নেটখাতা

May 28, 2016

শংগঠনের নতুন ধাঁচা – চলো ভাই দিলীপ করি

চন্দ্রবিন্দুর গানের খুচরো পান ধার করে বলা যায়, সংগঠন আসলে বেজায় রকমেরই শংগঠন। চলো ভাই, একটা শং বানাই, গাজনের শং, ভজনের শং, পূজনের শং। কখনও লেনিনের শং, কখনও হো-চি-মিনের শং, কখনও দিলীপের শং। দিলীপ সিংহর শং সাজায় একটু নতুন একটা ধাঁচা, পুরো লতুন ধাঁচার ধূপের গন্ধ। এটাই দিলীপ কাম বিজেপির ইউএসপি। হাড়মুড়মুড়ি ব্যাপারটা দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারে ছিল একটা ব্যারাম – দিলীপ সেটাকে, হয়ত তার ঠাকুরদা মোদির লাইনেই, মোদির একটা ছবি দেখেছিলাম নেটে, বন্দুকপুজোয় রত – একটা বাজনার আরামে এনে দিল। পুলুশকে তুলে নাও : আমরা এই বাজনার আরাম দেব পশ্চিমবঙ্গকে।

আমি যখন শেষ আমরা ছিলাম, এই জীবনের বাল্যকালেই বলা যায়, সোয়ামি-ইস্তিরির মত আমরা না, শংগঠনের আমরা, তখন এই শংগঠন আমিও করেছি। চলো নানা মন্ত্র নানা যন্ত্র দিয়ে একটা শং বানাই। আমরা বানাতাম মার্ক্স লেনিন গুয়েভারা এরকম করতে করতে একদম শেষ ধাপে এসে অমিতাভ নন্দীদের শং। চলো বানাও, খাড়া করো, তারপর একটাই কাজ, সুখে শান্তিতে বংশানুক্রমে প্রণামী খাও, শং-এর পাদদেশে থালায় যা পড়বে। কখনও সে প্রণামী মাল্লু কখনও তা চুল্লু – এক কথায় পাওয়ার।

সেসব সর্বহারা মার্কা শং এখন ফ্যাশনের বাইরে। চলো এখন হাড়মুড়মুড়ি শং বানাই। ঠিকই আছে, ভারতের গল্প, বর্ষ বর্ষ জুড়ে ভরতের বাচ্চাদের গল্প। জীবনের পাটক্ষেতে যে বেজন্মার বাচ্চারা আসিতেছে চলে – জন্ম দেবে জন্ম দেবে বলে, জন্ম দিতে হয় যাহাদের, জন্ম দিয়া আসিয়াছে যারা। তাহাদের আদিপুরুষ তো সেই ভরত – শকুন্তলার বেজন্মা, তার বাপ যাকে নেয়নি। এখন হলে অবশ্য ইশকুলে বা পাসপোর্টে তাতে কোনও ঘাপলা হত না। কিন্তু তখনকার সেই আদি বেজন্মা তার নিজের নামে একটা দেশ গড়ে তুলল – জিস দেস কে বাসী হুঁ। মোদীর দেশ দিলীপের দেশ আরএসএসের দেশ আমার দেশ তোমার দেশ আদি বেজন্মার ডেরিভেটিভের ডেরিভেটিভের ডেরিভেটিভ বেজন্মাদের দেশ। এই হাঘরে হাভাতে হাবাপ-দের দেশে দিলীপই জম্পেশ – চলো, এবার দিলীপ করি।


April 22, 2012

ব্যাঙতন্ত্র এবং ঠাম্মা-ব্যাঙ

আমার এক সহকর্মী দিন চারেক আগে আমায় রাতে ফোন করলেন, “দেখছিলে আজ সিপিএমদের, টিচার্স-রুমে — আজ কেমন গলা বেরিয়েছিল, এতদিন পর?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, নতুন বর্ষার জল পড়ায় এঁদো পুকুরের ব্যাঙের মত তো?” সে অবাক হয়ে জানাল, “ওমা তোমারও ব্যাঙের কথা মাথায় এল? আমারও তাই এসেছিল।”

ব্যাঙের তুলনাটা মাথায় আসা খুব বিচিত্র কিছু নয়। দলবদ্ধ আস্ফালন তৈরি করা, যার থেকে কিছুই বোঝা যাবে না। বোঝা যাবে না কারুরই একার আস্ফালন। বোঝার কিছু বোধহয় নেইও। সিপিএম-এর যে কারুরই কথা শুনলে বোঝা যায়, তিনি সবচেয়ে বুদ্ধিমান, সব চক্রান্ত তৈরি হওয়ার আগে থেকে সমাধা হওয়ার পর অব্দি তার জানা, এবং তাঁর এই কথন আর কিছুই নয়, গর্দভ জনগণ যারা নানাবিধ অপপ্রচারে ফেঁসে আছে, তাদের একটু সত্যিকারের সত্যি বুঝিয়ে দেওয়ার লোকশিক্ষা তৈরি করার চেষ্টা করছেন তিনি। সাহেব সৈন্যরা যেমন সাদা-মানুষের-দায়ভার, হোয়াইট-মেনস-বার্ডেন, নিয়ে ‌এইসব ভারত ইত্যাদি কলোনিতে আসত, পুণ্য অর্জনের জন্যে, অন্য কিছু নয়। তেমনি এই সিপিএমরাও এই মাটির পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন আমাদের একটু বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যে, আসল সত্যটা কী।

আগে এসব শুধু বুদ্ধ, গৌতম ইত্যাদি নেতাদের মধ্যে দেখতাম। তাদের সন্তানাদিতে ক্রমে পরিকীর্ণ হয়েছিল এই পৃথিবী, যদিও বিধানসভায় তৃণমূল জেতার পর থেকে তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না একেবারেই। সত্যিই তারা বর্ষার নবধারাজলে সিঞ্চিত ও রোমাঞ্চিত হয়ে তাদের ব্যক্তিগত সব কুয়ো থেকে বেরিয়ে আসছেন, একদম দিগ্বিদিক পুরো ডেকে ডেকে হেজে দিচ্ছেন। টেলিভিশন চ্যানেল থেকে কলেজের টিচার্স-রুম অব্দি। তবে এটা ঠিকই, গৌতম-বুদ্ধবাদীরা আজকাল তেমন মারধর করছেন না, বা, পারছেন না, শুধু ডেকে যাচ্ছেন। এবং এইখানটাতেই ভারি চটে যাচ্ছি।

কলেজের টিচার্স রুমেও সেদিন না বলে পারলাম না, “কোন ইতরামিটা তৃণমূল করছে, যার শুরুটা তোমাদের হাতে নয়?” একজন বললেন, “এতটা কিন্তু হয়নি কখনও।” তাকে না-বলে পারলাম না, “তোমাদের হাতে তোমাদের ক্ষমতায় যদি পাঁচটা খুন হয়ে থাকে তোমাদের উত্তরসূরী শুরু করছে ছয় নম্বর থেকে, সংখ্যাজগতে তো পাঁচের পরে ছয়ই আসে, সংখ্যার লজিকে”। আমার এক সহকর্মী বললেন, “চৌঁত্রিশের পরে ফের এক থেকে না-গুণে, পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ করে গুণে দেখো, পুরোটা মিলে যাবে।” আমি যোগ করার চেষ্টা করলাম, দেখো, এই আলোচনাটা যে টিচারদের মত নখদন্তহীন লোলচর্মদের মধ্যে ঘটতে পারছে, এটাও এই পঁয়ত্রিশতম বছরের অবদান। এর আগে কলকাতার সিকি দুয়ানি নয়া পয়সা নেতাদের দেখেও প্রিন্সিপালদের উঠে দাঁড়াতে হত। যা‌, মোটের উপর প্রিন্সিপাল জাতিটাকেই ঠেলে দিয়েছিল একটা অন্ধকার অপদার্থ অশিক্ষার মধ্যে, এমন অবস্থায় যেখানে আমার সব পরিচিতরাই মাস্টারমশাই হওয়া সত্ত্বেও আমি এমন একজনকেও চিনিনা, আত্মসম্মানবোধ এবং প্রিন্সিপাল হওয়ার বাসনা একই সঙ্গে যার মধ্যে বহমান। এই নিয়ে আগেও আলোচনা করেছিলাম এই ব্লগে — সিপিএম এবং শিক্ষা সাক্ষরতা। এখন তাদের যখন ধরে ধরে পেটাচ্ছে, সেটা মন্দ না ভাল তা স্থিরনিশ্চিত হওয়া খুবই কঠিন। কারণ, এক, ঘোমটার ভিতর থেকে উলঙ্গ সত্যটা বাইরে আসছে, হেগেলীয় ভাষায় যাকে বলে ইমানেন্ট এক্সপ্লিসিট হচ্ছে, লোকের কাছ থেকে চৌঁত্রিশ বছর ধরে গোপন রাখা সত্যটা প্রকাশিত হচ্ছে, আর দুই, যে সব লোক সিপিএমের নেতাদের বাড়ির বাজার করে দিয়ে প্রিন্সিপাল হয়েছে, এবং এখন সেই একই অনায়াস দক্ষতায় অন্য অনেক নেতাদের বাড়ির বাজার করে দিচ্ছে, তাদের পেটানো হয়ত আইনবিরোধী হতে পারে, কিন্তু অভ্যন্তরীন অন্য নৈতিকতায় তাকে খুব অন্যায় বলে বোধ হয় না, যেমন, গীতায় আছে যে আত্মীয়কে হত্যা করে তাকে মেরে ফেলাটা নিধন নয়, বধ, যেমন পশুবধ হয়, তা বেআইনি বটে, কিন্তু আমরা খুব অন্যায় মনে করি কি? বরং চৌত্রিশ বছরের অবরুদ্ধ অনুভূতি প্রকাশিত হোক না সমাজের নিউরোসিস-এর আকারে, বরং তা এবার চিকিৎসিত হতে পারবে।

কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই, ওই তুমুল ব্যাঙ ডাকার শব্দে কাউকেই কিছু শোনানো গেল না। সেই সশব্দ ব্যাঙতন্ত্র কোথাও তো একটা গণতন্ত্রেরও চিহ্ন, কারণ, আগেই বললাম, তৃণমূল ইত্যাদি নিয়ে যে আলোচনাটা চলছিল, সিপিএম আমলে সিপিএমকে নিয়ে তার ধারে কাছে কিছুও টিচার্সরুমে চলাটা ছিল কল্পনারও বাইরে। তাই, গণতন্ত্র না হোক, ব্যাঙতন্ত্রই সই।


আমার ওই সহকর্মীর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতেই, ওই ব্যাঙের প্রসঙ্গে মাথায় এসে গেল, এটা নিয়ে একটা ব্লগ লেখা যায়। আর তার একটু পরেই, চলে এল আমাদেরই একটা চিরাচরিত গল্প। কোথায় পড়েছি, ছোটবেলায়, পঞ্চতন্ত্রে না ঈশপে, তাও মনে করতে পারছি না।

