নেটখাতা

January 20, 2011

দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৫

[গুরুচণ্ডালী সাইটে এই লেখাটা প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু ওদের ইউনিকোড থেকে বাংলাপ্লেন কনভার্টারে সমস্যা থাকায় ফরম্যাটিং ঘেঁটে যাচ্ছে। তাই এখানে ওই প্রতিটা অংশ, যেমন যেমন গুরুচণ্ডালীতে প্রকাশ হচ্ছে, সঠিক ইউনিকোড অবয়বে আমি দিয়ে যাব। এটা তার পঞ্চম অংশ। এই ব্লগেরই পুরনো লেখায় পাবেন এর প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় আর চতুর্থ অংশ।]

==========অংশ ৫ শুরু===================

দেবকী বসুর কবি, ১৯৪৯ — দ্বিতীয় প্রবাহ

অধ্যায় বোঝাতে ‘প্রবাহ’ ব্যবহার আমি কখনও করিনি। তাই বেড়ে লাগছে, শব্দ ব্যবহার করতে করতে বুড়ো হয়ে গেলাম, জীবনে প্রথম কোনও একটা শব্দ ব্যবহার করছি এই মজা এখন দুর্লভের চেয়েও বেশি। সত্যিই প্রথম অংশটা চলছিল একটা প্রবাহের মত। লেখাটার পরিকল্পনাটাও গজিয়ে উঠল সাবটাইটল আর নোটস ফাইল শেষ হওয়ার পর, নানা জনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে। তারপরও ঈপ্সিতা না খোঁচালে শুরুও হত না। বেশ চলছিল। লিখতেও বেশ লাগছিল। এর মধ্যে একটা ছেদ এল শারীরিক ক্লান্তিতে। আমি রসিকতা করেও বলি, আমার ক্লান্তি হয় না, বংশটা তো দাস। কিন্তু দাসও তো বুড়ো হয়। খুব খুব ক্লান্তি হচ্ছিল। প্রথমে ভাবলাম ক্লান্তিটা স্নায়বিক, একটা দিন গোটাটা কাটালাম নানা কিছু রান্নাটান্না করে। মেয়েটা পুরো মাংসাষী হয়েছে, যেদিন পাড়ার যে বাড়িতে মাংস রান্না হয়, সেখানেই খেয়ে আসে। ওর বাবাই যে ব্রহ্মাণ্ডের শ্রেষ্ঠ মাংসরাঁধুনি এটা ওকে আরও একবার প্রত্যয়িত করার প্রয়োজন ছিল। তারপর দেখলাম ক্লান্তিটা তার চেয়েও গভীর, একদিন রাতে ঘুমোতে ঘুমোতে খাট থেকে পড়েই গেলাম। উঠে আবার শুয়েছি যখন ডান হাতের কনুইয়ে তীব্র যন্ত্রণা করছে, ভয় লাগছে আবার হাড় ভাঙল কিনা, কিন্তু তার মধ্যেই ফের সাড়হীন ঘুমিয়ে পড়লাম। একবার ভাবলাম, লেখাটা আর লিখব না, অসমাপ্ত কাজ হাতে থাকলে যেমন হয়, মেজাজ শুধুই খিঁচড়ে যেতে থাকে, তাও পারছিলাম না ফের হাত দেওয়ার উদ্যমটা সংগ্রহ করতে। আর ব্যাটা দেবাশিসও কোনও প্রতিবার্তা (বাংলায় ফিডব্যাক) পাঠাচ্ছিল না। সেই সাতই নভেম্বর ভোরের পর ছয়দিন আর লিখিইনি। কাল ফের উদ্যমটা ফিরে এল সেঁজুতি খোঁচানোয়, ওর একটা লেখার কাজে লাগতে পারে, তাই ফোনে বলল, কী হল, তুমি আর লিখছো না কেন? ছেলেপিলেদের অবস্থা কী? আঠারই, মানে সামনের বেস্পতিবার বিয়ে, এখনও অন্য জিনিসে মনযোগ দিয়ে যাচ্ছে। ছি, ছিছি। বিয়ে বস্তুটা কবে থেকে এমন এলেবেলে হয়ে গেল কে জানে, আরও তার উপরে এই প্রথম ও বিয়ে করছে। কিন্তু উদ্যমটা সত্যিই ফেরত এল। তাই, আসুন দ্বিতীয় প্রবাহে ঢোকা যাক। কিন্তু মাথায় রাখবেন, এটা ‘কবি’ ফিল্মের কোনও মূল্যায়ন নয়, সমালোচনা তো নয়ই। ‘কবি’ ফিল্ম দেখাটা আমি নামক ব্যক্তিকে, তার ব্যক্তি অনুভূতিকে কোন কোন জায়গায় আক্রমণ করেছিল, তার একটা তালিকা বলা যেতে পারে। সেই তালিকাও আবার কোনও সচেতন যত্ন নিয়ে চয়ন করা হয়নি, চালিয়ে দেখতে থাকছি, যে জায়গায় কিছু মাথায় আসছে, থামিয়ে লিখে নিচ্ছি।

