নেটখাতা

November 11, 2009

জলপাইগুড়ির টাটা চা-বাগান

এই ব্লগে, ২৯শে অক্টোবরের লেখায়, মধ্যমগ্রামের শেষহীন পুজো এবং জলপাইগুড়ির টাটা চা-বাগান, বুড়িয়ার চিঠির সূত্রে জলপাইগুড়ি টাটা চা-বাগানের প্রসঙ্গ এসেছিল। এর আগেও আমার ব্লগে ওর কথা, ওদের কথা, ওদের চা-শ্রমিকদের মধ্যে এনজিও-র কাজের কথা এসেছে। চা-বাগান নিয়ে মাঝেমধ্যেই ওদের সঙ্গে কথা হয়, কাজ নিয়েও, ওদের চা-বাগানে কাজ করার মত কম্পিউটার সিস্টেমগুলো ইনস্টল করে দিয়েছি, নানা সময়ে নানা টেকনিকাল সমস্যার সূত্রেও কথা হয়। যা শুনি তার গোটাটাতেই একটা শঙ্কা হয়। সেটার কথায় আসছি।

আগে বুড়িয়ার বিষয়ে বলে নিই। ওর ভাল নাম শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস, কিন্তু সেটা প্রায় কেউ জানেই না। যদিও ও অর্থনীতি নিয়ে বিএসসি পাস করেছে আমার কলেজ থেকেই, ‘৯৩-এ, তার মানে আমি তখন মাস্টারমশাই, কিন্তু সে সময়ে আমি ওকে চিনতাম না। ওকে চিনলাম অনেক পরে। তখন ও জীবন, পুলিশ, মতাদর্শ ইত্যাদি সবকিছুরই দ্বারাই বিরাট রকমে নিষ্পেষিত এবং তাড়িত। সোজা বাংলায়, কোনও রকমে বাঁচতে চাইছে, চাকরি খুঁজছে। ও এবং ওর আরও দু-চারজন বন্ধু মিলে আমার কাছে এল, তাদের সবারই ইতিহাস ওই এক। চাকরির পরীক্ষার জন্যে আমি কোনও সাহায্য করতে পারি কিনা, বা, ইকনমিক্স ছাড়া অন্য বিষয়ে চেনা কারুর কাছে পাঠাতে পারি কিনা। সবার কাছে ওরা তখন যেতে পারছে না, তার কারণটা বলে নিই।

তার আগে ওরা পিডব্লুজি রাজনীতি করত। এবং রাজনীতিসূত্রে বেশ কিছুটা জীবনীশক্তি, বছর এবং উদ্যম ব্যয় করার পর ওরা বুঝতে পারে, ব্যক্তিহত্যার রাজনীতির সঙ্গে ওরা কিছুতেই মানিয়ে উঠতে পারছে না। হয়ত রাজনীতিটা ঘোষিত ভাবে ব্যক্তিহত্যার নয়, কিন্তু শেষ অব্দি তাই তো হয়ে দাঁড়ায়। এবং মজাটা এখানে, ছেড়ে দেওয়ার পর ওরা বিপন্ন হয়ে পড়ে সমস্ত দিক দিয়ে, শুধু পুলিশ বা সমাজজীবন নয়। ওদের বহু খবর যা ওদের রাজনীতির বাইরে অন্য কারুর কাছে অজানা এমন নানা কিছুও পৌঁছে যেতে থাকে ক্ষমতার কাছে। এবং নিজেদের বাড়ি বা পরিবারের কাছ থেকে নানা সমস্যা তো ছিলই, তাদের কোনও দোষও দেওয়া যায় না, এতদিন তারা কোনও কিছু না-করেই পুলিশি নানা উৎপীড়নের শিকার হয়েছে।

এইসময় আমার কিছু নিকট মানুষ যারা সিপিএম করে বা সিপিএমের সঙ্গে সে অর্থে ঘনিষ্ঠ, এই বিষয়টা জানার পর, তাদের মঙ্গলাকাঙ্খা থেকেই, আমাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। তাদেরকে বলেছিলাম, কেউ যদি ওদের একটুও সাহায্য না-করে তাহলে ফের ওদের ফেরত যেতে হবে সেই রাজনীতিতেই যার বিরোধিতা করে ওরা ছেড়েছে। এবং সেই ব্যক্তিহত্যার রাজনীতির তো বিরোধী আমিও। আমি সক্রিয় দলভিত্তিক রাজনীতি ছেড়েছি ‘৮৯ সালে। কিন্তু তার পরের এই দুটো দশক আমি তো রাজনীতি করেই চলেছি। আমার লেখালেখি আমার বক্তব্য আমার চিন্তা এটাই তো আমার রাজনীতি। এবং উগ্রপন্থাকে আমি তো সত্যিই রাজনৈতিক ভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক একটা জায়গা বলে মনে করি, যা মানুষের সমস্ত গনতান্ত্রিক বক্তব্যকেই শেষ অব্দি স্তব্ধ করে দেয়। এবং ক্ষমতাকেই, সে আমেরিকাই হোক আন্তর্জাতিক ভাবে, আর বুদ্ধই হোক রাজ্যস্তরে, আরও আরও হিংস্রতা করে চলার লাইসেন্স দিয়ে দেয়। এই নিয়ে একটা লেখাও লিখেছিলাম, ১১ই সেপ্টেম্বরের পর, ‘ভাল আমেরিকা, কাল আমেরিকা’ বলে, ‘অন্যস্বর’ পত্রিকায় বেরিয়েছিল। সেই লেখাটা আমার ওয়েবসাইটে রাখা আছে, যদি কেউ চান পড়তে পারেন। লিংকটা হল: http://ddts.randomink.org/bangla/essay/theory/juddha.pdf

উগ্রপন্থাকে আমি বিপজ্জনক মনে করি, কারণ, শেষ অব্দি প্রতিটি উগ্রপন্থী রাজনীতিই, সন্ত্রাসবাদী রাজনীতিই, পুঁজির তথা শাসক ক্ষমতার হাত শক্ত করে।  তাই, উগ্রপন্থাকে বিপজ্জনক মনে করি বলে সেই সমস্ত রাজনীতিকেই আমি বিপজ্জনক মনে করি যা এই উগ্রপন্থী রাজনীতি তৈরি হওয়ার অবস্থাটাকে সৃষ্টি করে। এই কদিন আগে বুদ্ধ ইত্যাদি বক্তৃতা রাখলেন, ‘জঙ্গলে ঢুকেই মারব’ বা ওই ধরনের কিছু। লালগড় সূত্রে। গোটা আস্ফালনের হাস্যকরতাটা যদি বাদও দিই, পুরো পরিস্থিতিটাকে একবার ভাবুন: কী ভয়ানক অমানবিক।

বুদ্ধ যাবেন জঙ্গলে, তার দশ গজ বিশ গজ ত্রিশ গজ দূরে দূরে পুলিশ ও কমান্ডোর বৃত্ত, ঢুকে তিনি একটি ডালে বসা বসন্তবৌরী পাখির ন্যাজ নড়তে দেখে বলবেন, ‘তোমার ন্যাজে যদি কোনও মাওবাদ থাকে তো আমরা সেটা গুঁড়িয়ে দেব’ ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। তাতে সেই বাচ্চা মেয়েটির কী হবে, যে ভয়ে ও অপমানে কাঁদতে কাঁদতে, নিজের কাঁচা হাতে পোস্টার লিখছিল, ‘আমার বাবা আর সিপিএম করবে না’। সে তো মহাকরণেও থাকে না, তার চারদিকে তো কমান্ডোর বৃত্ত নেই। এবং মাওবাদ ও মাওবাদীরা তো শূন্য থেকে গজায়নি। সে তো এই সিপিএম রাজনীতিই যা একজন রাজনৈতিক কর্মীর সম্পর্কে এতটা ঘেন্না ও বিবমিষা তৈরি করতে পারে যেখান থেকে মাওবাদীরা এইরকম একটা দাবি তৈরি করে। আমার এক ছাত্রের কাকা, সরকারি চাকরি করেন কলকাতায়, ওই এলাকাতেই থাকেন, আমাকে বলেছিলেন, সত্যি কথা বলব স্যার, ওই পোস্টারগুলো দেখি আর মনে বেশ জোর পাই, যাক কেউ একটা তো আছে অন্যায় প্রতিবাদ করার।

এবং ওই মাওবাদ তৈরি করল কে? পাঁশকুড়া গড়বেতায় পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন সিপিএম মদতকে বাদ দিন, সেটা অন্য গল্প, তৃণমূল কী ভাবে মারতে হবে তার সিপিএমী ছক, এই ভয়টাই তো সেই সিপিএম রাজনীতি। এবং ভয় থাকলে ভুত তৈরি হতে কতক্ষণ। একভাবে না একভাবে নিষ্পেষিত ভয় তো ফেরত আসবেই, সমাজের রাজনীতির নিউরোসিস হয়ে, সেটাই উগ্রপন্থী রাজনীতি। এবং উগ্রপন্থী রাজনীতি থাকলেই তো পুলিশ ও সৈন্য নামিয়ে আনা যায়, তাতে মৃত্যু ও রক্ত ও ধর্ষণ দিয়ে ধুয়ে মুছে দেওয়া যায় আদিবাসীদের উপর অত্যাচারের ইতিহাস।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর মহাভারত ও পুরাণের গল্পগুলোয় সব রাক্ষসরা কথা বলে সাঁওতালি রকমে। এখনো তো তারা রাক্ষসই। কখনও মদেশিয়া রাক্ষস, কখনও লালগড়ের রাক্ষস। ফিল্মস্টাডিজের সঞ্জয়দা একদিন বলছিল ওর ছাত্রদের, লালগড়কে বুঝতে চাও তো ঋত্বিকের অযান্ত্রিক দেখো, নায়ক নায়িকা এক কোণে পড়ে আছে, আর গোটা ফ্রেম জুড়ে কেন উপজাতি নাচ আর উপজাতি ভূগোল সেটা বোঝো, তাহলেই লালগড় বুঝবে। ঠিক তাই। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর সময় পেয়েছিলেন আপনারা, উপজাতিদের ইতিহাস কেন এক ইঞ্চিও বদলাল না সেটা আগে বুঝুন তারপর পাঁজি দেখে ঠিক করবেন কবে জঙ্গলে যাবেন মাওবাদী মারতে।

চা-বাগানের এই শ্রমিকরাও সেই আদিবাসী। বুদ্ধরা একটা মাওবাদী এলাকা তো তৈরি করেই দিয়েছেন। আরও একটা উত্তরবঙ্গে তৈরি করতে যাচ্ছেন, ঠিক এই কথাটাই মনে হয়েছিল বুড়িয়ার চিঠিটা পড়ে। দু-দিন আগে আবার ওর একটা চিঠি এল। সেই গোটা চিঠিটাই তুলে দিলাম এই লেখায়, শুধু সম্ভাষণ আর ইতিটা বাদ দিয়ে। আর সামান্য কিছু বাক্যের ও শব্দের মেরামত সহ, হুবহু চিঠিটাই তুলে দিলাম।


date Sun, Nov 8, 2009 at 9:09 subject TATA Tea
তোমায় আগেই বলেছি, নেওড়ানদী চা-বাগানের গোলমালের কথা। এখানে কিছু দিন ধরে টাটার বাগান নেওড়ানদী চা বাগানে আদিবাসী শ্রমিকরা আন্দোলন চালাচ্ছে। নেওড়ানদী চা বাগান টাটার একটি সংস্থা। বছরখানেক আগে হঠাৎ সব টাটার বাগানে বোর্ড থেকে টাটার নাম তুলে দিয়ে অ্যামালগেমেটেড কোম্পানী লিখে দেওয়া হল।

বাগানের শ্রমিকরা এই পরিবর্তনের অর্থ বোঝেনি। তাদের একবার বলা হয়েছিল যে এখন থেকে টাটার বাগান চলবে শ্রমিক, কর্মচারী আর ম্যানেজমেন্টের শেয়ারে। সবাইকে শেয়ার কিনতে হবে। শ্রমিকরা সেসব কিছুই বোঝেনি — শেয়ারের মানে কী। সেটা হলে তাদের অবস্থা কী হবে সে সব কিছুই তারা বোঝেনি। এই ভাবে বাগান চলছিল। হঠাৎ আবার সেই বোর্ডে দেখা গেল অ্যামালগেমেটেড এর পাশাপাশি ‘টাটা টি এন্টারপ্রাইজ’ লেখা হল। আর কোম্পানির ঠিকানা লেখা হল টাটা টি কোম্পানির  কলকাতা অফিসের। পুরো বিষয়টাই শ্রমিকদের অজানা।

আমি ডুয়ার্সে আসি বন্ধ বাগানের শ্রমিকদের অবস্থা জানতে, আর তার পাশাপাশি তারা যাতে সরকারী সুবিধা পায় সেই বিষয়টা দেখতে — আইইউএফ-এর কাজ নিয়ে। প্রথম আমরা বন্ধ বাগানেই গিয়েছিলাম। খোলা বাগানগুলো সম্পর্কে তেমন কিছু জানা ছিলনা। দূর থেকে দেখে ভাবতাম টাটা, গুডরিক, ডানকানের মত বড় বড় বহুজাতিক সংস্থার বাগানগুলিতে শ্রমিকদের অবস্থা বোধহয় খুব ভাল। নিশ্চয়ই ওদের ওখানে বাগিচা শ্রম আইনের সব সুবিধাই শ্রমিকরা পায়। নিশ্চয়ই ওদের ঘরদোরগুলো ভাল। একটা বোকাবোকা স্বপ্ন ছিল ওই সব বাগানগুলি নিয়ে।

তারপর একবার চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের অবস্থা কেমন সেটার ওপর একটা কাজ চালাতে হল। সমীক্ষাটার জন্য বন্ধ, খোলা সব রকমেরই কিছু কিছু বাগান বেছে নিয়েছিলাম। সেই লিস্টে ডানকানের বাগানও ছিল। তবে টাটা বা গুডরিকের বাগান ছিল না। সেখানে ঢুকতেই পারিনি। এত কড়া ওখানকার নিয়ম কানুন। ডানকানের বাগানে ঢুকতেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। ওই কাজে আমাদের সঙ্গে নেহাত জশুয়ার মত সাদা চামড়ার মানুষ ছিল, তাই হয়ত শেষ পর্যন্ত ঢোকা সম্ভব হয়েছিল। আর অনুরাধাদির মামা এখানে ডানকানের সাতটি বাগানের দায়িত্বে আছে, তাই কোনও রকমে তাকে অনুরোধ করে ঢোকার পারমিশন পেয়েছিলাম শেষ পর্যন্ত। তাও অনেক শর্ত ছিল। আমাদের রিপোর্টে ওদের বাগানের নাম উল্লেখ করা যাবে না, এই সব।