গল্পটা এক ব্যাঙ-ঠাম্মাকে নিয়ে। তার নাতি-নাতনিরা তাঁকে দেখে অবাক হত, ওমা এত বড় কখনও হওয়া যায়, হওয়া সম্ভব? কিন্তু সেই ঠাম্মার আয়তনগত হেজেমনি একদিন আক্রান্ত ও চূর্ণ হল, যখন নাতিনাতনিরা কাছের মাঠে একদিন একটি বলদকে দেখল এবং ফিরে এসে ঠাম্মাকে জানাল। ঠাম্মা বিস্মিত হয়ে গেলেন, তাঁর চেয়েও বড় কিছু কি সত্যিই হওয়া সম্ভব? ঠাম্মার এটা সততই মনে হল, কারণ ঠাম্মা ব্যাঙ কোনওদিনই তাঁর কুয়োর বাইরে যান নি। কিছুই দেখেননি। তিনি পেটের ভিতর দম আটকে আটকে নিজের ভুঁড়ি ক্রমে ফোলাতেই থাকলেন। এর চেয়েও বড়? এর চেয়েও বড়? …

শেষে ফুলতে ফুলতে তিনি ফেটেই গেলেন।

শেষ কিছুদিন মমতার ক্রিয়াকলাপ দেখে মনে হচ্ছে, বোধহয়, যা শুনেছি, অধীর চৌধুরী যা বলেছেন, হার্মাদ থেকে উন্মাদদের হাতে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ, তার সঙ্গে একমত হওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। আজকে এঁদোপুকুরের ব্যাঙেরা তাদের পাঁকমাখা চীৎকার ফের শুরু করার জোরটা পেয়ে গেল এত তাড়াতাড়ি তার জন্যে ইতিহাসের কাছে দায়ী থাকবেন মমতা নিজেই। ঔদ্ধত্য আর আত্মরতিতে ঋদ্ধ সিপিএমের গৌতম বুদ্ধের এই নয়া বৌদ্ধধর্ম তিনি যত বেশি প্রসারিত প্রবাহিত ও উচ্চারিত করে তুলবেন, ততই তিনি এগোতে থাকবেন নিজের বিনাশের দিকে, এবং রাজ্যেরও। পার্ক স্ট্রিট থেকে কাটোয়া, নোনাডাঙ্গা থেকে বন্ধ-রোখা, ঠিক সেই একই রকম শরীরি বলপ্রয়োগে যেমন করে সিপিএম বন্ধ করত, তিনি কী প্রমাণ করতে চাইছেন — তিনি গৌতমবুদ্ধের চেয়েও বেশি বৌদ্ধ? তা হলে কী হল এত কিছু করে সিপিএম জমানার বিরুদ্ধে এত বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়ায়? ব্যাঙ-ঠাম্মা হতে চাইছেন? তিনি কেন এই আত্মবিনাশের পথে হাঁটছেন, আমি জানি না।

ভয় লাগছে হয়তো ইতিহাসে আমাদের জন্যে বরাদ্দ আছে এখন হয় হার্মাদ নয় উন্মাদ কোনও এক ধরনের স্বৈরতন্ত্রই। আতঙ্ক হচ্ছে এই কারণে যে সিপিএম তো নিজেকে বিশ্বাসই করিয়ে ফেলেছে, নিজের কোনও কারণে নয়, করাতের চালনাতেই সমস্যা, কংগ্রেস থেকে কেন্দ্রে সমর্থন তুলে নেওয়াতেই সে হেরেছে, ওটা না ঘটলে সে তো হারতও না, শাসনটা তো সে ঠিকই চালাচ্ছিল। অর্থাৎ, এই সিপিএম ফিরে আসবে আরও আরও নতুন নন্দীগ্রাম সিঙ্গুরের প্রতিশ্রুতি, এবং অমিতাভ নন্দী ও লক্ষ্মণ শেঠদের নিয়েই, কারণ সে তো তাদের মিথ্যা মামলায় আক্রান্ত বলে মনে করে। সে কোন সিপিএম যা আমাদের চেনা সিপিএম-এর চেয়েও ভয়ঙ্কর?

April 14, 2012

শিক্ষা শিক্ষাহীনতা ও কুশিক্ষা

আমার নিজের ভিতর থেকেই একটা গভীর বিরূপতা আমি চিরকালই বোধ করি শিক্ষার প্রতি। মুখে যেটা বলি প্রায়ই, শিক্ষা দিয়ে মানুষ শিক্ষিত বদমাইস হয়, শিক্ষিত রকমে চুরি করতে এবং পা চাটতে পারে। এটা তো আপাতত একটা গোদা এবং গাজোয়ারি যুক্তি বলে শোনাচ্ছে। কিন্তু আদতে এটা ততটা গাজোয়ারি এবং গোদা নয়। অনেক ভেবেছিও আমি এটা নিয়ে। আমার পরিচিত শিক্ষিত বদমাইসদের প্রতি আমার যতটা গা-ঘিনঘিন করে, কখনওই সেটা অশিক্ষিতদের প্রতি করে না।

আমার মাস্টারিজীবনের একদম গোড়ায় আমি কিছুদিন পড়িয়েছিলাম, পুরুলিয়ার মানবাজার কলেজে। সেখানের অনেককে, কলেজের ক্যাজুয়াল কর্মী প্রফুল্লকে, ওখানের আমার এক প্রাক্তন ছাত্রের বাবা-মাকে মনে করে আমার এই শিক্ষাবিরোধিতার পক্ষে আমি উজ্জ্বল সব উদাহরণও পেয়ে যেতাম, আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি মানুষ যাদের দেখেছি, ভালবাসায় যত্নে আতিথেয়তায় — এবং এই গোটাটা মিলিয়ে মানবিক সংস্কৃতিতে — তার মধ্যেই পড়েন এই মানুষগুলো। অথচ যাকে শিক্ষা বলি আমরা তার নিরিখে এরা যথার্থ শূন্য। বিশুদ্ধ নিরক্ষর। আমার খুব নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বা পরিজনদের মধ্যে যে কজন মানুষকে সত্যিই নকল করার মত লাগে, আবার নকল করা অসম্ভবও লাগে, তাদেরও কারুরই শিক্ষাটা কোনও মুখ্য জায়গা নয় একেবারেই।

মমতা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই, বেশ কয়েকবার নিজের মধ্যেই মনে হচ্ছিল নিজের এই অভ্যস্ত শিক্ষাবিরোধী অবস্থান থেকে কি শিক্ষাপন্থী হয়ে উঠতে হবে এই বুড়ো বয়সে? তাহলে কি নিজের ভিতর থেকেই কোথাও একটা মেনে নিতে হবে যে মানুষ হয়ে ওঠায় শিক্ষারও একটা গুরুত্বের জায়গা আছে? এবং এতদিন ধরে একটা চিন্তার সঙ্গে ঘর করার পর সেটার অনুপস্থিতিটাও তো একটা বেদনার হয়ে দাঁড়ায়। তাই একটু খারাপও লাগছিল এটা ভেবে।

চূড়ান্ত উত্তরটা পেলাম এই মিনিট পাঁচেক আগে। টেলিভিশনে অম্বিকেশ মহাপাত্রর, সেই মাস্টারমশাই যাকে প্রহার মৃত্যুভয় ও জেল দিয়েছিল গতকাল রাত্রে এই তৃণমূল শাসন ও সরকার, একটি ইমেল ফরোয়ার্ড করার দোষে, সঙ্গে কথা বলছিলেন এক সাংবাদিক। সাংবাদিকটি জিগেশ করলেন, আপনার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে সেই তৃণমূল কর্মীরা যারা আপনাকে মেরেছিল ও পুলিশে দিয়েছিল। আপনার এতে প্রতিক্রিয়া?

মাস্টারমশাই মাত্র দুতিনটে বাক্যে উত্তর দিলেন। তার মধ্যে একটা মাথায় গেঁথে গেল। দেখুন, যারা গ্রেপ্তার হয়েছিল, তারা তো আমার পরিচিত ও প্রতিবেশী — এতে তো আনন্দ পাওয়ার কিছু নেই।

আমরা সকলেই জানি পরশু রাত থেকে মাস্টারমশাইয়ের উপর কী চলছে। তার পরেও এই প্রতিক্রিয়াটা আমায় কেমন স্তম্ভিত করে দিল। এটাকে কী বলব? এটা তো শিক্ষা নয়, শিক্ষিত মানুষ তো রোজই দেখি কোটি কোটি। তাহলে এটা কী? হয়তো এটাই শিক্ষা।

আর এর উল্টোদিকে যে তৃণমূল শাসন ও সরকার — সে অর্থে তো তারাও কেউ অশিক্ষিত নয়। শিক্ষিত না হলে তো অন্তত কম্পিউটার চালানো, ইমেল খোলা, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, বা মাইকে বক্তৃতা করে চেঁচানো যায় না, “অন্যায় করেছে তো তার শাস্তি পাবে”। অনেকে টিভিতে বলছিলেন এটা মমতার তথা তৃণমূলের অশিক্ষা। না অশিক্ষা নয়, ওটা কুশিক্ষা।

মাস্টারমশাই অম্বিকেশবাবু, আমিও মাস্টারমশাই, বেশ বয়সও হয়ে গেছে, তাও আমাকেও আপনি আজ শেখালেন, কী ভাবে ভাবতে হয়, সারারাত পুলিশের লক-আপে কাটানোর পরের দিনও। আমি এখন থেকে আপনাকে নকল করার চেষ্টা করব। তবে কতটা পারব জানি না।

April 13, 2012

ভগবান ও মমতা — কী ভাল এবং ফর্সা

আজকের গোটা লেখাটাই চুরি করা। কারণ এত অসুস্থ ও অবিস্রস্ত লাগছে গোটাটায় যে নিজে লেখার অবস্থায় নেই। সুমনের গান থেকে চুরি করা নামটা। এবং গুরুচণ্ডালী সাইটের (guruchandali.com) ভাটিয়ালিতে সিকি বলে একজনের লেখা দেখে মুগ্ধ হয়ে সেটাই চুরি করলাম। শুধু একদম শেষে ‘মমতা কী ফর্সা’ এই তিনটে শব্দই মোটে আমার।

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা জয় মমতা

মমতা কী ভাল! মমতা কী দরদী! মমতা কী মিষ্টি! মমতা কী ফর্সা!