আমরা ছেড়েছিলাম বাবুর উপন্যাস-রূপ আর চলচ্চিত্র-রূপে পার্থক্যের প্রশ্নে। খেয়াল করেছেন কী, অনুবাদ ভুল অনুবাদ প্রতি-অনুবাদের গোটা চক্করটা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে ‘কবি’ ফিল্ম, যা ‘কবি’ উপন্যাস পারেনি। উপন্যাস ভাষা-নির্ভর হওয়াতে সেখানে কোন পাঠক উপন্যাসটা পড়ছে, কার জন্য তারাশঙ্কর লিখছেন, এই নির্বাচনটা সক্রিয় ছিল। ভাষাই ঠিক করে দিচ্ছিল, কে লেখাটা পড়বে — ইংরিজি বর্ণমালা এবং ভাষা যার কাছে অবোধ্য নয়। কিন্তু ফিল্মে বাবুর মাঝ-ফ্রেমে বসে থাকা এবং বারবার দুদিকে নাচপুতুলের মত করে তাকাতে থাকা, তারপরে উঠে দাঁড়ানো এবং কথা বলে ওঠা, এই গোটাটা মিলে তৈরি করল একটা ভঙ্গী। যে ভঙ্গীটা যে কোনও দর্শকের কাছেই অত্যন্ত সুবোধ্য, সেখানে ভাষাটা কোনও অন্তরালই নয় আর। এই ভঙ্গীটা, এবং ভঙ্গীটাকে প্রাকৃত বাঙালি কী ভাবে চেনে, কী ভাবে বোঝে, এটা অনেক অজস্র অসংখ্য বার এসেছে বাংলা সাহিত্যে, কিন্তু আমার তো কিছু স্থির শ্মশানভূমির বাধ্যতা আছেই। সেই ‘ইছামতী’ থেকেই তোলা যাক, যে উপন্যাসটা আজ পর্যন্ত একবারও হয়নি যে আমি যে কোনও পাতা একবারও পড়েছি, অথচ রক্তক্ষরণ হয়নি অস্তিত্বের গভীরে কোথাও। আমি যে উদ্ধৃতি দিচ্ছি, সেই উদ্ধৃতিটুকু দিতে দিতেও, উপন্যাস থেকে এই লেখায় টুকতে টুকতেও আমার মধ্যে কী একটা হচ্ছে, পড়তেও ভাল লাগছে। বেশ কয়েক লাইন তোলা যাক ‘ইছামতী’ থেকে।

তিলু হেসে বললে—এই খোকা, তোর শম্ভুদাদা কেমন ইংরিজি বলে রে?
ইট্ সেইস্ট মাট্ ফুট্—ইট সুনটু-ফুট-ফিট্ —
ভবানী বললে—বা রে! কখন শিখলি এত?
টুলু বললে—শুনে শিখিচি। বলে, তাই শুনি কিনা। যা বলে, সেরকম বলি।
ভবানী বললে—সত্যি, ঠিক ইংরিজি শিখেছে দ্যাখো। কেমন বলচে।
নিলু বললে—সত্যি, ঠিক বলচে তো!
তিনজনেই খুব খুশি হোলো খোকার বুদ্ধি দেখে। খোকা উত্সাহ পেয়ে বললে—আমি আরো জানি, বলবো বাবা? সিট্ এ হিপ্-সিট্-ফুট্-এপট্-আই-মাই—ও বাবা এ দুটো কথা খুব বলে আই আর মাই—সত্যি বলছি বাবা—
নিলু অবাক হয়ে ভাবলে—কী আশ্চর্য বুদ্ধিমান তাদের খোকা!

এর মধ্যে একজন, ভবানী নিজে অত্যন্ত শিক্ষিত একটি মানুষ, ভারতীয় শাস্ত্র ও তত্ত্বের ডিসকোর্সে, আলোচনায়। এবং নিলুর শেষ বিস্ময়টা খেয়াল করুন, “কী আশ্চর্য।” এই ওয়ান্ডার বা বিস্ময়টা একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এবং এটা বোধহয় আজও অব্দি একটা ক্রিয়াশীল বিস্ময়। আনন্দ-সাহিত্যের, মানে আনন্দ পাবলিশার্সের ছাপা সাহিত্যের, একটা ব্যাপক অংশে, এত ইংরিজি বাক্যের প্রাদুর্ভাব কেন, এবং একই ঘটনা পুনরাবৃত্ত হয় কেন বাংলা ফিল্মে সিরিয়ালে — আমার ধারণা, এই বিস্ময় আজও ক্রিয়াশীল। খুব ঝিনচাক একটা লোকের, বা তার বউয়ের, বা ছেলেমেয়ের বিশ্বাসযোগ্যতাই নির্মিত হয় এই ইংরিজি প্রয়োগে, কারণে এবং অকারণে। এবং ‘অকারণ’ শব্দটা এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ ‘কারণ’ শব্দটার সঙ্গে। আমি দেখেছি সিরিয়ালগুলো সিনেমাগুলো চলার সময়ে ইংরিজি ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষদেরও কোনও অসুবিধা হয় না, তার মানে কাহিনীর শরীরে এগুলো কোনও অর্থপূর্ণ উপাদানই নয়। বা সম্পূর্ণ ইংরিজি-অজ্ঞ মানুষকেও কোনও আনন্দ-সাহিত্য পড়ার পর প্রশ্ন করে দেখেছি, তার বুঝতে একটুও অসুবিধা হয়নি। এগুলি প্রয়োগ হয়ে চলে একদম সেই বিস্ময়ই উত্পাদনের জন্য, নিলুর যা হত। এগুলো দেখে একটা বিকৃত আনন্দও হয়, ওই সাহিত্যে বা সিরিয়ালে এই প্রয়োগে — সচরাচর এত খারাপ ইংরিজি থাকে সেগুলো যে একটা আরাম হয়, দে দে রে, ইংরেজদের তো নিজে থেকে তাড়াতে পারিনি আমরা, দে ব্যাটাদের ভাষাকেই ধর্ষণ করে দে।

