, ওদের কথা, ওদের চা-শ্রমিকদের মধ্যে এনজিও-র কাজের কথা এসেছে। চা-বাগান নিয়ে মাঝেমধ্যেই ওদের সঙ্গে কথা হয়, কাজ নিয়েও, ওদের চা-বাগানে কাজ করার মত কম্পিউটার সিস্টেমগুলো ইনস্টল করে দিয়েছি, নানা সময়ে নানা টেকনিকাল সমস্যার সূত্রেও কথা হয়। যা শুনি তার গোটাটাতেই একটা শঙ্কা হয়। সেটার কথায় আসছি।

আগে বুড়িয়ার বিষয়ে বলে নিই। ওর ভাল নাম শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস, কিন্তু সেটা প্রায় কেউ জানেই না। যদিও ও অর্থনীতি নিয়ে বিএসসি পাস করেছে আমার কলেজ থেকেই, ‘৯৩-এ, তার মানে আমি তখন মাস্টারমশাই, কিন্তু সে সময়ে আমি ওকে চিনতাম না। ওকে চিনলাম অনেক পরে। তখন ও জীবন, পুলিশ, মতাদর্শ ইত্যাদি সবকিছুরই দ্বারাই বিরাট রকমে নিষ্পেষিত এবং তাড়িত। সোজা বাংলায়, কোনও রকমে বাঁচতে চাইছে, চাকরি খুঁজছে। ও এবং ওর আরও দু-চারজন বন্ধু মিলে আমার কাছে এল, তাদের সবারই ইতিহাস ওই এক। চাকরির পরীক্ষার জন্যে আমি কোনও সাহায্য করতে পারি কিনা, বা, ইকনমিক্স ছাড়া অন্য বিষয়ে চেনা কারুর কাছে পাঠাতে পারি কিনা। সবার কাছে ওরা তখন যেতে পারছে না, তার কারণটা বলে নিই।

তার আগে ওরা পিডব্লুজি রাজনীতি করত। এবং রাজনীতিসূত্রে বেশ কিছুটা জীবনীশক্তি, বছর এবং উদ্যম ব্যয় করার পর ওরা বুঝতে পারে, ব্যক্তিহত্যার রাজনীতির সঙ্গে ওরা কিছুতেই মানিয়ে উঠতে পারছে না। হয়ত রাজনীতিটা ঘোষিত ভাবে ব্যক্তিহত্যার নয়, কিন্তু শেষ অব্দি তাই তো হয়ে দাঁড়ায়। এবং মজাটা এখানে, ছেড়ে দেওয়ার পর ওরা বিপন্ন হয়ে পড়ে সমস্ত দিক দিয়ে, শুধু পুলিশ বা সমাজজীবন নয়। ওদের বহু খবর যা ওদের রাজনীতির বাইরে অন্য কারুর কাছে অজানা এমন নানা কিছুও পৌঁছে যেতে থাকে ক্ষমতার কাছে। এবং নিজেদের বাড়ি বা পরিবারের কাছ থেকে নানা সমস্যা তো ছিলই, তাদের কোনও দোষও দেওয়া যায় না, এতদিন তারা কোনও কিছু না-করেই পুলিশি নানা উৎপীড়নের শিকার হয়েছে।

এইসময় আমার কিছু নিকট মানুষ যারা সিপিএম করে বা সিপিএমের সঙ্গে সে অর্থে ঘনিষ্ঠ, এই বিষয়টা জানার পর, তাদের মঙ্গলাকাঙ্খা থেকেই, আমাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। তাদেরকে বলেছিলাম, কেউ যদি ওদের একটুও সাহায্য না-করে তাহলে ফের ওদের ফেরত যেতে হবে সেই রাজনীতিতেই যার বিরোধিতা করে ওরা ছেড়েছে। এবং সেই ব্যক্তিহত্যার রাজনীতির তো বিরোধী আমিও। আমি সক্রিয় দলভিত্তিক রাজনীতি ছেড়েছি ‘৮৯ সালে। কিন্তু তার পরের এই দুটো দশক আমি তো রাজনীতি করেই চলেছি। আমার লেখালেখি আমার বক্তব্য আমার চিন্তা এটাই তো আমার রাজনীতি। এবং উগ্রপন্থাকে আমি তো সত্যিই রাজনৈতিক ভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক একটা জায়গা বলে মনে করি, যা মানুষের সমস্ত গনতান্ত্রিক বক্তব্যকেই শেষ অব্দি স্তব্ধ করে দেয়। এবং ক্ষমতাকেই, সে আমেরিকাই হোক আন্তর্জাতিক ভাবে, আর বুদ্ধই হোক রাজ্যস্তরে, আরও আরও হিংস্রতা করে চলার লাইসেন্স দিয়ে দেয়। এই নিয়ে একটা লেখাও লিখেছিলাম, ১১ই সেপ্টেম্বরের পর, ‘ভাল আমেরিকা, কাল আমেরিকা’ বলে, ‘অন্যস্বর’ পত্রিকায় বেরিয়েছিল। সেই লেখাটা আমার ওয়েবসাইটে রাখা আছে, যদি কেউ চান পড়তে পারেন। লিংকটা হল: http://ddts.randomink.org/bangla/essay/theory/juddha.pdf

উগ্রপন্থাকে আমি বিপজ্জনক মনে করি, কারণ, শেষ অব্দি প্রতিটি উগ্রপন্থী রাজনীতিই, সন্ত্রাসবাদী রাজনীতিই, পুঁজির তথা শাসক ক্ষমতার হাত শক্ত করে।  তাই, উগ্রপন্থাকে বিপজ্জনক মনে করি বলে সেই সমস্ত রাজনীতিকেই আমি বিপজ্জনক মনে করি যা এই উগ্রপন্থী রাজনীতি তৈরি হওয়ার অবস্থাটাকে সৃষ্টি করে। এই কদিন আগে বুদ্ধ ইত্যাদি বক্তৃতা রাখলেন, ‘জঙ্গলে ঢুকেই মারব’ বা ওই ধরনের কিছু। লালগড় সূত্রে। গোটা আস্ফালনের হাস্যকরতাটা যদি বাদও দিই, পুরো পরিস্থিতিটাকে একবার ভাবুন: কী ভয়ানক অমানবিক।

বুদ্ধ যাবেন জঙ্গলে, তার দশ গজ বিশ গজ ত্রিশ গজ দূরে দূরে পুলিশ ও কমান্ডোর বৃত্ত, ঢুকে তিনি একটি ডালে বসা বসন্তবৌরী পাখির ন্যাজ নড়তে দেখে বলবেন, ‘তোমার ন্যাজে যদি কোনও মাওবাদ থাকে তো আমরা সেটা গুঁড়িয়ে দেব’ ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। তাতে সেই বাচ্চা মেয়েটির কী হবে, যে ভয়ে ও অপমানে কাঁদতে কাঁদতে, নিজের কাঁচা হাতে পোস্টার লিখছিল, ‘আমার বাবা আর সিপিএম করবে না’। সে তো মহাকরণেও থাকে না, তার চারদিকে তো কমান্ডোর বৃত্ত নেই। এবং মাওবাদ ও মাওবাদীরা তো শূন্য থেকে গজায়নি। সে তো এই সিপিএম রাজনীতিই যা একজন রাজনৈতিক কর্মীর সম্পর্কে এতটা ঘেন্না ও বিবমিষা তৈরি করতে পারে যেখান থেকে মাওবাদীরা এইরকম একটা দাবি তৈরি করে। আমার এক ছাত্রের কাকা, সরকারি চাকরি করেন কলকাতায়, ওই এলাকাতেই থাকেন, আমাকে বলেছিলেন, সত্যি কথা বলব স্যার, ওই পোস্টারগুলো দেখি আর মনে বেশ জোর পাই, যাক কেউ একটা তো আছে অন্যায় প্রতিবাদ করার।

এবং ওই মাওবাদ তৈরি করল কে? পাঁশকুড়া গড়বেতায় পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন সিপিএম মদতকে বাদ দিন, সেটা অন্য গল্প, তৃণমূল কী ভাবে মারতে হবে তার সিপিএমী ছক, এই ভয়টাই তো সেই সিপিএম রাজনীতি। এবং ভয় থাকলে ভুত তৈরি হতে কতক্ষণ। একভাবে না একভাবে নিষ্পেষিত ভয় তো ফেরত আসবেই, সমাজের রাজনীতির নিউরোসিস হয়ে, সেটাই উগ্রপন্থী রাজনীতি। এবং উগ্রপন্থী রাজনীতি থাকলেই তো পুলিশ ও সৈন্য নামিয়ে আনা যায়, তাতে মৃত্যু ও রক্ত ও ধর্ষণ দিয়ে ধুয়ে মুছে দেওয়া যায় আদিবাসীদের উপর অত্যাচারের ইতিহাস।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর মহাভারত ও পুরাণের গল্পগুলোয় সব রাক্ষসরা কথা বলে সাঁওতালি রকমে। এখনো তো তারা রাক্ষসই। কখনও মদেশিয়া রাক্ষস, কখনও লালগড়ের রাক্ষস। ফিল্মস্টাডিজের সঞ্জয়দা একদিন বলছিল ওর ছাত্রদের, লালগড়কে বুঝতে চাও তো ঋত্বিকের অযান্ত্রিক দেখো, নায়ক নায়িকা এক কোণে পড়ে আছে, আর গোটা ফ্রেম জুড়ে কেন উপজাতি নাচ আর উপজাতি ভূগোল সেটা বোঝো, তাহলেই লালগড় বুঝবে। ঠিক তাই। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর সময় পেয়েছিলেন আপনারা, উপজাতিদের ইতিহাস কেন এক ইঞ্চিও বদলাল না সেটা আগে বুঝুন তারপর পাঁজি দেখে ঠিক করবেন কবে জঙ্গলে যাবেন মাওবাদী মারতে।

চা-বাগানের এই শ্রমিকরাও সেই আদিবাসী। বুদ্ধরা একটা মাওবাদী এলাকা তো তৈরি করেই দিয়েছেন। আরও একটা উত্তরবঙ্গে তৈরি করতে যাচ্ছেন, ঠিক এই কথাটাই মনে হয়েছিল বুড়িয়ার চিঠিটা পড়ে। দু-দিন আগে আবার ওর একটা চিঠি এল। সেই গোটা চিঠিটাই তুলে দিলাম এই লেখায়, শুধু সম্ভাষণ আর ইতিটা বাদ দিয়ে। আর সামান্য কিছু বাক্যের ও শব্দের মেরামত সহ, হুবহু চিঠিটাই তুলে দিলাম।


date Sun, Nov 8, 2009 at 9:09 subject TATA Tea
তোমায় আগেই বলেছি, নেওড়ানদী চা-বাগানের গোলমালের কথা। এখানে কিছু দিন ধরে টাটার বাগান নেওড়ানদী চা বাগানে আদিবাসী শ্রমিকরা আন্দোলন চালাচ্ছে। নেওড়ানদী চা বাগান টাটার একটি সংস্থা। বছরখানেক আগে হঠাৎ সব টাটার বাগানে বোর্ড থেকে টাটার নাম তুলে দিয়ে অ্যামালগেমেটেড কোম্পানী লিখে দেওয়া হল।

বাগানের শ্রমিকরা এই পরিবর্তনের অর্থ বোঝেনি। তাদের একবার বলা হয়েছিল যে এখন থেকে টাটার বাগান চলবে শ্রমিক, কর্মচারী আর ম্যানেজমেন্টের শেয়ারে। সবাইকে শেয়ার কিনতে হবে। শ্রমিকরা সেসব কিছুই বোঝেনি — শেয়ারের মানে কী। সেটা হলে তাদের অবস্থা কী হবে সে সব কিছুই তারা বোঝেনি। এই ভাবে বাগান চলছিল। হঠাৎ আবার সেই বোর্ডে দেখা গেল অ্যামালগেমেটেড এর পাশাপাশি ‘টাটা টি এন্টারপ্রাইজ’ লেখা হল। আর কোম্পানির ঠিকানা লেখা হল টাটা টি কোম্পানির  কলকাতা অফিসের। পুরো বিষয়টাই শ্রমিকদের অজানা।

আমি ডুয়ার্সে আসি বন্ধ বাগানের শ্রমিকদের অবস্থা জানতে, আর তার পাশাপাশি তারা যাতে সরকারী সুবিধা পায় সেই বিষয়টা দেখতে — আইইউএফ-এর কাজ নিয়ে। প্রথম আমরা বন্ধ বাগানেই গিয়েছিলাম। খোলা বাগানগুলো সম্পর্কে তেমন কিছু জানা ছিলনা। দূর থেকে দেখে ভাবতাম টাটা, গুডরিক, ডানকানের মত বড় বড় বহুজাতিক সংস্থার বাগানগুলিতে শ্রমিকদের অবস্থা বোধহয় খুব ভাল। নিশ্চয়ই ওদের ওখানে বাগিচা শ্রম আইনের সব সুবিধাই শ্রমিকরা পায়। নিশ্চয়ই ওদের ঘরদোরগুলো ভাল। একটা বোকাবোকা স্বপ্ন ছিল ওই সব বাগানগুলি নিয়ে।

