নেটখাতা

December 31, 2007

২০০৭ শেষ, ফেডোরা ৮, সিপিএম, এবং আমাদের পিতৃশ্রাদ্ধ

গত কয়েকদিন ধরে মধ্যমগ্রামে এক নৃত্য-উৎসব চলছিল। মানে, টিভিতে যেমন হয়, কোনও ফিল্মি গানের সঙ্গে নাচ, তার প্রতিযোগিতা। সংগঠক দেবীগড় সাংস্কৃতিক চক্র, মানে, সিপিএমের গনফ্রন্ট যেমন ডিওয়াইএফআই, তার আবার গনতরফ্রন্ট ওই চক্র। তার জন্যে মধ্যমগ্রামের গলির পর গলির গোটা রাস্তা জুড়ে ছড়ানো এবং জড়ানো হয়েছিল আলোকমালা, প্রায় দেড় কিলোমিটার ব্যাস জুড়ে সমস্ত খুঁটি ভূষিত হয়েছিল মাইকের চোঙায়।

আমার বাড়ি সেই ব্যাসেরও বাইরে, কতটা বাইরে তার একটা তুলনা দেওয়া যাক। এই মাইকায়িত এলাকার শেষ চোঙদার খুঁটি ছিল মধ্যমগ্রাম কালীবাড়ির গায়ে, যেখান থেকে আমার বাড়ি আসতে হলে প্রথমে দুমিনিট মত, এবং তার পর লম্ব ভাবে বেঁকে আবার এক মিনিট মত আসতে হয়, মানে, বহুভুজ বরাবর সোয়া দুই মিনিট মত হাঁটা হবে। এর পরেও, আমার বাড়ির সমস্ত জানলা এবং দরজা বন্ধ থাকার পরেও, আমার বাড়ির কমপক্ষে দুটি দরজা বা একটি জানলা (কাঁচের এবং বন্ধ) ভেদ করে সেই ‘মুংলা, মুংলা’ ইত্যাদি গানের ঝটকা আমার কম্পিউটার টেবিলের সামনে বসে থাকা আমার মাথায় আঘাত করছিল। ড্রামের বিটগুলো এসে লাগছিল যেন পেটে। আমি আমার একাধিক বন্ধুকে টেলিফোন চলাকালীন কথা বন্ধ করে ওই আওয়াজ শোনাই এবং তারা শুনতেও পায়।

এদিকে গতকাল আমার একটা কাজও ছিল, এলএফওয়াই-এর সঙ্গে যে ডিভিডিটা দিয়েছে, ফেডোরা ৮-এর, সেটা পত্রিকার সঙ্গে দেওয়া সিডি বলে আমার খুব একটা ভরসা হয়নি। এদিকে নিজের মেশিনে ফেডোরা ৭ দিব্য চলছে, কিন্তু অন্যদের জন্যে, সেটা বিট টরেন্টে নামাতে বসিয়েছি পরশু থেকে। অ্যাজেরিউসের পোর্ট খোলা নিয়ে বড্ড ঝামেলা হয়, তাই একটা নতুন ক্লায়েন্ট ডেলিউজ দিয়ে। বেশ কাজ করছে সেটা, নিজেই খুঁজে নেয় কোন পোর্টে কাজ করতে হবে। আবার কাল খুলে যাবে কলেজ, তার আগে হয়ে গেলেই ভাল। একে আমাদের এদিকে এই অক্লান্ত লোডশেডিং, এবং তার উপর আমার মেশিনও প্রায় আট বছরের বুড়ো অ্যাথলন ১৮০০, তার একটা হার্ডডিস্কও তাই। তাই নজরদারিটা রাখতেই হয়। গত কাল রাতেও তাই, শোয়ার আগে, বারোটা অব্দি মেশিনের সামনেই বসেছিলাম। দু-একটা মেলের উত্তর দিলাম, ইত্যাদি করছিলাম।

গত কদিন ধরেই নৃত্য-উৎসবে, মানে আমাদের এই পিতৃশ্রাদ্ধ চলছিল। গত পরশুর মত, বা তার আগের দিনের মত, আমরা বেশ কিছু লোক কষ্ট পাচ্ছিলাম। সকলেরই একই কথা, পুলিশকে ফোন করে কী হবে, বরং ওরা জেনে যাবে, পুলিশই গিয়ে ‘পার্টি’-কে বলে দেবে। সিপিএমের ত্রাস-নির্মাণ এতটাই পূর্ণাঙ্গ যে, এমনকি ব্যক্তিগত কথোপকথনেও মানুষ দেখেছি, ‘সিপিএম’ নামটা ব্যবহার করে না, বলে ‘পার্টি’। টেলিফোনে অব্দি। তাও শেষ অব্দি, গত কালও, অন্য দিনগুলোর মতই, বেশ দুচারবার পুলিশকে ফোন করা হল। পুলিশ ভারি ভালো ব্যবহার করল। হ্যাঁ দেখছি। তারা দেখল তারা, চাঁদ, শীতের রাত, মধ্যযাম রাত্রির শোভা, বোধহয়।