October 19, 2009

পুজোর ব্লগ — সংযোজন ১

এটাই পুজোর ব্লগের শেষ লেখা। এমনটাই মনে হচ্ছে। কারণ কাল থেকে প্রবল কাজের চাপ। লেখার কাজ যতটুকু এগিয়েছে তার থেকে অনেকটা বেশি এগোনোর দরকার ছিল। তাই আর সময়ও হবে না। আজই শেষ এক টুকরো অবসর এই বকেয়া বিষয়টা শেষ করার। আমি কী দেখলাম এই বছরের পুজোর, বা, যেমন আগেই লিখেছি, আগে তো পুজোর অংশ হইনি কখনওই, এমনকি পুজোর দর্শক হিসাবেও নয়, তাই আসলে পুজো ব্যাপারটাই আমি কী দেখলাম। আসলে আমি কিছুই দেখিনি — মানে, দেখেছি অনেক শূন্যতা, আর শূন্যতা তো দেখা যায় না।

উল্টোদিক দিয়ে শুরু করা যাক। আজ সন্ধ্যাবেলা ফিরে এলাম কালীপুজোর দিনগুলো এক আত্মীয়বাড়িতে কাটিয়ে। ফিরে এসেই, মধ্যমগ্রাম স্টেশনে নেমেই পেলাম গাঁক গাঁক করে মাইকের আওয়াজ। তার পরে পাড়ায় ফিরে। শনিবার গেছে পুজো, আজ সোমবার, আজও বিরাট দাপটে ও গতিতে চলছে মাইক ও বাজি। এই কথা বোধহয় সকলেই কমবেশি বুঝতে পারছে এবার, সব এলাকারই, মানু আমায় বলল, খবরের কাগজেও লিখেছে।

আমার কলেজের এক সহকর্মী ফোন করেছিল। ওর বাড়ির কাছেই বস্তি, ও থাকে একটা সরকারি আবাসনে, সেটার মধ্যে কোনও পুজো হয়না, কিন্তু পিছনের বস্তিতে হয়। ওরও খুব আওয়াজে কষ্ট হয়, এইগুলো নিয়ে তাই অনেক কথাও হয়। আজও হল। শনিবার থেকে আজ পর্যন্ত, ও আমায় বলল, জানো দীপঙ্করদা, কোনও বাড়িয়ে বলছি না, অন্তত পঞ্চাশবার একটা সিডি চলেছে, আমার ফ্ল্যাটের থেকে ফুট কুড়ি গজের মধ্যে মাইক, তাই গোটা গানটা আমার মুখস্থ হয়ে গেছে। আমায় গানের কথাগুলোও বলল ও, আমি এখন লিখতে গিয়ে দেখছি ভুলে গেছি, ‘ও ফুলির মা, ফুলিকে বলো না, সবার সঙ্গে ডেট মারে, আমাকে আর দেখে না’ — ইত্যাদি। শ্রমজীবী মানুষের সংস্কৃতি তো — তাই বোধহয় একটু অপরিচিত গান। আমি ওকে জানালাম, ওই একই অবস্থা সব ধরণের জীব ও জীবীদেরই, ‘পরান যায় জ্বলিয়া রে’ আমাদের পাড়ায় চলছিল। এবং যে গানই চলুক, যাই চলুক, মন্ত্র বা গান বা গোষ্ঠীর পিণ্ডদান, সব কিছুতেই একই অবস্থা।

আমার এই সহকর্মীও নিজে অনেকের সঙ্গে কথা বলেছে, এই সব নিয়ে। ও একটা মজার জিনিসও জানাল, আগে সচরাচর অবাঙালীদের দিওয়ালি বাঙালী কালীপুজোর পরের দিন হত, কিন্তু এবারে একই দিনে পড়েছে, তাও বাজি ও আওয়াজ দুদিন ধরেই, আজ তৃতীয় দিনও চলছে, বাঙালীর উৎসব ক্রমে বেড়ে যাচ্ছে। আমি জিগেশ করলাম, তোকে লোকে কী বলল। ও বলল, জানো, অনেকেই বলল, একটা ফেস্টিভাল, সেলিব্রেট তো করবেই লোকে।

আমাকে প্রথমে আকৃষ্ট করল শব্দ দুটো। ফেস্টিভাল ও সেলিব্রেট। কথা হচ্ছে পুজো নিয়ে। পুজোর ধর্মের জায়গাটা যদি ছেড়েও দিই, সেখানে উৎসব নয়, ফেস্টিভাল। দ্বিতীয় শব্দটা প্রথম খুব চালু হতে দেখেছিলাম মদ্যপানের জন্য যুক্তি হিসাবে। এবং সেই ধারণাটাও এমন যে, আমার ছোটবেলায় যে বাঙালী অস্তিত্ত্ব আমি চিনতাম, তার জানা-বোঝার পরিসর দিয়ে বোঝা যায় না। ফেস্টিভালও তাই। আমি যে আমার ইতিহাসকে জানি সেখানে এটা সতত সঞ্চরমান শব্দ ছিল না। একটা আমদানি। আমদানি তো তাই যা মূল অবস্থানে নেই এমন কিছু বাইরে থেকে আনা।

আমি ওকে বললাম, এই জায়গাটাই আমাকে অবাক করে, সেলিব্রেট করতে হবে কেন আলাদা করে? যদি আনন্দ থাকে, তা তো স্বপ্রকাশ হবেই। আনন্দ যদি থাকে, তবে তো নিজের বউয়ের সঙ্গে বারান্দায় বসে চা খাওয়াও তো চূড়ান্ত আনন্দিত অবস্থাকে হাজির করতেই পারে। এটা কারুর ক্ষেত্রে কখনও মদ্যপানকে আনতে পারে, বাজিকেও আনতে পারে, গানকেও নিয়ে আসতে পারে। কিন্তু মূলটা কোথায়? আনন্দে। আর তাই যদি হয়, তাহলে বিশেষ কোনও কিছু একটাকে প্রয়োজন হবেই কেন? তার মানে প্রয়োজনটা ওই জিনিসগুলোরই। আনন্দটাকে একটা বক্তব্য, একটা উপস্থাপনযোগ্য যুক্তি হিসাবে হাজির করছি আমরা। ও আমার এই যুক্তিটাকে সমর্থন করল। ও নিজে কিছুদিন আগে একটা মানসিক মন্দার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। সেই সময়কার কথা মনে পড়িয়ে বলল, মনে নেই, ওই সময় আমি কেমন ছুতো খুঁজতে থাকতাম, যাই পেতাম তাই নিয়ে কখনো মাল্টিপ্লেক্স কখনো মল — এই সব করে বেড়াতাম।

একটু পিছোই। গত তিন চার দিন, কালীপুজোটা যেখানে কাটালাম — আমার এক আত্মীয় বাড়ি। সেখানে নানা অতিথি অভ্যাগতদের সঙ্গে, বা কখনও আমরাও গেছি কারুর কারুর বাড়ি বা কোথাও, অনেকটা সময় কাটালাম। কী দেখলাম?

পুজো উপলক্ষেও একটা প্রতিযোগিতা। যার চূড়ান্ত ভাঁড় উদাহরণটা হল, একটি পুজোর মন্ডপে কুড়ি সেকেন্ডে সর্বোচ্চসংখ্যক ফুচকা খাওয়ার প্রতিযোগিতা। এক, যদি কারুর মধ্যে ন্যূনতম ধর্মীয় অনুভূতিও থাকে, যেমনটা আমি দেখেছি আমার এক মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি, বীরভূমে, বাহিরি গ্রামে, শান্তিনিকেতনের কাছেই,  কালীপুজোয়, সমস্ত মানুষ সামগ্রিক ভাবে যেন এক ভরগ্রস্ততায় চলে যেত, ঢোল বাজছে, কাঁসর বাজছে, সবচেয়ে বড় কথা, মানুষগুলোর চোখগুলোই বদলে গেছে সেই মধ্যরাত্রে, এ আমি নিজে দেখেছি, সেই ধর্মীয় অনুভূতির খণ্ডমাত্রও যদি থাকত, তার কাছে তো এই গোটাটাই আপত্তিকর লাগত। আমায় যদি কেউ জীবনানন্দের জন্মদিনে ফুচকার প্রতিযোগিতায় নামতে বলে আমার যেমন লাগবে।

আমি সেই ধর্মীয় বাতাবরণের পক্ষে কথা বলছি না। আমি মোটেও পক্ষে নেই তার। সেই বলি, সেই রক্ত, সেই উন্মত্ততা। কিন্তু কথাটা হল এই যে, সেটা ভিন্ন। তার মানে ধর্মীয় অনুভূতি থেকে এটা ঘটছে না। তাহলে কী থেকে ঘটছে? আবার আমরা ফিরে এলাম সেই একই জায়গায় — আনন্দের বেলাতেও যেমন — শরীরটা লোপাট হয়ে গেছে, কিন্তু তার জ্বর হচ্ছে, হিসি পাচ্ছে, কপকপ করে খাচ্ছে।একটা শূন্যতা। আর তাকে ঘিরে আছে প্রচুর পূর্ণতার চিহ্ন।

এই চিহ্নগুলো আসছে কোথা থেকে আমরা গোটাটাই চিনি, আমি যে টিভি দেখি না, সেই আমিও, কোথাও গিয়ে টিভি বন্ধ করার আগের সময়টুকুতে, বা, কিছুতেই বন্ধ করায়, যতটুকু যতটুকু দেখে ফেলি, তাতেই দেখেছি, এবম্বিধ নানা প্রতিযোগিতা। এমনকি তা বাংলা সংস্কৃতি রক্ষার তাগিদেও — রসগোল্লা খাওয়ার প্রতিযোগিতা।

প্রতিযোগিতা শুধু ফুচকাতেই নয়। বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয়দের মধ্যেও। একজন কেউ কারমেল নিয়ে কিছু বলল তো আর একজনের তাতে প্রতিক্রিয়া হল, কারণ তার ছানা পড়ে কারমেলে নয়, এবং অন্য কোনও নিকটাত্মীয়ের ছানা পড়ে কারমেলে। এই ছানাদের এবং ছানাদের বাবামায়েদের প্রতিযোগিতা নানা কিছুতেই — পুজোয় কার কী পোষাক হল, কতটা মহার্ঘ, কোন রেস্টোরেন্টে, কতটা কুলীন, কারা কোথায় গিয়েছে। ইত্যাদি। কতকগুলি ব্রান্ডের মধ্যেকার প্রতিযোগিতা, যার শিকার হচ্ছে কিছু লোক যারা মনে করছে যে তারা পুজোয় আনন্দ পাচ্ছে। একটা কথা ঠিক, কিছু কিছু ছানাদের, সবকিছুর ভিতরই, আমি প্রবল উত্তেজিত হতে, আনন্দ পেতে, এবং পাগলামো করতে দেখেছি। কিন্তু সেই কথায় আমি একটু পরে আসছি। ওটা আরও একটু পিছিয়ে।

