নেটখাতা

July 22, 2009

মাউন্ট ব্যাটন সাহেব-অ, সাধের ব্যাটন কার হাতে থুইয়া গেলা-অ

শিলঙে রিফ্রেশার কোর্সে গিয়ে সেই যে পেটের গোলযোগ ফেরত এল, এখনো সেটা নেই হয়ে যায়নি। কোনও কিছুতেই লাগাও পাচ্ছি না একদম, ক্লান্তও লাগছে খুব। তাই এই ব্লগোক্তিটা হবে খুবই সংক্ষিপ্ত।

মধ্যমগ্রামের নাদচিত্র নিয়ে এই ব্লগে প্রচুর কথা আছে। নতুন করে কিছু বলার নেই, এমনই মহিমা তার। কিন্তু সেখানে একটা বদল এসেছে। গভীর ও গম্ভীর রাজনৈতিক বদল। আগে যেখানে মাইকাক্রান্ত হতাম আমরা রক্তদান আর তার ‘সাথীদের খুনে রাঙা’ শ্রেণীসচেতনতা দিয়ে, এখন সেখানে এসেছে নন্দীগ্রামের ইজ্জত ও সিঙ্গুরের মাটি নিয়ে সুমন। এর ইঙ্গিত বোঝা গেছিল ইলেকশনের আগেই, ইলেকশন মিটিঙের চোঙা ফোঁকার গুঁতোয় সব দরজা জানলা বন্ধ করার পরও একান্ত দাম্পত্য কথোপকথন চালাতে হচ্ছিল গলার শির ফুলিয়ে চীৎকার করে। আমার এক প্রতিবেশী বলেছিলেন, যেরকম চেঁচাচ্ছে, ভোট আমি আর দেব না তৃণমূলকে। জানিনা শেষ অব্দি দিয়েছিলেন কিনা। কারা ভয়ানকতর বলে মনে হয়েছিল তার।

শুধু এই শব্দের ট্রাডিশন সমানে চলছে তাই নয়। আছে আরও বহু নানা উত্তরাধিকার।

আমার এক ছাত্র তার বাড়ি করতে শুরু করেছিল সিপিএম আমলে, আর বাড়ি তৈরি এখনও চলছে, তৃণমূল আমল আসব আসব করছে বলে শোনা যাচ্ছে। এতে, ইতিমধ্যেই, তার বাড়ির ঠিকাদারদের কাছ থেকে কে তোলা তুলবে সেই পক্ষ গেছে বদলে। সিপিএমের তোলাবাজি পৌঁছে গেছে একদম গ্রাসরুট স্তরে।

আমার আর একজন পরিচিত, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তার একটা মাছের ব্যবসা আছে। তার গল্পটাও সেই একই। ইলেকশনের আগে ছিল সিপিএমের বীরত্ব এবং সিপিএমের বীরভাতা। ইতিমধ্যেই সেটা চলে গেছে তৃণমূলে। এখনো পরিমাণে কিঞ্চিৎ ন্যূন আছে। তবে আশা করা যাচ্ছে ২০১১র পর সমতাবিধান ঘটে যাবে।

কলেজে কলেজে, স্কুলে স্কুলে, এমনকি বিশ্বের বিদ্যা লয় করার এক্তিয়ারেও, যেসব পোকা আর মাকড়ে ভরে দেওয়া হয়েছে, তারা এখনও চাকরি করবে বহুবছর, এবং তাই গজাতে থাকবে আরও প্রচুরতর পোকামাকড়ের ডিম, এ তো জানা ছিলই। ইতিমধ্যেই বহু পোকা প্রজাতি বদলাতে শুরু করেছে, অন্ততঃ তার পূর্বাভাস আসছে বেশ জোরালো ভাবেই। জুরাসিক পার্কে দেখেছিলাম, কী ভাবে সরীসৃপরা লিঙ্গ বদলায়, আর এ তো মেরুদণ্ডীই নয়, বদলটা আরও অনেক অনায়াস হওয়ারই কথা। তাই পোকার কামড় কমার কোনও সংবাদ আসার আগেই খবরে খতম।

ইত্যাদি এবং ইত্যাদি।

মাউন্ট ব্যাটন সাহেব-অ, সাধের ব্যাটন কার হাতে থুইয়া গেলা-অ?

Filed under: সামাজিক-রাজনৈতিক — dd @ 9:22 pm

May 19, 2009

‘রোয়াক’ পত্রিকার জন্যে নির্বাচন ২০০৯ নিয়ে একটা লেখা

(এই লেখাটা আদৌ এই ব্লগের জন্যে নয়। ‘রোয়াক’ পত্রিকার জন্যে লেখা। এবং এর আগের ব্লগের লেখাটা হুবহু তুলে দিয়ে, সেটাকে ঘিরে আলোচনা। সম্পাদক সোমনাথ মুখোপাধ্যায়ের অনুমতি নিয়ে এখানে একটা আগাম ই-প্রতিলিপি সেঁটে দেওয়া হল, হুবহু যে আকারে ‘রোয়াক’-এ পাঠানো হয়েছে।)

ত্রাস এবং তার বিপরীত উল্লাস
সতেরোই মে, রবিবার, ২০০৯ লোকসভা ভোটের ফলপ্রকাশের পরের দিন, সকালে, যথেষ্ট বেলা, কিন্তু ওর গলায় ঘুম তখনো কাটেনি, সোমনাথ ফোন করল। রোয়াকের একটা সংখ্যা বার করব। আমি শোনামাত্রই সাবধান হয়ে গেলাম, তুই তো জানিস, আমি কেউ লিখতে বললে লিখতে পারিনা।
বেশ ভদ্র গলায়, সংযত, শান্ত, মানে আরও বিপজ্জনক, সোমনাথ বলল, আরে আগে পুরোটা শোনো না। তুমি আগে পুরোটা শুনে নাও।
সেই পুরোটা শোনার ফলাফল এই লেখাটা। আমি জানি, বিষয়টা যদি জরুরি হয়, আর এই বিষয়টা সত্যিই জরুরি, লেখা যার কাজ তার লিখতে পারা উচিত, ‘লেখা মাথায় আসা’  ইত্যাদি কোনও বাড়তি নাটক যোগ না-করে। কিন্তু আমি সত্যিই পারিনা। ভাবনার কোনও সূত্র সত্যিই আয় বলা মাত্র আসে না আমার। তাই খুব তাগিদে পড়লে পুরোনো কোনও ভাবনার সূত্রকেই ব্যবহার করতে হয়।
আটই মে দিনটা ছিল গরম এবং আর্দ্রতার ভারে ভারী, তার মধ্যে প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছিলাম সারাটা দিন। তারপর বাড়ি ফিরেই কিছু কথোপকথন ঘটেছিল কিছু লোকের সঙ্গে, যার কিছু প্রতিক্রিয়া মাথার ভিতর কিলবিল করছিল, কিন্তু সেদিন নয় ঘন্টারও বেশি একটানা পরিশ্রমের পর, আর বয়সও তো হচ্ছে, সত্যিই, বহু চেয়েও আমি ব্লগ লিখতে বসতে পারিনি। গায়ে জল ঢেলে এসে শুয়ে পড়েছিলাম।
কিন্তু প্রসঙ্গগুলো এতই চাপ ফেলছিল মাথায় যে ঘুমোতেও পারছিলাম না, বারবার ঘুম আলগা হয়ে যাচ্ছিল, ধাক্কা দিচ্ছিল ওগুলো। শেষে তিনটে নাগাদ উঠে পড়লাম, এবং ব্লগটা লিখতেই হল। লিখে তবে সাড়ে পাঁচটায় শুতে গেছিলাম। ddts.randomink.org/blog নেট-ঠিকানায় আমার ৯ই মে, ২০০৯ তারিখের এন্ট্রি, নাম ‘লক্ষ্মণের আবেদন এবং কিছু উল্লাস’। এই লেখাটার চিন্তাসূত্র ওটাই, লেখাটা তুলে দেওয়া যাক।
লক্ষ্মণের আবেদন এবং কিছু উল্লাস – ৯ মে, ২০০৯, ভোর ৫টা ২৭ মিনিট
গতকাল সারাদিন ওই বিচ্ছিরি গরম, তার মধ্যে কলেজে বসে নিজের লেখার প্রুফ দেখে দেখে সংশোধনগুলো ল্যাপটপে তুলে গেছি সারাদিন। সে এক ভয়ানক ক্লান্তিকর ব্যাপার। তারপরে বনগাঁ লোকালের ওই বিকট ভিড়ে বাড়ি ফিরেছি। ফিরতেই মা বলল, আমার এক বন্ধু, সচরাচর যে খুব বেশি ফোন করেনা, বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল। অবাক হলাম। শুধু একার নয় অনেকের ঘামে ভেজা জামা পিঠ থেকে খুলেই ফোন করলাম।
ওর গলাটাই ছিল ভিন্ন, দেখেছ, কী ঘটছে। একটা উল্লাস, একটা আরাম। আমি বললাম কী ঘটছে? আরে লক্ষ্মণ শেঠ রিপোল চেয়েছে। ও, আমি বললাম, তখনও খুব একটা ধাতস্থ হইনি, আর মানু বাড়ি না-থাকায় চা বসিয়ে এসেছি, কিন্তু চা তখনও হাতে নেই। ঘটেছে কী? আমি জিগেশ করলাম।
আরে, প্রচুর কিছু ঘটেছে, সিপিএম এতদিন যা করত, এবার সেটা সিপিএমকে কেউ ফেরত দিচ্ছে।
কী, খুব ভায়োলেন্স হয়েছে?
সেটা বড় কথা না, লক্ষ্মণ শেঠ রিপোল চেয়েছে, সত্যি আমি নানা চ্যানেলে যতবার দেখছি, দেখতেই যে কী আরাম লাগছে। দেখো না, যদি টিভি থেকে ইউটিউবে তুলে দিতে পারো, তুমি তো জানো এসব। বারবার দেখব, সবাইকে দেখাব।
আরে ধ্যাত, আমার কোনও ক্যাপচার কার্ড নেই। ইত্যাদি ইত্যাদি, কথোপকথন চলল। আমার এই বন্ধুর এই আরামটা বোঝা যায়না, নন্দীগ্রামের দিনের এবং রাতের অধ্যায়টা না বলে-দিলে। ওর দাদা থাকেন হলদিয়ায়, বৃদ্ধ মানুষ। অনেক আগে একসময় এক ভাবে গ্রামের কৃষি রাজনীতির সঙ্গে যোগও ছিল, তাই একরকম একটা আবেগের সংযোগ চাষ এবং চাষীর সাথে রয়ে গেছে এখনও ওর সেই দাদার। সিপিএমের নন্দীগ্রাম দখলের রাতে হলদিয়ায় যখন প্রচুর মদ মাংস এবং বাজি উপভোগ চলছিল, সেটা ঘটছিল ওঁর বাড়ির পিছনেই। উনি ফোন করে হাউহাউ করে কাঁদছিলেন, আর ফোনের মধ্যেই বাজি ফাটার শব্দ এবং তাণ্ডবের নাদ পাওয়া যাচ্ছিল। তাই এক ভাবে, কৃষি থেকে নন্দীগ্রাম থেকে বহু বহু দূরে বসেও আমার ওই বন্ধু জড়িয়ে গেছিল গোটাটার সঙ্গে। আমরাও।
জড়িয়ে যাওয়ার আরও উপাদান ছিল। আমাদের আর এক বন্ধুর স্ত্রী কাজ করে কর্পোরেট অফিসে। তার এক সহকর্মী ওদিন ওদের বাড়ি আসে। ওদের বাড়িতে থাকা কালীনই সেই সহকর্মীর সেলফোনে তার ভাইয়ের ফোন আসে, যে কম্পিউটার নিয়ে পড়ে, এবং তখন গ্রামে গিয়েছিল। দাদা ওরা মারছে রে, পুঁতে দিচ্ছে। এবং তার দাদার প্রতিক্রিয়াটা ঘটছিল ওদের চোখের সামনে।
তাই এই গোটা আরামটা আমার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছিল, কোথাও একটা ভাল লাগছিল। সিপিএমের একটি কর্মীকে চিনি, সেইরকম হাতে গোনা দুচারজনের একজন, সিপিএম অথচ বদমাইস নয়, চোর নয়। তার কথা মনে পড়ছিল। মাঝে সে একদিন বলেছিল, সিপিএমের মধ্যেও ওর বিরুদ্ধে কম বিক্ষোভ নেই, কোঅর্ডিনেশন কমিটি থেকে, বারই জুলাই কমিটি থেকে ওর বিরুদ্ধে একমত সিদ্ধান্ত গেছিল, কিন্তু টাকা, ও তো কোটি কোটি টাকা দেয়। এই ছেলেটির কাছেই শুনেছিলাম, আরও একটি ঘটনা, পার্টির থেকেই খেজুরির ক্যাম্পে যেতে হয়েছিল ওকে, গন্ডগোলের পর সিপিএমের ঘরছাড়া লোকেরা সেখানে আছে তখন, সেখানকার অভিজ্ঞতা। জানেন, কী খাচ্ছে ওরা — চাল ডালের খুদ, একসঙ্গে সিদ্ধ করা, তাতে পোকা, পচা গন্ধ, রাঁধছে যেখানে সেখানেও দাঁড়াতে ঘেন্না করছে, আর এরা তো তৃণমূলের না, আমাদেরই লোক, আর ওখান থেকে জেলা অফিসে এসে দেখলাম, নেতারা দুরকম মাছ, চাটনি, মিষ্টি দই দিয়ে খাচ্ছে, আমি এসে সেদিন রাতে খেতে পারিনি, জানেন, আমরা তো বড়লোক কোনওদিনই নই, কিন্তু ওরকম খাবার আমরা জীবনে খাইনি।
এই সব সমস্ত কিছু মিলে আমার মধ্যেও কাজ করছিল। যখন জোতদারদের পার্টি হয়ে নয়, নিজেই একধরণের জোতদারি হয়ে যাওয়াটাই রাজনীতির ভবিতব্য।
আমার কিছু পুরনো ছাত্রছাত্রী, বুঝতেই পারছিলাম, তারাও এক সঙ্গে আজ মজা পাচ্ছে, তাদের ফোন করলাম। তাদের একজন চেঁচিয়েই উঠল, আরে এতক্ষণ ধরে ভাবছি, তোমার ফোন আসছে না কেন। ওই শোনো, শুনতে পাচ্ছ? আমি কান খাড়া করেও ভাল বুঝতে পারলাম না, ওদেরই একজন পিছনে কিছু একটা বলে চেঁচাচ্ছে। কী চেঁচাচ্ছে ও?
শুনতে পাচ্ছ না, যুদ্ধের দামামা বেজে গেছে, বলে চেঁচাচ্ছে।
রাখ তো, তোদের টিভি দেখে যুদ্ধের দামামা, বললাম ওদের। বললাম বটে, কিন্তু ওদের উল্লাসটাও পাচ্ছিলাম। ওরা বেশ কয়েকজন এনজিও করে, গ্রাম এলাকায় একশো দিন কাজ পাওয়ার মানুষের সুযোগ কী ভাবে রাজ্য সরকারের দপ্তরগুলো চেপে রাখে, কারণ সেটা থেকে পার্টি বা পঞ্চায়েতের লোকেরা টাকা মারতে পারে না, সরাসরি ওই টাকাটা পোস্ট অফিসে আসে, সেটা ওদের কাছেই শুনেছি। ওরা একাধিক জায়গায় গরিব চাষী বা শ্রমিকদের সমবায় বানানোরও চেষ্টা করছে। তাই ওদের আনন্দটা ধরতেও পারছিলাম।
ওদের যেটা বললাম, সেটা আমিও মনে করি, লক্ষ্মণ শেঠের এই রিপোল চাওয়ার ঘটনায় সত্যিই একটা আখ্যানের ন্যায়, পোয়েটিক জাস্টিস আছে। যে ছবিটা মাথায় আসে সেটা একজন ভয়ানক রাবণের, মুখে হাতে শরীরে রক্ত, নিল ডাউন হয়ে বসে আছে, আর বলছে, স্যার দেখুন না আমায় ভ্যাংচাচ্ছে।

