নেটখাতা

August 19, 2010

সায়মিন্দুর জন্যে প্রেশার কুকারে গোরুর মাংস

সায়মিন্দু এখন একা একা থাকে, এমআইটি-তে। কাল রাত্তিরে ও জানিয়েছিল, প্রেশার কুকারে গোরুর মাংস রাঁধার একটা সহজ প্রক্রিয়া ওকে জানাতে। আজকে সেটা ওর জন্যে লিখলাম। সঙ্গে সঙ্কর্ষণ-সুস্মিতকেও পাঠিয়েছিলাম। সঙ্কর্ষণ বলল এটা ব্লগ করতে। তাই গোটা ইমেলটাই, তারপর তার সংযোজন সহ পোস্ট করে দিলাম ব্লগে।

প্রেশার কুকারে গরুর মাংস

ধরে নিচ্ছি এক কেজি মাংস। ধরে নিচ্ছি টক দই নেই।

৬ টা মাঝারি পেঁয়াজ কুচিয়ে নিবি। তার চারটে লাগবে মাংস মাখার সময়ে। ২ টো
লাগবে রান্নার সময়ে। হলুদ, আদা, গোলমরিচ, রসুন, সর্ষের তেল। আর পারলে
একটু মেথি। মেথিটা দিতে পারলে খুব ভাল হয়, না দিতে পারলেও ঠিক আছে।
আদাবাটা দোকানে পাবি, কিনে নিস। আর গোলমরিচ গুঁড়ো। রসুনটা কুচিয়ে দিতে
পারলে ভাল হয়, বাটার চেয়ে। রসুন একটা গোটা কোচানো, বা বাটা পেলে দুই চা
চামচ।

১। টুকরোগুলোর গায়ে নুন মাখিয়ে নে। নুনটা একটু চড়ার দিকে হবে। ৪টে পেঁয়াজ
কোচানো দিয়ে মাংসটা ভাল করে মাখ। সঙ্গে একটু কাঁচা তেল, ধর দুই পলা, মানে
পলা প্রতি আড়াই চা-চামচ তেল। ভাল করে মেখে, হলুদ দিবি। আদাবাটা (দুই
টেবিল চামচ, সমান সমান) আর গোলমরিচ গুঁড়োটাও মাখিয়ে দিবি। ধর এক কেজি
মাংসের জন্যে চার চা চামচ গোলমরিচ গুঁড়ো। একদম শেষে দুই টেবিল চামচ
ভিনিগার। প্রতিবার একটা একটা করে জিনিস দিয়ে একবার করে মাখবি। রান্না
মানে হাতুড়ি মারা নয়। এই গোটাটা একটা ঢাকা দেওয়া পাত্রে করে ফ্রিজে কম
ঠান্ডায় রেখে দিতে হবে। ঘন্টা ছয়েক। ওদের দেশে ঠান্ডা কেমন জানিনা,
বাইরেও রাখা যেতে পারে। নিজে বুঝে নিস। ধরে নিচ্ছি ওটুকু বোধবুদ্ধি আছে
তোর। এর পরের ধাপটা (২) শুরু হচ্ছে, ওই মাংসটা মাখা অবস্থায় ফ্রিজ থেকে
বার করার পরে, মানে ঘন্টা ছয়েক বাদে। সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু
কিছুটা সময় রেখে দিতে পারলে স্বাদটা ভাল আসে। যদি মেথি পাস, তাহলে দেড়
চা-চামচ মেথির গুড়ো এই মাংসের সঙ্গেই মেখে দিবি। এতে ভারি উমদা একটা গন্ধ
আসে।