দেবকী বসু ‘কবি’ চলচ্চিত্রে এই ভঙ্গীটাকেই অনুবাদ করে দিচ্ছেন ফিল্মের ভাষায়। এবং তাই করে উপন্যাসের লেখক পাঠকের নির্বাচিত চক্রের চক্কর থেকে বেরিয়ে আসছেন। ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ বা ‘শত্রু’ বা ‘চ্যালেঞ্জ’ জাতীয় ফিল্মে যখন কোনও বড়লোকের বেটাবেটি বা কোনও অফিসার ইংরিজি বলে, এই ভঙ্গীটাই সেখানে পাঠ করে দর্শক, চরিত্রের পোষাক ধরনধারণ সব কিছু মিলিয়ে। এবং তারাশঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাস আর আমাদের উদাহরণের এই ‘ইছামতী’ উপন্যাস দুটোতেই কিন্তু চক্করটা চালু আছে। ‘ইছামতী’ উপন্যাসে প্রচুর কথোপকথন আছে সরাসরি ইংরিজিতে, ভাষায় ও বর্ণমালায়, এমনকি কোনও অনুবাদও পাশাপাশি দেওয়া নেই তার বহু জায়গাতেই। আমি জানিনা, আপনাদের কী হয়, আমার গোড়া থেকেই একটা তীব্র বিরক্তি হত এতে, এই ইংরিজি প্রয়োগে। স্কুলের উঁচুর দিকে উঠে যখন প্রথম এলিয়টের কবিতায় সরাসরি সংস্কৃত ও গ্রীক অক্ষরের ব্যবহার প্রথম যেবার দেখেছিলাম, একটা সান্ত্বনা পেয়েছিলাম, আজও স্পষ্ট মনে আছে। যদিও সেটা অর্থহীন, এলিয়টের ওই ব্যবহার একদম অন্য একটা ব্যাপারকে হাজির করে। যাই হোক, দরকারি জায়গাটা এই যে, নিতাইদের আর বাবুর বক্তব্যকে ভাষা হিসাবে বুঝতে হয়না ‘কবি’ চলচ্চিত্রে, তাই বোঝার ভুলও হয়না, তাই সেই বোঝার ভুল অপনোদন করতে ভুল প্রতি-অনুবাদও আর প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে না। ভাষাগত অর্থের জায়গায় প্রবেশ না করেই বাবু তার সমস্ত ক্ষমতার ঔদ্ধত্য নিয়ে চিহ্নিত হয়ে যান।

102
00:10:39,100 –> 00:10:41,390
‘Absolute cowards, cowards’.[25]

অ্যাবসলিউটলি কাওয়ার্ডস, কাওয়ার্ডস কোথাকারের।

এবারে আর কিছুই আলোচনা করার নেই। শুধু শেষ আলোচনাটার সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

105
00:10:50,300 –> 00:10:52,300
What is a ‘madel’, didi?[26]
106
00:10:52,600 –> 00:10:56,400
A piece of metal, with engraved name.