উল্লাসের নির্মাণ প্রক্রিয়া – একটা চলমান ত্রাসের গল্প
কাল সোমনাথের ওই লেখার প্রস্তাবের পর থেকেই খুব চাপে ছিলাম, আরও বিষয়টার জীবন্ততা নিয়ে তো কোনও প্রশ্ন থাকতে পারে না, বা এই পুরোটাকে ঘিরে আমার প্রতিক্রিয়া নিয়েও। তাহলে লিখতে পারব না কেন, এতদিন ধরে তো কম লিখিনি, তাহলে এত পাঁজা পাঁজা লিখে লাভ কী, প্রয়োজনের দিনে যদি একটা হাজার দুয়েক শব্দের লেখাও লিখতে না-পারি।
আসলে আমার মধ্যে অন্য একটা বিপন্নতাও কাজ করে, একটা লজ্জ্বাবোধ। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যেদিন সিঙুর গেছিলাম, মিছিলে হেঁটেছিলাম, সেটা তো আমার রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার প্রায় দুই দশক পরে, বড় আলোড়িত লাগছিল সেদিন, ভিতরে ভিতরে, এবং ওই হাঁটতে হাঁটতেই আমার মধ্যে একটা লজ্জ্বা এবং ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় তৈরি হয়েছিল। যদি এরা জেনে ফেলে যে আমিও সিপিএম ছিলাম? যদি জানতে পারে, নিজের প্রায় শৈশব থেকে বারো বছরেরও বেশি সময় ধরে সমস্ত আবেগ ও আগ্রহ নিয়ে, পার্টি হোলটাইমার হব শুধু এই আকাঙ্খাকে ঘিরে রাজনীতি করে গেছি? শুধুমাত্র দুইজন নেতার অপছন্দই আমায় পিপলস ডেমক্রাসির হোলটাইমার হয়ে দিল্লী চলে যাওয়া থেকে আটকেছিল, সেই এমএসসি বয়সে। মানুষ হিসাবে এরা অত্যন্ত নোংরা স্তরের, কিন্তু আজ এদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞই লাগে আমায় সেদিন এরা অপছন্দ করেছিল বলে।
ষোল তারিখ যখন সারাদিন একটিবারের জন্যেও টিভির সামনে থেকে নড়তে পারছিলাম না, শুধু টিভিকে না টিভি দেখতে থাকা নিজেকেও দেখছিলাম। সিঙুর থেকে ঘুরে আসার পর থেকে যেখানেই যখনই কথা উঠত, অচেনা কারুর সঙ্গে, চেনারা তো এটা জানেও, আমি প্রথমেই অকপটে স্বীকার করে নিতাম। জানিয়ে না-দিয়ে পারতাম না, এই ধ্বংসের দায়ভাগে অংশীদার আমিও। আমি আর কে ছিলাম, কতটুকু ছিলাম, কিন্তু একটা কাঠবিড়ালির বাদামখোলার মত করে হলেও, আর আমার দিক থেকে তো সেটা একশো শতাংশই ছিল, যে সেতু বেয়ে গণহত্যাকারী আর গণধর্ষকরা গেছিল, সেই সেতুতে তো খোলামকুচি আমারও আছে। আমার আগ্রহ আর আবেগ আর মূর্খতা আর কী-জানি-কী তো তার প্রস্তুতির ইতিহাসে মিশে ছিল। কবীর সুমন বলছিল, আপনারা সিপিএমরা, গণহত্যাকারীরা, গণধর্ষকরা শুনুন … ইত্যাদি, আর আমার বুকে এসে সেটা লাগছিল। সুমনের মধ্যে তো একটা নাটুকেপনা চিরকালই থাকে, কিন্তু যা বলছিল সেটা তো মিথ্যে না। নিজেকেই কেমন ঘেন্না লাগছিল।
ঘেন্না হচ্ছিল, আবার মন-খারাপও লাগছিল। মধ্যমগ্রাম নিউব্যারাকপুরের আমাদের ছোটবেলায় চালু ছিল নিছক কলোনি সংস্কৃতি। রিফিউজি পুনর্বাসনের পর্চার জমিতে গড়ে ওঠা লোকালয় আসলে একটা পরিবর্ধিত রিফিউজি কলোনির সংস্কৃতি নিয়েই লাগু ছিল, রিফিউজি কলোনির বিপন্নতা, রিফিউজি কলোনির ঐক্যবোধ, রিফিউজি কলোনির আত্মীয়তা, এই নিয়েই আমরা বড় হচ্ছিলাম। সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে কী ভাবে যেন রাজনীতিও শুরু হয়ে গেছিল। তখন তো তত্ত্ব বলে যে কিছু হয় তাও জানতাম না। আর আমি যতটুকু যা তত্ত্ব পড়েছি বা লিখেছি তাতে তো আজও মনে হয় না যে, সেই খুব সরল জায়গাটার খুব একটা সংশোধনেরও প্রয়োজন আছে। আমার তো আজও মনে হয়, সেই কলোনি এলাকার সেদিনের সেই সিপিএম রাজনীতিটাই আমি আজও করে চলেছি, আমার সাহিত্যে, আমার রাজনৈতিক অর্থনীতিতে, আমার লিনাক্সে।
কিন্তু এটাও তো ঠিক, সেই রাজনীতি থেকেই কোনও একদিন এই পিশাচের জন্ম হয়েছিল। মজার কথা এই যে, ঠিক কী প্রক্রিয়ায় জন্ম হয়েছিল পিশাচ জন্মানোর এই প্রক্রিয়ার, সেটা আমি আজও ভাল বুঝতে পারিনি। আশি বা একাশির এক শীতের রাত্তিরে আমার আরও তিন বন্ধুর সঙ্গে আমাদের দিকে কারবালা বলে একটা জায়গায় গিয়েছিলাম, যেতে যেতে আমরা বি টি রণদিভেকে নিয়ে কথা বলছিলাম, পি সুন্দরাইয়াকে নিয়ে, তার সন্নিহিত এলাকার তত্ত্ব নিয়ে। তখন ওই দিকটা প্রায়জঙ্গল একটা জলাভূমি ছিল, সেদিন সেই জনহীন জলায় একটু একটু মেঘ মেশা আকাশে চাঁদের বাখারির শীর্ণ জ্যোৎস্নায় একটা মায়া নেমেছিল, কোনও এক পরী। কী যে একটা অনুভূতি হয়েছিল, আমার কেমন কৃতজ্ঞ লাগছিল ওই মুহূর্তটার প্রতি, যেমন হয়, এক একটা ঘটনার সময়ই মনে হতে থাকে, ভাগ্যিস জন্মেছিলাম, নইলে তো এই অভিজ্ঞতাটা হত না। এতটাই দাগ কেটে গেছিল মাথায় যে সেদিন রাতে ঠিক করে নিয়েছিলাম, তখন যে উপন্যাসটা লেখার পরিকল্পনাটা মাথায় ঘুরছিল, সেটা সত্যিই কোনওদিন লেখা হলে ওই তিনজনকে নিয়ে ওই রাতটাকে উৎসর্গ করব। এর অনেক বছর পরে বই আকারে প্রকাশিত হয়েছিল, ‘তপন বিশ্বাসের খিদের বত্রিশ ঘন্টা’ তখন খুব কষ্টও হয়েছিল সিদ্ধান্তটা বদলাতে, আরও কমবয়সের আবেগের মমতা তো, কিন্তু আমার সেই তিন কমরেড বন্ধুর একজন ততদিনে মদের ব্যবসার স্থায়ী আয়গ্রাহী, আর একজন নানা ইস্কুল কমিটির মাতব্বর, ইত্যাদি। তাই সেটা আর সম্ভবও নয়।
সিপিএম রাজনীতির প্রতি আমার প্রতিক্রিয়াটা অনেকটা এইরকম। এরকম কী করে হল, আচ্ছা এরকম হয়ে গেল যখন, এটা হওয়ার সম্ভাবনাটা তৈরি হচ্ছিলই, আমার মূর্খতার জন্যেই আমি ধরতে পারিনি — এর পরেই, এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যে প্রশ্নটা নিজের মধ্যে জেগে ওঠে, তাহলে কি আমিও এরকম? হতে তো পারে, আমার বুদ্ধিতে আমি ধরতে পারছি না, কিন্তু আসলে আমিও বিষাক্ত, ঠিক করে বুঝতে পারছি না।
আমাকে যারা চেনে তারা জানে, আমার ব্যক্তিজীবনে, আমার পারিবারিক অভিজ্ঞতায় একটা চূড়ান্ত অসফলতা আছে। স্তরে স্তরে বার বার। সেগুলোকে মিলিয়ে নিজের একটা বিষাক্ততার সম্ভাবনা আমার মাথায় ঘোরেই। বছর কয়েক আগে যখন বিষমানুষের গল্প লিখেছিলাম, এর একটা প্রভাব তার ভিতর কাজ করেছিল, মনে আছে।
তাই ১৬ই মে, সারাদিন টিভির সামনে থেকে যে নড়তে পারছিলাম না, তার ভিতরে একটা বেদনার নেশাও ছিল। আমার মধ্যে একটা মরবিডিটি চিরকালই আছে বোধহয়, খুব ছোটবেলায় পায়ে যখন কোনও কাঁটা ফুটে যেত, অনেকদিন ধরে একটা গভীর ব্যথা সেখানে রয়ে যেত, কেমন একটা উপভোগও করতাম। বোধহয় সেই একই অনুভূতি হচ্ছিল সেদিনও। আর বারবার নানা ফোন আসছিল, নানা জনের। আমি কেমন ভয় পাচ্ছিলাম, বহু বছরের একটা ত্রাস, তার সঙ্গে বসবাস করে এসেছি এত বছর, আমার বাড়িতে এসে সিপিএম যখন ফেইনম্যানস লেকচার্স আর ভ্যান গখের ছবি আর আরও নানা বহু বই ছিঁড়েছিল, বাড়ির লাইট ভেঙেছিল, তখন একটা ত্রাস এসেছিল। সেই ত্রাসটার সাথে বসবাস করতে করতে ঘরকন্না করতে করতে সেটাই তো জীবনপ্রক্রিয়া হয়ে গেছে, হঠাৎ সেটা অন্তর্হিত হয়ে যাওয়ায় একটা অনিশ্চয়তাও বোধহয় জন্ম নিচ্ছিল মাথায়।
আমার এক সহকর্মী বন্ধু, বয়সে অনেক ছোট, সিপিএম করত, নন্দীগ্রামের পর পার্টি মেম্বারশিপ ড্রপ করেছে, ওকে একবার জিগেশ করছিলাম, তোদের পার্টির আমার প্রতি এই অ্যালার্জিটা কেন, আমি যাই করি তাই অপছন্দ করে? ও বলেছিল, ওটা কিছু নয়, সিপিএম আসলে এখন তেমন যে-কেউকেই অস্বস্তি পায় যে সিপিএমকে ভয় পায় না।
এটা হয়তো সুখশ্রাব্য, কিন্তু সত্যি তো নয়। ওকেও বলেছিলাম সেটা। আমিও তো মর্মান্তিক ভয় পাই। আমার চেহারাটা বিরাট বলে, বা হয়ত আমার কথার ভঙ্গীর কারণে সেটা বোঝা যায় না, কিন্তু ভয় তো বেজায় পাই আমিও। আমার বাড়িতে ওদের ভাঙচুরের পরে ফোনের আওয়াজেও আমি কেঁপে উঠতাম, বমি হয়ে যেত প্রায়ই। তারপরে একটু একটু করে অনেকগুলো বছর চলে গেছে, আমি সেটার সঙ্গে বাঁচতে শিখে নিয়েছি, ভয়টা অনেক গভীর গোপন অন্দরে চলে গেছে। আর খুব বোকা ইগোর লোকদের যেমন হয়, কী করে জানি একটা ঠিক করে নেয়, ভয় পাই আর না-পাই যা ঠিক লাগছে সেটা তো বলতেই হবে, সেরকম কিছু বোকামি, যেন আমার কথা বলা আর না-বলা দিয়েই সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত হবে। অথচ আমার কাছে যারা আসে তাদের আবার আমিই শেখাই, চুপ করে থাকো, যা করার সেটা করো, কিন্তু চুপ, কথা বলে কী হয়। নিজে আমরা মাস্টারি করে যেটা শেখাই সেটা নিজে করাটা যে কী শক্ত। তাই, হয়ত, আমায় দেখে ভয়টা বোঝা যায় না, কিন্তু ভয়টা আছেই। নিঃশব্দ বলেই সেটা আরও গভীর, একটা ত্রাস। যারা অনেক বকে, গবগব করে ভয়টাও উগরে দেয় তারা তো বেঁচে যায়, গোপন ভয় ভিতরে চারিয়ে যায়, ক্ষয় করে চলতে থাকে ভিতরে ভিতরে। ইতিহাসের গল্প বলে একটা গল্প লিখেছিলাম, সেটা পড়ে সৈকৎ বলেছিল, ওর তিনচারদিন ধরে গা ছমছম করেছিল, সেটা আসলে নিজের এই ভয় থেকে চুরি করে। এতটা জ্যান্ত বলেই ওটা একজন পাঠক অব্দি পৌঁছতে পেরেছিল।