তারপর একবার চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের অবস্থা কেমন সেটার ওপর একটা কাজ চালাতে হল। সমীক্ষাটার জন্য বন্ধ, খোলা সব রকমেরই কিছু কিছু বাগান বেছে নিয়েছিলাম। সেই লিস্টে ডানকানের বাগানও ছিল। তবে টাটা বা গুডরিকের বাগান ছিল না। সেখানে ঢুকতেই পারিনি। এত কড়া ওখানকার নিয়ম কানুন। ডানকানের বাগানে ঢুকতেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। ওই কাজে আমাদের সঙ্গে নেহাত জশুয়ার মত সাদা চামড়ার মানুষ ছিল, তাই হয়ত শেষ পর্যন্ত ঢোকা সম্ভব হয়েছিল। আর অনুরাধাদির মামা এখানে ডানকানের সাতটি বাগানের দায়িত্বে আছে, তাই কোনও রকমে তাকে অনুরোধ করে ঢোকার পারমিশন পেয়েছিলাম শেষ পর্যন্ত। তাও অনেক শর্ত ছিল। আমাদের রিপোর্টে ওদের বাগানের নাম উল্লেখ করা যাবে না, এই সব।

আমরা রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ, আমাদের জানার খুব দরকার ছিল খোলা বাগানের শ্রমিকদের অবস্থা কেমন। আর শেষ পর্যন্ত যা দেখলাম তা ভয়ঙ্কর। আমাদের প্রচেষ্টায় বন্ধ বাগানের শ্রমিকদের কাছে ততদিনে সরকারী সাহায্য সঠিকভাবে পৌঁছতে শুরু করেছিল, আর তাতেই তাদের অবস্থা খানিকটা ভাল এই ডানকানের বাগানের শ্রমিকদের থেকে।

ডানকানের শ্রমিকদের বিএমআই (বডি মাস ইন্ডেক্স) কষে দেখা গেল তারা ক্রিটিক্যাল স্টেজ অফ মর্টালিটির স্তরে আছে। অর্থাৎ একটু সামান্য অসুখেই তাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। প্রায় সব শ্রমিকই এই বাগানে দিনে মাত্র দুইবার খাবার খায়। তার থেকে বেশী বার খাবার খাওয়ার সংস্থান নেই তাদের। প্রোটিন ধরনের খাবারের কথা সারা সপ্তাহে একবারও ঠিক ভাবে ভাবতেই পারে না। যদি মাছ, মাংস, বা ডিম কেনে তাও পুরো পরিবারের জন্য, এবং এত কম যে তাকে প্রোটিন খাওয়া বলে না।

টাটার বাগান প্রসঙ্গে তোমাকে এত কিছু এলোমেলো কথা বলছি কারণ আমদের এই সব বহুজাতিক কোম্পানির বাগান সম্পর্কে স্বপ্নের ধারনাটা কী ভাবে বদলাল, তার জায়গা নিল ভয় আর সন্দেহ, সেটা বোঝাবার জন্য। এত কিছুর পরেও কেমন যেন একটা ধারনা অচেতনে থেকেই গিয়েছিল যে তবুও টাটা বা গুডরিকের বাগানে বোধহয় শ্রমিকের অবস্থাটা সত্যিই এতটা খারাপ না। তাও, কেন সহজে ওই বাগানগুলোতে ঢোকা যায় না এই ভেবে একটা সন্দেহও ছিল।
এই অবস্থায় কিছুটা সময় আমি এখানে একাই প্রায় কাজ করছিলাম, আমার সঙ্গে আর কেউ ছিল না। মাথায় ফন্দি ফিকির ঘুরছিল, কী করে ঢোকা যায় ওই সব বাগানে। কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম এই সব বিশাল মালিকগুলোকে না ধরতে পারলে শুধু আগরওয়ালা, ঝুনঝুনওয়ালাদের নানা ভাবে চাপ দিয়ে তেমন কিছু হবে না। কারণ চা এর বিশ্ব বাজার যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারাই ঠিক করে দেয় চা-এর এই মানুষগুলির অবস্থা বা দুরবস্থা, ভূত, ভবিষ্যত, বর্তমান। তাই নানা ভাবে ধান্দা করছিলাম কি করে জানা যায় এই সব বাগানের শ্রমিকরা সত্যি সত্যি কেমন আছেন।

এর মধ্যে এখানে অনেক কিছু ঘটে যাচ্ছে। গোর্খারা দাবি করছে তাদের স্বাধীন গোর্খাল্যান্ড, ডুয়ার্সকেও তাদের গোর্খাল্যান্ডের অংশ করতে হবে, এইসব। তবে ডুয়ার্সের জনসংখ্যার বেশীরভাগ আদিবাসী। যাদের ব্রিটিশরা তাদের নিজেদের ভিটেমাটি থেকে সম্পূর্ণ উৎখাত করে নিয়ে এসেছিল অনেক বছর আগেই। এটাই এখন তাদের দেশ, তাদের মাটি। তাই তারা আপত্তি জানাল ডুয়ার্সকে গোর্খাল্যান্ডের অংশ করার এই অদ্ভুত দাবির। সিপিএম সহ সব রাজনৈতিক দল তাদের ব্যবহার করে নিল এই সুযোগে। এরা বুঝতেই পারেনি, একবার এই ভুখা মানুষগুলো একসাথে একটা দাবি করলে, আর তার দাবির জায়গাটাকে একবার প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই তারা কিন্তু দাবি করবে তাদের সমস্ত অধিকারের। বা ভাবতে পারলেও এই ভেবে শান্তি পেয়েছিল যে তারা সব কিছুকেই সহজেই ঠান্ডা করতে পারবে।

যাই হোক, এখন এই আদিবাসী মানুষগুলি ঐক্যবদ্ধ, নিজেদের এক হয়ে ওঠার শক্তি ওদের কাছে আজ বেশ কিছুটা বোধগম্য। তাই আজ ওরা দাবি করতে শুরু করেছে ওদের না পাওয়া সমস্ত কিছুর। আর এই দাবির ওপর আস্থা রেখে আমি একদিন গেলাম ওদের কাছে। প্রথমে ওরা আদিবাসী নই, শহুরে মেয়ে, বড়বড় লেকচার মারছি, এই ভেবে তেমন পাত্তা দেয়নি আমাকে। বারবার বলেছে আপনারা সব সাহায্য করেন ওই সব চোর ট্রেডইউনিয়নকেই। আমার তেমন কিছু খারাপ লাগেনি। কারণ মানুষতো তার অভিজ্ঞতা থেকেই কথা বলে। এতে তো খারাপ লাগার কিছু নেই। হাল ছাড়িনি। আমার পুরানো রাজনীতি করার অভিজ্ঞতায় আমিও শিখেছিলাম লেগে পড়ে থাকার শিক্ষা। নিজের ভিতরেই একটা রেজিমেন্টেশন কাজ করে প্রতি মুহূর্তেই।
বারবার ওদের কাছে যাওয়া শুরু করলাম, আমার জানা নানা তথ্য ওদের দেওয়ার চেষ্টা করলাম। একদিন খবর পেলাম টাটার বাগানে ওরা লড়াই শুরু করেছে ম্যানজমেন্টের অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে। বাগানটা বেআইনি ভাবে বন্ধ করে চলে গেছে ম্যানেজমেন্ট। তার বিরুদ্ধে ওদের লড়াই। বিষয়টা কি জানার জন্য ছুটে গেলাম ওদের কাছে। আর এর মধ্যে আমি ওদের খানিকটা কাছের মানুষও হয়ে উঠেছি। যা আমি আন্তরিক ভাবেই হতে চেয়েছিলাম প্রথম থেকেই।

এবার আসি টাটার বাগান নেওড়ানদীর কথায়। যা আমি জানতে পেরেছি ওদের সাথে ওই লড়াইটার একজন সমব্যাথী ও সহযোদ্ধা হয়ে ওঠার পর। সহযোদ্ধা ভাবতে ইচ্ছা করছে, তাই লিখলাম। আমি আদৌ সহযোদ্ধা কিনা তা আমি জানিনা। আর ওরা আমাকে তেমনটাই ভাবে কিনা সেটাও ঠিক করে জানা হয়নি।

টাটার এই ন্যাওড়ানদী বাগানটা অনেক বড়। আর ডুয়ার্সে টাটার বাকি যে তিনটে বাগান আছে তাদের সবার থেকে বেশি মুনাফা দেয় এই বাগানটাই। এই বাগানটার উৎপাদন অন্য তিনটে বাগানের থেকে অনেক বেশি। বহুদিন ধরেই অসুস্থ শ্রমিকরা আইনিভাবেই অসুস্থতার ছুটি চাইতে গেলে বেশিরভাগ সময় বাগানের ডাক্তারবাবু তাদের ছুটি দেয়না। এই ছুটি পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করে এক্কেবারে ডাক্তারবাবুর মর্জির ওপর। কখন কার ওপর তিনি সদয় হবেন আর সেই শ্রমিকটি ছুটি পেয়ে কৃতার্থ হবে। এমনটা চলছিল বেশ অনেকদিন ধরে। ম্যানেজমেন্টের কাছে বারবার শ্রমিকরা অভিযোগ করেও কোনো ফল হয়নি। আর হবেই বা কেমন করে। কারণ, ডাক্তারবাবু তো নিজেও ম্যানেজমেন্টের অংশ।

তাছাড়া বাগিচা শ্রম আইন অনুসারে শ্রমিকদের তাদের বাগানের হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা। রোগ নিয়ে বাগানের হাসপাতালে ভর্তি হলে তার চিকিৎসা, ওষুধ, ও খাবার বিনামূল্যেই পাওয়ার কথা। কারণ চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি মাত্র ৬২ টাকা ৫০ পয়সা, আর সেই ক্ষেত্রে মালিকরা এই সব সুবিধাগুলোকে টাকার অঙ্কে কষে বলেন যে আসলে শ্রমিকের মজুরি ১১২ টাকা। তার মধ্যে চিকিৎসাকেও ধরা হয়।

কিন্তু এখানে, শ্রমিকরা আমাদের জানাল, দীর্ঘদিন ধরে তাদের নানা ভাবে শোষণ করে আসছে মালিকপক্ষ। তারা যদি হাসপাতাল থেকে ওষুধ নেয়, তাহলে তার দাম তাদের দৈনিক মজুরি থেকে কেটে নেওয়া হয়। তারা হাসপাতালে ভর্তি হলে হাসপাতাল যে খাবার তাদের দেয়, তার জন্য তাদের রেশন থেকে সেটা কেটে নেওয়া হয়। আগে রোগীদের জন্য বুধবার, শুক্রবার আর রবিবার মাছ বা মাংস বা ডিমের ব্যবস্থা থাকত, দুধ-চা দেওয়া হত দিনে দুইবার, সকালে একটা টিফিন মানে বান-পাউরুটি গোছের কিছু থাকত। এখন সব বন্ধ। চা দেওয়া হয়, লিকার। চিনি ছাড়া কেবল নুন দিয়ে। দুই বেলা খাবার, তাতে থাকে ডাল, আর সোয়াবিনের তরকারি, তাও একইবার রান্না করে দুইবেলা তা দেওয়া হয়। আর সেও প্রায় খাওয়ার মত না।

বহু শ্রমিক অসুস্থ অবস্থায় ছুটি চাইলে তাদের দেওয়া হয় না। প্রতিবাদ করে ডাক্তারের হাতে চড়-থাপ্পড় খাওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে অনেকের। সব মিলিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষোভ জমছিল শ্রমিকদের মধ্যে। আমি কয়েকদিন আগে সন্ধ্যাবেলা ঢুকেছিলাম এই বাগানে। এক শ্রমিক বন্ধু বলছিলেন যে তাদের ঘরে আলো নেই, আর মাসে রেশনে মাত্র ৩০০ গ্রাম কেরসিন তেল দেওয়া হয়, কিভাবে পড়াশোনা করবে বাচ্চারা? অনেকদিন ধরে রবিবার কাজ করানো হয় তাদের, অথচ কোনো ওভার টাইমের টাকা তারা পান না। এমনকি রবিবার কাজ করার জন্য সপ্তাহের অন্যদিনে ছুটি তাদের প্রাপ্য, সেটাও পান না তারা।

আর এই চা শ্রমিকদের আরও একটা মজার কথা আছে। আমরা জানি সপ্তাহে ছয়দিন কাজ করার পর রবিবার মজুরি সহ তাদের ছুটি পাওয়ার কথা। সেটাকেই ছুটি বলি আমরা, তাই তো। কিন্তু এখানে আইনি ভাবেই সেটা তারা পাননা। এখানে এদের পোষাকী নাম ডেইলি রেটেড লেবার, মানে যে দিন কাজ করবে সে দিন পয়সা, রবিবার কাজ নেই, পয়সাও নেই। মানে আমার হিসাবে রবিবারটা আসলে বেকারদিন। যাই হোক যা চালু আছে তার মধ্যেই সবাই আছে, আমিও আছি — ওই শ্রমিকবন্ধু জানালেন।

যে ঘটনার কথা তোমায় লিখেছিলাম, সেই ঘটনায় ফিরে আসি আবার। এই ডাক্তারকে কেন্দ্র করেই সমস্যা। এই বাগানের এক শ্রমিক আরতি ওরাওঁ। ৮ মাসের গর্ভবতী অবস্থায় সে যেতে শুরু করল ডাক্তারের কাছে, তার মাতৃত্বকালীন ছুটি মঞ্জুর করার জন্য। প্রতি সপ্তাহে একবার করে যায়, আর ডাক্তার তাকে বলে দেয় যে এই সপ্তাহে কাজ কর, ওই সপ্তাহে কাজ কর। এই রকম। সে খুব অসুস্থ অবস্থায় চারদিন কাজে যেতে পারেনি, তখন ডাক্তার তাকে মাত্র তিনদিনের ছুটি দিয়েছিল। একদিন তার বিনা মজুরীতে ছুটি নিতে হয়েছে। একে তো মাত্র ওই কটা টাকা, তাও আবার যদি সেটাও না জোটে মানুষগুলো খাবে কী?

