নেটখাতা

November 24, 2009

একটি প্রায়স্প্যাম পিডিএফ এবং অগ্রদানী বামুনেরা

আজ দুপুরে সাতবার পেলাম একই ফাইল, প্রায় পরপর, একটি পিডিএফ। প্রথমে মনে হল কেউ স্প্যাম করছে? তারপর, পিডিএফ-টা খুলে দেখলাম, নিচে যার নাম, ‘তপন দাস’, এবং পিডিএফ-টিতে যা লেখা আছে তারও নিচে সেই একই নাম, ‘তপন দাস’, এবং লেখাটার যা চরিত্র তাতে স্প্যাম বলে মনেও হল না। যতদূর মনে হয়, কেউ একটা আবেগের আতিশয্যে, বা কম্পিউটারে অত্যধিক দক্ষতাবশত এটা করে থাকবেন।

লেখাটার শিরোনাম, ‘এই জন্যই কি আমরা সিঙ্গুর নন্দীগ্রামে একসাথে পথ হেঁটেছিলাম?’ লেখাটা থেকে এখানে প্রতিলিপি করে সেঁটে দেওয়া যেত, অন্তত কিছুটা অংশ, কিন্তু কোনও এক অদ্ভুত প্রাক-ইউনিকোড রকমে লেখা সেটা, পিডিএফ থেকে এইচটিএমএলে পরিবর্তিত করে নিলে সেটা জঞ্জাল হয়ে যাচ্ছে, ইউনিকোডে যা আমরা প্রায়ই করে থাকি। মানে নিজস্ব ফন্টে নিজস্ব নিয়মে লেখা টেক্সটা। আমি পরে দেখছি, মন্তব্যে পিডিএফটা জুড়ে দেওয়া যায় কিনা। কলকাতা ৩২ থেকে তপন দাসের পাঠানো পিডিএফটার মধ্যে একটা আবেগ আছে যে আবেগটা আমাকেও ছুঁচ্ছে। আসছি সেই কথায়। এর আগেও আমার ব্লগে আগেই লিখেছিলাম মাউন্ট ব্যাটন সাহেব-অ, সাধের ব্যাটন কার হাতে থুইয়া গেলা-অ, ২২শে জুলাই, ২০০৯, সেই প্রসঙ্গটাই আর এক বার প্রখরতর হয়ে ফিরে এল এই অগ্রদানী বামুনদের আলোচনায়।

খুব কম লোকের সঙ্গেই আমার রাজনীতি নিয়ে সরাসরি কথা হয়, নিজে নিজে একা একা বাঁচি প্রায়। তাই আমার কোনও রাজনৈতিক মতামতের কতটুকু মূল্য আছে জানি না, কিন্তু আমার যা মনে হয়েছে আমার চেনা একজন মানুষও খুব আশা করে, মানে সেই অর্থে ‘সদর্থক’ রকমে তৃণমূলকে ভোট দেননি। বা এগারোতেও দেওয়ার কথা তেমন ভাবছেন না। এখানে একটা শব্দই অর্থপূর্ণ, তা হল সিপিএম। সিপিএম-এর প্রতি ঘেন্না, যে কোনও মূল্যে সিপিএম তাড়াও — এই জায়গা থেকেই তাঁরা ভোট দিয়েছেন বলে আমার মনে হয়েছে। বা এগারোতেও দেবেন বলে ভাবছেন। লোকজনের মন সরাসরি প্রশ্ন করে জানা যায় না, বরং একদম অন্যরকম কোনও মন্তব্যে তার প্রতিক্রিয়া কী হচ্ছে এখান থেকে তাদের মন বোঝা যায়।

এই উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার দিন আমাদের টিচার্স রুমে আমি একটা মন্তব্য করেছিলাম একদমই ওই লোকের মন পরখ করার উদ্দেশ্যে। একজন যেই জানাল, সিপিএম দশে গোল্লা, এক আধজন পুরো সংবাদটা শুনতে চাইল, একজন আমার দিকে চেয়ে আমার কোনও মতামত চাইল। আমি বললাম, ধুর, এই বাই ইলেকশন নিয়ে আমার কোনও আগ্রহ নেই, এগারোর বাইবাই ইলেকশনে কী হয় সেটাই আগ্রহ। এবং আমি নিশ্চিত, এটা শোনামাত্র টিচার্স রুমের প্রত্যেকের মুখই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

এবং ওই বাক্যে বলুন, বা, বাক্যের পরবর্তী আলোচনায় বা উত্তেজনায়, আসলে কোথাও তৃণমূল নেই। সিপিএম আছে। ভয়ানক বিকট এবং কুৎসিত রকমে। আগেকার দিনে যেমন বলা হত, সিপিএমের পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়ে গেছে — এই বাক্যটা দিয়েই কেবলমাত্র মানুষের সিপিএম-ঘেন্নার সেই অনিবার্যতাটা প্রকাশ করা যায়।

এবং ষোলই মে লোকসভা নির্বাচনের ওই ফলাফল কোথাও একটা গতি সৃষ্টি করেছিল, সমাজজীবনের। সেটা এমনকি আমার মত সমাজবিমুখ মানুষও বুঝতে পারছিল। একটা বড় জায়গায় বক্তৃতা করার নেমন্তন্ন, যারা করল তারা জানাল, দেখো ষোলই মের আগে হলে তো তোমায় করতে পারতাম না, প্লিজ এসো। বহুদিনের বকেয়া কিছু প্রোমোশন হয়ে গেল, যাদের চেষ্টায় হল তাদের একজন বলল, এই ষোলই মের আগে হলে কি হত নাকি এরকম? এই ধরনের।

এবং সেখানেও কোথাও তৃণমূল নেই। আছে সিপিএম। সিপিএম-এর বিরুদ্ধে জনসমক্ষে মুখ খুলতে পারছি — এই আরাম দেখতে পাচ্ছিলাম আমি লোকের মুখেচোখে। সবাই-ই তো বীর হতে চায়, শুধু ভয়ে হতে পারে না।

এবং ষোলই মের পরে তো সত্যিই সিপিএমের কুষ্ঠ থেকে পাবলিক রকমেই মাংস খসে খসে পড়তে শুরু করল। বহু জায়গায় জোনাল কমিটি অব্দি জুড়ে দিতে হচ্ছে, কারণ লোক নেই। পার্টির মধ্যে শুদ্ধীকরণ প্রক্রিয়া চালু করা হবে — স্থগিত হয়ে গেল, কারণ, সেই প্রক্রিয়া চালু করা হবে যাদের হাত দিয়ে এমন সর্বসম্মত রকমে শুদ্ধ গুটিকয়েক লোকও যোগাড় হচ্ছে না। জমি মাফিয়ার টাকা কে নিয়েছে আর কে নেয়নি তাই নিয়ে যুদ্ধ। নানা খবরই কানে আসছিল। এর মধ্যে আবার যোগ হল বুদ্ধকে বলি করা। হুগলীর এক নেতা সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা করলেন, তিনি কারুর চুলের মুঠি ধরে কালীঘাট নিয়ে যেতে পারতেন চাইলেই। এই আপাতদৃষ্টিতে গালাগালের বক্তব্যটাকে দ্বিতীয়বার পড়লেই টের পাওয়া যায় তিনি ঝিকে মেরে বৌকে শিক্ষা দিতে চাইছেন, চুলের মুঠিটা তিনি যার টানতে চান তিনি আর যাই হোক কালীঘাটে থাকেন না।

