নেটখাতা

January 20, 2010

রু-এর হাতেখড়ি

আজ সরস্বতী পুজো। সকালে রু-এর হাতেখড়ি দিল আমার বন্ধু, শুভা চক্রবর্তী। সে আবার আমার পরিচিত মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে পণ্ডিতও বটে। হাতেখড়ি দেওয়ার এর চেয়ে ভাল আর কে হতে পারে?

হাতেখড়ির অপেক্ষা। মণিপুরী ওড়না কেটে বানানো শাড়ি চোলি পরে, টিপ এঁকে।

হাতেখড়ির অপেক্ষা

হাতেখড়ি চলছে। অ অক্ষর পরমব্রহ্ম, ভক্তিসহকারে চলছে।

অ চলছে

অ সমাপ্ত হল।

অ সমাপ্ত।

এখন হাতেখড়ি সমাপ্ত। তার মানে শ্লেটটার উপর মালিকানা কায়েম।

এখন শ্লেটটা ওর

Filed under: ব্যক্তিগত, মানুষ — dd @ 1:18 pm

January 12, 2010

২০১১ অনেক দূর

২০১১ অনেকটা দূর, খুব অনেক দূর, বড্ড দূর হয়ে যাবে না তো তৃণমূলের?

এইমাত্র ফিরে এলাম, কলেজ যেতে না পেরে। অটোদের পথ অবরোধ। এবং উল্টোডাঙা বস্তিতে আগুনের জন্য ট্রেন বন্ধ।

আমার প্রায় শৈশব থেকে আমি সিপিএম রাজনীতির বদমাইশি চারদিকে নিয়ে বড় হয়েছি। তাই জানি, বা বলা ভাল বিশ্বাস করি, সমাপতন বলে কিছু হয় না। প্রথম অবরোধ উঠল একটার পরে, এবং আড়াইটে থেকে দ্বিতীয় অবরোধ। দ্বিতীয়টা ঘোষিত ভাবে তৃণমূলের, এবং প্রথমটা অঘোষিত। এই অবরোধের ফলে রেল লাইনের পূর্ব দিক জুড়ে থাকা বস্তিতে ও বাজারে পৌঁছতে পারল না জলের গাড়ি, তাই পুড়ে ছাই হয়ে গেল। ছাই মানে সোনার ছাই, মহার্ঘ ফ্ল্যাট উঠবে সেখানে, যা তার অবস্থান তাতে ফ্ল্যাটের দাম হবে কোটি টাকা বা তারও বেশি। এতটা মানুষ-ছাই-সোনা শূন্য থেকে বা নিছক সমাপতন থেকে এসেছে এ আমি বিশ্বাস করি না।

এবং ঠিক আগের ব্লগেই যা লিখেছিলাম, সিপিএম যেখানে এসে শেষ হল সেখান থেকেই তৃণমূলের শুরু।

কিন্তু শুরু হয়ে গেল বড্ড আগে। আমরা কোথাও আশা করতে শুরু করেছিলাম যে পশ্চিমবঙ্গের এই গনতন্ত্র বিরোধী এবং যে কোনও শুভবোধ বিরোধী সিপিএম-ফ্যাসিবাদের অবসান হবে বোধহয় তৃণমূলের হাতেই। ২০১১-য়। আমার অনেক বন্ধুর মতই আমিও বিরাট কিছু আশা করিনি তৃণমূলের কাছে শুধু এটুকু ছাড়া যে কুচক্রী কৃষ্ণ নিধনের লৌহমুষলের খণ্ড ঘটনাচক্রে এসে গেছে তৃণমূল নামক ব্যাধের হাতেই।

কিন্তু আজ যখন আমার খুব নিকট খুব পরিচিত মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলছিলাম, যাদের বেশ কয়েকজনের সবকিছু সর্বস্ব গেছে ওই সংগঠিত আগুনে, তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে, এই কয়েক মিনিট আগে, আমার মনে হচ্ছিল, ২০১১ বড্ড দূর হয়ে পড়বে না তো তৃণমূলের জন্য?

পিশাচের হাত থেকে পিশাচতরতার হাতে যেতে কি লোকে চাইবে?

Filed under: সামাজিক-রাজনৈতিক — dd @ 5:14 pm

আওয়াজ আর আত্মঘোষণা

“আওয়াজ আর আত্মঘোষণা — পাড়া, ট্রেন, নিউব্যারাকপুর”, এইরকম ভেবেছিলাম এই ব্লগের নামটা। কিন্তু গোটাটা মিলিয়ে বড্ড বড়।

এইমাত্র লেখাপড়া করছিলাম, সেটা থেকে উঠে দরজা জানলা বন্ধ করে নিলাম, তাতেও আওয়াজটা আটকাতে পারিনি। এইমাত্র আবার ব্লগ লেখা স্থগিত করে, এই আগের বাক্যটার পরে, আওয়াজটা যেখান থেকে আসছিল, পাড়ার সেই কম্পিউটার সেন্টারে গিয়ে বললাম। ছেলেটি ভদ্র, কমাল আওয়াজটা।