২। গোরুর মাংসের সঙ্গে বড় গোল গোল আলু বেড়ে লাগে, দুটোই দেখ ‘গো’ দিয়ে
শুরু। তাই অমন আলু গায়ের ছালটা একটু ছাড়িয়ে নিয়ে, মানে বাঘের গায়ের ডোরার
মত, একটা ফালি ছাল, একটা ফালি ছাড়ানো, ছাড়ানোর মধ্যে মধ্যে ছাল, নাকি
ছালের মধ্যে মধ্যে ছাড়ানো বোঝা যাবে না, এই ভাবে গোটা ছয়েক আলু প্রেশার
কুকারে অল্প তেলে হলুদ নুন মাখিয়ে ভেজে নিতে হবে। তুলে একটা পাত্রে রেখে
দুই বড় কাপ জল দিয়ে রাখবি। ওই জলটাই পরে ঝোলে ব্যবহৃত হবে। ভাজার আগে
তেলটা রাগিয়ে নিতে হয়। মানে তেল প্রেশার কুকারে দিয়ে (আলু ভাজার জন্যে
তিন চা চামচ পর্যাপ্ত) প্রেশার কুকারের ঢাকনা খুলে রেখে, আগুনটা বাড়িয়ে
দিতে হবে। যখন দেখবি গবগব করে ধোঁয়া উঠছে, বা, মুন্ডু বেঁকিয়ে আলোর
প্রতিফলনে তেলটা দেখলে একটা ঘুমন্ত ফুটে ওঠা আবিষ্কার করা যাচ্ছে, তখন
বোঝা যাবে তেলটা ক্রুদ্ধ। তখনই আলু দিতে হবে। খুন্তি দিয়ে নাড়িয়ে যেতে
হবে। ধর প্রতি পাঁচ সেকেন্ড অন্তর, আলুগুলো যেন এক, পিঠ উল্টে যায়, আর
দুই, প্রেশার কুকারের নিচের বৃত্তের পরিধি আর কেন্দ্রের মধ্যে অবস্থান
বদলায়। একটু বাদে, লাল লাল (বলা যায় হালকা সুপুরি রং, কারণ, হলুদ আছে
ওগুলোর গায়ে, তার সঙ্গে লাল লাল আভা) হলে নামাতে হবে। মনে রাখিস,
বনভোজনের গল্পে তেল রাগার আগে প্যালা মাছ দিয়েছিল, ফলতঃ ওর নাম টেনিদা
তালিকা থেকে কেটে দেয়। পরে অবশ্য সবার নামই কাটা যায়, সে অন্য গল্প।

৩। আলু ভাজা হয়েছে খুব অল্প তেলে, তার তেলটা প্রেশার কুকারে মৃদু লেগে
লেগে আছে, এই অবস্থায়, আরও দুই চা চামচ তেল দিয়ে, একটু অপেক্ষা করে,
কিন্তু পুরো রাগার দরকার নেই, কারণ প্রেশার কুকারে গরম তেল কিঞ্চিত আগে
থেকেই আছে, রসুনটা, হয় বাটা নয় কোচানো, যাই হোক, দিয়ে দে। এবং খুন্তি
নাড়তে থাক। নইলেই পোড়া লাগবে, মানে কাল হয়ে যাবে। এইসময় আগুন কমানো আছে।
রসুনটা যখন একটু বাদামি বাদামি হয়েছে, একটু চিনি (এক চা চামচ) দিয়ে দে।
আমি যখনই যাই লিখছি চা-চামচ দিয়ে, তার মানে সমান চা চামচ, উঁচু নয়। একবার
দুবার নেড়েই অন্য দুটো পেঁয়াজের কুচি দিয়ে দে। সঙ্গে এক চা চামচ হলুদ, আর
১/৩ চা চামচ নুন। এবার চার চা চামচ সর্ষের তেল দিয়ে আগুনটা পুরো বাড়িয়ে
নাড়তে থাক।

৪। পেঁয়াজে একটা গাঢ় হলদে বাদামি রং এলে, আগুনটা একদম কমিয়ে দে। মেখে
রাখা ওই পুরো মাংসটা মেখে রাখার পাত্র থেকে কাখিয়ে কাখিয়ে প্রেশার কুকারে
দিয়ে দে। যতটা পারিস কাখিয়ে নে। এবার সাঁতলানো আলু ভিজিয়ে রাখা জলটা
পুরোটা এই পাত্রটায় দিয়ে দে। আলুর গায়ের তেলটুকুও দেখ চলে এসেছে এটায়।
এবার মাংসটা যে চুলায় চড়ানো, তার পাশের চুলাটায় ওই জলটা কম আঁচে চড়িয়ে
দে। ওটা গরম হতে থাকবে।