এই রকম সব হচ্ছিল। আর কেমন একটা ঘাবড়ে যাচ্ছিলাম ভিতরে ভিতরে। ‘৮৯-এ পার্টি যখন ছাড়লাম তখনই সেটা অবাসযোগ্য রকমের দূষিত হয়ে গেছে, ব্যবসায়ীদের দালালদের কাছ থেকে টাকা খাওয়ার ঘটনায় কেউ আর রাগ তো দূরের কথা অবাকও হয় না, ততদিনেই। কিন্তু এরকমটা ঠিক ভাবিনি। এ কেমন ওয়াকওভার। এবং ভেবে দেখুন, তৃণমূল তো কোথাও নেই-ই, তার মানে এটা সিপিএম-ঘেন্নার শূন্যতার কাছে সিপিএমের ওয়াকওভার। এবং এই শূন্যতাই তো তাই যা সিপিএমকে এরকম করেছে। সেটা তো তবু এসেছিল একটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে। শুধু মাত্র ঘেন্নার শূন্যতা থেকে তৃণমূল এত বড় একটা ওয়াকওভার পেয়ে যাচ্ছে — কেমন একটা বুদ্ধু লাগছিল নিজেকেই, এরকমটা যে হবে তা তো কোনওদিন ভাবিনি।

সেই শূন্যতার রানী হওয়া থেকে তৃণমূলকে হয়তো বাঁচিয়ে দিল এই অগ্রদানী বামুনেরা। বাংলা সাহিত্যে দুটো জায়গায় খুব বড় আকারে রাজানুগৃহীত ব্রাহ্মণের প্রতি বিতৃষ্ণা উচ্চারিত হওয়ার কথা এই মুহূর্তেই মনে পড়ছে। একটা শ্রীকান্ত উপন্যাসে, রাজলক্ষ্মীর সেই জমিদারি কেনার রাঙামাটি গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের প্রতি সশ্রদ্ধতা। আর একটা তো অবশ্যেই তারাশঙ্করের গণদেবতা-পঞ্চগ্রামে। বিশ্বেশ্বরের পিতামহের প্রতি সশ্রদ্ধতা। বিশ্বেশ্বর-ই তো ছিল সেই কমুনিস্ট যুবকের নাম, না কি বিশ্বনাথ? ভাল মনে করতে পারছি না।

এই সশ্রদ্ধতা আমার মধ্যেও আছে। রাজানুগৃহীত ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণ-ই নয় বলে আমি নিজেই মনে করি। আর অগ্রদানী বামুন আরও এক কাঠি বাড়া, সে পিণ্ড ভোগ করে। এই পিণ্ডটা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুরে সিপিএম-নিহত মানুষের পিণ্ড।

যে চারজনের পরামর্শের বিনিময়ে মাসে পঞ্চাশ হাজার বেতন এবং আরও নানা উপরি বখশিশ পাওয়ার কথা শুনলাম, তা যদি সত্যিও হয়, এ নিয়ে সিপিএমের কিছু বলার নেই। সিপিএম রাজনীতির সমান স্তরের ভয়ানকতার কাছাকাছিও নয় এইসব উঞ্ছবৃত্তি। কিন্তু আমরা যারা সিপিএম-ও নই, তৃণমূলই নই, ওই তপন দাসের মত আমাদের অনেকেরই এটা বেশ খারাপ লেগেছে, সমস্ত অর্থেই। এবং সেখানে টাকার অঙ্কটা গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই, আমাদের মত গরিব দেশে। প্রায় দুই দশক চাকরি করার পরও আমার মাইনে, আমি তো ভাল চাকরি করি, ওর থেকে অনেক কম। এবং সেটা পাওয়া যাচ্ছে পরামর্শ দিয়ে। অন্য কারুর কী মনে হচ্ছে জানি না, ব্যক্তিগত ভাবে আমার এটাকে একরকম হাড় বলেই মনে হচ্ছে, রাজনীতির টেবিল থেকে পায়ায় বাঁধা ব্রাহ্মণের দিকে হাড় ফেলা হচ্ছে।

যে চারজনকে নিয়ে এই প্রশ্ন উঠছে, তার মধ্যে অর্পিতা পালের নাম আমি কখনও শুনিনি, এখন শুনেছি, কিন্তু এই মুহূর্তেও মনে করতে পারছি না, কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে আমার এটা সত্যিই খুব অভাবিত এবং বেদনার লেগেছে শাঁওলি মিত্রের বেলাতেই। তার কারণের অনেকটাই নিতান্ত ব্যক্তিগত। আমি চিরদিনেরই পাষণ্ড। খুব ছোটবেলার পর থেকেই আমার কোনও ঠাকুর দেবতা নেই। কিন্তু সেখানে খুব স্থায়ী এবং অনড় দুটো চেয়ারে আসীন দুইজন মানুষ শাঁওলি মিত্রের মা আর বাবা। জানি এর মত বোকামো কিছু হয় না, বাবা-মা দিয়ে সন্তানকে বোঝার চেষ্টা করা, কিন্তু এটা ঠিক যুক্তি দিয়ে হচ্ছে না। আমার কষ্ট হচ্ছে। কষ্ট তো যুক্তি মেনে হয় না। জানি না, ওই দুজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন তো জানি না, হয়তো জানলে সেখানেও নানা ভাঙচুর থাকত, জানি না। এই জন্যেই খুব বেশি জানতে নেই। এর পর থেকেই শম্ভু মিত্রের অয়দিপাউসের কথা মনে পড়লেই, আমাদের স্মৃতি তো ওরকমই হয়, নানা নানা সংযোগের সূত্র ধরে চলে, আমার মনে পড়ে যাবে রেলের কথা, তৃণমূলের কথা — কী বিশ্রী।

তবে মোটের উপর এটা বোধহয় ভালই হল। শূন্যতার ফাঁকা মাঠে ওয়াকওভারের জয় কোনও গনতন্ত্রের পক্ষেই ভাল নয়।

November 17, 2009

জলপাইগুড়ির টাটা চা বাগান নিয়ে নেটে অন্যত্র

এই ব্লগে ঠিক এর আগের লেখাটা — বুড়িয়ার, মানে শর্মিষ্ঠার, চিঠিটা এবং তার সঙ্গে আমার যোগ করা ভূমিকা নিয়ে, প্রথমে আসে গুরুচণ্ডালী ওয়েবসাইটে

এখন গুরুচণ্ডালীতেই আসছে জলপাইগুড়িতে টাটার নেওড়ানদী চা বাগানে পরপর কী ঘটে চলেছে তার ডাইরি

নেওড়ানদী চা বাগানের শ্রমিকদের এই আন্দোলন নিয়ে দুটো ইংরিজি ওয়েবসাইটের লিংকও পেয়েছি। প্রথমটা আইইউএফ-এর