শেষে কোনো উপায় না পেয়ে, সংসার চালানোর জন্য সে ৯ই আগষ্ট কাজে যোগ দেয়। তার ঘর থেকে কাজের জায়গাটাও ছিল বেশ দূরে। শরীরের এই অবস্থায় সে কিছু পাতা তোলার পর তার ব্যথা ওঠে, সে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায় মাটিতে। এই অবস্থায় তার মা-কে সে জানায়, মা-ও ওখানের শ্রমিক, সে আর কাজ করতে পারবে না।

খবরটা পেয়েই সব শ্রমিকেরা জড় হয়ে যায় সেখানে। সর্দার হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স চাইতে গেলে ডাক্তার জানায় অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া যাবে না, ওকে যেন সাইকেল করে নিয়ে আসা হয়। এটা শোনার পর সব শ্রমিকরা মিলে, মূলত নারী শ্রমিকরা, ঠিক করে তারা হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তারের কাছে জবাব চাইবে কেন ডাক্তার তাদের ন্যায্য ছুটি দেয়না, কেন আরতির আজ এমন হবে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা যখন হাসপাতালের দিকে রওনা দিল তখন ডাক্তার পরিস্থিতি বুঝে একটা ট্রাকটর পাঠিয়েছিল আরতিকে আনার জন্য। কিন্তু শ্রমিকদের চেপে রাখা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ কে চাপা দেওয়া আর সম্ভব ছিলনা। তারা হাসপাতালে গিয়ে প্রশ্ন করল কেন ডাক্তার তাদের ন্যায্য ছুটি দেয়না, কেন আরতির এমন অবস্থা হল।

ডাক্তার তার ভুল স্বীকার না করে উদ্ধত আচরণ করতে লাগল, এবং শ্রমিকদের মারতেও উদ্যত হয়েছিল। তখনও বুঝতে পারেনি যে ভিতরে ভিতরে এখন এরা একজোট হয়েছে। সেটা বুঝে ফেলার পর পালানোর চেষ্টা করার সময় সব মহিলা শ্রমিকরা তাকে ঘিরে ধরে হালকা মারধোর করে। এমন করার পর তাদের মধ্যে একটা ভয়ের সঞ্চারও হয়। সে জন্য তারা ম্যানেজারকে সমস্ত ঘটনা জানায়, ডাক্তারের এই অমানবিক কাজের কথা জানায়। আর তার পাশাপাশি অনেক রাত অব্দি পাহারা দেয় ডাক্তারকে, যাতে সে পালিয়ে গিয়ে শ্রমিকদের কোনো ক্ষতি করতে না পারে।
ঘটনাটা ঘটে গত ৯ ই আগষ্ট। সেই দিন ম্যানেজারকে ডাক্তারের বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়ে আরতির বিষয়টা বলায় সে জানায় যে আগামী ১১ তারিখ সে সমস্ত শ্রমিকদের সাথে বসে সমস্যাটির একটা সমাধান বার করবে। পরদিন ছিল ছুটির দিন। শ্রমিকরা বুঝতে পারেনি ভিতরে ভিতরে কি ঘটে যাচ্ছে।

১১ই আগস্ট শ্রমিকরা তাদের কাজে যাওয়ার সাইরেন না শুনে বুঝতে পারে বাগান বন্ধ হয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে দেখা যায় মালিক ডাক্তার সহ ম্যানেজমেন্ট চলে গেছে বাগান ছেড়ে।  ৯৫২ জন শ্রমিক আর ৬৫০০ মানুষের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। শুরু হল প্রতিষ্ঠিত ট্রেড ইউনিয়নগুলির খেলা। ২৬ শে আগষ্ট বাগানের প্রতিষ্ঠিত ট্রেড ইউনিয়নের সাথে মালিকপক্ষ এবং সরকারী আমলার ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়ে ২৭ শে আগস্ট বাগান খুলে গেল। শর্ত কী ছিল তা জানতেই পারেনি শ্রমিকরা। তারা তখন খুশি।

৮ ই সেপ্টেম্বর ৬ জন মহিলা শ্রমিক সহ ৮ জন শ্রমিকের বাড়ি সন্ধ্যাবেলা সাসপেনশন-এর চিঠি যায় আর তার সাথে সাথে তাদের শোনানো হয় যে তাদের ডোমেষ্টিক ইনকয়ারী হবে। শ্রমিকরা এই সিদ্ধান্তের বিন্দুবিসর্গও জানত না। তারা সেই চিঠি না নিয়ে ফিরিয়ে দেয়।

১০ ই সেপ্টেম্বর ম্যানেজার শ্রমিকদের ডেকে জানান যে বাগান খোলার ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে ৮ জন দোষী শ্রমিক যারা ডাক্তার কে মারধোর করেছে তাদের সাসপেন্ড করা হবে আর তাদের জন্য চলবে ডোমেষ্টিক ইনকয়ারী, যদি দোষী প্রমানিত হয়, তাহলে তাদের আরো কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। এবং ম্যানেজমেন্টের এই শর্তে রাজী হয়েছে সবকটি ট্রেড ইউনিয়ন, স্বাক্ষরও করেছে তারা চুক্তিপত্রে। শ্রমিকরা এই সংবাদে হতচকিত হয়ে তারা তাৎক্ষনিক ভাবে ম্যানেজারের কাছে ৬ দিন সময় নিয়ে নেয় বিষয়টা নিয়ে সিদ্ধান্তে আসার জন্য। ম্যানেজার এই আবেদন মঞ্জুরও করেন।

তারপর শ্রমিকরা তাদের বাগানের ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের ডেকে জানতে চায় তারা এমন এক চুক্তিতে তাদের না জানিয়ে স্বাক্ষর করেছেন কেন। অপরাধ করেছে ডাক্তার আর শ্রমিকদের সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্তে নেতারা রাজী হলেন কেন। সেই মুহূর্তে তারা মিথ্যা বলে, জানায় তারা স্বাক্ষর করেনি। কিন্তু ততক্ষণে শ্রমিকরা নেতাদের আসল পরিচয় জেনে গিয়েছিল। মারমুখো শ্রমিকদের মধ্যে থেকে অন্য নেতারা পালাতে সক্ষম হলেও আইএনটিইউসি নেতা একজন পালাতে সক্ষম হয়নি। শ্রমিকরা তাকে হাতের সামনে পেয়ে মারধোর করে। ১৪ ই সেপ্টেম্বর আবার ম্যানেজমেন্ট বাগান ছেড়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়। তারপর থেকে বাগান বন্ধ।

শ্রমিকরা আদিবাসী বিকাশ পরিষদের নেতৃত্বে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রথমদিকে তারা চিঠি দেয় জেলা শাসক, লেবার কমিশনার সহ সব সরকারী আমলাদের, এই ঘটনা উল্লেখ করে। সাথে সাথে বাগান খোলার আবেদন জানায় তাদের কাছে। ৯ ই অক্টোবর জেলাশাসকের সাথে মিটিং-এ তিনি জানান ম্যানেজার বাগান খুলতে রাজি, যদি ওই ৮ জন শ্রমিক রাজি হয়ে যায় ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তে।

১৫ অক্টোবর বিডিও অফিসে বৈঠক হয় ম্যানেজমেন্ট, মহকুমা শাসক, ব্লক আধিকারিক, আর শ্রমিকদের উপস্থিতিতে। কোনো উপায় না দেখে শ্রমিকরা ওই ৮ জন শ্রমিকের সাসপেনশনের সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়াই ঠিক করে। এই মিটিং এ ম্যানেজার দাবি করে একটা চিঠি শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দিতে হবে ম্যানেজমেন্টকে যে তারা ভবিষ্যতে এমন কাজ করবেন না। নিরুপায় হয়ে শ্রমিকরা তাতেও রাজি হয়ে যায়। ঠিক হয় কালীপুজোর পর বাগান খুলে যাবে।

২২ অক্টোবর বাগান না খোলায় শ্রমিকরা মহকুমা শাসকের কাছে জানতে চান কেন তাদের বাগান খুলল না। উনি খোঁজ নিয়ে জানান যে ম্যানেজমেন্টের জেলাশাসকের কাছে শ্রমিকদের দেওয়া চিঠির একটি বিশেষ লাইন নিয়ে আপত্তি আছে। সেটা বদলে দিলেই বাগান খুলে যাবে। কি লেখা ছিল সেই লাইনটায়? লাইনটায় শ্রমিকরা সরকারী প্রশাসকের কাছে জানিয়েছিল যে এমন বেআইনি ভাবে ম্যানেজমেন্ট তাদের শোষণ করতে থাকলে ভবিষ্যতে তারা এর বিরোধ করবে। এই লাইনটা বদলানোর আবদার করে ম্যানেজার।

২৩ তারিখ শ্রমিকরা জেলাশাসকের কাছে গেলে উনিও একই কথা জানান। ওই দিনই শ্রমিকরা চিঠির সেই লাইনটি মুছে দেয়। কারণ, শ্রমিকদের বাঁচার আর কোনও পথ নেই বাগান ছাড়া। সেই বাগান বন্ধ থাকা মানে তাদের নিশ্চিত মৃত্যু। এর মধ্যে সরকারি কোনও সাহায্যও পায়নি শ্রমিকরা। ২৫ তারিখ ম্যানেজার আবার আবদার করে শ্রমিকদের একটা চিঠি দিতে হবে স্ট্যান্ডিং অর্ডার মেনে নিয়ে যে ম্যানেজমেন্টের যে সিদ্ধান্ত হবে শ্রমিকরা আর বিরোধ করবে না। এবার শ্রমিকরা আর মানতে রাজী না। মাথা নত করতে করতে তাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আর তারাও দেখতে শুরু করল যে, যত তারা মেনে নিচ্ছে ম্যানেজারের আবদার তত বাড়ছে।

এবার তারা ২৭ তারিখ একটা চিঠি জেলাশাসককে দেয় যে যদি ৭ দিনের মধ্যে বাগান না খোলে বিনা শর্তে তাহলে তারা ২রা নভেম্বর থেকে অনশন শুরু করবে। বাগান খুলল না। অনশন শুরু হল দুই তারিখ থেকে। ২৬ জন শ্রমিক অনশন শুরু করল, ৯৫২ জন শ্রমিক আর তাদের পরিবারের সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য, ম্যানেজমেন্টের অন্যায় আচরনের বিরুদ্ধে, ন্যায়ের দাবিতে।

একজন বুদ্ধিজীবীকেও দেখলাম না এদের লড়াইকে নৈতিক সমর্থন দেওয়ার জন্য এগিয়ে এল। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কেউ এল না এই আন্দোলনকারী মানুষগুলির কথা শুনতে।

৪ঠা নভেম্বর মালিকপক্ষের সাথে সরকারি প্রশাসকের উপস্থিতিতে ট্রেড ইউনিয়নের মিটিং হওয়ার কথা ছিল। সেই মিটিং-এ এসে নেতারা জানান যে তাদের একজন নেতাকে নাকি আদিবাসী বিকাশ পরিষদের সদস্যরা আটকে রেখেছে আর সেই জন্যই তারা মিটিং-এ অংশ নেবেনা। যদিও এমন ঘটনা ঘটেইনি। আর সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, যারা আন্দোলন চালাচ্ছে সেই শ্রমিকদের একবারও মিটিং-এ ডাকা হচ্ছে না। কারন তাদের অপরাধ তারা আদিবাসী বিকাশ পরিষদের সদস্য।

৬ই নভেম্বর সংবাদ আসে টি বোর্ডের কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার পর জেলাশাসক টাটার ম্যানেজমেন্ট কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন যে ৭ দিনের মধ্যে বাগান না খুলে দিলে তারা ব্যবস্থা নেবেন। শুনে একটু আশাবাদী হয়ে জানতে চাইলাম, কী ব্যবস্থা? কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে কি? জানলাম, ব্যবস্থার মানে হল, বন্ধ বাগানে যে যে সরকারি সুবিধা পাওয়া যায় সেই সব চালু করবে প্রশাসন। এই হল ব্যবস্থার নমুনা।

