নেটখাতা

May 28, 2016

শংগঠনের নতুন ধাঁচা – চলো ভাই দিলীপ করি

চন্দ্রবিন্দুর গানের খুচরো পান ধার করে বলা যায়, সংগঠন আসলে বেজায় রকমেরই শংগঠন। চলো ভাই, একটা শং বানাই, গাজনের শং, ভজনের শং, পূজনের শং। কখনও লেনিনের শং, কখনও হো-চি-মিনের শং, কখনও দিলীপের শং। দিলীপ সিংহর শং সাজায় একটু নতুন একটা ধাঁচা, পুরো লতুন ধাঁচার ধূপের গন্ধ। এটাই দিলীপ কাম বিজেপির ইউএসপি। হাড়মুড়মুড়ি ব্যাপারটা দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারে ছিল একটা ব্যারাম – দিলীপ সেটাকে, হয়ত তার ঠাকুরদা মোদির লাইনেই, মোদির একটা ছবি দেখেছিলাম নেটে, বন্দুকপুজোয় রত – একটা বাজনার আরামে এনে দিল। পুলুশকে তুলে নাও : আমরা এই বাজনার আরাম দেব পশ্চিমবঙ্গকে।

আমি যখন শেষ আমরা ছিলাম, এই জীবনের বাল্যকালেই বলা যায়, সোয়ামি-ইস্তিরির মত আমরা না, শংগঠনের আমরা, তখন এই শংগঠন আমিও করেছি। চলো নানা মন্ত্র নানা যন্ত্র দিয়ে একটা শং বানাই। আমরা বানাতাম মার্ক্স লেনিন গুয়েভারা এরকম করতে করতে একদম শেষ ধাপে এসে অমিতাভ নন্দীদের শং। চলো বানাও, খাড়া করো, তারপর একটাই কাজ, সুখে শান্তিতে বংশানুক্রমে প্রণামী খাও, শং-এর পাদদেশে থালায় যা পড়বে। কখনও সে প্রণামী মাল্লু কখনও তা চুল্লু – এক কথায় পাওয়ার।

সেসব সর্বহারা মার্কা শং এখন ফ্যাশনের বাইরে। চলো এখন হাড়মুড়মুড়ি শং বানাই। ঠিকই আছে, ভারতের গল্প, বর্ষ বর্ষ জুড়ে ভরতের বাচ্চাদের গল্প। জীবনের পাটক্ষেতে যে বেজন্মার বাচ্চারা আসিতেছে চলে – জন্ম দেবে জন্ম দেবে বলে, জন্ম দিতে হয় যাহাদের, জন্ম দিয়া আসিয়াছে যারা। তাহাদের আদিপুরুষ তো সেই ভরত – শকুন্তলার বেজন্মা, তার বাপ যাকে নেয়নি। এখন হলে অবশ্য ইশকুলে বা পাসপোর্টে তাতে কোনও ঘাপলা হত না। কিন্তু তখনকার সেই আদি বেজন্মা তার নিজের নামে একটা দেশ গড়ে তুলল – জিস দেস কে বাসী হুঁ। মোদীর দেশ দিলীপের দেশ আরএসএসের দেশ আমার দেশ তোমার দেশ আদি বেজন্মার ডেরিভেটিভের ডেরিভেটিভের ডেরিভেটিভ বেজন্মাদের দেশ। এই হাঘরে হাভাতে হাবাপ-দের দেশে দিলীপই জম্পেশ – চলো, এবার দিলীপ করি।


December 6, 2014

কুকুরের কান্না, চিৎকার

আজ সকালে আমাদের পাড়ার কুকুরগুলোর একটা অনেকক্ষণ ধরে হাউ হাউ করে চীৎকার করছিল। শুনছিলাম, আর ভাবছিলাম, কেন করে? এটা ঘটছিল একটা দেজাভুর, ফিরে-দেখার, মত। এই পাড়ায় আমরা এসেছিলাম বাহাত্তর সাল নাগাদ, তখন আমি ছেলেমানুষ, ইশকুলে পড়ি। সেই সময় একদিন এই পাড়াতে আসার পরপরই ঠিক এমনটা ঘটেছিল। জীবনে প্রথমবার, খেয়াল করে, এই কান্নার আওয়াজটা শুনেছিলাম। কান্না না ডাক না চীৎকার — সবকিছুই। শুনতে খুব করুণ লাগে। কিন্তু কুকুরগুলোর পরিস্থিতেতে খুব করুণাকর কোনও উপাদান থাকে না বোধহয়, কোনও যন্ত্রণা বা বেদনা বা অমন কিছু, অন্তত জানতে বা বুঝতে পারিনি কখনো।

সেই ছোটবেলাতে খুব অবাক হয়েছিলাম, কুকুরটা এমন করছে কেন। কুকুর খুব ভালবাসি বলে নিজের বুকে কেমন মোচড়াচ্ছিল। তারপর থেকে কত বার কত জনকে জিগেশ করেছি, কুকুরেরা অমন করে কেন মাঝে মাঝে, কোনও প্রশ্ন মিটে যাওয়ার মত উত্তর পাইনি। বহু পরে, তখন আমি বিয়ে করেছি, যুবক, সমরেশদা বা লাডলিদা, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরিতে ছিলেন, লিখতেনও প্রতিক্ষণ-এ, বলেছিলেন, সে নব্বই টব্বই হবে, কুকুরেরা চাঁদ ওঠা ব্যাপারটাকে ঠিক বুঝতে পারে না, তাই জ্যোৎস্না উঠলে অমন করে।

তারপরে আবার কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। কুকুরকে বা কুকুরদের অমন করতে শুনলে প্রশ্নটা মাঝেমাঝেই ফেরত এসেছে। লাডলিদার উত্তরটা, যেদিন শুনেছিলাম, সেদিনের মতই, খুব একটা সঠিক লাগেনি। কিন্তু চাঁদের সঙ্গে কোনও একটা সম্পর্ক নিশ্চয়ই উনি অভিজ্ঞতায় পেয়েছেন, তাই বলেছিলেন।

তারপর আবার বহুবছর কেটে গেছে। লাডলিদা কোথায় আছেন কেমন আছেন সেই প্রসঙ্গও মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে বহুবছর, পরবর্তী অনেক বছরের ভিড়ে। যেমন হয়। আজ সকালে আবার শুনলাম ওই কান্না। ছোটবেলার সেই সকালেরই যেন একটা ফিরে দেখা।

শীত পড়ছে। ঠান্ডায় আমার কষ্ট হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে শরীরটা যেন নড়তেই চায় না। আড়ষ্ট ব্যথাব্যথা, যেমন আমার চিরকালই। গত পনরো কুড়ি বছর আবার অভ্যেস দাঁড়িয়ে গেছে, সকালে ঘুম থেকে উঠেই এসে কম্পিউটারের সামনে বসা, রাতে কোনও মেল এসে থাকলে সেটা পড়া, আর সব কাজই তো আজকাল করি মোটামুটি এই কম্পিউটারকেন্দ্রিক, সেই সবে ক্রমে ঢুকে যাওয়া। তেমনি বসেছিলাম, মেশিন তো চালানোই থাকে, মাউস ঘুরিয়ে জাগালাম, দুটো ব্যক্তিগত মেল এসেছিল, তার উত্তর দিলাম। নিজের এই জবুথবুপনাকে একটা আলগা বিরক্তি সহ অনুভব করছিলাম, তখনই কুকুরটা ডাকতে শুরু করল।

বাংলায় কোনও শব্দ আছে বলে তো জানি না, ইংরিজিতে বোধহয় এটাকেই হাউল বলে। নেকড়েরাও নাকি করে। শুনিনি কখনও, পড়েছি, নেকড়ে আর কোথায় দেখব? কোথাওই তো তেমন যাইনি আমি কখনও। আজকে হঠাৎ মাথায় এল, ছোটবেলায় সে উপায় ছিল না, তখন তো কম্পিউটারের কেউ নামই শোনেনি, ছোটদের পত্রিকায় কল্পবিজ্ঞান জাতীয় বিষয়ে ছাপা হত কখনও কখনও, আমরা বাচ্চারা পড়তাম। আজ নেটে খুঁজলাম একটু। তেমন কিছু একটা পেলামও না। শুধু এটাই কেউ কেউ বলছে যে নেকড়ে থেকে কুকুরেরা আসায় তাদের প্রাগৈতিহাসিক অভ্যেশ থেকে করে। কেন করে?

