নেটখাতা

September 29, 2009

পুজোর ব্লগ

আমাদের নিজেদের মেলিং লিস্টে অন্য একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল। তার মধ্যে সুস্মিত লিখল, ‘দীপঙ্করদা, পুজোয় একটা ব্লগ লেখো’। আমরা সকলেই বেশ মজা পেলাম, পুজোয় চাই নতুন ব্লগ। তখন থেকেই মাথায় বিষয়টা নিজের গোচরে অগোচরেই কাজ করছিল, যেন পুজোটাকে লক্ষ্য করছিলাম, সবসময় ভাল করে নিজে না-বুঝেই।

লক্ষ্য করে চলার কিছু সুযোগও আসছিল এবার। আমিই এতটা বুড়ো, আমার বাবা-মা নিশ্চিতভাবেই আরও প্রচুরতর বুড়ো, মানু কিছুদিন ধরে বলছিল, তাদের অনেকদিন ধরে ইচ্ছে রু-এর সঙ্গে পুজোয় ঠাকুর দেখতে যাবে, আর কবে কী হবে না-হবে, সেটাও এবারেই সংগঠিত করা হয়েছিল। রু, বাবা, মা, সঙ্গে সবিতা আর পার্বতী, বহু বছর ধরে আমাদের বাড়িতে কাজ করে, মানু, আর আমি। গাড়ি করে কলকাতা যাওয়া, ঠাকুর দেখা, আর সঙ্গে, যেমন দস্তুর, বাইরে কোথাও খেতে হবে, অ্যাম্বার-এ খাওয়া।

অদ্ভুত লাগছিল নিজের এটা ভাবতে, কিন্তু এটা সত্যি, এটা সে অর্থে আমার প্রথম ঠাকুর দেখতে যাওয়া। খুব ছোটবেলায়, আমাদের ছোটবেলায়, কলোনি থেকে অভ্যস্ত মফস্বল হয়ে উঠতে চাওয়া মধ্যমগ্রামে, বা তারও আগের শিশুবয়সের নিউব্যারাকপুর, সেজেগুজে ঠাকুর দেখতে যাওয়া মণ্ডপে মণ্ডপে তখন কেবল একটু একটু চালু হচ্ছে, কোনওক্রমে টিঁকে থাকা মানুষের একটু একটু করে ক্রমসঞ্চয়মান সময় ও সারপ্লাস, একটু আধটু বোধহয় গেছিও অমন, খুব ছোটবেলার আবছা স্মৃতি ঘেঁটে মনে হচ্ছে। বা এমনও হতে পারে, ওরকমই তো হওয়ার কথা, তাই ওরকম ভেবে নিচ্ছি, অন্য ছবি দিয়ে স্মৃতির ভাঁড়ারের ফুটো মেরামত করার চেষ্টা করছি।

যেটা পুজো সংক্রান্ত স্মৃতি আমার খুব স্পষ্ট ভাবে আছে, সেটা পাঁচ ছয় নাগাদ, নিউব্যারাকপুরের স্মৃতিটা ঠিক পুজোর নয়, পুজো উপলক্ষে ব্যায়ামসমিতির করা শরীরের পেশী প্রদর্শন, আর মামাবাড়িতে, মধ্যমগ্রামের বিধানপল্লীতে, দুলুদার দোকানের সামনে ফাঁকা মাঠে পুজোর মণ্ডপে, খুবই মাঠো সব, বাঁশের বেড়ার গায়ে চটের আবরণ, তার মধ্যে তখনকার ডেকরেটরের কাঠ-পিজবোর্ডের চেয়ারে বসে আমি আর গজো, তখনকার এক সঙ্গী, একটা খেলনা পিস্তল দিয়ে মারামারি করছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য: যুদ্ধে আমিই জিতেছিলাম। ফিরে এসে আমার মামাতো ভাই লবকে সেই জয়ঘোষণায় আমার করা বাক্যটা আমার এখনও মনে আছে, গজোকে জুতো পালিশ করে দিয়েছি।

এর পরের কয়েকটা বছর জুড়ে, মেয়েদের প্রতি, উজ্জ্বল পোষাকের প্রতি আকর্ষণ ছাড়া পুজোর উৎসবের আর যে জিনিসটা মনে আছে সেটা হল মণ্ডপে বসে থাকা। আমি চিরকালই বেজায় কুঁড়ে, বসে বসে চেয়ে থাকার চেয়ে বেশি সক্রিয় কোনও ক্রিয়া আমায় আজও তেমন একটা টানে না। এই মণ্ডপে বসে থাকা, মণ্ডপের নানা, তেমন সুশ্রী নয় বিষয় আমার মাথায় রয়ে যাওয়া কাজ করেছিল ‘তপন বিশ্বাসের খিদের বত্রিশ ঘন্টা’ লেখার সময়ে। আর লেখায় ওটা চলে আসা নিয়ে বেশ অদ্ভুত এবং কুৎসিত একটা অভিজ্ঞতা আমার প্রায় ওই বয়সেই হয়েছিল। হিন্দুস্কুলে আমাদের ক্লাস সেভেনে বাংলা পড়াতেন যে মাস্টারমশাই, হঠাৎ এই লিখতে গিয়ে দেখছি তার নামটা মনে করতে পারছি না, তিনি বাংলা রচনা লিখতে দিয়েছিলেন, রথের মেলা নিয়ে। আমি সে বছরই রথের মেলায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম, কীর্তন যেখানে হচ্ছে সেই গোটাটা। সেখানের একটা উপাদান আমি রচনায় এনেছিলাম। কীর্তনের খোল বাজাচ্ছে যে লোকটা, মাড়ি আর দাঁত কালো, একটু উঁচু, কোনও নারী এসে কাছে দাঁড়ালেই তার দিকে একটু ঝুঁকে যাচ্ছে আর তার খোলের বাজনার জোরও বাড়ছে একটু। গোটাটা সত্যি, আমার এখনও ছবিটা মনে আছে, ঝাপসা ঝাপসা। কী ভাষায় লিখেছিলাম মনে নেই। আমায় ক্লাসে উনি দাঁড় করিয়ে জিগেশ করলেন এটা কী লিখেছ, রম্যরচনা? আমি শব্দটার মানে জানতাম না, এর অনেক বাদে জেনেছিলাম, এবং কী উত্তর দিয়েছিলাম তা আজ আর মনে নেই, কিন্তু উনি আমায় বেঞ্চ থেকে বার করে এনে মেরেছিলেন। আমি সেই মুহূর্তে ভারি ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে গিয়েছিলাম, এবং মার চলাকালীনই বুঝতে পারছিলাম, আমি যা-ই উত্তর দিতাম উনি বোধহয় মারতেন। এখনকার বাজারে এটা বেশ কঠিন, কিন্তু কাম বা যৌনতা নিয়ে কোনও দূরাণ্বয়ী কথাও তখন কী ভীষণ হিংস্রতা বার করে আনত। তখন সেটা বুঝিনি, লোকটা যে পাঁঠা, মজাটা বুঝল না, এটাও বুঝেছিলাম অনেকটা বাদে।

আর এর মাঝেই শুরু হয়ে গেল রাজনীতি। সেই কৈশোর বয়সেই। তখন তো তত্ত্বটত্ত্ব কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু যে লোকগুলো এলাকায় রাজনীতি করত, সিপিএম রাজনীতি, গজোর বাবা তাদের একজন, নিউব্যারাকপুরের অমূল্যজ্যাঠা আর একজন, দেশহিতৈষী নিয়ে আসত আমাদের বাড়িতে, বহুবছর জেল খাটা, দাড়িতে চুলে কিছুটা রূপকথা হয়ে ওঠা সুরেশজ্যাঠা ছিলেন, এরা যে চারপাশের মানুষগুলোর থেকে অনেকটা অন্যরকম, সেটা সেই তখনই বুঝতে পারতাম, কেমন একটা অন্য অনুভূতি হয়, স্বপ্ন দেখানো রকমে একটা কিছু। একটা ভাল অনুভূতি হত, এখনকার সিপিএমদের দেখলে ঠিক যার উল্টোটা হয়। আমি এঁদের নিয়ে কোনও রূপকথা তৈরি করছি না। অতটা ছেলেমানুষ আমি ছেলেবয়সেও ছিলাম না, অনেককিছুই চোখে পড়ত আমার। আটাত্তরের পর থেকে এই লোকগুলোই ক্রমে, তাদের চারপাশ পরিজন পরিবেশ, ক্রমশঃ গেঁজে যেতে শুরু করল, ওই স্বাধীনতা আন্দোলনের পেনশনের মত আত্মত্যাগের বাড়িভাড়া পেতে ও নিতে শুরু করল, দেখলাম। কিন্তু তার আগেই রাজনীতি এসে গেল।