কাল ট্রেনে ফিরছিলাম। ক্লান্ত ছিলাম। আমার এক বন্ধুর বিষয়ে একটা দুশ্চিন্তাও ছিল। তার মধ্যে ওই কর্কশ সস্তা উঁচু আওয়াজের বাজনা, চৈনিক সেলফোন থেকেই বোধহয়, আর নিতে পারছিলাম না। ছেলেগুলি এক আধবার কমাল, কিন্তু আসলে বাজিয়েই চলল।আসলে ওরাও না বাজিয়ে পারছিল না, ওরা তো আসলে গানবাজনা শুনছিল না, ওরা যে আছে, বেঁচে আছে সেই আত্মঘোষণা করছিল। আমরা টের পাচ্ছিলাম যে সত্যিই ওরা আছে।

এই টের পাওয়ার আত্মঘোষণার রাজনীতির চূড়ান্তটা দেখলাম গত শনিবার রাতে। নিউব্যারাকপুরে। সেখানে যাওয়ার পথেই, বিটি কলেজের মোড় থেকে হেঁটে যখন যাচ্ছি, বিটি কলেজের গায়ে দেখলাম কালীপুজোর মত লাইট, এবং, কলেজের বাইরে কলেজের কোনায়, দু-দুটো মাইক লাগানো, দুটোরই মুখ বাইরের দিকে। বাইরে ব্যানারও দেখলাম, নিউব্যারাকপুর বিটি কলেজের পুনর্মিলন উৎসব। এই মিলনের আনন্দ বাইরে বিতরণ করার বাসনা যদি তাদের হয়ও, এটা তো শেষ অব্দি একটা ইনস্টিটিউশন, একটা সামাজিক প্রতিষ্ঠান, এরকম অসামাজিক কাজ সেখানে প্রশাসনিক ভাবে করা হচ্ছে। অবাক হতে গিয়েও হলাম না। নিউব্যারাকপুরের রাজনীতির কথা আগেই শুনেছি অনেকের মুখে। গোটাটাই সেখানে দুর্বৃত্তদের হাতে। এতদিন ছিল সিপিএমের দুর্বৃত্ত, এতদিনে নিশ্চয়ই তারা তৃণমূলের দুর্বৃত্ত হতে শুরু করেছে। নিউব্যারাকপুরে যেটা চলে সেটা অবশ্য সিপিএমের দুর্বৃত্ত না বলে দুর্বৃত্তের সিপিএম বলাই ভাল। কোয়ান্টিটি কোয়ালিটির ডায়ালেক্টিক্সে।

তারপর যা দেখলাম, সে আরও চমৎকার। যে বাড়িটায় গেছিলাম সেটা নিউব্যারাকপুরের বড় স্কুল মাঠের পাশেই, চিত্ররথ সিনেমার ধারে। সেই মাঠে পুষ্পমেলা চলছে। তার আগে বেশ কিছু দিন চলেছে সংস্কৃতি মেলা। সংগঠক নিউব্যারাকপুর পৌরসভা। এবং তাতে মুম্বইয়া গানের মাইকে ঘরের মধ্যে খাবারের প্লেট অব্দি কেঁপে কেঁপে উঠছে। আমার ভাবতেই আতঙ্ক হল। এটা হচ্ছে ওখানের সিপিএম পৌরসভার তত্ত্বাবধানে। এটাই নিউব্যারাকপুরের সিপিএম।

আমার ছোটবেলাটা কেটেছে নিউব্যারাকপুরে। তাই বহু ঘটনাই মনে আছে ছোটবেলার স্মৃতি থেকে। পরে যে জুয়াচুরিটাই সামগ্রীক সিপিএম রাজনীতি হয়ে দাঁড়াল তার গোড়াপত্তন হয়েছিল আদতে সাতাত্তরে ক্ষমতায় আসার আগেই, শুধু তখন সেটাকে একটা গতির চিহ্ন বলে ধরতে পারিনি, ছড়ানো ছেটানো কিছু টুকরো গল্প বলে ভেবেছি। আমার মনে আছে বাবার সঙ্গে এসে দেখা করেছিলেন, বাবা ছিল মাস্টারমশাই, তৎকালীন নিউব্যারাকপুরের পৌরপ্রধান এবং ওই গোটা এলাকার অবিসংবাদিত সিপিএম নেতা। তাঁরা চাইছিলেন বাবাকে পার্টি মেম্বারশিপ দিতে, এবং তার জন্যে প্রয়োজনীয় নথী ইত্যাদি তারা সঙ্গেই এনেছিলেন, যা দিয়ে বাবার অক্সিলিয়ারি গ্রুপের সভ্য হওয়া, এবং ক্যান্ডিডেট মেম্বার হওয়া, ব্যাগডেটেই তৈরি করে দেওয়া যাবে। এই এজি এক বছর থাকা, এবং প্রার্থী সভ্য এক বছর থাকা সিপিএমের সংবিধান অনুযায়ী নিয়ম, পূর্ণ সভ্য হওয়ার আগে। ওই নেতাদের এটা করার উদ্দেশ্য একটাই, একটা ভোট নিজেদের পক্ষে বাড়ানো, যাতে নিজেদের পছন্দ মোতাবেক কমিটি কনফারেন্স থেকে বার করে আনা যায়।

এবং গোটাটাই, এখন দেখলে মজা লাগে, কী অদ্ভুত ভাবেই, গনতন্ত্রের মধ্যে ফ্যাসিবাদ বাঁচিয়ে রাখার জুয়াচুরি। পরে সিপিএম রাজনীতি এটাই হয়ে দাঁড়াল, প্রতিটি জায়গাতেই, আপাত গনতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখার ভণ্ডামি, এবং ভিতরে ভিতরে একটা চুরির জমিদারি বানিয়ে তোলা, এবং বাঁচিয়ে রাখা। এই রাজনীতিটাই পরে চারিয়ে গেছে সমাজ জীবনের প্রতিটা স্তরে।