অন্য ঘরে মেয়ে রু আর তার মা ঘুমোচ্ছে, আওয়াজ আটকাতে জানলার পাল্লার সামনে মোটা বেডকভার ঝোলানো। আমি দেখছি, ডেলিউজে বিন্দু বিন্দু করে বাড়ছে ফেডোরা ৮ এর ডিভিডির ইমেজ, রেস্কিউ সিডির ইমেজ, এবং তাদের এসএইচওয়ান সাম। আওয়াজগুলো কানে শরীরে বাড়ি মেরে চলেছে। হঠাৎ একবার মনে হল, এই সব ফ্রি সফটওয়্যার, জিএলটি, লিনাক্স এইসব, বা যে কোনও কাজই, কোনও কাজ, করার মানে কী? এই সিপিএমই তো ইতিহাস। আর তো কিছু নেই, কোথাও নেই। মনে হল মেশিনে একটা লাথি মারি।

এবং এই ত্রাস তো প্রতিদিন সংঘবদ্ধতর হচ্ছে। এই অত্যাচারও নন্দীগ্রামের পর থেকে আরও স্পষ্ট। যা খুশি করব। নেতারাও, একটা মুখ্যমন্ত্রীও কথা বলছে সন্ত্রাসবাদীদের ভাষায়। ভুল ইংরিজিটা যদি বাদও দি, ইট মারলে পাটকেল খেতে হবে — এটা তো সন্ত্রাসবাদীর ভাষা। ইট মারলে সে তো অন্যায় করছে, তাকে রাষ্ট্রের শাসনে আসতে হবে, রাষ্ট্রের আইনে শাস্তি পেতে হবে — তোমার তো রাষ্ট্রের ভাষা বলার কথা, তুমি রাষ্ট্রের অংশ। তুমি সংবিধানবিরোধী কথা বলো কী করে? তারপর ক্ষমা চাওয়ার ভাঁড়ামো, বেশ চুকে গেল, পার্টিতর ওই ডিওয়াইএফআইরা, বা ডিওয়াইএফআইতর ওই চক্ররা এবার থেকে কি কাউকে মেরে একবার ক্ষমা চেয়ে নেবে, ব্যাস খেল খতম, রাষ্ট্রর দায়িত্ব সম্পূর্ণ?

দম আটকে আসছিল, গা গোলাচ্ছিল, ও ঘরে গিয়ে একবার ঘুমন্ত মেয়ের পাশে বসে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম। তাতেও কিছু হল না। কী হবে কোনও কিছু করে? সব কিছুই তো সিপিএম।

… সেই প্রেতনৃত্য চলল ভোর পাঁচটা অব্দি …

আমি শেষ অব্দি ফেডোরা ৮ এর ডাউনলোড থামিয়ে দিইনি। মেশিনে লাথিও মারিনি, ছি মারতে পারি, আমার কতদিনের সঙ্গী, কত লেখা লিখেছি, আর ওর নামও মামদো, মহম্মদকে যা বলে ডাকতাম, সোহাগের সময়। ফেডোরা ৮ ডাউনলোড চলছে, এখন একটু পজ করে নিয়েছি ডেলিউজ, এই ব্লগটা লিখছি বলে। … রক্তক্লেদ বসা থেকে রৌদ্রে ফের উড়ে যায় মাছি / সোনালি রোদের ঢেউয়ে উড়ন্ত কীটের খেলা কত দেখিয়াছি …

December 27, 2007

মেয়ের মুণ্ড, বাংলা ওয়েবপেজ, এবং ফ্লস

কাল আমার এক আত্মীয় এসেছিল, তার মেয়েকে নিয়ে। রু-এর চেয়ে দুই দিনের বড়। অথচ মাথা ভর্তি ফুলোফুলো চুল। যেখানে রু এর মাথায় এই পাঁচ মাস ন-দিন বয়সেও কিছু ধূসর আঁচড়ের মত চুলের অ্যাপলজি। আমি গুণে দেখিনি। কিন্তু চাইলে গোনাই যায়। মা বলল, ও তো হবেই, তোরও চুল উঠেছিল দেরিতে, তোর তো সবকিছুই দেরিতে, তোর মেয়েরও তাই হবে।