রাজনীতির সেই কিশোরবয়স থেকেই পুজো মানেই হয়ে উঠল অনেক অনেক বই পড়ার অবিমিশ্র ছুটি। শারদীয়া যে কোনও সংখ্যা, বেশ মোটা হলে আমার একদিন ছাড়াত, নয়তো দিনের দিনই নেমে যেত। এর পরপরই এসে গেল পার্টির পুজোর বইয়ের স্টল। বইয়ের সঙ্গে বসে থাকতে, পড়ে থাকতে, এমনকি ঘুমিয়ে থাকতে অব্দি বেজায় ভালবাসতাম চিরকালই। একবার একটা গল্পে একটা চরিত্র লিখেছিলাম যে সঙ্গে বই মানে অক্ষরের কবচকুণ্ডল না থাকলে ট্রেনে উঠতে ভয় পেত, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগত, আত্মপরিচিতি ঘেঁটে যেত তার, সেটা নিজের প্রতিক্রিয়া থেকেই। কম্পিউটার এই উপকারটা করেছে আমার, অন্য অনেক কাজে সাহায্যের পাশাপাশি, বইপ্রতিমার বাতিক দূর করেছে। তবে বোকা ইগোর আত্মঘোষণাটা থাকেই, হয়তো সেটা করে উঠতে নিজেকে অনুমতি দিই না, বা নিজের অগোচরে হয়ত দিয়েও ফেলি, কিন্তু তার প্রতিমাটা অন্তত বদলেছে।

তাই, পুজো ও ঠাকুর দেখতে যাওয়া আমার এই প্রথম। ওরকম শোভাযাত্রা করে দামি জায়গায় খেতে যাওয়াটাও। এখন তো একটু পয়সাটয়সাও হচ্ছে আমার। বুড়ো হতে হতে যেমন হয়েই থাকে।

এবার আরও একটা নতুন জিনিস করলাম। জীবনে প্রথম। বিসর্জনের মিছিলে যাওয়া। রাজনীতির মিছিলে অনেক হেঁটেছি। অনেক রকম। কিন্তু বিসর্জনের মিছিলে এই প্রথম। আর আমার তো সেই খুব ছোটবেলার পর থেকে ভক্তিটা কেমন একটা খসে গিয়েছিল, কোনও কিছুতেই কোনও ভক্তি হত না, লোককে না ঠাকুরকে না। আমার ক্ষেত্রে এটা অন্তত একটা বিষাক্ততা নিয়েই এসেছিল। একটা প্যারানইয়াও হতে পারে, সবাই এটা করছে, আমায় করাতে চাইছে, তার মানেই এটায় কোনও বদমাইসি আছে। কোনও ভক্তি নেই বলে জীবনের খুব একা খুব তিক্ত সময়গুলোয় মাঝে মাঝে নিজেকে খুব একা বোকা এবং বিষণ্ণও লেগেছে, আমার হায় নালিশ জানানোর কোনও জায়গাও নেই। তাই অন্য মানুষগুলোকে, তাদের খুব আবেগ হচ্ছে, ফাঁকা মণ্ডপ দেখে, ঠাকুর চলে যাচ্ছে, কেঁদে ফেলছে, আর সেই লোকগুলোকে তো আমি বেশ ভালই বাসি, পছন্দ করি, তাদের খারাপ লাগায় আমারও লাগছে। এই গোটাটাই আমার বেশ কৌতূহলোদ্দীপক আর আকর্ষণীয় লাগছিল।

এই দুটোকে মিলিয়ে অনেকটা লেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ভূমিকাটা বড্ড বড় হয়ে গেল। আর একটা ঘটনা কাল রাত থেকে ভীষণ খারাপ একটা অনুভূতি দিচ্ছে। সেটা উল্লেখ করে আজকের ব্লগটা শেষ করি। ওগুলো নিয়ে হয়তো পুজোর ব্লগ ২ লিখব এর পর।

এবারের পুজোর কলকাতা দেখে, এবং অন্যদের কাছ থেকে শুনেও যা পেলাম, বেশ শান্তিপূর্ণ ছিল। মাইকের এবং বাজির কদর্যতা বেশ সহনীয় ছিল। গোটা গাদটা এসে জমা হয়েছে মফস্বলে। সারাদিন ধরে প্রবল জোরে মাইক বেজেছে সর্বত্র, রাত্তির এগারোটা নাগাদ মোটামুটি হয়ত বন্ধ হয়েছে, অন্তত মধ্যমগ্রাম নিউব্যারাকপুরে, কিন্তু সারাদিন ধরে সে যে কী কষ্ট হয়েছে। অজস্রবার জানানো হয়েছে গিয়ে, রীতিমত অসুস্থ লাগছিল, কিন্তু কিছু তেমন লাভ হয়নি। আর বাজি ফেটেছে ভয়ঙ্কর। খারাপ অভিজ্ঞতাটা সেই বাজি নিয়েই।

আমার এক বহু পুরোনো ছাত্র, এখন আমার বন্ধু, তার বউ অন্তঃস্বত্তা। সেখানে নানা সমস্যাও আছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আর ওর প্রথম বাচ্চা সাড়ে তিন বছর বয়েস। নিউব্যারাকপুরে ওদের বাড়ির কাছে গতকাল বিসর্জনে এমন বাজি ফেটেছে, সেই সাড়ে তিনের মেয়ে ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে বমি পায়খানা করে ফেলেছে। সেটা শোনা থেকেই এত কষ্ট হচ্ছিল। আমাদের এখানেও, ঘুমন্ত বাচ্চারা কেঁপে কেঁপে উঠছিল। এবং এটা চলে অন্তত রাত একটা দশ পর্যন্ত। আমি ঘুমোতে পারছিলাম না আওয়াজে। ওই সময়ে আমি ওষুধ খেয়ে ঘুমোতে গেছিলাম।

এবার আওয়াজের মাত্রা আবার বেড়েছে, শুনছি যুক্তিটা নাকি শ্রমিকশ্রেণীর হয়ে। যদি শব্দবাজি না হয় এরা কোথায় কাজ পাবে? এ যে কি অদ্ভুত যুক্তি। তাহলে পাইপগান তৈরিকেও স্বীকৃতি দিতে হয়, নইলে শ্রমিকদের কী হবে? বাজি বানাতে কি এতটাই দক্ষতা লাগে, ইতিহাসের মাস্টারমশাই যেমন অঙ্ক শেখাতে পারেন না, যে এই শব্দবাজি-শ্রমিকরা তুবড়ি বা রংমশাল বানাতে পারবেন না?

ছত্রধর মাহাতোকে ধরা হল রাষ্ট্রের বিরোধিতার দায়ে। তাহলে ‘লালা বাংলা ছেড়ে পালা’ আর ভুল ইংরিজিতে ‘ওদের ভাষাতেই ওদের উত্তর দেওয়া হয়েছে’ এই দায়ে বিমান-বুদ্ধকে কেন ধরা হবে না কে জানে? আইনবিভাগকে অপমান করা মানেও রাষ্ট্রবিরোধিতা। বা, মুখ্যমন্ত্রী হয়েও, সংবিধানের ভাষা না বলে দুষ্কৃতীদের ভাষায় কথা বলতে চাওয়া অবশ্যই রাষ্ট্রবিরোধিতা। এরা এই অসভ্যতা গুলো করে করে যা করেছেন তা হল কোনও রকমের কোনও প্রকারের কৌম অস্তিত্ত্বটাই মুছে গিয়েছে, কোনও অনুশাসনের প্রয়োজনীয়তাও। তাই কোনও ক্রমে দম চেপে কলকাতা থেকে তাড়ালেও তা এসে জোরতর হয়ে চেপে বসছে কলকাতার বাইরে, খ্রীষ্ট যেখানে হাঁটেননি।