ম্যাডেল কী দিদি, ম্যাডেল?
পদুক লো পদুক। তাতে নাম ন্যাকা থাকবে।

এবার এল ভারি আকর্ষণীয় একটা জায়গা। বাবু ও ক্ষমতার জগতকে কেন্দ্র করে ইংরিজি শব্দ কত কত স্তরে কত রকমে অনিংরিজিতে পর্যবসিত হতে পারে তার একটা ভারি চমত্কার উদাহরণ। এবং এটা চলেছে গোটা ‘কবি’ চলচ্চিত্র জুড়ে। এই মেডেল নামক শব্দ ও পরিপ্রেক্ষিতটা এখন বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলবে, এবং আবারও ফেরত আসবে চলচ্চিত্রের একদম শেষ দিকে। যখন একদিকে বসনের মৃত্যু হচ্ছে, এবং একটা প্রতিযোগিতায় সোনার মেডেল জয়ের জন্য অংশগ্রহণের নিমন্ত্রণ আসছে নিতাইয়ের কাছে। চলচ্চিত্রের এই জায়গায় যেমন স্টেশনমাস্টার, রাজনের বৌ, ঠাকুরঝি, রাজন, এবং নিতাই, পরের বার এই ‘মেডেল’ শব্দটা তার বিভিন্ন উচ্চারণভেদে উচ্চারিত হবে মহাদেব কবিয়াল, বেহালাদার, মাসি, বসন, আমন্ত্রণকর্তা এবং নিতাইয়ের মুখ দিয়ে। এবং মজাটা এই যে, যে উচ্চারণটা এখানে গৃহীত হচ্ছে, স্টেশনমাস্টার জাতীয় মানুষদের মুখ দিয়ে, সেটা মূল শব্দটার ইংরিজি উচ্চারণ নয় আদৌ, একটা স্পষ্ট বাংলাকরণ রয়ে যাচ্ছে তাতে, -এ একার, -এ একার, ল — এই উচ্চারণে। অর্থাত্‍ এটাই শিক্ষিত বাঙালির কাছে ইংরিজি শব্দটার আকার। এই পার্থক্য রয়েছে অজস্র শব্দের লোক ব্যবহারে, যেমন বাস-স্টপেজ, যা, বোধহয় কোনও ইংরিজি শব্দই নয়। শিক্ষিত বাঙালির জনপ্রিয় ব্যবহারে ‘বাসস্টপ’ শব্দটার ওই আকার দাঁড়িয়েছে। ঠিক তেমনি ‘মেডেল’ এখানে গৃহীত-সঠিক। এবার, সেই গৃহীত-সঠিকের থেকে কতটা দূরবর্তী কারুর উচ্চারণ তার ভিত্তিতে তার সামাজিক অবস্থানটাও চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছে গোটা চলচ্চিত্র জুড়েই। যেমন সবচেয়ে স্পষ্ট ত্রুটিপূর্ণ উচ্চারণটা আসছে ঠাকুরঝির কাছ থেকে। সামাজিক অবস্থানটা ভাবুন। গ্রাম, পরিবারতন্ত্র, নারী। তার চেয়ে সঠিক উচ্চারণ করেন, ‘মেডেল’ নামক সেই স্টেশনমাস্টার উচ্চারণের নিকটতর, মাসি। যা স্বাভাবিক, শ্রমের বাজারের অভ্যস্ততা। এবং বেহালাদার তার চেয়েও সঠিক, কারণ সে ভুয়োদর্শী, সত্যই নানা ঘাটের জল খেয়ে এসেছে সে, এবং একই সঙ্গে পুরুষ। ওই একই জায়গা থেকেই বোধহয়, গ্রামের ডোমনন্দন নিতাইয়ের উচ্চারণের সঙ্গেও তার একটা পার্থক্য থাকে। হয়ত এতটা সত্যিই সচেতন নির্মাণ নাও হতে পারে, কিন্তু হতেও পারে। কারণ এই গোটা ‘মেডেল’ পরিপ্রেক্ষিতটাই চলচ্চিত্রের নিজস্ব, উপন্যাসে এটা আদৌ নেই। চলচ্চিত্রের এই জায়গায় এসে এটা শুরু হল, চলবে একদম শেষ অব্দি, কাহিনীধারার মূল একটা প্রবাহ। তাই সেটা অনেক ভেবেচিন্তেই প্রযুক্ত হয়েছিল, এটাই স্বাভাবিক। তারাশঙ্করের লেখায় ভাষাভিত্তিক এই অবস্থান এবং বর্গসঙ্করতার কিছু ভাবনার ভ্রূণ ছিল, কিন্তু যে আকারে সেটা উপস্থিত হল চলচ্চিত্রে তার সঙ্গে তার তুলনা করাই যায় না। আমরা সেই কথায় পরে আসছি, বালিয়ার প্রসঙ্গে। এই মেডেল-পদুক পরিপ্রেক্ষিতে আর দু-একটা কথা যোগ করে নেওয়া যাক।

খেয়াল করুন, ‘মেডেল’ উচ্চারণটাকে যদি আমরা সেই অর্থে বাঙালি-সঠিক বলে ধরে নিই, তাহলে, ঠাকুরঝি সেখান থেকেও নড়ে গেল, হয়ে গেল ‘ম্যাডেল’। এবং সেই বিদেশী ধারণাকে দেশী ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজনের বৌ বলল, ‘পদুক’। যা একই সঙ্গে আর একটা পুরনো শব্দের থেকে নড়ে যাওয়া। ‘পদক’ একটি সংস্কৃত শব্দ, শিক্ষিত তত্সম বাঙলায় এর ব্যবহার বহুল, কিন্তু এই তদ্ভব আকারটা তার থেকে পৃথক। একসময়ের শাসকদের হাত ধরে এসেছিল ‘পদক’, বদলে তার অপভ্রংশ হয়ে গেল ‘পদুক’। নতুনতর শাসকের হাত ধরে এল ‘মেডেল’, সেটাও গেল বদলে। আমার ভারি মজা লেগেছিল এই কথোপকথনটায়। মনে পড়ে গিয়েছিল, একাদশ শতকে লেখা কৃষ্ণ মিশ্রের ‘প্রবোধচন্দ্রোদয়’ সংস্কৃত নাটকে ‘আর্যপুত্র’ বদলে অপভ্রংশ বাচনে ‘অজ্জউত্ত’ হয়ে যাওয়া, নাটকে নটীর প্রথম সংলাপেই ছিল। মুরারিমোহন সেন তাঁর অনুবাদের সঙ্গে দেওয়া মূল সংস্কৃত নাটকে প্রতিটি অমন অপভ্রংশ সংলাপের নিচেই ব্রাকেটে সঠিক সংস্কৃত শব্দগুলো দিয়ে দিয়েছিলেন, মনে আছে। ব্রাকেটের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে ওগুলো দেখতে দেখতে জ্যান্ত ইতিহাসের শরীরে ঘটতে থাকা বদলের একটা ছাপ পেয়েছিলাম, মনে আছে। এখানে ‘কবি’ চলচ্চিত্রে ঠিক তাই ঘটে। দাসী ও শূদ্রদের অপভ্রংশে ছড়িয়ে যেতে থাকে তার নানা বিভিন্ন আকারে মূল ইংরিজি শব্দটি। এই বাস্তবকে ধরে উঠতে পারে চলচ্চিত্রটি, কোনও বাড়তি মন্তব্য না করেই।

148
00:14:58,090 –> 00:15:07,800
_The son of the wise ‘doam’_[31]
_Started getting stupid_