আর একটা জিনিসও মাথায় এল। বাংলায় কোনও শব্দ বোধহয় নেই। নেই কেন? কম্পিউটারেই রাখা অভিধান থেকে দেখলাম, ইংরিজি হাউল শব্দটা এসেছে মধ্যযুগের ইংরিজি শব্দ হুলেন থেকে। তার মানে খুব প্রাচীন শব্দ নয়। তাহলে বাংলায় নেই কেন? রেখা টেখাকে জিগেশ করে দেখতে হবে, হিন্দিতে আছে কিনা। ওদের বিশেষ্য ভাঁড়ারটা তো বোধহয় বাংলার চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ। থাকতে পারে।

যতদূর জানি, সেই কৌষিতকী উপনিষদের শ্লোকের আলোচনা থেকে, একাধিক লেখায় ব্যবহারও করেছি, সালাবৃক বা হায়না বলে ওখানে উল্লেখ করা হয়েছিল কুকুরকেই। যারা ঘোড়া এবং লোহার সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল ভারতে, আর্যদের পোষা। ইন্দ্র যে কুকুরদের মুখে সিন্ধু সভ্যতার তিনশিংযুক্ত দেবতার অনুগামী যোগীদের মেরে মেরে রক্তাক্ত শরীরে বিতরণ করেছিলেন।

তাহলে? যথেষ্ট প্রাচীন যুগেই ভারতে কুকুর এসেছে। ওই কান্নার কোনও প্রতিশব্দ বাংলায় নেই কেন? বাঙালি কুত্তা কি কাঁদে না? তা তো ঠিক নয়। আমার গোটা জীবনটা তার সাক্ষী, আমি নিজেই শুনেছি। আজও কাঁদছিল। আবার বছর চল্লিশেক আগেও কাঁদত। আমার স্মৃতি আছে।

জীবনের বোধহয় এটাই ভাঁড়ার। এই সব না মেটা রহস্যরা। এখন তো খুব সমাপ্তির কথা মাথায় আসে। তাই ভাবছিলাম, এটা নিয়েই বোধহয় শেষ হতে হবে। তারপর কী হবে, তাও জানি না। আমার কোনও ধর্মবিশ্বাসও নেই। পোড়াবে না কবর দেবে, কী করবে, তাতে কিছু এসেও যায় না, ভাবিও না। কিন্তু সমাপ্তিটাকে মাঝেমাঝেই ভাবি। মাথার মধ্যে এই রহস্য বোধহয় ভরাই থাকবে।

কুকুরেরা যদি তাদের জিনগত প্রাগৈতিহাসিকতা থেকে কাঁদে, কাঁদে আজও, তাহলে আমরা কী করি? দাঁত খেঁচাই, মুখব্যাদান করি? নিজের মুখ ভেটকে ভেটকে একটু খেয়াল করার চেষ্টা করলাম, আমি কি অমন করে থাকি, যখন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কখনও কথা বলি, বা আমার কলেজের প্রিন্সিপালের সঙ্গে, কে জানে? বোধহয় না। কিন্তু জিনগত স্মৃতি তো আমারও আছে, নিশ্চয়ই, আমাদের পাড়ার ওই কুকুরটার মতই। কী সেগুলো?

April 22, 2012

ব্যাঙতন্ত্র এবং ঠাম্মা-ব্যাঙ

আমার এক সহকর্মী দিন চারেক আগে আমায় রাতে ফোন করলেন, “দেখছিলে আজ সিপিএমদের, টিচার্স-রুমে — আজ কেমন গলা বেরিয়েছিল, এতদিন পর?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, নতুন বর্ষার জল পড়ায় এঁদো পুকুরের ব্যাঙের মত তো?” সে অবাক হয়ে জানাল, “ওমা তোমারও ব্যাঙের কথা মাথায় এল? আমারও তাই এসেছিল।”

ব্যাঙের তুলনাটা মাথায় আসা খুব বিচিত্র কিছু নয়। দলবদ্ধ আস্ফালন তৈরি করা, যার থেকে কিছুই বোঝা যাবে না। বোঝা যাবে না কারুরই একার আস্ফালন। বোঝার কিছু বোধহয় নেইও। সিপিএম-এর যে কারুরই কথা শুনলে বোঝা যায়, তিনি সবচেয়ে বুদ্ধিমান, সব চক্রান্ত তৈরি হওয়ার আগে থেকে সমাধা হওয়ার পর অব্দি তার জানা, এবং তাঁর এই কথন আর কিছুই নয়, গর্দভ জনগণ যারা নানাবিধ অপপ্রচারে ফেঁসে আছে, তাদের একটু সত্যিকারের সত্যি বুঝিয়ে দেওয়ার লোকশিক্ষা তৈরি করার চেষ্টা করছেন তিনি। সাহেব সৈন্যরা যেমন সাদা-মানুষের-দায়ভার, হোয়াইট-মেনস-বার্ডেন, নিয়ে ‌এইসব ভারত ইত্যাদি কলোনিতে আসত, পুণ্য অর্জনের জন্যে, অন্য কিছু নয়। তেমনি এই সিপিএমরাও এই মাটির পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন আমাদের একটু বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যে, আসল সত্যটা কী।

আগে এসব শুধু বুদ্ধ, গৌতম ইত্যাদি নেতাদের মধ্যে দেখতাম। তাদের সন্তানাদিতে ক্রমে পরিকীর্ণ হয়েছিল এই পৃথিবী, যদিও বিধানসভায় তৃণমূল জেতার পর থেকে তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না একেবারেই। সত্যিই তারা বর্ষার নবধারাজলে সিঞ্চিত ও রোমাঞ্চিত হয়ে তাদের ব্যক্তিগত সব কুয়ো থেকে বেরিয়ে আসছেন, একদম দিগ্বিদিক পুরো ডেকে ডেকে হেজে দিচ্ছেন। টেলিভিশন চ্যানেল থেকে কলেজের টিচার্স-রুম অব্দি। তবে এটা ঠিকই, গৌতম-বুদ্ধবাদীরা আজকাল তেমন মারধর করছেন না, বা, পারছেন না, শুধু ডেকে যাচ্ছেন। এবং এইখানটাতেই ভারি চটে যাচ্ছি।

কলেজের টিচার্স রুমেও সেদিন না বলে পারলাম না, “কোন ইতরামিটা তৃণমূল করছে, যার শুরুটা তোমাদের হাতে নয়?” একজন বললেন, “এতটা কিন্তু হয়নি কখনও।” তাকে না-বলে পারলাম না, “তোমাদের হাতে তোমাদের ক্ষমতায় যদি পাঁচটা খুন হয়ে থাকে তোমাদের উত্তরসূরী শুরু করছে ছয় নম্বর থেকে, সংখ্যাজগতে তো পাঁচের পরে ছয়ই আসে, সংখ্যার লজিকে”। আমার এক সহকর্মী বললেন, “চৌঁত্রিশের পরে ফের এক থেকে না-গুণে, পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ করে গুণে দেখো, পুরোটা মিলে যাবে।” আমি যোগ করার চেষ্টা করলাম, দেখো, এই আলোচনাটা যে টিচারদের মত নখদন্তহীন লোলচর্মদের মধ্যে ঘটতে পারছে, এটাও এই পঁয়ত্রিশতম বছরের অবদান। এর আগে কলকাতার সিকি দুয়ানি নয়া পয়সা নেতাদের দেখেও প্রিন্সিপালদের উঠে দাঁড়াতে হত। যা‌, মোটের উপর প্রিন্সিপাল জাতিটাকেই ঠেলে দিয়েছিল একটা অন্ধকার অপদার্থ অশিক্ষার মধ্যে, এমন অবস্থায় যেখানে আমার সব পরিচিতরাই মাস্টারমশাই হওয়া সত্ত্বেও আমি এমন একজনকেও চিনিনা, আত্মসম্মানবোধ এবং প্রিন্সিপাল হওয়ার বাসনা একই সঙ্গে যার মধ্যে বহমান। এই নিয়ে আগেও আলোচনা করেছিলাম এই ব্লগে — সিপিএম এবং শিক্ষা সাক্ষরতা। এখন তাদের যখন ধরে ধরে পেটাচ্ছে, সেটা মন্দ না ভাল তা স্থিরনিশ্চিত হওয়া খুবই কঠিন। কারণ, এক, ঘোমটার ভিতর থেকে উলঙ্গ সত্যটা বাইরে আসছে, হেগেলীয় ভাষায় যাকে বলে ইমানেন্ট এক্সপ্লিসিট হচ্ছে, লোকের কাছ থেকে চৌঁত্রিশ বছর ধরে গোপন রাখা সত্যটা প্রকাশিত হচ্ছে, আর দুই, যে সব লোক সিপিএমের নেতাদের বাড়ির বাজার করে দিয়ে প্রিন্সিপাল হয়েছে, এবং এখন সেই একই অনায়াস দক্ষতায় অন্য অনেক নেতাদের বাড়ির বাজার করে দিচ্ছে, তাদের পেটানো হয়ত আইনবিরোধী হতে পারে, কিন্তু অভ্যন্তরীন অন্য নৈতিকতায় তাকে খুব অন্যায় বলে বোধ হয় না, যেমন, গীতায় আছে যে আত্মীয়কে হত্যা করে তাকে মেরে ফেলাটা নিধন নয়, বধ, যেমন পশুবধ হয়, তা বেআইনি বটে, কিন্তু আমরা খুব অন্যায় মনে করি কি? বরং চৌত্রিশ বছরের অবরুদ্ধ অনুভূতি প্রকাশিত হোক না সমাজের নিউরোসিস-এর আকারে, বরং তা এবার চিকিৎসিত হতে পারবে।

কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই, ওই তুমুল ব্যাঙ ডাকার শব্দে কাউকেই কিছু শোনানো গেল না। সেই সশব্দ ব্যাঙতন্ত্র কোথাও তো একটা গণতন্ত্রেরও চিহ্ন, কারণ, আগেই বললাম, তৃণমূল ইত্যাদি নিয়ে যে আলোচনাটা চলছিল, সিপিএম আমলে সিপিএমকে নিয়ে তার ধারে কাছে কিছুও টিচার্সরুমে চলাটা ছিল কল্পনারও বাইরে। তাই, গণতন্ত্র না হোক, ব্যাঙতন্ত্রই সই।


আমার ওই সহকর্মীর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতেই, ওই ব্যাঙের প্রসঙ্গে মাথায় এসে গেল, এটা নিয়ে একটা ব্লগ লেখা যায়। আর তার একটু পরেই, চলে এল আমাদেরই একটা চিরাচরিত গল্প। কোথায় পড়েছি, ছোটবেলায়, পঞ্চতন্ত্রে না ঈশপে, তাও মনে করতে পারছি না।

গল্পটা এক ব্যাঙ-ঠাম্মাকে নিয়ে। তার নাতি-নাতনিরা তাঁকে দেখে অবাক হত, ওমা এত বড় কখনও হওয়া যায়, হওয়া সম্ভব? কিন্তু সেই ঠাম্মার আয়তনগত হেজেমনি একদিন আক্রান্ত ও চূর্ণ হল, যখন নাতিনাতনিরা কাছের মাঠে একদিন একটি বলদকে দেখল এবং ফিরে এসে ঠাম্মাকে জানাল। ঠাম্মা বিস্মিত হয়ে গেলেন, তাঁর চেয়েও বড় কিছু কি সত্যিই হওয়া সম্ভব? ঠাম্মার এটা সততই মনে হল, কারণ ঠাম্মা ব্যাঙ কোনওদিনই তাঁর কুয়োর বাইরে যান নি। কিছুই দেখেননি। তিনি পেটের ভিতর দম আটকে আটকে নিজের ভুঁড়ি ক্রমে ফোলাতেই থাকলেন। এর চেয়েও বড়? এর চেয়েও বড়? …

শেষে ফুলতে ফুলতে তিনি ফেটেই গেলেন।

শেষ কিছুদিন মমতার ক্রিয়াকলাপ দেখে মনে হচ্ছে, বোধহয়, যা শুনেছি, অধীর চৌধুরী যা বলেছেন, হার্মাদ থেকে উন্মাদদের হাতে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ, তার সঙ্গে একমত হওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। আজকে এঁদোপুকুরের ব্যাঙেরা তাদের পাঁকমাখা চীৎকার ফের শুরু করার জোরটা পেয়ে গেল এত তাড়াতাড়ি তার জন্যে ইতিহাসের কাছে দায়ী থাকবেন মমতা নিজেই। ঔদ্ধত্য আর আত্মরতিতে ঋদ্ধ সিপিএমের গৌতম বুদ্ধের এই নয়া বৌদ্ধধর্ম তিনি যত বেশি প্রসারিত প্রবাহিত ও উচ্চারিত করে তুলবেন, ততই তিনি এগোতে থাকবেন নিজের বিনাশের দিকে, এবং রাজ্যেরও। পার্ক স্ট্রিট থেকে কাটোয়া, নোনাডাঙ্গা থেকে বন্ধ-রোখা, ঠিক সেই একই রকম শরীরি বলপ্রয়োগে যেমন করে সিপিএম বন্ধ করত, তিনি কী প্রমাণ করতে চাইছেন — তিনি গৌতমবুদ্ধের চেয়েও বেশি বৌদ্ধ? তা হলে কী হল এত কিছু করে সিপিএম জমানার বিরুদ্ধে এত বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়ায়? ব্যাঙ-ঠাম্মা হতে চাইছেন? তিনি কেন এই আত্মবিনাশের পথে হাঁটছেন, আমি জানি না।

ভয় লাগছে হয়তো ইতিহাসে আমাদের জন্যে বরাদ্দ আছে এখন হয় হার্মাদ নয় উন্মাদ কোনও এক ধরনের স্বৈরতন্ত্রই। আতঙ্ক হচ্ছে এই কারণে যে সিপিএম তো নিজেকে বিশ্বাসই করিয়ে ফেলেছে, নিজের কোনও কারণে নয়, করাতের চালনাতেই সমস্যা, কংগ্রেস থেকে কেন্দ্রে সমর্থন তুলে নেওয়াতেই সে হেরেছে, ওটা না ঘটলে সে তো হারতও না, শাসনটা তো সে ঠিকই চালাচ্ছিল। অর্থাৎ, এই সিপিএম ফিরে আসবে আরও আরও নতুন নন্দীগ্রাম সিঙ্গুরের প্রতিশ্রুতি, এবং অমিতাভ নন্দী ও লক্ষ্মণ শেঠদের নিয়েই, কারণ সে তো তাদের মিথ্যা মামলায় আক্রান্ত বলে মনে করে। সে কোন সিপিএম যা আমাদের চেনা সিপিএম-এর চেয়েও ভয়ঙ্কর?

April 14, 2012

শিক্ষা শিক্ষাহীনতা ও কুশিক্ষা

আমার নিজের ভিতর থেকেই একটা গভীর বিরূপতা আমি চিরকালই বোধ করি শিক্ষার প্রতি। মুখে যেটা বলি প্রায়ই, শিক্ষা দিয়ে মানুষ শিক্ষিত বদমাইস হয়, শিক্ষিত রকমে চুরি করতে এবং পা চাটতে পারে। এটা তো আপাতত একটা গোদা এবং গাজোয়ারি যুক্তি বলে শোনাচ্ছে। কিন্তু আদতে এটা ততটা গাজোয়ারি এবং গোদা নয়। অনেক ভেবেছিও আমি এটা নিয়ে। আমার পরিচিত শিক্ষিত বদমাইসদের প্রতি আমার যতটা গা-ঘিনঘিন করে, কখনওই সেটা অশিক্ষিতদের প্রতি করে না।

আমার মাস্টারিজীবনের একদম গোড়ায় আমি কিছুদিন পড়িয়েছিলাম, পুরুলিয়ার মানবাজার কলেজে। সেখানের অনেককে, কলেজের ক্যাজুয়াল কর্মী প্রফুল্লকে, ওখানের আমার এক প্রাক্তন ছাত্রের বাবা-মাকে মনে করে আমার এই শিক্ষাবিরোধিতার পক্ষে আমি উজ্জ্বল সব উদাহরণও পেয়ে যেতাম, আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি মানুষ যাদের দেখেছি, ভালবাসায় যত্নে আতিথেয়তায় — এবং এই গোটাটা মিলিয়ে মানবিক সংস্কৃতিতে — তার মধ্যেই পড়েন এই মানুষগুলো। অথচ যাকে শিক্ষা বলি আমরা তার নিরিখে এরা যথার্থ শূন্য। বিশুদ্ধ নিরক্ষর। আমার খুব নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বা পরিজনদের মধ্যে যে কজন মানুষকে সত্যিই নকল করার মত লাগে, আবার নকল করা অসম্ভবও লাগে, তাদেরও কারুরই শিক্ষাটা কোনও মুখ্য জায়গা নয় একেবারেই।

মমতা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই, বেশ কয়েকবার নিজের মধ্যেই মনে হচ্ছিল নিজের এই অভ্যস্ত শিক্ষাবিরোধী অবস্থান থেকে কি শিক্ষাপন্থী হয়ে উঠতে হবে এই বুড়ো বয়সে? তাহলে কি নিজের ভিতর থেকেই কোথাও একটা মেনে নিতে হবে যে মানুষ হয়ে ওঠায় শিক্ষারও একটা গুরুত্বের জায়গা আছে? এবং এতদিন ধরে একটা চিন্তার সঙ্গে ঘর করার পর সেটার অনুপস্থিতিটাও তো একটা বেদনার হয়ে দাঁড়ায়। তাই একটু খারাপও লাগছিল এটা ভেবে।

চূড়ান্ত উত্তরটা পেলাম এই মিনিট পাঁচেক আগে। টেলিভিশনে অম্বিকেশ মহাপাত্রর, সেই মাস্টারমশাই যাকে প্রহার মৃত্যুভয় ও জেল দিয়েছিল গতকাল রাত্রে এই তৃণমূল শাসন ও সরকার, একটি ইমেল ফরোয়ার্ড করার দোষে, সঙ্গে কথা বলছিলেন এক সাংবাদিক। সাংবাদিকটি জিগেশ করলেন, আপনার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে সেই তৃণমূল কর্মীরা যারা আপনাকে মেরেছিল ও পুলিশে দিয়েছিল। আপনার এতে প্রতিক্রিয়া?