May 25, 2009

কলকাতা এবং আরও নানা কলকাতা

মধ্যমগ্রামকে কিছুদিন আগে বৃহত্তর কলকাতার পোস্টাল নেটওয়ার্কের পিন নম্বর দেওয়া হল। গত বছর দুয়েক মধ্যমগ্রামের পিন ৭০০১২৯, মানে কলকাতার বিভিন্ন এলাকার মত ৭ দিয়ে শুরু। যে সময়টায় হয়েছিল, তখন বেশ কয়েকবার শুনেছি, এ অন্যকে বলছে: কি, মধ্যমগ্রাম তো কলকাতা হয়ে গেল। এবং তার মধ্যে বেশ একটা গৌরববোধ। ছেলে আমেরিকায় চাকরি পেয়ে গেলে যা হয় তার একটা নরমতর প্রতিভাস। যদিও এই কথাও শুনেছি, আদতে নাকি এই কলকাতা হওয়া কোনও কলকাতা হওয়াই নয়, এটা শুধু ডাক-ও-তার বিভাগের জন্য প্রযোজ্য। যাই সত্যি হোক, তাতে মধ্যমগ্রামের পান-বিড়ির দোকানের মাথাতেও উজ্জ্বলতর অক্ষরে কলকাতা ১২৯ লেখা আটকায়নি। উজ্জ্বলতর, কারণ এখানে একটা চলমান বাস্তব সময়ের পদচিহ্ন থাকছে, যখন সাইনবোর্ডটা লেখা হয়েছিল তখনও তো আমরা গরীয়ানতর এই নাগরিকতার অন্তর্গত ছিলাম না।

কিন্তু আমরা কলকাতার নাগরিকই হই, অহো, আর না-ই হই, হায়, তাতে কলকাতার সঙ্গে আমাদের ভৌগোলিক দূরত্বটা বদলায়নি। আমাদের রেলটিকিটের গায়ে লেখা থাকে, কলকাতা ১৯ কিমি, এটা শিয়ালদা ইস্টিশন থেকে মধ্যমগ্রাম। আবার মধ্যমগ্রাম চৌমাথা থেকে উল্টোডাঙ্গা মোড় ২০ কিমি। এই রেলে ১৯ বা বাসে ২০ এর কোনওটাই তো এমন দূরত্ব নয় যা দিয়ে বোঝানো যায়, গত দশ বছর ধরে (প্রতি নির্বাচনের আগে মাসদেড়েক ছেড়ে দিয়ে) দিনে গড়ে ছয়-সাত ঘন্টা এবং কমপক্ষে দুই ঘন্টার লোডশেডিং। এবং যখন কলকাতায় লোডশেডিং হলেই সেটা খবর হয়। সত্যি কথা বলতে কি,  আমার ল্যাপটপে চলে যাওয়াটা একদমই এই লোডশেডিং-এর কারণে। সকালের খাবার খেয়ে কলেজ চলে যাওয়া ল্যাপটপ নিয়ে, এবং অনেক রাতে কলেজ থেকে ফেরা, কারণ কলকাতায় কোনও লোডশেডিং হয় না। এই পার্থক্যটা এতটাই নাটকীয় যে প্রথম দিকে আমার দু-এক সহকর্মী বিশ্বাস করত না। প্রতিহিংসাপরায়ণ ক্রোধে আমি একটা ভয়ঙ্কর জিনিস শুরু করেছিলাম। যেদিন বাড়ি আছি, লোডশেডিং হওয়া মাত্র ফোন করে তাদের সেদিনের বিদ্যুৎচিত্রটা জানানো।

তফাতটা আমাদের সমাজে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা তফাত, কিন্তু এটা মানতে বেশ কষ্ট হত, এখনও হয়, কিন্তু কষ্টটা সয়ে গেছে, নিজেকে নিচু জাতের বলে এতবার মানতে হয়েছে এই গোটা জীবন জুড়ে। কলকাতায় সাংবাদিকরা থাকে, নেতারা থাকে, মিডিয়ার নজরে পড়ে যায়। ক্রাইস্ট হেঁটেছিলেন ইবোলি পর্যন্ত, আর কারেন্ট হাঁটেন কলকাতা পর্যন্ত। এই কিছুদিন আগে যখন কলকাতায় প্রচণ্ড লোডশেডিং প্রচণ্ড লোডশেডিং বলে বিরাট ধুমধাড়াক্কা হচ্ছিল, একটা গোপন মজা খেলা করত মাথায়। বোঝ শালা, আমাদের তো এটা সয়ে গেছে, তোদের তো হয়নি, তাই আমরা নিচু জাতের বলে একটা সুবিধার জায়গায় আছি।

এবং কলকাতা থেকে ১৯ বা ২০ দূরত্বেই যদি এই হয়, তাহলে দূর মফস্বলে, যেখান থেকে এমনকি কোনও ছাগল আমার মত কলকাতায় চাকরি করতেও যায় না, সেখানে কী হয়? বা সেই পুরুলিয়ার গ্রামে, যেখানের কলেজে একসময় আমি পড়াতাম, যেখানে বিদ্যুৎ পেতে গেলেও পঞ্চায়েতের লোককে বলতে হয়, একটা মূল ট্যাপিং থেকে উপশিরা ট্যাপিং লাগিয়ে দিয়ে যেত, কোনও মিটার কানেকশন ইত্যাদির বালাই নেই, শুধু মাসপ্রতি একটা টাকা একজন এসে নিয়ে যেত। এ অবশ্য আজ প্রায় দুই দশক হতে চলল, জানি না এখন ওখানে কী হয়।

পাটনা আগে লোডশেডিং-এর জন্য বিখ্যাত ছিল, রাজগিরে গিয়ে একবার দেড়মাসব্যাপী লোডশেডিং দেখেছিলাম, সেখানেও এখন শুনছি নীতিশকুমারের আমলে লোডশেডিং বেশ কমেছে। তবে একটা রাজ্য নিশ্চয়ই আমাদের পিছনে আছে, কৃষিদারিদ্রবৃদ্ধির হারেও যেমন, সেটা ঝাড়খণ্ড। এই ঝাড়খণ্ডের কারণে আমরা গেঞ্জি উল্টো করে পরেও প্রথম হতে পারছি না, সেই ঢাকাই কুট্টি একজন উল্টো-গেঞ্জি পরা লোককে যেমন বলেছিল, কর্তা আইতাছেন না যাইতাছেন। কর্তা বলতেই পারতেন উল্টোমুখে অগ্রগতি করছি।

আজকে এই গোটাটার অবতারণা আবার এক পিস খচে যাওয়া থেকে। আজ ভারি ঝড় বাদল যাচ্ছে। খুব ভোর থেকে। বা, শেষ রাত থেকে। সকাল সাতটা থেকে আমাদের কারেন্ট নেই। অনেক গাছ পড়েছে। এইমাত্র জানলাম, ট্রান্সফর্মার শাটডাউন করে দিয়ে গেছে, কালকের আগে কিছু হওয়ার আর গল্প নেই। আমাদের ট্যাঙ্কের জল ফুরিয়ে গেছে। নিচের রিজার্ভারে আছে। সেখান থেকে বালতি করে তুলতে হবে এখন, এই লেখাটা শেষ করেই। কোমরে একটা ব্যথা চলছে, কিন্তু বাড়িতে বাবার বয়স আশির উপর, মার প্রায় আশি, মানুর পক্ষে ঝুঁকে পড়ে দড়ি দিয়ে জল তোলা সম্ভব না। আর জল লাগেই অনেক, বাড়িতে বাচ্চা থাকলে যা হয়। বারো ঘন্টা কারেন্ট নেই ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে, কাল যখনই আসুক, চব্বিশ ঘন্টা পেরিয়ে যাবেই।

এর চেয়েও ভয়ানক বিষয়টা আমাদের পাড়ার ফ্ল্যাটবাড়িগুলো। সেখানের একটি মেয়ে এইমাত্র ফোন করল, ওর দুটো ছোট ছোট বাচ্চা, আমাদের বাড়িতে জল আছে কিনা জানতে চাইল। বললাম, ট্যাঙ্ক শেষ হয়ে গেছে, রিজার্ভারে আছে, তুই বালতি নিয়ে আয়, কিছু একটা ব্যবস্থা করছি। এরকম ঘরে ঘরে।

কিন্তু রাগটা এখানেও হয়নি। অনেকটা বুড়ো হয়েছি তো, যে কোনও অশ্লীলতাই কেমন একটা নৈর্ব্যক্তিক দূরত্ব নিয়ে দেখার অভ্যাস হয়ে যাওয়াই তো বুড়ো হওয়া। বিরক্ত হলাম অন্য কারণে। আমার কলেজের একজনকে ফোন করলাম, কাজে। সে কথা প্রসঙ্গে জানাল, কলকাতাতেও আজ ভয়ানক অবস্থা গেছে, মেট্রো বন্ধ, বাস বন্ধ, কারেন্ট নেই, রাস্তায় গাছ পড়ে। কিন্তু সেগুলো তিনটে নাগাদ মিটে গেছে।