সুবুদ্ধি ডোমের পোয়ের কুবুদ্ধি ধরিল।

ঠিক আগের দৃশ্যই ছিল নিচু-জাতের দুজন মানুষ, মুচি ও ডোম, পরস্পরকে জড়িয়ে ধরছে। আর তার পরের দৃশ্যই হল এই জাত তুলেই গালি দিচ্ছে মহাদেব কবিয়াল। এবং এখানে দেবকী বসু একটা অদ্ভুত সুযোগ পেয়ে গেলেন, পড়ে পাওয়া আঠারো আনার মত, একটা দুষ্প্রাপ্য সুযোগ। জাতপাতের স্তরে একটা জ্যান্ত যুদ্ধ সেটা ইতিমধ্যেই সদাসর্বদাই এসে গেছে আলোচনা বা ডিসকোর্সের স্তরে, কবিগানের দৌলতে। এবং সেই আলোচনায় স্থানান্তরিত কবিগান-যুদ্ধের অনেকগুলো উপাদানই হল যে মাধ্যমটি দেবকী বসু নির্মাণ করছেন তার সঙ্গে এক। কবিগানের মধ্যেই আছে গান, নাচ, অভিনয়ের কিছু উপাদান, এবং কোথাও কোথাও ভ্রূণাকার কাহিনীসূত্র। এই কবিগানটার মধ্যেও ভাবুন, যখনই মহাদেব কবিয়াল গরুড়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ, এবং নিতাই মশার ভূমিকায়, তার মধ্যেই চলে আসছে একটা আলগা কাহিনীসূত্র যা উপ্ত রকমে ব্যবহার করছে রামায়ণের কাহিনীসূত্রর একটা ছায়াকে। ফিল্মে মনোরঞ্জনের জন্যে নাচ-গান যোগ করা হয়, আমরা রোজই দেখি। আর এখানে, কাহিনীর একটা মূল উপাদান, জাতপাতের যুদ্ধ, ইতিমধ্যেই স্থানান্তরিত হয়েছে কবিগানের পালায়, যে কবিগানের মধ্যেই রয়েছে সামাজিক ভাবে পরীক্ষিত ও উত্তীর্ণ মনোরঞ্জনের নানা উপাদান। এবং সেটা কাহিনীর মূল ধারাটিকে, জাতপাতের যুদ্ধকে একটুও দুর্বল করছে না, বরং সংঘাতটাকে এনে দিচ্ছে সরাসরি প্রদর্শনীমঞ্চের উপর, প্রদর্শনযোগ্যতায়, শিল্পমাধ্যমে অনুবাদ করে। এই জাতপাতের সংঘাতের জায়গাটা, একটু অন্য চেহারায়, এই কবিগানের আকারেই উপস্থিত হয়েছিল আর একটা জনপ্রিয় বাঙলা চলচ্চিত্রে, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’। মনে করুন, ‘খ্রীষ্ট আর কৃষ্টে কিছু ফারাক নাই রে ভাই’ কবিগানের সেই তীব্রতা। দেবকী বসুর সুযোগ বলতে এটাকেই বোঝাচ্ছি যে সামাজিক বাস্তবতার চিত্রায়ন করতে গিয়ে নাচ-গান ইত্যাদিতে সরে যাওয়া নয়, সেই নাচ-গানের মধ্যে দিয়েই সেটা উপস্থিত হচ্ছে। সরাসরি এর রাজনৈতিক প্রয়োগের একটা উদাহরণ নিবারণ পণ্ডিত। গণনাট্যের গানে তার জনপ্রিয় হয়ে ওঠা সেই ‘পাপী তো কৃষ্ণ বলে না’ অনেকদিন পরে ফের শুনেছিলাম দোহারের গানে।

মহাদেব কবিয়ালের গানে এর পরবর্তী অংশে যে প্রসঙ্গগুলি এসেছে তার দু-একটা এখানে উল্লেখ করে রাখি। এর পরেই মহাদেব কবিয়াল উল্লেখ করবে নিতাইয়ের জাত-ব্যবসার কথা। সেটা বলতে এখানে চুরি-ডাকাতির কথা তুলেছে মহাদেব। যেমন নিতাইয়ের বাবার কথা বলেছে সে, সিঁদ কেটে বাড়ি বাড়ি চুরি করত, বা তার ঠ্যাঙাড়ে ঠাকুর্দার কথা, এবং তার মায়ের বাবার কথাও যে কিনা দ্বীপান্তরে মরেছে। এছাড়া নানা জায়গায়, ডোমদের আর একটা পেশা ছিল শ্মশানে। ডোমদের এই ধরনের পেশাগুলির একটা ইতিহাস ছিল। বাংলার সামাজিক ইতিহাস নিয়ে কোনও খুব স্পষ্ট মতামত দেওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। কিন্তু নানা সময় যা কিছু শুনেছি বা পড়েছি, তার থেকে এইটুকু মাথায় আসছে যে, বোধহয় ব্রিটিশ আমলে ডোমদের এইসব অপরাধ ও মৃত্যুকেন্দ্রিক পেশার সূচনা প্রাকব্রিটিশ বাংলায়। সেখানে ডোমরা ছিল একটি যোদ্ধা জাতি। বিভিন্ন রাজার হয়ে যুদ্ধ করত এই ডোমরাই। এই ইতিহাসই বোধহয় ধরা আছে ওই ছেলেভোলানো ছড়ায়: “আগে ডোম, বাগে ডোম, ঘোড়াডোম সাজে”। আগে এবং পিছনে ডোম সৈন্যদের নিয়ে, অশ্বারোহী ডোম যোদ্ধাদের নিয়ে, “ঢাক মেঘর ঘাঘর” ইত্যাদিতে যুদ্ধের বাজনা বাজাতে বাজাতে যুদ্ধে যেতেন তখনকার বাংলার রাজারা। তারপর রুল ব্রিটানিয়ার দোর্দণ্ডপ্রতাপে, রাজশেখরের ভাষায়, “আন্ডার দি সুদিং ইনফ্লুয়েন্স অফ দি বিগ রড”, রাজারা ভ্যানিশ, রাজায় রাজায় যুদ্ধও ভ্যানিশ। ফলত বহু জায়গাতেই ডোমরা তাদের যুদ্ধবিদ্যা সম্পৃক্ততা থেকে সহজেই রত হল চুরি-ডাকাতি ইত্যাদি পেশায়। ডোমদের যেটা পোষাকি নাম, ‘রাজবংশী’ বা ‘বীরবংশী’, যার একটি মহাদেব কবিয়ালের গানে এর পরেই এসেছে, অন্যটিও এসেছে চলচ্চিত্রের অন্যত্র, তারও শিকড়টা তাই রাজা বা বীর, যা এদের সেই লুপ্ত হয়ে যাওয়া পেশাকেই চিহ্নিত করে।