মাস্টারমশাই মাত্র দুতিনটে বাক্যে উত্তর দিলেন। তার মধ্যে একটা মাথায় গেঁথে গেল। দেখুন, যারা গ্রেপ্তার হয়েছিল, তারা তো আমার পরিচিত ও প্রতিবেশী — এতে তো আনন্দ পাওয়ার কিছু নেই।

আমরা সকলেই জানি পরশু রাত থেকে মাস্টারমশাইয়ের উপর কী চলছে। তার পরেও এই প্রতিক্রিয়াটা আমায় কেমন স্তম্ভিত করে দিল। এটাকে কী বলব? এটা তো শিক্ষা নয়, শিক্ষিত মানুষ তো রোজই দেখি কোটি কোটি। তাহলে এটা কী? হয়তো এটাই শিক্ষা।

আর এর উল্টোদিকে যে তৃণমূল শাসন ও সরকার — সে অর্থে তো তারাও কেউ অশিক্ষিত নয়। শিক্ষিত না হলে তো অন্তত কম্পিউটার চালানো, ইমেল খোলা, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, বা মাইকে বক্তৃতা করে চেঁচানো যায় না, “অন্যায় করেছে তো তার শাস্তি পাবে”। অনেকে টিভিতে বলছিলেন এটা মমতার তথা তৃণমূলের অশিক্ষা। না অশিক্ষা নয়, ওটা কুশিক্ষা।

মাস্টারমশাই অম্বিকেশবাবু, আমিও মাস্টারমশাই, বেশ বয়সও হয়ে গেছে, তাও আমাকেও আপনি আজ শেখালেন, কী ভাবে ভাবতে হয়, সারারাত পুলিশের লক-আপে কাটানোর পরের দিনও। আমি এখন থেকে আপনাকে নকল করার চেষ্টা করব। তবে কতটা পারব জানি না।

April 13, 2012

ভগবান ও মমতা — কী ভাল এবং ফর্সা

আজকের গোটা লেখাটাই চুরি করা। কারণ এত অসুস্থ ও অবিস্রস্ত লাগছে গোটাটায় যে নিজে লেখার অবস্থায় নেই। সুমনের গান থেকে চুরি করা নামটা। এবং গুরুচণ্ডালী সাইটের (guruchandali.com) ভাটিয়ালিতে সিকি বলে একজনের লেখা দেখে মুগ্ধ হয়ে সেটাই চুরি করলাম। শুধু একদম শেষে ‘মমতা কী ফর্সা’ এই তিনটে শব্দই মোটে আমার।

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

মমতা কী ভাল! মমতা কী দরদী! মমতা কী মিষ্টি! মমতা কী ফর্সা!

August 25, 2010

সিপিএম ও শিক্ষা-সাক্ষরতা

কলেজের ছাত্রদের নিয়ে সাক্ষরতা বিষয়ক একটা কিছু ছিল। তার নোটিস লিখেছিলেন কলেজেরই এক সিপিএম মাস্টারমশাই, যাকে বাংলায় বা ইংরিজিতে কোনও ভাষাতেই একটি বাক্যও আজও অব্দি আমি সঠিক লিখতে দেখিনি — জানিনা, আমার অগোচরে লিখে থাকতেই পারেন। তিনি একটি নোটিস লেখেন, ক্লাসে ক্লাসে পাঠানোর জন্যে।

আর একজন মাস্টারমশাই, তিনিও সিপিএম, এবং আরও একটু নেতা সিপিএম, সেই নোটিসটিকে সংশোধন করেন। প্রথম জন যেখানে সাক্ষরতা দিবস অর্থে ‘লিটারেসি ডে’ লিখেছিলেন, সেটিকে কেটে তিনি ‘লিটারারি ডে’ করেন।

প্রথম জন যেখানে শুধুই পার্টি মেম্বার, দ্বিতীয় জন সেখানে নেতৃস্থানীয়। প্রথম জন যেখানে ভাষা বা সাহিত্য নয়, অন্য বিষয়ের মাস্টারমশাই, দ্বিতীয় জন সেখানে ইংরিজি ভাষারই শিক্ষক। দ্বিতীয় জন আবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটেরও সভ্য, মানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিষয়ক নীতিগুলো যারা নির্ধারণ করেন। এবং খেয়াল করুন, বেখেয়ালি ভুল নয়, তিনি অন্য এক জনের লেখা কেটে করেছেন, মানে তিনি সত্যিই ‘সাক্ষরতা’ শব্দের ইংরিজি ‘লিটারারি’ বলে জানেন।

গত চৌত্রিশ বছরের সিপিএম শাসনের এটা একটা প্রতিনিধিস্থানীয় চিহ্ন। আমি অন্য রাজ্যের কথা জানি না, পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষা বলে একটা কিছু ছিল, ভাল হোক আর মন্দ হোক। আমার নিজের এবং আমার চারপাশের অভিজ্ঞতা থেকে যা দেখেছি, কম বেশি একটা কেজো মাপের ভাষা ও গণিত শিক্ষা পশ্চিমবঙ্গে হত — শেষ অব্দি যে দুটো হল শিক্ষার সবচেয়ে বুনিয়াদি জায়গা। এবং আমার এই অভিজ্ঞতার একটা অর্থ সত্যিই আছে, কারণ, আমার মা ও বাবা দুদিক থেকেই আমি তৃতীয় প্রজন্মের শিক্ষক। আমার মা, বাবা, মায়ের বাবা, এবং বাবার বাবা, সবাই ছিল মাস্টারমশাই। ঠাকুমা আর দিদিমা কোনও চাকরি করত না, সংসার করত।

এই সাড়ে তিন দশকে শিক্ষার এই অধোগতির মূল জায়গাটা খুব সহজ। শিক্ষা ছিল টাকা আয়ের সবচেয়ে সহজ এবং দুর্লক্ষ্য জায়গা। খুব ছোট ছোট মাপের টাকা, তাই চোখেও পড়বে না, এবং নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সেটা চালিয়েও যাওয়া যাবে। বছরবিয়োনি মেঘ — বজ্র দেয় বৃষ্টিপাত দেয়, ডোবার রহস্য বাড়ে, পদ্মপাতা দীঘিতে তছনছ। এবং শিক্ষাখাতে বছর বছর টাকাও বাড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সেগুলো খুব অনাবিল ভাবে বিকেন্দ্রীকৃত হওয়ার স্বার্থে, সিপিএম সরকার ও শাসন ও পার্টি শুধু সেই সব প্রশ্নাতীত ভাবে অপদার্থ মানুষদেরই বেছে নিয়েছে, যাদের কোনও নিজস্ব মেরুদণ্ডের কুসংস্কারই নেই, স্বতন্ত্র স্বাধীন চিন্তাভাবনার কথা ছেড়েই দিন। এটা ঘটেছে প্রতিটি স্তরে, বাধ্যতা মূলক ভাবে, বামফ্রন্টের প্রথম দিককার বছরগুলোয়। তারপর আর এটা করতেও হয়নি আলাদা করে। অসত অপদার্থদের যে ভাণ্ডারটা ততদিনে তৈরি হয়ে গেছে তারাই সেটাকে মসৃণ রকমে চালিয়ে নিয়ে গেছে, সতত সঞ্চরমান শৈবালের ছেদহীন ছন্দে।