অন্য মানুষকে, নিজের বাইরে, নিজের প্রভুদের বা নেতাদের, বা নিজের সঙ্গে সংযোজিত অন্য জুয়াচোরদের মিলিত চক্রের বাইরে, সম্মান করার বা মর্যাদা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন যে পড়ে না, এটাই সামাজিক সাফল্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিল সিপিএম। এবং আজ এটাই আমাদের জ্যান্ত ট্রাডিশন। সমাজের, রাজনীতির। সবকিছুই ওই দিয়ে স্থির হয় এখন।

সেদিন আমার এক পুরোনো ছাত্র, সে নিজেও ব্যবসায়ী, তাই অনেক কিছু খোঁজখবরও রাখে, আমায় বলল, কী বলব স্যার, যেখান অব্দি গিয়ে মানব মুখার্জিরা ছেড়েছে ঠিক সেইখান থেকেই ধরছে শুভেন্দু অধিকারীরা। আর একটু স্মার্ট হতে হবে অবশ্য। আর একটু দু-চার পাতা ইংরিজি বলাও। তা মহাশ্বেতা দেবীরা আছেন টাছেন, ও সবও হয়ে যাবে।

এবং আর একটু পিছন ফিরে যদি তাকাই, মানুষকে মর্যাদা না-দেওয়া, তাদের যে কোনও অধিকার এবং প্রাপ্য নিয়ে ছিনিমিনি করা, সেখানে আবার আইনকে কাজে লাগানো — এর গোটাটাই আমাদের ইতিহাসে আছে। ইংরাজ প্রভুদের গোমস্তা ও কেরানিদের রাজনৈতিক সামাজিক ভূমিকাই ছিল এটা। যে খোপটায় খাপে খাপে ঢুকে গেছিল সিপিএম। এবার তৃণমূল যাবে। মোট রাজনীতিটা বদলাবে না।

আর কতদিন আমরা কলোনির ইতিহাস বয়ে বেড়াব?

January 7, 2010

মাইকনির্ভর শ্রেণীসংগ্রামে বিজয়ী বাম

জানিনা, বোধহয়, ওইসব চিঠিটিঠির পর, আগেকার ব্লগে আছে, তৃণমূলের সবুজ মাইক মধ্যমগ্রামে অনেকটাই এখন শান্ত। কিন্তু বিপ্লবী দাপট যদি দেখতে চান মাইকের তো মধ্যমগ্রামে আসুন।

কদিন ধরে চলল একটি গনতরফ্রন্ট মাস, মানে এমএএসএস, মধ্যমগ্রাম অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশাল সার্ভিসের মাইক। তারা আবার অপসংস্কৃতি করে না, ভারি গণসংস্কৃতি শোনায়, মাসের ব্যাপার  তো। কিন্তু মাইকটা চলেই। এই গনতরফ্রন্টের ধারণাটা প্রথম এসেছিল এই ব্লগেই ২০০৭ সালের শেষ ব্লগে, ২০০৭ শেষ, ফেডোরা ৮, সিপিএম, এবং আমাদের পিতৃশ্রাদ্ধ। সেখানে ছিল সিপিএমের গণফ্রন্ট ডিওয়াইএফআই, এবং তার গণতরফ্রন্ট দেবীগড় সাংস্কৃতিক চক্রের কথা। গণতরফ্রন্টের সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে, কখনও চক্র, কখনও মাস। তবে মাস গণতরফ্রন্ট হিসাবে অনেক নরমপন্থী, রাত দশটার পরে লোককে ঘুমোতে বা কথা বলতে বা লেখাপড়া করতে দেয় বটে।

গত দুদিন ধরে সরাসরি যে সিপিএম ভাঁড়ামিটা দেখছি সেটা এমনকি আমাকেও বেশ অবাক করে দিয়েছে। মফস্বল এলাকায়, এই বেলঘরিয়া সোদপুর মধ্যমগ্রাম ইত্যাদি এলাকায় দেখেছি, নানা বিজ্ঞাপনের ক্যাসেট চলে, মানে আগে ক্যাসেট চলত, আজকাল নিশ্চয়ই সিডি চলে। কোনও গেঞ্জি জাঙিয়ার দোকান খুলছে, কি কোনও নতুন মলম, ইত্যাদির জন্যে। ভারি অতিকৃত রোমান্টিক গলায়, ভাসিয়ে ভাসিয়ে, একটি মেয়ে একবার কিছু বলে, আবার একটি ছেলে, মধ্যে মধ্যে জুড়ে দেওয়া থাকে গানের লাইন, ধরুন কোনও রবীন্দ্রসঙ্গীত, বা জীবনমুখী, যা আপনাকে ওই গেঞ্জি জাঙিয়ায় বা মলমে উৎসাহিত করবে। বারবার নানা ছলে, কখনও কথোপকথন, কখনও নাটকীয়তা, ওই ব্রান্ডনাম বা দোকাননামটা উল্লিখিত হতে থাকে।