আর একটা র‍্যাডিকাল নোটসের

আরও একটা, এখানে মন্তব্য আছে অনেক।

November 11, 2009

জলপাইগুড়ির টাটা চা-বাগান

এই ব্লগে, ২৯শে অক্টোবরের লেখায়, মধ্যমগ্রামের শেষহীন পুজো এবং জলপাইগুড়ির টাটা চা-বাগান, বুড়িয়ার চিঠির সূত্রে জলপাইগুড়ি টাটা চা-বাগানের প্রসঙ্গ এসেছিল। এর আগেও আমার ব্লগে ওর কথা, ওদের কথা, ওদের চা-শ্রমিকদের মধ্যে এনজিও-র কাজের কথা এসেছে। চা-বাগান নিয়ে মাঝেমধ্যেই ওদের সঙ্গে কথা হয়, কাজ নিয়েও, ওদের চা-বাগানে কাজ করার মত কম্পিউটার সিস্টেমগুলো ইনস্টল করে দিয়েছি, নানা সময়ে নানা টেকনিকাল সমস্যার সূত্রেও কথা হয়। যা শুনি তার গোটাটাতেই একটা শঙ্কা হয়। সেটার কথায় আসছি।

আগে বুড়িয়ার বিষয়ে বলে নিই। ওর ভাল নাম শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস, কিন্তু সেটা প্রায় কেউ জানেই না। যদিও ও অর্থনীতি নিয়ে বিএসসি পাস করেছে আমার কলেজ থেকেই, ‘৯৩-এ, তার মানে আমি তখন মাস্টারমশাই, কিন্তু সে সময়ে আমি ওকে চিনতাম না। ওকে চিনলাম অনেক পরে। তখন ও জীবন, পুলিশ, মতাদর্শ ইত্যাদি সবকিছুরই দ্বারাই বিরাট রকমে নিষ্পেষিত এবং তাড়িত। সোজা বাংলায়, কোনও রকমে বাঁচতে চাইছে, চাকরি খুঁজছে। ও এবং ওর আরও দু-চারজন বন্ধু মিলে আমার কাছে এল, তাদের সবারই ইতিহাস ওই এক। চাকরির পরীক্ষার জন্যে আমি কোনও সাহায্য করতে পারি কিনা, বা, ইকনমিক্স ছাড়া অন্য বিষয়ে চেনা কারুর কাছে পাঠাতে পারি কিনা। সবার কাছে ওরা তখন যেতে পারছে না, তার কারণটা বলে নিই।

তার আগে ওরা পিডব্লুজি রাজনীতি করত। এবং রাজনীতিসূত্রে বেশ কিছুটা জীবনীশক্তি, বছর এবং উদ্যম ব্যয় করার পর ওরা বুঝতে পারে, ব্যক্তিহত্যার রাজনীতির সঙ্গে ওরা কিছুতেই মানিয়ে উঠতে পারছে না। হয়ত রাজনীতিটা ঘোষিত ভাবে ব্যক্তিহত্যার নয়, কিন্তু শেষ অব্দি তাই তো হয়ে দাঁড়ায়। এবং মজাটা এখানে, ছেড়ে দেওয়ার পর ওরা বিপন্ন হয়ে পড়ে সমস্ত দিক দিয়ে, শুধু পুলিশ বা সমাজজীবন নয়। ওদের বহু খবর যা ওদের রাজনীতির বাইরে অন্য কারুর কাছে অজানা এমন নানা কিছুও পৌঁছে যেতে থাকে ক্ষমতার কাছে। এবং নিজেদের বাড়ি বা পরিবারের কাছ থেকে নানা সমস্যা তো ছিলই, তাদের কোনও দোষও দেওয়া যায় না, এতদিন তারা কোনও কিছু না-করেই পুলিশি নানা উৎপীড়নের শিকার হয়েছে।

এইসময় আমার কিছু নিকট মানুষ যারা সিপিএম করে বা সিপিএমের সঙ্গে সে অর্থে ঘনিষ্ঠ, এই বিষয়টা জানার পর, তাদের মঙ্গলাকাঙ্খা থেকেই, আমাকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। তাদেরকে বলেছিলাম, কেউ যদি ওদের একটুও সাহায্য না-করে তাহলে ফের ওদের ফেরত যেতে হবে সেই রাজনীতিতেই যার বিরোধিতা করে ওরা ছেড়েছে। এবং সেই ব্যক্তিহত্যার রাজনীতির তো বিরোধী আমিও। আমি সক্রিয় দলভিত্তিক রাজনীতি ছেড়েছি ‘৮৯ সালে। কিন্তু তার পরের এই দুটো দশক আমি তো রাজনীতি করেই চলেছি। আমার লেখালেখি আমার বক্তব্য আমার চিন্তা এটাই তো আমার রাজনীতি। এবং উগ্রপন্থাকে আমি তো সত্যিই রাজনৈতিক ভাবে অত্যন্ত বিপজ্জনক একটা জায়গা বলে মনে করি, যা মানুষের সমস্ত গনতান্ত্রিক বক্তব্যকেই শেষ অব্দি স্তব্ধ করে দেয়। এবং ক্ষমতাকেই, সে আমেরিকাই হোক আন্তর্জাতিক ভাবে, আর বুদ্ধই হোক রাজ্যস্তরে, আরও আরও হিংস্রতা করে চলার লাইসেন্স দিয়ে দেয়। এই নিয়ে একটা লেখাও লিখেছিলাম, ১১ই সেপ্টেম্বরের পর, ‘ভাল আমেরিকা, কাল আমেরিকা’ বলে, ‘অন্যস্বর’ পত্রিকায় বেরিয়েছিল। সেই লেখাটা আমার ওয়েবসাইটে রাখা আছে, যদি কেউ চান পড়তে পারেন। লিংকটা হল: http://ddts.randomink.org/bangla/essay/theory/juddha.pdf

উগ্রপন্থাকে আমি বিপজ্জনক মনে করি, কারণ, শেষ অব্দি প্রতিটি উগ্রপন্থী রাজনীতিই, সন্ত্রাসবাদী রাজনীতিই, পুঁজির তথা শাসক ক্ষমতার হাত শক্ত করে।  তাই, উগ্রপন্থাকে বিপজ্জনক মনে করি বলে সেই সমস্ত রাজনীতিকেই আমি বিপজ্জনক মনে করি যা এই উগ্রপন্থী রাজনীতি তৈরি হওয়ার অবস্থাটাকে সৃষ্টি করে। এই কদিন আগে বুদ্ধ ইত্যাদি বক্তৃতা রাখলেন, ‘জঙ্গলে ঢুকেই মারব’ বা ওই ধরনের কিছু। লালগড় সূত্রে। গোটা আস্ফালনের হাস্যকরতাটা যদি বাদও দিই, পুরো পরিস্থিতিটাকে একবার ভাবুন: কী ভয়ানক অমানবিক।