এটা ঠিক ওই পার্টি প্রক্রিয়ার মত। আমার নিজের পার্টি অভিজ্ঞতায় যেমন দেখেছি, এখনও যেটা বলি, পার্টির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আছে এমন কোনও লোক স্বাভাবিক থাকতে পারে না। দরজার সামনে পাঁঠার মত বাঁধা আছে, কিছুই করে না, মাঝে মাঝে একটু ব্যা করে, এমন কিছু লোক ছাড়া, যদি সে সক্রিয় হয় তাহলে সে বদমাইস হতে বাধ্য। কারণ, সক্রিয় মানেই সে নিচু থেকে উঁচু ক্রমারোহী কমিটিতরতায় উত্তীর্ণ হয়ে এসেছে। এবং কখনওই কোন স্তরেই উচ্চতর কমিটি তো তাকে নেবেনা যদি সে তাদের চুরির অংশ না হয়, চুরি-বিরোধিতা ছেড়েই দিন। চুরি বলতে এখানে বৃহত্তর অর্থে বলছি — ক্ষমতা বা টাকা যে কোনও দিক থেকেই হোক পার্টি-ব্যবসার অংশ তাকে হতেই হবে। ব্রাঞ্চ স্তর থেকে লোকাল, লোকাল থেকে জোনাল, জোনাল থেকে জেলা, জেলা থেকে রাজ্য — স্তরবিন্যস্ত লাইনবাজি ও অসততার সিঁড়ি পেরিয়ে পেরিয়েই সে এসেছে। যদি একটা স্তরেও কখনও তার একটু দিওয়ানাপন গড়ে উঠত, দেখি তো একটু না-বদমাইস হয়ে, কেমন লাগে, পেট গোলায় কিনা — তাহলেই সে সেই স্তরেই আটকে যেত।

পার্টির সব জায়গাতেই তাই হয়েছে, শিক্ষাতেও তাই। তার ফল আমাদের চারপাশে। এবং প্রতিটি জায়গায়, স্কুলে স্কুলে কলেজে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সিপিএমের এত দাপট কেন — এর একটাই কারণ, এই প্রতিটি একককে ঘিরে নিয়মিত একটা টাকার প্রবাহ। এবং প্রতিটি স্তরে বাধ্যতামূলক ভাবে অপদার্থ অসতদের বেছে নেওয়া এই প্রক্রিয়ারই অংশ। কলেজে একজন প্রিন্সিপাল যোগ দিল। তার শিক্ষাক্ষেত্রে অংশগ্রহণের বৃহত্তম যোগ্যতা কী — সে অমুক নেতার বাড়ি রোজ বাজার করে দিত, বা তার শালীর ছেলেমেয়েদের বিনাপয়সার পড়াত। এই ক্রিয়াগুলোর একটা তাৎপর্য আছে। এর মধ্যে দিয়ে বাছাই হয়ে যাচ্ছে, তার কোনও রকম কোনও আত্মসম্মানের পিছুটান আছে কিনা। তা যদি থাকে তাহলে টাকার প্রবাহের ওই মসৃণতা ব্যাহত হবে।

এটা একটানা সাড়ে তিন দশক ধরে চলায় যা হওয়ার তাই হয়েছে। নানা সিপিএম নেতা ভুঁইফোড় নানা স্কুল বা শিক্ষাব্যবসায় কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে। বা, নানা যে প্রাইভেট কলেজ ও ইউনিভার্সিটি গজাচ্ছে তার থেকেও কামিয়ে চলেছে। আবহমান স্কুল কলেজ থেকে ওখানে টাকা কামানোর সম্ভাব্যতাটা আরও একটু বেশি। বা, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ গুলোয় নানা জায়গায় এসএফআই-এর দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াচ্ছে চাঁদার বিনিময়ে পরীক্ষার হলে টুকলি সরবরাহ করা। এগুলোর কোনওটাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সিপিএম আমলের শিক্ষা-সাক্ষরতারই চিহ্ন। এবং মজাটা এই যে এই উত্তরাধিকার মাথায় নিয়েই তৃণমূল আসছে, তাদের হাতে যে এই উত্তরাধিকার বদলাবে, এমন আশা আমি এখনও রাখি না।

Filed under: সামাজিক-রাজনৈতিক — dd @ 6:44 am

January 12, 2010

২০১১ অনেক দূর

২০১১ অনেকটা দূর, খুব অনেক দূর, বড্ড দূর হয়ে যাবে না তো তৃণমূলের?

এইমাত্র ফিরে এলাম, কলেজ যেতে না পেরে। অটোদের পথ অবরোধ। এবং উল্টোডাঙা বস্তিতে আগুনের জন্য ট্রেন বন্ধ।

আমার প্রায় শৈশব থেকে আমি সিপিএম রাজনীতির বদমাইশি চারদিকে নিয়ে বড় হয়েছি। তাই জানি, বা বলা ভাল বিশ্বাস করি, সমাপতন বলে কিছু হয় না। প্রথম অবরোধ উঠল একটার পরে, এবং আড়াইটে থেকে দ্বিতীয় অবরোধ। দ্বিতীয়টা ঘোষিত ভাবে তৃণমূলের, এবং প্রথমটা অঘোষিত। এই অবরোধের ফলে রেল লাইনের পূর্ব দিক জুড়ে থাকা বস্তিতে ও বাজারে পৌঁছতে পারল না জলের গাড়ি, তাই পুড়ে ছাই হয়ে গেল। ছাই মানে সোনার ছাই, মহার্ঘ ফ্ল্যাট উঠবে সেখানে, যা তার অবস্থান তাতে ফ্ল্যাটের দাম হবে কোটি টাকা বা তারও বেশি। এতটা মানুষ-ছাই-সোনা শূন্য থেকে বা নিছক সমাপতন থেকে এসেছে এ আমি বিশ্বাস করি না।

এবং ঠিক আগের ব্লগেই যা লিখেছিলাম, সিপিএম যেখানে এসে শেষ হল সেখান থেকেই তৃণমূলের শুরু।

কিন্তু শুরু হয়ে গেল বড্ড আগে। আমরা কোথাও আশা করতে শুরু করেছিলাম যে পশ্চিমবঙ্গের এই গনতন্ত্র বিরোধী এবং যে কোনও শুভবোধ বিরোধী সিপিএম-ফ্যাসিবাদের অবসান হবে বোধহয় তৃণমূলের হাতেই। ২০১১-য়। আমার অনেক বন্ধুর মতই আমিও বিরাট কিছু আশা করিনি তৃণমূলের কাছে শুধু এটুকু ছাড়া যে কুচক্রী কৃষ্ণ নিধনের লৌহমুষলের খণ্ড ঘটনাচক্রে এসে গেছে তৃণমূল নামক ব্যাধের হাতেই।

কিন্তু আজ যখন আমার খুব নিকট খুব পরিচিত মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলছিলাম, যাদের বেশ কয়েকজনের সবকিছু সর্বস্ব গেছে ওই সংগঠিত আগুনে, তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে, এই কয়েক মিনিট আগে, আমার মনে হচ্ছিল, ২০১১ বড্ড দূর হয়ে পড়বে না তো তৃণমূলের জন্য?

পিশাচের হাত থেকে পিশাচতরতার হাতে যেতে কি লোকে চাইবে?

Filed under: সামাজিক-রাজনৈতিক — dd @ 5:14 pm

আওয়াজ আর আত্মঘোষণা

“আওয়াজ আর আত্মঘোষণা — পাড়া, ট্রেন, নিউব্যারাকপুর”, এইরকম ভেবেছিলাম এই ব্লগের নামটা। কিন্তু গোটাটা মিলিয়ে বড্ড বড়।

এইমাত্র লেখাপড়া করছিলাম, সেটা থেকে উঠে দরজা জানলা বন্ধ করে নিলাম, তাতেও আওয়াজটা আটকাতে পারিনি। এইমাত্র আবার ব্লগ লেখা স্থগিত করে, এই আগের বাক্যটার পরে, আওয়াজটা যেখান থেকে আসছিল, পাড়ার সেই কম্পিউটার সেন্টারে গিয়ে বললাম। ছেলেটি ভদ্র, কমাল আওয়াজটা।

কাল ট্রেনে ফিরছিলাম। ক্লান্ত ছিলাম। আমার এক বন্ধুর বিষয়ে একটা দুশ্চিন্তাও ছিল। তার মধ্যে ওই কর্কশ সস্তা উঁচু আওয়াজের বাজনা, চৈনিক সেলফোন থেকেই বোধহয়, আর নিতে পারছিলাম না। ছেলেগুলি এক আধবার কমাল, কিন্তু আসলে বাজিয়েই চলল।আসলে ওরাও না বাজিয়ে পারছিল না, ওরা তো আসলে গানবাজনা শুনছিল না, ওরা যে আছে, বেঁচে আছে সেই আত্মঘোষণা করছিল। আমরা টের পাচ্ছিলাম যে সত্যিই ওরা আছে।