আমার প্রথম থেকেই আপত্তি ছিল অনশনের সিদ্ধান্তে। একেই তো মানুষগুলি ভুখা। তারা আবার ভুখ হরতাল করবে কি? সরকারের কিছু আসে যায় না ভুখা মানুষ ভুখ হরতাল করলে। আর, মালিক তো ভুখাই রেখেছে। তার তো কিছুই সমস্যা নেই শ্রমিকের ভুখ হরতালে। তবুও ওদের সিদ্ধান্ত, তাকে শ্রদ্ধা করতেই শিখেছি। তাই ওদের পথ নিয়ে সংশয় থাকলেও ওদের লড়াই এর প্রতি প্রথম থেকেই শ্রদ্ধা ছিল আমার। ৭ই নভেম্বর ভুখ হরতাল উঠে গেল জেলাশাসকের চিঠির আশ্বাসে। এর মধ্যে তিনজন মহিলা অসম্ভব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তারা হাসপাতালে। কোন ভবিষ্যতের দিকে হেটে চলেছি আমরা কে জানে।

আমি তৃণমূল কংগ্রেসের ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদেরও জানিয়ে ছিলাম ঘটনাটা। অনুরোধ করেছিলাম তারা তো আন্দোলনের ঢেউ তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গে, এই লড়াইতে অন্তত নৈতিক সমর্থনটাও তো জানাতে পারেন, তারাও সবাই নীরব। আমার পুরোনো এক বন্ধুর একটা কথা মনে এল সেই সময়, একবার আমরা জাতিসত্তার অধিকারের সমর্থনে এআইপিআরএফ থেকে একটা সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলাম। সেই সম্মেলন করার জন্য আমরা তার আগে ছাত্ররা মিলে ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে টাকা তুলতাম। মানে এক রকম ভিক্ষাই হয়ত বলা যায়। আমাদের বিষয়টা জানিয়ে টাকা চাইতাম সবার কাছে। কিছু কিছু স্থির মুখ দেখে আমাদের এক বন্ধু বলেছিল, ওরা সব পাথর হয়ে গেছে। সেই পাথরের মতই লাগল পশ্চিমবঙ্গের এই এগিয়ে থাকা, লড়াকু সংগঠনটিকেও। কারোর ওপর ভরসা আর নেই। শুধু যে শ্রমিক মানুষগুলো একটু একটু করে বুঝতে পারছে ওদের অধিকারের কথা, নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে আর সাহস করে দাবি করতে শুরু করেছে, কোথাও যেন ক্ষীণ ভরসা বেঁচে আছে এখনও ওদের ওপরেই।

October 29, 2009

মধ্যমগ্রামের শেষহীন পুজো এবং জলপাইগুড়ির টাটা চা-বাগান

মধ্যমগ্রামের পুজো শেষ হয়না। কালীপুজো যেতে-না-যেতেই, গত কয়েকদিন যাবত ফের আমরা মাইকরবে ঘুমিয়ে পড়ি, মাইকরবে জাগি, কারণ জগদ্ধাত্রী — সেটা চলছে, চলতেই থাকছে। নানা জায়গায়। প্রচুর। তার সঙ্গে বাজি তো আছেই। আমাদের বাড়ি থেকে নিকটতম জগদ্ধাত্রীটা হল মধ্যমগ্রাম বড়রাস্তা, মানে সোদপুর রোডের উপর, ঠিক কালীবাড়ির পাশে। গতকাল সকালে রু-এর সঙ্গে বেরিয়েছিলাম, পল্লীশ্রী বলে একটা মাঠ আছে, সেটায় গিয়ে এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াতে ও খুব পছন্দ করে, খোলা জায়গা তো আর নেই, গোটা মধ্যমগ্রামটাই একটা বিস্তৃত বস্তি এলাকা হয়ে গিয়েছে — মাঠে গিয়ে বসতেও পারলাম না, জগদ্ধাত্রীর বাচ্চাকাচ্চাদের মাইকের গুঁতোয়, সেখান থেকে বেরিয়ে বিটি-কলেজের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম, পরপর পুজো, দোকানে গিয়ে জিনিসের নাম বলা যাচ্ছে না এত জোরে মাইক। তারপর বিটি-কলেজ থেকে নিউব্যারাকপুরে ঢুকে হাঁটতে হাঁটতে ফিরলাম, নিউব্যারাকপুরে এই নিপীড়নটা বোধহয় কিঞ্চিত কম — কে জানে।

বিস্ময়কর লাগে। মাঝেমাঝে মনে হয়, আমাদের এই এলাকাটা কি ব্রহ্মাণ্ড থেকে বাইরে? মানুষের কোনও দুশ্চিন্তা নেই, কাজ নেই, ব্যস্ততা নেই? শুধু পুজো আছে? গান আর মাইক আর প্যান্ডেল?

সদ্য একটা মেল এসেছে, আমার এক পুরোনো ছাত্রীর কাছ থেকে, শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস, সবাই ডাকে বুড়িয়া বলে। ওরা জলপাইগুড়িতে চা-বাগান নিয়ে এনজিও করেছে। ওখানের চা-বাগানের শ্রমিকদের নিয়ে খুব খাটছে। কম্পিউটার নিয়ে ওদের যা যা দরকার সেগুলো করে দেওয়ার চেষ্টা করি, সেইজন্যে এক ধরণের একটা সক্রিয় যোগাযোগও আছে। ওর চিঠিটা পড়ে মনে হচ্ছিল, সত্যিই তো, কতটা দূরে জলপাইগুড়ি, একই তো পশ্চিমবঙ্গ, তাও কোনওমতেই তো আমাদের মাইক বাজিয়ে গান শোনা বন্ধ হয় না?

বুড়িয়ার চিঠির বিষয়-লাইন ছিল, ‘টাটা গার্ডেন রিপোর্ট’, ওর চিঠি থেকেই উদ্ধৃতি দিই:

“… তোমাকে এই রিপোর্ট টা দিচ্ছি, কারন তুমি তোমার ব্লগে এটাকে নিয়ে লিখতে পারবে। টাটা কি ভয়ানক ভালো তার প্রমাণ থাকবে এতে। সিঙ্গুর নিয়ে যারা টাটা কে প্রায় সমাজসেবী বানিয়ে ফেলেছিল, তাদের জন্য এটা ভালো একটা উদাহরণ হতে পারে। …”

এর সঙ্গে রিপোর্টা সংযুক্ত করা, সেটা ইংরিজিতে। আইইউএফ বা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ ফুড ওয়ার্কার্স-এর জন্য তৈরি করা, তার একটা আলগা অনুবাদ এইরকম:

সংযুক্ত সংস্থা (অ্যামালগামেটেড কোম্পানি) — ‘টাটা টি’ সংস্থার একটি বাগানের রিপোর্ট

ন্যাওড়ানদী চা বাগান, একটি সংযুক্ত সংস্থা — টাটা টি-র একটি বাগান, তাকে ভগবানের নামে ছেড়ে দিয়েছে তার কর্তৃপক্ষ। অনেককাল হল, কোনওমতেই ওখানের কোনও শ্রমিক অসুস্থ হয় না, অসুস্থ হওয়ার সুযোগই পায় না — ওখানকার ডাক্তার কাউকে অসুস্থতার সার্টিফিকেট দিতে নারাজ, তাই তারা অসুস্থতার ছুটিও পায় না। তাদের শরীরের অবস্থা যাই হোক, কাজ করতে বাধ্য করা হয় তাদের। আট মাসের গর্ভবতী আরতি ওরাওঁ হাসপাতালে গিয়ে অসুস্থতা এবং মাতৃত্বের ছুটির আবেদন জানালেও সেই একই প্রতিক্রিয়া হয়েছিল ডাক্তারের। ডাক্তার তাকে ছুটি প্রত্যাখ্যান করে এবং কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করে। চূড়ান্ত গর্ভের বেদনা ওঠার পর, কাজের জায়গাতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে আরতি, এবং বাগান থেকে অ্যাম্বুলান্স দিতে নারাজ হওয়ায় সেই প্রসূতিকে ট্রাক্টরে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ব্লক হাসপাতালে। এর পরে শ্রমিকরা গিয়ে ডাক্তারের কাছে ন্যায়ের দাবি জানালে ডাক্তার কোনও উত্তর না দিয়েই পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম করে, এবং ক্রুদ্ধ শ্রমিকরা তাকে মারধোর করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাগানের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ চা বাগান ছেড়ে চলে যায়। কয়েকদিন বাদে ফের খোলে বাগান, আদিবাসী-বিকাশ-পরিষদের হস্তক্ষেপের পর, কিন্তু খোলার সঙ্গে সঙ্গেই বাগান কর্তৃপক্ষ সেই আটজন শ্রমিককে ছাঁটাই করে দিতে চায় যারা ওই ঘটনায় গলা তুলেছিল। সমস্ত শ্রমিকরা মিলে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে। এতে কর্তৃপক্ষ ফের বাগান ছেড়ে চলে যায়। এবং, শ্রমিকদের কথা অনুযায়ী, শ্রমিকদের মূল যে দুটি সংগঠন, সিআইটিইউ এবং আইএনটিইউসি, তারা গোটা সময়টাই নেপথ্যে রয়ে যায় এবং গোপনে কর্তৃপক্ষকেই সাহায্য করে। এবং কর্তৃপক্ষ যখন ওই আট শ্রমিককে ছাঁটাই করাটা বাগান খোলার একটা শর্ত করে তোলে সেই শর্ত এরা মেনেও নেয়। শ্রমিকরা এই শর্ত মেনে নেয়নি — তাদের যুক্তি এই যে, শুধু ওই আট জনের নয়, আপত্তিটা তাদের সকলের, প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিল তারা সবাই মিলে। বাগান তাই আজও বন্ধ, এই শ্রমিকেরা তাদের বোনাস পায়নি, এক সপ্তাহের মজুরিও বকেয়া আছে। আমরা এখানে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি, সাক্ষাতকারও নিয়েছি। …

October 11, 2009

পুজোর ব্লগ — সংযোজন

সুস্মিত বলেছিল পুজোর ব্লগ লিখতে। হয়নি। লেখা শুরু করে হাজিপাজি লিখতে শুরু করেছিলাম। আজ লিখি, লেখার একটা কারণ এল।

আজ গেছিলাম আড়িয়াদহে, আমার বন্ধু সুমিতা ও মধুসূদনের মেয়ে তিতাসের জন্মদিনে। আমি কোথাও যাইনা বলে বিশ্বপৃথিবীর সবাই আমাকে গালাগাল দেয়, নিজের ঘরে নিজের কম্পিউটারের সামনে পড়ে থাকি। তাই মাঝেসাঝে, মানে মাঝে-বছর-দুয়েক-অন্তর-সাঝে, এরকম হঠাৎ করে কোথাও গিয়ে পড়ি, গিয়ে সততই নিজেকে বেশ উজবুকের মত লাগে, কেন গেছি এর কোনও কারণ খুঁজে পাই না, কেন কথা বলছি, বা তার চেয়েও ভয়ঙ্কর, ঠিক কী বলছি সেটা নিজেই ভাল বুঝে উঠতে পারি না। আমার ভিড় ভাল লাগে না, সে আলাদা করে ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দসই লোকের ভিড় হলেও, কেমন দম আটকে আসে। জোর করে তেঁতো ওষুধ গিলছি এমনটা লাগে। কিন্তু, তাও, মাঝে সাঝে … ইত্যাদি।

ঠিক এটাই হচ্ছিল আমার দশমীর দিনও।পাড়ার সবাই তখন ঠাকুর তুলছেপরপর পাঁচটা ভ্যানে। সঙ্গে লাইট ইত্যাদি লাগিয়ে বিসর্জনে যাবে। কৌশিক, আমাদের পাড়ার ছেলে, আগেই একদিন গল্পসূত্রে বলেছিল, ঠাকুর বিসর্জনের আগে ওর কান্না এসে যায়, সেদিনও দেখছিলাম, ওর চোখ বদলে গেল। ওর, এবং আরও দুজনের, অনুভব করতে পারছিলাম। সরাসরি কেউ কাঁদছে না, কিন্তু বেশ গভীর একটা মন-খারাপ হচ্ছে। আমার এটা হচ্ছিল না, এবং হচ্ছিল না বলে একটা খারাপ লাগা তৈরি হচ্ছিল, যেন সবার মত আমারও এটা হওয়া উচিত, কিন্তু হচ্ছিল না এটাই সত্যি। আমি বারবার তখন প্রতিমা তুলে ফেলা ফাঁকা মণ্ডপটা দেখছিলাম, বরং, সত্য অর্থেই, খুব গোপনে আমার বোধহয় একটা আরামই হচ্ছিল: যাক মাইকটাও তো বন্ধ হল। তখনও, সেই ঠাকুর তুলে ফেলার মুহূর্তেও পাড়ার ছোট ছেলেরা এসে চালিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল, ‘বাবা আমার কি বিয়ে হবে না–’ ইত্যাদি। খুবই বিশ্রী লাগছিল, কিন্তু কিছু বলতে পারছিলাম না, এই মানুষগুলোকে, এই সমবায়টাকে এত কম চিনি, কোনটুকু বলা যায়, কোনটুকু যায় না, সেটাতেই নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। আর যেহেতু এক সময় রাজনীতিটা সত্যিই সবচেয়ে জরুরি কাজ হিসাবে করেছি, অনেকগুলো বছর একটানা, তাই এটুকু অন্তত বুঝি, এরকম কিছু দাগ সদাসর্বদাই থাকে, কোনটুকু করা যায়, কোনটুকু যায় না। শেষে পাড়ারই এক দিদি, তিনি প্রায় বছর ষাটেক, তিনি অত্যন্ত পুজোসক্রিয়, তাই এই সমবায়ের খুব কেন্দ্রীয় অবস্থানেই আছেন, বলা যায়, তিনি গানগুলোয় বিরক্তি প্রকাশ করা মাত্র, ইলেকট্রিকের ছেলেটিকে বললাম, ওটা খুলে দাও।