আমরা রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ, আমাদের জানার খুব দরকার ছিল খোলা বাগানের শ্রমিকদের অবস্থা কেমন। আর শেষ পর্যন্ত যা দেখলাম তা ভয়ঙ্কর। আমাদের প্রচেষ্টায় বন্ধ বাগানের শ্রমিকদের কাছে ততদিনে সরকারী সাহায্য সঠিকভাবে পৌঁছতে শুরু করেছিল, আর তাতেই তাদের অবস্থা খানিকটা ভাল এই ডানকানের বাগানের শ্রমিকদের থেকে।

ডানকানের শ্রমিকদের বিএমআই (বডি মাস ইন্ডেক্স) কষে দেখা গেল তারা ক্রিটিক্যাল স্টেজ অফ মর্টালিটির স্তরে আছে। অর্থাৎ একটু সামান্য অসুখেই তাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। প্রায় সব শ্রমিকই এই বাগানে দিনে মাত্র দুইবার খাবার খায়। তার থেকে বেশী বার খাবার খাওয়ার সংস্থান নেই তাদের। প্রোটিন ধরনের খাবারের কথা সারা সপ্তাহে একবারও ঠিক ভাবে ভাবতেই পারে না। যদি মাছ, মাংস, বা ডিম কেনে তাও পুরো পরিবারের জন্য, এবং এত কম যে তাকে প্রোটিন খাওয়া বলে না।

টাটার বাগান প্রসঙ্গে তোমাকে এত কিছু এলোমেলো কথা বলছি কারণ আমদের এই সব বহুজাতিক কোম্পানির বাগান সম্পর্কে স্বপ্নের ধারনাটা কী ভাবে বদলাল, তার জায়গা নিল ভয় আর সন্দেহ, সেটা বোঝাবার জন্য। এত কিছুর পরেও কেমন যেন একটা ধারনা অচেতনে থেকেই গিয়েছিল যে তবুও টাটা বা গুডরিকের বাগানে বোধহয় শ্রমিকের অবস্থাটা সত্যিই এতটা খারাপ না। তাও, কেন সহজে ওই বাগানগুলোতে ঢোকা যায় না এই ভেবে একটা সন্দেহও ছিল।
এই অবস্থায় কিছুটা সময় আমি এখানে একাই প্রায় কাজ করছিলাম, আমার সঙ্গে আর কেউ ছিল না। মাথায় ফন্দি ফিকির ঘুরছিল, কী করে ঢোকা যায় ওই সব বাগানে। কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম এই সব বিশাল মালিকগুলোকে না ধরতে পারলে শুধু আগরওয়ালা, ঝুনঝুনওয়ালাদের নানা ভাবে চাপ দিয়ে তেমন কিছু হবে না। কারণ চা এর বিশ্ব বাজার যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারাই ঠিক করে দেয় চা-এর এই মানুষগুলির অবস্থা বা দুরবস্থা, ভূত, ভবিষ্যত, বর্তমান। তাই নানা ভাবে ধান্দা করছিলাম কি করে জানা যায় এই সব বাগানের শ্রমিকরা সত্যি সত্যি কেমন আছেন।

এর মধ্যে এখানে অনেক কিছু ঘটে যাচ্ছে। গোর্খারা দাবি করছে তাদের স্বাধীন গোর্খাল্যান্ড, ডুয়ার্সকেও তাদের গোর্খাল্যান্ডের অংশ করতে হবে, এইসব। তবে ডুয়ার্সের জনসংখ্যার বেশীরভাগ আদিবাসী। যাদের ব্রিটিশরা তাদের নিজেদের ভিটেমাটি থেকে সম্পূর্ণ উৎখাত করে নিয়ে এসেছিল অনেক বছর আগেই। এটাই এখন তাদের দেশ, তাদের মাটি। তাই তারা আপত্তি জানাল ডুয়ার্সকে গোর্খাল্যান্ডের অংশ করার এই অদ্ভুত দাবির। সিপিএম সহ সব রাজনৈতিক দল তাদের ব্যবহার করে নিল এই সুযোগে। এরা বুঝতেই পারেনি, একবার এই ভুখা মানুষগুলো একসাথে একটা দাবি করলে, আর তার দাবির জায়গাটাকে একবার প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই তারা কিন্তু দাবি করবে তাদের সমস্ত অধিকারের। বা ভাবতে পারলেও এই ভেবে শান্তি পেয়েছিল যে তারা সব কিছুকেই সহজেই ঠান্ডা করতে পারবে।

যাই হোক, এখন এই আদিবাসী মানুষগুলি ঐক্যবদ্ধ, নিজেদের এক হয়ে ওঠার শক্তি ওদের কাছে আজ বেশ কিছুটা বোধগম্য। তাই আজ ওরা দাবি করতে শুরু করেছে ওদের না পাওয়া সমস্ত কিছুর। আর এই দাবির ওপর আস্থা রেখে আমি একদিন গেলাম ওদের কাছে। প্রথমে ওরা আদিবাসী নই, শহুরে মেয়ে, বড়বড় লেকচার মারছি, এই ভেবে তেমন পাত্তা দেয়নি আমাকে। বারবার বলেছে আপনারা সব সাহায্য করেন ওই সব চোর ট্রেডইউনিয়নকেই। আমার তেমন কিছু খারাপ লাগেনি। কারণ মানুষতো তার অভিজ্ঞতা থেকেই কথা বলে। এতে তো খারাপ লাগার কিছু নেই। হাল ছাড়িনি। আমার পুরানো রাজনীতি করার অভিজ্ঞতায় আমিও শিখেছিলাম লেগে পড়ে থাকার শিক্ষা। নিজের ভিতরেই একটা রেজিমেন্টেশন কাজ করে প্রতি মুহূর্তেই।
বারবার ওদের কাছে যাওয়া শুরু করলাম, আমার জানা নানা তথ্য ওদের দেওয়ার চেষ্টা করলাম। একদিন খবর পেলাম টাটার বাগানে ওরা লড়াই শুরু করেছে ম্যানজমেন্টের অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে। বাগানটা বেআইনি ভাবে বন্ধ করে চলে গেছে ম্যানেজমেন্ট। তার বিরুদ্ধে ওদের লড়াই। বিষয়টা কি জানার জন্য ছুটে গেলাম ওদের কাছে। আর এর মধ্যে আমি ওদের খানিকটা কাছের মানুষও হয়ে উঠেছি। যা আমি আন্তরিক ভাবেই হতে চেয়েছিলাম প্রথম থেকেই।

এবার আসি টাটার বাগান নেওড়ানদীর কথায়। যা আমি জানতে পেরেছি ওদের সাথে ওই লড়াইটার একজন সমব্যাথী ও সহযোদ্ধা হয়ে ওঠার পর। সহযোদ্ধা ভাবতে ইচ্ছা করছে, তাই লিখলাম। আমি আদৌ সহযোদ্ধা কিনা তা আমি জানিনা। আর ওরা আমাকে তেমনটাই ভাবে কিনা সেটাও ঠিক করে জানা হয়নি।

টাটার এই ন্যাওড়ানদী বাগানটা অনেক বড়। আর ডুয়ার্সে টাটার বাকি যে তিনটে বাগান আছে তাদের সবার থেকে বেশি মুনাফা দেয় এই বাগানটাই। এই বাগানটার উৎপাদন অন্য তিনটে বাগানের থেকে অনেক বেশি। বহুদিন ধরেই অসুস্থ শ্রমিকরা আইনিভাবেই অসুস্থতার ছুটি চাইতে গেলে বেশিরভাগ সময় বাগানের ডাক্তারবাবু তাদের ছুটি দেয়না। এই ছুটি পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করে এক্কেবারে ডাক্তারবাবুর মর্জির ওপর। কখন কার ওপর তিনি সদয় হবেন আর সেই শ্রমিকটি ছুটি পেয়ে কৃতার্থ হবে। এমনটা চলছিল বেশ অনেকদিন ধরে। ম্যানেজমেন্টের কাছে বারবার শ্রমিকরা অভিযোগ করেও কোনো ফল হয়নি। আর হবেই বা কেমন করে। কারণ, ডাক্তারবাবু তো নিজেও ম্যানেজমেন্টের অংশ।

তাছাড়া বাগিচা শ্রম আইন অনুসারে শ্রমিকদের তাদের বাগানের হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা। রোগ নিয়ে বাগানের হাসপাতালে ভর্তি হলে তার চিকিৎসা, ওষুধ, ও খাবার বিনামূল্যেই পাওয়ার কথা। কারণ চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি মাত্র ৬২ টাকা ৫০ পয়সা, আর সেই ক্ষেত্রে মালিকরা এই সব সুবিধাগুলোকে টাকার অঙ্কে কষে বলেন যে আসলে শ্রমিকের মজুরি ১১২ টাকা। তার মধ্যে চিকিৎসাকেও ধরা হয়।

কিন্তু এখানে, শ্রমিকরা আমাদের জানাল, দীর্ঘদিন ধরে তাদের নানা ভাবে শোষণ করে আসছে মালিকপক্ষ। তারা যদি হাসপাতাল থেকে ওষুধ নেয়, তাহলে তার দাম তাদের দৈনিক মজুরি থেকে কেটে নেওয়া হয়। তারা হাসপাতালে ভর্তি হলে হাসপাতাল যে খাবার তাদের দেয়, তার জন্য তাদের রেশন থেকে সেটা কেটে নেওয়া হয়। আগে রোগীদের জন্য বুধবার, শুক্রবার আর রবিবার মাছ বা মাংস বা ডিমের ব্যবস্থা থাকত, দুধ-চা দেওয়া হত দিনে দুইবার, সকালে একটা টিফিন মানে বান-পাউরুটি গোছের কিছু থাকত। এখন সব বন্ধ। চা দেওয়া হয়, লিকার। চিনি ছাড়া কেবল নুন দিয়ে। দুই বেলা খাবার, তাতে থাকে ডাল, আর সোয়াবিনের তরকারি, তাও একইবার রান্না করে দুইবেলা তা দেওয়া হয়। আর সেও প্রায় খাওয়ার মত না।

বহু শ্রমিক অসুস্থ অবস্থায় ছুটি চাইলে তাদের দেওয়া হয় না। প্রতিবাদ করে ডাক্তারের হাতে চড়-থাপ্পড় খাওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে অনেকের। সব মিলিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষোভ জমছিল শ্রমিকদের মধ্যে। আমি কয়েকদিন আগে সন্ধ্যাবেলা ঢুকেছিলাম এই বাগানে। এক শ্রমিক বন্ধু বলছিলেন যে তাদের ঘরে আলো নেই, আর মাসে রেশনে মাত্র ৩০০ গ্রাম কেরসিন তেল দেওয়া হয়, কিভাবে পড়াশোনা করবে বাচ্চারা? অনেকদিন ধরে রবিবার কাজ করানো হয় তাদের, অথচ কোনো ওভার টাইমের টাকা তারা পান না। এমনকি রবিবার কাজ করার জন্য সপ্তাহের অন্যদিনে ছুটি তাদের প্রাপ্য, সেটাও পান না তারা।

আর এই চা শ্রমিকদের আরও একটা মজার কথা আছে। আমরা জানি সপ্তাহে ছয়দিন কাজ করার পর রবিবার মজুরি সহ তাদের ছুটি পাওয়ার কথা। সেটাকেই ছুটি বলি আমরা, তাই তো। কিন্তু এখানে আইনি ভাবেই সেটা তারা পাননা। এখানে এদের পোষাকী নাম ডেইলি রেটেড লেবার, মানে যে দিন কাজ করবে সে দিন পয়সা, রবিবার কাজ নেই, পয়সাও নেই। মানে আমার হিসাবে রবিবারটা আসলে বেকারদিন। যাই হোক যা চালু আছে তার মধ্যেই সবাই আছে, আমিও আছি — ওই শ্রমিকবন্ধু জানালেন।

যে ঘটনার কথা তোমায় লিখেছিলাম, সেই ঘটনায় ফিরে আসি আবার। এই ডাক্তারকে কেন্দ্র করেই সমস্যা। এই বাগানের এক শ্রমিক আরতি ওরাওঁ। ৮ মাসের গর্ভবতী অবস্থায় সে যেতে শুরু করল ডাক্তারের কাছে, তার মাতৃত্বকালীন ছুটি মঞ্জুর করার জন্য। প্রতি সপ্তাহে একবার করে যায়, আর ডাক্তার তাকে বলে দেয় যে এই সপ্তাহে কাজ কর, ওই সপ্তাহে কাজ কর। এই রকম। সে খুব অসুস্থ অবস্থায় চারদিন কাজে যেতে পারেনি, তখন ডাক্তার তাকে মাত্র তিনদিনের ছুটি দিয়েছিল। একদিন তার বিনা মজুরীতে ছুটি নিতে হয়েছে। একে তো মাত্র ওই কটা টাকা, তাও আবার যদি সেটাও না জোটে মানুষগুলো খাবে কী?