এই টের পাওয়ার আত্মঘোষণার রাজনীতির চূড়ান্তটা দেখলাম গত শনিবার রাতে। নিউব্যারাকপুরে। সেখানে যাওয়ার পথেই, বিটি কলেজের মোড় থেকে হেঁটে যখন যাচ্ছি, বিটি কলেজের গায়ে দেখলাম কালীপুজোর মত লাইট, এবং, কলেজের বাইরে কলেজের কোনায়, দু-দুটো মাইক লাগানো, দুটোরই মুখ বাইরের দিকে। বাইরে ব্যানারও দেখলাম, নিউব্যারাকপুর বিটি কলেজের পুনর্মিলন উৎসব। এই মিলনের আনন্দ বাইরে বিতরণ করার বাসনা যদি তাদের হয়ও, এটা তো শেষ অব্দি একটা ইনস্টিটিউশন, একটা সামাজিক প্রতিষ্ঠান, এরকম অসামাজিক কাজ সেখানে প্রশাসনিক ভাবে করা হচ্ছে। অবাক হতে গিয়েও হলাম না। নিউব্যারাকপুরের রাজনীতির কথা আগেই শুনেছি অনেকের মুখে। গোটাটাই সেখানে দুর্বৃত্তদের হাতে। এতদিন ছিল সিপিএমের দুর্বৃত্ত, এতদিনে নিশ্চয়ই তারা তৃণমূলের দুর্বৃত্ত হতে শুরু করেছে। নিউব্যারাকপুরে যেটা চলে সেটা অবশ্য সিপিএমের দুর্বৃত্ত না বলে দুর্বৃত্তের সিপিএম বলাই ভাল। কোয়ান্টিটি কোয়ালিটির ডায়ালেক্টিক্সে।

তারপর যা দেখলাম, সে আরও চমৎকার। যে বাড়িটায় গেছিলাম সেটা নিউব্যারাকপুরের বড় স্কুল মাঠের পাশেই, চিত্ররথ সিনেমার ধারে। সেই মাঠে পুষ্পমেলা চলছে। তার আগে বেশ কিছু দিন চলেছে সংস্কৃতি মেলা। সংগঠক নিউব্যারাকপুর পৌরসভা। এবং তাতে মুম্বইয়া গানের মাইকে ঘরের মধ্যে খাবারের প্লেট অব্দি কেঁপে কেঁপে উঠছে। আমার ভাবতেই আতঙ্ক হল। এটা হচ্ছে ওখানের সিপিএম পৌরসভার তত্ত্বাবধানে। এটাই নিউব্যারাকপুরের সিপিএম।

আমার ছোটবেলাটা কেটেছে নিউব্যারাকপুরে। তাই বহু ঘটনাই মনে আছে ছোটবেলার স্মৃতি থেকে। পরে যে জুয়াচুরিটাই সামগ্রীক সিপিএম রাজনীতি হয়ে দাঁড়াল তার গোড়াপত্তন হয়েছিল আদতে সাতাত্তরে ক্ষমতায় আসার আগেই, শুধু তখন সেটাকে একটা গতির চিহ্ন বলে ধরতে পারিনি, ছড়ানো ছেটানো কিছু টুকরো গল্প বলে ভেবেছি। আমার মনে আছে বাবার সঙ্গে এসে দেখা করেছিলেন, বাবা ছিল মাস্টারমশাই, তৎকালীন নিউব্যারাকপুরের পৌরপ্রধান এবং ওই গোটা এলাকার অবিসংবাদিত সিপিএম নেতা। তাঁরা চাইছিলেন বাবাকে পার্টি মেম্বারশিপ দিতে, এবং তার জন্যে প্রয়োজনীয় নথী ইত্যাদি তারা সঙ্গেই এনেছিলেন, যা দিয়ে বাবার অক্সিলিয়ারি গ্রুপের সভ্য হওয়া, এবং ক্যান্ডিডেট মেম্বার হওয়া, ব্যাগডেটেই তৈরি করে দেওয়া যাবে। এই এজি এক বছর থাকা, এবং প্রার্থী সভ্য এক বছর থাকা সিপিএমের সংবিধান অনুযায়ী নিয়ম, পূর্ণ সভ্য হওয়ার আগে। ওই নেতাদের এটা করার উদ্দেশ্য একটাই, একটা ভোট নিজেদের পক্ষে বাড়ানো, যাতে নিজেদের পছন্দ মোতাবেক কমিটি কনফারেন্স থেকে বার করে আনা যায়।

এবং গোটাটাই, এখন দেখলে মজা লাগে, কী অদ্ভুত ভাবেই, গনতন্ত্রের মধ্যে ফ্যাসিবাদ বাঁচিয়ে রাখার জুয়াচুরি। পরে সিপিএম রাজনীতি এটাই হয়ে দাঁড়াল, প্রতিটি জায়গাতেই, আপাত গনতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখার ভণ্ডামি, এবং ভিতরে ভিতরে একটা চুরির জমিদারি বানিয়ে তোলা, এবং বাঁচিয়ে রাখা। এই রাজনীতিটাই পরে চারিয়ে গেছে সমাজ জীবনের প্রতিটা স্তরে।

অন্য মানুষকে, নিজের বাইরে, নিজের প্রভুদের বা নেতাদের, বা নিজের সঙ্গে সংযোজিত অন্য জুয়াচোরদের মিলিত চক্রের বাইরে, সম্মান করার বা মর্যাদা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন যে পড়ে না, এটাই সামাজিক সাফল্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিল সিপিএম। এবং আজ এটাই আমাদের জ্যান্ত ট্রাডিশন। সমাজের, রাজনীতির। সবকিছুই ওই দিয়ে স্থির হয় এখন।

সেদিন আমার এক পুরোনো ছাত্র, সে নিজেও ব্যবসায়ী, তাই অনেক কিছু খোঁজখবরও রাখে, আমায় বলল, কী বলব স্যার, যেখান অব্দি গিয়ে মানব মুখার্জিরা ছেড়েছে ঠিক সেইখান থেকেই ধরছে শুভেন্দু অধিকারীরা। আর একটু স্মার্ট হতে হবে অবশ্য। আর একটু দু-চার পাতা ইংরিজি বলাও। তা মহাশ্বেতা দেবীরা আছেন টাছেন, ও সবও হয়ে যাবে।

এবং আর একটু পিছন ফিরে যদি তাকাই, মানুষকে মর্যাদা না-দেওয়া, তাদের যে কোনও অধিকার এবং প্রাপ্য নিয়ে ছিনিমিনি করা, সেখানে আবার আইনকে কাজে লাগানো — এর গোটাটাই আমাদের ইতিহাসে আছে। ইংরাজ প্রভুদের গোমস্তা ও কেরানিদের রাজনৈতিক সামাজিক ভূমিকাই ছিল এটা। যে খোপটায় খাপে খাপে ঢুকে গেছিল সিপিএম। এবার তৃণমূল যাবে। মোট রাজনীতিটা বদলাবে না।

আর কতদিন আমরা কলোনির ইতিহাস বয়ে বেড়াব?

January 7, 2010

মাইকনির্ভর শ্রেণীসংগ্রামে বিজয়ী বাম

জানিনা, বোধহয়, ওইসব চিঠিটিঠির পর, আগেকার ব্লগে আছে, তৃণমূলের সবুজ মাইক মধ্যমগ্রামে অনেকটাই এখন শান্ত। কিন্তু বিপ্লবী দাপট যদি দেখতে চান মাইকের তো মধ্যমগ্রামে আসুন।

কদিন ধরে চলল একটি গনতরফ্রন্ট মাস, মানে এমএএসএস, মধ্যমগ্রাম অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশাল সার্ভিসের মাইক। তারা আবার অপসংস্কৃতি করে না, ভারি গণসংস্কৃতি শোনায়, মাসের ব্যাপার  তো। কিন্তু মাইকটা চলেই। এই গনতরফ্রন্টের ধারণাটা প্রথম এসেছিল এই ব্লগেই ২০০৭ সালের শেষ ব্লগে, ২০০৭ শেষ, ফেডোরা ৮, সিপিএম, এবং আমাদের পিতৃশ্রাদ্ধ। সেখানে ছিল সিপিএমের গণফ্রন্ট ডিওয়াইএফআই, এবং তার গণতরফ্রন্ট দেবীগড় সাংস্কৃতিক চক্রের কথা। গণতরফ্রন্টের সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে, কখনও চক্র, কখনও মাস। তবে মাস গণতরফ্রন্ট হিসাবে অনেক নরমপন্থী, রাত দশটার পরে লোককে ঘুমোতে বা কথা বলতে বা লেখাপড়া করতে দেয় বটে।