সত্যিই তখন চারপাশে ওই বিষণ্ণতাটা ছিল। এত অস্বস্তিকর লাগছিল সেটার অংশ হয়ে উঠতে না-পারায়, যে, শেষ অব্দি আমি সমবায়টার হয়ে পরিশ্রম করতে শুরু করলাম। এটা আমার বহুযুগের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। আমাদের কিশোর-যুবক বয়সে একটা শব্দ খুব চালু ছিল: ‘আঁতেল’। এটা ছোটবেলা থেকেই খুব শুনতে হত, কারণ আমি ভিড় ও সমাগম খারাপ বাসতাম। আমার আত্মীয়স্বজন, নিকটজনদের বিয়ে জন্মদিন অন্নপ্রাশন শ্রাদ্ধ বিবাহবার্ষিকী — এই সবই খুব বিরক্তিকর লাগত। লোকজন এত সাজে, এত বানায়, এত ভণ্ডামি করে। কিন্তু এ একটা অদ্ভুত সমবায়ের ফ্যাসিজম যে সবাইকেই ওটা খুব পছন্দ করতে হবে, হবেই। আর সবাই যখন বলত, ‘আঁতেল তো তাই ও পছন্দ করে না’, সেটা হয়ত আমাকে চেয়ে আমাকে ভালবেসেই, আমাকে অনুষ্ঠানের অংশ করে নেওয়ার ইচ্ছাতেই করা একটা পরিহাস-আক্রমণ, কিন্তু পরিহাস বলে তার দাঁতে ও নখে বিষ কম থাকত না। সেটায় কেমন বিপন্ন লাগত, অসহায় লাগত। আবার এটাও ঠিক, কোনও অনুষ্ঠানে গেলেই কিছুক্ষণ পর থেকে আমার সম্মুখস্থ প্রতিটি লোকের মুখে থাবড়া মেরে চলার গোপন বাসনা চারিয়ে উঠতে থাকত। অনেক পরে, তখন এমএসসি পড়ি, আমার এক সহপাঠী দেবু বলেছিল, কোনও বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার একমাত্র মানে হয় প্রচুর গাঁজা খাওয়ার পরেই, ও নাকি একবার সেই অবস্থায় গিয়ে, ওর পাড়ারই এক মেয়ের বিয়েতে তার হবু শ্বাশুড়ির সঙ্গে দেশভাগের দুঃখে হাউহাউ করে কেঁদেছিল। এবং, এই গল্পটায় আমার সবচেয়ে উত্তেজক লেগেছিল এই জায়গাটা যে, এই ধরনের একটা কিম্ভুত ঘটনা ঘটানোর পরেও কেউই দেবুকে লাথি মেরে বার করে দেয়নি সেই বিয়েবাড়ি থেকে–এর পরেও ও অনেকবার গেছে সেই বাড়িতে–সেই ভদ্রমহিলাও, আজও, এখনও, ওকে পছন্দই করে। পুরো গল্পটা বলে দেবু আমায় বলেছিল, সেই মুহূর্তে সেটা আমার মাথাতেও ঘুরছিল, বিয়েবাড়িফাড়িতে সবাই বোধহয় গাঁজা কি সিদ্ধি খেয়ে থাকে, কেউই শালা বোঝে না কী হচ্ছে কী করছে।

তা দেবুর সেই সমাধান আমার কোনওদিনই করে দেখা হয়নি। বরং আমার গায়ের জোর আর কায়িক শ্রম করার ক্ষমতা চিরকালই গড়ের চেয়ে বেশি বলে আমি আমার পক্ষে সহজ একটা সমাধান তৈরি করে নিয়েছিলাম, অনুষ্ঠানের সঙ্গে বসবাসের। পরিবেশন কি মালপত্র টানাটানি গোছের এমন একটা কাজ নিয়ে নিতাম যা শেষ হবে না, করেই চলতে হবে, করেই চলতে হবে, তাতে ওই সাজগোজিত ন্যাকামোর আক্রমণ এবং করার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাব। পেতামও। আরও বাড়তি কিছু পেতাম। কাজের শেষে, সবকিছু মিটে যাওয়ার পর, সবাই যখন জিরোচ্ছে, বয়স্করা উল্লেখ করতেন, ওঃ, ও কিছু খেটেছে বটে, আসলে ওর কিন্তু টানটা খুব। ইত্যাদি। একটু অস্বস্তি লাগত, ঠকাচ্ছি না তো, কিন্তু ভালও লাগত, নিজেকে ওই সমবায়ের অংশ বলেও মনে হত, সেটাতে ভালও লাগত, হয়ে উঠতে ইচ্ছে করত, সেই ইচ্ছেটা করত আমার চিরকালই। আমি কোথাও ওই গোটাটার অংশ হয়ে রইলাম সেই জায়গা থেকে যত ছোট করেই হোক নিজেকে একটু অর্থপূর্ণও লাগত।

দশমীর সন্ধ্যায় আমার সেই পুরনো অভিযোজনে ফিরে গেলাম অনেকদিন পরে ফের একবার। অতগুলো প্রতিমা, দুর্গার মূলটা, আর চারটে লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক ও গনেশের, আটফুট দশফুট লম্বা সেই প্রতিমাগুলো মণ্ডপ থেকে নামিয়ে ভ্যানে সাজানোটা সত্যিই একটা প্রবল পরিশ্রম। সেটাতেই হাত লাগালাম। পাড়ার বয়স্ক একজন, পুজো সংগঠকদের একজন, আরও এখন তো আমিও বয়স্ক, বললেনও, তুমি করছ এসব, এ কী? বানিয়ে না,  বেশ সসঙ্কোচ হয়েই বললেন। আমার আবার সেই সমবায়ে ফেরার অনুভূতিটা হল। এদের বেদনার ভাগ নিতে পারছি না, হচ্ছে না আমার, কিন্তু শ্রমের ভাগ তো নেওয়াই যায়।

অনেকটা সময় লাগল সবটা হতে। ঘামে জামা বেশ ভিজেও গেল। এর মধ্যে, একটু জিরিয়ে নিতে, পাড়ার মোড়ে এসে একটা সিগারেট ধরালাম। তখন অন্য অনেক পুজোর বিসর্জনের শোভাযাত্রা বেরিয়েও গেছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেসব দেখছিলাম, সেই প্রবল আওয়াজ, কিন্তু খোলা জায়গা বলে খুব অসুবিধাও হচ্ছিল না। আর প্রচুর ঢাক বাজছিল। ঢাকের বাজনাটা আমার দেখি বেশ লাগে। এমনকি অনেকসময় শরীরেও তালটা অনুভব করতে পারি।

এই রকম সময়ে ঘটল ঘটনাটা। উল্টোদিকে বাঁদিকের লেন দিয়ে শোভাযাত্রাটা আসছে বলে একটা অটো রাস্তার বিভাজকের কাটা অংশ দিয়ে ডানদিক থেকে বাঁদিকে চলে গেল, অটোটা মধ্যমগ্রাম ইস্টিশন থেকে চৌমাথার দিকে যাচ্ছিল। শোভাযাত্রার স্বেচ্ছাসেবক যাননিয়ন্ত্রকরা তাকে বারণ করছিল হাত তুলে, সেটা না-দেখেই, বা, হয়তো, দেখার পরও অটোটা ঢুকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দুচারজন ছুটে এল, একজন অটোচালককে মারতে শুরু করল। আমি হাতের সিগারেট ফেলে রাস্তা পার হতে হতেই অটোচালকের মুখ রক্তাক্ত হয়ে গেছে, এবং শাসকদের একজনেরও। অটোচালকটি, একটু চুপচাপ ধরনের চশমা পরা গোলগাল মুখের স্বাস্থ্য ভাল একজন মানুষ, বোধহয় তার প্রতিবর্তী প্রক্রিয়াতেই ঘুষি খেতে খেতে হঠাৎই একটা পাল্টা ঘুষি মেরে বসেছে।

আমি গিয়ে একজন দুজনকে জাপটে ধরলাম। সেই মুহূর্তে, আমার মনে আছে, আমি একটা যুক্তি খুঁজছিলাম। একটা কোনও জোরালো যুক্তি, যেটা সজোরে বারবার চেঁচাতে থাকলে, একসময়, কয়েকজনের অন্তত মাথায় সেটা ঢোকে। আমার নিজের ভক্তি ব্যাপারটা অনুপস্থিত, কিন্তু এই লোকগুলোর তো আছে, একটু আগে দেখছিলাম সেটাও হয়তো মাথায় কাজ করছিল, আমি বারবার চেঁচাতে থাকলাম, আরে ভাসান ভাসান–ভাসানের দিন একটা লোকের রক্তপাত করছেন। সেই পলকটায় যে কথাটা সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে হয়েছিল আর কী। বলছিলাম, আর নিজের ভারি শরীরটা আক্রমণকারী লোকগুলো আর ড্রাইভারের মধ্যে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আর কিছু মাথায় কাজ করছিল না, শুধুমাত্র একটা মার খেতে থাকা একটা লোককে বাঁচানোর চেষ্টা। কিছুই হলনা। শেষ অব্দি ছেলেটির গলাও আমি আমার ঘাড় পিঠ বাড়িয়ে জড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কিছুই প্রায় করতে পারলাম না, নিজের সাদা ফতুয়ায় রক্ত লেগে যাওয়া ছাড়া।

এবং, সেই মুহূর্তেই আমি লক্ষ্য করছিলাম, কী ভয়ানক অনুপস্থিত কোনও জাতের কোনও ভক্তি সেই মানুষগুলোর মধ্যে। একদম ছিঁচকে মস্তান সব। প্রবল ভাবে মদ খেয়ে রয়েছে বলেই যে ভক্তিটা কাজ করছিল না তা নয়। দুই দশক ধরে মাস্টারির অভিজ্ঞতায় অন্তত ছেলেপিলেদের চোখ চিনতে কিছুটা তো শিখেছি, ওই যুক্তিটা ওদের স্পর্ষমাত্রও করেনি।

ফিরে আসার পর পাড়ার লোকে বলল, যারা আমায় মাস্টারমশাই হিসাবে চেনে, আপনি ওদের মধ্যে গেছিলেন কেন — সমস্ত ছিঁচকে বদমাইস। ওরা নাকি বঙ্কিমপল্লীর বান্ধবসমিতির, ঠিক গুন্ডা না, গুন্ডাগোছের, ওরা ওদের কাউকে কাউকে চেনেও, পাড়ার কেউ কেউ বলল।

আজ, আড়িয়াদহ থেকে এলাম সোদপুর, রু, মানু আর আমি। সেখান থেকে মধ্যমগ্রামের অটো ধরলাম। একটি কমবয়েসি ছেলে চালাচ্ছিল। তাকে জিগেশ করলাম, আচ্ছা দশমীর ভাসানের দিন একটা অটো এই রুটেই মধ্যমগ্রাম চৌমাথা যাচ্ছিল, ছেলেটি ফ্লাইওভারের সামনে মার খেয়েছিল, তার কী হল, জানো? যা জানলাম, সেই রাত থেকেই সে হাসপাতালে, ও সোদপুর স্ট্যান্ডের ছেলে, সোদপুর ইস্টিশনের ফ্লাইওভারের নিচে ওদের ইউনিয়নের অফিস থেকেই চিকিৎসার খরচ দিচ্ছে। নাকে খুব গভীর কোথাও লেগে গেছে।