আমার এক পুরোনো মাস্টারমশাইয়ের কাছে গেছিলাম, কিছু ফিল্ম দিতে, এই ১০ই মে, নির্বাচনের ফল প্রকাশেরও ছয় দিন আগে, তিনিও বলছিলেন একই কথা, আসলে তো একটা অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে, তুমি ওদের বিরুদ্ধে হয়ত পাড়ার পুকুর নিয়ে একটা কথা বললে, এতে তোমার চাকরির জায়গায় একটা ফাইল গায়েব হয়ে গেল। তোমার সঙ্গে কোনও শত্রুতা হল, রণে বনে জঙ্গলে পার্টি অফিসে ঠিকাদারের ঠেকে সব জায়গায় এদের প্রতিটি লোক এক বাক্যে বলতে থাকবে, তুমি কী খারাপ, তোমার বাবা খারাপ, মা খারাপ, নিয়ত খারাপ, এবং এই বিষয়ে যাবতীয় তথ্য সরকারি দপ্তরে আছে, ইত্যাদি, ইত্যাদি, একদিন তুমিও বিশ্বাস করে ফেলবে। ইডিওলজি বিষয়টা ওদের উঠে গেছে, তার জায়গা নিয়েছে কাউকে মারার বিষয়ে এই ঐক্যবদ্ধতা। এ এমন একটা জিনিস এর প্রতি ত্রাস না-হয়ে কোনও উপায় নেই।
গত কদিন ধরে কোমরে একটা ব্যথা হচ্ছিল, আজকে ডাক্তারবাবুর কাছে গেলাম, সকালে, বারাসাতে হেলাবটতলা মোড়ে। যাওয়ার সময়ে মধ্যমগ্রাম চৌমাথা থেকে একটা ভ্যানে উঠলাম। ভ্যানে উঠতে গিয়েই মনে পড়ল, গত তিনমাস ধরে আমি যেটা করে যাচ্ছিলাম, ইলেকশনের কিছুদিন আগে অব্দি, রাজনৈতিক প্রক্রিয়াটা বোঝার স্বার্থে, এখন তো জ্যান্ত রাজনীতির সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগই আমি হারিয়ে ফেলেছি। পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় থেকেই মনে হচ্ছিল, একটা কোনও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চলছে, তার গন্ধটা যেন বাতাসে ছিল। কিন্তু ওই ত্রাস তো তার বাধ্যতামূলক নৈঃশব্দে সবটাই গোপন করছিল। কী করে বোঝা যায়, কী করে বোঝা যায়, এমনটা কদিন ভাবার পর একটা পদ্ধতি আবিষ্কার করলাম।
মানুষ ভয় পাচ্ছে কথা বলতে, কিন্তু তার চেনা মানুষের সঙ্গে সে তো কথা বলে, আর সবচেয়ে বড় চেনা আর কী হয়, ভয়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধতা ছাড়া? ঠিক সেই জায়গাটাকেই ধরার চেষ্টা করলাম, প্রশ্নটার কাঠামোটাকেই বদলালাম। আপনাদের ওখানে রাজনীতির অবস্থা কী, এই প্রশ্নটা আর না-করে প্রশ্নটাকে দাঁড় করালাম, আপনাদের এলাকায় সিপিএম এবার হারবে তো, ঝাড় খাবে তো?
এবং মজার কথা এই প্রশ্নটার সাফল্যে নিজেই অবাক হলাম। রিক্সা-ভ্যান যারা চালান তারা নানা জায়গা থেকে আসেন, কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক বর্গটা সবারই এক। সচরাচর আমি ইস্টিশন অব্দি হেঁটে যাই, কারণে অকারণে ভ্যান চড়া শুরু করলাম, এবং চেষ্টা করতাম ফাঁকা ভ্যান পাওয়ার। প্রায় তিনমাস জুড়ে প্রতিদিন আমি এটা করে গেছি, দিনে কমপক্ষে একজন, এবং অনেকদিন তিন বা চারজনকেও। এবং ফলটা আমার নিজের কাছেও অবিশ্বাস্য লাগল। প্রত্যেকটার ফল একই। আমার বাড়িতে যারা চাল নিয়ে আসেন, মুড়ি, বা কোনও মজুর বা মিস্তিরি, তাদের সঙ্গেও একই। রীতিমত আরাম ও উৎসাহে তারা তাদের সিপিএম বিরোধিতা উজাড় করে দিতে শুরু করলেন। একদিনই এর উল্টো ফল পেয়েছিলাম ওই তিনমাসে, বারাসত যাওয়ার পথে একটা অটোয়। কিন্তু সেটাও আমার ধারণা, ছেলেটা চুপ করে গেল, হয়ত অটোয় নম্বর থাকে এটা ওর মাথায় ছিল, সম্পূর্ণ নামহীন হওয়া যায় না। বা হয়ত ও সত্যিই সিপিএম, কে জানে।
আমার দু-একজন সহকর্মীকেও এই পরীক্ষাটার কথা বলেছিলাম, তারাও যতটুকু করেছিল, একই ফল পায় বলেই শুনেছি।
তাই আজ সকালে, সোমনাথের লেখাটার কথা মাথায় ছিল, আবার কথা তুললাম। একই ফল পেলাম। ভ্যান চালকের ঘর ময়নায়, বসিরহাট নির্বাচনক্ষেত্রে। কথা বলতে বলতে তিনি জানাচ্ছিলেন, কী ভাবে বর্ধমান থেকে মেরে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়, ইত্যাদি। এরা শুধু টাকা চায়, টাকা।
আমিও নানা কথা বলতে শুরু করলাম তাকে, কলেজের মাস্টারমশাই হিসাবে আমার অভিজ্ঞতা, কী ভাবে শুধুমাত্র অযোগ্য লোকদেরই শিক্ষার উচ্চপদে আসীন করা হয়, কারণ তারাই একমাত্র সম্পূর্ণ নির্বাক ভাবে টাকা চুরি এবং যা-খুশি করে চলার অংশ হবে, ইত্যাদি।
মূল ঘটনাটা ঘটল এর পরে। রবার ফ্যাক্টরি স্টপ থেকে এক মহিলা উঠলেন ভ্যানে। আমরা তখন এতই মগ্ন আমাদের এই সিপিএম চর্চায় যে ভাল করে খেয়ালই করিনি। হঠাৎ করে, ওই ভ্যান চালককে আমি তখন বলছি, কিন্তু এখনও তো এরা শেষ হয়নি, আমার মধ্যে জানার কৌতূহল কাজ করছিল, পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে কী ভাবছেন ওরা। মহিলাটি পাশ থেকে বলে উঠলেন, হয়নি তো, হবে, হবে, একদম নিকেশ হয়ে যাবে।
মহিলাটিকে খেয়াল করলাম, একটা হলুদ কালো ছাপা শাড়ি পরনে, গরিব অশিক্ষিত মুখ, হাতে কিছু কাগজ। আমি ওঁকে বললাম, দিদি ধরে নিন, সিটের পিছনের আংটাটা দেখালাম। মহিলাটি প্রচণ্ড উত্তেজিত। একই বাক্যে, দুবার, গলা প্রায় চীৎকারে চলে যেতে যেতে উনি সামলে নিলেন। কত কিছু বলে চললেন উনি।
আমার সোয়ামির প্রতিবন্ধীর কাগজ, দিনের পর দিন আমারে ঘোরাচ্ছে। টাকা চায়। আরে টাকাই যদি দিতি পারব, প্রতিবন্ধীর কাগজ দিয়ে করব কী?
হঠাৎ আমার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। আমার দিদিমাও ছিল খুলনার মেয়ে, বাগধারা ওইরকম, পুবির মাটি শিবির ঘর, মুগির ডালি ঘি দিলি খিরির তার হয়। ওনার ওই উজ্জ্বল হলুদ কালো শাড়ি, ঘাম জমা গলার শির ফুলে উঠতে উঠতেই সামলে নেওয়া, ওনার জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী বর, দুই বাচ্চা গোটাটাই মাথার মধ্যে আমি দেখতে শুরু করলাম, কেমন একটা আত্মীয়তা, ছোটবেলার সেই কলোনি আত্মীয়তা।
মহিলাটি ভ্যান থামাতে বললেন ডাকবাংলা মোড়ে এসে। ভ্যান আবার চালু হচ্ছে, আমি কিছু না-ভেবেই বললাম, আসি দিদি, নিজেও ভাবিনি এটা আমি বলতে যাচ্ছি। উনিও বোধহয় একটু অবাক হলেন, অন্যমনস্ক ভাবে মাথা নাড়িয়ে সায় দিলেন।
কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার অন্য একটা ঘটনার কথা মনে পড়ল। বিরাশিই হবে বোধহয়, আমি দিল্লি যাচ্ছিলাম, জনতা এক্সপ্রেসে। কানপুরের ওখানে বোধহয় কিছু একটা ঘটেছিল। আমাদের ট্রেনটা আটকে গেছিল একটা অদ্ভুত জায়গায়, দুপাশে শুখা জমি, লোকালয়ও বহু দূরে। রাত নামছিল। কামরার সবাই বেশ ভয় পেয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করে কেউ একটা বললেন, এটা গাজিয়াবাদের কাছাকাছি কোথাও। ওই গাজিয়াবাদ শব্দটা গোটাটাই বদলে দিল। আমি ঠিক মনে করতে পারছি না, দেশহিতৈষী বা ওইরকম কোথাও এর কদিন আগেই কোনও লেখায় গাজিয়াবাদে সিপিএম রাজনীতির প্রসার নিয়ে একটা কোনও লেখা বেরিয়েছিল। আর আমি কোনওদিনই কিছু চিনিনা, কোথাও তো তেমন যাওয়ারও সুযোগ হয়নি, শুধু নামটা মনে ছিল। সেই মুহূর্তে আমার গোটা ভয়টা কমে গেল, মনে হল, এই তো নিকটেই কোথাও আমার কমরেডরা আছে, নিজের আত্মীয়স্বজন হলেও ওই অনুভূতিটা হত না।
আজ ভ্যানের ওই মহিলার প্রতি আমার ওই প্রতিক্রিয়াটায় এক সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠল, আমার আত্মীয়তার উৎস, একটা ত্রাস, এবং ত্রাসবিরোধী ঐক্যবদ্ধতাটা। ওই ভ্যানচালকের কথাটা মনে পড়ল, কিছুই শেষ হয়নি, এবার হবে।
শেষ যে হয়নি এর প্রমাণ তো এই লেখাটা নিজেও। এই গোটা লেখাটা জুড়ে, লক্ষ্মণের লেখাটা থেকে, প্রতিটি খুঁটিনাটি আমায় সচেতনভাবে বদলাতে হয়েছে, আমার এই লেখার কারণে কেউ যেন বিপদে না পড়ে যায়। আমার সমস্ত লেখার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে লাগিয়ে বিকল্প খুঁটিনাটি বানিয়ে তুলতে হয়েছে, যাতে ঘটনার মূল আবেদনটাও থাকে, আবার কেউ বিপদে পড়ে না-যায়। ওই মহিলাটি চীৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলেন আত্মীয় সান্নিধ্যে, আমাদের কথোপকথনই তাঁর কাছে পৌঁছে দিয়েছিল, আমরা তার আত্মীয়, ত্রাসহীন হয়ে কথা বলতে পারছিলেন। আমরা কবে ত্রাসহীন হয়ে লিখতে পারব?