আমার মাথায় এল, সত্যিই তো, যা গাছ পড়ার সেগুলো তো ঘটে গেছে দিনের প্রথম অর্ধেকেই, তারপর সারাটা দিন গেল, সন্ধে গেল, সেগুলো ঠিক করা গেল না? বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে একটা অদ্ভুত ভাঁড়ামো করা হয় প্রতিবার, বর্ষা চলে যাওয়ার পর, সেপ্টেম্বরে, বিশ্বকর্মা পুজো নাগাদ গাছ বা গাছের ডাল কাটা হয়, বোধহয় বর্ষার ফলটাই ফলে, একটু দেরিতে। টেনিদা একবার প্যালাকে বলেছিল, বিকট গ্রীষ্মে যখন রাস্তায় আওয়ারা কুকুর আর সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া কেউ বেরোয় না, তখন কবিরা ঘরের দুয়োর বন্ধ করে লেখে, বাদলরাণীর নূপুর বাজে তালপিয়ালের বনে। নইলে বর্ষাকালে ছাপা হবে কী করে? এটা একটা জরুরি পরিষেবা, সেটা কি এইভাবে বন্ধ করে রাখা যায়? আর বিদ্যুৎ না থাকলে জলও থাকেনা, পৌরসভার জলও আসে না, বাড়ির পাম্পও চলে না।

এইমাত্র একটা ভারি প্রাসঙ্গিক ফোন পেলাম। আমার এক ভাই বারুইপুরে থাকে, সে ট্রেন বন্ধ হওয়ায় বাড়ি ফিরতে না-পেরে, কয়েকজন সহযাত্রী যোগাড় করে একটা গাড়ি করে বাড়ি ফিরছিল, নরেন্দ্রপুর আর কামাল গাজীর মাঝখানে গুন্ডারা রাস্তার গাছ সরানো বন্ধ করিয়ে সব গাড়ি থেকে টাকা আদায় করছিল। বারুইপুরের দূরত্ব শিয়ালদা থেকে ট্রেনে যতদূর সম্ভব ২৪ কিমি। বৃহত্তর কলকাতা।

কী অপরিসীম একটা সভ্যতায় বিরাজ করছি, এই অন্য কলকাতারা, পুলিশ বিদ্যুৎকর্মী গুন্ডাদের কী নিদারুণ পারস্পরিকতা। আমরা কলকাতায় থাকি না, তাই আমাদের এই ভাবেই বাঁচতে হয়।

Filed under: কলকাতা, মধ্যমগ্রাম — dd @ 7:02 pm

February 6, 2009

বিড়ি ও নেতাজি

মধ্যরাত অতিক্রান্ত। মধ্যমগ্রাম চৌমাথা থেকে বাণী আসছে, মাইকে, বিড়ি জ্বালাইলে জিগরসে পিয়া – জিগরমা বহত আগ হ্যায়। সুভাষমেলা। কদম কদম বঢ়ায়ে যা। জিগরমা কতটা আগ থাকলে তবেই এটা সম্ভব, এখনো এই মধ্যরাতে বিড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া – এবং যা শুনেছি, সুভাষমেলা শেষ হলে উদ্যোক্তাদের তীর্থভ্রমণের আয়োজনেরও ব্যবস্থা করা। জয়তু নেতাজি।

February 2, 2009

সরস্বতীপুজো এবং মাল্টিতলার পাবলিক জুয়া

একটা খুব সংক্ষিপ্ত ব্লগ, কাজের বড় চাপ যাচ্ছে, কিন্তু এটা এতটাই বিচিত্র যে উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারলাম না।

এবারের সরস্বতীপুজোয় মাইকবাজি ছেড়েই দিন, ও সব চুলোয় যাক, একটা ভারি বিচিত্র অভিজ্ঞতা হল আমাদের পাড়ার মাল্টিতলার ছাদের পুজোয়। সেখান থেকে গাঁক গাঁক করে মাইক বাজিয়ে, গতকাল সন্ধা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলল ‘হাউসি’ নামের একটা জুয়া। সেটা ঠিক কী খেলা আমি জানিনা। কিন্তু যেমন করে ওরা বিজ্ঞাপন করছিল, মাইকে ঘোষণা করে চলছিল, বলছিল যাতে নিশ্চয়ই আরো বেশি লোক এসে যোগ দেয়, ‘দশ টাকা দিন, যত খুশি জিতে নিন’, বা, ‘এটা একটা সংখ্যা ও ভাগ্যের খেলা’, এবং সঙ্গে সঙ্গে ইংরিজি করে জানিয়েও দিচ্ছিল, তাতে এটা যে একটা জুয়া সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম। আমি ঘরে বসে লেখাপড়ার চেষ্টা করছিলাম, এবং এগুলি শুনতে বাধ্য হচ্ছিলাম। কোথায়ই বা যাব? আমার খুব বিচিত্র লাগছিল গোটাটা, এবং খুবই অচেনাও লাগছিল। সরস্বতীপুজোর সঙ্গে কীভাবে জুয়াখেলা সম্পৃক্ত হল কে জানে? এবং মাইকের ঘোষণা থেকেই যাদের যাদের নাম ঘোষিত হচ্ছিল, তার দু-একজনকে চিনিও, তাতে মালুম হচ্ছিল, পারিবারিক ভাবেই অনেকে যোগ দিয়েছে এই জুয়ায়? এবং এরা কেউ সে অর্থে লুম্পেন নয়, সমাজবিরোধী নয়, বৌ-বাচ্চা ছেলে মেয়ে আছে, তারা পড়াশুনোও করে। কোথায় কবে কী করে যে এত  বদলে যাচ্ছে চারপাশটা, বুঝতেও পারিনা। আমার এত অদ্ভুত লেগেছে গোটাটা যে ব্লগে উল্লেখ না-করে পারলাম না।

January 29, 2009

গুরুচণ্ডালী, শব্দজব্দ এবং নাকউঁচুপনা

গুরুচণ্ডালী ওয়েবসাইটে , এই ব্লগের ‘ব্যান্ডপার্টি, নাইটরাইডার এবং গৌরী ধর্মপাল’ লেখাটা ‘বুলবুলভাজা’ বিভাগে ছাপা হয়েছিল। সেখানে নানা জনে নানা প্রতিক্রিয়া লিখেছিল লেখাটা নিয়ে। খুবই মজার সেটা, যে যার যা খুশি মন্তব্য করা। ওই লেখাটা নিয়ে টইপত্তরে আলোচনা চলছিল, অনেক অনেক মন্তব্য। কয়েকটা বিষয় সেখানে এমন এসেছিল যা আমাকে খুব নাড়া দিয়েছিল। তার মধ্যে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা হল, মধ্যমগ্রামের শব্দজব্দ নিয়ে এই লেখাটার মধ্যে একটা উপ্ত নাকউঁচুপনার সম্ভাবনা। সেটা আমার অবশ্যই ঠিক লাগেনি, কিন্তু সেই সমালোচনাটা যে সম্পূর্ণ অকারণ তাও নয়, লেখাটায় এমন কিছু জিনিস এসেছিল যা একত্র হয়ে এই সম্ভাবনাটা তুলে আনে বটে। এমন একটা পাঠ হতে পারে যে, ওটা সে অর্থে ‘প্রাকৃত’ সংস্কৃতির প্রতি একটা বিরূপতা, যার উপাদান লারেলাপ্পা গান, সহগ নাচ, বা বাজি ইত্যাদি। তাও, কেন আমার সমালোচনাটা সঠিক লাগেনি তারও কিছু কারণ আছে। বিষয়টা আমাকে বেশ ভাবিয়েছিল। কিন্তু কিছুতেই সময় বার করতে পারছিলাম না, আজকেও লিখতে হবে বেশ সংক্ষেপে।