আমি তার পর থেকেই অস্বাভাবিক হয়ে আছি। এতটাই, যে, ফিরে এসে মানুকে যেই বললাম, এটা ব্লগে লিখি, ও প্রায় লুফেই নিল, হ্যাঁ, লিখেই ফেল, তাতে যদি একটু স্বাভাবিক হও। আমার মাথায় বহু কিছু আসছিল, বহু কিছু, পুজো নিয়ে, ভাসানের শোভাযাত্রা নিয়ে, এবছরে পুজো দেখতে চেয়ে আমি যা যা দেখেছি, তার বহু কিছুই। কিন্তু সবচেয়ে যে জায়গাটায় আমার ঝাড়টা নামছিল, সেটা আসলে আরও অনেকটা গভীর। সেদিন, সেই মুহূর্তে, ছেলেটাকে বাঁচানোর সময়েই আমি খেয়াল করেছিলাম, বড়সড় চেহারা, একটু গোলগাল, চোখে চশমা, আমার সঙ্গে কোথাও একটা মিল আছে। আমার চেয়ে অনেক ছোট, কিন্তু বছর চল্লিশেক বয়স হবে, তার মানে, আমার কোনও ভাই থাকলে তো এরকমই হত। আজকে এটা শোনামাত্রই আমার মনে এসে গেল, আমার শিশু বয়সে বাবাদের ইস্কুলে একটা মামলা চলছিল বলে বাবা বহুবছর মাইনে পায়নি। তাও তো বাবা টিউশনি করত, তাও তো মা, যদিও তখন অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ মাইনের, একটা চাকরি করত। তার পরও নিজেদের অভাবটা মনে পড়ছিল। মনে আসছিল, ওরও হয়তো ছেলে মেয়ে আছে। তাদের মুখগুলো গজিয়ে উঠছিল মাথার ভিতর। হয়ত, এর মধ্যে যদি সময় পাই, সোদপুরের ওদের ইউনিয়ন অফিসে যাবও একদিন।

কিন্তু এটা তো পুজো, এটাও পুজো। এই ছিঁচকে বদমাইসদের পুজো, একটা কাজের লোককে অকেজো করে দেওয়ার পুজো। সেই দশমী থেকে আজ কালীপুজোর আর কয়েকদিন বাকি, বাড়ির স-আয়িক লোকটা অনায়িক হয়ে যাওয়ায় বাড়ির বাচ্চাদের অপেক্ষা করে থাকার পুজো। সুস্মিত, তোর পুজোর ব্লগ এবারও শেষ হল না। অনেক কিছু লেখার আছে রে, অনেক কিছু। কিন্তু জানিনা কবে হবে, আদৌ হবে কিনা। তবু একটু তো হল।

January 20, 2009

ব্যান্ডপার্টি, নাইটরাইডার এবং গৌরী ধর্মপাল

গতকাল দুপুরে আমার বৌয়ের সঙ্গে পাড়ায় একটি ব্যান্ডপার্টির খুব অশান্তি হয়, রাতে মানু সেটা আমায় বলল। বিয়ের ব্যান্ডপার্টি। আমাদের পাড়ায় খুব আসে। আমাদের এলাকায় ভূমিসংস্কারের প্রবল সাফল্যে পুকুর প্রায় লুপ্ত প্রজাতি, সবই এখন প্রোমো-তাড়িত বহুতল। আমাদের বাড়ির গায়েই একটা পুকুর এখনো অবশিষ্ট, বিয়ের মরশুমে প্রায়ই নানা বিয়েবাড়ি থেকে এখানে জল নিতে আসে। একসময় যেগুলো ছিল আচার, কিছু বৌ উপচার হাতে আসতেন, শঙ্খ নিয়ে, উলু দিয়ে, এখন তার সঙ্গে আসে ব্যান্ডপার্টি, এবং টুইস্ট নাচ। এই নাচের সঙ্গে এলভিসের কোনও সম্পর্ক নেই, হিন্দি সিনেমার নাচ দেখে, এবং নাইটক্লাবের নাচ টিভিতে দেখে নাচ-না-জানা লোক যখন পৃথুল দেহ কামোদ্দীপক রকমে আন্দোলিত করতে চায়, কিন্তু হয়ে দাঁড়ায় বিকটতা, তাকে বলে টুইস্ট, এতদিন মূলত বিসর্জনে নাচা হত, ধীরে বিয়েতে ও অন্নপ্রাশনে, এরপরে বোধহয় শবযাত্রাতেও হবে। কিছুদিন থেকে আবার ব্যান্ডপার্টির সঙ্গে একটি করে রিক্সাও থাকে, তাতে বসানো থাকে মাইক। এবং ব্যান্ডপার্টি বাজাতে থাকে গত কিছুদিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজা হিন্দি গান, যা সর্বত্র, এমনকি বাড়ির ডোরবেলে, ফোনের রিংটোনে অব্দি বাজানো এবং লোককে শোনানো চলছেই।

এই লোককে শোনানো অংশটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কবে যেন আমাদের চারপাশে একটু একটু করে এটা বেড়ে উঠতে উঠতে একটা অশ্লীল জায়গায় চলে গেছে। ট্রেনের গাদাগাদি ভিড়ে ভয়ানক জোরে ফোন বেজে উঠবে, তারপরে আসবে চীৎকারিত কথোপকথন, এবং ঠিক তার পাশের মানুষ হওয়ার কল্যাণে মাত্র সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে শুনে যেতে হবে। এরপর আছে চৈনিক সেলফোনগুলোর কল্যাণে সস্তায় পুষ্টিকর মনোরঞ্জন, খ্যাঁশখ্যাঁশে আওয়াজে ওই গানগুলো দুতিন বন্ধুর মধ্যে বা এমনকি নিজেই, জোরে জোরে, মানে জনসমক্ষে বাজানো। এবং আবার সেই একই গান। এরপর আছে ফাংশন, এক এক পাড়ার এক একটা ক্লাব। কুকুরে যেমন নিজের এলাকার গাছের গোড়ায় মূত্রত্যাগ করে এলাকা চিহ্নিত করত, এখন গাছ আর কোথায়, এই ক্লাবগুলি ফাংশনরবে এলাকা চিহ্নিত করে। যতদূর আওয়াজ যাচ্ছে ততদূর আমার এলাকা, ভোটের দিন ততদূর অব্দি আমার শাসন। তাই এই গোটা শীতকাল জুড়ে প্রবল ফাংশন চলে। এই ব্লগেই আগে একটা আলোচনাও আছে, সেই ফাংশনের দাপট নিয়ে, বাঘা যেমন ধ্রুপদ শুনে ঘাবড়ানো মুখে গুপিকে বলেছিল, কী দাপট। আর পুলিশ ফুলিশ আমাদের এলাকায় একটা নিতান্তই কুসংস্কার, রীতিমত একটা অলৌকিক উপস্থিতি, পরিস্থিতি আক্ষরিকভাবেই অর্থবহ হওয়ার আগে অব্দি তারা কখনো রূপপরিগ্রহ করেনা। ঠিক এই ডিসেম্বর এবং জানুয়ারিতে এই দাপট অনেকটাই লুপ্তপ্রায়, কারণ শুনলাম পুলিশের এই অলৌকিককতায় বিরক্ত পলিউশন কন্ট্রোলবোর্ড নাকি সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করেছে। নিয়ন্ত্রণ মানে কিন্তু রাতটুকু। আগে যেমন ডিসেম্বর জানুয়ারিতে অর্ধেক কি তারও বেশি রাত যেত আমাদের পান খেয়ে আর গান শুনে, এবার রাত বারোটার পরে গেছে মাত্র দিনকয়েক আর সারারাত মাত্র একটিই। ফাংশন মানে আর কিছু না, আবার সেই মাইক এবং আবার সেই একই গান, এবং বীভৎসতর ওই ড্রামবিট।

এবং আরো বীভৎস এই যে বেশিরভাগ মানুষের এটা বীভৎস লাগে না। গতকাল দুপুরে মেয়েকে কোলে নিয়ে ও যখন গিয়ে নিষেধ করে, দুপুরবেলা, এখন বৃদ্ধরা ঘুমোচ্ছে, বাচ্চারা, পাড়ার ভিতর, মাইক বাজাচ্ছেন কেন, তারা বন্ধ তো করেই নি, উপরন্তু নানা বিদ্রূপ করেছে। এবং গোটা পাড়ার মানুষ কেউ আপত্তিও করেনি। ট্রেনে যখন সারাদিনের কাজের পর ক্লান্ত শরীরে ফেরত আসার সময়, মাঝে মাঝে আপত্তি করেছি, সেলফোনে গান বাজানোর বিচিত্রানুষ্ঠানে, কেউ আপত্তি শোনেনি, বরং অসভ্যতা করে বলেছে, কী করব বলুন হেডফোন কেনার পয়সা নেই, অন্য সমস্ত মানুষ চুপ করে থেকেছে। তারা কেউ কেউ আমাকে চেনেনও, মাস্টারমশাই বলেই চেনেন, চুপ করে যান স্যার, ও বলে কোনও লাভ নেই।

কাল রাতে, মেয়ে রু ঘুমিয়ে পড়ার পর, আমরা দুজনে এটা নিয়েই কথা বলছিলাম, কেমন নিঃসঙ্গ একা আর বিষণ্ণ লাগছিল। ওরও আমারও। নিজেকেও বোঝাচ্ছিলাম, ওকেও, ধুর, ও বলে কোনও লাভ নেই, চুপ করে থাকাই শ্রেয়। এবং বোধহয় আমার বাল্য কৈশোর এবং যৌবন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে কেটেছে বলেই এই চুপ করে থাকার পন্থাটা কেমন দমবন্ধকর লাগে। দুজনেরই লাগছিল। আমি আবার ওকে মনে করালাম, ও আবার তো ওই নাইটরাইডার আসছে।

কী সেটা।

আমি বললাম, ওই যে ক্রিকেট। মাঝরাত্তিরে বোম ফাটাবে।

ও। ও বলল। মনে পড়ে গেল ওর। আমাদের বাড়িতে বৃদ্ধ আর বাচ্চা দুইই আছে। তাদের কেঁপে কেঁপে ওঠা, মাঝরাত্তরের বোমের আওয়াজে।

গানের সঙ্গে সঙ্গে এই বোম। বিয়েতে পুজোয় খেলায় সব কিছুতে। খেলা দেখে আনন্দ পেলাম, চমৎকার কথা, তাতে অন্যকে মাঝরাত্তিরে ঘুম থেকে জাগিয়ে বোম ফাটানো কেন, বুঝতে পারিনা। গতবারে আইসিএলে নাইটরাইডার হারা মাত্র একটা উল্লাস হয়েছিল আমার, যাক বোমের অত্যাচার এবার কমবে। সত্যিই কমেছিল, অনেকটাই। তারই সঙ্গে কমেছিল মাঝরাত্তিরে গাবদা গাবদা চেহারার হাফপ্যান্ট পরা লোকের, যারা খেলেনা, শুধু মদ আর চিপস খায়, আর তাদের গাবদাতর বাচ্চারা, যারা খায় কোল্ডড্রিংক্স আর চিপস, এবং সারাদিন লেদিয়ে পড়ে থাকে টিভির সামনে, তাদের ওই বোম ফাটানো, চীৎকার আর নাচানাচি। মনে পড়ছিল, মনটা কেমন শূন্য শূন্য হয়ে যাচ্ছিল। কেন আমারই লাগে, আর কারুর কেন বীভৎস লাগে না, আমিই কি অস্বাভাবিক? এরা আবার যখন নাচে না, তখন জোরে জোরে টিভি চালায়, গান বাজায় সাউন্ডসিস্টেমে। আর ইলেকট্রনিক্সের মত কোন জিনিসই বা সস্তা হয়েছে? খেলা নেই, টিভিতে খেলা দেখা আছে। খেলা গান নাচ সবই টিভি প্রোগ্রাম, লোকগুলো আর তাদের বাচ্চাগুলো শুধু টিভি দেখে আর খায় আর অন্য মানুষকে বিরক্ত করে, অসভ্যতা করে। গোটা সংস্কৃতিটাই হল বোকা অসভ্য প্রতিলিপির। সবকিছুই কপির কপির কপি। বদ্রিলার যেমন লিখেছিল, ট্রান্সপারেন্সি অফ ইভিলে। রাইগর মবিলিস। লোকগুলো টিভি দেখে চলেছে, চিপস খেয়ে চলেছে, ভুঁড়ি বাড়িয়ে চলেছে। কিন্তু আসলে মরে গেছে, সংস্কৃতি বলেই আর কিছু নেই। সবই কপির কপির কপি। গান শোনাও তাই, জীবনচর্য়াও তাই, যৌনতাও তাই, যৌনতা মানেই কিছু অঙ্গভঙ্গী যাকে ইতিমধ্যেই মিডিয়া আমায় যৌনতা বলে চিনিয়ে দিয়েছে। শুধু পুকুর বুজিয়ে বাড়ি কেন, গোটা জীবনটাই এদের প্রোমোতাড়িত। কত কোল্ডড্রিংক্স কত চিপস প্রোমোটেড হবে এই আইসিএল আর নাইটরাইডারের কল্যাণে, খেলা বা শরীর বা জীবন কিছু হোক আর না-হোক।

রাত বাড়ছিল। মানু ক্রমে ওপাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে গত কদিন ধরে রাতে যেটা পড়ছি, টিপিং পয়েন্ট আর ধূর্জটিপ্রসাদ রচনাবলীর একটা খন্ড, মাথার কাছে ছিল, নামিয়ে নিলাম, পড়তে পারলাম না। বেশ কয়েকবার পড়ে গেলাম একই বাক্য, কোনও মানে বুঝছি না। বিছানা থেকে উঠলাম, কম্পিউটারের টেবিলে বসে একটা সিগারেট খেলাম। রু-এর কথা মনে হচ্ছিল, ওকে নিয়ে একটা দুশ্চিন্তাও হয় আমার, বুড়ো বয়সের বাচ্চা, ও সঠিক অর্থে কৈশোর পেতে পেতেই আমার অবসরের দিন চলে আসবে। আর চারপাশে মানুষকে বিরক্ত করার, উত্যক্ত করার এই ব্যান্ডপার্টি আর নাইটরাইডারের সংস্কৃতি। কী মানুষ হবে এতে?