Filed under: সামাজিক-রাজনৈতিক — dd @ 12:09 pm

May 9, 2009

লক্ষ্মণের আবেদন এবং কিছু উল্লাস

গতকাল সারাদিন ওই বিচ্ছিরি গরম, তার মধ্যে কলেজে বসে নিজের লেখার প্রুফ দেখে দেখে সংশোধনগুলো ল্যাপটপে তুলে গেছি সারাদিন। সে এক ভয়ানক ক্লান্তিকর ব্যাপার। তারপরে বনগাঁ লোকালের ওই বিকট ভিড়ে বাড়ি ফিরেছি। ফিরতেই মা বলল, আমার এক বন্ধু, সচরাচর যে খুব বেশি ফোন করেনা, বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল। অবাক হলাম। শুধু একার নয় অনেকের ঘামে ভেজা জামা পিঠ থেকে খুলেই ফোন করলাম।

ওর গলাটাই ছিল ভিন্ন, দেখেছ, কী ঘটছে। একটা উল্লাস, একটা আরাম। আমি বললাম কী ঘটছে? আরে লক্ষ্মণ শেঠ রিপোল চেয়েছে। ও, আমি বললাম, তখনও খুব একটা ধাতস্থ হইনি, আর মানু বাড়ি না-থাকায় চা বসিয়ে এসেছি, কিন্তু চা তখনও হাতে নেই। ঘটেছে কী? আমি জিগেশ করলাম।

আরে, প্রচুর কিছু ঘটেছে, সিপিএম এতদিন যা করত, এবার সেটা সিপিএমকে কেউ ফেরত দিচ্ছে।

কী, খুব ভায়োলেন্স হয়েছে?

সেটা বড় কথা না, লক্ষ্মণ শেঠ রিপোল চেয়েছে, সত্যি আমি নানা চ্যানেলে যতবার দেখছি, দেখতেই যে কী আরাম লাগছে। দেখো না, যদি টিভি থেকে ইউটিউবে তুলে দিতে পারো, তুমি তো জানো এসব। বারবার দেখব, সবাইকে দেখাব।

আরে ধ্যাত, আমার কোনও ক্যাপচার কার্ড নেই। ইত্যাদি ইত্যাদি, কথোপকথন চলল। আমার এই বন্ধুর এই আরামটা বোঝা যায়না, নন্দীগ্রামের দিনের এবং রাতের অধ্যায়টা না বলে-দিলে। ওর দাদা থাকেন হলদিয়ায়, বৃদ্ধ মানুষ। অনেক আগে একসময় এক ভাবে গ্রামের কৃষি রাজনীতির সঙ্গে যোগও ছিল, তাই একরকম একটা আবেগের সংযোগ চাষ এবং চাষীর সাথে রয়ে গেছে এখনও ওর সেই দাদার। সিপিএমের নন্দীগ্রাম দখলের রাতে হলদিয়ায় যখন প্রচুর মদ মাংস এবং বাজি উপভোগ চলছিল, সেটা ঘটছিল ওঁর বাড়ির পিছনেই। উনি ফোন করে হাউহাউ করে কাঁদছিলেন, আর ফোনের মধ্যেই বাজি ফাটার শব্দ এবং তাণ্ডবের নাদ পাওয়া যাচ্ছিল। তাই এক ভাবে, কৃষি থেকে নন্দীগ্রাম থেকে বহু বহু দূরে বসেও আমার ওই বন্ধু জড়িয়ে গেছিল গোটাটার সঙ্গে। আমরাও।

জড়িয়ে যাওয়ার আরও উপাদান ছিল। আমাদের আর এক বন্ধুর স্ত্রী কাজ করে কর্পোরেট অফিসে। তার এক সহকর্মী ওদিন ওদের বাড়ি আসে। ওদের বাড়িতে থাকা কালীনই সেই সহকর্মীর সেলফোনে তার ভাইয়ের ফোন আসে, যে কম্পিউটার নিয়ে পড়ে, এবং তখন গ্রামে গিয়েছিল। দাদা ওরা মারছে রে, পুঁতে দিচ্ছে। এবং তার দাদার প্রতিক্রিয়াটা ঘটছিল ওদের চোখের সামনে।

তাই এই গোটা আরামটা আমার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছিল, কোথাও একটা ভাল লাগছিল। সিপিএমের একটি কর্মীকে চিনি, সেইরকম হাতে গোনা দুচারজনের একজন, সিপিএম অথচ বদমাইস নয়, চোর নয়। তার কথা মনে পড়ছিল। মাঝে সে একদিন বলেছিল, সিপিএমের মধ্যেও ওর বিরুদ্ধে কম বিক্ষোভ নেই, কোঅর্ডিনেশন কমিটি থেকে, বারই জুলাই কমিটি থেকে ওর বিরুদ্ধে একমত সিদ্ধান্ত গেছিল, কিন্তু টাকা, ও তো কোটি কোটি টাকা দেয়। এই ছেলেটির কাছেই শুনেছিলাম, আরও একটি ঘটনা, পার্টির থেকেই খেজুরির ক্যাম্পে যেতে হয়েছিল ওকে, গন্ডগোলের পর সিপিএমের ঘরছাড়া লোকেরা সেখানে আছে তখন, সেখানকার অভিজ্ঞতা। জানেন, কী খাচ্ছে ওরা — চাল ডালের খুদ, একসঙ্গে সিদ্ধ করা, তাতে পোকা, পচা গন্ধ, রাঁধছে যেখানে সেখানেও দাঁড়াতে ঘেন্না করছে, আর এরা তো তৃণমূলের না, আমাদেরই লোক, আর ওখান থেকে জেলা অফিসে এসে দেখলাম, নেতারা দুরকম মাছ, চাটনি, মিষ্টি দই দিয়ে খাচ্ছে, আমি এসে সেদিন রাতে খেতে পারিনি, জানেন, আমরা তো বড়লোক কোনওদিনই নই, কিন্তু ওরকম খাবার আমরা জীবনে খাইনি।

এই সব সমস্ত কিছু মিলে আমার মধ্যেও কাজ করছিল। যখন জোতদারদের পার্টি হয়ে নয়, নিজেই একধরণের জোতদারি হয়ে যাওয়াটাই রাজনীতির ভবিতব্য।

আমার কিছু পুরনো ছাত্রছাত্রী, বুঝতেই পারছিলাম, তারাও এক সঙ্গে আজ মজা পাচ্ছে, তাদের ফোন করলাম। তাদের একজন চেঁচিয়েই উঠল, আরে এতক্ষণ ধরে ভাবছি, তোমার ফোন আসছে না কেন। ওই শোনো, শুনতে পাচ্ছ? আমি কান খাড়া করেও ভাল বুঝতে পারলাম না, ওদেরই একজন পিছনে কিছু একটা বলে চেঁচাচ্ছে। কী চেঁচাচ্ছে ও?