গত কদিন ধরে এইটা চলছে, করছে সরাসরি সিপিএম উত্তর ২৪ পরগনা জেলা কমিটি। আমাদের ঘুম ভাঙছে এবং ঘুমোতে যাচ্ছি আমরা এই শেষহীন লয়হীন ঘোষণার মধ্যে। এবং হুবহু ওই বিজ্ঞাপনের ক্যাসেটের গলা, ভঙ্গী ও ভাষা।

তারা সারাদিন ধরে জানিয়ে চলেছে, হুবহু ওই গেঞ্জি-রোমান্টিক রকমে, আজ রাজ্য জুড়ে যে অরাজকতার আগুন, তার সলতে পাকানো শুরু হয়েছে অনেকদিন আগে … কখনও জানাচ্ছে, কিন্তু প্রতিরোধ শুরু হয়ে গেছে, লাখো মানুষের প্রতিরোধ … সঙ্গে সঙ্গে গান শুরু হয়ে যাচ্ছে ‘আহ্বান, শুনি আহ্বান, আসে মাঠ ঘাট বন পেরিয়ে’, দুলাইনের পর আবার ফেরত আসছে লাখো মানুষের প্রতিরোধ, কখনও কাব্যিকরা পুরুষের গলায়, কখনো ন্যাকা নারীর গলায়।প্রতি বাক্যের শেষেই ফিরে আসছে একটা ব্রান্ড নাম, ব্রান্ড বুদ্ধ। বুদ্ধ বক্তৃতা দেবেন বারাসাত কাছারি ময়দানে, উত্তর ২৪ পরগনা জেলা কমিটির মিটিং-এ। তারই বিজ্ঞাপন চলছে এই অহোরাত্র।

আমি জানি না, আমার তো আর কোনও রকম কোনও সম্পর্কই নেই সিপিএমের সঙ্গে, তবু আমার কেমন লজ্জা আর ঘেন্না লাগছিল। সেই রাজনীতি যেটা আমরা করতাম, সেটার শেষ অব্দি মানে ছিল এই? ঠিক আগের ব্লগে আমি এসএফআইয়ের যে ভাষার কথা লিখেছিলাম, সেটার সঙ্গে এই গেঞ্জি-রোমান্টিক রাজনীতি একটা জায়গায় এক, দুটোই একটা ধর্ষণের সংস্কৃতি। অনেক আগেকার বটুক নন্দী দেবব্রতর পরে, প্রথমে হেমাঙ্গ বিশ্বাস, পরে সলিল চৌধুরী, এই লোকগুলোর একটা মানে ছিল, অর্থ ছিল, আবেগ ছিল। এখনও সুদূর সমুদ্দুর শুনলে আমার মাথার ভিতর কোথাও একটা নড়ে। কাছাকাছি থাকা কোনও বাচ্চাকে শোনাতে ইচ্ছে করে। সেই সবটাকে এরকম গেঞ্জি বিক্রি করায় নামিয়ে না-আনলে কি এদের কিছুতেই চলছিল না? এর চেয়ে বড় ধর্ষণ আর কি হয়? আইডেন্টিটি, পরিচয়, কেড়ে নেওয়া, ওই সময় ওই শিল্পের মুখটাই মুছে দেওয়া।

January 4, 2010

একটা মিশ্র দুপুর

আজ আমার ক্লাস ছিল না। দুপুরে গেছিলাম ইনসিওরেন্সের প্রিমিয়াম জমা দিতে, চৌরঙ্গি রোডে। সেখান থেকে বেরিয়ে রাস্তার উপরেই একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। কয়েকটি বছর ত্রিশ পঁয়ত্রিশের ছেলে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল, পরিকল্পনা করছিল একটি পিকনিকের। এবং অনবরত মুখ খারাপ করছিল। ছেলেগুলির পোষাক আশাক বেশ মহার্ঘ, এবং কথা থেকে যা বুঝছিলাম, ওই সামনাসামনি অফিসগুলোয় কাজ করে, কোনও গাড়ির সেলসে যতদূর সম্ভব। ওখানে একটা বেজায় বড় গাড়ির সেলস সেন্টার আছেও, ঠিক রেমন্ডস-এর আগে, এক্সাইডের মোড় থেকে এগোতে। ছেলেগুলি সকলেই বাঙালি। এবং ইংরিজি উচ্চারণও মোটেই শিক্ষিত কিছু নয়, অত্যন্ত গড়, অথচ ইংরিজি শব্দ বলছিল বড়ই বেশি। সে তো অবশ্য বলেই আজকাল। এবং পিকনিকের পরিকল্পনার সূত্রে শুধুই নানা খাবার, আরও খাবার, আরও আরও তৈলাক্ত এবং তৈলাক্ততর খাবার, এগুলোই যেন উচ্চারণের মাধ্যমে অনুভব করে চলছিল ছেলেগুলো। অথচ প্রত্যেকেরই গোটা সম্মুখভাগ জুড়ে এক একটি বেশ নধর আকারের ভুঁড়ি।

তিনটি মেয়ে, এরা বরং অনেক স্বাভাবিক, এরাও বাঙালি এসে দাঁড়াল ওই চায়ের দোকানেই। এরাও কথা বলছিল বাংলাতেই। এবং এতটা কাছে প্রায় গায়ের পাশে মেয়ে তিনটির উপস্থিতি সত্ত্বেও এদের মুখখারাপের দিকচক্রবাল একটুও বদলাল না, খাবারের আলোচনার কামুক যৌনতায় এরা তখন এতটাই মগ্ন। বেশ বিরক্তি লাগছিল আর গা-রিরি করছিল। আবার এটা যে মূর্খতা সেটাও বুঝছিলাম। এরকমই হয় সেলসের ছেলেপিলেরা, ছেলে তো নয় ঠিক, বর্তুল পিলেরা। একমাত্র দেখেছি ওষুধের সেলসের ছেলেরা, মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ নাম ওদের পেশার, কখনও কখনও একটু আলাদা হয়।