শেষে কোনো উপায় না পেয়ে, সংসার চালানোর জন্য সে ৯ই আগষ্ট কাজে যোগ দেয়। তার ঘর থেকে কাজের জায়গাটাও ছিল বেশ দূরে। শরীরের এই অবস্থায় সে কিছু পাতা তোলার পর তার ব্যথা ওঠে, সে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায় মাটিতে। এই অবস্থায় তার মা-কে সে জানায়, মা-ও ওখানের শ্রমিক, সে আর কাজ করতে পারবে না।

খবরটা পেয়েই সব শ্রমিকেরা জড় হয়ে যায় সেখানে। সর্দার হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স চাইতে গেলে ডাক্তার জানায় অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া যাবে না, ওকে যেন সাইকেল করে নিয়ে আসা হয়। এটা শোনার পর সব শ্রমিকরা মিলে, মূলত নারী শ্রমিকরা, ঠিক করে তারা হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তারের কাছে জবাব চাইবে কেন ডাক্তার তাদের ন্যায্য ছুটি দেয়না, কেন আরতির আজ এমন হবে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা যখন হাসপাতালের দিকে রওনা দিল তখন ডাক্তার পরিস্থিতি বুঝে একটা ট্রাকটর পাঠিয়েছিল আরতিকে আনার জন্য। কিন্তু শ্রমিকদের চেপে রাখা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ কে চাপা দেওয়া আর সম্ভব ছিলনা। তারা হাসপাতালে গিয়ে প্রশ্ন করল কেন ডাক্তার তাদের ন্যায্য ছুটি দেয়না, কেন আরতির এমন অবস্থা হল।

ডাক্তার তার ভুল স্বীকার না করে উদ্ধত আচরণ করতে লাগল, এবং শ্রমিকদের মারতেও উদ্যত হয়েছিল। তখনও বুঝতে পারেনি যে ভিতরে ভিতরে এখন এরা একজোট হয়েছে। সেটা বুঝে ফেলার পর পালানোর চেষ্টা করার সময় সব মহিলা শ্রমিকরা তাকে ঘিরে ধরে হালকা মারধোর করে। এমন করার পর তাদের মধ্যে একটা ভয়ের সঞ্চারও হয়। সে জন্য তারা ম্যানেজারকে সমস্ত ঘটনা জানায়, ডাক্তারের এই অমানবিক কাজের কথা জানায়। আর তার পাশাপাশি অনেক রাত অব্দি পাহারা দেয় ডাক্তারকে, যাতে সে পালিয়ে গিয়ে শ্রমিকদের কোনো ক্ষতি করতে না পারে।
ঘটনাটা ঘটে গত ৯ ই আগষ্ট। সেই দিন ম্যানেজারকে ডাক্তারের বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়ে আরতির বিষয়টা বলায় সে জানায় যে আগামী ১১ তারিখ সে সমস্ত শ্রমিকদের সাথে বসে সমস্যাটির একটা সমাধান বার করবে। পরদিন ছিল ছুটির দিন। শ্রমিকরা বুঝতে পারেনি ভিতরে ভিতরে কি ঘটে যাচ্ছে।

১১ই আগস্ট শ্রমিকরা তাদের কাজে যাওয়ার সাইরেন না শুনে বুঝতে পারে বাগান বন্ধ হয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে দেখা যায় মালিক ডাক্তার সহ ম্যানেজমেন্ট চলে গেছে বাগান ছেড়ে।  ৯৫২ জন শ্রমিক আর ৬৫০০ মানুষের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। শুরু হল প্রতিষ্ঠিত ট্রেড ইউনিয়নগুলির খেলা। ২৬ শে আগষ্ট বাগানের প্রতিষ্ঠিত ট্রেড ইউনিয়নের সাথে মালিকপক্ষ এবং সরকারী আমলার ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়ে ২৭ শে আগস্ট বাগান খুলে গেল। শর্ত কী ছিল তা জানতেই পারেনি শ্রমিকরা। তারা তখন খুশি।

৮ ই সেপ্টেম্বর ৬ জন মহিলা শ্রমিক সহ ৮ জন শ্রমিকের বাড়ি সন্ধ্যাবেলা সাসপেনশন-এর চিঠি যায় আর তার সাথে সাথে তাদের শোনানো হয় যে তাদের ডোমেষ্টিক ইনকয়ারী হবে। শ্রমিকরা এই সিদ্ধান্তের বিন্দুবিসর্গও জানত না। তারা সেই চিঠি না নিয়ে ফিরিয়ে দেয়।

১০ ই সেপ্টেম্বর ম্যানেজার শ্রমিকদের ডেকে জানান যে বাগান খোলার ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে ৮ জন দোষী শ্রমিক যারা ডাক্তার কে মারধোর করেছে তাদের সাসপেন্ড করা হবে আর তাদের জন্য চলবে ডোমেষ্টিক ইনকয়ারী, যদি দোষী প্রমানিত হয়, তাহলে তাদের আরো কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। এবং ম্যানেজমেন্টের এই শর্তে রাজী হয়েছে সবকটি ট্রেড ইউনিয়ন, স্বাক্ষরও করেছে তারা চুক্তিপত্রে। শ্রমিকরা এই সংবাদে হতচকিত হয়ে তারা তাৎক্ষনিক ভাবে ম্যানেজারের কাছে ৬ দিন সময় নিয়ে নেয় বিষয়টা নিয়ে সিদ্ধান্তে আসার জন্য। ম্যানেজার এই আবেদন মঞ্জুরও করেন।

তারপর শ্রমিকরা তাদের বাগানের ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের ডেকে জানতে চায় তারা এমন এক চুক্তিতে তাদের না জানিয়ে স্বাক্ষর করেছেন কেন। অপরাধ করেছে ডাক্তার আর শ্রমিকদের সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্তে নেতারা রাজী হলেন কেন। সেই মুহূর্তে তারা মিথ্যা বলে, জানায় তারা স্বাক্ষর করেনি। কিন্তু ততক্ষণে শ্রমিকরা নেতাদের আসল পরিচয় জেনে গিয়েছিল। মারমুখো শ্রমিকদের মধ্যে থেকে অন্য নেতারা পালাতে সক্ষম হলেও আইএনটিইউসি নেতা একজন পালাতে সক্ষম হয়নি। শ্রমিকরা তাকে হাতের সামনে পেয়ে মারধোর করে। ১৪ ই সেপ্টেম্বর আবার ম্যানেজমেন্ট বাগান ছেড়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়। তারপর থেকে বাগান বন্ধ।

শ্রমিকরা আদিবাসী বিকাশ পরিষদের নেতৃত্বে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রথমদিকে তারা চিঠি দেয় জেলা শাসক, লেবার কমিশনার সহ সব সরকারী আমলাদের, এই ঘটনা উল্লেখ করে। সাথে সাথে বাগান খোলার আবেদন জানায় তাদের কাছে। ৯ ই অক্টোবর জেলাশাসকের সাথে মিটিং-এ তিনি জানান ম্যানেজার বাগান খুলতে রাজি, যদি ওই ৮ জন শ্রমিক রাজি হয়ে যায় ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তে।

১৫ অক্টোবর বিডিও অফিসে বৈঠক হয় ম্যানেজমেন্ট, মহকুমা শাসক, ব্লক আধিকারিক, আর শ্রমিকদের উপস্থিতিতে। কোনো উপায় না দেখে শ্রমিকরা ওই ৮ জন শ্রমিকের সাসপেনশনের সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়াই ঠিক করে। এই মিটিং এ ম্যানেজার দাবি করে একটা চিঠি শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দিতে হবে ম্যানেজমেন্টকে যে তারা ভবিষ্যতে এমন কাজ করবেন না। নিরুপায় হয়ে শ্রমিকরা তাতেও রাজি হয়ে যায়। ঠিক হয় কালীপুজোর পর বাগান খুলে যাবে।

২২ অক্টোবর বাগান না খোলায় শ্রমিকরা মহকুমা শাসকের কাছে জানতে চান কেন তাদের বাগান খুলল না। উনি খোঁজ নিয়ে জানান যে ম্যানেজমেন্টের জেলাশাসকের কাছে শ্রমিকদের দেওয়া চিঠির একটি বিশেষ লাইন নিয়ে আপত্তি আছে। সেটা বদলে দিলেই বাগান খুলে যাবে। কি লেখা ছিল সেই লাইনটায়? লাইনটায় শ্রমিকরা সরকারী প্রশাসকের কাছে জানিয়েছিল যে এমন বেআইনি ভাবে ম্যানেজমেন্ট তাদের শোষণ করতে থাকলে ভবিষ্যতে তারা এর বিরোধ করবে। এই লাইনটা বদলানোর আবদার করে ম্যানেজার।

২৩ তারিখ শ্রমিকরা জেলাশাসকের কাছে গেলে উনিও একই কথা জানান। ওই দিনই শ্রমিকরা চিঠির সেই লাইনটি মুছে দেয়। কারণ, শ্রমিকদের বাঁচার আর কোনও পথ নেই বাগান ছাড়া। সেই বাগান বন্ধ থাকা মানে তাদের নিশ্চিত মৃত্যু। এর মধ্যে সরকারি কোনও সাহায্যও পায়নি শ্রমিকরা। ২৫ তারিখ ম্যানেজার আবার আবদার করে শ্রমিকদের একটা চিঠি দিতে হবে স্ট্যান্ডিং অর্ডার মেনে নিয়ে যে ম্যানেজমেন্টের যে সিদ্ধান্ত হবে শ্রমিকরা আর বিরোধ করবে না। এবার শ্রমিকরা আর মানতে রাজী না। মাথা নত করতে করতে তাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আর তারাও দেখতে শুরু করল যে, যত তারা মেনে নিচ্ছে ম্যানেজারের আবদার তত বাড়ছে।

এবার তারা ২৭ তারিখ একটা চিঠি জেলাশাসককে দেয় যে যদি ৭ দিনের মধ্যে বাগান না খোলে বিনা শর্তে তাহলে তারা ২রা নভেম্বর থেকে অনশন শুরু করবে। বাগান খুলল না। অনশন শুরু হল দুই তারিখ থেকে। ২৬ জন শ্রমিক অনশন শুরু করল, ৯৫২ জন শ্রমিক আর তাদের পরিবারের সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য, ম্যানেজমেন্টের অন্যায় আচরনের বিরুদ্ধে, ন্যায়ের দাবিতে।

একজন বুদ্ধিজীবীকেও দেখলাম না এদের লড়াইকে নৈতিক সমর্থন দেওয়ার জন্য এগিয়ে এল। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কেউ এল না এই আন্দোলনকারী মানুষগুলির কথা শুনতে।

৪ঠা নভেম্বর মালিকপক্ষের সাথে সরকারি প্রশাসকের উপস্থিতিতে ট্রেড ইউনিয়নের মিটিং হওয়ার কথা ছিল। সেই মিটিং-এ এসে নেতারা জানান যে তাদের একজন নেতাকে নাকি আদিবাসী বিকাশ পরিষদের সদস্যরা আটকে রেখেছে আর সেই জন্যই তারা মিটিং-এ অংশ নেবেনা। যদিও এমন ঘটনা ঘটেইনি। আর সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, যারা আন্দোলন চালাচ্ছে সেই শ্রমিকদের একবারও মিটিং-এ ডাকা হচ্ছে না। কারন তাদের অপরাধ তারা আদিবাসী বিকাশ পরিষদের সদস্য।

৬ই নভেম্বর সংবাদ আসে টি বোর্ডের কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার পর জেলাশাসক টাটার ম্যানেজমেন্ট কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন যে ৭ দিনের মধ্যে বাগান না খুলে দিলে তারা ব্যবস্থা নেবেন। শুনে একটু আশাবাদী হয়ে জানতে চাইলাম, কী ব্যবস্থা? কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে কি? জানলাম, ব্যবস্থার মানে হল, বন্ধ বাগানে যে যে সরকারি সুবিধা পাওয়া যায় সেই সব চালু করবে প্রশাসন। এই হল ব্যবস্থার নমুনা।

আমার প্রথম থেকেই আপত্তি ছিল অনশনের সিদ্ধান্তে। একেই তো মানুষগুলি ভুখা। তারা আবার ভুখ হরতাল করবে কি? সরকারের কিছু আসে যায় না ভুখা মানুষ ভুখ হরতাল করলে। আর, মালিক তো ভুখাই রেখেছে। তার তো কিছুই সমস্যা নেই শ্রমিকের ভুখ হরতালে। তবুও ওদের সিদ্ধান্ত, তাকে শ্রদ্ধা করতেই শিখেছি। তাই ওদের পথ নিয়ে সংশয় থাকলেও ওদের লড়াই এর প্রতি প্রথম থেকেই শ্রদ্ধা ছিল আমার। ৭ই নভেম্বর ভুখ হরতাল উঠে গেল জেলাশাসকের চিঠির আশ্বাসে। এর মধ্যে তিনজন মহিলা অসম্ভব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তারা হাসপাতালে। কোন ভবিষ্যতের দিকে হেটে চলেছি আমরা কে জানে।

আমি তৃণমূল কংগ্রেসের ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদেরও জানিয়ে ছিলাম ঘটনাটা। অনুরোধ করেছিলাম তারা তো আন্দোলনের ঢেউ তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গে, এই লড়াইতে অন্তত নৈতিক সমর্থনটাও তো জানাতে পারেন, তারাও সবাই নীরব। আমার পুরোনো এক বন্ধুর একটা কথা মনে এল সেই সময়, একবার আমরা জাতিসত্তার অধিকারের সমর্থনে এআইপিআরএফ থেকে একটা সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলাম। সেই সম্মেলন করার জন্য আমরা তার আগে ছাত্ররা মিলে ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে টাকা তুলতাম। মানে এক রকম ভিক্ষাই হয়ত বলা যায়। আমাদের বিষয়টা জানিয়ে টাকা চাইতাম সবার কাছে। কিছু কিছু স্থির মুখ দেখে আমাদের এক বন্ধু বলেছিল, ওরা সব পাথর হয়ে গেছে। সেই পাথরের মতই লাগল পশ্চিমবঙ্গের এই এগিয়ে থাকা, লড়াকু সংগঠনটিকেও। কারোর ওপর ভরসা আর নেই। শুধু যে শ্রমিক মানুষগুলো একটু একটু করে বুঝতে পারছে ওদের অধিকারের কথা, নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে আর সাহস করে দাবি করতে শুরু করেছে, কোথাও যেন ক্ষীণ ভরসা বেঁচে আছে এখনও ওদের ওপরেই।

October 30, 2009

মা জগদ্ধাত্রীর ছানারা এবং মধ্যমগ্রাম পুলিশ

কখনও কখনও নিজের অভিজ্ঞতাকে নিজেই বিশ্বাস করার ইচ্ছা হয়না। আজকের অভিজ্ঞতাটাও অনেকটা সেইরকম। এই সোমবার থেকে আজ শুক্রবার এই পাঁচ দিন, যেমন আগেই লিখেছিলাম, আমরা ঘুমোতে যাচ্ছিলাম এবং ঘুম থেকে উঠছিলাম জগদ্ধাত্রীর মাইকিত চীৎকারে। মধ্যমগ্রামের নাড়িভুড়ি জুড়ে ছড়ানো পূজারীদের যদি ছেড়েও দি, ঠিক সোদপুর রোডের উপরেই প্রায় গোটা কয়েক। বিশেষ করে দুটো, স্টেশনের গায়ে সুভাষপল্লীতে  এবং মধ্যমগ্রাম কালীবাড়ির গায়েই রাস্তার উপরে।

আমার এক প্রতিবেশীর ছেলের কাল কী একটা পরীক্ষা আছে, খুব চাপে ছিল পরীক্ষা নিয়ে। আজ সকালে ওর বাবা, আর কিছুতেই পেরে-না-উঠে ফোন করলেন মধ্যমগ্রাম থানায়, ২৫৩৮৩২৯৪ নম্বরে। আমি সরাসরি শুনিনি, কিন্তু উনি যা বললেন, যে অফিসারটি ধরেন, তিনি খুব অবাক হয়ে বলেন, কই কেউ তো কিছু জানায়নি আমাদের। এবং এই ফোনটা হয় আটটার দু-পাঁচ মিনিট আগে। এর মিনিট চল্লিশেকের ভিতরই দুটো পুজোর মাইকই বন্ধ হয়ে যায়। এবং এখনও, এই বেলা সওয়া এগারোটা অব্দিও আর শোনা যাচ্ছে না। এবং সকালে নিজের ঘরে বসে, জানলা দরজা বন্ধ না-করেই লেখাপড়া করা গেল এতক্ষণ। মধ্যমগ্রামের নিরিখে এ প্রায় অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা।

জয়টা কার দেব, মা জগদ্ধাত্রীর, নাকি মধ্যমগ্রাম পুলিশের?