শুনতে পাচ্ছ না, যুদ্ধের দামামা বেজে গেছে, বলে চেঁচাচ্ছে।

রাখ তো, তোদের টিভি দেখে যুদ্ধের দামামা, বললাম ওদের। বললাম বটে, কিন্তু ওদের উল্লাসটাও পাচ্ছিলাম। ওরা বেশ কয়েকজন এনজিও করে, গ্রাম এলাকায় একশো দিন কাজ পাওয়ার মানুষের সুযোগ কী ভাবে রাজ্য সরকারের দপ্তরগুলো চেপে রাখে, কারণ সেটা থেকে পার্টি বা পঞ্চায়েতের লোকেরা টাকা মারতে পারে না, সরাসরি ওই টাকাটা পোস্ট অফিসে আসে, সেটা ওদের কাছেই শুনেছি। ওরা একাধিক জায়গায় গরিব চাষী বা শ্রমিকদের সমবায় বানানোরও চেষ্টা করছে। তাই ওদের আনন্দটা ধরতেও পারছিলাম।

ওদের যেটা বললাম, সেটা আমিও মনে করি, লক্ষ্মণ শেঠের এই রিপোল চাওয়ার ঘটনায় সত্যিই একটা আখ্যানের ন্যায়, পোয়েটিক জাস্টিস আছে। যে ছবিটা মাথায় আসে সেটা একজন ভয়ানক রাবণের, মুখে হাতে শরীরে রক্ত, নিল ডাউন হয়ে বসে আছে, আর বলছে, স্যার দেখুন না আমায় ভ্যাংচাচ্ছে।

Filed under: সামাজিক-রাজনৈতিক — dd @ 5:27 am

March 30, 2009

মাল্যবান ও খবরের কাগজ

মাল্যবানবাবুকে নিয়ে অনেকদিন আগে একটা লেখা লিখেছিলাম। ঠিক লেখা নয়, সাহিত্য আকাদেমিতে একটা সেমিনার হয়েছিল, তার আলোচনার একটা লিখিত রূপ। পরে সেটা অপর পত্রিকাতেও বেরিয়েছিল। ‘নিজের লেখা’ এই ব্যাপারটাই বেশ অদ্ভুত। প্রথম দু-চারদিন নিজের থেকে আলাদা করা যায়না লেখাটাকে, তাই আসলে  পড়াই যায় না লেখাটা, লেখার প্রক্রিয়াটা তখনও মাথার মধ্যে চালু থাকে, তাই পড়াটা হয়ে দাঁড়ায় পাঠ, বা নিদেন, সম্পাদনা। কিন্তু পড়া মানে যদি হয় লেখকের চিন্তার একটা স্তব্ধ আকারের সঙ্গে মুখোমুখি আসা, সেটা হয়ই না। এই দু-চারদিন লেখাটাকে মনে হয়, ‘ওঃ, যা লিখেছি না, অসাধারণ’। তারপর ধীরে ধীরে লেখাটা মাথায় মরে যায়, নতুন স্মৃতি এসে জায়গা নেয়, কেউ কখনো নিজের লেখার কোনও লাইন বা প্রসঙ্গ টেনে আনলে, এমনও হয় যে প্রথমে মনে হয়, আরে এটা তো চেনা চেনা, তারপর মনে পড়ে। অনেকদিন বাদে ‘নিজের লেখা’ পড়তে গেলে প্রায়ই বেশ একটা উদ্ভট পরিস্থিতি হয়। এক, পড়াটার মধ্যে কোনও লড়াই থাকে না, এই অর্থে যে, পড়তে শুরু করলেই মূল গতিটা অন্তত মনে পড়ে যায়, তাই কোনও অজানা বিষয় অজানা চিন্তা চলে আসার সম্ভাবনাটা প্রায় নেই হয়ে যায়। দুই, নিজের মাথার চিন্তাগুলো, যদি ওই পুরোনো চিন্তাগুলো তখনও মাথার মধ্যে বেঁচে থাকে, হয়ে দাঁড়ায় ওই পুরোনো চিন্তার একটা সুপারসেট, তাই প্রায়ই, যদি ভুলভাল একান্ত নাও মনে হয়, অন্তত একঘেয়ে তো লাগেই।

খুব কম লেখাই, ‘নিজের লেখা’, অনেকদিন পরে পড়লেও খুব একটা বিরক্তি লাগে না। বেয়াল্লিশ বয়স্ক মাল্যবানবাবুকে নিয়ে প্রায় ওই বয়স্ক ত্রিদিবের ওই লেখাটা মাঝে একদিন অনেকটাই পড়লাম। তুলনামূলক সাহিত্যের আমার এক পণ্ডিত বন্ধুর জন্যে, তার খুব দরকার ছিল, ওই পুরোনো লেখাটার পাতাগুলো স্ক্যান করে একটা ডিজেভিউ ফাইল বানালাম। তারপর তার থেকে একটা পিডিএফ। পিডিএফ ফাইল আর ডিজেভিউ ফাইল দুটোই তুললাম নেটে (লিংকদুটো এখানে দিয়ে দিলাম, কেউ পড়তে চাইলে যাতে ক্লিক করলেই পেয়ে যান, আগে দু-একজন চেয়েছে)। তখন বেশ অনেকটা অংশ পড়লাম। তখন ফুকোর ‘বর্ডার অফ ডিসকোর্স’ দিয়ে ঠিক যে ভাবে ভাবতাম, সেটা এখন কিছুটা বদলেছে, সদ্যসমাপ্ত (প্রথম খসড়া) কম্পিউটার সায়েন্সের রাজনৈতিক অর্থনীতির বইটা লেখার সূত্রে আরও বদলেছে সেটা, প্রতিরোধকে রাজনৈতিক দর্শনে জায়গা দেওয়ার একটা নতুন রকম মাথায় আসছে আজকাল, কিন্তু তাও লেখাটা বেশ ভাল লাগল, বেশ কিছু জায়গা।

কিন্তু মজাটা মাথায় এল তারপর। যেমন বললাম, লেখাটা যখন লিখেছি, আমি মাল্যবানদার চেয়ে মৃদু ছোট ছিলাম, গত চোদ্দ বছরে আমার বয়স বেড়ে গেছে। আর মাল্যবানের (এখন ও আমার চেয়ে ছোট, বরং ওরই আমায় দাদা বলা উচিত) বয়স তো বাড়েনি, ওর জীবনীর প্রথম পাতাতেই ছিল, বেয়াল্লিশ বছরের জন্মদিন থেকে শুরু, তারপর আর কয়েক মাসের ঘটনা মাত্র এসেছে, মানে ম্যাক্সিমাম সাড়ে-বেয়াল্লিশ। কিন্তু এই গত বছরগুলোয়, নিজের অচেতনেই, আমি ব্যাটাকে নকল করেছি। অন্তত ঠিক নকল বলতে যদি সত্যে বা সম্মানে একটু লাগে, প্রভাব তো ছিলই।

গত বেশ কিছু বছর, সেই পাঞ্জাবের উগ্রপন্থীরা একবার একবাস মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলার পর থেকে, আমি খবরের কাগজ পড়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। জানি ওগুলো সত্যি, কিন্তু নেওয়া যায় না। রাজীব গান্ধী হত্যার পরে, কী একটা  পত্রিকায়, খবরটা পড়তে হয়েছিল আমায় মধ্যের ছবির পাতাগুলো স্টেপল করে নিয়ে। খবরের কাগজ, রোজকার, বা খবরের পত্রিকা আমি স্থায়ী ভাবেই ছেড়ে দিয়েছিলাম, শরীরে চাপ পড়ছিল। তার জন্যে বেঁচেও গিয়েছিলাম, গুজরাটে মোদির ব্যাপারগুলোও আমায় পড়তে হয়নি।

মাঝে মাঝে টিভিতে খবর বা আলোচনা দেখতাম। আমার কাছে টিভি মানেই সিনেমা। হিন্দি সিনেমায় বড্ড বেশি বিজ্ঞাপন থাকে বলে এইচবিও বা স্টারটিভি এইসব দেখতাম। মানু আবার খুব সংবাদ দেখতে ভালবাসে। তাই বাধ্যতই, মাঝে মাঝে, ‘বাবা কী ইন্টারেস্টিং’ মুখ করে সেসব দেখতে হত। পাঞ্জাবের উগ্রপন্থীরা কাগজ থেকে বাঁচিয়েছিল, টিভি থেকে বাঁচিয়ে দিলেন বুদ্ধ। মোদিরটা তো দেখিই নি, বুদ্ধরটা দেখে, সিঙ্গুরে, পরপর দুদিন খুব বমি পেটব্যথা হল। ব্যাস, খেল খতম পয়সা হজম। বেশ বছর দেড়েক আমাদের টিভিটা চালানোই হত না, মানু মাঝে সাঝে আমি বাড়ি না-থাকলে চালিয়ে দেখত, সেটাও এই শর্তে যে আমায় কখনও কিচ্ছু বলবে না কী দেখল। বাড়িতে বাবা আর মানু খবরের কাগজ পড়ে, ওদের বলা আছে, আমায় কখনও কিছু জানায় না। মাঝে অশোকদা এসে একদিন বলল, তোমাদের টিভি খারাপ হয়ে যাবে, অনেকদিন না-চালালে নাকি তাই হয়, আর্দ্রতায়, মানে গতরে শুঁয়োপোকা ধরে যায় টিভির। তারপর থেকে মানু কিঞ্চিত বাড়িয়েছে, দু-তিন দিনে এক আধ বার চালায়, তাও আমি বাড়ি না-থাকলে।

অর্থাত, এখন, বেশ কিছু দিন, বছর তিনেক, আমি সভ্যতার দুটো কুসংস্কার থেকেই মুক্ত, খবরের কাগজ আর টিভি। মানে এক কথায় সংবাদ আর কি। সেদিন দেখলাম, এই গোটাটা নিয়েই বেশ কিছুটা আলোচনা ছিল মাল্যবানের ওই লেখাটায়। জীবনানন্দ, সজনীকান্ত দাশ, কামু, অনেকগুলো প্রসঙ্গ টেনে এনে। তখনই মাথায় এল, নিজের খেয়াল পড়েনি আগে, উৎসাহটা বোধহয় মাল্যবান থেকেই পাওয়া। আলোকপ্রাপ্তির বিপরীত গতিতে, একের পর এক একটা একটা করে আলো নেভাতে থাকা। বয়স হচ্ছে তো, চোখে ছটা লাগে বড়। কবি-তে একটা গান ছিল, বেশ উচ্ছল যৌনতার, চোখে ছটা লাগিল তোমার আয়না বসা চুড়িতে। ওই বয়সে ছটাটা বোধহয় ভালই লাগে।

February 6, 2009

বিড়ি ও নেতাজি

মধ্যরাত অতিক্রান্ত। মধ্যমগ্রাম চৌমাথা থেকে বাণী আসছে, মাইকে, বিড়ি জ্বালাইলে জিগরসে পিয়া – জিগরমা বহত আগ হ্যায়। সুভাষমেলা। কদম কদম বঢ়ায়ে যা। জিগরমা কতটা আগ থাকলে তবেই এটা সম্ভব, এখনো এই মধ্যরাতে বিড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া – এবং যা শুনেছি, সুভাষমেলা শেষ হলে উদ্যোক্তাদের তীর্থভ্রমণের আয়োজনেরও ব্যবস্থা করা। জয়তু নেতাজি।