ঠিক তাই। আমার সবকিছুই খুব দেরিতে। হয়ত, বড্ড দেরিতে। আমার গ্নু-লিনাক্সের বইটার একদম গোড়াতেই লিখেছিলাম, লিনাক্স ব্যবহার করতে, শিখতে শুরু করে মনে হয়েছিল, এত দেরিতে এটা পেলাম কেন, কম বয়সে পেলে তো আরও কত শিখতে পারতাম। তখন তো কাজ, কাজের ঝঞ্ঝাটও কত কম ছিল। বেশি ছিল উদ্যম, মানে উত্তেজিত হওয়ার দম।

কাল আর আজ এই দুদিন বসে আমার বেশ কিছু লেখার ওয়েবপেজ বানালাম। অনেকগুলো গল্পের ওয়েবপেজ এবং তার সূচী। লেখাগুলো আগেই ছিল আমার সাইটে। পিডিএফে। এর কিছু লেখা এত পুরোনো যে সেগুলো পিডিএফ ছাড়া আর কিছুই নেই। সেখান থেকে ইউনিকোড করাও যাবে না। নিজে নিজেই ওয়েবপেজ বানিয়ে বড় আমোদ পেলাম। কিছুই না, একদমই ভ্যানিলা ওয়েবপেজ। কিন্তু নিজে নিজেই করে ফেলার একটা মজা আছে। আরও যেটা আমার কাজের জায়গা নয়।

যা বলছিলাম, এই লেখালেখিও শুরু হয়েছিল আমার বড় দেরিতে। এমএসসির-ও পরে এসে। মোটামুটি যে বয়সে বাঙালি ছেলেপিলে লেখালেখি ছেড়ে দিয়ে কাজে মন দেয়। হয়তো কোনও দিন লিখতামও না। কিন্তু সেইসময় রাজনীতি ছেড়ে বসে যাওয়ার বেদনাটা এমন ঘিরে ধরেছিল, সেটার হাত থেকে বাঁচার বাসনাতেই বোধহয় লিখতে শুরু করেছিলাম। আমার প্রথম গল্প ছাপা হয়ে বেরিয়েছিল ‘বারোমাস’ পত্রিকায়। এপ্রিল ‘৮৮তে, একটি লড়াইয়ের ব্যবচ্ছেদ। নিজেরই আজ দেখে কেমন অদ্ভুত লাগছিল। বেশ অনেক জায়গা অনেকটা কাঁচা গদ্যও লাগছিল। ওরকম অবশ্য লাগেই, পুরোনো লেখা।

ওয়েবপেজগুলো বানালাম গেডিট-এ। ও, রুণা বকেছিল, ইংরিজি নাম না-দেওয়ায়, গেডিট মানে gedit, গুহনোমের টেক্সট এডিটর। যদিও আমি এক্স-উইনডোজ ব্যবহার করি এক্সএফসিই (Xfce)। বানাচ্ছিলাম আর দেখে নিচ্ছিলাম ফায়ারফক্স (Firefox) আর এপিফ্যানি (Epiphany) আর কংকোরার (Konqueror) চালিয়ে। ঠিকঠাক দেখাচ্ছে কিনা। বেশ মজা পাচ্ছিলাম এই ভেবে যে, লেখাটার সমাপ্ত অবয়বটাও হচ্ছে আমার হাতেই। এই করে ফেলা আর শিখে ফেলার মজাটা ওই বুড়ো বয়সে এসে আমাকে দিয়েছিল ফ্লস। যা যা দিয়ে আমি কাজ করলাম সেই গোটাটাই তৈরি একটা কমিউনিটির, সম্প্রদায়ের। আমি সেই জ্যান্ত সম্প্রদায়ের একটা জ্যান্ত অংশ। এটা যখনই ভাবি একটা আবেগ তৈরি হয়। আর একবার ধন্যবাদ ফ্লসকে, তাই কায়দা করে, নিজেকেও।