October 29, 2009

মধ্যমগ্রামের শেষহীন পুজো এবং জলপাইগুড়ির টাটা চা-বাগান

মধ্যমগ্রামের পুজো শেষ হয়না। কালীপুজো যেতে-না-যেতেই, গত কয়েকদিন যাবত ফের আমরা মাইকরবে ঘুমিয়ে পড়ি, মাইকরবে জাগি, কারণ জগদ্ধাত্রী — সেটা চলছে, চলতেই থাকছে। নানা জায়গায়। প্রচুর। তার সঙ্গে বাজি তো আছেই। আমাদের বাড়ি থেকে নিকটতম জগদ্ধাত্রীটা হল মধ্যমগ্রাম বড়রাস্তা, মানে সোদপুর রোডের উপর, ঠিক কালীবাড়ির পাশে। গতকাল সকালে রু-এর সঙ্গে বেরিয়েছিলাম, পল্লীশ্রী বলে একটা মাঠ আছে, সেটায় গিয়ে এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াতে ও খুব পছন্দ করে, খোলা জায়গা তো আর নেই, গোটা মধ্যমগ্রামটাই একটা বিস্তৃত বস্তি এলাকা হয়ে গিয়েছে — মাঠে গিয়ে বসতেও পারলাম না, জগদ্ধাত্রীর বাচ্চাকাচ্চাদের মাইকের গুঁতোয়, সেখান থেকে বেরিয়ে বিটি-কলেজের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম, পরপর পুজো, দোকানে গিয়ে জিনিসের নাম বলা যাচ্ছে না এত জোরে মাইক। তারপর বিটি-কলেজ থেকে নিউব্যারাকপুরে ঢুকে হাঁটতে হাঁটতে ফিরলাম, নিউব্যারাকপুরে এই নিপীড়নটা বোধহয় কিঞ্চিত কম — কে জানে।

বিস্ময়কর লাগে। মাঝেমাঝে মনে হয়, আমাদের এই এলাকাটা কি ব্রহ্মাণ্ড থেকে বাইরে? মানুষের কোনও দুশ্চিন্তা নেই, কাজ নেই, ব্যস্ততা নেই? শুধু পুজো আছে? গান আর মাইক আর প্যান্ডেল?

সদ্য একটা মেল এসেছে, আমার এক পুরোনো ছাত্রীর কাছ থেকে, শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস, সবাই ডাকে বুড়িয়া বলে। ওরা জলপাইগুড়িতে চা-বাগান নিয়ে এনজিও করেছে। ওখানের চা-বাগানের শ্রমিকদের নিয়ে খুব খাটছে। কম্পিউটার নিয়ে ওদের যা যা দরকার সেগুলো করে দেওয়ার চেষ্টা করি, সেইজন্যে এক ধরণের একটা সক্রিয় যোগাযোগও আছে। ওর চিঠিটা পড়ে মনে হচ্ছিল, সত্যিই তো, কতটা দূরে জলপাইগুড়ি, একই তো পশ্চিমবঙ্গ, তাও কোনওমতেই তো আমাদের মাইক বাজিয়ে গান শোনা বন্ধ হয় না?

বুড়িয়ার চিঠির বিষয়-লাইন ছিল, ‘টাটা গার্ডেন রিপোর্ট’, ওর চিঠি থেকেই উদ্ধৃতি দিই:

“… তোমাকে এই রিপোর্ট টা দিচ্ছি, কারন তুমি তোমার ব্লগে এটাকে নিয়ে লিখতে পারবে। টাটা কি ভয়ানক ভালো তার প্রমাণ থাকবে এতে। সিঙ্গুর নিয়ে যারা টাটা কে প্রায় সমাজসেবী বানিয়ে ফেলেছিল, তাদের জন্য এটা ভালো একটা উদাহরণ হতে পারে। …”

এর সঙ্গে রিপোর্টা সংযুক্ত করা, সেটা ইংরিজিতে। আইইউএফ বা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ ফুড ওয়ার্কার্স-এর জন্য তৈরি করা, তার একটা আলগা অনুবাদ এইরকম:

সংযুক্ত সংস্থা (অ্যামালগামেটেড কোম্পানি) — ‘টাটা টি’ সংস্থার একটি বাগানের রিপোর্ট

ন্যাওড়ানদী চা বাগান, একটি সংযুক্ত সংস্থা — টাটা টি-র একটি বাগান, তাকে ভগবানের নামে ছেড়ে দিয়েছে তার কর্তৃপক্ষ। অনেককাল হল, কোনওমতেই ওখানের কোনও শ্রমিক অসুস্থ হয় না, অসুস্থ হওয়ার সুযোগই পায় না — ওখানকার ডাক্তার কাউকে অসুস্থতার সার্টিফিকেট দিতে নারাজ, তাই তারা অসুস্থতার ছুটিও পায় না। তাদের শরীরের অবস্থা যাই হোক, কাজ করতে বাধ্য করা হয় তাদের। আট মাসের গর্ভবতী আরতি ওরাওঁ হাসপাতালে গিয়ে অসুস্থতা এবং মাতৃত্বের ছুটির আবেদন জানালেও সেই একই প্রতিক্রিয়া হয়েছিল ডাক্তারের। ডাক্তার তাকে ছুটি প্রত্যাখ্যান করে এবং কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করে। চূড়ান্ত গর্ভের বেদনা ওঠার পর, কাজের জায়গাতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে আরতি, এবং বাগান থেকে অ্যাম্বুলান্স দিতে নারাজ হওয়ায় সেই প্রসূতিকে ট্রাক্টরে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ব্লক হাসপাতালে। এর পরে শ্রমিকরা গিয়ে ডাক্তারের কাছে ন্যায়ের দাবি জানালে ডাক্তার কোনও উত্তর না দিয়েই পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম করে, এবং ক্রুদ্ধ শ্রমিকরা তাকে মারধোর করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাগানের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ চা বাগান ছেড়ে চলে যায়। কয়েকদিন বাদে ফের খোলে বাগান, আদিবাসী-বিকাশ-পরিষদের হস্তক্ষেপের পর, কিন্তু খোলার সঙ্গে সঙ্গেই বাগান কর্তৃপক্ষ সেই আটজন শ্রমিককে ছাঁটাই করে দিতে চায় যারা ওই ঘটনায় গলা তুলেছিল। সমস্ত শ্রমিকরা মিলে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে। এতে কর্তৃপক্ষ ফের বাগান ছেড়ে চলে যায়। এবং, শ্রমিকদের কথা অনুযায়ী, শ্রমিকদের মূল যে দুটি সংগঠন, সিআইটিইউ এবং আইএনটিইউসি, তারা গোটা সময়টাই নেপথ্যে রয়ে যায় এবং গোপনে কর্তৃপক্ষকেই সাহায্য করে। এবং কর্তৃপক্ষ যখন ওই আট শ্রমিককে ছাঁটাই করাটা বাগান খোলার একটা শর্ত করে তোলে সেই শর্ত এরা মেনেও নেয়। শ্রমিকরা এই শর্ত মেনে নেয়নি — তাদের যুক্তি এই যে, শুধু ওই আট জনের নয়, আপত্তিটা তাদের সকলের, প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিল তারা সবাই মিলে। বাগান তাই আজও বন্ধ, এই শ্রমিকেরা তাদের বোনাস পায়নি, এক সপ্তাহের মজুরিও বকেয়া আছে। আমরা এখানে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি, সাক্ষাতকারও নিয়েছি। …

October 20, 2009

ফাংশন মধ্যমগ্রামে, নিউব্যারাকপুরে

এই নামের আগের ব্লগটারই একটা সংযোজন এটা। বাজির আর মাইকের আওয়াজে অতিষ্ঠ হয়ে শুয়ে পড়েছিলাম ঘুমের ওষুধ খেয়ে। রাত বারোটা নাগাদ ফোন এল আমার ওই ছাত্রের। একটু দেখা যাবে, নিউব্যারাকপুর থানার ফোন নম্বর খুঁজে পাওয়া যায় কিনা। ওর চার বছরের মেয়ে খাটের তলায় ঢুকে যেতে চাইছে, এমনই বীভৎস বাজির আওয়াজ হচ্ছে। আমি বললাম, দেখি পাই কিনা। মাথায় রাখবেন, ওর ছোট মেয়েটি জন্মেছে তিরিশে সেপ্টেম্বর, মানে গত রাতে তার বয়স ছিল উনিশ দিন।

আমি ঘুম তাড়িয়ে উঠে নেটে খুঁজে, যতদূর সম্ভব ঠিক নম্বরটা পেলাম। ওর সেলে পর পর দুবার ফোন করলাম। বেজে গেল। তৃতীয়বার পেলাম। ও বলল, আর দরকার নেই। এখন পুলিশ এলে ওরা আমার ফ্ল্যাটে এসে চড়াও হবে। ও গিয়েছিল ওদের বারণ করতে — গোটা পঁচিশেক মাতাল। ও তাদের বলেছিল, আপনারা এসে দেখে যান আমার বাচ্চাদুটোর কী অবস্থা। তাতে তারা জানায়, একটা দিন, পুজোর আনন্দের দিন — এসব হবে।

আর একটা খবরও এখানে খুব জরুরি লাগছে। আমার এক সহকর্মী, রাত নটা নাগাদ তার আওয়াজের জন্য পাগল পাগল অবস্থা, কিন্তু সে জানে, এর আগে অভিজ্ঞতা আছে উল্টোডাঙ্গা থানায় অর্থহীন ফোন করার, শেষ অব্দি সমস্ত দরজা জানলা বন্ধ করে, ভিতরে তার ডাইনিং প্লেসে এসে শুয়েছিল। এইসময় তার কাছে একটা ফোন আসে তার এক আত্মীয়র, সুদূর আজমির থেকে, রাজস্থান, দিওয়ালির গর্ভগৃহ, সে তাকে ফোনে জিগেশ করে, তোমার ওখানে এত আওয়াজ কিসের?

এরপর আমার ওই সহকর্মী, আজমিরে কোনও আওয়াজের ব্যাঘাত নেই শুনে, ফোন করে উত্তরাঞ্চলের দেরাদুনে, তার এক বন্ধুকে, এবং খুঁজে খুঁজে নম্বর বার করে, ব্যাঙ্গালোরে, এবং পাটনায়। এবং, মজার কথা, ব্যাঙ্গালোর সম্পর্কে আমি ঠিক জানিনা, কিন্তু আর প্রত্যেকটা জায়গাতেই বছরের বৃহত্তম একটা উৎসব দিওয়ালি। সেখানে কোনও ব্যাঘাত নেই।

আর আমাদের আছে। এমনকি দিওয়ালির দুই দিন পরেও।

আমার ওই ছাত্রটি আমায় ফোন শেষ করার আগে বলেছিল, জানো, এটা এখন আমাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব, আমাদের শান্তিটা বাঁচানো। নইলে আর বাঁচা যাবে না।

আমি আর জানিনা, বুঝতে পারিনা, কী রাজনীতি, কোনটা রাজনৈতিক দায়িত্ব। একটা সময় রাজনীতি নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম, তার পরে দেখলাম সেই রাজনীতি কী ভাবে দানব আর পিশাচের জন্ম দেয়। কিন্তু এটাও তো ঠিক, কিছু একটা না করলে আর বাঁচা যাচ্ছে না। বস্তুতই, শব্দ ও আওয়াজ তো এমন জিনিস যা ঘরের অন্দরে ঢুকে আক্রমণ করে, আলো নয় যে অন্যদিকে তাকালে তার থেকে বাঁচতে পারব, ঘরের অন্দরতম বিন্দুতে এসে অব্দি বাঁচা যায় না। অন্দর বলেই আর কিছু থাকে না। এইজন্যেই বোধহয়, উৎসবের নামে এই নিপীড়ন যারা চালায়, তাদের কাছে আওয়াজটা এত জরুরি অঙ্গ। কিছু একটা করা দরকার বোধহয়, সত্যিই, কিন্তু কী করার আছে আমি জানিনা।

October 19, 2009

পুজোর ব্লগ — সংযোজন ১

এটাই পুজোর ব্লগের শেষ লেখা। এমনটাই মনে হচ্ছে। কারণ কাল থেকে প্রবল কাজের চাপ। লেখার কাজ যতটুকু এগিয়েছে তার থেকে অনেকটা বেশি এগোনোর দরকার ছিল। তাই আর সময়ও হবে না। আজই শেষ এক টুকরো অবসর এই বকেয়া বিষয়টা শেষ করার। আমি কী দেখলাম এই বছরের পুজোর, বা, যেমন আগেই লিখেছি, আগে তো পুজোর অংশ হইনি কখনওই, এমনকি পুজোর দর্শক হিসাবেও নয়, তাই আসলে পুজো ব্যাপারটাই আমি কী দেখলাম। আসলে আমি কিছুই দেখিনি — মানে, দেখেছি অনেক শূন্যতা, আর শূন্যতা তো দেখা যায় না।

উল্টোদিক দিয়ে শুরু করা যাক। আজ সন্ধ্যাবেলা ফিরে এলাম কালীপুজোর দিনগুলো এক আত্মীয়বাড়িতে কাটিয়ে। ফিরে এসেই, মধ্যমগ্রাম স্টেশনে নেমেই পেলাম গাঁক গাঁক করে মাইকের আওয়াজ। তার পরে পাড়ায় ফিরে। শনিবার গেছে পুজো, আজ সোমবার, আজও বিরাট দাপটে ও গতিতে চলছে মাইক ও বাজি। এই কথা বোধহয় সকলেই কমবেশি বুঝতে পারছে এবার, সব এলাকারই, মানু আমায় বলল, খবরের কাগজেও লিখেছে।

আমার কলেজের এক সহকর্মী ফোন করেছিল। ওর বাড়ির কাছেই বস্তি, ও থাকে একটা সরকারি আবাসনে, সেটার মধ্যে কোনও পুজো হয়না, কিন্তু পিছনের বস্তিতে হয়। ওরও খুব আওয়াজে কষ্ট হয়, এইগুলো নিয়ে তাই অনেক কথাও হয়। আজও হল। শনিবার থেকে আজ পর্যন্ত, ও আমায় বলল, জানো দীপঙ্করদা, কোনও বাড়িয়ে বলছি না, অন্তত পঞ্চাশবার একটা সিডি চলেছে, আমার ফ্ল্যাটের থেকে ফুট কুড়ি গজের মধ্যে মাইক, তাই গোটা গানটা আমার মুখস্থ হয়ে গেছে। আমায় গানের কথাগুলোও বলল ও, আমি এখন লিখতে গিয়ে দেখছি ভুলে গেছি, ‘ও ফুলির মা, ফুলিকে বলো না, সবার সঙ্গে ডেট মারে, আমাকে আর দেখে না’ — ইত্যাদি। শ্রমজীবী মানুষের সংস্কৃতি তো — তাই বোধহয় একটু অপরিচিত গান। আমি ওকে জানালাম, ওই একই অবস্থা সব ধরণের জীব ও জীবীদেরই, ‘পরান যায় জ্বলিয়া রে’ আমাদের পাড়ায় চলছিল। এবং যে গানই চলুক, যাই চলুক, মন্ত্র বা গান বা গোষ্ঠীর পিণ্ডদান, সব কিছুতেই একই অবস্থা।