৫। প্রেশার কুকারের ঢাকনাটা এবার উপরে রেখে দে, যাতে প্রেশার কুকারের
মুখটা ঢেকে যায়। কিন্তু ঢাকনাটা লাগাবি না, নিছক উপরে রেখে দিবি। এবার
আগুনটা বাড়িয়ে দে। এখন থেকে প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর একবার করে ঢাকাটা
তুলবি, খুন্তি দিয়ে নেড়ে দিবি — নিচের মাংস উপরে, কেন্দ্রের মাংস
পরিধিতে — এই নিয়মে। পাশের চুলায় জল গরম হচ্ছে।

৬। বার চারেক এরকম হওয়ার (মানে অন্যূন কুড়ি মিনিট) চলার পরে, খেয়াল
রাখবি, মাংস থেকে জলটা বেরিয়ে আসবে, এবং খুন্তিটাও একটু আঠালো লাগবে, তখন
ঢাকাটা খুলে দিবি, এবং আঁচটা একদম কমিয়ে দিবি। এই কুড়ি মিনিটটা মুরগিতে
মিনিট সাতেক এবং পাঁঠায় মিনিট বারো তের লাগে মোটামুটি। ওখানের গোরুর মাংস
ঠিক কেমন হয় আমি তো জানিনা, আশা করছি এখানের রেয়াজি পাঁঠার চেয়ে সামান্য
বেশি সময় লাগবে।

৭। এখন থেকে, প্রতি দু-তিন মিনিট অন্তর একবার করে নাড়বি মাংসটা। যখন
দেখবি (আশা করছি মিনিট পনেরো পরে) মাংসটা একটু লেগে লেগে যাচ্ছে, তার
মানে কষানো সম্পূর্ণ। এবার আলুগুলো দিয়ে দে। অন্য চুলায় গরম হতে থাকা
জলটা দিয়ে দে। দুই চা-চামচ সর্ষের তেল দিয়ে দে, এবং দুই চা-চামচ গোলমরিচ
গুঁড়ো। দিয়ে প্রেশার কুকারের ঢাকনা লাগিয়ে দে। এবং আঁচ কমানোই থাকবে।

৮। একটা ভোঁ পড়ার পরে আগুন বন্ধ করে দে। মিনিট কুড়ি পরে, ধীরে ধীরে
ঠান্ডা হয়ে এলে, ওটা খুলে নুনটা দেখে, দরকার পড়লে পরিমাণ মত নুন, কাঁচা
তেল, এবং গোলমরিচ গুঁড়ো দিয়ে, প্রেশার কুকারের ঢাকনা লাগিয়ে, কিন্তু
ভেন্ট-ওজনটা না-লাগিয়ে আর একবার অল্প ফুটিয়ে নে। মাংস সম্পূর্ণ।

সংযোজন

১। মেথিটা গুঁড়ো করার আগে শুকনো প্রেশার কুকারে নিম্নতম আঁচে একটু নেড়ে
নিস। গাঢ় বাদামি রং হলে নামিয়ে, পেষাই যন্ত্রে গুঁড়ো করে এটাকে একটা
বাটিতে রেখে দিস আগেই।
২। মাংসটা প্রথমবার প্রেশার খুলে যদি দেখিস সিদ্ধ হয়নি তাহলে আর একবার
(বা যেমন প্রয়োজন) ভোঁ দিয়ে নিস। মার্কিন গোরুরা কেমন হয়, দানাদার না
ছিবড়ে না কোমল তা আমার জানা নেই — কতটা ভোঁ তাদের প্রয়োজন পড়ে।

Filed under: ব্যক্তিগত, রান্না — dd @ 1:55 pm

Powered by WordPress