ওর বইগুলো চোখে পড়ল, ছড়ানো রয়েছে, রাতে শুতে যাওয়ার আগেই মানু ওকে পড়ে শোনাচ্ছিল। একটা বই তুললাম, আশ্চর্য কৌটো, লেখক গৌরী ধর্মপাল। মানু এগুলো কিনে এনেছে শিশু সাহিত্য সংসদ থেকে, রু-এর জন্যে।

একটু বাদে, ধীরে, মনটা ক্রমে কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। কী আশ্চর্য বই এই আশ্চর্য কৌটো। কী অদ্ভুত গদ্য, কী আবেগপ্রবণ। আর কী যত্ন করে ছাপা। নিজের মধ্যেই বেশ একটা আরাম এল। সংস্কৃতি তো এটাও। গৌরী ধর্মপাল কে আমি জানিনা, খুব বেশি নামও শুনিনি। ওঁর একটা বই আগেও পড়ছিলাম, সেটাও চমৎকার, ইংলে পিংলে। ও আরও একটা অনবদ্য বই পড়েছিলাম ওনার, বাচ্চাদের জন্য উপনিষদের গল্প। কিন্তু কোনও বইয়েই ওনার বিষয়ে কিছু ছিল না। মানু আর রু পাশে ঘুমিয়ে আছে। ওদের দুজনেরই মাথায় একটু একটু হাত বোলালাম। বেশ লাগছিল। জীবনের সবটাই ওই ব্যান্ডপার্টি আর নাইটরাইডার নয়, এগুলোও তো আছে। গৌরী ধর্মপালের মত লোকেরাও আছে। তাদের এই অসাধারণ রকমের যুদ্ধটাও আছে, ভালো বই লিখে সাংস্কৃতিক ভাবে টিঁকে থাকার যুদ্ধ, এই শুয়োরের মত করে বেঁচে থাকার বিরুদ্ধে।

October 20, 2007

বাংলা লেখার ব্লগ, নেটখাতা

অ্যাদ্দিনে সায়মিন্দু বানাল একপিস ব্লগ, র‍্যান্ডম-ইংকে। আমার একমাত্র দাবি ছিল এমন একখানা ব্লগ যেখানে আমি বাংলায় লিখতে পারব। নেটখাতা নামটা তো, এখনও, ভালই লাগছে। দেখা যাক।

আর, পুরোনো ব্লগস্পটের ব্লগে যে এন্ট্রিগুলো ছিল সেগুলোও নিয়ে এলাম এখানে। পুরোনো সেগুলো, ইংরিজিতে। তা হোক। এখানে চাইলে বাংলাতেও লিখব, ইংরিজিতেও লিখব।

কত লিখব কে জানে: সায়মিন্দুকে দিয়ে ব্লগ তো বানালাম। যাকগে, বানিয়ে রাখা ভাল।

Filed under: ব্যক্তিগত, মানুষ — dd @ 7:06 am

March 18, 2007

Letters Scattered in Blood

That was the time of plain old pen and paper. I was writing from the morning, a job i had to complete. Sahaj came to me quite a few times and returned frustrated, that i cannot participate in his games. Finally i came to a blank, moments that are so usual while writing, everything is there in your head, but the link between the letters and those thoughts has somehow lost. All this time Sahaj was coming there and going away, full of fear of what his mother told him, “Don’t disturb pisha”. He called me ‘pisha’, a minor variation of ‘pishemashai’ in Bangla, the spouse of the ‘pishi’, the sister of his father. And that ‘pisha’ too did sound so queer. Firstly, because his mother, from Nepal by birth, spoke Bangla with an altered accent, and even that Bangla too Sahaj was yet to learn, he was only three or something. He spoke a working mixture of soft-uttered Bangla and English words, quite often in incomplete sentences. I was sitting there, with my tired and absent eyes hanging over the window grill, and the thoughts around the Jibananda Novel ‘Malyaban’, which i was writing down in the form of an essay, still looming there in the air, while he came near me, without my notice. And all of a sudden i got startled when he said, “Pisha, vowr ands vaar daahty”, with a soft ‘d’ and soft ‘t’, meaning to say, obviously, “Pisha, your hands are dirty”. With a startled look still in my eyes, i saw, there were so many ink-stains over my palm and fingers, obviously some problem with the pen that i did not notice earlier. Around two decades have gone by, almost the length of time that I have not seen Sahaj any more. I miss him. A void, silent, speechless, still full of so many reverberations that strike my skull from inside my head, starts infiltrating me, at times when i remember him, when i hear someone talking about Bhubaneshwar, the place where he lived with his parents, when the last time i heard about him. I know of that feeling and i take care, i start thinking something else, that mechanically and that stupidly, and somehow, it works. Sahaj goes away from my head, with his parents, with his ‘pishi’, the son i had with his ‘pishi’, every one, every context, every moment, when i start thinking, say, how many cigarettes are left there in the packet, or, is it a long time i have not gone to the loo. Just that image remains. A chubby three year old face, with eyes like marble balls immersed in rich oil, looking, or better, glinting hither and thither, and fixing questioningly towards me, and a voice so pungently acidly cute, sputtering out, “Pisha, vowr ands vaar daahty”. ‘Sahaj’ means simple and innocent, and yes, so ’sahaj’ he was. But all these years, this question with that image returns to me again and again. Yes, Sahaj, my hands are dirty. And what can be more true than that for any writer from Calcutta, after Singur and Nandigram. Whatever i write, it is full of blood, and dirt. Whatever. Anything that i write is sheer dirt, and blood.

Filed under: ব্যক্তিগত, মানুষ — dd @ 10:19 pm

October 12, 2005

TJ2: Nutan (continued)

( … continued … )

Now that so much of background info about Nutan is given, it is better to start from nowhere: that is now and here. Better to start from the other end: presenting the present. The present the transient the cloud that you can never pin down, the sunbeam that you can never hold in your hand, that part common with Julie Andrews Maria in Sound of Music, but the other part is, ‘Present, this present/ Presenting and representing/ The ugliest songs of ours/ Relentlessly’. It was a very weak and feeble attempt, that is an attempt possible with my ability, in translating Jibanananda, the greatest Bangla writer ever. This ‘relentlessly’ part is extremely important, this is a dynamic situation. The present is always past, every moment it is happening, by the very criterion of happening it is becoming past, it is a process that you cannot describe, because every description is static, like the past. The description by virtue of getting described, that is, thought or spoken or written, is becoming dead and static, and how a dead and static thing can describe a live process that realizes in its ever-changing dynamics?

But, this Tridib’s Journal Entry 2, TJ2, is not about present-description-past. It is about Nutan.

Nutan. The sister Tridib could have but did not. Making something real doubly proves that it is not real by the action of making. This is not just playing with words. What is making? It is forcing squeezing pressuring some of the infinite variables of the reality to behave in some particular way or structure. That is, making some loose ends meet there, that would not meet in the real case, and make some closed ends unmeet that have already met in reality. But this intervention in the history of the variables itself becomes a history. And you are always conscious that you are enacting a play, you have to go on playing it, that itself changes the play.

This was the mindset that remained there in Tridib’s head towards Nutan. Maybe that was a bit caused by his laziness too. Making something happen means a lot of labor and labor is always a negative commodity, one likes it if only it is someone else’s. And making any emotional event true involves a lot of labor. Like falling in love. At times Tridib thinks, middle age is here, and old age is knocking at the door, it is better now to fall in love once again, for some time to come it will make so many things so magically dynamic again. But, the very next moment, the fear of that astronomical amount of labor looms large. That much transport, that much sudden change in plans, that much remaining ready on your toes that any moment she needs you, emotionally, telephonically, physically, letterically, you have to be there. Maybe the same fear worked in the case of Nutan too. Getting into a relationship is so much of a responsibility, and if you are not responsible, it seems that you are a bloody cheater.

So, as everything happens around Tridib, being a big brother to Nutan was there, and simultaneously, not there. There, in his head, and not there, in reality. Years were going by. Within this time, he knew that Nutan was ill, got her news from his friend. That it was a peculiar kind of illness. A continuing low fever, and a lot of cough and other things, a cough that is making her vomit once or twice every day, but no diagnosis at all. Twice she was hospitalized. Once taken to some renowned hospital in some other state, that the disease can get diagnosed, with absolutely no results. Then, slowly, the fever went away. After some two years, without any known reason, exactly as it came. And this was the time when Tridib’s personal life was breaking down. He was trying to re-generate himself on his personal plane, taking resort to his writings, political economy, literature, philosophy, computers and every thing. He was writing a lot. Writing is always easier than reading, when you are disturbed. One year, two years went by. Tridib married again. His old political party, all this time in power, bit him a lot, as these things happen, actually the party does not bite, but some people there, and after all, they are the party. They abused him on lack of politics, lack of morality, lack of everything, and, maybe to generate and demonstrate a lack of entirely new order, ransacked his house and threw his books into the nearby pond: lack of books: was it very poignant in terms of surplus meaning?

All this time, Tridib was wanting it so hard to go to Nutan, at least once or twice. Every year, after the Pujo Festivals in the autumn, in fact as if marking the end point to the Pujo, comes the bhaai-phnota. And every year, without fail, he suffered on that day. That he did not go there. Going there, to take the phnota, that a sister gives on the forehead of a brother, would be playing too much of a second fiddle to a badly constructed mythology, but, not going there had its own price too.

And then, exactly fourteen years after the magic dawn in their Purulia home, Tridib went to Nutan’s place. And not on a bhaai-phnota. Within these fourteen years, thrice Tridib went to his friend’s place, and all three of them very short-time visits, the last two of them Tridib was accompanied with his wife, one just after the marriage, and Nutan with his husband and child had once come to Tridib’s place too. All of them very social and low profile meets, never the emotional variable flowing very high. And for a few years now the contacts with this old friend, husband of Nutan, were alive once again, that he was coming back to political economy research and all. Then came this meet with Nutan, fourteen years away from that first meet with the newly-married balika-badhu. And this was after her long disease, and Tridib was tense within himself, what he is going to see of her, on the way to their place.

It was a week-day, and it was noon. The scorching sun and the humid air. Temperature around 40 degree Centigrade, and humidity around hundred percent, as it happens in Calcutta summer on a June day. The house, the room, with all the windows closed to keep away the heat, actually did give Tridib a sense of comfort and relief, and sitting on the bed, usually middle income households in Bangla speaking people do not have a drawing room in that sense, and, in a way, Tridib was a family, so he sat on the bed of the bedroom, almost the only room of the apartment, the other one being a passage before the kitchen turned into a dining place, a bed that he had to almost grope for, it was so dark inside, after coming in from the burning sun. And the cot, made of old teak, from the marriage, the bed-sheet on the bed, the metal cupboard, the dresser beside the bed, everything being of a dark color, the whitewashed wall getting morose from the dirt of time, the light was not adequate by any standard. The young boy was sleeping on one side of the bed.

Nutan was already gasping for breath, from this action of opening the door and getting surprised and pleased at seeing Tridib on the door. Not that Tridib was hungry, but it was not very normal for her not to ask him if he was hungry from the long journey, she actually told Tridib to take some rest. “You better lie down a bit here, he has left some papers and journals and things for you, better take a look after taking some rest. You have all the way from there, in this heat.” Nothing normal was happening here, at least with respect to a Bangla household. Could Nutan see it, or couldn’t she, that Tridib’s shirt was absolutely wet from sweat, and if she could, it should be the first reaction of her to tell Tridib to take off the shirt, but she said nothing, together with not asking him if he is hungry or not, and actually asking nothing at all, and just telling him to lie down there, it was all so abnormal. Tridib got the answer a bit later. And it was one answer so very painful.

More to cope up with these things that he could not understand, Tridib lied down on the bed, like that, with that wet shirt on him. Though it was extremely soothing now, with this darkness and cool within the room, the fan running at full speed. And within moments Nutan lied down there too, beside him, between the sleeping son and Tridib. Tridib was actually a bit uneasy, not that any sexual context was ever present there between him and Nutan, still it was not a run of things that happens every day in your life. And the apprehension of what his friend could think if he knew of this was making him a bit alert too. And by that time Nutan had taken a pillow below her head and her eyes were already closed. Tridib’s eyes, now a bit habituated in this darkness, started discerning things. And because they were now lying, the window was very near to their heads, and the slits and joins of the wooden planks of the window were letting in microscopic amounts of light.