February 2, 2009

সরস্বতীপুজো এবং মাল্টিতলার পাবলিক জুয়া

একটা খুব সংক্ষিপ্ত ব্লগ, কাজের বড় চাপ যাচ্ছে, কিন্তু এটা এতটাই বিচিত্র যে উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারলাম না।

এবারের সরস্বতীপুজোয় মাইকবাজি ছেড়েই দিন, ও সব চুলোয় যাক, একটা ভারি বিচিত্র অভিজ্ঞতা হল আমাদের পাড়ার মাল্টিতলার ছাদের পুজোয়। সেখান থেকে গাঁক গাঁক করে মাইক বাজিয়ে, গতকাল সন্ধা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলল ‘হাউসি’ নামের একটা জুয়া। সেটা ঠিক কী খেলা আমি জানিনা। কিন্তু যেমন করে ওরা বিজ্ঞাপন করছিল, মাইকে ঘোষণা করে চলছিল, বলছিল যাতে নিশ্চয়ই আরো বেশি লোক এসে যোগ দেয়, ‘দশ টাকা দিন, যত খুশি জিতে নিন’, বা, ‘এটা একটা সংখ্যা ও ভাগ্যের খেলা’, এবং সঙ্গে সঙ্গে ইংরিজি করে জানিয়েও দিচ্ছিল, তাতে এটা যে একটা জুয়া সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম। আমি ঘরে বসে লেখাপড়ার চেষ্টা করছিলাম, এবং এগুলি শুনতে বাধ্য হচ্ছিলাম। কোথায়ই বা যাব? আমার খুব বিচিত্র লাগছিল গোটাটা, এবং খুবই অচেনাও লাগছিল। সরস্বতীপুজোর সঙ্গে কীভাবে জুয়াখেলা সম্পৃক্ত হল কে জানে? এবং মাইকের ঘোষণা থেকেই যাদের যাদের নাম ঘোষিত হচ্ছিল, তার দু-একজনকে চিনিও, তাতে মালুম হচ্ছিল, পারিবারিক ভাবেই অনেকে যোগ দিয়েছে এই জুয়ায়? এবং এরা কেউ সে অর্থে লুম্পেন নয়, সমাজবিরোধী নয়, বৌ-বাচ্চা ছেলে মেয়ে আছে, তারা পড়াশুনোও করে। কোথায় কবে কী করে যে এত  বদলে যাচ্ছে চারপাশটা, বুঝতেও পারিনা। আমার এত অদ্ভুত লেগেছে গোটাটা যে ব্লগে উল্লেখ না-করে পারলাম না।

January 29, 2009

গুরুচণ্ডালী, শব্দজব্দ এবং নাকউঁচুপনা

গুরুচণ্ডালী ওয়েবসাইটে , এই ব্লগের ‘ব্যান্ডপার্টি, নাইটরাইডার এবং গৌরী ধর্মপাল’ লেখাটা ‘বুলবুলভাজা’ বিভাগে ছাপা হয়েছিল। সেখানে নানা জনে নানা প্রতিক্রিয়া লিখেছিল লেখাটা নিয়ে। খুবই মজার সেটা, যে যার যা খুশি মন্তব্য করা। ওই লেখাটা নিয়ে টইপত্তরে আলোচনা চলছিল, অনেক অনেক মন্তব্য। কয়েকটা বিষয় সেখানে এমন এসেছিল যা আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল। তার মধ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা হল, মধ্যমগ্রামের শব্দজব্দ নিয়ে এই লেখাটার মধ্যে একটা উপ্ত নাকউঁচুপনার সম্ভাবনা। সেটা আমার অবশ্যই ঠিক লাগেনি, কিন্তু সেই সমালোচনাটা যে সম্পূর্ণ অকারণ তাও নয়, লেখাটায় এমন কিছু জিনিস এসেছিল যা একত্র হয়ে এই সম্ভাবনাটা তুলে আনে বটে। এমন একটা পাঠ হতে পারে যে, ওটা সে অর্থে ‘প্রাকৃত’ সংস্কৃতির প্রতি একটা বিরূপতা, যার উপাদান লারেলাপ্পা গান, সহগ নাচ, বা বাজি ইত্যাদি। তাও, কেন আমার সমালোচনাটা সঠিক লাগেনি তারও কিছু কারণ আছে। বিষয়টা আমাকে বেশ ভাবিয়েছিল। কিন্তু কিছুতেই সময় বার করতে পারছিলাম না, আজকেও লিখতে হবে বেশ সংক্ষেপে।

১। মধ্যমগ্রামের নাম কেন মধ্যম, এটা একটা রসিকতা বলে মনে আসে, শব্দজব্দের নিরিখে এর একমাত্র নাম হওয়া উচিত উচ্চগ্রাম। সবসময়েই উচ্চগ্রাম শব্দে উচ্চকিত এই গ্রাম, আমরা গ্রামের মানুষেরা তাতে জব্দ হয়ে থাকি। সকাল থেকে রাত, মাঝে মাঝে রাতান্তর অব্দি দিবারাত্রির এই শাব্দিকতা। সকাল থেকে শুরু হয়, হয় রক্তদান নয় ক্রীড়াউন্নয়ণ, নিদেন রাজনীতির মাইক। এটা চলে স্টেশন থেকে চৌমাথা। এর অন্তর্ভুক্ত হলনা এরপর প্রায়ই দোকানে দোকানে এবং দোকানের জবানিতে বিজ্ঞাপনের মাইক। খুব কম সময়ই চলে যখন স্টেশন থেকে চৌমাথা অব্দি ডিভাইডরের ল্যাম্পপোস্টে ল্যাম্পপোস্টে চোঙার টোপরসজ্জা খোলা হয়।

২। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় ফাংশন। কে ফাংশন করে, কেন করে, তারা কী খায়, তারা কজন, এসব প্রশ্ন আজকাল আর মাথায়ও আসে না। ফাংশন হয়, ফাংশনই হল উচ্চগ্রামের একমাত্র ভবিতব্য। এই বিষয়ে এই ব্লগে আরও আলোচনা আছে, পড়ে দেখতে পারেন। এগুলো আগে রাতশেষের আগে থামত না। খুব অদূর অতীতে, মানে ২০০৮ এর ডিসেম্বরে এবং ২০০৯ এর জানুয়ারিতে মাত্র দিন কয়েক ছাড়া কখনোই রাত বারোটা ছাড়ায়নি। এবং এখানে একটা মজা আছে, ডালের মজা তলায় হলে কী হয়, ফাংশনের মজা উপরে। রাস্তার দুপাশে দোকানে ও বাড়িতে আটকা পড়ে যায় শব্দ, প্রায় পাওয়াই যায় না, কিন্তু দোতলার বা তার উপরের তলাগুলোয় এই শব্দের একেবারে হদ্দমুদ্দ হয়ে ওঠে। এবং চারিদিকে প্রচুর পুকুর ছিল একসময়, যেগুলো এখন সবই মাল্টিতলা (গুরুচণ্ডালীর ওই আলোচনা থেকে এই চমৎকার শব্দটা তুলেছি আমি), তার আশ দিয়ে পাশ দিয়ে শব্দ ঘেঁটে গিয়ে, কোন দিক থেকে আসছে সেটা বোঝা খুবই কঠিন হয়। এবং শোনা যাচ্ছে এই কমাটুকুও নাকি পুলিশকে বাদ দিয়ে সরাসরি শব্দদূষণ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে আসছে, তাই কতদিন সেটা চলবে সেটাও বলা খুব কঠিন। আমার বাড়িতে নিয়মিত অনেক ঘন্টা সময় কাটানোর পর অন্তত তিনবার, তিন জায়গার, দক্ষিণেশ্বর, বেহালা এবং শ্যামনগরের তিনজনকে বলতে দেখেছি, মধ্যমগ্রামে কি রোজই ফাংশন হয়, এবং একসঙ্গে কটা ফাংশন হয়?

উপরের এই ১ আর ২ আসলে পরিপ্রেক্ষিৎটা বোঝাতে। এই রকম চলতে চলতে চলতে তিতিবিরক্ত, ব্যথিত, অাতঙ্কিত হতে হতে যা হয়, তখন যা ঘটে, হয়তো আপনার ছানা একটু বাদামের খোসা ঘষল দেওয়ালে, আপনি বদাম করে তাকে একটা কিল মারলেন, আসলে কিলটা মারতে চেয়েছিলেন উচ্চগ্রামের নাগরিকত্বকে। পড়ল গিয়ে তার ঘাড়ে। যেদিন নিয়ে ব্লগের ওই ব্যান্ডপার্টি লেখাটা অনেকটা তাই হয়েছিল। খুব লেখার ও অন্য কাজের চাপ, তার মধ্যে ওই ব্যান্ডপার্টির অসভ্যতা, সব মিলিয়ে ঠিক ওইদিন যে উপাদানগুলি ছিল সেগুলোই চিত্রিত হয়েছিল, সেই উপাদানগুলোর মধ্যে একটা আপাত-প্রাকৃত চরিত্র থাকায় ওই পাঠের সম্ভাবনাটা তৈরী হয়েছিল। কয়েকটা বিষয় পরিস্কার করে ফেলা যাক।

১। যে মানুষগুলোকে খেলার পর, এবং প্রায় যে কোনও কারণেই, পুজো হোক, বিয়ে হোক, পিকনিক হোক, বোম ফাটানোর ক্রিয়ার দেখা যায়, তারা, আর যাই হোক প্রাকৃত নয়। তারা পিপে পিপে মদ, থুড়ি পিপে না হোক বোতল, সাঁটিয়ে থাকে, তাদের ঘরে যথেষ্ট প্রবল আকার ও আওয়াজের টেলিভিশন থাকে, তারা প্রচুর চিপস কেনে, নিজেদের এবং বাচ্চাদের, এবং তারা ফ্ল্যাটের মালিক। এখানে যেগুলি লিখলাম, এছাড়া আরও বহু উপায়ে, পোষাক থেকে বাচ্চার ইস্কুল এবং ইস্কুলের সঙ্গত, এদের অর্থকৌলীন্য স্পষ্ট। এবং আমি যেহেতু আমার নিরিখে ভাবি, এরা অবশ্যই আমার চেয়ে বড়লোক, এবং আমি তো গরিব নই মোটেই। তো? প্রাকৃত কাকে বলে?

২। বিয়েতে রাশিরাশি মানুষের ভূরিভোজে মানে ভুঁড়ি ফাটিয়ে ও বাড়িয়ে ভোজের পরও যারা ব্যান্ডপার্টি দিয়ে, এবং তার সঙ্গে মাইক লাগিয়ে জল আনা ইত্যাদি আচার করাতে পারে তারা প্রাকৃত?

৩। মধ্যমগ্রামের উচ্চগ্রাম শব্দমানচিত্রের একটা ঝলক তো আগেই দিয়েছি। এর পর, এই ফ্ল্যাটগুলি থেকে, সকাল দুপুর সন্ধ্যা গান বাজানো হয়। এবং এর মধ্যে বেশ কিছু সিস্টেম সোনোডাইন তো বটেই, দু-চারটি বোসও আছে। তারপরে আছে কম্পুটারের সঙ্গে লাগানো অ্যালটেক ল্যান্সিং ইত্যাদির সিস্টেম। যার যে কোনওটাই কিনতে গেলে আমাকে অন্য অনেক কিছুতেই গুরুতর মানিয়ে নেওয়ায় আসতে হবে, আর বোস তো আমি চাইলেও কিনতে পারব না। এরা প্রাকৃত?