==========অংশ ৫ শেষ===================

Filed under: ফিল্ম — dd @ 9:06 am

January 11, 2011

দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৪

[গুরুচণ্ডালী সাইটে এই লেখাটা প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু ওদের ইউনিকোড থেকে বাংলাপ্লেন কনভার্টারে সমস্যা থাকায় ফরম্যাটিং ঘেঁটে যাচ্ছে। তাই এখানে ওই প্রতিটা অংশ, যেমন যেমন গুরুচণ্ডালীতে প্রকাশ হচ্ছে, সঠিক ইউনিকোড অবয়বে আমি দিয়ে যাব। এটা তার চতুর্থ অংশ। এই ব্লগেরই পুরনো লেখায় পাবেন এর প্রথম, দ্বিতীয়, আর তৃতীয় অং।]

==========অংশ ৪ শুরু===================

61
00:07:29,900 –> 00:07:33,500
And that milkmaid, she too.

আউর ও ছোকরিয়া গাঁওকে — গোয়ালিন।

এখানেই প্রথম উল্লেখ আসছে ঠাকুরঝির। এবং এটা লক্ষণীয় যে সে আসছে ‘গোয়ালিনী’ এই উল্লেখে। গোটা শাস্ত্র লোককথা উপকথা রূপকথা মিলিয়ে রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক আলোচনার, ডিসকোর্সের যে অজস্র সরাসরি তির্যক এবং উপ্ত উল্লেখ বা চিহ্ন ‘কবি’ ফিল্মে আমরা পেতে যাচ্ছি, এটাই তার প্রথম। কবিয়াল নিতাই কয়লা বা কাজলের মত কাল, তার প্রেমিকা অন্য পুরুষের পত্নী এবং গোয়ালিনী, নিতাই তাকে ছেড়ে চলে যায় অন্য রমণীর কাছে, যাকে এই ফিল্মেই সরাসরি চন্দ্রাবলী বলে ডাকা হয়। রাধা-কৃষ্ণ কাহিনীর ছকটা এখানে কোনও মতেই এড়ানো যায় না। তার প্রথম সঙ্কেতটা আমরা পাচ্ছি বালিয়ার এই সংলাপে।

65
00:07:44,600 –> 00:07:47,200
My wife’s sister – ‘thakurjhi’?[17]

আরে ও তো হামারে জরুকে বহিন হ্যায় রে — ও ঠাকুরঝি?

ফিল্মের মূল ছয়টি নারী চরিত্রর ভিতর তিনটি হল ঠাকুরঝি, রাজার স্ত্রী, ঠাকুরঝির শাশুড়ি বা বৃন্দাবনের মা — এদের কারুরই ব্যক্তিনাম আমরা জানতে পারি না গোটা ফিল্ম জুড়েই, একবারও উল্লিখিত হয় না। এরা সকলেই সুব্যবস্থিত নারী, পরিবারকাঠামোর মধ্যে অবস্থিত। যে দুটি নারী চরিত্রের নাম আমরা জানতে পারি, বসন বা বসন্ত এবং নির্মলা — তারা দুজনেই ঝুমুর দলের শিল্পী মানে নর্তকী গায়িকা এবং বেশ্যা, এক কথায় পরিবারতন্ত্রের বাইরে। ছয় নম্বর চরিত্রটি আরও আকর্ষণীয়, গোটা ফিল্মে তারও নাম একবারও উল্লিখিত হয়নি, তিনি ঝুমুর দলের প্রধান, সবাই তাকে ডাকে ‘মাসি’ বলে। আবার একটা সম্পর্কের নাম, কিন্তু যা আর বংশলতিকা সূত্রে আহরিত নয়, কাজের সূত্রে পাতিয়ে তোলা একটা নকল আরামদায়ক পারিবারিকতার অংশ। এরকম পাতিয়ে তোলা আমরা ফিল্মেই একবার দেখব, নির্মলাকে যখন দিদি মানে বোন বলে ডাকবে নিতাই, সঙ্গে সঙ্গেই ভাইফোঁটার উল্লেখ নিয়ে আসবে মাসি, সম্পর্কের প্রত্যয়ীকরণের স্বার্থে। এই সম্পর্কের নাম দিয়ে ডাকা নারীরা সেই সময়ের সমাজে ক্ষমতার মানচিত্রে এবং পরিবারতন্ত্রে নারীর অবস্থানকে এক ভাবে চিহ্নিত করে। এই পরিপ্রেক্ষিতের সাপেক্ষে ঠাকুরঝির প্রেমের আবেগে ব্যক্তি অভিলাষের আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণকে আরও নাটকীয় লাগে। কিন্তু একটুও অবাস্তব হয়ে ওঠে না তার একটি ঘোষণাও। বাংলা ফিল্মে বোধহয় এখনও দুর্লভ এই বাস্তবতাবোধ যার মধ্যে আসীন অবস্থায় এই চরিত্রগুলিকে ‘কবি’ ফিল্মে আমরা পাই।