আমাদের পাড়ার ভাসানে গিয়ে, অন্য অনেক কিছুই দেখেছি, তার কিছু তো আগেই লিখেছি। আরও একটা জিনিস উল্লেখ করি এই প্রসঙ্গে। সেই মিছিলে, সে এক মহামিছিল হয়ে গিয়েছিল, এলাকার প্রচুর পুজোর ভাসানের মিছিলের সমান্তরাল এবং সমমুহূর্তিক উপস্থিতিতে। সেখানে আমার এক পরিচিত মহিলাকে আমি বারবার নেচে উঠতে দেখলাম। তাঁকে, তাঁর স্বামীকে, তাঁর সন্তানদেরও চিনি আমি। তার পারিবারিক অবস্থানটাও জানি, অত্যন্ত গড় একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের আর পাঁচজনের মত। একটু রূঢ়ভাষী, এছাড়া আর কোনও পরিলক্ষ্যনীয়তা তাঁর ভিতরে আমি কখনও নজর করিনি। মহিলাটি এবং তার ছেলেমেয়েরা ওই একই মিছিলেই ছিলেন, আমি দেখতে পাচ্ছিলাম। সেই নাচটায়, যেমন হয়, আর প্রায় কিছুই ছিল না সঙ্গমমুদ্রা ছাড়া, যে কোনও ফিল্মের নাচগান, টিভিতে যা দেখায়, সেগুলোয় যা দেখা যায়। এবং মাঝেমাঝেই তিনি হাতের ভুঁইপটকা মাটিতে আছড়ে ফেলে ফাটাচ্ছিলেন। গোটাটায়, ওনার সমস্ত ভঙ্গীগুলো মিলিয়ে, ছিল একটা সাবভারশন। সঙ্গতকে ফাটিয়ে ফেলে বেরিয়ে আসা নিরুদ্ধ সত্তার স্ফোরণ। সেটা আমার মজাই লাগছিল। এটাই আনন্দ? বোধহয় আমার এবারের এই গোটা পুজো অভিজ্ঞতায় এটাই আমার বয়স্কদের স্তরে একমাত্র খুঁজে পাওয়া।

বাচ্চাদের কথায় ফিরে যাওয়া যাক। নবমীর দিনে আমার এক পুরোনো ছাত্রী, এখন বন্ধু, ফোন করেছিল। কী গো, কী করছ? আমি বললাম, তুই কী করছিস? বলল, জানো আমি শুধু বকা খাচ্ছি সবার কাছে। আমি বললাম, কেন, কী করেছিস? ও বলল, আমি করিনি, আমার মেয়ে করেছে। মানে, বকছে আমাকেই। আমি বললাম, কী হয়েছে। বলল, দেখো না, মেয়ের তো প্রবল ফূর্তি, শুধুই লাফাচ্ছে। আর আজ যা গুমোট, পাগলের মত ঘামছে, সন্ধ্যা থেকেই চার বার জামা বদলেছি। ঘটনাটা এই যে, সুন্দর সুসজ্জিত করে রেখে না দিয়ে ও কেন ওর মেয়েকে ওরকম লাফাতে দিচ্ছে এটা নিয়েই অন্যদের আপত্তি। ওর ন-বছরের মেয়েকে ও কেন সেই রকম সাজিয়ে রেখে দেবে না ও যেমন ওরা তাদের বাচ্চাদের রেখেছে।

আবার আমরা সেই একই জায়গায় ফিরে এলাম। আনন্দে মানুষ সাজে, সেই চিহ্নটা থাকলেই চলবে, আনন্দকে বরং মেরে দাও। ওকে আমি কী বললাম সেটা বরং পরে বলছি। তার আগে একদম পিছিয়ে যাই, সেই সপ্তমীর দিনে আমাদের পুজো ও ঠাকুর দেখতে গাড়ি চড়ে কলকাতায় যাওয়া এবং অ্যাম্বারে খেতে যাওয়ার গল্পে।

লিখতে গিয়ে যেটা খুব উল্লেখনীয় লাগছে প্রথমেই সেটা হল রাস্তায় জমে যাওয়া জ্যামে অজস্র যানের এবং যানের লোকেদের মধ্যে কী ভয়ঙ্কর নীচতা। একটি গাড়ির ভিতর একটি বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তার গাড়ির লোক যখন তাদের গাড়িটা একটু পাশ কাটিয়ে বার করে নিতে চাইলেন, তখন অন্যান্যদের প্রতিক্রিয়া দেখলাম। একজন বললেন, বোসপুকুরের পুজোর এখানে এসেই অসুস্থ হয়ে পড়ল — ইত্যাদি। হতেই পারে যে ওটা সত্যি নয়, কিন্তু সত্যি কিনা জানিনা এই অবস্থায় এই পরিস্থিতিতে মানুষ কী আপত্তি করে? তার চেয়েও বড় কথা, কোনও আনন্দিত মানুষ? আনন্দে থাকাকালীন তার ঔদার্য তো বরং বাড়ার কথা? আমাদের নিজেদের গাড়ি নেই। আর গাড়িতে বা ট্যাক্সিতে চড়াটা আমার ঘটে নমাসে ছমাসে, তাই গাড়ি-আসীন মানুষের মানুষের জায়গা থেকে এই ঘটনার স্বাভাবিকতা বা অস্বাভাবিকতা কতটা তা আমি জানিনা।

(বাজির শব্দে রু কেঁপে ও কেঁদে ওঠার পর ওকে কম্পিউটারে সিনেমা চালিয়ে দিতে হল, তাই লেখায় এখানে একটু থামতে হয়েছিল।)

তারপরে দেখলাম, মানুষ খাচ্ছে। কী পরিমাণ যে মানুষ খেতে পারে, অবলীলায়, তার ধারণাটাই আমার বদলে গেছে ওই দিনের পর। কী একটা ঘোরগ্রস্তের মত মানুষ খাচ্ছে। আমি কোনওদিন বিদেশে যাইনি। আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয় ইউরোপ আমেরিকায় উৎসবের সময় খাদক মানচিত্রটা ঠিক কী দাঁড়ায়। কারণ, আমার নিজর বিশ্বাস, সেদিন সেই উচ্চ মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত মানুষগুলোর মুখে হাতে চামচে প্লেটে আমি একটা তৃতীয় বিশ্বের দুর্ভিক্ষতাড়িত বুভুক্ষা দেখতে পাচ্ছিলাম। যেন টিভিতে একটু আগেই দেখে এসেছে মধ্যপ্রদেশের গোণ্ডরা কী ভাবে না খেতে পেয়ে মারা গেছে, এবং সেই স্মৃতি থেকে এরা সব খেয়ে যাচ্ছে।

খাওয়া নামক ক্রিয়ার সেই অঘোষিত প্রতিযোগিতার পাশাপাশি আর একটা প্রতিযোগিতা দেখছিলাম, পোষাকের ও শরীরের প্রদর্শনীর প্রতিযোগিতা। হয়ত একটা মানেই অন্যটা। আবার সেই বুভুক্ষা। এবার খাদ্যের নয়, কামের।

আনন্দ কই?

খুব আনন্দিত অবস্থা মানে তো অভিলাষের পরিপূর্ণতার আরাম। এর এ তো শুধু অভিলাষের ও বাসনার আরও আরও অপরিপূরণ। তাহলে আনন্দ কোথায়?

আমার সেই ছাত্রীকে যা বলেছিলাম, সেটা দিয়েই শেষ করি, আরও অনেকটা লেখার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু শেষহীন এই শব্দবাজি ও মাইকের অত্যাচারে শুধু রু না, আমিও কেঁপে উঠছি বারবার, এবং ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। আমি ওকে বললাম, তোর কী ধারণা, পুজো কেন হয়? ও বলল, কেন আবার হয়, পুজো তো হয়েই আসছে। আমি ওকে বললাম, না, পুজো হয় মিডিয়ার জন্যে। মিডিয়া প্রচার করে, আর এই মানুষগুলো এত শূন্য যে, সেই প্রচারের পরে এরা বিশ্বাস করে নেয় যে, এই এই এই … ক্রিয়াই হল আনন্দ। এই এই জিনিস কেনা, খাওয়া, পরা ইত্যাদি। তখন তারা তাই করতে থাকে, এবং এই কুসংস্কারে বিশ্বাস করে নেয় যে তারা আনন্দ পাচ্ছে। তখন, ফলত, সবাই একই জিনিস বিশ্বাস করে নেওয়ায়, সেটাই আনন্দ হয়ে দাঁড়ায়। একমাত্র যে ক্রিয়াটা এই গোটাটায় তা হল আরও আরও বিক্রি। বাজির, মাইকের, খাবারের, পোষাকের, প্রসাধনের। আমি টিভি দেখলে মিলিয়ে মিলিয়ে বলতে পারতাম, কী কী বিজ্ঞাপনে কোন কোন জিনিস আসে। খেয়াল রাখিস, সংবাদ মানেও কিন্তু বিজ্ঞাপন, ‘সংবাদ’ নামের বিজ্ঞাপন, ‘অনুষ্ঠান’ নামের বিজ্ঞাপন, এবং ‘বিজ্ঞাপন’ নামের বিজ্ঞাপন।

সঙ্কর্ষণ লিখেছিল, জয় হো সিরিজে কিছু লেখা উচিত।

জয় হো মানুষের পুজোর আনন্দের।

(খুব দ্রুত টাইপ করেছি, প্রচুর টাইপত্রুটি থাকার কথা, কিন্তু আমি আর এখন দেখতে পারছি না, বড্ড ক্লান্ত লাগছে।)

October 11, 2009

পুজোর ব্লগ — সংযোজন

সুস্মিত বলেছিল পুজোর ব্লগ লিখতে। হয়নি। লেখা শুরু করে হাজিপাজি লিখতে শুরু করেছিলাম। আজ লিখি, লেখার একটা কারণ এল।

আজ গেছিলাম আড়িয়াদহে, আমার বন্ধু সুমিতা ও মধুসূদনের মেয়ে তিতাসের জন্মদিনে। আমি কোথাও যাইনা বলে বিশ্বপৃথিবীর সবাই আমাকে গালাগাল দেয়, নিজের ঘরে নিজের কম্পিউটারের সামনে পড়ে থাকি। তাই মাঝেসাঝে, মানে মাঝে-বছর-দুয়েক-অন্তর-সাঝে, এরকম হঠাৎ করে কোথাও গিয়ে পড়ি, গিয়ে সততই নিজেকে বেশ উজবুকের মত লাগে, কেন গেছি এর কোনও কারণ খুঁজে পাই না, কেন কথা বলছি, বা তার চেয়েও ভয়ঙ্কর, ঠিক কী বলছি সেটা নিজেই ভাল বুঝে উঠতে পারি না। আমার ভিড় ভাল লাগে না, সে আলাদা করে ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দসই লোকের ভিড় হলেও, কেমন দম আটকে আসে। জোর করে তেঁতো ওষুধ গিলছি এমনটা লাগে। কিন্তু, তাও, মাঝে সাঝে … ইত্যাদি।