যা হয়, বিরক্তিটা ক্রমে ভিতরে চারিয়ে যেতে থাকে, নিজের উপরেই রাগ হতে থাকে। কিন্তু কিছু করারও থাকে না, নিজেদের এই ক্ষয় ও জীর্ণতা নিয়ে আর একবার একটু বিষণ্ণ, দুঃখিত এবং ক্লান্ত হওয়া ছাড়া। ওই নিয়েই এসে রবীন্দ্রসদন ইস্টিশনে মেট্রোয় উঠলাম। সেখানে একটা ছেলেকে দেখলাম, তার কাঁধের ব্যাগের গোটা ফিতে জুড়ে খাকির উপর নীল মার্কারে রেখা রাহুল রাহুল। আবার ব্যাগের অন্য দুটো উল্লম্ব ভাবে ঝোঝুল্যমান ফিতেতে লেখা এসটিওপি-ও, অন্যটিতে এসটিওপি-কে। মানে দুটো মিলিয়ে হচ্ছে দুবার স্টপ এবং একবার ওকে। আবার ব্যাগের গায়েও লেখা অনেককিছু, রাহুল ইজ গোয়িং ওকে, ইত্যাদি।

ছেলেটি অনকেক্ষণ ধরেই খেয়াল করছিল আমি ওকে দেখছি, এবং বোধহয় আমার মুখের রেখায় কিঞ্চিত মজার উপস্থিতিও টের পাচ্ছিল, একটা অস্বস্তিও পাচ্ছিল। ক্রমে আমি ওর সঙ্গে আলাপ জমালাম, ‘তোমার নাম কি রাহুল’ এই দিয়ে শুরু করে। ছেলেটি দমদম মেট্রোপলিটান স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে। ওকে আমি ওর ব্যাগলিখনের একটু ইংরিজির ত্রুটিও সংশোধন করে দিলাম। জিগেশ করলাম, ব্যাগে এত কিছু লিখেছিস, মা বকেনি? ও হেসেই বলল, না, মাথা নাড়িয়ে।

অবাক হলাম আমি দমদমে নামতে নামতে। ছেলেটি যাওয়ার আগে, তার আগে বেশ কিছুক্ষণ আমি এসে দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমায় বলল, “আসি”। আমি তো ছেলেপিলেই চরাই, সত্যিই এতটা সৌজন্য আমি আশাই করিনি ওই বয়সের একটি ছেলের কাছে। বেশ লাগল। অবাকও হলাম। অবাক হওয়ার মত আর একটা জিনিস আমার জন্য অপেক্ষা করছিল তখনও, দমদম পাঁচ নম্বর প্লাটফর্মে। মেট্রো থেকে নেমে দেখলাম মাঝেরহাট-দত্তপুকুর লোকাল দিয়েছে ওখানে। সিঁড়ির দিকে হাঁটলাম।

ট্রেনে উঠে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসলাম। খুব নিকটে কোনও চৈনিক সেলফোনের সাঙ্গীতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত নেই এটা দেখেও ভারি আরাম হল। এই সময় দেখছিলাম, একটি মেয়ে, আর তার সঙ্গে তার মা, খুব খুঁজে বেড়াচ্ছে কিছু একটা ট্রেনে। মা সম্পর্কটা ডাক থেকে মালুম হল, মেয়েটি বেশ উজ্জ্বল দেখতে, ছাপা সিন্থেটিক হলুদ সাদা সালওয়ার কুর্তা পরনে, সঙ্গে মায়ের চেহারায় বরং কায়িক শ্রম ও ক্লেশের ছাপটা বেশ প্রকট, প্রথম দেখলে মা-মেয়ে বলে মনেই হয় না। মেয়েটার মুখটা ভারি মিষ্টি, নরম। ছোটখাট চেহারা, বাঙালি সৌন্দর্য বলতে ঠিক যেমনটা ছোটবেলা থেকে মাথায় গেঁথে আছে একদম সেরকম। ওরা কী খুঁজছে এত সেটা ভাবছিলাম।

এইসময় ওরা উঠে এল, আমাদের কামরাতেই। এবং একটি মানুষ, সামনে ঝুড়ি আর বস্তাটা না-থাকলেও যাকে ওই ধরনের একজন ছোট পুঁজির ব্যবসায়ী বলে আন্দাজ করে নিতে পারতাম এমনই চেহারা তার। লুঙ্গি পরনে, মুখটা একটু ভাঙাচোরা, কাঁচাপাকা গোঁফ। তরকারির ভেন্ডার, কমলালেবু বিক্রেতা এমনটা বললেই যে ধরনের চেহারা মাথায় আসে।