আমার এই সহকর্মীও নিজে অনেকের সঙ্গে কথা বলেছে, এই সব নিয়ে। ও একটা মজার জিনিসও জানাল, আগে সচরাচর অবাঙালীদের দিওয়ালি বাঙালী কালীপুজোর পরের দিন হত, কিন্তু এবারে একই দিনে পড়েছে, তাও বাজি ও আওয়াজ দুদিন ধরেই, আজ তৃতীয় দিনও চলছে, বাঙালীর উৎসব ক্রমে বেড়ে যাচ্ছে। আমি জিগেশ করলাম, তোকে লোকে কী বলল। ও বলল, জানো, অনেকেই বলল, একটা ফেস্টিভাল, সেলিব্রেট তো করবেই লোকে।

আমাকে প্রথমে আকৃষ্ট করল শব্দ দুটো। ফেস্টিভাল ও সেলিব্রেট। কথা হচ্ছে পুজো নিয়ে। পুজোর ধর্মের জায়গাটা যদি ছেড়েও দিই, সেখানে উৎসব নয়, ফেস্টিভাল। দ্বিতীয় শব্দটা প্রথম খুব চালু হতে দেখেছিলাম মদ্যপানের জন্য যুক্তি হিসাবে। এবং সেই ধারণাটাও এমন যে, আমার ছোটবেলায় যে বাঙালী অস্তিত্ত্ব আমি চিনতাম, তার জানা-বোঝার পরিসর দিয়ে বোঝা যায় না। ফেস্টিভালও তাই। আমি যে আমার ইতিহাসকে জানি সেখানে এটা সতত সঞ্চরমান শব্দ ছিল না। একটা আমদানি। আমদানি তো তাই যা মূল অবস্থানে নেই এমন কিছু বাইরে থেকে আনা।

আমি ওকে বললাম, এই জায়গাটাই আমাকে অবাক করে, সেলিব্রেট করতে হবে কেন আলাদা করে? যদি আনন্দ থাকে, তা তো স্বপ্রকাশ হবেই। আনন্দ যদি থাকে, তবে তো নিজের বউয়ের সঙ্গে বারান্দায় বসে চা খাওয়াও তো চূড়ান্ত আনন্দিত অবস্থাকে হাজির করতেই পারে। এটা কারুর ক্ষেত্রে কখনও মদ্যপানকে আনতে পারে, বাজিকেও আনতে পারে, গানকেও নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু মূলটা কোথায়? আনন্দে। আর তাই যদি হয়, তাহলে বিশেষ কোনও কিছু একটাকে প্রয়োজন হবেই কেন? তার মানে প্রয়োজনটা ওই জিনিসগুলোরই। আনন্দটাকে একটা বক্তব্য, একটা উপস্থাপনযোগ্য যুক্তি হিসাবে হাজির করছি আমরা। ও আমার এই যুক্তিটাকে সমর্থন করল। ও নিজে কিছুদিন আগে একটা মানসিক মন্দার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। সেই সময়কার কথা মনে পড়িয়ে বলল, মনে নেই, ওই সময় আমি কেমন ছুতো খুঁজতে থাকতাম, যাই পেতাম তাই নিয়ে কখনো মাল্টিপ্লেক্স কখনো মল — এই সব করে বেড়াতাম।

একটু পিছোই। গত তিন চার দিন, কালীপুজোটা যেখানে কাটালাম — আমার এক আত্মীয় বাড়ি। সেখানে নানা অতিথি অভ্যাগতদের সঙ্গে, বা কখনও আমরাও গেছি কারুর কারুর বাড়ি বা কোথাও, অনেকটা সময় কাটালাম। কী দেখলাম?

পুজো উপলক্ষেও একটা প্রতিযোগিতা। যার চূড়ান্ত ভাঁড় উদাহরণটা হল, একটি পুজোর মন্ডপে কুড়ি সেকেন্ডে সর্বোচ্চসংখ্যক ফুচকা খাওয়ার প্রতিযোগিতা। এক, যদি কারুর মধ্যে ন্যূনতম ধর্মীয় অনুভূতিও থাকে, যেমনটা আমি দেখেছি আমার এক মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি, বীরভূমে, বাহিরি গ্রামে, শান্তিনিকেতনের কাছেই,  কালীপুজোয়, সমস্ত মানুষ সামগ্রিক ভাবে যেন এক ভরগ্রস্ততায় চলে যেত, ঢোল বাজছে, কাঁসর বাজছে, সবচেয়ে বড় কথা, মানুষগুলোর চোখগুলোই বদলে গেছে সেই মধ্যরাত্রে, এ আমি নিজে দেখেছি, সেই ধর্মীয় অনুভূতির খণ্ডমাত্রও যদি থাকত, তার কাছে তো এই গোটাটাই আপত্তিকর লাগত। আমায় যদি কেউ জীবনানন্দের জন্মদিনে ফুচকার প্রতিযোগিতায় নামতে বলে আমার যেমন লাগবে।

আমি সেই ধর্মীয় বাতাবরণের পক্ষে কথা বলছি না। আমি মোটেও পক্ষে নেই তার। সেই বলি, সেই রক্ত, সেই উন্মত্ততা। কিন্তু কথাটা হল এই যে, সেটা ভিন্ন। তার মানে ধর্মীয় অনুভূতি থেকে এটা ঘটছে না। তাহলে কী থেকে ঘটছে? আবার আমরা ফিরে এলাম সেই একই জায়গায় — আনন্দের বেলাতেও যেমন — শরীরটা লোপাট হয়ে গেছে, কিন্তু তার জ্বর হচ্ছে, হিসি পাচ্ছে, কপকপ করে খাচ্ছে।একটা শূন্যতা। আর তাকে ঘিরে আছে প্রচুর পূর্ণতার চিহ্ন।

এই চিহ্নগুলো আসছে কোথা থেকে আমরা গোটাটাই চিনি, আমি যে টিভি দেখি না, সেই আমিও, কোথাও গিয়ে টিভি বন্ধ করার আগের সময়টুকুতে, বা, কিছুতেই বন্ধ করায়, যতটুকু যতটুকু দেখে ফেলি, তাতেই দেখেছি, এবম্বিধ নানা প্রতিযোগিতা। এমনকি তা বাংলা সংস্কৃতি রক্ষার তাগিদেও — রসগোল্লা খাওয়ার প্রতিযোগিতা।

প্রতিযোগিতা শুধু ফুচকাতেই নয়। বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয়দের মধ্যেও। একজন কেউ কারমেল নিয়ে কিছু বলল তো আর একজনের তাতে প্রতিক্রিয়া হল, কারণ তার ছানা পড়ে কারমেলে নয়, এবং অন্য কোনও নিকটাত্মীয়ের ছানা পড়ে কারমেলে। এই ছানাদের এবং ছানাদের বাবামায়েদের প্রতিযোগিতা নানা কিছুতেই — পুজোয় কার কী পোষাক হল, কতটা মহার্ঘ, কোন রেস্টোরেন্টে, কতটা কুলীন, কারা কোথায় গিয়েছে। ইত্যাদি। কতকগুলি ব্রান্ডের মধ্যেকার প্রতিযোগিতা, যার শিকার হচ্ছে কিছু লোক যারা মনে করছে যে তারা পুজোয় আনন্দ পাচ্ছে। একটা কথা ঠিক, কিছু কিছু ছানাদের, সবকিছুর ভিতরই, আমি প্রবল উত্তেজিত হতে, আনন্দ পেতে, এবং পাগলামো করতে দেখেছি। কিন্তু সেই কথায় আমি একটু পরে আসছি। ওটা আরও একটু পিছিয়ে।

আমাদের পাড়ার ভাসানে গিয়ে, অন্য অনেক কিছুই দেখেছি, তার কিছু তো আগেই লিখেছি। আরও একটা জিনিস উল্লেখ করি এই প্রসঙ্গে। সেই মিছিলে, সে এক মহামিছিল হয়ে গিয়েছিল, এলাকার প্রচুর পুজোর ভাসানের মিছিলের সমান্তরাল এবং সমমুহূর্তিক উপস্থিতিতে। সেখানে আমার এক পরিচিত মহিলাকে আমি বারবার নেচে উঠতে দেখলাম। তাঁকে, তাঁর স্বামীকে, তাঁর সন্তানদেরও চিনি আমি। তার পারিবারিক অবস্থানটাও জানি, অত্যন্ত গড় একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের আর পাঁচজনের মত। একটু রূঢ়ভাষী, এছাড়া আর কোনও পরিলক্ষ্যনীয়তা তাঁর ভিতরে আমি কখনও নজর করিনি। মহিলাটি এবং তার ছেলেমেয়েরা ওই একই মিছিলেই ছিলেন, আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। সেই নাচটায়, যেমন হয়, আর প্রায় কিছুই ছিল না সঙ্গমমুদ্রা ছাড়া, যে কোনও ফিল্মের নাচগান, টিভিতে যা দেখায়, সেগুলোয় যা দেখা যায়। এবং মাঝেমাঝেই তিনি হাতের ভুঁইপটকা মাটিতে আছড়ে ফেলে ফাটাচ্ছিলেন। গোটাটায়, ওনার সমস্ত ভঙ্গীগুলো মিলিয়ে, ছিল একটা সাবভারশন। সঙ্গতকে ফাটিয়ে ফেলে বেরিয়ে আসা নিরুদ্ধ সত্তার স্ফোরণ। সেটা আমার মজাই লাগছিল। এটাই আনন্দ? বোধহয় আমার এবারের এই গোটা পুজো অভিজ্ঞতায় এটাই আমার বয়স্কদের স্তরে একমাত্র খুঁজে পাওয়া।

বাচ্চাদের কথায় ফিরে যাওয়া যাক। নবমীর দিনে আমার এক পুরোনো ছাত্রী, এখন বন্ধু, ফোন করেছিল। কী গো, কী করছ? আমি বললাম, তুই কী করছিস? বলল, জানো আমি শুধু বকা খাচ্ছি সবার কাছে। আমি বললাম, কেন, কী করেছিস? ও বলল, আমি করিনি, আমার মেয়ে করেছে। মানে, বকছে আমাকেই। আমি বললাম, কী হয়েছে। বলল, দেখো না, মেয়ের তো প্রবল ফূর্তি, শুধুই লাফাচ্ছে। আর আজ যা গুমোট, পাগলের মত ঘামছে, সন্ধ্যা থেকেই চার বার জামা বদলেছি। ঘটনাটা এই যে, সুন্দর সুসজ্জিত করে রেখে না দিয়ে ও কেন ওর মেয়েকে ওরকম লাফাতে দিচ্ছে এটা নিয়েই অন্যদের আপত্তি। ওর ন-বছরের মেয়েকে ও কেন সেই রকম সাজিয়ে রেখে দেবে না ও যেমন ওরা তাদের বাচ্চাদের রেখেছে।

আবার আমরা সেই একই জায়গায় ফিরে এলাম। আনন্দে মানুষ সাজে, সেই চিহ্নটা থাকলেই চলবে, আনন্দকে বরং মেরে দাও। ওকে আমি কী বললাম সেটা বরং পরে বলছি। তার আগে একদম পিছিয়ে যাই, সেই সপ্তমীর দিনে আমাদের পুজো ও ঠাকুর দেখতে গাড়ি চড়ে কলকাতায় যাওয়া এবং অ্যাম্বারে খেতে যাওয়ার গল্পে।

লিখতে গিয়ে যেটা খুব উল্লেখনীয় লাগছে প্রথমেই সেটা হল রাস্তায় জমে যাওয়া জ্যামে অজস্র যানের এবং যানের লোকেদের মধ্যে কী ভয়ঙ্কর নীচতা। একটি গাড়ির ভিতর একটি বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তার গাড়ির লোক যখন তাদের গাড়িটা একটু পাশ কাটিয়ে বার করে নিতে চাইলেন, তখন অন্যান্যদের প্রতিক্রিয়া দেখলাম। একজন বললেন, বোসপুকুরের পুজোর এখানে এসেই অসুস্থ হয়ে পড়ল — ইত্যাদি। হতেই পারে যে ওটা সত্যি নয়, কিন্তু সত্যি কিনা জানিনা এই অবস্থায় এই পরিস্থিতিতে মানুষ কী আপত্তি করে? তার চেয়েও বড় কথা, কোনও আনন্দিত মানুষ? আনন্দে থাকাকালীন তার ঔদার্য তো বরং বাড়ার কথা? আমাদের নিজেদের গাড়ি নেই। আর গাড়িতে বা ট্যাক্সিতে চড়াটা আমার ঘটে নমাসে ছমাসে, তাই গাড়ি-আসীন মানুষের মানুষের জায়গা থেকে এই ঘটনার স্বাভাবিকতা বা অস্বাভাবিকতা কতটা তা আমি জানিনা।

(বাজির শব্দে রু কেঁপে ও কেঁদে ওঠার পর ওকে কম্পিউটারে সিনেমা চালিয়ে দিতে হল, তাই লেখায় এখানে একটু থামতে হয়েছিল।)

তারপরে দেখলাম, মানুষ খাচ্ছে। কী পরিমাণ যে মানুষ খেতে পারে, অবলীলায়, তার ধারণাটাই আমার বদলে গেছে ওই দিনের পর। কী একটা ঘোরগ্রস্তের মত মানুষ খাচ্ছে। আমি কোনওদিন বিদেশে যাইনি। আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয় ইউরোপ আমেরিকায় উৎসবের সময় খাদক মানচিত্রটা ঠিক কী দাঁড়ায়। কারণ, আমার নিজর বিশ্বাস, সেদিন সেই উচ্চ মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত মানুষগুলোর মুখে হাতে চামচে প্লেটে আমি একটা তৃতীয় বিশ্বের দুর্ভিক্ষতাড়িত বুভুক্ষা দেখতে পাচ্ছিলাম। যেন টিভিতে একটু আগেই দেখে এসেছে মধ্যপ্রদেশের গোণ্ডরা কী ভাবে না খেতে পেয়ে মারা গেছে, এবং সেই স্মৃতি থেকে এরা সব খেয়ে যাচ্ছে।

খাওয়া নামক ক্রিয়ার সেই অঘোষিত প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আর একটা প্রতিযোগিতা দেখছিলাম, পোষাকের ও শরীরের প্রদর্শনীর প্রতিযোগিতা। হয়ত একটা মানেই অন্যটা। আবার সেই বুভুক্ষা। এবার খাদ্যের নয়, কামের।

আনন্দ কই?