ঠিক এটাই হচ্ছিল আমার দশমীর দিনও।পাড়ার সবাই তখন ঠাকুর তুলছেপরপর পাঁচটা ভ্যানে। সঙ্গে লাইট ইত্যাদি লাগিয়ে বিসর্জনে যাবে। কৌশিক, আমাদের পাড়ার ছেলে, আগেই একদিন গল্পসূত্রে বলেছিল, ঠাকুর বিসর্জনের আগে ওর কান্না এসে যায়, সেদিনও দেখছিলাম, ওর চোখ বদলে গেল। ওর, এবং আরও দুজনের, অনুভব করতে পারছিলাম। সরাসরি কেউ কাঁদছে না, কিন্তু বেশ গভীর একটা মন-খারাপ হচ্ছে। আমার এটা হচ্ছিল না, এবং হচ্ছিল না বলে একটা খারাপ লাগা তৈরি হচ্ছিল, যেন সবার মত আমারও এটা হওয়া উচিত, কিন্তু হচ্ছিল না এটাই সত্যি। আমি বারবার তখন প্রতিমা তুলে ফেলা ফাঁকা মণ্ডপটা দেখছিলাম, বরং, সত্য অর্থেই, খুব গোপনে আমার বোধহয় একটা আরামই হচ্ছিল: যাক মাইকটাও তো বন্ধ হল। তখনও, সেই ঠাকুর তুলে ফেলার মুহূর্তেও পাড়ার ছোট ছেলেরা এসে চালিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল, ‘বাবা আমার কি বিয়ে হবে না–’ ইত্যাদি। খুবই বিশ্রী লাগছিল, কিন্তু কিছু বলতে পারছিলাম না, এই মানুষগুলোকে, এই সমবায়টাকে এত কম চিনি, কোনটুকু বলা যায়, কোনটুকু যায় না, সেটাতেই নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। আর যেহেতু এক সময় রাজনীতিটা সত্যিই সবচেয়ে জরুরি কাজ হিসাবে করেছি, অনেকগুলো বছর একটানা, তাই এটুকু অন্তত বুঝি, এরকম কিছু দাগ সদাসর্বদাই থাকে, কোনটুকু করা যায়, কোনটুকু যায় না। শেষে পাড়ারই এক দিদি, তিনি প্রায় বছর ষাটেক, তিনি অত্যন্ত পুজোসক্রিয়, তাই এই সমবায়ের খুব কেন্দ্রীয় অবস্থানেই আছেন, বলা যায়, তিনি গানগুলোয় বিরক্তি প্রকাশ করা মাত্র, ইলেকট্রিকের ছেলেটিকে বললাম, ওটা খুলে দাও।

সত্যিই তখন চারপাশে ওই বিষণ্ণতাটা ছিল। এত অস্বস্তিকর লাগছিল সেটার অংশ হয়ে উঠতে না-পারায়, যে, শেষ অব্দি আমি সমবায়টার হয়ে পরিশ্রম করতে শুরু করলাম। এটা আমার বহুযুগের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। আমাদের কিশোর-যুবক বয়সে একটা শব্দ খুব চালু ছিল: ‘আঁতেল’। এটা ছোটবেলা থেকেই খুব শুনতে হত, কারণ আমি ভিড় ও সমাগম খারাপ বাসতাম। আমার আত্মীয়স্বজন, নিকটজনদের বিয়ে জন্মদিন অন্নপ্রাশন শ্রাদ্ধ বিবাহবার্ষিকী — এই সবই খুব বিরক্তিকর লাগত। লোকজন এত সাজে, এত বানায়, এত ভণ্ডামি করে। কিন্তু এ একটা অদ্ভুত সমবায়ের ফ্যাসিজম যে সবাইকেই ওটা খুব পছন্দ করতে হবে, হবেই। আর সবাই যখন বলত, ‘আঁতেল তো তাই ও পছন্দ করে না’, সেটা হয়ত আমাকে চেয়ে আমাকে ভালবেসেই, আমাকে অনুষ্ঠানের অংশ করে নেওয়ার ইচ্ছাতেই করা একটা পরিহাস-আক্রমণ, কিন্তু পরিহাস বলে তার দাঁতে ও নখে বিষ কম থাকত না। সেটায় কেমন বিপন্ন লাগত, অসহায় লাগত। আবার এটাও ঠিক, কোনও অনুষ্ঠানে গেলেই কিছুক্ষণ পর থেকে আমার সম্মুখস্থ প্রতিটি লোকের মুখে থাবড়া মেরে চলার গোপন বাসনা চারিয়ে উঠতে থাকত। অনেক পরে, তখন এমএসসি পড়ি, আমার এক সহপাঠী দেবু বলেছিল, কোনও বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার একমাত্র মানে হয় প্রচুর গাঁজা খাওয়ার পরেই, ও নাকি একবার সেই অবস্থায় গিয়ে, ওর পাড়ারই এক মেয়ের বিয়েতে তার হবু শ্বাশুড়ির সঙ্গে দেশভাগের দুঃখে হাউহাউ করে কেঁদেছিল। এবং, এই গল্পটায় আমার সবচেয়ে উত্তেজক লেগেছিল এই জায়গাটা যে, এই ধরনের একটা কিম্ভুত ঘটনা ঘটানোর পরেও কেউই দেবুকে লাথি মেরে বার করে দেয়নি সেই বিয়েবাড়ি থেকে–এর পরেও ও অনেকবার গেছে সেই বাড়িতে–সেই ভদ্রমহিলাও, আজও, এখনও, ওকে পছন্দই করে। পুরো গল্পটা বলে দেবু আমায় বলেছিল, সেই মুহূর্তে সেটা আমার মাথাতেও ঘুরছিল, বিয়েবাড়িফাড়িতে সবাই বোধহয় গাঁজা কি সিদ্ধি খেয়ে থাকে, কেউই শালা বোঝে না কী হচ্ছে কী করছে।

তা দেবুর সেই সমাধান আমার কোনওদিনই করে দেখা হয়নি। বরং আমার গায়ের জোর আর কায়িক শ্রম করার ক্ষমতা চিরকালই গড়ের চেয়ে বেশি বলে আমি আমার পক্ষে সহজ একটা সমাধান তৈরি করে নিয়েছিলাম, অনুষ্ঠানের সঙ্গে বসবাসের। পরিবেশন কি মালপত্র টানাটানি গোছের এমন একটা কাজ নিয়ে নিতাম যা শেষ হবে না, করেই চলতে হবে, করেই চলতে হবে, তাতে ওই সাজগোজিত ন্যাকামোর আক্রমণ এবং করার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাব। পেতামও। আরও বাড়তি কিছু পেতাম। কাজের শেষে, সবকিছু মিটে যাওয়ার পর, সবাই যখন জিরোচ্ছে, বয়স্করা উল্লেখ করতেন, ওঃ, ও কিছু খেটেছে বটে, আসলে ওর কিন্তু টানটা খুব। ইত্যাদি। একটু অস্বস্তি লাগত, ঠকাচ্ছি না তো, কিন্তু ভালও লাগত, নিজেকে ওই সমবায়ের অংশ বলেও মনে হত, সেটাতে ভালও লাগত, হয়ে উঠতে ইচ্ছে করত, সেই ইচ্ছেটা করত আমার চিরকালই। আমি কোথাও ওই গোটাটার অংশ হয়ে রইলাম সেই জায়গা থেকে যত ছোট করেই হোক নিজেকে একটু অর্থপূর্ণও লাগত।

দশমীর সন্ধ্যায় আমার সেই পুরনো অভিযোজনে ফিরে গেলাম অনেকদিন পরে ফের একবার। অতগুলো প্রতিমা, দুর্গার মূলটা, আর চারটে লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক ও গনেশের, আটফুট দশফুট লম্বা সেই প্রতিমাগুলো মণ্ডপ থেকে নামিয়ে ভ্যানে সাজানোটা সত্যিই একটা প্রবল পরিশ্রম। সেটাতেই হাত লাগালাম। পাড়ার বয়স্ক একজন, পুজো সংগঠকদের একজন, আরও এখন তো আমিও বয়স্ক, বললেনও, তুমি করছ এসব, এ কী? বানিয়ে না,  বেশ সসঙ্কোচ হয়েই বললেন। আমার আবার সেই সমবায়ে ফেরার অনুভূতিটা হল। এদের বেদনার ভাগ নিতে পারছি না, হচ্ছে না আমার, কিন্তু শ্রমের ভাগ তো নেওয়াই যায়।

অনেকটা সময় লাগল সবটা হতে। ঘামে জামা বেশ ভিজেও গেল। এর মধ্যে, একটু জিরিয়ে নিতে, পাড়ার মোড়ে এসে একটা সিগারেট ধরালাম। তখন অন্য অনেক পুজোর বিসর্জনের শোভাযাত্রা বেরিয়েও গেছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেসব দেখছিলাম, সেই প্রবল আওয়াজ, কিন্তু খোলা জায়গা বলে খুব অসুবিধাও হচ্ছিল না। আর প্রচুর ঢাক বাজছিল। ঢাকের বাজনাটা আমার দেখি বেশ লাগে। এমনকি অনেকসময় শরীরেও তালটা অনুভব করতে পারি।

এই রকম সময়ে ঘটল ঘটনাটা। উল্টোদিকে বাঁদিকের লেন দিয়ে শোভাযাত্রাটা আসছে বলে একটা অটো রাস্তার বিভাজকের কাটা অংশ দিয়ে ডানদিক থেকে বাঁদিকে চলে গেল, অটোটা মধ্যমগ্রাম ইস্টিশন থেকে চৌমাথার দিকে যাচ্ছিল। শোভাযাত্রার স্বেচ্ছাসেবক যাননিয়ন্ত্রকরা তাকে বারণ করছিল হাত তুলে, সেটা না-দেখেই, বা, হয়তো, দেখার পরও অটোটা ঢুকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দুচারজন ছুটে এল, একজন অটোচালককে মারতে শুরু করল। আমি হাতের সিগারেট ফেলে রাস্তা পার হতে হতেই অটোচালকের মুখ রক্তাক্ত হয়ে গেছে, এবং শাসকদের একজনেরও। অটোচালকটি, একটু চুপচাপ ধরনের চশমা পরা গোলগাল মুখের স্বাস্থ্য ভাল একজন মানুষ, বোধহয় তার প্রতিবর্তী প্রক্রিয়াতেই ঘুষি খেতে খেতে হঠাৎই একটা পাল্টা ঘুষি মেরে বসেছে।

আমি গিয়ে একজন দুজনকে জাপটে ধরলাম। সেই মুহূর্তে, আমার মনে আছে, আমি একটা যুক্তি খুঁজছিলাম। একটা কোনও জোরালো যুক্তি, যেটা সজোরে বারবার চেঁচাতে থাকলে, একসময়, কয়েকজনের অন্তত মাথায় সেটা ঢোকে। আমার নিজের ভক্তি ব্যাপারটা অনুপস্থিত, কিন্তু এই লোকগুলোর তো আছে, একটু আগে দেখছিলাম সেটাও হয়তো মাথায় কাজ করছিল, আমি বারবার চেঁচাতে থাকলাম, আরে ভাসান ভাসান–ভাসানের দিন একটা লোকের রক্তপাত করছেন। সেই পলকটায় যে কথাটা সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে হয়েছিল আর কী। বলছিলাম, আর নিজের ভারি শরীরটা আক্রমণকারী লোকগুলো আর ড্রাইভারের মধ্যে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আর কিছু মাথায় কাজ করছিল না, শুধুমাত্র একটা মার খেতে থাকা একটা লোককে বাঁচানোর চেষ্টা। কিছুই হলনা। শেষ অব্দি ছেলেটির গলাও আমি আমার ঘাড় পিঠ বাড়িয়ে জড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কিছুই প্রায় করতে পারলাম না, নিজের সাদা ফতুয়ায় রক্ত লেগে যাওয়া ছাড়া।