68
00:08:02,300 –> 00:08:09,200
(Mahadev kabial vocalizing)

মহাদেব কবিয়াল তানা নানা করছে, কবিগানের আসর শুরুর অপেক্ষায়, সম্মুখভূমিতে। এবং পশ্চাত্ভূমিতে একটা জরুরি জিনিস চিহ্নিত হয়ে চলেছে। জায়গা নিয়ে রয়েছে মহান্ত। তার দুই পাশে ফাঁকা জায়গা। জনসাধারণ বসে মাটিতে এবং উচ্চাসন রয়েছে মাত্র হাতে গোনা গুটি কয়েক। দৃশ্য চলছে। মহান্ত ঠাকুরের বাঁপাশে এসে বসলেন ইস্টিশনের স্টেশনমাস্টার। মহান্ত আর স্টেশনমাস্টার দুজনেই বসলেন। এবার এলেন তৃতীয় উপস্থিতি সেই বাঙালি বাবু, যাকে একটু আগে আমরা উল্লেখ থেকে বিরত ছিলাম, তাঁর হাতে কোঁচা ও ছড়িটিও আছে। তিনি সমাগত হওয়ায় মহান্ত উঠে দাঁড়ালেন, বাবু বসলেন মহান্তের ডানপাশে, মহান্ত আবার বসলেন। সেই দুজনকে দুপাশে নিয়ে যাদেরকে মহান্ত পাত্তা দেন, পাত্তা দিতে হয় যাহাদের। ব্রিটিশের রেলের স্টেশনমাস্টার এবং ব্রিটিশের মেকলেশিক্ষার বাবু। এবং ক্ষমতার এই তিন বিন্দুই চিহ্নিত হয় তখনকার চালু ঔপনিবেশিক পুঁজির বাজারের সাপেক্ষে। বাবু ও মহান্ত আসীন হওয়া মাত্র পর্দায় আমরা দেখি পাঁপড়ভাজা বিক্রির ঝুড়ি। “এই, ফুরিয়ে গেল।” দেখা যাক, তারাশঙ্কর এই বাবু-উপস্থিতিকে উপন্যাসে কী ভাবে লিখেছিলেন।

বাবুদলের মধ্যে একজন কলিকাতায় চাকরি করেন, ময়লা কাপড়-জামার গাদার মধ্যে তিনি ধোপদুরস্ত পাটকরা বস্ত্রের মতই শোভমান ছিলেন। চালটিও তাঁহার বেশ ভারিক্কী, তিনি খুব উঁচুদরের পায়াভারী পৃষ্ঠপোষকের মত করুণামিশ্রিত বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিলেন—বল কি, অ্যাঁ? নেতাইচরণের আমাদের এত গুণ! A poet! বাহবা, বাহবা রে নিতাই! তা লেগে যা রে বেটা, লেগে যা।

এ গেল অনুষ্ঠান শুরুর আগে। কবিয়াল যুদ্ধে মহাদেব কবিয়ালের সঙ্গে নিতাইয়ের জয়ের পর সেই জয়ঘোষণাও স্পষ্ট উচ্চারিত ভাবে এল ওই বাবুরই গলায়।

চাকুরে বাবুটি করুণামিশ্রিত প্রশংসার হাসি হাসিয়া বার বার বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিলেন—ইউ আর এ পোয়েট, অ্যাঁ! এ পোয়েট! ইউ আর এ পোয়েট! কথাটার অর্থ বুঝিতে না পারিয়া নিতাই বিনীত সপ্রশ্নভঙ্গীতে বাবুর দিকে চাহিয়া বলিল—আজ্ঞে? বাবু বলিলেন—তুই তো একজন কবি রে।

এবং ঔপনিবেশিক শিক্ষার যে বিকটতাটা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করি আমরা, শিক্ষাশ্রমিকরা, মাস্টারমশাইরা, সেটার একটা বিজ্ঞাপনও এখানে রয়ে গেল, সেটা খেয়াল করেছেন কি? বাবু নিতাইয়ের বোঝার স্বার্থে তার ভুল ইংরিজি বাক্যকে ঠিক অনুবাদ করে শোনালেন নিতাইকে। নিতাইকে যা বললেন সেটা ঠিক, নিতাই কবি, যা শুনে নিতাই বিমুগ্ধও হল। কিন্তু সেই ‘কবি’ শব্দের ইংরিজি তো ‘পোয়েট’ নয়। ‘কবি’ শব্দটা এখানে ‘কবিয়াল’ শব্দের সংক্ষেপ, ‘কবিগান’ ক্রিয়ার সঙ্গে যা সম্পৃক্ত। যা আধুনিক শহুরে বাংলার ‘কবি’ শব্দটায়, বা ইংরিজি ‘পোয়েট’ শব্দটায়, অন্তত তাদের চালু অর্থে কিছুতেই আসে না। ওই শব্দদুটি সংযুক্ত কবিতা বা পোয়েট্রির সঙ্গে, যা পড়া যায়, পাঠ করা যায়, এমনকি আবৃত্তিও করা যায়। কিন্তু, কবি বা পোয়েটকে একটা লড়াইয়ের ময়দানে, সংলাপের রূপারোপে, বিপক্ষের গানের বিপরীতে গান বেঁধে সেই গানে সুর দিয়ে বাজনা সহ গাইতে হয় না। সেই ক্রিয়াটার নামই কবিগান। সেই কবিতা আর আধুনিক শহুরে বাংলায় ‘কবি’ শব্দটা হল ইংরিজি ‘পোয়েট’ শব্দের বাংলা রূপ। তার মানে এখানে আদানপ্রদানটা ঘটছে তিনটে ভাষার মধ্যে, আধুনিক শহুরে বাংলা, পুরনো গ্রামীন বাংলা, এবং ইংরিজি। ইংরিজি শব্দের বাংলা রূপান্তরে ‘কবি’ শব্দটা চলে এল। একই শব্দ দুটো আলাদা ভাষায়, পুরনো গ্রামীন বাংলা এবং আধুনিক শহুরে বাংলা, দুটো আলাদা অর্থ হাজির করল। ‘পোয়েট’ বা তার অনুবাদে শহুরে বাংলায় ‘কবি’ এই শব্দে মূল অর্থটাই হারিয়ে গেল। লস্ট ইন ট্রান্সলেশনের এ এক অন্য জাতের উদাহরণ।