৪। এরা যে গানগুলি বাজায়, সকাল থেকে শুরু হয়ে যায় ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে আওয়াজ-বাহার, তার বেশিরভাগটাই আবার, কুসুমে কুসুমে থেকে শুরু করে আমার বেলা যে যায়। মানে রুচির একেবারে চূড়ান্ত। তাতে তাদের বীভৎসতা কমে না। বীভৎসতাটা এই জায়গায় যে অন্যের উপর সেই শব্দ চাপিয়ে দেওয়া হয়। আমি এদের অনেকবার বলেছি, অনেককে। বলে, কই খুব একটা জোরে তো বাজাচ্ছি না। সত্যই এর পরে আমার যুক্তি ফুরিয়ে যায়, তার কাছে তো ওই আওয়াজ কমজোরি লাগে বলেই বোস কিনতে হয়। এবং আগে যখন সামন্ত প্রভুরা জলসাঘরে জমিয়ে বসত, তাদের তো বাড়ি থাকত, বাড়ির বাইরে অনেকটা জমি। লেবেন্সরউম, বোধহয়। এখন, এরা ফ্ল্যাট কেনে, এদের শব্দটা ঘরের চেয়ে বেশি বসবাস করে বাইরে। এইটাই ছিল বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি সস্তা হয়ে যাওয়ার প্রতি আমার আক্ষেপ। তার মানে এদের প্রাকৃতপনার বিপরীতে সামন্তদের প্রতি ভালোবাসা নয়।
৫। এর পরেও একটা নাকউঁচুপনার সম্ভাবনা থাকে। বিদ্যার। যে লেখাটার বিপরীতে এই সংস্কৃতিকে স্থাপন করা হয়েছে, সেটা গৌরী ধর্মপালের লেখা, যে লেখা যথেষ্ট বিদ্যে নাড়িভুঁড়িতে না থাকলে লেখা যায় না। কিন্তু এখানেও বিদ্যাটা গুরুত্বের না। গুরুত্বের হল জীবনের প্রতি দরদটা, বাচ্চাদের প্রতি ভালোবাসাটা। একটা পোকার বাচ্চাকেও ভালোবাসতে শেখানো হয়েছে আশ্চর্য কৌটোর গল্পটায়। আর এর বিপরীতে এই বড় টেলিভিশন দামি ইস্কুলের চিপস আর কোল্ডড্রিংক্স খাওয়া বাচ্চারা কী পায়? এদের বাবারা এদের পয়সা দেয়, এবং বাড়ি ফিরেই মদ খেতে বসে, হাফ প্যান্ট পরে। এবং এদের মায়েরা নতুন বুটিকে জামা কিনে ফিরে সিরিয়াল দেখে। এরা প্রাকৃত তো নয়ই, তার চেয়েও বড় কথা, এরা স্নেহহীন, বাবামা হওয়ার যোগ্যই নয়। যদি যোগ্যতা আসে ভালোবাসা থেকে। গৌরী ধর্মপাল এখানে তাঁর বিদ্যার গৌরবে আসেননি। এসেছেন তার বাচ্চাদের প্রতি ভালোবাসার জোরে।

আমি জানিনা, এর পরেও স্পষ্ট করতে পারলাম কিনা আমি যা বলতে চেয়েছিলাম। তবে ওখানের আলোচকদের ধন্যবাদ, ওঁরা পুরো নাম লেখেন না, তাই নাম করে ধন্যবাদ দিতে পারলাম না, ওঁরা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত একটা পাঠের সম্ভাবনাকে দেখিয়ে দেওয়ায়। যদিও ওরা এটা একটা সাহিত্য হিসাবে পড়েছেন, ব্লগ হিসাবে নয়, গুরুচণ্ডালীতে পোস্ট হওয়ার সময় ব্লগঠিকানাটা উল্লিখিত ছিলনা, তাও সম্ভাবনাটা ছিলই।

January 25, 2009

মধ্যমগ্রামের ফাংশন চলছে চলবে …

আজ ২৪শে জানুয়ারি, রাত ১২:০৮, এখনো মধ্যমগ্রামের গৌরববাহী ফাংশন চলছে। যতদূর সম্ভব সুভাষমেলায়, চৌমাথায়। বা, চৌমাথার কাছাকাছি কোথাও। এত ফ্ল্যাটবাড়ি হয়েছে যে কোনদিক থেকে আওয়াজ আসছে বোঝা যায় না। গাঁক গাঁক করে মাইক বাজছে।

মধ্যমগ্রাম থানার নম্বরে, ২৫৩৮৩২৯৪, ফোন করলাম। যথারীতি একজন সাড়া দিলেন, এবং মাইক বন্ধ করানোর অনুরোধে হ্যাঁ বললেন। কিছুই হল না। আবার করলেও তাই হবে। দু তিনবারের পরে সরল পাপহীন গলায় কেউ বলবেন, দেখুন না, বলছি তো, বন্ধ করছে না। এটাই আমাদের কিছু মানুষের নিয়মিত অভ্যাস।

দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের wbpcb.gov.in সাইটে যে কোনও সময় করার জন্য টোল-ফ্রি নম্বর দেওয়া আছে, ১৮০০৩৪৫৩৩৯০, তিনবার ফোন করলাম, কেউ ধরলই না।

আশা করা যাক, ঈশ্বর আছেন …

January 20, 2009

ব্যান্ডপার্টি, নাইটরাইডার এবং গৌরী ধর্মপাল

গতকাল দুপুরে আমার বৌয়ের সঙ্গে পাড়ায় একটি ব্যান্ডপার্টির খুব অশান্তি হয়, রাতে মানু সেটা আমায় বলল। বিয়ের ব্যান্ডপার্টি। আমাদের পাড়ায় খুব আসে। আমাদের এলাকায় ভূমিসংস্কারের প্রবল সাফল্যে পুকুর প্রায় লুপ্ত প্রজাতি, সবই এখন প্রোমো-তাড়িত বহুতল। আমাদের বাড়ির গায়েই একটা পুকুর এখনো অবশিষ্ট, বিয়ের মরশুমে প্রায়ই নানা বিয়েবাড়ি থেকে এখানে জল নিতে আসে। একসময় যেগুলো ছিল আচার, কিছু বৌ উপচার হাতে আসতেন, শঙ্খ নিয়ে, উলু দিয়ে, এখন তার সঙ্গে আসে ব্যান্ডপার্টি, এবং টুইস্ট নাচ। এই নাচের সঙ্গে এলভিসের কোনও সম্পর্ক নেই, হিন্দি সিনেমার নাচ দেখে, এবং নাইটক্লাবের নাচ টিভিতে দেখে নাচ-না-জানা লোক যখন পৃথুল দেহ কামোদ্দীপক রকমে আন্দোলিত করতে চায়, কিন্তু হয়ে দাঁড়ায় বিকটতা, তাকে বলে টুইস্ট, এতদিন মূলত বিসর্জনে নাচা হত, ধীরে বিয়েতে ও অন্নপ্রাশনে, এরপরে বোধহয় শবযাত্রাতেও হবে। কিছুদিন থেকে আবার ব্যান্ডপার্টির সঙ্গে একটি করে রিক্সাও থাকে, তাতে বসানো থাকে মাইক। এবং ব্যান্ডপার্টি বাজাতে থাকে গত কিছুদিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজা হিন্দি গান, যা সর্বত্র, এমনকি বাড়ির ডোরবেলে, ফোনের রিংটোনে অব্দি বাজানো এবং লোককে শোনানো চলছেই।

এই লোককে শোনানো অংশটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কবে যেন আমাদের চারপাশে একটু একটু করে এটা বেড়ে উঠতে উঠতে একটা অশ্লীল জায়গায় চলে গেছে। ট্রেনের গাদাগাদি ভিড়ে ভয়ানক জোরে ফোন বেজে উঠবে, তারপরে আসবে চীৎকারিত কথোপকথন, এবং ঠিক তার পাশের মানুষ হওয়ার কল্যাণে মাত্র সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে শুনে যেতে হবে। এরপর আছে চৈনিক সেলফোনগুলোর কল্যাণে সস্তায় পুষ্টিকর মনোরঞ্জন, খ্যাঁশখ্যাঁশে আওয়াজে ওই গানগুলো দুতিন বন্ধুর মধ্যে বা এমনকি নিজেই, জোরে জোরে, মানে জনসমক্ষে বাজানো। এবং আবার সেই একই গান। এরপর আছে ফাংশন, এক এক পাড়ার এক একটা ক্লাব। কুকুরে যেমন নিজের এলাকার গাছের গোড়ায় মূত্রত্যাগ করে এলাকা চিহ্নিত করত, এখন গাছ আর কোথায়, এই ক্লাবগুলি ফাংশনরবে এলাকা চিহ্নিত করে। যতদূর আওয়াজ যাচ্ছে ততদূর আমার এলাকা, ভোটের দিন ততদূর অব্দি আমার শাসন। তাই এই গোটা শীতকাল জুড়ে প্রবল ফাংশন চলে। এই ব্লগেই আগে একটা আলোচনাও আছে, সেই ফাংশনের দাপট নিয়ে, বাঘা যেমন ধ্রুপদ শুনে ঘাবড়ানো মুখে গুপিকে বলেছিল, কী দাপট। আর পুলিশ ফুলিশ আমাদের এলাকায় একটা নিতান্তই কুসংস্কার, রীতিমত একটা অলৌকিক উপস্থিতি, পরিস্থিতি আক্ষরিকভাবেই অর্থবহ হওয়ার আগে অব্দি তারা কখনো রূপপরিগ্রহ করেনা। ঠিক এই ডিসেম্বর এবং জানুয়ারিতে এই দাপট অনেকটাই লুপ্তপ্রায়, কারণ শুনলাম পুলিশের এই অলৌকিককতায় বিরক্ত পলিউশন কন্ট্রোলবোর্ড নাকি সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করেছে। নিয়ন্ত্রণ মানে কিন্তু রাতটুকু। আগে যেমন ডিসেম্বর জানুয়ারিতে অর্ধেক কি তারও বেশি রাত যেত আমাদের পান খেয়ে আর গান শুনে, এবার রাত বারোটার পরে গেছে মাত্র দিনকয়েক আর সারারাত মাত্র একটিই। ফাংশন মানে আর কিছু না, আবার সেই মাইক এবং আবার সেই একই গান, এবং বীভৎসতর ওই ড্রামবিট।

এবং আরো বীভৎস এই যে বেশিরভাগ মানুষের এটা বীভৎস লাগে না। গতকাল দুপুরে মেয়েকে কোলে নিয়ে ও যখন গিয়ে নিষেধ করে, দুপুরবেলা, এখন বৃদ্ধরা ঘুমোচ্ছে, বাচ্চারা, পাড়ার ভিতর, মাইক বাজাচ্ছেন কেন, তারা বন্ধ তো করেই নি, উপরন্তু নানা বিদ্রূপ করেছে। এবং গোটা পাড়ার মানুষ কেউ আপত্তিও করেনি। ট্রেনে যখন সারাদিনের কাজের পর ক্লান্ত শরীরে ফেরত আসার সময়, মাঝে মাঝে আপত্তি করেছি, সেলফোনে গান বাজানোর বিচিত্রানুষ্ঠানে, কেউ আপত্তি শোনেনি, বরং অসভ্যতা করে বলেছে, কী করব বলুন হেডফোন কেনার পয়সা নেই, অন্য সমস্ত মানুষ চুপ করে থেকেছে। তারা কেউ কেউ আমাকে চেনেনও, মাস্টারমশাই বলেই চেনেন, চুপ করে যান স্যার, ও বলে কোনও লাভ নেই।

কাল রাতে, মেয়ে রু ঘুমিয়ে পড়ার পর, আমরা দুজনে এটা নিয়েই কথা বলছিলাম, কেমন নিঃসঙ্গ একা আর বিষণ্ণ লাগছিল। ওরও আমারও। নিজেকেও বোঝাচ্ছিলাম, ওকেও, ধুর, ও বলে কোনও লাভ নেই, চুপ করে থাকাই শ্রেয়। এবং বোধহয় আমার বাল্য কৈশোর এবং যৌবন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে কেটেছে বলেই এই চুপ করে থাকার পন্থাটা কেমন দমবন্ধকর লাগে। দুজনেরই লাগছিল। আমি আবার ওকে মনে করালাম, ও আবার তো ওই নাইটরাইডার আসছে।