এবং, সেই মুহূর্তেই আমি লক্ষ্য করছিলাম, কী ভয়ানক অনুপস্থিত কোনও জাতের কোনও ভক্তি সেই মানুষগুলোর মধ্যে। একদম ছিঁচকে মস্তান সব। প্রবল ভাবে মদ খেয়ে রয়েছে বলেই যে ভক্তিটা কাজ করছিল না তা নয়। দুই দশক ধরে মাস্টারির অভিজ্ঞতায় অন্তত ছেলেপিলেদের চোখ চিনতে কিছুটা তো শিখেছি, ওই যুক্তিটা ওদের স্পর্ষমাত্রও করেনি।

ফিরে আসার পর পাড়ার লোকে বলল, যারা আমায় মাস্টারমশাই হিসাবে চেনে, আপনি ওদের মধ্যে গেছিলেন কেন — সমস্ত ছিঁচকে বদমাইস। ওরা নাকি বঙ্কিমপল্লীর বান্ধবসমিতির, ঠিক গুন্ডা না, গুন্ডাগোছের, ওরা ওদের কাউকে কাউকে চেনেও, পাড়ার কেউ কেউ বলল।

আজ, আড়িয়াদহ থেকে এলাম সোদপুর, রু, মানু আর আমি। সেখান থেকে মধ্যমগ্রামের অটো ধরলাম। একটি কমবয়েসি ছেলে চালাচ্ছিল। তাকে জিগেশ করলাম, আচ্ছা দশমীর ভাসানের দিন একটা অটো এই রুটেই মধ্যমগ্রাম চৌমাথা যাচ্ছিল, ছেলেটি ফ্লাইওভারের সামনে মার খেয়েছিল, তার কী হল, জানো? যা জানলাম, সেই রাত থেকেই সে হাসপাতালে, ও সোদপুর স্ট্যান্ডের ছেলে, সোদপুর ইস্টিশনের ফ্লাইওভারের নিচে ওদের ইউনিয়নের অফিস থেকেই চিকিৎসার খরচ দিচ্ছে। নাকে খুব গভীর কোথাও লেগে গেছে।

আমি তার পর থেকেই অস্বাভাবিক হয়ে আছি। এতটাই, যে, ফিরে এসে মানুকে যেই বললাম, এটা ব্লগে লিখি, ও প্রায় লুফেই নিল, হ্যাঁ, লিখেই ফেল, তাতে যদি একটু স্বাভাবিক হও। আমার মাথায় বহু কিছু আসছিল, বহু কিছু, পুজো নিয়ে, ভাসানের শোভাযাত্রা নিয়ে, এবছরে পুজো দেখতে চেয়ে আমি যা যা দেখেছি, তার বহু কিছুই। কিন্তু সবচেয়ে যে জায়গাটায় আমার ঝাড়টা নামছিল, সেটা আসলে আরও অনেকটা গভীর। সেদিন, সেই মুহূর্তে, ছেলেটাকে বাঁচানোর সময়েই আমি খেয়াল করেছিলাম, বড়সড় চেহারা, একটু গোলগাল, চোখে চশমা, আমার সঙ্গে কোথাও একটা মিল আছে। আমার চেয়ে অনেক ছোট, কিন্তু বছর চল্লিশেক বয়স হবে, তার মানে, আমার কোনও ভাই থাকলে তো এরকমই হত। আজকে এটা শোনামাত্রই আমার মনে এসে গেল, আমার শিশু বয়সে বাবাদের ইস্কুলে একটা মামলা চলছিল বলে বাবা বহুবছর মাইনে পায়নি। তাও তো বাবা টিউশনি করত, তাও তো মা, যদিও তখন অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ মাইনের, একটা চাকরি করত। তার পরও নিজেদের অভাবটা মনে পড়ছিল। মনে আসছিল, ওরও হয়তো ছেলে মেয়ে আছে। তাদের মুখগুলো গজিয়ে উঠছিল মাথার ভিতর। হয়ত, এর মধ্যে যদি সময় পাই, সোদপুরের ওদের ইউনিয়ন অফিসে যাবও একদিন।

কিন্তু এটা তো পুজো, এটাও পুজো। এই ছিঁচকে বদমাইসদের পুজো, একটা কাজের লোককে অকেজো করে দেওয়ার পুজো। সেই দশমী থেকে আজ কালীপুজোর আর কয়েকদিন বাকি, বাড়ির স-আয়িক লোকটা অনায়িক হয়ে যাওয়ায় বাড়ির বাচ্চাদের অপেক্ষা করে থাকার পুজো। সুস্মিত, তোর পুজোর ব্লগ এবারও শেষ হল না। অনেক কিছু লেখার আছে রে, অনেক কিছু। কিন্তু জানিনা কবে হবে, আদৌ হবে কিনা। তবু একটু তো হল।

September 29, 2009

পুজোর ব্লগ

আমাদের নিজেদের মেলিং লিস্টে অন্য একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল। তার মধ্যে সুস্মিত লিখল, ‘দীপঙ্করদা, পুজোয় একটা ব্লগ লেখো’। আমরা সকলেই বেশ মজা পেলাম, পুজোয় চাই নতুন ব্লগ। তখন থেকেই মাথায় বিষয়টা নিজের গোচরে অগোচরেই কাজ করছিল, যেন পুজোটাকে লক্ষ্য করছিলাম, সবসময় ভাল করে নিজে না-বুঝেই।

লক্ষ্য করে চলার কিছু সুযোগও আসছিল এবার। আমিই এতটা বুড়ো, আমার বাবা-মা নিশ্চিতভাবেই আরও প্রচুরতর বুড়ো, মানু কিছুদিন ধরে বলছিল, তাদের অনেকদিন ধরে ইচ্ছে রু-এর সঙ্গে পুজোয় ঠাকুর দেখতে যাবে, আর কবে কী হবে না-হবে, সেটাও এবারেই সংগঠিত করা হয়েছিল। রু, বাবা, মা, সঙ্গে সবিতা আর পার্বতী, বহু বছর ধরে আমাদের বাড়িতে কাজ করে, মানু, আর আমি। গাড়ি করে কলকাতা যাওয়া, ঠাকুর দেখা, আর সঙ্গে, যেমন দস্তুর, বাইরে কোথাও খেতে হবে, অ্যাম্বার-এ খাওয়া।

অদ্ভুত লাগছিল নিজের এটা ভাবতে, কিন্তু এটা সত্যি, এটা সে অর্থে আমার প্রথম ঠাকুর দেখতে যাওয়া। খুব ছোটবেলায়, আমাদের ছোটবেলায়, কলোনি থেকে অভ্যস্ত মফস্বল হয়ে উঠতে চাওয়া মধ্যমগ্রামে, বা তারও আগের শিশুবয়সের নিউব্যারাকপুর, সেজেগুজে ঠাকুর দেখতে যাওয়া মণ্ডপে মণ্ডপে তখন কেবল একটু একটু চালু হচ্ছে, কোনওক্রমে টিঁকে থাকা মানুষের একটু একটু করে ক্রমসঞ্চয়মান সময় ও সারপ্লাস, একটু আধটু বোধহয় গেছিও অমন, খুব ছোটবেলার আবছা স্মৃতি ঘেঁটে মনে হচ্ছে। বা এমনও হতে পারে, ওরকমই তো হওয়ার কথা, তাই ওরকম ভেবে নিচ্ছি, অন্য ছবি দিয়ে স্মৃতির ভাঁড়ারের ফুটো মেরামত করার চেষ্টা করছি।

যেটা পুজো সংক্রান্ত স্মৃতি আমার খুব স্পষ্ট ভাবে আছে, সেটা পাঁচ ছয় নাগাদ, নিউব্যারাকপুরের স্মৃতিটা ঠিক পুজোর নয়, পুজো উপলক্ষে ব্যায়ামসমিতির করা শরীরের পেশী প্রদর্শন, আর মামাবাড়িতে, মধ্যমগ্রামের বিধানপল্লীতে, দুলুদার দোকানের সামনে ফাঁকা মাঠে পুজোর মণ্ডপে, খুবই মাঠো সব, বাঁশের বেড়ার গায়ে চটের আবরণ, তার মধ্যে তখনকার ডেকরেটরের কাঠ-পিজবোর্ডের চেয়ারে বসে আমি আর গজো, তখনকার এক সঙ্গী, একটা খেলনা পিস্তল দিয়ে মারামারি করছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য: যুদ্ধে আমিই জিতেছিলাম। ফিরে এসে আমার মামাতো ভাই লবকে সেই জয়ঘোষণায় আমার করা বাক্যটা আমার এখনও মনে আছে, গজোকে জুতো পালিশ করে দিয়েছি।

এর পরের কয়েকটা বছর জুড়ে, মেয়েদের প্রতি, উজ্জ্বল পোষাকের প্রতি আকর্ষণ ছাড়া পুজোর উৎসবের আর যে জিনিসটা মনে আছে সেটা হল মণ্ডপে বসে থাকা। আমি চিরকালই বেজায় কুঁড়ে, বসে বসে চেয়ে থাকার চেয়ে বেশি সক্রিয় কোনও ক্রিয়া আমায় আজও তেমন একটা টানে না। এই মণ্ডপে বসে থাকা, মণ্ডপের নানা, তেমন সুশ্রী নয় বিষয় আমার মাথায় রয়ে যাওয়া কাজ করেছিল ‘তপন বিশ্বাসের খিদের বত্রিশ ঘন্টা’ লেখার সময়ে। আর লেখায় ওটা চলে আসা নিয়ে বেশ অদ্ভুত এবং কুৎসিত একটা অভিজ্ঞতা আমার প্রায় ওই বয়সেই হয়েছিল। হিন্দুস্কুলে আমাদের ক্লাস সেভেনে বাংলা পড়াতেন যে মাস্টারমশাই, হঠাৎ এই লিখতে গিয়ে দেখছি তার নামটা মনে করতে পারছি না, তিনি বাংলা রচনা লিখতে দিয়েছিলেন, রথের মেলা নিয়ে। আমি সে বছরই রথের মেলায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম, কীর্তন যেখানে হচ্ছে সেই গোটাটা। সেখানের একটা উপাদান আমি রচনায় এনেছিলাম। কীর্তনের খোল বাজাচ্ছে যে লোকটা, মাড়ি আর দাঁত কালো, একটু উঁচু, কোনও নারী এসে কাছে দাঁড়ালেই তার দিকে একটু ঝুঁকে যাচ্ছে আর তার খোলের বাজনার জোরও বাড়ছে একটু। গোটাটা সত্যি, আমার এখনও ছবিটা মনে আছে, ঝাপসা ঝাপসা। কী ভাষায় লিখেছিলাম মনে নেই। আমায় ক্লাসে উনি দাঁড় করিয়ে জিগেশ করলেন এটা কী লিখেছ, রম্যরচনা? আমি শব্দটার মানে জানতাম না, এর অনেক বাদে জেনেছিলাম, এবং কী উত্তর দিয়েছিলাম তা আজ আর মনে নেই, কিন্তু উনি আমায় বেঞ্চ থেকে বার করে এনে মেরেছিলেন। আমি সেই মুহূর্তে ভারি ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে গিয়েছিলাম, এবং মার চলাকালীনই বুঝতে পারছিলাম, আমি যা-ই উত্তর দিতাম উনি বোধহয় মারতেন। এখনকার বাজারে এটা বেশ কঠিন, কিন্তু কাম বা যৌনতা নিয়ে কোনও দূরাণ্বয়ী কথাও তখন কী ভীষণ হিংস্রতা বার করে আনত। তখন সেটা বুঝিনি, লোকটা যে পাঁঠা, মজাটা বুঝল না, এটাও বুঝেছিলাম অনেকটা বাদে।

