নেটখাতা

November 26, 2007

ঔপনিবেশিক অশিক্ষা, ওয়ার্ডপ্রসেসিং, ওওও, এবং মাইক্রোসফট ওয়ার্ড

সিচুয়েশনালি আমি কিছুটা খার খেয়েই আছি, কিন্তু শুধু সেটুকুই নয়। এই ব্লগটায় সত্যিই চটে যাওয়ার মত কিছু বিষয় রয়েছে। সিচুয়েশনালি আমি যে খার খেয়ে আছি, তার একটা কারণ জ্বর। পরশুদিন, বেলঘরিয়ায় একটা নাটকের গ্রুপের ফাইনাল রিহার্সাল ছিল। সেই বেটাবেটিরা কিছুতেই বুঝল না, আমি যথেষ্ট বুড়ো হয়েছি, রাত্তিরের হিমের মধ্যে খোলা ছাদে বসে রিহার্সাল দেখা আমার ধম্মে সইবে না। তা শালা বোঝে কে? সংস্থানগত ভাবে চটে থাকার দ্বিতীয় কারণ সঙ্কর্ষণ। সেটা এমনই পেঁজো, কদিন বাদে বাদেই আমার ব্লগে এসে একটা করে কমেন্ট করে যাচ্ছে, কিছু লিখছ না কেন?

তা যাই হোক, এরকম একটা অবস্থায়, সকালবেলায় একটা লেমলেড (কোনও লেমনেড নয়, একটা জ্বরের ওষুধ, প্যারাসিটামল) খেয়ে আমি একটু শিক্ষিত হওয়ার জন্যে একটা পিডিএফ পড়তে বসলাম। এইসব আইপিটেবল, ফায়ারওয়াল বিষয়ে আমার অশিক্ষাটা প্রায় অতলান্ত। এদিকে, এগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে প্রায়ই। প্রথম হল অ্যাজেরিউস। সেটা চালাতে হলেই আমায় ফায়ারওয়ালটা অফ করে দিতে হচ্ছিল, ঠিক কোন পোর্টটাকে কী ভাবে ছাড়তে হবে, সেটা আমার মাথায় ঢুকছিল না। দ্বিতীয়টা হল স্কুইড। আমার ডেস্কটপে একটা স্কুইড চলে, আর ডেস্কটপ থেকে আইপি-ফরোয়ার্ডিং এনাবেল করে দিয়ে, স্কুইড-ডট-কন্ফ ফাইলটা একটু বদলে, এবং ফায়ারওয়ালে ৩১২৮ নম্বর পোর্ট, যেটা দিয়ে ডেস্কটপের স্কুইডকে ধরে ল্যাপটপটা, সেটাকে ছাড় দিয়ে, ল্যাপটপ থেকে বেশ করা যাচ্ছে নেটসংক্রান্ত সবকিছু। কিন্তু এই করাগুলোর সময়ে ব্যাপক সাহায্য নিতে হয়েছিল সুস্মিতের কাছ থেকে। তখন ওকে অনেকবার বলেছিলাম, আমায় নেটওয়ার্কিংটা একটু শেখাস তো। ও বলেছে, পরীক্ষা হয়ে গেলে আমায় ক’দিন পড়াবে। এর আগে সায়মিন্দুকেও অনেকবার বলেছি, শেষ অব্দি ঘটে ওঠেনি।

যাইহোক আমার সেই নেটওয়ার্কিং সংক্রান্ত নিবিড় না-জানার সূত্র ধরে, সুস্মিত আমাকে একটা লেখা পড়ার কথা বলেছিল। ডব্লুবিউটির সাইট থেকে সেই পিডিএফটা নামিয়ে নিয়েছিলাম। আজ সকালে, আমার দুর্ভাগ্য, আমি সেই লেখাটা পড়তে গেলাম। লেখাটা যতটুকু পড়তে পেরেছিলাম, তাতে খারাপ লাগছিল যে তা নয়। কিন্তু পড়া গেলনা। নিছক বিরক্তি থেকে। এত রাশি রাশি অযত্ন গোটা লেখাটায়। অযত্ন মানে?