December 24, 2007

কম্পিউটার, বাংলা, ওসিআর

আজ সকালে, আমাদের বাড়ির সামনে ফ্ল্যাটবাড়ির দরজা দিয়ে বেরিয়ে একটি কুচো বালিকা গপ্পোগাছারত তার মা-কে প্রশ্ন করে, “মা, শাঁখ বানানে চন্দ্রবিন্দু আছে?” আমি চন্দ্রবিন্দুটা এখানে আপনাদের বোঝার স্বার্থে দিইনি। সত্যিই সে চন্দ্রবিন্দুটা উচ্চারণ করেছিল। এতে তার মা, যিনি, সকলের জ্ঞাতার্থে জানাই, বাঙালি এবং গ্রাজুয়েট, এবং কোনদিনই নন-রেসিডেন্ট-বাঙালি নন, উত্তর দেন, “আমি তো ঠিক মনে করতে পারছি না, তুই বই থেকে দেখ না”, এবং আবার তার ক্রিয়ায় রত হন।

আমার কলেজের এক বাংলা মাস্টারমশাই, তিনি ডঃ-ও বটেন, গত পুজোর ছুটির পড়ার দিনে, ভোজ উপলক্ষে (কেন ভোজ? — এই প্রশ্ন করবেন না, কলেজের মাস্টারমশাইদের লেখাপড়ার দায়িত্ব থেকে মুক্তিপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে এক গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে — মাস্টারমশাইরা কী করে? কেন, খায়। শুধু খায় তারা। হয়ত এই দায়িত্ব আমাদের কলেজে বিকশিততর, উত্তর কলকাতার খাবারের প্রাচুর্য ও সুলভতার কারণে। ঠিক যখন শোভাবাজার মেট্রো ইস্টিশনের ধারে রাস্তার রেলিঙের গায়ে এই ডিসেম্বরের শীতে পড়ে থাকে অভুক্ত ভিখিরির বাচ্চা, বস্তুটা মরে গেছে না বেঁচে আছে, সেটাও ভালো বোঝা যায় না।) টিচার্স রুমের বোর্ডে নোটিশ লেখেন, “দূর্গাপূজার ভোজ”। আপনারা যারা পড়লেন, আপনাদেরও অনেকেই, স্বীকার করুন আর নাই-করুন, বুঝতে পারেননি, কেলোটা কোথায়। আমি যখন তাকে বললাম, ওটা বোধহয় “দুর্গা” হবে, তিনি আমাকে একটু এলিট উচাটন নিয়ে প্রতিপ্রশ্ন করলেন, “তুমি কি শিওর দীপঙ্করদা?”

আজকে ফ্লিকারে আমার একটা ছবির সূত্রে মাথা-খারাপ করে দেওয়া বিতিকিচ্ছিরি সব প্রশ্ন করছিল সঙ্কর্ষণ। ঠিক হাস্যরস তৈরির বিন্দুতে যা হয়, যা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক, সেটাকে প্রসঙ্গের ভিতর টেনে আনার। তার সূত্রে কথা এল শিবরামের, সুকুমারের। লেখাগুলো ওকে পড়াতে ইচ্ছে হচ্ছিল। তারপর মনে পড়ল, বাংলা লেখা পড়ানো মানে তো স্ক্যান করে ছবি তোলা, তারপর তার দেজাভু বা পিডিএফ ফাইল করে পাঠানো। আমাদের তো একটা ওসিআর এখনো হল না।

ত্রৈলোক্যনাথ, রামেন্দ্রসুন্দর, শিবনাথ শাস্ত্রী ছেড়ে দিন, রাজশেখর বসু বা হুতোম প্যাঁচা বা ঈশ্বর গুপ্তের কথা তুললেও, এমনকি প্রায় আজকের আখতারুজ্জামান, কমলকুমার, ছেলেপিলেরা কেমন মরা তেলাপিয়ার মত চোখ করে চেয়ে থাকে। যে পড়তে চায় না, তার কথা থাক। পড়তে চায় এমন বহু ছেলেমেয়েও তো আছে। তারা পাবে কী করে? অথচ, কম্পিউটারের কল্যাণে এখন লেখাপড়া কত সস্তা হয়ে গেছে। আমার নিজের ঘরে হাজার দুয়েক বই আছে, সেই বই জমেছে অনেক বছরে, বহু কিছু না-কিনতে পারা, না-কেনা, বৌয়ের বহু যুক্তিসঙ্গত গালাগালির ইতিহাস শরীরে নিয়ে তারা জমেছে। অথচ, হাজার নয়, কয়েক লাখ বই আছে আমার মেশিনের হার্ডডিস্কে। এবং তার জন্য প্রায় কিছুই ব্যয় করতে হয়নি আমায়। গত কয়েক বছরে কটা বই আমি আমি ছাপার হরফে পড়েছি, আমার নিজেরই সন্দেহ আছে। শুধু কিছু বাংলা বই ছাড়া।