বুদ্ধ যাবেন জঙ্গলে, তার দশ গজ বিশ গজ ত্রিশ গজ দূরে দূরে পুলিশ ও কমান্ডোর বৃত্ত, ঢুকে তিনি একটি ডালে বসা বসন্তবৌরী পাখির ন্যাজ নড়তে দেখে বলবেন, ‘তোমার ন্যাজে যদি কোনও মাওবাদ থাকে তো আমরা সেটা গুঁড়িয়ে দেব’ ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। তাতে সেই বাচ্চা মেয়েটির কী হবে, যে ভয়ে ও অপমানে কাঁদতে কাঁদতে, নিজের কাঁচা হাতে পোস্টার লিখছিল, ‘আমার বাবা আর সিপিএম করবে না’। সে তো মহাকরণেও থাকে না, তার চারদিকে তো কমান্ডোর বৃত্ত নেই। এবং মাওবাদ ও মাওবাদীরা তো শূন্য থেকে গজায়নি। সে তো এই সিপিএম রাজনীতিই যা একজন রাজনৈতিক কর্মীর সম্পর্কে এতটা ঘেন্না ও বিবমিষা তৈরি করতে পারে যেখান থেকে মাওবাদীরা এইরকম একটা দাবি তৈরি করে। আমার এক ছাত্রের কাকা, সরকারি চাকরি করেন কলকাতায়, ওই এলাকাতেই থাকেন, আমাকে বলেছিলেন, সত্যি কথা বলব স্যার, ওই পোস্টারগুলো দেখি আর মনে বেশ জোর পাই, যাক কেউ একটা তো আছে অন্যায় প্রতিবাদ করার।

এবং ওই মাওবাদ তৈরি করল কে? পাঁশকুড়া গড়বেতায় পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন সিপিএম মদতকে বাদ দিন, সেটা অন্য গল্প, তৃণমূল কী ভাবে মারতে হবে তার সিপিএমী ছক, এই ভয়টাই তো সেই সিপিএম রাজনীতি। এবং ভয় থাকলে ভুত তৈরি হতে কতক্ষণ। একভাবে না একভাবে নিষ্পেষিত ভয় তো ফেরত আসবেই, সমাজের রাজনীতির নিউরোসিস হয়ে, সেটাই উগ্রপন্থী রাজনীতি। এবং উগ্রপন্থী রাজনীতি থাকলেই তো পুলিশ ও সৈন্য নামিয়ে আনা যায়, তাতে মৃত্যু ও রক্ত ও ধর্ষণ দিয়ে ধুয়ে মুছে দেওয়া যায় আদিবাসীদের উপর অত্যাচারের ইতিহাস।

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর মহাভারত ও পুরাণের গল্পগুলোয় সব রাক্ষসরা কথা বলে সাঁওতালি রকমে। এখনো তো তারা রাক্ষসই। কখনও মদেশিয়া রাক্ষস, কখনও লালগড়ের রাক্ষস। ফিল্মস্টাডিজের সঞ্জয়দা একদিন বলছিল ওর ছাত্রদের, লালগড়কে বুঝতে চাও তো ঋত্বিকের অযান্ত্রিক দেখো, নায়ক নায়িকা এক কোণে পড়ে আছে, আর গোটা ফ্রেম জুড়ে কেন উপজাতি নাচ আর উপজাতি ভূগোল সেটা বোঝো, তাহলেই লালগড় বুঝবে। ঠিক তাই। প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর সময় পেয়েছিলেন আপনারা, উপজাতিদের ইতিহাস কেন এক ইঞ্চিও বদলাল না সেটা আগে বুঝুন তারপর পাঁজি দেখে ঠিক করবেন কবে জঙ্গলে যাবেন মাওবাদী মারতে।

চা-বাগানের এই শ্রমিকরাও সেই আদিবাসী। বুদ্ধরা একটা মাওবাদী এলাকা তো তৈরি করেই দিয়েছেন। আরও একটা উত্তরবঙ্গে তৈরি করতে যাচ্ছেন, ঠিক এই কথাটাই মনে হয়েছিল বুড়িয়ার চিঠিটা পড়ে। দু-দিন আগে আবার ওর একটা চিঠি এল। সেই গোটা চিঠিটাই তুলে দিলাম এই লেখায়, শুধু সম্ভাষণ আর ইতিটা বাদ দিয়ে। আর সামান্য কিছু বাক্যের ও শব্দের মেরামত সহ, হুবহু চিঠিটাই তুলে দিলাম।


date Sun, Nov 8, 2009 at 9:09 subject TATA Tea
তোমায় আগেই বলেছি, নেওড়ানদী চা-বাগানের গোলমালের কথা। এখানে কিছু দিন ধরে টাটার বাগান নেওড়ানদী চা বাগানে আদিবাসী শ্রমিকরা আন্দোলন চালাচ্ছে। নেওড়ানদী চা বাগান টাটার একটি সংস্থা। বছরখানেক আগে হঠাৎ সব টাটার বাগানে বোর্ড থেকে টাটার নাম তুলে দিয়ে অ্যামালগেমেটেড কোম্পানী লিখে দেওয়া হল।

বাগানের শ্রমিকরা এই পরিবর্তনের অর্থ বোঝেনি। তাদের একবার বলা হয়েছিল যে এখন থেকে টাটার বাগান চলবে শ্রমিক, কর্মচারী আর ম্যানেজমেন্টের শেয়ারে। সবাইকে শেয়ার কিনতে হবে। শ্রমিকরা সেসব কিছুই বোঝেনি — শেয়ারের মানে কী। সেটা হলে তাদের অবস্থা কী হবে সে সব কিছুই তারা বোঝেনি। এই ভাবে বাগান চলছিল। হঠাৎ আবার সেই বোর্ডে দেখা গেল অ্যামালগেমেটেড এর পাশাপাশি ‘টাটা টি এন্টারপ্রাইজ’ লেখা হল। আর কোম্পানির ঠিকানা লেখা হল টাটা টি কোম্পানির  কলকাতা অফিসের। পুরো বিষয়টাই শ্রমিকদের অজানা।

আমি ডুয়ার্সে আসি বন্ধ বাগানের শ্রমিকদের অবস্থা জানতে, আর তার পাশাপাশি তারা যাতে সরকারী সুবিধা পায় সেই বিষয়টা দেখতে — আইইউএফ-এর কাজ নিয়ে। প্রথম আমরা বন্ধ বাগানেই গিয়েছিলাম। খোলা বাগানগুলো সম্পর্কে তেমন কিছু জানা ছিলনা। দূর থেকে দেখে ভাবতাম টাটা, গুডরিক, ডানকানের মত বড় বড় বহুজাতিক সংস্থার বাগানগুলিতে শ্রমিকদের অবস্থা বোধহয় খুব ভাল। নিশ্চয়ই ওদের ওখানে বাগিচা শ্রম আইনের সব সুবিধাই শ্রমিকরা পায়। নিশ্চয়ই ওদের ঘরদোরগুলো ভাল। একটা বোকাবোকা স্বপ্ন ছিল ওই সব বাগানগুলি নিয়ে।