গত দুদিন ধরে সরাসরি যে সিপিএম ভাঁড়ামিটা দেখছি সেটা এমনকি আমাকেও বেশ অবাক করে দিয়েছে। মফস্বল এলাকায়, এই বেলঘরিয়া সোদপুর মধ্যমগ্রাম ইত্যাদি এলাকায় দেখেছি, নানা বিজ্ঞাপনের ক্যাসেট চলে, মানে আগে ক্যাসেট চলত, আজকাল নিশ্চয়ই সিডি চলে। কোনও গেঞ্জি জাঙিয়ার দোকান খুলছে, কি কোনও নতুন মলম, ইত্যাদির জন্যে। ভারি অতিকৃত রোমান্টিক গলায়, ভাসিয়ে ভাসিয়ে, একটি মেয়ে একবার কিছু বলে, আবার একটি ছেলে, মধ্যে মধ্যে জুড়ে দেওয়া থাকে গানের লাইন, ধরুন কোনও রবীন্দ্রসঙ্গীত, বা জীবনমুখী, যা আপনাকে ওই গেঞ্জি জাঙিয়ায় বা মলমে উৎসাহিত করবে। বারবার নানা ছলে, কখনও কথোপকথন, কখনও নাটকীয়তা, ওই ব্রান্ডনাম বা দোকাননামটা উল্লিখিত হতে থাকে।

গত কদিন ধরে এইটা চলছে, করছে সরাসরি সিপিএম উত্তর ২৪ পরগনা জেলা কমিটি। আমাদের ঘুম ভাঙছে এবং ঘুমোতে যাচ্ছি আমরা এই শেষহীন লয়হীন ঘোষণার মধ্যে। এবং হুবহু ওই বিজ্ঞাপনের ক্যাসেটের গলা, ভঙ্গী ও ভাষা।

তারা সারাদিন ধরে জানিয়ে চলেছে, হুবহু ওই গেঞ্জি-রোমান্টিক রকমে, আজ রাজ্য জুড়ে যে অরাজকতার আগুন, তার সলতে পাকানো শুরু হয়েছে অনেকদিন আগে … কখনও জানাচ্ছে, কিন্তু প্রতিরোধ শুরু হয়ে গেছে, লাখো মানুষের প্রতিরোধ … সঙ্গে সঙ্গে গান শুরু হয়ে যাচ্ছে ‘আহ্বান, শুনি আহ্বান, আসে মাঠ ঘাট বন পেরিয়ে’, দুলাইনের পর আবার ফেরত আসছে লাখো মানুষের প্রতিরোধ, কখনও কাব্যিকরা পুরুষের গলায়, কখনো ন্যাকা নারীর গলায়।প্রতি বাক্যের শেষেই ফিরে আসছে একটা ব্রান্ড নাম, ব্রান্ড বুদ্ধ। বুদ্ধ বক্তৃতা দেবেন বারাসাত কাছারি ময়দানে, উত্তর ২৪ পরগনা জেলা কমিটির মিটিং-এ। তারই বিজ্ঞাপন চলছে এই অহোরাত্র।

আমি জানি না, আমার তো আর কোনও রকম কোনও সম্পর্কই নেই সিপিএমের সঙ্গে, তবু আমার কেমন লজ্জা আর ঘেন্না লাগছিল। সেই রাজনীতি যেটা আমরা করতাম, সেটার শেষ অব্দি মানে ছিল এই? ঠিক আগের ব্লগে আমি এসএফআইয়ের যে ভাষার কথা লিখেছিলাম, সেটার সঙ্গে এই গেঞ্জি-রোমান্টিক রাজনীতি একটা জায়গায় এক, দুটোই একটা ধর্ষণের সংস্কৃতি। অনেক আগেকার বটুক নন্দী দেবব্রতর পরে, প্রথমে হেমাঙ্গ বিশ্বাস, পরে সলিল চৌধুরী, এই লোকগুলোর একটা মানে ছিল, অর্থ ছিল, আবেগ ছিল। এখনও সুদূর সমুদ্দুর শুনলে আমার মাথার ভিতর কোথাও একটা নড়ে। কাছাকাছি থাকা কোনও বাচ্চাকে শোনাতে ইচ্ছে করে। সেই সবটাকে এরকম গেঞ্জি বিক্রি করায় নামিয়ে না-আনলে কি এদের কিছুতেই চলছিল না? এর চেয়ে বড় ধর্ষণ আর কি হয়? আইডেন্টিটি, পরিচয়, কেড়ে নেওয়া, ওই সময় ওই শিল্পের মুখটাই মুছে দেওয়া।

January 4, 2010

একটা মিশ্র দুপুর

আজ আমার ক্লাস ছিল না। দুপুরে গেছিলাম ইনসিওরেন্সের প্রিমিয়াম জমা দিতে, চৌরঙ্গি রোডে। সেখান থেকে বেরিয়ে রাস্তার উপরেই একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। কয়েকটি বছর ত্রিশ পঁয়ত্রিশের ছেলে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল, পরিকল্পনা করছিল একটি পিকনিকের। এবং অনবরত মুখ খারাপ করছিল। ছেলেগুলির পোষাক আশাক বেশ মহার্ঘ, এবং কথা থেকে যা বুঝছিলাম, ওই সামনাসামনি অফিসগুলোয় কাজ করে, কোনও গাড়ির সেলসে যতদূর সম্ভব। ওখানে একটা বেজায় বড় গাড়ির সেলস সেন্টার আছেও, ঠিক রেমন্ডস-এর আগে, এক্সাইডের মোড় থেকে এগোতে। ছেলেগুলি সকলেই বাঙালি। এবং ইংরিজি উচ্চারণও মোটেই শিক্ষিত কিছু নয়, অত্যন্ত গড়, অথচ ইংরিজি শব্দ বলছিল বড়ই বেশি। সে তো অবশ্য বলেই আজকাল। এবং পিকনিকের পরিকল্পনার সূত্রে শুধুই নানা খাবার, আরও খাবার, আরও আরও তৈলাক্ত এবং তৈলাক্ততর খাবার, এগুলোই যেন উচ্চারণের মাধ্যমে অনুভব করে চলছিল ছেলেগুলো। অথচ প্রত্যেকেরই গোটা সম্মুখভাগ জুড়ে এক একটি বেশ নধর আকারের ভুঁড়ি।

তিনটি মেয়ে, এরা বরং অনেক স্বাভাবিক, এরাও বাঙালি এসে দাঁড়াল ওই চায়ের দোকানেই। এরাও কথা বলছিল বাংলাতেই। এবং এতটা কাছে প্রায় গায়ের পাশে মেয়ে তিনটির উপস্থিতি সত্ত্বেও এদের মুখখারাপের দিকচক্রবাল একটুও বদলাল না, খাবারের আলোচনার কামুক যৌনতায় এরা তখন এতটাই মগ্ন। বেশ বিরক্তি লাগছিল আর গা-রিরি করছিল। আবার এটা যে মূর্খতা সেটাও বুঝছিলাম। এরকমই হয় সেলসের ছেলেপিলেরা, ছেলে তো নয় ঠিক, বর্তুল পিলেরা। একমাত্র দেখেছি ওষুধের সেলসের ছেলেরা, মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ নাম ওদের পেশার, কখনও কখনও একটু আলাদা হয়।

যা হয়, বিরক্তিটা ক্রমে ভিতরে চারিয়ে যেতে থাকে, নিজের উপরেই রাগ হতে থাকে। কিন্তু কিছু করারও থাকে না, নিজেদের এই ক্ষয় ও জীর্ণতা নিয়ে আর একবার একটু বিষণ্ণ, দুঃখিত এবং ক্লান্ত হওয়া ছাড়া। ওই নিয়েই এসে রবীন্দ্রসদন ইস্টিশনে মেট্রোয় উঠলাম। সেখানে একটা ছেলেকে দেখলাম, তার কাঁধের ব্যাগের গোটা ফিতে জুড়ে খাকির উপর নীল মার্কারে রেখা রাহুল রাহুল। আবার ব্যাগের অন্য দুটো উল্লম্ব ভাবে ঝোঝুল্যমান ফিতেতে লেখা এসটিওপি-ও, অন্যটিতে এসটিওপি-কে। মানে দুটো মিলিয়ে হচ্ছে দুবার স্টপ এবং একবার ওকে। আবার ব্যাগের গায়েও লেখা অনেককিছু, রাহুল ইজ গোয়িং ওকে, ইত্যাদি।

ছেলেটি অনকেক্ষণ ধরেই খেয়াল করছিল আমি ওকে দেখছি, এবং বোধহয় আমার মুখের রেখায় কিঞ্চিত মজার উপস্থিতিও টের পাচ্ছিল, একটা অস্বস্তিও পাচ্ছিল। ক্রমে আমি ওর সঙ্গে আলাপ জমালাম, ‘তোমার নাম কি রাহুল’ এই দিয়ে শুরু করে। ছেলেটি দমদম মেট্রোপলিটান স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে। ওকে আমি ওর ব্যাগলিখনের একটু ইংরিজির ত্রুটিও সংশোধন করে দিলাম। জিগেশ করলাম, ব্যাগে এত কিছু লিখেছিস, মা বকেনি? ও হেসেই বলল, না, মাথা নাড়িয়ে।