কমা, এবং ফুলস্টপ, তারা যখন বসে, তাদের আগে বা পরে, জায়গা বা স্পেস দেওয়া বা না-দেওয়ার কিছু নিয়ম আছে। কোথাও কমার আগে স্পেস, কোথাও পরে। কোথাও নতুন বাক্য শুরু হয়ে যাচ্ছে কোনও স্পেস না দিয়ে। আমার পড়তে গিয়ে খুব বিরক্তি হল। কেন এমন হবে? ও তো লেখাটার বিষয়ে সিরিয়াস: নিজেই যখন লেখাটা রেফার করেছিল, আমার সাহায্যার্থে। একটা টেক্সট টেক্সট হয়ে ওঠে টেক্সটোচিত কিছু নিয়ম মেনে। কিন্তু এটা তো কোনও টেক্সটই নয়।

এত রাগ হচ্ছিল, তখনই একটা ফোন করলাম ওকে। প্রথম কথাটাই বললাম, ওয়ার্ডপ্রসেসর বলে একটা ব্যাপার আছে, জানিস। তারপর বহু কথা বললাম ওর সঙ্গে। ও যা বলল, ও জানেই না, কমা বা ফুলস্টপের পরে স্পেস দিতে হয়। আমি বললাম কী করে জানিস না: তুই তো বই পড়িস। ও আমায় বলল, তুমি বেশ কয়েকজনকে জিগেশ করে দেখো, অনেকেই জানে না। এবং তার পর যা বলল, সেটা আরও ভয়ঙ্কর। ওর এই লেখাটা ফর্মালি পাবলিশ হবে বলে, সাইটে, বেশ কয়েকজন মাস্টারমশাইয়ের হাত ঘুরে গেছে। তারাও কেউ ওকে কিছু বলেনি, এবং কিছু বদলায়ও নি। এভাবেই চলে গেছে লেখাটা সাইটে।

আমার প্রথম মনে হল, এরা, এই মাস্টারমশাইরা — এরা কারা? এরা ক’জন? ভয়ঙ্কর গল্প তো আমি আগেও শুনেছি, আমার নিজের গ্নু-লিনাক্স নিয়ে বইয়ে তার দু-একটা গল্প ব্যবহারও করেছি। আইট্রিপলই-র সভ্য, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক, তিনি নাকি আবার কারনেল ডিভেলপও করেন (হায় খোদা তুমি আমায় কোথায় নিয়ে চলেছ: মুরগীহাটায়?) একবার এক আলোচনায় বলেছিলেন, আমি লিনাক্স আট ব্যবহার করি, কোন কারনেল তিনি ব্যবহার করেন, এই প্রশ্নের উত্তরে। তখনো তিনি কারনেল আর রেডহ্যাটের ভার্শন নম্বরে পার্থক্য করতে জানেন না।

এরা কারা? এক জন ছাত্র, নিজের জীবনের প্রথম সিরিয়াস টেক্সট লিখছে, কত আবেগ নিয়ে, আগ্রহ নিয়ে। সেটাকে এরকম নষ্ট শশা পচা চালকুমড়োর মত করে দেওয়ার এই রাজনারায়ণ বসু-র লেখার ঔপনিবেশিক নিরক্ষরতা সম্পন্ন মাস্টাররা কারা? তারা কজন? কোথায় থাকে? কী দিয়ে ভাত খায়?

কিন্তু আমার বিস্ময়-বিরক্তির পাঠ তখনও শেষ হয়নি। আমি সুস্মিতকে বলেছিলাম, কিন্তু, এই অকালকুষ্মাণ্ডরা তোকে না-বললেও, তোর কাছে তো ওয়ার্ডপ্রসেসর ছিল, ওওও, ওপনঅফিস অর্গ, সেটাই তো দেখিয়ে দেবে, কোথায় ভুল হচ্ছে। ও বলল, কই দেখায়নি তো। আমি তখন ভাবলাম, ও নিশ্চয়ই ভুলভাল বলছে। কিন্তু তখনো আমার অবাক হওয়ার কিছু বাকি ছিল। আরও, আমার মাথায় স্মৃতিতে আসছিল, আমি দেখতে পাচ্ছি, মাথার ভিতরে, যতিচিহ্নের আগে পরে ঠিকঠাক স্পেস না-দিলে, নিচে বেঁকাবেঁকা লাল দাগ।