তারপর একবার চা শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের অবস্থা কেমন সেটার ওপর একটা কাজ চালাতে হল। সমীক্ষাটার জন্য বন্ধ, খোলা সব রকমেরই কিছু কিছু বাগান বেছে নিয়েছিলাম। সেই লিস্টে ডানকানের বাগানও ছিল। তবে টাটা বা গুডরিকের বাগান ছিল না। সেখানে ঢুকতেই পারিনি। এত কড়া ওখানকার নিয়ম কানুন। ডানকানের বাগানে ঢুকতেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। ওই কাজে আমাদের সঙ্গে নেহাত জশুয়ার মত সাদা চামড়ার মানুষ ছিল, তাই হয়ত শেষ পর্যন্ত ঢোকা সম্ভব হয়েছিল। আর অনুরাধাদির মামা এখানে ডানকানের সাতটি বাগানের দায়িত্বে আছে, তাই কোনও রকমে তাকে অনুরোধ করে ঢোকার পারমিশন পেয়েছিলাম শেষ পর্যন্ত। তাও অনেক শর্ত ছিল। আমাদের রিপোর্টে ওদের বাগানের নাম উল্লেখ করা যাবে না, এই সব।

আমরা রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ, আমাদের জানার খুব দরকার ছিল খোলা বাগানের শ্রমিকদের অবস্থা কেমন। আর শেষ পর্যন্ত যা দেখলাম তা ভয়ঙ্কর। আমাদের প্রচেষ্টায় বন্ধ বাগানের শ্রমিকদের কাছে ততদিনে সরকারী সাহায্য সঠিকভাবে পৌঁছতে শুরু করেছিল, আর তাতেই তাদের অবস্থা খানিকটা ভাল এই ডানকানের বাগানের শ্রমিকদের থেকে।

ডানকানের শ্রমিকদের বিএমআই (বডি মাস ইন্ডেক্স) কষে দেখা গেল তারা ক্রিটিক্যাল স্টেজ অফ মর্টালিটির স্তরে আছে। অর্থাৎ একটু সামান্য অসুখেই তাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। প্রায় সব শ্রমিকই এই বাগানে দিনে মাত্র দুইবার খাবার খায়। তার থেকে বেশী বার খাবার খাওয়ার সংস্থান নেই তাদের। প্রোটিন ধরনের খাবারের কথা সারা সপ্তাহে একবারও ঠিক ভাবে ভাবতেই পারে না। যদি মাছ, মাংস, বা ডিম কেনে তাও পুরো পরিবারের জন্য, এবং এত কম যে তাকে প্রোটিন খাওয়া বলে না।

টাটার বাগান প্রসঙ্গে তোমাকে এত কিছু এলোমেলো কথা বলছি কারণ আমদের এই সব বহুজাতিক কোম্পানির বাগান সম্পর্কে স্বপ্নের ধারনাটা কী ভাবে বদলাল, তার জায়গা নিল ভয় আর সন্দেহ, সেটা বোঝাবার জন্য। এত কিছুর পরেও কেমন যেন একটা ধারনা অচেতনে থেকেই গিয়েছিল যে তবুও টাটা বা গুডরিকের বাগানে বোধহয় শ্রমিকের অবস্থাটা সত্যিই এতটা খারাপ না। তাও, কেন সহজে ওই বাগানগুলোতে ঢোকা যায় না এই ভেবে একটা সন্দেহও ছিল।
এই অবস্থায় কিছুটা সময় আমি এখানে একাই প্রায় কাজ করছিলাম, আমার সঙ্গে আর কেউ ছিল না। মাথায় ফন্দি ফিকির ঘুরছিল, কী করে ঢোকা যায় ওই সব বাগানে। কারণ আমি বুঝতে পারছিলাম এই সব বিশাল মালিকগুলোকে না ধরতে পারলে শুধু আগরওয়ালা, ঝুনঝুনওয়ালাদের নানা ভাবে চাপ দিয়ে তেমন কিছু হবে না। কারণ চা এর বিশ্ব বাজার যারা নিয়ন্ত্রণ করে তারাই ঠিক করে দেয় চা-এর এই মানুষগুলির অবস্থা বা দুরবস্থা, ভূত, ভবিষ্যত, বর্তমান। তাই নানা ভাবে ধান্দা করছিলাম কি করে জানা যায় এই সব বাগানের শ্রমিকরা সত্যি সত্যি কেমন আছেন।

এর মধ্যে এখানে অনেক কিছু ঘটে যাচ্ছে। গোর্খারা দাবি করছে তাদের স্বাধীন গোর্খাল্যান্ড, ডুয়ার্সকেও তাদের গোর্খাল্যান্ডের অংশ করতে হবে, এইসব। তবে ডুয়ার্সের জনসংখ্যার বেশীরভাগ আদিবাসী। যাদের ব্রিটিশরা তাদের নিজেদের ভিটেমাটি থেকে সম্পূর্ণ উৎখাত করে নিয়ে এসেছিল অনেক বছর আগেই। এটাই এখন তাদের দেশ, তাদের মাটি। তাই তারা আপত্তি জানাল ডুয়ার্সকে গোর্খাল্যান্ডের অংশ করার এই অদ্ভুত দাবির। সিপিএম সহ সব রাজনৈতিক দল তাদের ব্যবহার করে নিল এই সুযোগে। এরা বুঝতেই পারেনি, একবার এই ভুখা মানুষগুলো একসাথে একটা দাবি করলে, আর তার দাবির জায়গাটাকে একবার প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই তারা কিন্তু দাবি করবে তাদের সমস্ত অধিকারের। বা ভাবতে পারলেও এই ভেবে শান্তি পেয়েছিল যে তারা সব কিছুকেই সহজেই ঠান্ডা করতে পারবে।

যাই হোক, এখন এই আদিবাসী মানুষগুলি ঐক্যবদ্ধ, নিজেদের এক হয়ে ওঠার শক্তি ওদের কাছে আজ বেশ কিছুটা বোধগম্য। তাই আজ ওরা দাবি করতে শুরু করেছে ওদের না পাওয়া সমস্ত কিছুর। আর এই দাবির ওপর আস্থা রেখে আমি একদিন গেলাম ওদের কাছে। প্রথমে ওরা আদিবাসী নই, শহুরে মেয়ে, বড়বড় লেকচার মারছি, এই ভেবে তেমন পাত্তা দেয়নি আমাকে। বারবার বলেছে আপনারা সব সাহায্য করেন ওই সব চোর ট্রেডইউনিয়নকেই। আমার তেমন কিছু খারাপ লাগেনি। কারণ মানুষতো তার অভিজ্ঞতা থেকেই কথা বলে। এতে তো খারাপ লাগার কিছু নেই। হাল ছাড়িনি। আমার পুরানো রাজনীতি করার অভিজ্ঞতায় আমিও শিখেছিলাম লেগে পড়ে থাকার শিক্ষা। নিজের ভিতরেই একটা রেজিমেন্টেশন কাজ করে প্রতি মুহূর্তেই।
বারবার ওদের কাছে যাওয়া শুরু করলাম, আমার জানা নানা তথ্য ওদের দেওয়ার চেষ্টা করলাম। একদিন খবর পেলাম টাটার বাগানে ওরা লড়াই শুরু করেছে ম্যানজমেন্টের অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে। বাগানটা বেআইনি ভাবে বন্ধ করে চলে গেছে ম্যানেজমেন্ট। তার বিরুদ্ধে ওদের লড়াই। বিষয়টা কি জানার জন্য ছুটে গেলাম ওদের কাছে। আর এর মধ্যে আমি ওদের খানিকটা কাছের মানুষও হয়ে উঠেছি। যা আমি আন্তরিক ভাবেই হতে চেয়েছিলাম প্রথম থেকেই।