খুব আনন্দিত অবস্থা মানে তো অভিলাষের পরিপূর্ণতার আরাম। এর এ তো শুধু অভিলাষের ও বাসনার আরও আরও অপরিপূরণ। তাহলে আনন্দ কোথায়?

আমার সেই ছাত্রীকে যা বলেছিলাম, সেটা দিয়েই শেষ করি, আরও অনেকটা লেখার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু শেষহীন এই শব্দবাজি ও মাইকের অত্যাচারে শুধু রু না, আমিও কেঁপে উঠছি বারবার, এবং ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। আমি ওকে বললাম, তোর কী ধারণা, পুজো কেন হয়? ও বলল, কেন আবার হয়, পুজো তো হয়েই আসছে। আমি ওকে বললাম, না, পুজো হয় মিডিয়ার জন্যে। মিডিয়া প্রচার করে, আর এই মানুষগুলো এত শূন্য যে, সেই প্রচারের পরে এরা বিশ্বাস করে নেয় যে, এই এই এই … ক্রিয়াই হল আনন্দ। এই এই জিনিস কেনা, খাওয়া, পরা ইত্যাদি। তখন তারা তাই করতে থাকে, এবং এই কুসংস্কারে বিশ্বাস করে নেয় যে তারা আনন্দ পাচ্ছে। তখন, ফলত, সবাই একই জিনিস বিশ্বাস করে নেওয়ায়, সেটাই আনন্দ হয়ে দাঁড়ায়। একমাত্র যে ক্রিয়াটা এই গোটাটায় তা হল আরও আরও বিক্রি। বাজির, মাইকের, খাবারের, পোষাকের, প্রসাধনের। আমি টিভি দেখলে মিলিয়ে মিলিয়ে বলতে পারতাম, কী কী বিজ্ঞাপনে কোন কোন জিনিস আসে। খেয়াল রাখিস, সংবাদ মানেও কিন্তু বিজ্ঞাপন, ‘সংবাদ’ নামের বিজ্ঞাপন, ‘অনুষ্ঠান’ নামের বিজ্ঞাপন, এবং ‘বিজ্ঞাপন’ নামের বিজ্ঞাপন।

সঙ্কর্ষণ লিখেছিল, জয় হো সিরিজে কিছু লেখা উচিত।

জয় হো মানুষের পুজোর আনন্দের।

(খুব দ্রুত টাইপ করেছি, প্রচুর টাইপত্রুটি থাকার কথা, কিন্তু আমি আর এখন দেখতে পারছি না, বড্ড ক্লান্ত লাগছে।)

October 11, 2009

পুজোর ব্লগ — সংযোজন

সুস্মিত বলেছিল পুজোর ব্লগ লিখতে। হয়নি। লেখা শুরু করে হাজিপাজি লিখতে শুরু করেছিলাম। আজ লিখি, লেখার একটা কারণ এল।

আজ গেছিলাম আড়িয়াদহে, আমার বন্ধু সুমিতা ও মধুসূদনের মেয়ে তিতাসের জন্মদিনে। আমি কোথাও যাইনা বলে বিশ্বপৃথিবীর সবাই আমাকে গালাগাল দেয়, নিজের ঘরে নিজের কম্পিউটারের সামনে পড়ে থাকি। তাই মাঝেসাঝে, মানে মাঝে-বছর-দুয়েক-অন্তর-সাঝে, এরকম হঠাৎ করে কোথাও গিয়ে পড়ি, গিয়ে সততই নিজেকে বেশ উজবুকের মত লাগে, কেন গেছি এর কোনও কারণ খুঁজে পাই না, কেন কথা বলছি, বা তার চেয়েও ভয়ঙ্কর, ঠিক কী বলছি সেটা নিজেই ভাল বুঝে উঠতে পারি না। আমার ভিড় ভাল লাগে না, সে আলাদা করে ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দসই লোকের ভিড় হলেও, কেমন দম আটকে আসে। জোর করে তেঁতো ওষুধ গিলছি এমনটা লাগে। কিন্তু, তাও, মাঝে সাঝে … ইত্যাদি।

ঠিক এটাই হচ্ছিল আমার দশমীর দিনও।পাড়ার সবাই তখন ঠাকুর তুলছেপরপর পাঁচটা ভ্যানে। সঙ্গে লাইট ইত্যাদি লাগিয়ে বিসর্জনে যাবে। কৌশিক, আমাদের পাড়ার ছেলে, আগেই একদিন গল্পসূত্রে বলেছিল, ঠাকুর বিসর্জনের আগে ওর কান্না এসে যায়, সেদিনও দেখছিলাম, ওর চোখ বদলে গেল। ওর, এবং আরও দুজনের, অনুভব করতে পারছিলাম। সরাসরি কেউ কাঁদছে না, কিন্তু বেশ গভীর একটা মন-খারাপ হচ্ছে। আমার এটা হচ্ছিল না, এবং হচ্ছিল না বলে একটা খারাপ লাগা তৈরি হচ্ছিল, যেন সবার মত আমারও এটা হওয়া উচিত, কিন্তু হচ্ছিল না এটাই সত্যি। আমি বারবার তখন প্রতিমা তুলে ফেলা ফাঁকা মণ্ডপটা দেখছিলাম, বরং, সত্য অর্থেই, খুব গোপনে আমার বোধহয় একটা আরামই হচ্ছিল: যাক মাইকটাও তো বন্ধ হল। তখনও, সেই ঠাকুর তুলে ফেলার মুহূর্তেও পাড়ার ছোট ছেলেরা এসে চালিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল, ‘বাবা আমার কি বিয়ে হবে না–’ ইত্যাদি। খুবই বিশ্রী লাগছিল, কিন্তু কিছু বলতে পারছিলাম না, এই মানুষগুলোকে, এই সমবায়টাকে এত কম চিনি, কোনটুকু বলা যায়, কোনটুকু যায় না, সেটাতেই নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। আর যেহেতু এক সময় রাজনীতিটা সত্যিই সবচেয়ে জরুরি কাজ হিসাবে করেছি, অনেকগুলো বছর একটানা, তাই এটুকু অন্তত বুঝি, এরকম কিছু দাগ সদাসর্বদাই থাকে, কোনটুকু করা যায়, কোনটুকু যায় না। শেষে পাড়ারই এক দিদি, তিনি প্রায় বছর ষাটেক, তিনি অত্যন্ত পুজোসক্রিয়, তাই এই সমবায়ের খুব কেন্দ্রীয় অবস্থানেই আছেন, বলা যায়, তিনি গানগুলোয় বিরক্তি প্রকাশ করা মাত্র, ইলেকট্রিকের ছেলেটিকে বললাম, ওটা খুলে দাও।

সত্যিই তখন চারপাশে ওই বিষণ্ণতাটা ছিল। এত অস্বস্তিকর লাগছিল সেটার অংশ হয়ে উঠতে না-পারায়, যে, শেষ অব্দি আমি সমবায়টার হয়ে পরিশ্রম করতে শুরু করলাম। এটা আমার বহুযুগের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। আমাদের কিশোর-যুবক বয়সে একটা শব্দ খুব চালু ছিল: ‘আঁতেল’। এটা ছোটবেলা থেকেই খুব শুনতে হত, কারণ আমি ভিড় ও সমাগম খারাপ বাসতাম। আমার আত্মীয়স্বজন, নিকটজনদের বিয়ে জন্মদিন অন্নপ্রাশন শ্রাদ্ধ বিবাহবার্ষিকী — এই সবই খুব বিরক্তিকর লাগত। লোকজন এত সাজে, এত বানায়, এত ভণ্ডামি করে। কিন্তু এ একটা অদ্ভুত সমবায়ের ফ্যাসিজম যে সবাইকেই ওটা খুব পছন্দ করতে হবে, হবেই। আর সবাই যখন বলত, ‘আঁতেল তো তাই ও পছন্দ করে না’, সেটা হয়ত আমাকে চেয়ে আমাকে ভালবেসেই, আমাকে অনুষ্ঠানের অংশ করে নেওয়ার ইচ্ছাতেই করা একটা পরিহাস-আক্রমণ, কিন্তু পরিহাস বলে তার দাঁতে ও নখে বিষ কম থাকত না। সেটায় কেমন বিপন্ন লাগত, অসহায় লাগত। আবার এটাও ঠিক, কোনও অনুষ্ঠানে গেলেই কিছুক্ষণ পর থেকে আমার সম্মুখস্থ প্রতিটি লোকের মুখে থাবড়া মেরে চলার গোপন বাসনা চারিয়ে উঠতে থাকত। অনেক পরে, তখন এমএসসি পড়ি, আমার এক সহপাঠী দেবু বলেছিল, কোনও বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার একমাত্র মানে হয় প্রচুর গাঁজা খাওয়ার পরেই, ও নাকি একবার সেই অবস্থায় গিয়ে, ওর পাড়ারই এক মেয়ের বিয়েতে তার হবু শ্বাশুড়ির সঙ্গে দেশভাগের দুঃখে হাউহাউ করে কেঁদেছিল। এবং, এই গল্পটায় আমার সবচেয়ে উত্তেজক লেগেছিল এই জায়গাটা যে, এই ধরনের একটা কিম্ভুত ঘটনা ঘটানোর পরেও কেউই দেবুকে লাথি মেরে বার করে দেয়নি সেই বিয়েবাড়ি থেকে–এর পরেও ও অনেকবার গেছে সেই বাড়িতে–সেই ভদ্রমহিলাও, আজও, এখনও, ওকে পছন্দই করে। পুরো গল্পটা বলে দেবু আমায় বলেছিল, সেই মুহূর্তে সেটা আমার মাথাতেও ঘুরছিল, বিয়েবাড়িফাড়িতে সবাই বোধহয় গাঁজা কি সিদ্ধি খেয়ে থাকে, কেউই শালা বোঝে না কী হচ্ছে কী করছে।

তা দেবুর সেই সমাধান আমার কোনওদিনই করে দেখা হয়নি। বরং আমার গায়ের জোর আর কায়িক শ্রম করার ক্ষমতা চিরকালই গড়ের চেয়ে বেশি বলে আমি আমার পক্ষে সহজ একটা সমাধান তৈরি করে নিয়েছিলাম, অনুষ্ঠানের সঙ্গে বসবাসের। পরিবেশন কি মালপত্র টানাটানি গোছের এমন একটা কাজ নিয়ে নিতাম যা শেষ হবে না, করেই চলতে হবে, করেই চলতে হবে, তাতে ওই সাজগোজিত ন্যাকামোর আক্রমণ এবং করার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাব। পেতামও। আরও বাড়তি কিছু পেতাম। কাজের শেষে, সবকিছু মিটে যাওয়ার পর, সবাই যখন জিরোচ্ছে, বয়স্করা উল্লেখ করতেন, ওঃ, ও কিছু খেটেছে বটে, আসলে ওর কিন্তু টানটা খুব। ইত্যাদি। একটু অস্বস্তি লাগত, ঠকাচ্ছি না তো, কিন্তু ভালও লাগত, নিজেকে ওই সমবায়ের অংশ বলেও মনে হত, সেটাতে ভালও লাগত, হয়ে উঠতে ইচ্ছে করত, সেই ইচ্ছেটা করত আমার চিরকালই। আমি কোথাও ওই গোটাটার অংশ হয়ে রইলাম সেই জায়গা থেকে যত ছোট করেই হোক নিজেকে একটু অর্থপূর্ণও লাগত।

দশমীর সন্ধ্যায় আমার সেই পুরনো অভিযোজনে ফিরে গেলাম অনেকদিন পরে ফের একবার। অতগুলো প্রতিমা, দুর্গার মূলটা, আর চারটে লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক ও গনেশের, আটফুট দশফুট লম্বা সেই প্রতিমাগুলো মণ্ডপ থেকে নামিয়ে ভ্যানে সাজানোটা সত্যিই একটা প্রবল পরিশ্রম। সেটাতেই হাত লাগালাম। পাড়ার বয়স্ক একজন, পুজো সংগঠকদের একজন, আরও এখন তো আমিও বয়স্ক, বললেনও, তুমি করছ এসব, এ কী? বানিয়ে না,  বেশ সসঙ্কোচ হয়েই বললেন। আমার আবার সেই সমবায়ে ফেরার অনুভূতিটা হল। এদের বেদনার ভাগ নিতে পারছি না, হচ্ছে না আমার, কিন্তু শ্রমের ভাগ তো নেওয়াই যায়।

অনেকটা সময় লাগল সবটা হতে। ঘামে জামা বেশ ভিজেও গেল। এর মধ্যে, একটু জিরিয়ে নিতে, পাড়ার মোড়ে এসে একটা সিগারেট ধরালাম। তখন অন্য অনেক পুজোর বিসর্জনের শোভাযাত্রা বেরিয়েও গেছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেসব দেখছিলাম, সেই প্রবল আওয়াজ, কিন্তু খোলা জায়গা বলে খুব অসুবিধাও হচ্ছিল না। আর প্রচুর ঢাক বাজছিল। ঢাকের বাজনাটা আমার দেখি বেশ লাগে। এমনকি অনেকসময় শরীরেও তালটা অনুভব করতে পারি।

এই রকম সময়ে ঘটল ঘটনাটা। উল্টোদিকে বাঁদিকের লেন দিয়ে শোভাযাত্রাটা আসছে বলে একটা অটো রাস্তার বিভাজকের কাটা অংশ দিয়ে ডানদিক থেকে বাঁদিকে চলে গেল, অটোটা মধ্যমগ্রাম ইস্টিশন থেকে চৌমাথার দিকে যাচ্ছিল। শোভাযাত্রার স্বেচ্ছাসেবক যাননিয়ন্ত্রকরা তাকে বারণ করছিল হাত তুলে, সেটা না-দেখেই, বা, হয়তো, দেখার পরও অটোটা ঢুকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দুচারজন ছুটে এল, একজন অটোচালককে মারতে শুরু করল। আমি হাতের সিগারেট ফেলে রাস্তা পার হতে হতেই অটোচালকের মুখ রক্তাক্ত হয়ে গেছে, এবং শাসকদের একজনেরও। অটোচালকটি, একটু চুপচাপ ধরনের চশমা পরা গোলগাল মুখের স্বাস্থ্য ভাল একজন মানুষ, বোধহয় তার প্রতিবর্তী প্রক্রিয়াতেই ঘুষি খেতে খেতে হঠাৎই একটা পাল্টা ঘুষি মেরে বসেছে।