১। মধ্যমগ্রামের নাম কেন মধ্যম, এটা একটা রসিকতা বলে মনে আসে, শব্দজব্দের নিরিখে এর একমাত্র নাম হওয়া উচিত উচ্চগ্রাম। সবসময়েই উচ্চগ্রাম শব্দে উচ্চকিত এই গ্রাম, আমরা গ্রামের মানুষেরা তাতে জব্দ হয়ে থাকি। সকাল থেকে রাত, মাঝে মাঝে রাতান্তর অব্দি দিবারাত্রির এই শাব্দিকতা। সকাল থেকে শুরু হয়, হয় রক্তদান নয় ক্রীড়াউন্নয়ণ, নিদেন রাজনীতির মাইক। এটা চলে স্টেশন থেকে চৌমাথা। এর অন্তর্ভুক্ত হলনা এরপর প্রায়ই দোকানে দোকানে এবং দোকানের জবানিতে বিজ্ঞাপনের মাইক। খুব কম সময়ই চলে যখন স্টেশন থেকে চৌমাথা অব্দি ডিভাইডরের ল্যাম্পপোস্টে ল্যাম্পপোস্টে চোঙার টোপরসজ্জা খোলা হয়।

২। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় ফাংশন। কে ফাংশন করে, কেন করে, তারা কী খায়, তারা কজন, এসব প্রশ্ন আজকাল আর মাথায়ও আসে না। ফাংশন হয়, ফাংশনই হল উচ্চগ্রামের একমাত্র ভবিতব্য। এই বিষয়ে এই ব্লগে আরও আলোচনা আছে, পড়ে দেখতে পারেন। এগুলো আগে রাতশেষের আগে থামত না। খুব অদূর অতীতে, মানে ২০০৮ এর ডিসেম্বরে এবং ২০০৯ এর জানুয়ারিতে মাত্র দিন কয়েক ছাড়া কখনোই রাত বারোটা ছাড়ায়নি। এবং এখানে একটা মজা আছে, ডালের মজা তলায় হলে কী হয়, ফাংশনের মজা উপরে। রাস্তার দুপাশে দোকানে ও বাড়িতে আটকা পড়ে যায় শব্দ, প্রায় পাওয়াই যায় না, কিন্তু দোতলার বা তার উপরের তলাগুলোয় এই শব্দের একেবারে হদ্দমুদ্দ হয়ে ওঠে। এবং চারিদিকে প্রচুর পুকুর ছিল একসময়, যেগুলো এখন সবই মাল্টিতলা (গুরুচণ্ডালীর ওই আলোচনা থেকে এই চমৎকার শব্দটা তুলেছি আমি), তার আশ দিয়ে পাশ দিয়ে শব্দ ঘেঁটে গিয়ে, কোন দিক থেকে আসছে সেটা বোঝা খুবই কঠিন হয়। এবং শোনা যাচ্ছে এই কমাটুকুও নাকি পুলিশকে বাদ দিয়ে সরাসরি শব্দদূষণ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে আসছে, তাই কতদিন সেটা চলবে সেটাও বলা খুব কঠিন। আমার বাড়িতে নিয়মিত অনেক ঘন্টা সময় কাটানোর পর অন্তত তিনবার, তিন জায়গার, দক্ষিণেশ্বর, বেহালা এবং শ্যামনগরের তিনজনকে বলতে দেখেছি, মধ্যমগ্রামে কি রোজই ফাংশন হয়, এবং একসঙ্গে কটা ফাংশন হয়?

উপরের এই ১ আর ২ আসলে পরিপ্রেক্ষিৎটা বোঝাতে। এই রকম চলতে চলতে চলতে তিতিবিরক্ত, ব্যথিত, অাতঙ্কিত হতে হতে যা হয়, তখন যা ঘটে, হয়তো আপনার ছানা একটু বাদামের খোসা ঘষল দেওয়ালে, আপনি বদাম করে তাকে একটা কিল মারলেন, আসলে কিলটা মারতে চেয়েছিলেন উচ্চগ্রামের নাগরিকত্বকে। পড়ল গিয়ে তার ঘাড়ে। যেদিন নিয়ে ব্লগের ওই ব্যান্ডপার্টি লেখাটা অনেকটা তাই হয়েছিল। খুব লেখার ও অন্য কাজের চাপ, তার মধ্যে ওই ব্যান্ডপার্টির অসভ্যতা, সব মিলিয়ে ঠিক ওইদিন যে উপাদানগুলি ছিল সেগুলোই চিত্রিত হয়েছিল, সেই উপাদানগুলোর মধ্যে একটা আপাত-প্রাকৃত চরিত্র থাকায় ওই পাঠের সম্ভাবনাটা তৈরী হয়েছিল। কয়েকটা বিষয় পরিস্কার করে ফেলা যাক।

১। যে মানুষগুলোকে খেলার পর, এবং প্রায় যে কোনও কারণেই, পুজো হোক, বিয়ে হোক, পিকনিক হোক, বোম ফাটানোর ক্রিয়ার দেখা যায়, তারা, আর যাই হোক প্রাকৃত নয়। তারা পিপে পিপে মদ, থুড়ি পিপে না হোক বোতল, সাঁটিয়ে থাকে, তাদের ঘরে যথেষ্ট প্রবল আকার ও আওয়াজের টেলিভিশন থাকে, তারা প্রচুর চিপস কেনে, নিজেদের এবং বাচ্চাদের, এবং তারা ফ্ল্যাটের মালিক। এখানে যেগুলি লিখলাম, এছাড়া আরও বহু উপায়ে, পোষাক থেকে বাচ্চার ইস্কুল এবং ইস্কুলের সঙ্গত, এদের অর্থকৌলীন্য স্পষ্ট। এবং আমি যেহেতু আমার নিরিখে ভাবি, এরা অবশ্যই আমার চেয়ে বড়লোক, এবং আমি তো গরিব নই মোটেই। তো? প্রাকৃত কাকে বলে?

২। বিয়েতে রাশিরাশি মানুষের ভূরিভোজে মানে ভুঁড়ি ফাটিয়ে ও বাড়িয়ে ভোজের পরও যারা ব্যান্ডপার্টি দিয়ে, এবং তার সঙ্গে মাইক লাগিয়ে জল আনা ইত্যাদি আচার করাতে পারে তারা প্রাকৃত?

৩। মধ্যমগ্রামের উচ্চগ্রাম শব্দমানচিত্রের একটা ঝলক তো আগেই দিয়েছি। এর পর, এই ফ্ল্যাটগুলি থেকে, সকাল দুপুর সন্ধ্যা গান বাজানো হয়। এবং এর মধ্যে বেশ কিছু সিস্টেম সোনোডাইন তো বটেই, দু-চারটি বোসও আছে। তারপরে আছে কম্পুটারের সঙ্গে লাগানো অ্যালটেক ল্যান্সিং ইত্যাদির সিস্টেম। যার যে কোনওটাই কিনতে গেলে আমাকে অন্য অনেক কিছুতেই গুরুতর মানিয়ে নেওয়ায় আসতে হবে, আর বোস তো আমি চাইলেও কিনতে পারব না। এরা প্রাকৃত?

৪। এরা যে গানগুলি বাজায়, সকাল থেকে শুরু হয়ে যায় ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে আওয়াজ-বাহার, তার বেশিরভাগটাই আবার, কুসুমে কুসুমে থেকে শুরু করে আমার বেলা যে যায়। মানে রুচির একেবারে চূড়ান্ত। তাতে তাদের বীভৎসতা কমে না। বীভৎসতাটা এই জায়গায় যে অন্যের উপর সেই শব্দ চাপিয়ে দেওয়া হয়। আমি এদের অনেকবার বলেছি, অনেককে। বলে, কই খুব একটা জোরে তো বাজাচ্ছি না। সত্যই এর পরে আমার যুক্তি ফুরিয়ে যায়, তার কাছে তো ওই আওয়াজ কমজোরি লাগে বলেই বোস কিনতে হয়। এবং আগে যখন সামন্ত প্রভুরা জলসাঘরে জমিয়ে বসত, তাদের তো বাড়ি থাকত, বাড়ির বাইরে অনেকটা জমি। লেবেন্সরউম, বোধহয়। এখন, এরা ফ্ল্যাট কেনে, এদের শব্দটা ঘরের চেয়ে বেশি বসবাস করে বাইরে। এইটাই ছিল বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি সস্তা হয়ে যাওয়ার প্রতি আমার আক্ষেপ। তার মানে এদের প্রাকৃতপনার বিপরীতে সামন্তদের প্রতি ভালোবাসা নয়।
৫। এর পরেও একটা নাকউঁচুপনার সম্ভাবনা থাকে। বিদ্যার। যে লেখাটার বিপরীতে এই সংস্কৃতিকে স্থাপন করা হয়েছে, সেটা গৌরী ধর্মপালের লেখা, যে লেখা যথেষ্ট বিদ্যে নাড়িভুঁড়িতে না থাকলে লেখা যায় না। কিন্তু এখানেও বিদ্যাটা গুরুত্বের না। গুরুত্বের হল জীবনের প্রতি দরদটা, বাচ্চাদের প্রতি ভালোবাসাটা। একটা পোকার বাচ্চাকেও ভালোবাসতে শেখানো হয়েছে আশ্চর্য কৌটোর গল্পটায়। আর এর বিপরীতে এই বড় টেলিভিশন দামি ইস্কুলের চিপস আর কোল্ডড্রিংক্স খাওয়া বাচ্চারা কী পায়? এদের বাবারা এদের পয়সা দেয়, এবং বাড়ি ফিরেই মদ খেতে বসে, হাফ প্যান্ট পরে। এবং এদের মায়েরা নতুন বুটিকে জামা কিনে ফিরে সিরিয়াল দেখে। এরা প্রাকৃত তো নয়ই, তার চেয়েও বড় কথা, এরা স্নেহহীন, বাবামা হওয়ার যোগ্যই নয়। যদি যোগ্যতা আসে ভালোবাসা থেকে। গৌরী ধর্মপাল এখানে তাঁর বিদ্যার গৌরবে আসেননি। এসেছেন তার বাচ্চাদের প্রতি ভালোবাসার জোরে।