এবার আসি টাটার বাগান নেওড়ানদীর কথায়। যা আমি জানতে পেরেছি ওদের সাথে ওই লড়াইটার একজন সমব্যাথী ও সহযোদ্ধা হয়ে ওঠার পর। সহযোদ্ধা ভাবতে ইচ্ছা করছে, তাই লিখলাম। আমি আদৌ সহযোদ্ধা কিনা তা আমি জানিনা। আর ওরা আমাকে তেমনটাই ভাবে কিনা সেটাও ঠিক করে জানা হয়নি।

টাটার এই ন্যাওড়ানদী বাগানটা অনেক বড়। আর ডুয়ার্সে টাটার বাকি যে তিনটে বাগান আছে তাদের সবার থেকে বেশি মুনাফা দেয় এই বাগানটাই। এই বাগানটার উৎপাদন অন্য তিনটে বাগানের থেকে অনেক বেশি। বহুদিন ধরেই অসুস্থ শ্রমিকরা আইনিভাবেই অসুস্থতার ছুটি চাইতে গেলে বেশিরভাগ সময় বাগানের ডাক্তারবাবু তাদের ছুটি দেয়না। এই ছুটি পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করে এক্কেবারে ডাক্তারবাবুর মর্জির ওপর। কখন কার ওপর তিনি সদয় হবেন আর সেই শ্রমিকটি ছুটি পেয়ে কৃতার্থ হবে। এমনটা চলছিল বেশ অনেকদিন ধরে। ম্যানেজমেন্টের কাছে বারবার শ্রমিকরা অভিযোগ করেও কোনো ফল হয়নি। আর হবেই বা কেমন করে। কারণ, ডাক্তারবাবু তো নিজেও ম্যানেজমেন্টের অংশ।

তাছাড়া বাগিচা শ্রম আইন অনুসারে শ্রমিকদের তাদের বাগানের হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা। রোগ নিয়ে বাগানের হাসপাতালে ভর্তি হলে তার চিকিৎসা, ওষুধ, ও খাবার বিনামূল্যেই পাওয়ার কথা। কারণ চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি মাত্র ৬২ টাকা ৫০ পয়সা, আর সেই ক্ষেত্রে মালিকরা এই সব সুবিধাগুলোকে টাকার অঙ্কে কষে বলেন যে আসলে শ্রমিকের মজুরি ১১২ টাকা। তার মধ্যে চিকিৎসাকেও ধরা হয়।

কিন্তু এখানে, শ্রমিকরা আমাদের জানাল, দীর্ঘদিন ধরে তাদের নানা ভাবে শোষণ করে আসছে মালিকপক্ষ। তারা যদি হাসপাতাল থেকে ওষুধ নেয়, তাহলে তার দাম তাদের দৈনিক মজুরি থেকে কেটে নেওয়া হয়। তারা হাসপাতালে ভর্তি হলে হাসপাতাল যে খাবার তাদের দেয়, তার জন্য তাদের রেশন থেকে সেটা কেটে নেওয়া হয়। আগে রোগীদের জন্য বুধবার, শুক্রবার আর রবিবার মাছ বা মাংস বা ডিমের ব্যবস্থা থাকত, দুধ-চা দেওয়া হত দিনে দুইবার, সকালে একটা টিফিন মানে বান-পাউরুটি গোছের কিছু থাকত। এখন সব বন্ধ। চা দেওয়া হয়, লিকার। চিনি ছাড়া কেবল নুন দিয়ে। দুই বেলা খাবার, তাতে থাকে ডাল, আর সোয়াবিনের তরকারি, তাও একইবার রান্না করে দুইবেলা তা দেওয়া হয়। আর সেও প্রায় খাওয়ার মত না।

বহু শ্রমিক অসুস্থ অবস্থায় ছুটি চাইলে তাদের দেওয়া হয় না। প্রতিবাদ করে ডাক্তারের হাতে চড়-থাপ্পড় খাওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে অনেকের। সব মিলিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষোভ জমছিল শ্রমিকদের মধ্যে। আমি কয়েকদিন আগে সন্ধ্যাবেলা ঢুকেছিলাম এই বাগানে। এক শ্রমিক বন্ধু বলছিলেন যে তাদের ঘরে আলো নেই, আর মাসে রেশনে মাত্র ৩০০ গ্রাম কেরসিন তেল দেওয়া হয়, কিভাবে পড়াশোনা করবে বাচ্চারা? অনেকদিন ধরে রবিবার কাজ করানো হয় তাদের, অথচ কোনো ওভার টাইমের টাকা তারা পান না। এমনকি রবিবার কাজ করার জন্য সপ্তাহের অন্যদিনে ছুটি তাদের প্রাপ্য, সেটাও পান না তারা।

আর এই চা শ্রমিকদের আরও একটা মজার কথা আছে। আমরা জানি সপ্তাহে ছয়দিন কাজ করার পর রবিবার মজুরি সহ তাদের ছুটি পাওয়ার কথা। সেটাকেই ছুটি বলি আমরা, তাই তো। কিন্তু এখানে আইনি ভাবেই সেটা তারা পাননা। এখানে এদের পোষাকী নাম ডেইলি রেটেড লেবার, মানে যে দিন কাজ করবে সে দিন পয়সা, রবিবার কাজ নেই, পয়সাও নেই। মানে আমার হিসাবে রবিবারটা আসলে বেকারদিন। যাই হোক যা চালু আছে তার মধ্যেই সবাই আছে, আমিও আছি — ওই শ্রমিকবন্ধু জানালেন।

যে ঘটনার কথা তোমায় লিখেছিলাম, সেই ঘটনায় ফিরে আসি আবার। এই ডাক্তারকে কেন্দ্র করেই সমস্যা। এই বাগানের এক শ্রমিক আরতি ওরাওঁ। ৮ মাসের গর্ভবতী অবস্থায় সে যেতে শুরু করল ডাক্তারের কাছে, তার মাতৃত্বকালীন ছুটি মঞ্জুর করার জন্য। প্রতি সপ্তাহে একবার করে যায়, আর ডাক্তার তাকে বলে দেয় যে এই সপ্তাহে কাজ কর, ওই সপ্তাহে কাজ কর। এই রকম। সে খুব অসুস্থ অবস্থায় চারদিন কাজে যেতে পারেনি, তখন ডাক্তার তাকে মাত্র তিনদিনের ছুটি দিয়েছিল। একদিন তার বিনা মজুরীতে ছুটি নিতে হয়েছে। একে তো মাত্র ওই কটা টাকা, তাও আবার যদি সেটাও না জোটে মানুষগুলো খাবে কী?