আমি গিয়ে একজন দুজনকে জাপটে ধরলাম। সেই মুহূর্তে, আমার মনে আছে, আমি একটা যুক্তি খুঁজছিলাম। একটা কোনও জোরালো যুক্তি, যেটা সজোরে বারবার চেঁচাতে থাকলে, একসময়, কয়েকজনের অন্তত মাথায় সেটা ঢোকে। আমার নিজের ভক্তি ব্যাপারটা অনুপস্থিত, কিন্তু এই লোকগুলোর তো আছে, একটু আগে দেখছিলাম সেটাও হয়তো মাথায় কাজ করছিল, আমি বারবার চেঁচাতে থাকলাম, আরে ভাসান ভাসান–ভাসানের দিন একটা লোকের রক্তপাত করছেন। সেই পলকটায় যে কথাটা সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে হয়েছিল আর কী। বলছিলাম, আর নিজের ভারি শরীরটা আক্রমণকারী লোকগুলো আর ড্রাইভারের মধ্যে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আর কিছু মাথায় কাজ করছিল না, শুধুমাত্র একটা মার খেতে থাকা একটা লোককে বাঁচানোর চেষ্টা। কিছুই হলনা। শেষ অব্দি ছেলেটির গলাও আমি আমার ঘাড় পিঠ বাড়িয়ে জড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কিছুই প্রায় করতে পারলাম না, নিজের সাদা ফতুয়ায় রক্ত লেগে যাওয়া ছাড়া।

এবং, সেই মুহূর্তেই আমি লক্ষ্য করছিলাম, কী ভয়ানক অনুপস্থিত কোনও জাতের কোনও ভক্তি সেই মানুষগুলোর মধ্যে। একদম ছিঁচকে মস্তান সব। প্রবল ভাবে মদ খেয়ে রয়েছে বলেই যে ভক্তিটা কাজ করছিল না তা নয়। দুই দশক ধরে মাস্টারির অভিজ্ঞতায় অন্তত ছেলেপিলেদের চোখ চিনতে কিছুটা তো শিখেছি, ওই যুক্তিটা ওদের স্পর্ষমাত্রও করেনি।

ফিরে আসার পর পাড়ার লোকে বলল, যারা আমায় মাস্টারমশাই হিসাবে চেনে, আপনি ওদের মধ্যে গেছিলেন কেন — সমস্ত ছিঁচকে বদমাইস। ওরা নাকি বঙ্কিমপল্লীর বান্ধবসমিতির, ঠিক গুন্ডা না, গুন্ডাগোছের, ওরা ওদের কাউকে কাউকে চেনেও, পাড়ার কেউ কেউ বলল।

আজ, আড়িয়াদহ থেকে এলাম সোদপুর, রু, মানু আর আমি। সেখান থেকে মধ্যমগ্রামের অটো ধরলাম। একটি কমবয়েসি ছেলে চালাচ্ছিল। তাকে জিগেশ করলাম, আচ্ছা দশমীর ভাসানের দিন একটা অটো এই রুটেই মধ্যমগ্রাম চৌমাথা যাচ্ছিল, ছেলেটি ফ্লাইওভারের সামনে মার খেয়েছিল, তার কী হল, জানো? যা জানলাম, সেই রাত থেকেই সে হাসপাতালে, ও সোদপুর স্ট্যান্ডের ছেলে, সোদপুর ইস্টিশনের ফ্লাইওভারের নিচে ওদের ইউনিয়নের অফিস থেকেই চিকিৎসার খরচ দিচ্ছে। নাকে খুব গভীর কোথাও লেগে গেছে।

আমি তার পর থেকেই অস্বাভাবিক হয়ে আছি। এতটাই, যে, ফিরে এসে মানুকে যেই বললাম, এটা ব্লগে লিখি, ও প্রায় লুফেই নিল, হ্যাঁ, লিখেই ফেল, তাতে যদি একটু স্বাভাবিক হও। আমার মাথায় বহু কিছু আসছিল, বহু কিছু, পুজো নিয়ে, ভাসানের শোভাযাত্রা নিয়ে, এবছরে পুজো দেখতে চেয়ে আমি যা যা দেখেছি, তার বহু কিছুই। কিন্তু সবচেয়ে যে জায়গাটায় আমার ঝাড়টা নামছিল, সেটা আসলে আরও অনেকটা গভীর। সেদিন, সেই মুহূর্তে, ছেলেটাকে বাঁচানোর সময়েই আমি খেয়াল করেছিলাম, বড়সড় চেহারা, একটু গোলগাল, চোখে চশমা, আমার সঙ্গে কোথাও একটা মিল আছে। আমার চেয়ে অনেক ছোট, কিন্তু বছর চল্লিশেক বয়স হবে, তার মানে, আমার কোনও ভাই থাকলে তো এরকমই হত। আজকে এটা শোনামাত্রই আমার মনে এসে গেল, আমার শিশু বয়সে বাবাদের ইস্কুলে একটা মামলা চলছিল বলে বাবা বহুবছর মাইনে পায়নি। তাও তো বাবা টিউশনি করত, তাও তো মা, যদিও তখন অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ মাইনের, একটা চাকরি করত। তার পরও নিজেদের অভাবটা মনে পড়ছিল। মনে আসছিল, ওরও হয়তো ছেলে মেয়ে আছে। তাদের মুখগুলো গজিয়ে উঠছিল মাথার ভিতর। হয়ত, এর মধ্যে যদি সময় পাই, সোদপুরের ওদের ইউনিয়ন অফিসে যাবও একদিন।

কিন্তু এটা তো পুজো, এটাও পুজো। এই ছিঁচকে বদমাইসদের পুজো, একটা কাজের লোককে অকেজো করে দেওয়ার পুজো। সেই দশমী থেকে আজ কালীপুজোর আর কয়েকদিন বাকি, বাড়ির স-আয়িক লোকটা অনায়িক হয়ে যাওয়ায় বাড়ির বাচ্চাদের অপেক্ষা করে থাকার পুজো। সুস্মিত, তোর পুজোর ব্লগ এবারও শেষ হল না। অনেক কিছু লেখার আছে রে, অনেক কিছু। কিন্তু জানিনা কবে হবে, আদৌ হবে কিনা। তবু একটু তো হল।

October 8, 2009

মধ্যমগ্রাম না হোক দোলতলা পুলিশ লাইনের পুলিশ

উল্লেখ করা হয়নি, মধ্যমগ্রামে এর মধ্যে আরও দু-দুটো প্রাণঘাতী ফাংশন গেছে। গতকাল (ইংরিজি নিয়মে বললে আজ, কারণ রাত বারোটার পরে) ছিল তৃতীয়টি।

গতকালের এই ফাংশন চলাকালীন আবার আমাদের ফোন যায় মধ্যমগ্রাম থানায়। আবার সেই একই সার্কাস। দেখুন, আমাদের মোবাইল ভ্যান তো মাত্র একটা, দেখুন আমরা যথাশীঘ্র পাঠাচ্ছি, দেখুন আমরা তো বললাম, দেখুন এরা যদি এত অসভ্য হয় আমরা কী করব, দেখুন … মানে, আসলে, দেখতেই থাকুন। বা, শুনতেই।

গতকাল আমার এক প্রতিবেশী এবং আমি সেই মধ্যরাতে নেট থেকে ফোন নম্বর খুঁজতে শুরু করলাম। উচ্চতর পর্যায়ের। তাতে ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশের একটা ওয়েবসাইট পাওয়া গেল, যোগাযোগের:

http://policewb.gov.in/wbp/othcontact/maintcindex.php

তাতে যতগুলো নম্বর যৌক্তিক বা অযৌক্তিক ভাবে আমাদের টেপনীয় বলে মনে হল, এগুলো তো ছাই বুঝিও না, যেমন ডিজি আইজিপি ২২১৪৫৪০০, ডিজি কোঅর্ডিনেশন ২২১৪৪৪৯৮, ইত্যাদি, সে সবই করলাম। কোনওটা কেউ তুললই না, অনেকগুলোয় কী অদ্ভুত বিতিকিচ্ছিরি সব যান্ত্রিক আওয়াজ হল, মানে রিংই হল না।

তারপর খোঁজা শুরু করলাম উত্তর ২৪ পরগনা দিয়ে। একটা পিডিএফ পেলাম, ফোন নম্বরের, লিংকটা হল:

http://www.north24parganas.gov.in/pegen1pol.pdf

এতে শুরুরটাই হল, এসপি উত্তর ২৪ পরগনা, শ্রী সুপ্রতিম সরকার। তার সেল নম্বর দেওয়া ৯৮৩০৫০৪৮৭০, বাজল, কেউ তুলল না। তার দুটো ল্যান্ড লাইন, ২৫৪২৩০৫৫, এবং ২৫৩৮৯২০২। এটায় ২৫৩৮ দেখে, মানে মধ্যমগ্রাম, আবার বাড়তি উৎসাহে করলাম। একজন তুললেনও। বেশ সহৃদয় গলা, তাকে মধ্যমগ্রাম থানার না-জেগে ওঠার সমস্যাটা জানানোয় তিনি আর একটা নম্বর দিলেন, বললেন সেটা দোলতলা পুলিশ লাইনের। লিখে নিলাম, দোলতলা পুলিশ লাইন, কন্ট্রোল ২৫৩৮৫৯০০।

সেখানে ফোন করায়, প্রথমে তিনি জানতে চাইলেন, এই নম্বর পেলাম কোথা থেকে? আমরা জানালাম, নেট থেকে, সুপ্রতিম সরকারের নামে দেওয়া। তিনি বেজায় ধমকালেন আমাদের, “সুপ্রতিম সরকার মোটেই এসপি নন”। আমরা সবিনয়ে বললাম, দেখুন অত তো বুঝি না, নেট থেকে যা পেয়েছি।

এরপর, বকতে বকতেই, তিনি জিগেশ করলেন, “যাক গে, সমস্যাটা কী বলুন”। তাকে জানালাম। “দেখছি” বলে ঠকাস করে তিনি ফোন নামালেন।

মজার কথা, যা একেবারেই আশা করিনি, এর দশমিনিটের মধ্যে সত্যিই সমস্ত শব্দ বন্ধ হয়ে গেল। এতটাই বিগলিত, কৃতার্থ, কৃতজ্ঞ লাগছিল যে, ভাবলাম একবার ফোন করে জানাই, আপনার ভাল হোক। তারপর ঘাবড়ে গেলাম, ফের যদি বকা খাই, সুপ্রতিম সরকার যে এসপি নন — সত্যিই তো এটা না-জানার মত অন্যায় তো আর হয় না।

আমি উপরের নম্বরগুলো এই অঞ্চলের অন্য বাসিন্দাদের প্রাণবাঁচানোর জন্যে তুলে দিলাম। এবং এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতাটাও ভাগ দিতে, যে, পুলিশ, শেষ অব্দি, কখনও কখনও, এমনকি কিছু করেও, মধ্যমগ্রামের পুলিশ না হোক, দোলতলা পুলিশ লাইনের পুলিশ।

আপনারা যারা পড়ছেন, তাদের সবার কাছে আবেদন, উত্তর ২৪ পরগনা থেকে যারা আছেন তারা বিশেষ করে, দয়া করে এই ইমেল আইডিটাও লিখে রাখুন dipankard AT gmail DOT com : আপনারা আর যারা যারা কষ্ট পাচ্ছেন শব্দের অত্যাচারে, দয়া করে এই ঠিকানায় যোগাযোগ করুন, আমরা অনেকে মিলে কিছু একটা করার পরিকল্পনা করছি। নাগরিক অধিকার সমিতি গোছের। আপনারাও কী মনে করছেন জানান।

October 2, 2009

Sound Pollution in Madhyamgram, 24 Parganas (N)

This is an appeal to you.

After two atrocious “Cultural Functions” in two adjacent localities of Madhyamgram, namely Bankimpally and Bireshpally, one elder-brotherly senior neighbour in our locality wrote this

on-line petition.

Please read this petition and sign if you consider it important enough.

আগের দুটো ব্লগ-লেখায় যা উল্লিখিত হয়েছে, মধ্যমগ্রামে সেই ফাংশনের অত্যাচার নিয়ে আমার এক দাদাপ্রতিম প্রতিবেশী একটি

অনলাইন পিটিশন লিখেছেন।

আপনারা সেটি পড়ুনএবং প্রয়োজনীয় মনে করলে তাতে সাক্ষর করুন।

October 1, 2009

ফাংশন মধ্যমগ্রামে, নিউব্যারাকপুরে

এই ব্লগে ঠিক আগের লেখাটায় যে বাচ্চা মেয়েটির কথা ছিল, বাজির আওয়াজ যে আর নিতে পারছিল না, গত পরশু রাত তিনটে অব্দি তাকে তার বাবা কোলে নিয়ে হেঁটে বেড়িয়েছে, কারণ নিউব্যারাকপুরে ওদের বাড়ির পাশেই “ফাংশন” চলছিল।

আর মধ্যমগ্রামে, বঙ্কিমপল্লীতে গতকাল রাতে চলছিল “ফাংশন”। আমার এক প্রতিবেশী দু-দুবার ফোন করেছিলেন, তাতে বারোটার পর সামান্য আওয়াজ কমেছিল।

আজ বীরেশপল্লীতে চলছে সেই একই, “ফাংশন”, আমাদের আর এক প্রতিবেশী ফোন করেছিলেন। খুবই ভদ্রভাবে পুলিশ বলেছিল, দেখছি। তখন সওয়া দশটা, এখন এগারোটা বাজে। এখনো পুলিশ দেখছে।

September 29, 2009

পুজোর ব্লগ

আমাদের নিজেদের মেলিং লিস্টে অন্য একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল। তার মধ্যে সুস্মিত লিখল, ‘দীপঙ্করদা, পুজোয় একটা ব্লগ লেখো’। আমরা সকলেই বেশ মজা পেলাম, পুজোয় চাই নতুন ব্লগ। তখন থেকেই মাথায় বিষয়টা নিজের গোচরে অগোচরেই কাজ করছিল, যেন পুজোটাকে লক্ষ্য করছিলাম, সবসময় ভাল করে নিজে না-বুঝেই।

লক্ষ্য করে চলার কিছু সুযোগও আসছিল এবার। আমিই এতটা বুড়ো, আমার বাবা-মা নিশ্চিতভাবেই আরও প্রচুরতর বুড়ো, মানু কিছুদিন ধরে বলছিল, তাদের অনেকদিন ধরে ইচ্ছে রু-এর সঙ্গে পুজোয় ঠাকুর দেখতে যাবে, আর কবে কী হবে না-হবে, সেটাও এবারেই সংগঠিত করা হয়েছিল। রু, বাবা, মা, সঙ্গে সবিতা আর পার্বতী, বহু বছর ধরে আমাদের বাড়িতে কাজ করে, মানু, আর আমি। গাড়ি করে কলকাতা যাওয়া, ঠাকুর দেখা, আর সঙ্গে, যেমন দস্তুর, বাইরে কোথাও খেতে হবে, অ্যাম্বার-এ খাওয়া।