আর এর মাঝেই শুরু হয়ে গেল রাজনীতি। সেই কৈশোর বয়সেই। তখন তো তত্ত্বটত্ত্ব কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু যে লোকগুলো এলাকায় রাজনীতি করত, সিপিএম রাজনীতি, গজোর বাবা তাদের একজন, নিউব্যারাকপুরের অমূল্যজ্যাঠা আর একজন, দেশহিতৈষী নিয়ে আসত আমাদের বাড়িতে, বহুবছর জেল খাটা, দাড়িতে চুলে কিছুটা রূপকথা হয়ে ওঠা সুরেশজ্যাঠা ছিলেন, এরা যে চারপাশের মানুষগুলোর থেকে অনেকটা অন্যরকম, সেটা সেই তখনই বুঝতে পারতাম, কেমন একটা অন্য অনুভূতি হয়, স্বপ্ন দেখানো রকমে একটা কিছু। একটা ভাল অনুভূতি হত, এখনকার সিপিএমদের দেখলে ঠিক যার উল্টোটা হয়। আমি এঁদের নিয়ে কোনও রূপকথা তৈরি করছি না। অতটা ছেলেমানুষ আমি ছেলেবয়সেও ছিলাম না, অনেককিছুই চোখে পড়ত আমার। আটাত্তরের পর থেকে এই লোকগুলোই ক্রমে, তাদের চারপাশ পরিজন পরিবেশ, ক্রমশঃ গেঁজে যেতে শুরু করল, ওই স্বাধীনতা আন্দোলনের পেনশনের মত আত্মত্যাগের বাড়িভাড়া পেতে ও নিতে শুরু করল, দেখলাম। কিন্তু তার আগেই রাজনীতি এসে গেল।

রাজনীতির সেই কিশোরবয়স থেকেই পুজো মানেই হয়ে উঠল অনেক অনেক বই পড়ার অবিমিশ্র ছুটি। শারদীয়া যে কোনও সংখ্যা, বেশ মোটা হলে আমার একদিন ছাড়াত, নয়তো দিনের দিনই নেমে যেত। এর পরপরই এসে গেল পার্টির পুজোর বইয়ের স্টল। বইয়ের সঙ্গে বসে থাকতে, পড়ে থাকতে, এমনকি ঘুমিয়ে থাকতে অব্দি বেজায় ভালবাসতাম চিরকালই। একবার একটা গল্পে একটা চরিত্র লিখেছিলাম যে সঙ্গে বই মানে অক্ষরের কবচকুণ্ডল না থাকলে ট্রেনে উঠতে ভয় পেত, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগত, আত্মপরিচিতি ঘেঁটে যেত তার, সেটা নিজের প্রতিক্রিয়া থেকেই। কম্পিউটার এই উপকারটা করেছে আমার, অন্য অনেক কাজে সাহায্যের পাশাপাশি, বইপ্রতিমার বাতিক দূর করেছে। তবে বোকা ইগোর আত্মঘোষণাটা থাকেই, হয়তো সেটা করে উঠতে নিজেকে অনুমতি দিই না, বা নিজের অগোচরে হয়ত দিয়েও ফেলি, কিন্তু তার প্রতিমাটা অন্তত বদলেছে।

তাই, পুজো ও ঠাকুর দেখতে যাওয়া আমার এই প্রথম। ওরকম শোভাযাত্রা করে দামি জায়গায় খেতে যাওয়াটাও। এখন তো একটু পয়সাটয়সাও হচ্ছে আমার। বুড়ো হতে হতে যেমন হয়েই থাকে।

এবার আরও একটা নতুন জিনিস করলাম। জীবনে প্রথম। বিসর্জনের মিছিলে যাওয়া। রাজনীতির মিছিলে অনেক হেঁটেছি। অনেক রকম। কিন্তু বিসর্জনের মিছিলে এই প্রথম। আর আমার তো সেই খুব ছোটবেলার পর থেকে ভক্তিটা কেমন একটা খসে গিয়েছিল, কোনও কিছুতেই কোনও ভক্তি হত না, লোককে না ঠাকুরকে না। আমার ক্ষেত্রে এটা অন্তত একটা বিষাক্ততা নিয়েই এসেছিল। একটা প্যারানইয়াও হতে পারে, সবাই এটা করছে, আমায় করাতে চাইছে, তার মানেই এটায় কোনও বদমাইসি আছে। কোনও ভক্তি নেই বলে জীবনের খুব একা খুব তিক্ত সময়গুলোয় মাঝে মাঝে নিজেকে খুব একা বোকা এবং বিষণ্ণও লেগেছে, আমার হায় নালিশ জানানোর কোনও জায়গাও নেই। তাই অন্য মানুষগুলোকে, তাদের খুব আবেগ হচ্ছে, ফাঁকা মণ্ডপ দেখে, ঠাকুর চলে যাচ্ছে, কেঁদে ফেলছে, আর সেই লোকগুলোকে তো আমি বেশ ভালই বাসি, পছন্দ করি, তাদের খারাপ লাগায় আমারও লাগছে। এই গোটাটাই আমার বেশ কৌতূহলোদ্দীপক আর আকর্ষণীয় লাগছিল।

এই দুটোকে মিলিয়ে অনেকটা লেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ভূমিকাটা বড্ড বড় হয়ে গেল। আর একটা ঘটনা কাল রাত থেকে ভীষণ খারাপ একটা অনুভূতি দিচ্ছে। সেটা উল্লেখ করে আজকের ব্লগটা শেষ করি। ওগুলো নিয়ে হয়তো পুজোর ব্লগ ২ লিখব এর পর।

এবারের পুজোর কলকাতা দেখে, এবং অন্যদের কাছ থেকে শুনেও যা পেলাম, বেশ শান্তিপূর্ণ ছিল। মাইকের এবং বাজির কদর্যতা বেশ সহনীয় ছিল। গোটা গাদটা এসে জমা হয়েছে মফস্বলে। সারাদিন ধরে প্রবল জোরে মাইক বেজেছে সর্বত্র, রাত্তির এগারোটা নাগাদ মোটামুটি হয়ত বন্ধ হয়েছে, অন্তত মধ্যমগ্রাম নিউব্যারাকপুরে, কিন্তু সারাদিন ধরে সে যে কী কষ্ট হয়েছে। অজস্রবার জানানো হয়েছে গিয়ে, রীতিমত অসুস্থ লাগছিল, কিন্তু কিছু তেমন লাভ হয়নি। আর বাজি ফেটেছে ভয়ঙ্কর। খারাপ অভিজ্ঞতাটা সেই বাজি নিয়েই।

আমার এক বহু পুরোনো ছাত্র, এখন আমার বন্ধু, তার বউ অন্তঃস্বত্তা। সেখানে নানা সমস্যাও আছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আর ওর প্রথম বাচ্চা সাড়ে তিন বছর বয়েস। নিউব্যারাকপুরে ওদের বাড়ির কাছে গতকাল বিসর্জনে এমন বাজি ফেটেছে, সেই সাড়ে তিনের মেয়ে ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে বমি পায়খানা করে ফেলেছে। সেটা শোনা থেকেই এত কষ্ট হচ্ছিল। আমাদের এখানেও, ঘুমন্ত বাচ্চারা কেঁপে কেঁপে উঠছিল। এবং এটা চলে অন্তত রাত একটা দশ পর্যন্ত। আমি ঘুমোতে পারছিলাম না আওয়াজে। ওই সময়ে আমি ওষুধ খেয়ে ঘুমোতে গেছিলাম।

এবার আওয়াজের মাত্রা আবার বেড়েছে, শুনছি যুক্তিটা নাকি শ্রমিকশ্রেণীর হয়ে। যদি শব্দবাজি না হয় এরা কোথায় কাজ পাবে? এ যে কি অদ্ভুত যুক্তি। তাহলে পাইপগান তৈরিকেও স্বীকৃতি দিতে হয়, নইলে শ্রমিকদের কী হবে? বাজি বানাতে কি এতটাই দক্ষতা লাগে, ইতিহাসের মাস্টারমশাই যেমন অঙ্ক শেখাতে পারেন না, যে এই শব্দবাজি-শ্রমিকরা তুবড়ি বা রংমশাল বানাতে পারবেন না?

ছত্রধর মাহাতোকে ধরা হল রাষ্ট্রের বিরোধিতার দায়ে। তাহলে ‘লালা বাংলা ছেড়ে পালা’ আর ভুল ইংরিজিতে ‘ওদের ভাষাতেই ওদের উত্তর দেওয়া হয়েছে’ এই দায়ে বিমান-বুদ্ধকে কেন ধরা হবে না কে জানে? আইনবিভাগকে অপমান করা মানেও রাষ্ট্রবিরোধিতা। বা, মুখ্যমন্ত্রী হয়েও, সংবিধানের ভাষা না বলে দুষ্কৃতীদের ভাষায় কথা বলতে চাওয়া অবশ্যই রাষ্ট্রবিরোধিতা। এরা এই অসভ্যতা গুলো করে করে যা করেছেন তা হল কোনও রকমের কোনও প্রকারের কৌম অস্তিত্ত্বটাই মুছে গিয়েছে, কোনও অনুশাসনের প্রয়োজনীয়তাও। তাই কোনও ক্রমে দম চেপে কলকাতা থেকে তাড়ালেও তা এসে জোরতর হয়ে চেপে বসছে কলকাতার বাইরে, খ্রীষ্ট যেখানে হাঁটেননি।