শেষে কোনো উপায় না পেয়ে, সংসার চালানোর জন্য সে ৯ই আগষ্ট কাজে যোগ দেয়। তার ঘর থেকে কাজের জায়গাটাও ছিল বেশ দূরে। শরীরের এই অবস্থায় সে কিছু পাতা তোলার পর তার ব্যথা ওঠে, সে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায় মাটিতে। এই অবস্থায় তার মা-কে সে জানায়, মা-ও ওখানের শ্রমিক, সে আর কাজ করতে পারবে না।

খবরটা পেয়েই সব শ্রমিকেরা জড় হয়ে যায় সেখানে। সর্দার হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স চাইতে গেলে ডাক্তার জানায় অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া যাবে না, ওকে যেন সাইকেল করে নিয়ে আসা হয়। এটা শোনার পর সব শ্রমিকরা মিলে, মূলত নারী শ্রমিকরা, ঠিক করে তারা হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তারের কাছে জবাব চাইবে কেন ডাক্তার তাদের ন্যায্য ছুটি দেয়না, কেন আরতির আজ এমন হবে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা যখন হাসপাতালের দিকে রওনা দিল তখন ডাক্তার পরিস্থিতি বুঝে একটা ট্রাকটর পাঠিয়েছিল আরতিকে আনার জন্য। কিন্তু শ্রমিকদের চেপে রাখা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ কে চাপা দেওয়া আর সম্ভব ছিলনা। তারা হাসপাতালে গিয়ে প্রশ্ন করল কেন ডাক্তার তাদের ন্যায্য ছুটি দেয়না, কেন আরতির এমন অবস্থা হল।

ডাক্তার তার ভুল স্বীকার না করে উদ্ধত আচরণ করতে লাগল, এবং শ্রমিকদের মারতেও উদ্যত হয়েছিল। তখনও বুঝতে পারেনি যে ভিতরে ভিতরে এখন এরা একজোট হয়েছে। সেটা বুঝে ফেলার পর পালানোর চেষ্টা করার সময় সব মহিলা শ্রমিকরা তাকে ঘিরে ধরে হালকা মারধোর করে। এমন করার পর তাদের মধ্যে একটা ভয়ের সঞ্চারও হয়। সে জন্য তারা ম্যানেজারকে সমস্ত ঘটনা জানায়, ডাক্তারের এই অমানবিক কাজের কথা জানায়। আর তার পাশাপাশি অনেক রাত অব্দি পাহারা দেয় ডাক্তারকে, যাতে সে পালিয়ে গিয়ে শ্রমিকদের কোনো ক্ষতি করতে না পারে।
ঘটনাটা ঘটে গত ৯ ই আগষ্ট। সেই দিন ম্যানেজারকে ডাক্তারের বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়ে আরতির বিষয়টা বলায় সে জানায় যে আগামী ১১ তারিখ সে সমস্ত শ্রমিকদের সাথে বসে সমস্যাটির একটা সমাধান বার করবে। পরদিন ছিল ছুটির দিন। শ্রমিকরা বুঝতে পারেনি ভিতরে ভিতরে কি ঘটে যাচ্ছে।

১১ই আগস্ট শ্রমিকরা তাদের কাজে যাওয়ার সাইরেন না শুনে বুঝতে পারে বাগান বন্ধ হয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে দেখা যায় মালিক ডাক্তার সহ ম্যানেজমেন্ট চলে গেছে বাগান ছেড়ে।  ৯৫২ জন শ্রমিক আর ৬৫০০ মানুষের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। শুরু হল প্রতিষ্ঠিত ট্রেড ইউনিয়নগুলির খেলা। ২৬ শে আগষ্ট বাগানের প্রতিষ্ঠিত ট্রেড ইউনিয়নের সাথে মালিকপক্ষ এবং সরকারী আমলার ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়ে ২৭ শে আগস্ট বাগান খুলে গেল। শর্ত কী ছিল তা জানতেই পারেনি শ্রমিকরা। তারা তখন খুশি।

৮ ই সেপ্টেম্বর ৬ জন মহিলা শ্রমিক সহ ৮ জন শ্রমিকের বাড়ি সন্ধ্যাবেলা সাসপেনশন-এর চিঠি যায় আর তার সাথে সাথে তাদের শোনানো হয় যে তাদের ডোমেষ্টিক ইনকয়ারী হবে। শ্রমিকরা এই সিদ্ধান্তের বিন্দুবিসর্গও জানত না। তারা সেই চিঠি না নিয়ে ফিরিয়ে দেয়।

১০ ই সেপ্টেম্বর ম্যানেজার শ্রমিকদের ডেকে জানান যে বাগান খোলার ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে ৮ জন দোষী শ্রমিক যারা ডাক্তার কে মারধোর করেছে তাদের সাসপেন্ড করা হবে আর তাদের জন্য চলবে ডোমেষ্টিক ইনকয়ারী, যদি দোষী প্রমানিত হয়, তাহলে তাদের আরো কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে। এবং ম্যানেজমেন্টের এই শর্তে রাজী হয়েছে সবকটি ট্রেড ইউনিয়ন, স্বাক্ষরও করেছে তারা চুক্তিপত্রে। শ্রমিকরা এই সংবাদে হতচকিত হয়ে তারা তাৎক্ষনিক ভাবে ম্যানেজারের কাছে ৬ দিন সময় নিয়ে নেয় বিষয়টা নিয়ে সিদ্ধান্তে আসার জন্য। ম্যানেজার এই আবেদন মঞ্জুরও করেন।

তারপর শ্রমিকরা তাদের বাগানের ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের ডেকে জানতে চায় তারা এমন এক চুক্তিতে তাদের না জানিয়ে স্বাক্ষর করেছেন কেন। অপরাধ করেছে ডাক্তার আর শ্রমিকদের সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্তে নেতারা রাজী হলেন কেন। সেই মুহূর্তে তারা মিথ্যা বলে, জানায় তারা স্বাক্ষর করেনি। কিন্তু ততক্ষণে শ্রমিকরা নেতাদের আসল পরিচয় জেনে গিয়েছিল। মারমুখো শ্রমিকদের মধ্যে থেকে অন্য নেতারা পালাতে সক্ষম হলেও আইএনটিইউসি নেতা একজন পালাতে সক্ষম হয়নি। শ্রমিকরা তাকে হাতের সামনে পেয়ে মারধোর করে। ১৪ ই সেপ্টেম্বর আবার ম্যানেজমেন্ট বাগান ছেড়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যায়। তারপর থেকে বাগান বন্ধ।

শ্রমিকরা আদিবাসী বিকাশ পরিষদের নেতৃত্বে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রথমদিকে তারা চিঠি দেয় জেলা শাসক, লেবার কমিশনার সহ সব সরকারী আমলাদের, এই ঘটনা উল্লেখ করে। সাথে সাথে বাগান খোলার আবেদন জানায় তাদের কাছে। ৯ ই অক্টোবর জেলাশাসকের সাথে মিটিং-এ তিনি জানান ম্যানেজার বাগান খুলতে রাজি, যদি ওই ৮ জন শ্রমিক রাজি হয়ে যায় ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তে।

১৫ অক্টোবর বিডিও অফিসে বৈঠক হয় ম্যানেজমেন্ট, মহকুমা শাসক, ব্লক আধিকারিক, আর শ্রমিকদের উপস্থিতিতে। কোনো উপায় না দেখে শ্রমিকরা ওই ৮ জন শ্রমিকের সাসপেনশনের সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়াই ঠিক করে। এই মিটিং এ ম্যানেজার দাবি করে একটা চিঠি শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দিতে হবে ম্যানেজমেন্টকে যে তারা ভবিষ্যতে এমন কাজ করবেন না। নিরুপায় হয়ে শ্রমিকরা তাতেও রাজি হয়ে যায়। ঠিক হয় কালীপুজোর পর বাগান খুলে যাবে।