ওই মেয়েটি এবং তার মা দুজনেই এসে এই লোকটির সঙ্গে বসল। এই লোকটি এবং মায়ের সঙ্গে, তখনও মা বলে আমি নিশ্চিত নই, মেয়েটির মুখ চোখের শিক্ষা ও উজ্জ্বলতার এতটাই ফারাক যে আমি বেশ সকৌতূহল দেখছিলাম। মেয়েটির মা কয়েকটি কমলালেবু কিনলেন, ওর বাবাকে দিলেন, বাবা ঝুড়িটায় ঢোকাতে যাচ্ছেন দেখে মা-টি বললেন, “এখন খাইলে দুইটা পাইতা, বাড়ি গ্যালে তো একটা পাবা কেবল”, অন্যান্য কথাতেও ওদের ফরিদপুরের দেশের ভাষার, পরে জানলাম সেটা কথার সূত্রে, পরিপূর্ণ উপস্থিতি। অথচ মেয়েটির কথায় ওরকম কোনও টানই নেই। কলকাতার যে কোনও একটা কলেজের যে কোনও একটি ছাত্রীর মত তার কথোপকথন।

এই যে মেয়েটির সঙ্গে এত ফারাক বাবা-মার, এটা আমায় এতটাই সপ্রশ্ন করছিল যে শেষ অব্দি আমার ঠিক সামনে বসা ওর মা-কে জিগেশ করলাম, আপনার মেয়ে? মা সায় দিলেন। জিগেশ করলাম কী পড়ে? আলাপ শুরু হল। মেয়েটিকে জিগেশ করায় উত্তর দিল, ও মতিঝিল কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। কী বিষয়, জিগেশ করলাম আমি। ও বলল, ফিলসফি। বিষয়ের নামটা বাংলায় বললে আমার আর একটু পছন্দ হত, কিন্তু ফিলসফি শব্দটা ও সত্যিই ফিলসফিই বলল, সচরাচর অভ্যস্ত ফিলজফি নয়। পাস কী জিগেশ করায় সেগুলোর নামের উচ্চারণও বেশ সুন্দর।

ওর মা পাশ থেকে বললেন যে, ওই ফুলের ব্যবসা করেই ছেলেমেয়েদের মানুষ করার চেষ্টা করেন। তারা থাকেন ক্যান্টনমেন্টের রেল লাইনের পাশের ঝুপড়িতে।

আমি ওনাকে না-বলে পারলাম না, মেয়ে আপনার সত্যিই মানুষ হচ্ছে দিদি। এত সুন্দর একটা মেয়ে, আমার সত্যিই মনে হচ্ছিল, বাড়িতে কোনও তেমন বয়সের ভাইপো টাইপো থাকলে তার সঙ্গে সম্মন্ধ করতাম। লেখাপড়াটায় যথাযথ হওয়াটাই বড় কথা না, মা-বাবার বাস্তবতায় কায়িক শ্রমের উপস্থিতিটা এতটাই প্রকট যে মেয়েটি সেটা জানে না তা হতেই পারে না, অথচ তা নিয়ে কোনও সঙ্কোচ নেই। সত্যিই মনটা পুরো ভরে উঠছিল। লেখাপড়াটাও যে ভাল করেই করে নিজের এই দুই দশকের মাস্টারির অভিজ্ঞতায় সেটা ভালই বুঝতে পারছিলাম। মনে মনে আশীর্বাদ করছিলাম, ভাল বাঙালি মেয়ে হ, ভাল বাঙালি মা হ, তোর বাচ্চারাও শিক্ষিত হোক, ইত্যাদি।

লাবণি হালদার বলে মেয়েটিকে আমার নাম, কলেজের নাম দিতেও খুব ভাল লাগল। যদি কখনও ওর কোনও কাজে লাগতে পারি। তখনই ভাবছিলাম, ভাল কিছু তো ব্লগে লেখাই হয় না, আজ ওকে নিয়ে ব্লগ লিখব, ওকে আর রাহুলকে নিয়ে। ভাল ব্লগ। তখনও আমি জানিনা, এর পরে আরও একটা অভিজ্ঞতা আছে যা আমায় উল্লেখ করতে হবে ব্লগে।

বেশ ভাল ফুরফুরে মনে ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরছিলাম। ঠিক গলির মুখে এসে রাস্তার উল্টোদিকে আটকে গেলাম। এসএফআইয়ের একটা মিছিল যাচ্ছে। বোধহয় এপিসি কলেজের, বা মধ্যমগ্রাম বয়েজের ছেলেপিলেও হতে পারে, যেরকম সব কম বয়সের ছেলে। তাদের একদম প্রথমদিকের দুই সারি ছেলে স্বাধীনতা গনতন্ত্র সমাজতন্ত্র ইত্যাদি নিয়ে স্লোগান দিচ্ছে। এবং অন্যরা ঠিক কী করছে সেটা বলা খুব কঠিন। সবচেয়ে কাছাকাছি এটাই আসবে যে তারা একটা প্রতিযোগিতায় নেমেছে, একটা বাংলা বাক্যে কতবার পুং যৌনাঙ্গ ভরে দেওয়া যায়, এবং তার খুব নিকটাত্মীয় শব্দদের। লাকাঁ একবার লিখেছিলেন সমাজতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষার কথা। আর এটা শুনতে শুনতে এটাই আমার মাথায় এল, তাপসী মালিক বা অন্য এই জাতীয় ধর্ষণগুলো তো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। এই ভাষার রূপারোপ যে রাজনৈতিক সক্রিয়তায় ঘটবে তাতে তো ওগুলোই ঘটার কথা।

কিন্তু শেষ অব্দি তো এটাই সত্য যে এই শিক্ষার আবহ, রাজনীতির প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়েও তো রাহুল তার সৌজন্য হারিয়ে না-ফেলার, এবং আমি তাকে সমালোচনার পরও, দায়িত্বশীলতা ধরে রাখতে পারে। লাবণি পারে তিন ভাইবোনের দিদি হয়ে তাদের পড়ানোর পরেও, তাদের দারিদ্রের পরও, তার জীবন্ততা বজায় রাখতে। কোথাও বোধহয় সব কিছু এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

January 2, 2010

সাহেবদের পিণ্ডদান আর কেন?