আমি জানিনা, এর পরেও স্পষ্ট করতে পারলাম কিনা আমি যা বলতে চেয়েছিলাম। তবে ওখানের আলোচকদের ধন্যবাদ, ওঁরা পুরো নাম লেখেন না, তাই নাম করে ধন্যবাদ দিতে পারলাম না, ওঁরা অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত একটা পাঠের সম্ভাবনাকে দেখিয়ে দেওয়ায়। যদিও ওরা এটা একটা সাহিত্য হিসাবে পড়েছেন, ব্লগ হিসাবে নয়, গুরুচণ্ডালীতে পোস্ট হওয়ার সময় ব্লগঠিকানাটা উল্লিখিত ছিলনা, তাও সম্ভাবনাটা ছিলই।

January 25, 2009

মধ্যমগ্রামের ফাংশন চলছে চলবে …

আজ ২৪শে জানুয়ারি, রাত ১২:০৮, এখনো মধ্যমগ্রামের গৌরববাহী ফাংশন চলছে। যতদূর সম্ভব সুভাষমেলায়, চৌমাথায়। বা, চৌমাথার কাছাকাছি কোথাও। এত ফ্ল্যাটবাড়ি হয়েছে যে কোনদিক থেকে আওয়াজ আসছে বোঝা যায় না। গাঁক গাঁক করে মাইক বাজছে।

মধ্যমগ্রাম থানার নম্বরে, ২৫৩৮৩২৯৪, ফোন করলাম। যথারীতি একজন সাড়া দিলেন, এবং মাইক বন্ধ করানোর অনুরোধে হ্যাঁ বললেন। কিছুই হল না। আবার করলেও তাই হবে। দু তিনবারের পরে সরল পাপহীন গলায় কেউ বলবেন, দেখুন না, বলছি তো, বন্ধ করছে না। এটাই আমাদের কিছু মানুষের নিয়মিত অভ্যাস।

দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের wbpcb.gov.in সাইটে যে কোনও সময় করার জন্য টোল-ফ্রি নম্বর দেওয়া আছে, ১৮০০৩৪৫৩৩৯০, তিনবার ফোন করলাম, কেউ ধরলই না।

আশা করা যাক, ঈশ্বর আছেন …

January 20, 2009

ব্যান্ডপার্টি, নাইটরাইডার এবং গৌরী ধর্মপাল

গতকাল দুপুরে আমার বৌয়ের সঙ্গে পাড়ায় একটি ব্যান্ডপার্টির খুব অশান্তি হয়, রাতে মানু সেটা আমায় বলল। বিয়ের ব্যান্ডপার্টি। আমাদের পাড়ায় খুব আসে। আমাদের এলাকায় ভূমিসংস্কারের প্রবল সাফল্যে পুকুর প্রায় লুপ্ত প্রজাতি, সবই এখন প্রোমো-তাড়িত বহুতল। আমাদের বাড়ির গায়েই একটা পুকুর এখনো অবশিষ্ট, বিয়ের মরশুমে প্রায়ই নানা বিয়েবাড়ি থেকে এখানে জল নিতে আসে। একসময় যেগুলো ছিল আচার, কিছু বৌ উপচার হাতে আসতেন, শঙ্খ নিয়ে, উলু দিয়ে, এখন তার সঙ্গে আসে ব্যান্ডপার্টি, এবং টুইস্ট নাচ। এই নাচের সঙ্গে এলভিসের কোনও সম্পর্ক নেই, হিন্দি সিনেমার নাচ দেখে, এবং নাইটক্লাবের নাচ টিভিতে দেখে নাচ-না-জানা লোক যখন পৃথুল দেহ কামোদ্দীপক রকমে আন্দোলিত করতে চায়, কিন্তু হয়ে দাঁড়ায় বিকটতা, তাকে বলে টুইস্ট, এতদিন মূলত বিসর্জনে নাচা হত, ধীরে বিয়েতে ও অন্নপ্রাশনে, এরপরে বোধহয় শবযাত্রাতেও হবে। কিছুদিন থেকে আবার ব্যান্ডপার্টির সঙ্গে একটি করে রিক্সাও থাকে, তাতে বসানো থাকে মাইক। এবং ব্যান্ডপার্টি বাজাতে থাকে গত কিছুদিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজা হিন্দি গান, যা সর্বত্র, এমনকি বাড়ির ডোরবেলে, ফোনের রিংটোনে অব্দি বাজানো এবং লোককে শোনানো চলছেই।

এই লোককে শোনানো অংশটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কবে যেন আমাদের চারপাশে একটু একটু করে এটা বেড়ে উঠতে উঠতে একটা অশ্লীল জায়গায় চলে গেছে। ট্রেনের গাদাগাদি ভিড়ে ভয়ানক জোরে ফোন বেজে উঠবে, তারপরে আসবে চীৎকারিত কথোপকথন, এবং ঠিক তার পাশের মানুষ হওয়ার কল্যাণে মাত্র সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে শুনে যেতে হবে। এরপর আছে চৈনিক সেলফোনগুলোর কল্যাণে সস্তায় পুষ্টিকর মনোরঞ্জন, খ্যাঁশখ্যাঁশে আওয়াজে ওই গানগুলো দুতিন বন্ধুর মধ্যে বা এমনকি নিজেই, জোরে জোরে, মানে জনসমক্ষে বাজানো। এবং আবার সেই একই গান। এরপর আছে ফাংশন, এক এক পাড়ার এক একটা ক্লাব। কুকুরে যেমন নিজের এলাকার গাছের গোড়ায় মূত্রত্যাগ করে এলাকা চিহ্নিত করত, এখন গাছ আর কোথায়, এই ক্লাবগুলি ফাংশনরবে এলাকা চিহ্নিত করে। যতদূর আওয়াজ যাচ্ছে ততদূর আমার এলাকা, ভোটের দিন ততদূর অব্দি আমার শাসন। তাই এই গোটা শীতকাল জুড়ে প্রবল ফাংশন চলে। এই ব্লগেই আগে একটা আলোচনাও আছে, সেই ফাংশনের দাপট নিয়ে, বাঘা যেমন ধ্রুপদ শুনে ঘাবড়ানো মুখে গুপিকে বলেছিল, কী দাপট। আর পুলিশ ফুলিশ আমাদের এলাকায় একটা নিতান্তই কুসংস্কার, রীতিমত একটা অলৌকিক উপস্থিতি, পরিস্থিতি আক্ষরিকভাবেই অর্থবহ হওয়ার আগে অব্দি তারা কখনো রূপপরিগ্রহ করেনা। ঠিক এই ডিসেম্বর এবং জানুয়ারিতে এই দাপট অনেকটাই লুপ্তপ্রায়, কারণ শুনলাম পুলিশের এই অলৌকিককতায় বিরক্ত পলিউশন কন্ট্রোলবোর্ড নাকি সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করেছে। নিয়ন্ত্রণ মানে কিন্তু রাতটুকু। আগে যেমন ডিসেম্বর জানুয়ারিতে অর্ধেক কি তারও বেশি রাত যেত আমাদের পান খেয়ে আর গান শুনে, এবার রাত বারোটার পরে গেছে মাত্র দিনকয়েক আর সারারাত মাত্র একটিই। ফাংশন মানে আর কিছু না, আবার সেই মাইক এবং আবার সেই একই গান, এবং বীভৎসতর ওই ড্রামবিট।