May 25, 2009

কলকাতা এবং আরও নানা কলকাতা

মধ্যমগ্রামকে কিছুদিন আগে বৃহত্তর কলকাতার পোস্টাল নেটওয়ার্কের পিন নম্বর দেওয়া হল। গত বছর দুয়েক মধ্যমগ্রামের পিন ৭০০১২৯, মানে কলকাতার বিভিন্ন এলাকার মত ৭ দিয়ে শুরু। যে সময়টায় হয়েছিল, তখন বেশ কয়েকবার শুনেছি, এ অন্যকে বলছে: কি, মধ্যমগ্রাম তো কলকাতা হয়ে গেল। এবং তার মধ্যে বেশ একটা গৌরববোধ। ছেলে আমেরিকায় চাকরি পেয়ে গেলে যা হয় তার একটা নরমতর প্রতিভাস। যদিও এই কথাও শুনেছি, আদতে নাকি এই কলকাতা হওয়া কোনও কলকাতা হওয়াই নয়, এটা শুধু ডাক-ও-তার বিভাগের জন্য প্রযোজ্য। যাই সত্যি হোক, তাতে মধ্যমগ্রামের পান-বিড়ির দোকানের মাথাতেও উজ্জ্বলতর অক্ষরে কলকাতা ১২৯ লেখা আটকায়নি। উজ্জ্বলতর, কারণ এখানে একটা চলমান বাস্তব সময়ের পদচিহ্ন থাকছে, যখন সাইনবোর্ডটা লেখা হয়েছিল তখনও তো আমরা গরীয়ানতর এই নাগরিকতার অন্তর্গত ছিলাম না।

কিন্তু আমরা কলকাতার নাগরিকই হই, অহো, আর না-ই হই, হায়, তাতে কলকাতার সঙ্গে আমাদের ভৌগোলিক দূরত্বটা বদলায়নি। আমাদের রেলটিকিটের গায়ে লেখা থাকে, কলকাতা ১৯ কিমি, এটা শিয়ালদা ইস্টিশন থেকে মধ্যমগ্রাম। আবার মধ্যমগ্রাম চৌমাথা থেকে উল্টোডাঙ্গা মোড় ২০ কিমি। এই রেলে ১৯ বা বাসে ২০ এর কোনওটাই তো এমন দূরত্ব নয় যা দিয়ে বোঝানো যায়, গত দশ বছর ধরে (প্রতি নির্বাচনের আগে মাসদেড়েক ছেড়ে দিয়ে) দিনে গড়ে ছয়-সাত ঘন্টা এবং কমপক্ষে দুই ঘন্টার লোডশেডিং। এবং যখন কলকাতায় লোডশেডিং হলেই সেটা খবর হয়। সত্যি কথা বলতে কি,  আমার ল্যাপটপে চলে যাওয়াটা একদমই এই লোডশেডিং-এর কারণে। সকালের খাবার খেয়ে কলেজ চলে যাওয়া ল্যাপটপ নিয়ে, এবং অনেক রাতে কলেজ থেকে ফেরা, কারণ কলকাতায় কোনও লোডশেডিং হয় না। এই পার্থক্যটা এতটাই নাটকীয় যে প্রথম দিকে আমার দু-এক সহকর্মী বিশ্বাস করত না। প্রতিহিংসাপরায়ণ ক্রোধে আমি একটা ভয়ঙ্কর জিনিস শুরু করেছিলাম। যেদিন বাড়ি আছি, লোডশেডিং হওয়া মাত্র ফোন করে তাদের সেদিনের বিদ্যুৎচিত্রটা জানানো।

তফাতটা আমাদের সমাজে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা তফাত, কিন্তু এটা মানতে বেশ কষ্ট হত, এখনও হয়, কিন্তু কষ্টটা সয়ে গেছে, নিজেকে নিচু জাতের বলে এতবার মানতে হয়েছে এই গোটা জীবন জুড়ে। কলকাতায় সাংবাদিকরা থাকে, নেতারা থাকে, মিডিয়ার নজরে পড়ে যায়। ক্রাইস্ট হেঁটেছিলেন ইবোলি পর্যন্ত, আর কারেন্ট হাঁটেন কলকাতা পর্যন্ত। এই কিছুদিন আগে যখন কলকাতায় প্রচণ্ড লোডশেডিং প্রচণ্ড লোডশেডিং বলে বিরাট ধুমধাড়াক্কা হচ্ছিল, একটা গোপন মজা খেলা করত মাথায়। বোঝ শালা, আমাদের তো এটা সয়ে গেছে, তোদের তো হয়নি, তাই আমরা নিচু জাতের বলে একটা সুবিধার জায়গায় আছি।

এবং কলকাতা থেকে ১৯ বা ২০ দূরত্বেই যদি এই হয়, তাহলে দূর মফস্বলে, যেখান থেকে এমনকি কোনও ছাগল আমার মত কলকাতায় চাকরি করতেও যায় না, সেখানে কী হয়? বা সেই পুরুলিয়ার গ্রামে, যেখানের কলেজে একসময় আমি পড়াতাম, যেখানে বিদ্যুৎ পেতে গেলেও পঞ্চায়েতের লোককে বলতে হয়, একটা মূল ট্যাপিং থেকে উপশিরা ট্যাপিং লাগিয়ে দিয়ে যেত, কোনও মিটার কানেকশন ইত্যাদির বালাই নেই, শুধু মাসপ্রতি একটা টাকা একজন এসে নিয়ে যেত। এ অবশ্য আজ প্রায় দুই দশক হতে চলল, জানি না এখন ওখানে কী হয়।

পাটনা আগে লোডশেডিং-এর জন্য বিখ্যাত ছিল, রাজগিরে গিয়ে একবার দেড়মাসব্যাপী লোডশেডিং দেখেছিলাম, সেখানেও এখন শুনছি নীতিশকুমারের আমলে লোডশেডিং বেশ কমেছে। তবে একটা রাজ্য নিশ্চয়ই আমাদের পিছনে আছে, কৃষিদারিদ্রবৃদ্ধির হারেও যেমন, সেটা ঝাড়খণ্ড। এই ঝাড়খণ্ডের কারণে আমরা গেঞ্জি উল্টো করে পরেও প্রথম হতে পারছি না, সেই ঢাকাই কুট্টি একজন উল্টো-গেঞ্জি পরা লোককে যেমন বলেছিল, কর্তা আইতাছেন না যাইতাছেন। কর্তা বলতেই পারতেন উল্টোমুখে অগ্রগতি করছি।

আজকে এই গোটাটার অবতারণা আবার এক পিস খচে যাওয়া থেকে। আজ ভারি ঝড় বাদল যাচ্ছে। খুব ভোর থেকে। বা, শেষ রাত থেকে। সকাল সাতটা থেকে আমাদের কারেন্ট নেই। অনেক গাছ পড়েছে। এইমাত্র জানলাম, ট্রান্সফর্মার শাটডাউন করে দিয়ে গেছে, কালকের আগে কিছু হওয়ার আর গল্প নেই। আমাদের ট্যাঙ্কের জল ফুরিয়ে গেছে। নিচের রিজার্ভারে আছে। সেখান থেকে বালতি করে তুলতে হবে এখন, এই লেখাটা শেষ করেই। কোমরে একটা ব্যথা চলছে, কিন্তু বাড়িতে বাবার বয়স আশির উপর, মার প্রায় আশি, মানুর পক্ষে ঝুঁকে পড়ে দড়ি দিয়ে জল তোলা সম্ভব না। আর জল লাগেই অনেক, বাড়িতে বাচ্চা থাকলে যা হয়। বারো ঘন্টা কারেন্ট নেই ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে, কাল যখনই আসুক, চব্বিশ ঘন্টা পেরিয়ে যাবেই।

এর চেয়েও ভয়ানক বিষয়টা আমাদের পাড়ার ফ্ল্যাটবাড়িগুলো। সেখানের একটি মেয়ে এইমাত্র ফোন করল, ওর দুটো ছোট ছোট বাচ্চা, আমাদের বাড়িতে জল আছে কিনা জানতে চাইল। বললাম, ট্যাঙ্ক শেষ হয়ে গেছে, রিজার্ভারে আছে, তুই বালতি নিয়ে আয়, কিছু একটা ব্যবস্থা করছি। এরকম ঘরে ঘরে।

কিন্তু রাগটা এখানেও হয়নি। অনেকটা বুড়ো হয়েছি তো, যে কোনও অশ্লীলতাই কেমন একটা নৈর্ব্যক্তিক দূরত্ব নিয়ে দেখার অভ্যাস হয়ে যাওয়াই তো বুড়ো হওয়া। বিরক্ত হলাম অন্য কারণে। আমার কলেজের একজনকে ফোন করলাম, কাজে। সে কথা প্রসঙ্গে জানাল, কলকাতাতেও আজ ভয়ানক অবস্থা গেছে, মেট্রো বন্ধ, বাস বন্ধ, কারেন্ট নেই, রাস্তায় গাছ পড়ে। কিন্তু সেগুলো তিনটে নাগাদ মিটে গেছে।

আমার মাথায় এল, সত্যিই তো, যা গাছ পড়ার সেগুলো তো ঘটে গেছে দিনের প্রথম অর্ধেকেই, তারপর সারাটা দিন গেল, সন্ধে গেল, সেগুলো ঠিক করা গেল না? বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে একটা অদ্ভুত ভাঁড়ামো করা হয় প্রতিবার, বর্ষা চলে যাওয়ার পর, সেপ্টেম্বরে, বিশ্বকর্মা পুজো নাগাদ গাছ বা গাছের ডাল কাটা হয়, বোধহয় বর্ষার ফলটাই ফলে, একটু দেরিতে। টেনিদা একবার প্যালাকে বলেছিল, বিকট গ্রীষ্মে যখন রাস্তায় আওয়ারা কুকুর আর সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া কেউ বেরোয় না, তখন কবিরা ঘরের দুয়োর বন্ধ করে লেখে, বাদলরাণীর নূপুর বাজে তালপিয়ালের বনে। নইলে বর্ষাকালে ছাপা হবে কী করে? এটা একটা জরুরি পরিষেবা, সেটা কি এইভাবে বন্ধ করে রাখা যায়? আর বিদ্যুৎ না থাকলে জলও থাকেনা, পৌরসভার জলও আসে না, বাড়ির পাম্পও চলে না।

এইমাত্র একটা ভারি প্রাসঙ্গিক ফোন পেলাম। আমার এক ভাই বারুইপুরে থাকে, সে ট্রেন বন্ধ হওয়ায় বাড়ি ফিরতে না-পেরে, কয়েকজন সহযাত্রী যোগাড় করে একটা গাড়ি করে বাড়ি ফিরছিল, নরেন্দ্রপুর আর কামাল গাজীর মাঝখানে গুন্ডারা রাস্তার গাছ সরানো বন্ধ করিয়ে সব গাড়ি থেকে টাকা আদায় করছিল। বারুইপুরের দূরত্ব শিয়ালদা থেকে ট্রেনে যতদূর সম্ভব ২৪ কিমি। বৃহত্তর কলকাতা।

কী অপরিসীম একটা সভ্যতায় বিরাজ করছি, এই অন্য কলকাতারা, পুলিশ বিদ্যুৎকর্মী গুন্ডাদের কী নিদারুণ পারস্পরিকতা। আমরা কলকাতায় থাকি না, তাই আমাদের এই ভাবেই বাঁচতে হয়।

Filed under: কলকাতা, মধ্যমগ্রাম — dd @ 7:02 pm

Powered by WordPress