সেই পঁচিশে ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে এখনও চলছে সাহেবদের পিণ্ডদান। কবে সাহেবরা এসেছিল, চলে গেছে, তাদের কিছু বাল-বাচ্চা আর বেজম্মা পয়দা করে, এখনও চলছে তাদের পিণ্ডদান। কত হাজার টাকার বাজি যে পুড়ল, কত মদের বোতল ইত্যাদিতে কত টাকা যে গেল, তার ইয়ত্তা নেই।

আর আজ সকালেই এলেন বিমলবাবু বলে এক জন। তিনি আমার কাছে মাঝেসাঝে আসেন প্রায় সতের আঠার বছর হল। প্রথমবার তাদের কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, শ্রমিকদের জন্য সাহায্য চাইতে এসেছিলেন। তারপর কতগুলো বছর গড়িয়ে গেল। তিন তিনবার সোদপুরের কাছেই তাদের বস্ত্র-কারখানা বন্ধ হল, এবং খোলার নাটক, আবার বন্ধ।

ওনার প্রতি আমার একটা অপরাধবোধও আছে। বছর দশেক আগে ওনার মেয়ের বিয়ের জন্য কিছু দিতে পারি কিনা জানতে এসেছিলেন, মেয়ের বিয়েতে যেতে বলেছিলেন। আমি ঠিকও করেছিলাম যাব, সোদপুর যাওয়ার পথে গির্জাতে নেমে তার পাশে ওনার বাড়ির রাস্তার নির্দেশ লিখে নিয়েছিলাম, পুরোনো খাতার পিছনে সেই নির্দেশ আজও আছে। আমি ঠিক করেছিলাম, একটা বেশ লাল শাড়ি কিনে, যদি কিছু টাকাও দিতে পারি তাই নিয়ে যাব।

তারপর সেই বছরেই, এই শীতেই, ডিসেম্বরে হল আমার সেই পেটব্যথা। অসহ্য একটা ব্যথা, দম অব্দি বন্ধ হয়ে আসে, আমি ভ্রূণর ভঙ্গীতে কুঁকড়ে শুয়ে থাকি, কিছু করার থাকে না আর। অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে। সবারই এক মত, ওটা মন থেকে আসে। অনেক ভেবেছি। দুটো কারণ থাকতে পারে, এই ডিসেম্বরে শীতের কারণে পেটে একটা খারাপ অবস্থা সৃষ্টি হয়, তার সঙ্গে বোধহয় যুক্ত হয় আমার দুটো মূল স্মৃতি। এক, আমার ছোটবেলায় প্রতিটি বড়দিন ছিল খুব বেদনার।

পঁচিশে ডিসেম্বর বড়দিন, আর তার দুদিন বা এক দিন আগে রেজাল্ট বেরোত। আমার রেজাল্ট বেরোনো মানেই একটা ভয়ঙ্করতা, মা পুরো তাণ্ডব করত, কেন আমি যত ভাল ছেলে তত ভাল রেজাল্ট করিনি — কান্নাকাটি, চেঁচামেচি, অনেক প্রতিশ্রুতি — সেই প্রতিশ্রুতি দেওয়াকালীনই, যে সামনের বছর ভাল করে পড়ব, আমার অপরাধবোধ, কারণ সেই মুহূর্তেই আমি জানি, যে সামনের বছরও একই ভাবে বিড়াল দেখলে আমি লাফাব, একই ভাবে রাস্তার দিকে লোকের দিকে আমি চেয়ে থাকব, একই ভাবে পড়ার খাতায় বন্দুকের ছবি আঁকব — মানে, এক কথায়, একই ভাবে আমি ফাঁকি মারব। ক্রমে, ছোটবেলা আর কৈশোর জুড়ে আমি বড়দিন, ওই হলদে কমলা সিনকাগজ মোড়া কেক, এগুলোকেই কেমন একটা বিতৃষ্ণা নিয়ে দেখতে শুরু করেছিলাম।

এরপরের একটা বড় ডিসেম্বর-স্মৃতি হল মহম্মদের জন্ম। মহম্মদ যখন পেটে এল, ঠিক সেই সময়টায় ওর জন্মটা আমি চেয়েছিলাম না। তখনও তো আমি ওই ম্যাজিকটা আমি টের পাইনি। মহম্মদ আমার প্রথম বাচ্চা। তারপর যখন পেটের মধ্যে নড়তে শুরু করল, সেই অদ্ভুত আবছায়া সোনোগ্রাফি ছবিতেই আমি ফুলোফুলো গাল আর গাবদা কান আবিষ্কার করতে শুরু করলাম, তার আবার কোনও মানেই নেই, কারণ ওসব বোঝা যায় না, তখন তো গল্পটা একদম অন্য। মহম্মদ জন্মেছিল সাতই জানুয়ারি, তাই ৯১-এর ডিসেম্বরে চলছিল তারই তোড়জোড়। সেই আনন্দিত উত্তেজনাটা ঘটছিল, আর মাঝেমাঝে মনেও পড়ছিল, এই জন্মটাই গোড়ার দিকে আমি চাইনি।