অদ্ভুত লাগছিল নিজের এটা ভাবতে, কিন্তু এটা সত্যি, এটা সে অর্থে আমার প্রথম ঠাকুর দেখতে যাওয়া। খুব ছোটবেলায়, আমাদের ছোটবেলায়, কলোনি থেকে অভ্যস্ত মফস্বল হয়ে উঠতে চাওয়া মধ্যমগ্রামে, বা তারও আগের শিশুবয়সের নিউব্যারাকপুর, সেজেগুজে ঠাকুর দেখতে যাওয়া মণ্ডপে মণ্ডপে তখন কেবল একটু একটু চালু হচ্ছে, কোনওক্রমে টিঁকে থাকা মানুষের একটু একটু করে ক্রমসঞ্চয়মান সময় ও সারপ্লাস, একটু আধটু বোধহয় গেছিও অমন, খুব ছোটবেলার আবছা স্মৃতি ঘেঁটে মনে হচ্ছে। বা এমনও হতে পারে, ওরকমই তো হওয়ার কথা, তাই ওরকম ভেবে নিচ্ছি, অন্য ছবি দিয়ে স্মৃতির ভাঁড়ারের ফুটো মেরামত করার চেষ্টা করছি।

যেটা পুজো সংক্রান্ত স্মৃতি আমার খুব স্পষ্ট ভাবে আছে, সেটা পাঁচ ছয় নাগাদ, নিউব্যারাকপুরের স্মৃতিটা ঠিক পুজোর নয়, পুজো উপলক্ষে ব্যায়ামসমিতির করা শরীরের পেশী প্রদর্শন, আর মামাবাড়িতে, মধ্যমগ্রামের বিধানপল্লীতে, দুলুদার দোকানের সামনে ফাঁকা মাঠে পুজোর মণ্ডপে, খুবই মাঠো সব, বাঁশের বেড়ার গায়ে চটের আবরণ, তার মধ্যে তখনকার ডেকরেটরের কাঠ-পিজবোর্ডের চেয়ারে বসে আমি আর গজো, তখনকার এক সঙ্গী, একটা খেলনা পিস্তল দিয়ে মারামারি করছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য: যুদ্ধে আমিই জিতেছিলাম। ফিরে এসে আমার মামাতো ভাই লবকে সেই জয়ঘোষণায় আমার করা বাক্যটা আমার এখনও মনে আছে, গজোকে জুতো পালিশ করে দিয়েছি।

এর পরের কয়েকটা বছর জুড়ে, মেয়েদের প্রতি, উজ্জ্বল পোষাকের প্রতি আকর্ষণ ছাড়া পুজোর উৎসবের আর যে জিনিসটা মনে আছে সেটা হল মণ্ডপে বসে থাকা। আমি চিরকালই বেজায় কুঁড়ে, বসে বসে চেয়ে থাকার চেয়ে বেশি সক্রিয় কোনও ক্রিয়া আমায় আজও তেমন একটা টানে না। এই মণ্ডপে বসে থাকা, মণ্ডপের নানা, তেমন সুশ্রী নয় বিষয় আমার মাথায় রয়ে যাওয়া কাজ করেছিল ‘তপন বিশ্বাসের খিদের বত্রিশ ঘন্টা’ লেখার সময়ে। আর লেখায় ওটা চলে আসা নিয়ে বেশ অদ্ভুত এবং কুৎসিত একটা অভিজ্ঞতা আমার প্রায় ওই বয়সেই হয়েছিল। হিন্দুস্কুলে আমাদের ক্লাস সেভেনে বাংলা পড়াতেন যে মাস্টারমশাই, হঠাৎ এই লিখতে গিয়ে দেখছি তার নামটা মনে করতে পারছি না, তিনি বাংলা রচনা লিখতে দিয়েছিলেন, রথের মেলা নিয়ে। আমি সে বছরই রথের মেলায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম, কীর্তন যেখানে হচ্ছে সেই গোটাটা। সেখানের একটা উপাদান আমি রচনায় এনেছিলাম। কীর্তনের খোল বাজাচ্ছে যে লোকটা, মাড়ি আর দাঁত কালো, একটু উঁচু, কোনও নারী এসে কাছে দাঁড়ালেই তার দিকে একটু ঝুঁকে যাচ্ছে আর তার খোলের বাজনার জোরও বাড়ছে একটু। গোটাটা সত্যি, আমার এখনও ছবিটা মনে আছে, ঝাপসা ঝাপসা। কী ভাষায় লিখেছিলাম মনে নেই। আমায় ক্লাসে উনি দাঁড় করিয়ে জিগেশ করলেন এটা কী লিখেছ, রম্যরচনা? আমি শব্দটার মানে জানতাম না, এর অনেক বাদে জেনেছিলাম, এবং কী উত্তর দিয়েছিলাম তা আজ আর মনে নেই, কিন্তু উনি আমায় বেঞ্চ থেকে বার করে এনে মেরেছিলেন। আমি সেই মুহূর্তে ভারি ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে গিয়েছিলাম, এবং মার চলাকালীনই বুঝতে পারছিলাম, আমি যা-ই উত্তর দিতাম উনি বোধহয় মারতেন। এখনকার বাজারে এটা বেশ কঠিন, কিন্তু কাম বা যৌনতা নিয়ে কোনও দূরাণ্বয়ী কথাও তখন কী ভীষণ হিংস্রতা বার করে আনত। তখন সেটা বুঝিনি, লোকটা যে পাঁঠা, মজাটা বুঝল না, এটাও বুঝেছিলাম অনেকটা বাদে।

আর এর মাঝেই শুরু হয়ে গেল রাজনীতি। সেই কৈশোর বয়সেই। তখন তো তত্ত্বটত্ত্ব কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু যে লোকগুলো এলাকায় রাজনীতি করত, সিপিএম রাজনীতি, গজোর বাবা তাদের একজন, নিউব্যারাকপুরের অমূল্যজ্যাঠা আর একজন, দেশহিতৈষী নিয়ে আসত আমাদের বাড়িতে, বহুবছর জেল খাটা, দাড়িতে চুলে কিছুটা রূপকথা হয়ে ওঠা সুরেশজ্যাঠা ছিলেন, এরা যে চারপাশের মানুষগুলোর থেকে অনেকটা অন্যরকম, সেটা সেই তখনই বুঝতে পারতাম, কেমন একটা অন্য অনুভূতি হয়, স্বপ্ন দেখানো রকমে একটা কিছু। একটা ভাল অনুভূতি হত, এখনকার সিপিএমদের দেখলে ঠিক যার উল্টোটা হয়। আমি এঁদের নিয়ে কোনও রূপকথা তৈরি করছি না। অতটা ছেলেমানুষ আমি ছেলেবয়সেও ছিলাম না, অনেককিছুই চোখে পড়ত আমার। আটাত্তরের পর থেকে এই লোকগুলোই ক্রমে, তাদের চারপাশ পরিজন পরিবেশ, ক্রমশঃ গেঁজে যেতে শুরু করল, ওই স্বাধীনতা আন্দোলনের পেনশনের মত আত্মত্যাগের বাড়িভাড়া পেতে ও নিতে শুরু করল, দেখলাম। কিন্তু তার আগেই রাজনীতি এসে গেল।

রাজনীতির সেই কিশোরবয়স থেকেই পুজো মানেই হয়ে উঠল অনেক অনেক বই পড়ার অবিমিশ্র ছুটি। শারদীয়া যে কোনও সংখ্যা, বেশ মোটা হলে আমার একদিন ছাড়াত, নয়তো দিনের দিনই নেমে যেত। এর পরপরই এসে গেল পার্টির পুজোর বইয়ের স্টল। বইয়ের সঙ্গে বসে থাকতে, পড়ে থাকতে, এমনকি ঘুমিয়ে থাকতে অব্দি বেজায় ভালবাসতাম চিরকালই। একবার একটা গল্পে একটা চরিত্র লিখেছিলাম যে সঙ্গে বই মানে অক্ষরের কবচকুণ্ডল না থাকলে ট্রেনে উঠতে ভয় পেত, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগত, আত্মপরিচিতি ঘেঁটে যেত তার, সেটা নিজের প্রতিক্রিয়া থেকেই। কম্পিউটার এই উপকারটা করেছে আমার, অন্য অনেক কাজে সাহায্যের পাশাপাশি, বইপ্রতিমার বাতিক দূর করেছে। তবে বোকা ইগোর আত্মঘোষণাটা থাকেই, হয়তো সেটা করে উঠতে নিজেকে অনুমতি দিই না, বা নিজের অগোচরে হয়ত দিয়েও ফেলি, কিন্তু তার প্রতিমাটা অন্তত বদলেছে।

তাই, পুজো ও ঠাকুর দেখতে যাওয়া আমার এই প্রথম। ওরকম শোভাযাত্রা করে দামি জায়গায় খেতে যাওয়াটাও। এখন তো একটু পয়সাটয়সাও হচ্ছে আমার। বুড়ো হতে হতে যেমন হয়েই থাকে।

এবার আরও একটা নতুন জিনিস করলাম। জীবনে প্রথম। বিসর্জনের মিছিলে যাওয়া। রাজনীতির মিছিলে অনেক হেঁটেছি। অনেক রকম। কিন্তু বিসর্জনের মিছিলে এই প্রথম। আর আমার তো সেই খুব ছোটবেলার পর থেকে ভক্তিটা কেমন একটা খসে গিয়েছিল, কোনও কিছুতেই কোনও ভক্তি হত না, লোককে না ঠাকুরকে না। আমার ক্ষেত্রে এটা অন্তত একটা বিষাক্ততা নিয়েই এসেছিল। একটা প্যারানইয়াও হতে পারে, সবাই এটা করছে, আমায় করাতে চাইছে, তার মানেই এটায় কোনও বদমাইসি আছে। কোনও ভক্তি নেই বলে জীবনের খুব একা খুব তিক্ত সময়গুলোয় মাঝে মাঝে নিজেকে খুব একা বোকা এবং বিষণ্ণও লেগেছে, আমার হায় নালিশ জানানোর কোনও জায়গাও নেই। তাই অন্য মানুষগুলোকে, তাদের খুব আবেগ হচ্ছে, ফাঁকা মণ্ডপ দেখে, ঠাকুর চলে যাচ্ছে, কেঁদে ফেলছে, আর সেই লোকগুলোকে তো আমি বেশ ভালই বাসি, পছন্দ করি, তাদের খারাপ লাগায় আমারও লাগছে। এই গোটাটাই আমার বেশ কৌতূহলোদ্দীপক আর আকর্ষণীয় লাগছিল।

এই দুটোকে মিলিয়ে অনেকটা লেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ভূমিকাটা বড্ড বড় হয়ে গেল। আর একটা ঘটনা কাল রাত থেকে ভীষণ খারাপ একটা অনুভূতি দিচ্ছে। সেটা উল্লেখ করে আজকের ব্লগটা শেষ করি। ওগুলো নিয়ে হয়তো পুজোর ব্লগ ২ লিখব এর পর।

এবারের পুজোর কলকাতা দেখে, এবং অন্যদের কাছ থেকে শুনেও যা পেলাম, বেশ শান্তিপূর্ণ ছিল। মাইকের এবং বাজির কদর্যতা বেশ সহনীয় ছিল। গোটা গাদটা এসে জমা হয়েছে মফস্বলে। সারাদিন ধরে প্রবল জোরে মাইক বেজেছে সর্বত্র, রাত্তির এগারোটা নাগাদ মোটামুটি হয়ত বন্ধ হয়েছে, অন্তত মধ্যমগ্রাম নিউব্যারাকপুরে, কিন্তু সারাদিন ধরে সে যে কী কষ্ট হয়েছে। অজস্রবার জানানো হয়েছে গিয়ে, রীতিমত অসুস্থ লাগছিল, কিন্তু কিছু তেমন লাভ হয়নি। আর বাজি ফেটেছে ভয়ঙ্কর। খারাপ অভিজ্ঞতাটা সেই বাজি নিয়েই।

আমার এক বহু পুরোনো ছাত্র, এখন আমার বন্ধু, তার বউ অন্তঃস্বত্তা। সেখানে নানা সমস্যাও আছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আর ওর প্রথম বাচ্চা সাড়ে তিন বছর বয়েস। নিউব্যারাকপুরে ওদের বাড়ির কাছে গতকাল বিসর্জনে এমন বাজি ফেটেছে, সেই সাড়ে তিনের মেয়ে ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে বমি পায়খানা করে ফেলেছে। সেটা শোনা থেকেই এত কষ্ট হচ্ছিল। আমাদের এখানেও, ঘুমন্ত বাচ্চারা কেঁপে কেঁপে উঠছিল। এবং এটা চলে অন্তত রাত একটা দশ পর্যন্ত। আমি ঘুমোতে পারছিলাম না আওয়াজে। ওই সময়ে আমি ওষুধ খেয়ে ঘুমোতে গেছিলাম।

এবার আওয়াজের মাত্রা আবার বেড়েছে, শুনছি যুক্তিটা নাকি শ্রমিকশ্রেণীর হয়ে। যদি শব্দবাজি না হয় এরা কোথায় কাজ পাবে? এ যে কি অদ্ভুত যুক্তি। তাহলে পাইপগান তৈরিকেও স্বীকৃতি দিতে হয়, নইলে শ্রমিকদের কী হবে? বাজি বানাতে কি এতটাই দক্ষতা লাগে, ইতিহাসের মাস্টারমশাই যেমন অঙ্ক শেখাতে পারেন না, যে এই শব্দবাজি-শ্রমিকরা তুবড়ি বা রংমশাল বানাতে পারবেন না?

ছত্রধর মাহাতোকে ধরা হল রাষ্ট্রের বিরোধিতার দায়ে। তাহলে ‘লালা বাংলা ছেড়ে পালা’ আর ভুল ইংরিজিতে ‘ওদের ভাষাতেই ওদের উত্তর দেওয়া হয়েছে’ এই দায়ে বিমান-বুদ্ধকে কেন ধরা হবে না কে জানে? আইনবিভাগকে অপমান করা মানেও রাষ্ট্রবিরোধিতা। বা, মুখ্যমন্ত্রী হয়েও, সংবিধানের ভাষা না বলে দুষ্কৃতীদের ভাষায় কথা বলতে চাওয়া অবশ্যই রাষ্ট্রবিরোধিতা। এরা এই অসভ্যতা গুলো করে করে যা করেছেন তা হল কোনও রকমের কোনও প্রকারের কৌম অস্তিত্ত্বটাই মুছে গিয়েছে, কোনও অনুশাসনের প্রয়োজনীয়তাও। তাই কোনও ক্রমে দম চেপে কলকাতা থেকে তাড়ালেও তা এসে জোরতর হয়ে চেপে বসছে কলকাতার বাইরে, খ্রীষ্ট যেখানে হাঁটেননি।

« Previous PageNext Page »

Powered by WordPress