এবং আরো বীভৎস এই যে বেশিরভাগ মানুষের এটা বীভৎস লাগে না। গতকাল দুপুরে মেয়েকে কোলে নিয়ে ও যখন গিয়ে নিষেধ করে, দুপুরবেলা, এখন বৃদ্ধরা ঘুমোচ্ছে, বাচ্চারা, পাড়ার ভিতর, মাইক বাজাচ্ছেন কেন, তারা বন্ধ তো করেই নি, উপরন্তু নানা বিদ্রূপ করেছে। এবং গোটা পাড়ার মানুষ কেউ আপত্তিও করেনি। ট্রেনে যখন সারাদিনের কাজের পর ক্লান্ত শরীরে ফেরত আসার সময়, মাঝে মাঝে আপত্তি করেছি, সেলফোনে গান বাজানোর বিচিত্রানুষ্ঠানে, কেউ আপত্তি শোনেনি, বরং অসভ্যতা করে বলেছে, কী করব বলুন হেডফোন কেনার পয়সা নেই, অন্য সমস্ত মানুষ চুপ করে থেকেছে। তারা কেউ কেউ আমাকে চেনেনও, মাস্টারমশাই বলেই চেনেন, চুপ করে যান স্যার, ও বলে কোনও লাভ নেই।

কাল রাতে, মেয়ে রু ঘুমিয়ে পড়ার পর, আমরা দুজনে এটা নিয়েই কথা বলছিলাম, কেমন নিঃসঙ্গ একা আর বিষণ্ণ লাগছিল। ওরও আমারও। নিজেকেও বোঝাচ্ছিলাম, ওকেও, ধুর, ও বলে কোনও লাভ নেই, চুপ করে থাকাই শ্রেয়। এবং বোধহয় আমার বাল্য কৈশোর এবং যৌবন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে কেটেছে বলেই এই চুপ করে থাকার পন্থাটা কেমন দমবন্ধকর লাগে। দুজনেরই লাগছিল। আমি আবার ওকে মনে করালাম, ও আবার তো ওই নাইটরাইডার আসছে।

কী সেটা।

আমি বললাম, ওই যে ক্রিকেট। মাঝরাত্তিরে বোম ফাটাবে।

ও। ও বলল। মনে পড়ে গেল ওর। আমাদের বাড়িতে বৃদ্ধ আর বাচ্চা দুইই আছে। তাদের কেঁপে কেঁপে ওঠা, মাঝরাত্তরের বোমের আওয়াজে।

গানের সঙ্গে সঙ্গে এই বোম। বিয়েতে পুজোয় খেলায় সব কিছুতে। খেলা দেখে আনন্দ পেলাম, চমৎকার কথা, তাতে অন্যকে মাঝরাত্তিরে ঘুম থেকে জাগিয়ে বোম ফাটানো কেন, বুঝতে পারিনা। গতবারে আইসিএলে নাইটরাইডার হারা মাত্র একটা উল্লাস হয়েছিল আমার, যাক বোমের অত্যাচার এবার কমবে। সত্যিই কমেছিল, অনেকটাই। তারই সঙ্গে কমেছিল মাঝরাত্তিরে গাবদা গাবদা চেহারার হাফপ্যান্ট পরা লোকের, যারা খেলেনা, শুধু মদ আর চিপস খায়, আর তাদের গাবদাতর বাচ্চারা, যারা খায় কোল্ডড্রিংক্স আর চিপস, এবং সারাদিন লেদিয়ে পড়ে থাকে টিভির সামনে, তাদের ওই বোম ফাটানো, চীৎকার আর নাচানাচি। মনে পড়ছিল, মনটা কেমন শূন্য শূন্য হয়ে যাচ্ছিল। কেন আমারই লাগে, আর কারুর কেন বীভৎস লাগে না, আমিই কি অস্বাভাবিক? এরা আবার যখন নাচে না, তখন জোরে জোরে টিভি চালায়, গান বাজায় সাউন্ডসিস্টেমে। আর ইলেকট্রনিক্সের মত কোন জিনিসই বা সস্তা হয়েছে? খেলা নেই, টিভিতে খেলা দেখা আছে। খেলা গান নাচ সবই টিভি প্রোগ্রাম, লোকগুলো আর তাদের বাচ্চাগুলো শুধু টিভি দেখে আর খায় আর অন্য মানুষকে বিরক্ত করে, অসভ্যতা করে। গোটা সংস্কৃতিটাই হল বোকা অসভ্য প্রতিলিপির। সবকিছুই কপির কপির কপি। বদ্রিলার যেমন লিখেছিল, ট্রান্সপারেন্সি অফ ইভিলে। রাইগর মবিলিস। লোকগুলো টিভি দেখে চলেছে, চিপস খেয়ে চলেছে, ভুঁড়ি বাড়িয়ে চলেছে। কিন্তু আসলে মরে গেছে, সংস্কৃতি বলেই আর কিছু নেই। সবই কপির কপির কপি। গান শোনাও তাই, জীবনচর্য়াও তাই, যৌনতাও তাই, যৌনতা মানেই কিছু অঙ্গভঙ্গী যাকে ইতিমধ্যেই মিডিয়া আমায় যৌনতা বলে চিনিয়ে দিয়েছে। শুধু পুকুর বুজিয়ে বাড়ি কেন, গোটা জীবনটাই এদের প্রোমোতাড়িত। কত কোল্ডড্রিংক্স কত চিপস প্রোমোটেড হবে এই আইসিএল আর নাইটরাইডারের কল্যাণে, খেলা বা শরীর বা জীবন কিছু হোক আর না-হোক।

রাত বাড়ছিল। মানু ক্রমে ওপাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি টেবিলল্যাম্প জ্বালিয়ে গত কদিন ধরে রাতে যেটা পড়ছি, টিপিং পয়েন্ট আর ধূর্জটিপ্রসাদ রচনাবলীর একটা খন্ড, মাথার কাছে ছিল, নামিয়ে নিলাম, পড়তে পারলাম না। বেশ কয়েকবার পড়ে গেলাম একই বাক্য, কোনও মানে বুঝছি না। বিছানা থেকে উঠলাম, কম্পিউটারের টেবিলে বসে একটা সিগারেট খেলাম। রু-এর কথা মনে হচ্ছিল, ওকে নিয়ে একটা দুশ্চিন্তাও হয় আমার, বুড়ো বয়সের বাচ্চা, ও সঠিক অর্থে কৈশোর পেতে পেতেই আমার অবসরের দিন চলে আসবে। আর চারপাশে মানুষকে বিরক্ত করার, উত্যক্ত করার এই ব্যান্ডপার্টি আর নাইটরাইডারের সংস্কৃতি। কী মানুষ হবে এতে?

ওর বইগুলো চোখে পড়ল, ছড়ানো রয়েছে, রাতে শুতে যাওয়ার আগেই মানু ওকে পড়ে শোনাচ্ছিল। একটা বই তুললাম, আশ্চর্য কৌটো, লেখক গৌরী ধর্মপাল। মানু এগুলো কিনে এনেছে শিশু সাহিত্য সংসদ থেকে, রু-এর জন্যে।

একটু বাদে, ধীরে, মনটা ক্রমে কৃতজ্ঞতায় ভরে গেল। কী আশ্চর্য বই এই আশ্চর্য কৌটো। কী অদ্ভুত গদ্য, কী আবেগপ্রবণ। আর কী যত্ন করে ছাপা। নিজের মধ্যেই বেশ একটা আরাম এল। সংস্কৃতি তো এটাও। গৌরী ধর্মপাল কে আমি জানিনা, খুব বেশি নামও শুনিনি। ওঁর একটা বই আগেও পড়ছিলাম, সেটাও চমৎকার, ইংলে পিংলে। ও আরও একটা অনবদ্য বই পড়েছিলাম ওনার, বাচ্চাদের জন্য উপনিষদের গল্প। কিন্তু কোনও বইয়েই ওনার বিষয়ে কিছু ছিল না। মানু আর রু পাশে ঘুমিয়ে আছে। ওদের দুজনেরই মাথায় একটু একটু হাত বোলালাম। বেশ লাগছিল। জীবনের সবটাই ওই ব্যান্ডপার্টি আর নাইটরাইডার নয়, এগুলোও তো আছে। গৌরী ধর্মপালের মত লোকেরাও আছে। তাদের এই অসাধারণ রকমের যুদ্ধটাও আছে, ভালো বই লিখে সাংস্কৃতিক ভাবে টিঁকে থাকার যুদ্ধ, এই শুয়োরের মত করে বেঁচে থাকার বিরুদ্ধে।