যখন থেকে মহম্মদ আমার থেকে আলাদা থাকতে শুরু করল, সেই আলাদা থাকাটাও এল একটা শীতে, ওই ডিসেম্বরের একটু একটু অপরাধবোধ মেশা উত্তেজনাটা আমার বারবার মনে পড়ত। আর হয়ত এইসব মিলিয়েই ওই পেটের ব্যথাটা আসে, যেবার যেবার আসে, এই ডিসেম্বরেই। বিমলবাবুর মেয়ের বিয়ের সময়েও তাই হল, পেটের ব্যথাটা এমন লাট করে দিল আমায় যে আমার মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল। অনেকদিন বাদে ফের উনি আসা অব্দি মনেই পড়েনি।

আজ সকালে এসেছিলেন ওই ষাট বছরের বৃদ্ধ, দারিদ্র আর সময়ের অত্যাচারে আশি বছরেরও বেশি লাগে দেখতে। বৌ মারা গেছেন, মেয়েটা অবশ্য জামাইয়ের কাছে শান্তিতেই আছে। একটা দোকান করেছেন, সেটা কিনে রেখেছিলেন দুই দশক আগে, যখন চাকরি করতেন, খুব সস্তায় চেনা একজনের কাছে পেয়েছিলেন। এক শালা মারা গেছেন, তার বৌ লোকের বাড়ি কাজ করে, তার ছেলেটাকে এনে নিজের কাছে রেখেছেন। সেও খেতে পায়, ওনারও দোকানের কাজে সাহায্য করে।

ট্রেড ইউনিয়ন নিয়েও কত কিছু বললেন, কী ভাবে নেতারা সব টাকা মেরে দিল। ওরা শ্রমিকরা কিছু করতেও পারলেন না। সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন পৃথিবীর দেশে দেশে মাফিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের ক্ষমতার কাছে ওরা শ্রমিকরা আর কী-ই বা পারেন। কিছু টাকাই পেলেন না ওরা। এখন একটা টিমটিমে দোকানে বিস্কুট আর লজেন্স বিক্রি করে দুটো মানুষের গ্রাসাচ্ছাদন করেন।আমার কাছে এসেছিলেন যদি কিছু সাহায্য করতে পারি: তার “ক্যাপিটাল তো নেই, কী হবে?” আমি আর কী-ই বা সাহায্য পারি?

এগুলো শুনতে শুনতেই মাথায় আসছিল, গত দুদিনের এই ফুটানি, আর সাহেবচাটা বর্ষশেষে মাঝরাত্তিরে বাজি ফাটিয়ে ‘হ্যাপপি নিউইয়ার’ করা। সকালে প্রদীপ্তকে ফোন করেছিলাম, ও তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি বেলা আটটাতেও। আমায় বলল, গতকাল রাত সাড়ে তিনটে অব্দি মদ খেয়েছিলাম। সেটা শুনেও মন খারাপ হল। কত টাকা নষ্ট, শরীর নষ্ট, সময় নষ্ট। কী বলব বুঝতে পারলাম না, পরে মনে হল, আজ বিকালে ও কলেজে আসবে আমার সঙ্গে দেখা করতে, তখন বলব, এখন থেকে মদ খাওয়ার কথা মনে এলেই সেই টাকাটা রেখে দিতে, ওর বাগবাজারের পার্কটার পাশেপাশেই কত বাচ্চাকাচ্চা এই শীতে বিনা খাবারে বিনা জামাকাপড়ে রাত কাটায়, পরে ওই টাকাটা থেকে তাদের কিছু কিনে দিতে পারবে। একটা মানুষের হলেও, এক মিলিমিটার হলেও, সেই কষ্টটুকু তো কমবে।

আমাদের এই মধ্যমগ্রাম এলাকা তো ছিল কলোনি এলাকা। সেখানে আমাদের কৈশোর প্রথম যৌবন অব্দিও তো দেখেছি সম্প্রদায়ের একটা বোধ কাজ করত। সেই লোকগুলো তো সব মরে যায়নি, তাহলে সেই বোধটা অন্তর্হিত হয়ে গেল কেন, কী করে, কবে? চলে যাওয়া সাহেবদের পিণ্ডদান না করে এই টাকাটা এই বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার শ্রমিকদের, দুঃস্থদের জন্য কিছু করা যায় না? আমাদের কলেজের সামনে শোভাবাজার মেট্রো ইস্টিশনের চারদিকে ফুটপথে বাস করে কত মানুষ। সেই রকম এক বৃদ্ধাকে দেখি রোজই, কত বাচ্চা। কাল আমার বাচ্চা যখন ঢাকুরিয়া ইস্টিশনে ললিপপ খাচ্ছিল, আর একটা বাচ্চা ওই শীতেই প্ল্যাটফর্মে হেঁটে বেড়াচ্ছিল, পাছা থেকে গোটাটা ল্যাংটো। সাহেবদের ওই পিণ্ডিটা এদের স্থানান্তরিত করা যায় না কোনও মতেই? আমরা এরকম অমানুষ হয়ে গেলাম কেন?

Powered by WordPress