বাংলা বইয়ের সূত্রে মনে এল, রু-এর জন্যে গোটা সুকুমার রায় আর উপেন্দ্রকিশোরটা অডিওয় তুলে রাখার প্ল্যানে নভেম্বরে দে’জ থেকে উপেন্দ্রকিশোর আর সুকুমার রচনাবলী কিনলাম, আয়তনের তুলনায় বেশ সস্তা। শদুয়েক করে। কিন্তু, পাতায় পাতায় ভুল, মূল লেখায় যেখানে ছবির প্রসঙ্গ আছে সেই ছবিগুলো দেওয়া হয়নি, কোনও লেখার তালিকা দেওয়া নেই বইয়ের শেষে, ইত্যাদি। এককথায় যাচ্ছেতাই। অথচ বাংলা বই মানেই এই তা তো নয়, সিগনেট থেকে, মিত্র ঘোষ থেকে বহু ভাল বই পেয়েছি আমরা, আনন্দ বই ছাপে বেশ যত্ন নিয়ে। অসম্ভব নিষ্ঠা নিয়ে ছাপে উদ্বোধন। ওদের কাজটা প্রায় অবিশ্বাস্য। শঙ্করের বেদান্তদর্শনের মত আয়তন এবং জটিলতার একটা বইয়েও, এখনও একটাও কোনও ত্রুটি আমি পাইনি, যতদূর পড়েছি, বা, কথামৃত। উদ্বোধনের কথামৃতটা হাতে নিয়েই একটা তৃপ্তি হয়, এখনো কেউ বাংলায় বাঁচে, এই কথা মনে পড়ে।

যাই হোক, অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছি, একটা ওসিআর যদি থাকত, বাংলার এই গোটা অবিশ্বাস্য ভাণ্ডারটা তুলে দেওয়া যেত। এবং, খেয়াল করুন, কাফকার গ্রেট ওয়াল অফ চায়নার সেই রূপকল্পের মত, একটু একটু করে –পিসমিল কন্সট্রাকশন– আজ একটু, কাল আর একটু, পরশু আরও একটু। এবং, কম্পিউটারের কারণে, সেটা তোলা মাত্রই চলে আসত পাঠের আওতায়, ছাপার ঝক্কি এবং খরচ এবং ব্যয় শূন্য। এবং, এর চেয়েও বড় কথা, চাওয়া মাত্র সংশোধনযোগ্যতা। এবং সংশোধনমাত্রই ফের সেটা পাঠের আওতায়।

অথচ? অথচ নেই। কোনও ওসিআর নেই বাংলার। চৈনিক ভাষা, ইংরিজি, হিন্দি এবং তামিলের পরেই এই পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানুষ যা বলে, বোধহয়। দুটো দেশ জুড়ে ছড়ানো। একটা দেশে সেটা জাতীয় ভাষা।

আমি নিজে সরাসরি জানিনা, কিন্তু বহু কথা শুনেছি এই ওসিআর নিয়ে। বহু হারামজাদার নাকি বাড়ির সোফা এবং কুত্তার বকলশ হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে মারা বাংলা তথা ইন্ডিক ওসিআর বানানোর টাকায়। অথচ তারা কিঞ্চিৎ গোবরও প্রসব করেনি। শেষ যা শুনেছিলাম, বাংলা ওসিআর বানানোর নামে যা হয়েছে তা হল, টেসেরাক্টের ইতিমধ্যেই তৈরি থাকা কোডের উপর ভিত্তি করে, দুটো কলামকে একটা কলাম বানানোর প্রকৌশল। অথচ লোকে নাকি টাকা মেরেই চলেছে। আমাদের ফ্লসের তো এলেমদার ছেলেপিলে কম নেই। তাদেরকে দায়িত্ব দিতে পারে না কেউ? আইএসআইয়ে, একসময় শুনেছিলাম, ওসিআরের একেবারে হদ্দমুদ্দ হয়ে গেছে। সেই অশ্বডিম্ব কোন ইনকিউবেটরে তা দেওয়া হচ্ছে?

আচ্ছা, হাইকোর্ট বা সুপ্রিমকোর্ট ছাড়া কেউ তো আজকাল জল উঁচু না নিচু সেটুকুও বলে না। আমরা একটা মামলা করতে পারি না? যে হারামজাদারা এই টাকাগুলো মারল, তারা হয় বাংলা ওসিআর দিক, নয়তো, টাকা ফেরত দিক — এই বলে?

Powered by WordPress