December 31, 2007

২০০৭ শেষ, ফেডোরা ৮, সিপিএম, এবং আমাদের পিতৃশ্রাদ্ধ

গত কয়েকদিন ধরে মধ্যমগ্রামে এক নৃত্য-উৎসব চলছিল। মানে, টিভিতে যেমন হয়, কোনও ফিল্মি গানের সঙ্গে নাচ, তার প্রতিযোগিতা। সংগঠক দেবীগড় সাংস্কৃতিক চক্র, মানে, সিপিএমের গনফ্রন্ট যেমন ডিওয়াইএফআই, তার আবার গনতরফ্রন্ট ওই চক্র। তার জন্যে মধ্যমগ্রামের গলির পর গলির গোটা রাস্তা জুড়ে ছড়ানো এবং জড়ানো হয়েছিল আলোকমালা, প্রায় দেড় কিলোমিটার ব্যাস জুড়ে সমস্ত খুঁটি ভূষিত হয়েছিল মাইকের চোঙায়।

আমার বাড়ি সেই ব্যাসেরও বাইরে, কতটা বাইরে তার একটা তুলনা দেওয়া যাক। এই মাইকায়িত এলাকার শেষ চোঙদার খুঁটি ছিল মধ্যমগ্রাম কালীবাড়ির গায়ে, যেখান থেকে আমার বাড়ি আসতে হলে প্রথমে দুমিনিট মত, এবং তার পর লম্ব ভাবে বেঁকে আবার এক মিনিট মত আসতে হয়, মানে, বহুভুজ বরাবর সোয়া দুই মিনিট মত হাঁটা হবে। এর পরেও, আমার বাড়ির সমস্ত জানলা এবং দরজা বন্ধ থাকার পরেও, আমার বাড়ির কমপক্ষে দুটি দরজা বা একটি জানলা (কাঁচের এবং বন্ধ) ভেদ করে সেই ‘মুংলা, মুংলা’ ইত্যাদি গানের ঝটকা আমার কম্পিউটার টেবিলের সামনে বসে থাকা আমার মাথায় আঘাত করছিল। ড্রামের বিটগুলো এসে লাগছিল যেন পেটে। আমি আমার একাধিক বন্ধুকে টেলিফোন চলাকালীন কথা বন্ধ করে ওই আওয়াজ শোনাই এবং তারা শুনতেও পায়।

এদিকে গতকাল আমার একটা কাজও ছিল, এলএফওয়াই-এর সঙ্গে যে ডিভিডিটা দিয়েছে, ফেডোরা ৮-এর, সেটা পত্রিকার সঙ্গে দেওয়া সিডি বলে আমার খুব একটা ভরসা হয়নি। এদিকে নিজের মেশিনে ফেডোরা ৭ দিব্য চলছে, কিন্তু অন্যদের জন্যে, সেটা বিট টরেন্টে নামাতে বসিয়েছি পরশু থেকে। অ্যাজেরিউসের পোর্ট খোলা নিয়ে বড্ড ঝামেলা হয়, তাই একটা নতুন ক্লায়েন্ট ডেলিউজ দিয়ে। বেশ কাজ করছে সেটা, নিজেই খুঁজে নেয় কোন পোর্টে কাজ করতে হবে। আবার কাল খুলে যাবে কলেজ, তার আগে হয়ে গেলেই ভাল। একে আমাদের এদিকে এই অক্লান্ত লোডশেডিং, এবং তার উপর আমার মেশিনও প্রায় আট বছরের বুড়ো অ্যাথলন ১৮০০, তার একটা হার্ডডিস্কও তাই। তাই নজরদারিটা রাখতেই হয়। গত কাল রাতেও তাই, শোয়ার আগে, বারোটা অব্দি মেশিনের সামনেই বসেছিলাম। দু-একটা মেলের উত্তর দিলাম, ইত্যাদি করছিলাম।

গত কদিন ধরেই নৃত্য-উৎসবে, মানে আমাদের এই পিতৃশ্রাদ্ধ চলছিল। গত পরশুর মত, বা তার আগের দিনের মত, আমরা বেশ কিছু লোক কষ্ট পাচ্ছিলাম। সকলেরই একই কথা, পুলিশকে ফোন করে কী হবে, বরং ওরা জেনে যাবে, পুলিশই গিয়ে ‘পার্টি’-কে বলে দেবে। সিপিএমের ত্রাস-নির্মাণ এতটাই পূর্ণাঙ্গ যে, এমনকি ব্যক্তিগত কথোপকথনেও মানুষ দেখেছি, ‘সিপিএম’ নামটা ব্যবহার করে না, বলে ‘পার্টি’। টেলিফোনে অব্দি। তাও শেষ অব্দি, গত কালও, অন্য দিনগুলোর মতই, বেশ দুচারবার পুলিশকে ফোন করা হল। পুলিশ ভারি ভালো ব্যবহার করল। হ্যাঁ দেখছি। তারা দেখল তারা, চাঁদ, শীতের রাত, মধ্যযাম রাত্রির শোভা, বোধহয়।

অন্য ঘরে মেয়ে রু আর তার মা ঘুমোচ্ছে, আওয়াজ আটকাতে জানলার পাল্লার সামনে মোটা বেডকভার ঝোলানো। আমি দেখছি, ডেলিউজে বিন্দু বিন্দু করে বাড়ছে ফেডোরা ৮ এর ডিভিডির ইমেজ, রেস্কিউ সিডির ইমেজ, এবং তাদের এসএইচওয়ান সাম। আওয়াজগুলো কানে শরীরে বাড়ি মেরে চলেছে। হঠাৎ একবার মনে হল, এই সব ফ্রি সফটওয়্যার, জিএলটি, লিনাক্স এইসব, বা যে কোনও কাজই, কোনও কাজ, করার মানে কী? এই সিপিএমই তো ইতিহাস। আর তো কিছু নেই, কোথাও নেই। মনে হল মেশিনে একটা লাথি মারি।

এবং এই ত্রাস তো প্রতিদিন সংঘবদ্ধতর হচ্ছে। এই অত্যাচারও নন্দীগ্রামের পর থেকে আরও স্পষ্ট। যা খুশি করব। নেতারাও, একটা মুখ্যমন্ত্রীও কথা বলছে সন্ত্রাসবাদীদের ভাষায়। ভুল ইংরিজিটা যদি বাদও দি, ইট মারলে পাটকেল খেতে হবে — এটা তো সন্ত্রাসবাদীর ভাষা। ইট মারলে সে তো অন্যায় করছে, তাকে রাষ্ট্রের শাসনে আসতে হবে, রাষ্ট্রের আইনে শাস্তি পেতে হবে — তোমার তো রাষ্ট্রের ভাষা বলার কথা, তুমি রাষ্ট্রের অংশ। তুমি সংবিধানবিরোধী কথা বলো কী করে? তারপর ক্ষমা চাওয়ার ভাঁড়ামো, বেশ চুকে গেল, পার্টিতর ওই ডিওয়াইএফআইরা, বা ডিওয়াইএফআইতর ওই চক্ররা এবার থেকে কি কাউকে মেরে একবার ক্ষমা চেয়ে নেবে, ব্যাস খেল খতম, রাষ্ট্রর দায়িত্ব সম্পূর্ণ?

দম আটকে আসছিল, গা গোলাচ্ছিল, ও ঘরে গিয়ে একবার ঘুমন্ত মেয়ের পাশে বসে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম। তাতেও কিছু হল না। কী হবে কোনও কিছু করে? সব কিছুই তো সিপিএম।

… সেই প্রেতনৃত্য চলল ভোর পাঁচটা অব্দি …

আমি শেষ অব্দি ফেডোরা ৮ এর ডাউনলোড থামিয়ে দিইনি। মেশিনে লাথিও মারিনি, ছি মারতে পারি, আমার কতদিনের সঙ্গী, কত লেখা লিখেছি, আর ওর নামও মামদো, মহম্মদকে যা বলে ডাকতাম, সোহাগের সময়। ফেডোরা ৮ ডাউনলোড চলছে, এখন একটু পজ করে নিয়েছি ডেলিউজ, এই ব্লগটা লিখছি বলে। … রক্তক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি / সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কত দেখিয়াছি …

« Previous Page

Powered by WordPress