অবাক হলাম আমি দমদমে নামতে নামতে। ছেলেটি যাওয়ার আগে, তার আগে বেশ কিছুক্ষণ আমি এসে দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমায় বলল, “আসি”। আমি তো ছেলেপিলেই চরাই, সত্যিই এতটা সৌজন্য আমি আশাই করিনি ওই বয়সের একটি ছেলের কাছে। বেশ লাগল। অবাকও হলাম। অবাক হওয়ার মত আর একটা জিনিস আমার জন্য অপেক্ষা করছিল তখনও, দমদম পাঁচ নম্বর প্লাটফর্মে। মেট্রো থেকে নেমে দেখলাম মাঝেরহাট-দত্তপুকুর লোকাল দিয়েছে ওখানে। সিঁড়ির দিকে হাঁটলাম।

ট্রেনে উঠে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসলাম। খুব নিকটে কোনও চৈনিক সেলফোনের সাঙ্গীতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত নেই এটা দেখেও ভারি আরাম হল। এই সময় দেখছিলাম, একটি মেয়ে, আর তার সঙ্গে তার মা, খুব খুঁজে বেড়াচ্ছে কিছু একটা ট্রেনে। মা সম্পর্কটা ডাক থেকে মালুম হল, মেয়েটি বেশ উজ্জ্বল দেখতে, ছাপা সিন্থেটিক হলুদ সাদা সালওয়ার কুর্তা পরনে, সঙ্গে মায়ের চেহারায় বরং কায়িক শ্রম ও ক্লেশের ছাপটা বেশ প্রকট, প্রথম দেখলে মা-মেয়ে বলে মনেই হয় না। মেয়েটার মুখটা ভারি মিষ্টি, নরম। ছোটখাট চেহারা, বাঙালি সৌন্দর্য বলতে ঠিক যেমনটা ছোটবেলা থেকে মাথায় গেঁথে আছে একদম সেরকম। ওরা কী খুঁজছে এত সেটা ভাবছিলাম।

এইসময় ওরা উঠে এল, আমাদের কামরাতেই। এবং একটি মানুষ, সামনে ঝুড়ি আর বস্তাটা না-থাকলেও যাকে ওই ধরনের একজন ছোট পুঁজির ব্যবসায়ী বলে আন্দাজ করে নিতে পারতাম এমনই চেহারা তার। লুঙ্গি পরনে, মুখটা একটু ভাঙাচোরা, কাঁচাপাকা গোঁফ। তরকারির ভেন্ডার, কমলালেবু বিক্রেতা এমনটা বললেই যে ধরনের চেহারা মাথায় আসে।

ওই মেয়েটি এবং তার মা দুজনেই এসে এই লোকটির সঙ্গে বসল। এই লোকটি এবং মায়ের সঙ্গে, তখনও মা বলে আমি নিশ্চিত নই, মেয়েটির মুখ চোখের শিক্ষা ও উজ্জ্বলতার এতটাই ফারাক যে আমি বেশ সকৌতূহল দেখছিলাম। মেয়েটির মা কয়েকটি কমলালেবু কিনলেন, ওর বাবাকে দিলেন, বাবা ঝুড়িটায় ঢোকাতে যাচ্ছেন দেখে মা-টি বললেন, “এখন খাইলে দুইটা পাইতা, বাড়ি গ্যালে তো একটা পাবা কেবল”, অন্যান্য কথাতেও ওদের ফরিদপুরের দেশের ভাষার, পরে জানলাম সেটা কথার সূত্রে, পরিপূর্ণ উপস্থিতি। অথচ মেয়েটির কথায় ওরকম কোনও টানই নেই। কলকাতার যে কোনও একটা কলেজের যে কোনও একটি ছাত্রীর মত তার কথোপকথন।

এই যে মেয়েটির সঙ্গে এত ফারাক বাবা-মার, এটা আমায় এতটাই সপ্রশ্ন করছিল যে শেষ অব্দি আমার ঠিক সামনে বসা ওর মা-কে জিগেশ করলাম, আপনার মেয়ে? মা সায় দিলেন। জিগেশ করলাম কী পড়ে? আলাপ শুরু হল। মেয়েটিকে জিগেশ করায় উত্তর দিল, ও মতিঝিল কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। কী বিষয়, জিগেশ করলাম আমি। ও বলল, ফিলসফি। বিষয়ের নামটা বাংলায় বললে আমার আর একটু পছন্দ হত, কিন্তু ফিলসফি শব্দটা ও সত্যিই ফিলসফিই বলল, সচরাচর অভ্যস্ত ফিলজফি নয়। পাস কী জিগেশ করায় সেগুলোর নামের উচ্চারণও বেশ সুন্দর।

ওর মা পাশ থেকে বললেন যে, ওই ফুলের ব্যবসা করেই ছেলেমেয়েদের মানুষ করার চেষ্টা করেন। তারা থাকেন ক্যান্টনমেন্টের রেল লাইনের পাশের ঝুপড়িতে।

আমি ওনাকে না-বলে পারলাম না, মেয়ে আপনার সত্যিই মানুষ হচ্ছে দিদি। এত সুন্দর একটা মেয়ে, আমার সত্যিই মনে হচ্ছিল, বাড়িতে কোনও তেমন বয়সের ভাইপো টাইপো থাকলে তার সঙ্গে সম্মন্ধ করতাম। লেখাপড়াটায় যথাযথ হওয়াটাই বড় কথা না, মা-বাবার বাস্তবতায় কায়িক শ্রমের উপস্থিতিটা এতটাই প্রকট যে মেয়েটি সেটা জানে না তা হতেই পারে না, অথচ তা নিয়ে কোনও সঙ্কোচ নেই। সত্যিই মনটা পুরো ভরে উঠছিল। লেখাপড়াটাও যে ভাল করেই করে নিজের এই দুই দশকের মাস্টারির অভিজ্ঞতায় সেটা ভালই বুঝতে পারছিলাম। মনে মনে আশীর্বাদ করছিলাম, ভাল বাঙালি মেয়ে হ, ভাল বাঙালি মা হ, তোর বাচ্চারাও শিক্ষিত হোক, ইত্যাদি।

লাবণি হালদার বলে মেয়েটিকে আমার নাম, কলেজের নাম দিতেও খুব ভাল লাগল। যদি কখনও ওর কোনও কাজে লাগতে পারি। তখনই ভাবছিলাম, ভাল কিছু তো ব্লগে লেখাই হয় না, আজ ওকে নিয়ে ব্লগ লিখব, ওকে আর রাহুলকে নিয়ে। ভাল ব্লগ। তখনও আমি জানিনা, এর পরে আরও একটা অভিজ্ঞতা আছে যা আমায় উল্লেখ করতে হবে ব্লগে।

বেশ ভাল ফুরফুরে মনে ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরছিলাম। ঠিক গলির মুখে এসে রাস্তার উল্টোদিকে আটকে গেলাম। এসএফআইয়ের একটা মিছিল যাচ্ছে। বোধহয় এপিসি কলেজের, বা মধ্যমগ্রাম বয়েজের ছেলেপিলেও হতে পারে, যেরকম সব কম বয়সের ছেলে। তাদের একদম প্রথমদিকের দুই সারি ছেলে স্বাধীনতা গনতন্ত্র সমাজতন্ত্র ইত্যাদি নিয়ে স্লোগান দিচ্ছে। এবং অন্যরা ঠিক কী করছে সেটা বলা খুব কঠিন। সবচেয়ে কাছাকাছি এটাই আসবে যে তারা একটা প্রতিযোগিতায় নেমেছে, একটা বাংলা বাক্যে কতবার পুং যৌনাঙ্গ ভরে দেওয়া যায়, এবং তার খুব নিকটাত্মীয় শব্দদের। লাকাঁ একবার লিখেছিলেন সমাজতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষার কথা। আর এটা শুনতে শুনতে এটাই আমার মাথায় এল, তাপসী মালিক বা অন্য এই জাতীয় ধর্ষণগুলো তো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। এই ভাষার রূপারোপ যে রাজনৈতিক সক্রিয়তায় ঘটবে তাতে তো ওগুলোই ঘটার কথা।

কিন্তু শেষ অব্দি তো এটাই সত্য যে এই শিক্ষার আবহ, রাজনীতির প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়েও তো রাহুল তার সৌজন্য হারিয়ে না-ফেলার, এবং আমি তাকে সমালোচনার পরও, দায়িত্বশীলতা ধরে রাখতে পারে। লাবণি পারে তিন ভাইবোনের দিদি হয়ে তাদের পড়ানোর পরেও, তাদের দারিদ্রের পরও, তার জীবন্ততা বজায় রাখতে। কোথাও বোধহয় সব কিছু এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

Next Page »

Powered by WordPress