মজার কথা, এবার আমি ভুলভাল কিছু যতিচিহ্ন দিয়ে, একটা ফাইল লিখলাম ওপনঅফিসে। তার স্ক্রিনশট দেখুন। লক্ষ্য করুন: কোনও গন্ডগোলের নিচেই ও কিছু করছে না। একমাত্র, ফুলস্টপের দুপাশেই কোনও স্পেস না-থাকায়, ও সেটাকে কোনও ভুল বানানের শব্দ বলে ভাবছে। সুস্মিত তো তাহলে ঠিকই বলেছিল। তাহলে? আমার ওই স্মৃতি আসছে কোথা থেকে? এতটা বুড়ো কি আমি সত্যিই হয়েছি? তখন মনে হল, ২০০০ নাগাদ ফ্লসে চলে আসার আগে বেশ কিছু বছর তো আমি এমএস-উইন্ডোজে কাজ করেছি, এমএস-ওয়ার্ডে। সেই স্মৃতি নয় তো? সেই লেখালেখির প্রথম বছরগুলোয় যখন এইসব গোলমাল করতাম।

তাক থেকে ধুলো ঝেড়ে সিডি বার করে, উইন্ডোজ ইনস্টল করলাম, আর আমার সেই পুরোনো ওয়ার্ড-৯৭, যা আমি বেশ কিছুদিন একটানা ব্যবহার করেছি। এবং, মজাটা এই যে, তাতে দেখলাম, আমি ঠিকই বলেছি। স্ক্রিনশট দেখুন।

এবং শুধু এটুকুই না, ওয়ার্ডে স্পেলচেক চালালে, গ্রামারসহ, সে পরিস্কার প্রতিটি ত্রুটিকে চিহ্নিত করছে। ন্যূনতম কিছু নিয়মকানুনও বলে দিচ্ছে। আর ওওও-তে তো আগেই বললাম, শুধু, there.So এটাকে একটা ভুল বানানের শব্দ বলছে, এবং এর কিছু বিকল্প হাজির করছে। তাহলে কি গ্রামারচেক আলাদা করে চালাতে হবে, ওওও-তে? হেল্পে গেলাম, এবং, সেখানে ঘোষিত, ওয়ার্ড যাকে স্পেলচেক এবং গ্রামার বলে ডাকে, এখানে তাকেই স্পেলচেক বলে ডাকা হয়। তাহলে? ঢুকলাম স্পেলচেকের অপশানে, এবং আমার এই এক দশকের বেশি ওয়ার্ডপ্রসেসর ব্যবহারের যতটুকু অভিজ্ঞতা, তাতে কিছু খুঁজেও পেলাম না, যাতে এই কাজটা করানো যায়।

তখনই একটা বাড়তি মজা মাথায় এল: আমি এই ওয়ার্ডটা কিনেছিলাম ‘৯৭-এ। আর ওওওটা এই সেদিন নামানো, ২০০৭-এ। ঠিক এক দশক হয়ে গেল।

আমাদের অগ্রগতির হার ঠিক আছে তো, সঙ্কর্ষণ? অবশ্য তোকে জিগেশ করেই বা কী হবে? বরং, ওপনঅফিসের বিদেশী কাপ্তানদের আমি তো চিনিনা, এশীয় মস্তানদেরই জিগেশ করা যাক, সায়মিন্দু, রুণা, জামিলদের? কী রে, সব ঠিকঠাক চলছে তো? কোনও পেটব্যথা, গা বমিবমি করছে?

ওয়ার্ডের অন্য কাজকর্মের কথা তো ছেড়েই দিলাম। প্রোজেক্ট গুটেনবার্গ থেকে জিপ করা টেক্সট নামিয়ে, গোটাটায় ভাঙা লাইনগুলোকে নিরবচ্ছিন্ন করে, প্যারাগ্রাফ ভাঙাগুলোকে রেখে, সমস্ত কোটকে স্মার্ট কোট করে, কোনও একটা সেরিফ ফন্টে, আমি ব্যবহার করতাম টাইমস, করে দেওয়ার একটা ম্যাক্রো ছিল। গোটাটা সে করে দিত। সেরকম কোনও ম্যাক্রো ওওও‌-তে লেখাও যাবে না, স্ট্রেট কোটকে স্মার্ট কোট করার অপশান দেওয়ার পরেও, রিপ্লেস অল করলেও, সেটা করেনা ওওও, প্রতিটিকে হাতে করে বদলাতে হয়।

সুস্মিতের মাস্টারমশাইরা অল্পেই খুশি, চাকরি এবং বাকরি দুইই যখন চলে যাচ্ছে, সাক্ষর হওয়ার আর দরকার কী? আমাদেরও সেই অল্প লইয়া থাকার অসুখ ধরে যাচ্ছে না তো?

(কী সঙ্কর্ষণ বাবু? ঢিট ফর ঢ্যাট? আবার যদি লিখছি না কেন, তাই নিয়ে খোঁচাস, এরকম বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি সব লেখা লিখব।)

Powered by WordPress