২২ অক্টোবর বাগান না খোলায় শ্রমিকরা মহকুমা শাসকের কাছে জানতে চান কেন তাদের বাগান খুলল না। উনি খোঁজ নিয়ে জানান যে ম্যানেজমেন্টের জেলাশাসকের কাছে শ্রমিকদের দেওয়া চিঠির একটি বিশেষ লাইন নিয়ে আপত্তি আছে। সেটা বদলে দিলেই বাগান খুলে যাবে। কি লেখা ছিল সেই লাইনটায়? লাইনটায় শ্রমিকরা সরকারী প্রশাসকের কাছে জানিয়েছিল যে এমন বেআইনি ভাবে ম্যানেজমেন্ট তাদের শোষণ করতে থাকলে ভবিষ্যতে তারা এর বিরোধ করবে। এই লাইনটা বদলানোর আবদার করে ম্যানেজার।

২৩ তারিখ শ্রমিকরা জেলাশাসকের কাছে গেলে উনিও একই কথা জানান। ওই দিনই শ্রমিকরা চিঠির সেই লাইনটি মুছে দেয়। কারণ, শ্রমিকদের বাঁচার আর কোনও পথ নেই বাগান ছাড়া। সেই বাগান বন্ধ থাকা মানে তাদের নিশ্চিত মৃত্যু। এর মধ্যে সরকারি কোনও সাহায্যও পায়নি শ্রমিকরা। ২৫ তারিখ ম্যানেজার আবার আবদার করে শ্রমিকদের একটা চিঠি দিতে হবে স্ট্যান্ডিং অর্ডার মেনে নিয়ে যে ম্যানেজমেন্টের যে সিদ্ধান্ত হবে শ্রমিকরা আর বিরোধ করবে না। এবার শ্রমিকরা আর মানতে রাজী না। মাথা নত করতে করতে তাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আর তারাও দেখতে শুরু করল যে, যত তারা মেনে নিচ্ছে ম্যানেজারের আবদার তত বাড়ছে।

এবার তারা ২৭ তারিখ একটা চিঠি জেলাশাসককে দেয় যে যদি ৭ দিনের মধ্যে বাগান না খোলে বিনা শর্তে তাহলে তারা ২রা নভেম্বর থেকে অনশন শুরু করবে। বাগান খুলল না। অনশন শুরু হল দুই তারিখ থেকে। ২৬ জন শ্রমিক অনশন শুরু করল, ৯৫২ জন শ্রমিক আর তাদের পরিবারের সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য, ম্যানেজমেন্টের অন্যায় আচরনের বিরুদ্ধে, ন্যায়ের দাবিতে।

একজন বুদ্ধিজীবীকেও দেখলাম না এদের লড়াইকে নৈতিক সমর্থন দেওয়ার জন্য এগিয়ে এল। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কেউ এল না এই আন্দোলনকারী মানুষগুলির কথা শুনতে।

৪ঠা নভেম্বর মালিকপক্ষের সাথে সরকারি প্রশাসকের উপস্থিতিতে ট্রেড ইউনিয়নের মিটিং হওয়ার কথা ছিল। সেই মিটিং-এ এসে নেতারা জানান যে তাদের একজন নেতাকে নাকি আদিবাসী বিকাশ পরিষদের সদস্যরা আটকে রেখেছে আর সেই জন্যই তারা মিটিং-এ অংশ নেবেনা। যদিও এমন ঘটনা ঘটেইনি। আর সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, যারা আন্দোলন চালাচ্ছে সেই শ্রমিকদের একবারও মিটিং-এ ডাকা হচ্ছে না। কারন তাদের অপরাধ তারা আদিবাসী বিকাশ পরিষদের সদস্য।

৬ই নভেম্বর সংবাদ আসে টি বোর্ডের কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার পর জেলাশাসক টাটার ম্যানেজমেন্ট কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন যে ৭ দিনের মধ্যে বাগান না খুলে দিলে তারা ব্যবস্থা নেবেন। শুনে একটু আশাবাদী হয়ে জানতে চাইলাম, কী ব্যবস্থা? কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে কি? জানলাম, ব্যবস্থার মানে হল, বন্ধ বাগানে যে যে সরকারি সুবিধা পাওয়া যায় সেই সব চালু করবে প্রশাসন। এই হল ব্যবস্থার নমুনা।

আমার প্রথম থেকেই আপত্তি ছিল অনশনের সিদ্ধান্তে। একেই তো মানুষগুলি ভুখা। তারা আবার ভুখ হরতাল করবে কি? সরকারের কিছু আসে যায় না ভুখা মানুষ ভুখ হরতাল করলে। আর, মালিক তো ভুখাই রেখেছে। তার তো কিছুই সমস্যা নেই শ্রমিকের ভুখ হরতালে। তবুও ওদের সিদ্ধান্ত, তাকে শ্রদ্ধা করতেই শিখেছি। তাই ওদের পথ নিয়ে সংশয় থাকলেও ওদের লড়াই এর প্রতি প্রথম থেকেই শ্রদ্ধা ছিল আমার। ৭ই নভেম্বর ভুখ হরতাল উঠে গেল জেলাশাসকের চিঠির আশ্বাসে। এর মধ্যে তিনজন মহিলা অসম্ভব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তারা হাসপাতালে। কোন ভবিষ্যতের দিকে হেটে চলেছি আমরা কে জানে।

আমি তৃণমূল কংগ্রেসের ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদেরও জানিয়ে ছিলাম ঘটনাটা। অনুরোধ করেছিলাম তারা তো আন্দোলনের ঢেউ তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গে, এই লড়াইতে অন্তত নৈতিক সমর্থনটাও তো জানাতে পারেন, তারাও সবাই নীরব। আমার পুরোনো এক বন্ধুর একটা কথা মনে এল সেই সময়, একবার আমরা জাতিসত্তার অধিকারের সমর্থনে এআইপিআরএফ থেকে একটা সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলাম। সেই সম্মেলন করার জন্য আমরা তার আগে ছাত্ররা মিলে ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে টাকা তুলতাম। মানে এক রকম ভিক্ষাই হয়ত বলা যায়। আমাদের বিষয়টা জানিয়ে টাকা চাইতাম সবার কাছে। কিছু কিছু স্থির মুখ দেখে আমাদের এক বন্ধু বলেছিল, ওরা সব পাথর হয়ে গেছে। সেই পাথরের মতই লাগল পশ্চিমবঙ্গের এই এগিয়ে থাকা, লড়াকু সংগঠনটিকেও। কারোর ওপর ভরসা আর নেই। শুধু যে শ্রমিক মানুষগুলো একটু একটু করে বুঝতে পারছে ওদের অধিকারের কথা, নিজেদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে আর সাহস করে দাবি করতে শুরু করেছে, কোথাও যেন ক্ষীণ ভরসা বেঁচে আছে এখনও ওদের ওপরেই।

Powered by WordPress