Nutan spoke again, and this time due to the vicinity, Nutan’s head was now not more than thirty centimeters from his head, Tridib was hearing it clearly over the drone of the fan, and some occasional fluttering of the Goddess Kali on the calendar hanging on the wall, Tridib now got the ring of the voice. It was a stoned voice, as if drugged. Was she that ill?

“If you smoke, the ash-tray is on the window. Just a bit back I had my medicine. I don’t get anything very clearly after this medicine. You get some rest.”

Oh, then, this is the thing, Her illness, her medicine, Tridib thought. And as if to fulfill her wish, and maybe he was longing for a cigarette too, he raised his body a bit on his left elbow and opened the window just a bit that it lets out the smoke, most probably it would be harmful for her. And the moment he hid it, he wished he had not, but it was too late. The soft light from the partially opened window, it opened towards a verandah that had a big bushy tree outside, made Nutan’s face visible to his eyes. Was it Nutan’s face at all. She was around twenty on that Purulia morning, and it seemed she has aged at least twice those years, and not just that, all very miniscule crows’ feet now filled her whole cheek and forehead and all, the hairline receded so far back, it was not the face he knew. With his elbow now on the window sill, and his head rested on it Tridib looked on and on: Nutan, the same Nutan, really? All of a sudden, the cruel irony of the name shot him back.

Without knowing it fully well that he was doing it, Tridib put his right palm on Nutan’s forehead, and started playing his fingers through it. And so matte and lifeless and dry they seemed. Why? He could not understand that. Understood later, on the way back.

Nutan, sleepily, and spontaneously, as it seemed, moved her head a bit, and made the smallest of motion of her head, in reply and acceptance of Tridib’s hand on her head. Did she do it really? Or, she was already asleep, it was just one physical movement that people do while asleep, without knowing that they were doing it? Whatever it maybe, Tridib went on doing it. And all these years, all the images of Nutan and everything around her, in retrospect were running through his head. Can living people become this dead so fast, without actually dying?

In the afternoon, on his way back, the mystery of those dry and matte hair cropped up in Tridib’s head. When she got awake in the afternoon, one of her very first reactions was a surprise, full of pain, by looking at Tridib, “You are absolutely the same, how it happened: you did not change a bit?”

At times Tridib is reminded of this by some of his associates, he did age really far less than many other of his friends. When someone says of it, on the next morning, after having his bath, while backbrushing his hair, Tridib looks at the image a bit more attentively, is it true? It seems, this is the face he is seeing there for so many years, something like fifteen seconds every morning, that is the time it takes to comb the hair, once. Obviously, in his childhood he had no beard and moustache, but he can’t remember it any more. At times these comments gives him a silent pleasure and satisfaction: see, that is the plus point of workouts and exercises he does every morning for the last two decades. But, this is the first time he felt a guilt. Why he did not age? Why? Why this difference in aging between people, a difference that makes Nutan go into a futile attempt of hiding her age, by applying dye and all that made her hair so listless and lack-luster and dry? This occurred to Tridib that very moment, going by a barber’s shop. This barber was giving the evening time incense and good-luck lamp to his shop. Tridib told him to crop the hair and beard as small as he can. Tridib wanted to do something but he did not know what.

For the last two or three years, the explosive energy in his friend’s work and a changed way of behaving with people first gave him the hunch, and then, later, Tridib discovered, his friend has found a woman of his own. This woman is good, Tridib saw her too, once or twice, good-natured, intelligent, communicative. It is OK, Tridib is no judge of morality or something. Tridib’s friend was never engrossed in Nutan. Tridib knew it all along, even the night before that magic dawn the conversation they had between two old friends. It was more a marriage of responsibility than a marriage of love. Nutan does not know of it too, as his friend told Tridib. Though Tridib has a fair amount of doubt. Can a wife not-know sufficiently well? Life is not a film after all.

And this aged woman, this wreckage of a person that was supposed to become a woman, full of life and vigor and everything, but that never really happened, why she continues to miss everything? Why? This barber was doing his job very inefficiently. Every move in the scissor was giving a sparking pain in his scalp, but at this moment Tridib loved the pain, he wanted it to be harder still.

Filed under: ব্যক্তিগত, মানুষ — dd @ 8:12 pm

October 11, 2005

TJ2: Nutan (continued)

(… continued … )
In the next few years to come, so many things were happening around Tridib, in his personal life, and so many times Tridib would like to return to this picture of a girl becoming a woman. Sitting there, beside him, on the floor, and making him eat “everything there”.

Tridib knew, Nutan did not have a happy family life before her marriage, the same man who named her Nutan, most probably, who else can it be, his affects to the daughter, the daughters actually, Nutan had a sister too, to the mother of the daughters, all the affects had undergone a queer but common turn, violence becoming its primary language. Tridib once saw this man too, a very strongly built physique, a kind of biological force emanating from his every gesture, maybe he was more than dissatisfied with his frail and asthmatic wife, suffering from malnutrition, and so, naturally he tried to settle the unsettled conjugal account in every possible alternative way. Almost every night, all through Nutan’s childhood, he would beat up this wife, not that his physical vigor could achieve a full-employment scenario even here, so little of violence was required at all to overpower this junk of a woman. And if the terrorized daughters happened to be there, they too got endowed with their share of familial affects. A common tale but true, that repeated every night, after his regular quota of alcohol.

Now a tea-totaler for the last eight years, for quite a long time Tridib was himself an authentic alcoholic himself. His own experience with alcohol always falls inadequate of this: how some amount of that tinted liquid, a bit unfriendly with his digestion maybe, but how the hell can it make someone do this? This is actually unjust abusing towards that larger than life liquid. That man who named Nutan as Nutan, provided the patronymic and never lived up to becoming a father of Nutan, most probably, had his alcohol just to rationalize his violence. Why he wanted to be violent? In his own way, Tridib has discovered so many unpredictable ways of loving that it makes him think at times, is this another form of love? Poisonous, killing, dirty, but love still? Just that the man does not know any other language of loving? Tridib is not at all sure here, how he can be, who knows what works in anyone else’s head, but one thing is sure, if violence is there, it should never be one-way. Why the woman should not strike out? In fact, while writing this, this image comes to life in his head: man and woman fighting between them, fighting physically, the hard way, just as a variation on the theme of romance. Why not? At least it sounds less stupid and more full of life than many other so popular ones.

That Nutan was deprived of her childhood, a childhood that every child should get, makes it doubly magic, how she could remain so much alive and childlike, some savage paternal heritage?

Time was moving on its own course. A few meetings happened within that. Once or twice Tridib went to their place with an occasional set of Salwar-Kurta, that Tridib purchased after a lot of browsing in New Market, when he discovered that peach-colored salwar suit filled with Lakhnau Chikan embroidery it seemed that it was created just for her. Nutan liked Tridib’s going to her place on bhaai-phnota, the traditional autumn ritual of brothers and sisters, the whole thing getting more authentic because, as if providence set it that way, “see, you don’t have any sister, and I don’t have any brother: when I was young, how I would like it, if I had a big brother”. Tridib, though getting touched by these, actually feels kind of uneasy with every expression of emotion, as if it is getting recorded somewhere, and some day, when things have somewhat changed, and things do change, really, they are going to return to you and ask, ‘did you cheat that day’? Something like this happens with him, and so, Tridib does never feel at home with these expressions, and so would reply back with his stupid grin, time now to make it a global patent, but why, why others should not have any right to use it? Copyleft is the name of the future.

Like this it was going for years. Peaceful and everything, as one expects any story to be. Then things started changing.

( … continued … )

Filed under: ব্যক্তিগত, মানুষ — dd @ 5:27 pm

TJ2: Nutan (continued)

(… continued …)

The first time Tridib saw Nutan, she was actually a child. Though at her nineteen, she laughed like a girl of nine. The horrible part of the whole thing is that, the last time Tridib saw her, once or twice she tried to laugh, at least smile, and every time Tridib could discern the same movements of muscle and face parts that she remembered from those first time laughs, exactly the same movements, the same form, only the content has changed. Not exactly the same form though. So many years of suffering from an unknown disease, and that the disease is unknown makes it a bigger terror, has changed the face a lot too. Though, that day she tried hard in her own way not to look as she is now, but, more like as she was, as wants to be remembered by Tridib. Or, maybe, she did not think that much at all, Tridib is making them up.

Tridib imbibes Nutan with a lot of the glory of magic. Actually, not exactly Nutan. But some context. Some very special context that goes on working down under and generating unexpected new turns in meaning in apparently very expected way of things and events.

That time Tridib was working in Purulia. For one year or so. A village so many miles even from the distant district town of Purulia. And this place Manbajar actually brought to his mind the name of the film, ‘Christ Stopped at Eboli’. He used this phrase so many times in his mind and in his conversations too, Christ stopped at Purulia. Manbajar is a place beyond all reasons, an uncertain barren piece of land full of chunks of stone everywhere, a place where even Christ has never treaded on.

A place where he had to take his dinner within six in the evening, because that is the time when the last shop in Manbajar closed down. And the house he lived in was geographically on the extreme end of the village, just beside the village’s own burning ghat for burning down the corpses of the indigenous dead, and the nearest house housed two chained insane people, who cried at some ungodly hours at times, and that is a tautology, because no hour was ever godly there. He lived in this house, because in the history of the village he was the first person to rent in any house in that village, outsiders are very much of a novelty in those areas.

But that was not the most important thing. The bigger thing was his own history though. For the last few years, that is exactly from the moment of marriage, the moment of truth when he understood he should not ever have entered into this marriage, he was sleeping on a broken bed. That is again a grossly overstatement, in a way he was still sleeping in his bachelor bed. So very few nights he went to the place where he should have lived, that is, with his wife, preferring his small lonely corner room, full of so many political memories, in the big bad parental house, a house where never ever a family has lived. But through the years of childhood and youth the house was, by that time, a habit, not any kind of emotional demand any more. So, this return to the old parental house after the college, actually helped him cheat himself that, yes, every thing is exactly as it was, that he was never married at all. Anyway, all these were just the backdrop that actually worked underground to make this second interaction with Nutan doubly rich all possible layers of emotion.

The whole impossibility of a woman being like that, the wife of one of his friends, being so much like a child in the first interaction when Tridib met the friend with his friend and his friend’s fiancée who were planning to marry very soon, in fact got more highlighted and underlined by this second interaction, when this child, a child that a girl can ever be, was married some time back with Tridib’s friend, and so, appropriately run through the ‘Wife’ template, with all those due attires, with a household of her own, with the whole house under her command, that is exactly in every way as a wife should be, and still so unseemly in every way.

Her tip, that is the bindi, the sindur, the vermilion dot on her forehead, as any traditional Bangali bou or wife must have: even that small thing too was so much of a massacre. She has not even learned to wear her sindur, Tridib thought. This second interface with Nutan, after her marriage, from the very first moment made Tridib so conscious that all his childhood he has longed so much for a sister of his own that he never had, being the only child of his parents, and what a emotional necessity it was. That very moment the feeling that came up within him that, yes, maybe this planet is not that bad to live on, what he had started believing for quite some time, specially after this ‘punishment posting’ in Purulia. ‘Punishment Posting’ is the common term in the related circles, when some powers that be punish someone by the posting, for his impertinence, and yes, impertinence, that was one thing that Tridib was never short in supply with, with an in-built attitude problem. These problems now added up with his becoming renegade to the politics that was now in power in West Bengal.

That primary moment of feeling the bubbly soft buoyancy of a hill spring after a long way up hill, the water is taking away your weight, all the bubbles are playing with you, your body, your soul, you are relieved of carrying yourself, that lingered on and even swelled on more, and in a way inundated Tridib on the next morning. As Tridib and his friend, went on talking into the late hours of the night, eager to exchange so many things, meeting after a long time, and so, it was fixed the earlier night that Tridib would rise very early in the morning and catch the first local train, without waking his friend. That Nutan, the child-wife, balika-badhu, as Tridib was already teasing her, and Nutan never failing to get angry, would rise from her sleep at such a small hour, and prepare breakfast for him, was, very truly beyond the wildest imagination of Tridib. Maybe more so due to his semi-nomadic lifestyle for many years, political and impersonal, and more due to his never finding a family in a real way, and he has seen his own wife in many occasions like this without ever getting an experience of this kind. That morning, it was even not four on his black Seiko digital watch, that watch was lost very soon after that, Nutan in her commanding voice, how a wife that runs the family can talk without commands in her voice, told Tridib to sit calmly there, the seat for breakfast that she prepared for him on the floor, with a folded table cloth, and have the whole plate of food without leaving a single morsel on the plate. That was the ugliest fried potato that Tridib has ever seen, now that Nutan has learned her life and her trade and her efficiency she will never be able to produce that ugly that beautiful pieces of fried potato any more in her life, every piece with a thickness of its own, and that some of them are over-fried being compensated by some of them remaining quite raw.

(… continued …)

Filed under: ব্যক্তিগত, মানুষ — dd @ 10:20 am
« Previous PageNext Page »

Powered by WordPress