কী সেটা।

আমি বললাম, ওই যে ক্রিকেট। মাঝরাত্তিরে বোম ফাটাবে।

ও। ও বলল। মনে পড়ে গেল ওর। আমাদের বাড়িতে বৃদ্ধ আর বাচ্চা দুইই আছে। তাদের কেঁপে কেঁপে ওঠা, মাঝরাত্তরের বোমের আওয়াজে।

গানের সঙ্গে সঙ্গে এই বোম। বিয়েতে পুজোয় খেলায় সব কিছুতে। খেলা দেখে আনন্দ পেলাম, চমৎকার কথা, তাতে অন্যকে মাঝরাত্তিরে ঘুম থেকে জাগিয়ে বোম ফাটানো কেন, বুঝতে পারিনা। গতবারে আইসিএলে নাইটরাইডার হারা মাত্র একটা উল্লাস হয়েছিল আমার, যাক বোমের অত্যাচার এবার কমবে। সত্যিই কমেছিল, অনেকটাই। তারই সঙ্গে কমেছিল মাঝরাত্তিরে গাবদা গাবদা চেহারার হাফপ্যান্ট পরা লোকের, যারা খেলেনা, শুধু মদ আর চিপস খায়, আর তাদের গাবদাতর বাচ্চারা, যারা খায় কোল্ডড্রিংক্স আর চিপস, এবং সারাদিন লেদিয়ে পড়ে থাকে টিভির সামনে, তাদের ওই বোম ফাটানো, চীৎকার আর নাচানাচি। মনে পড়ছিল, মনটা কেমন শূন্য শূন্য হয়ে যাচ্ছিল। কেন আমারই লাগে, আর কারুর কেন বীভৎস লাগে না, আমিই কি অস্বাভাবিক? এরা আবার যখন নাচে না, তখন জোরে জোরে টিভি চালায়, গান বাজায় সাউন্ডসিস্টেমে। আর ইলেকট্রনিক্সের মত কোন জিনিসই বা সস্তা হয়েছে? খেলা নেই, টিভিতে খেলা দেখা আছে। খেলা গান নাচ সবই টিভি প্রোগ্রাম, লোকগুলো আর তাদের বাচ্চাগুলো শুধু টিভি দেখে আর খায় আর অন্য মানুষকে বিরক্ত করে, অসভ্যতা করে। গোটা সংস্কৃতিটাই হল বোকা অসভ্য প্রতিলিপির। সবকিছুই কপির কপির কপি। বদ্রিলার যেমন লিখেছিল, ট্রান্সপারেন্সি অফ ইভিলে। রাইগর মবিলিস। লোকগুলো টিভি দেখে চলেছে, চিপস খেয়ে চলেছে, ভুঁড়ি বাড়িয়ে চলেছে। কিন্তু আসলে মরে গেছে, সংস্কৃতি বলেই আর কিছু নেই। সবই কপির কপির কপি। গান শোনাও তাই, জীবনচর্য়াও তাই, যৌনতাও তাই, যৌনতা মানেই কিছু অঙ্গভঙ্গী যাকে ইতিমধ্যেই মিডিয়া আমায় যৌনতা বলে চিনিয়ে দিয়েছে। শুধু পুকুর বুজিয়ে বাড়ি কেন, গোটা জীবনটাই এদের প্রোমোতাড়িত। কত কোল্ডড্রিংক্স কত চিপস প্রোমোটেড হবে এই আইসিএল আর নাইটরাইডারের কল্যাণে, খেলা বা শরীর বা জীবন কিছু হোক আর না-হোক।

রাত বাড়ছিল। মানু ক্রমে ওপাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে গত কদিন ধরে রাতে যেটা পড়ছি, টিপিং পয়েন্ট আর ধূর্জটিপ্রসাদ রচনাবলীর একটা খন্ড, মাথার কাছে ছিল, নামিয়ে নিলাম, পড়তে পারলাম না। বেশ কয়েকবার পড়ে গেলাম একই বাক্য, কোনও মানে বুঝছি না। বিছানা থেকে উঠলাম, কম্পিউটারের টেবিলে বসে একটা সিগারেট খেলাম। রু-এর কথা মনে হচ্ছিল, ওকে নিয়ে একটা দুশ্চিন্তাও হয় আমার, বুড়ো বয়সের বাচ্চা, ও সঠিক অর্থে কৈশোর পেতে পেতেই আমার অবসরের দিন চলে আসবে। আর চারপাশে মানুষকে বিরক্ত করার, উত্যক্ত করার এই ব্যান্ডপার্টি আর নাইটরাইডারের সংস্কৃতি। কী মানুষ হবে এতে?

ওর বইগুলো চোখে পড়ল, ছড়ানো রয়েছে, রাতে শুতে যাওয়ার আগেই মানু ওকে পড়ে শোনাচ্ছিল। একটা বই তুললাম, আশ্চর্য কৌটো, লেখক গৌরী ধর্মপাল। মানু এগুলো কিনে এনেছে শিশু সাহিত্য সংসদ থেকে, রু-এর জন্যে।

একটু বাদে, ধীরে, মনটা ক্রমে কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। কী আশ্চর্য বই এই আশ্চর্য কৌটো। কী অদ্ভুত গদ্য, কী আবেগপ্রবণ। আর কী যত্ন করে ছাপা। নিজের মধ্যেই বেশ একটা আরাম এল। সংস্কৃতি তো এটাও। গৌরী ধর্মপাল কে আমি জানিনা, খুব বেশি নামও শুনিনি। ওঁর একটা বই আগেও পড়ছিলাম, সেটাও চমৎকার, ইংলে পিংলে। ও আরও একটা অনবদ্য বই পড়েছিলাম ওনার, বাচ্চাদের জন্য উপনিষদের গল্প। কিন্তু কোনও বইয়েই ওনার বিষয়ে কিছু ছিল না। মানু আর রু পাশে ঘুমিয়ে আছে। ওদের দুজনেরই মাথায় একটু একটু হাত বোলালাম। বেশ লাগছিল। জীবনের সবটাই ওই ব্যান্ডপার্টি আর নাইটরাইডার নয়, এগুলোও তো আছে। গৌরী ধর্মপালের মত লোকেরাও আছে। তাদের এই অসাধারণ রকমের যুদ্ধটাও আছে, ভালো বই লিখে সাংস্কৃতিক ভাবে টিঁকে থাকার যুদ্ধ, এই শুয়োরের মত করে বেঁচে থাকার বিরুদ্ধে।

September 10, 2008

দুটো বই এবং এক পশলা বিষণ্ণতা

২০০৬-এ আমার দুটি বই বেরোয়, একটি গ্নু-লিনাক্স নিয়ে, ‘গ্নু-লিনাক্স একটি ব্যক্তিগত যাত্রা’, প্রকাশক প্রজ্ঞা প্রকাশনী, আর অন্যটি জোড়া উপন্যাস: ‘নিরন্তর প্রব্রজ্যায়: দ্বিতীয় খসড়া’ /  ‘বুলা, তোমাকে’। প্রথমটির প্রাপ্তিস্থান চিরায়ত, এবং দ্বিতীয়টির প্রাপ্তিস্থান দেজ। গোড়ার দিকে লিনাক্সের বইটির বিষয়ে পরিবেশক চিরায়ত বেশ উৎসাহিত ছিল বলেই মনে হয়, কারণ, একাধিক জনের কাছেই শুনেছি, তারা বইটি কিনতে গেলে ওখানের লোকেরা বইটার বিষয়ে প্রশংসাবাচক কথাবার্তা বলতেন, এবং সেটা সম্পূর্ণই স্বতঃপ্রণোদিত। ব্যক্তিগত ভাবে এঁদের কাউকেই আমি চিনিনা। প্রথম বছরের বই বিক্রয়ের হিসাব এবং টাকাও সহজ এবং সম্মানজনক ভাবেই এসেছিল।

২০০৭ এর থেকে সমস্যাটা বাধে। হঠাৎ করেই এরা বই নেওয়া বন্ধ করে দেন, একাধিক ক্রেতাকেও ফিরিয়ে দেন বই নেই বলে। এবং হিসাব দেওয়া নিয়ে ঘোরাতে শুরু করেন। এবং এটা কেন ঘটছে সে বিষয়েও কিছু এরা জানান না। এবং অবভাসও দেজ পাবলিশার্সকে বই দেওয়া বন্ধ করে দেয়।

শেষ অব্দি, বেশ কয়েক মাস ঘোরানোর পর, এই সপ্তাহে তাদের কাছে যে বইগুলি ছিল বই বিক্রি বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে, এবং তার আগে বিক্রি হওয়া বইয়ের টাকা দেয় চিরায়ত। গত কালই ব্যবস্থা করা হয়, নতুন একজন পরিবেশকের, যেখানে দুটো বই-ই পাওয়া যাবে:

প্রকাশ ভবন, ১৫ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা ৭৩। ফোন: ২২৪১৮২৬৬।
আগামী ১৭ই সেপ্টেম্বর ‘দেশ’ পত্রিকায় বইয়ের বিজ্ঞাপনও দেওয়া হবে। বিজ্ঞাপন দিতে মন চায়নি আমার কিছুতেই, কিন্তু বইদুটোর পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে এই সংশয়ে ঝঞ্ঝাট হচ্ছিল আমার দুই বন্ধুর, যাদের মমতায় এই বইদুটো বেরিয়েছে। এবং বইয়ে ছাপা প্রাপ্তিস্থান যেহেতু বদলে গেল, তাই এটা প্রয়োজনীয়ও ছিল। তাই দিতেই হল বিজ্ঞাপন।

অবশ্যই, আমার নিজের কাছে একটা ব্যাখ্যা আছে, একেবারেই বিচ্ছিন্ন এবং অসম্পর্কিত দুটো সংস্থার একই সময়ে এই একই অদ্ভুত আচরণের, নিজেদের লাভের বিপরীতে গিয়ে। এবং কলকাতার রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সম্পর্কের বিষয়ে যাদের ন্যূনতম ধারণা আছে তাদের অনেকের কাছেই ব্যাখ্যাটা সেই একই। কিন্তু সেটা লেখার মত কোনও প্রমাণ আমার হাতে নেই, যা আমার মাথায় আছে তা নিতান্তই কিছু পরিস্থিতিসচেতন আন্দাজ। মজার কথা এই যে এই বইদুটোর কোনওটারই সেই অর্থে কোনও রাজনৈতিক সত্তা নেই, গত দুই দশক জুড়ে কোনও সরাসরি রাজনীতির ছোঁয়া নেই এদের লেখকেরও, এই লেখকের প্রতি এমন কিছু মানুষের বিরক্তি ছাড়া যারা রাজনৈতিক ভাবে শক্তিমান, বা, যাদের রাজনৈতিক ভাবে শক্তিমান মাতুল বা পিতৃব্য আছেন। মাতুল বা পিতৃব্যেরা তো শুভাকাঙ্খীই হয়ে থাকেন, হয়তো আনন্দবাজার গ্রুপে বিজ্ঞাপন দেওয়ার বিরুদ্ধে আমার কুসংস্কার দূরীকরণেই এরা এটা করেছেন।
যারা এই বই‌দুটো কম্পুটারে পড়তে চান, তারা পেতে পারেন ওয়েবসাইট থেকে, দীপঙ্কর দাশ / ত্রিদিব সেনগুপ্তর লেখালেখি, ওখানে গেলে বাংলা লেখালেখির আর লিনাক্সের পাতায় পেয়ে যাবেন।

« Previous PageNext Page »

Powered by WordPress