অথচ এই ইংরিজি শব্দে শিক্ষিত এবং ভাষায় অশিক্ষিত ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত বাবুটির হাত ধরেই আসছে নিতাইয়ের স্বীকৃতি। এবং তারাশঙ্করও তাদের জন্যেই লিখছেন যাদের মধ্যে কিছুতেই নিতাই পড়ে না। কারণ নিতাই তো ইংরিজি বর্ণমালাই জানে না। তারাশঙ্কর একাধিকবার ‘পোয়েট’ শব্দটাকে ইংরিজি বর্ণমালায় লিখছেন। বাংলা তো তারাই পড়ে যারা ইংরিজি জানে, মানে, জানে বলে ভাবে, আসলে বেশির ভাগ সময়ই জানে না। তারাশঙ্কর নিজেও তার পাঠককে আলাদা করে দিয়েছেন নিতাই থেকে, যেমন ওই বাবুটিও করেছিলেন। তিনি জানেন নিতাইরা কোনওদিনই ওই উপন্যাস পড়বে না। এটার মধ্যে কোনও নাটকীয়তাও নেই। এটা খুব জানা কথাও। এখানে একটা বড় পার্থক্য করে দেয় ফিল্ম মাধ্যমটা। সেই পার্থক্যের কথায় আমরা পরে আসছি। তার আগে এই জায়গাটা আর একবার খেয়াল করিয়ে দিই, এই দুই স্তরে দুবার নিতাইদের ত্যক্ত বহিষ্কৃত করে দেওয়ার শিক্ষা রাজনীতির প্রসঙ্গটা। এটাও নতুন কিছু নয়। মার্জিন অফ মার্জিনে আমরা আলোচনা করেছিলাম এরকম আর একটা দ্বিস্তর বর্জনের। বঙ্কিম তার কৃষ্ণচরিত্রে কৃষ্ণ তথা হিন্দু ঐতিহ্য বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বেশ কিছু জায়গায় নৈঃশব্দ্য দিয়েছিলেন। জাতিভেদ ইত্যাদি বিষয়কে আনেন নি তাঁর আলোচনায়, কারণ যে পশ্চিমী মনের পাঠকের জন্যে তিনি লিখছিলেন, তাঁর রুচিকর লাগতে নাও পারে ওই আলোচনা। এবার পার্থ চ্যাটার্জি যখন বঙ্কিমকে আনেন তাঁর সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের আলোচনায়, সেখানে তিনি বঙ্কিমের ওই নৈঃশব্দ্যকে চিহ্নিত করেন না। তার মানে জোড়া নৈঃশব্দ্য বুকে নিয়ে গড়ে ওঠে চালু সংস্কৃতিবিদ্যার কৃষ্ণ ডিসকোর্স, কৃষ্ণ বিষয়ক আলোচনা। এটাকে আমরা এনেছিলাম আমাদের এই যুক্তির সমর্থনে যে ঐতিহ্য আর আধুনিকতা কোনও আলাদা বর্গ আর নয়, তারা এ অন্যের বুকের মধ্যেই বসে আছে, ইতিমধ্যেই সদাসর্বদাই। যদি কেউ এই আলোচনাটা পড়তে আগ্রহী হন, তাহলে মার্জিন অফ মার্জিনের উল্লেখ তো আগেই করেছি, এছাড়া আমার বাংলা দুটো প্রবন্ধেও এটা পাবেন, ‘মার্জিন অফ মার্জিন: একটি অটেকনিকাল ভূমিকা’, বা ‘কলোনি যায়নি মরে আজো’। এই দুটো প্রবন্ধই পিডিএফ আকারে রাখা আছে আমার বাংলা প্রবন্ধের নেটপাতায় (http://ddts.randomink.org/bangla/index.html)। এই স্তরবিন্যস্ত নৈঃশব্দ্যকে কী ভাবে একটা ফিল্ম হিসাবে ‘কবি’ এড়িয়ে যেতে পারল, সেটার কথায় আসছি আমরা একটু পরেই।

সেই যে রেলের প্রসঙ্গ থেকে শরত্চন্দ্র আসতে শুরু করল, বারবার মাথায় এসেই যাচ্ছে এগুলো। এই বাবুর শরত্চন্দ্র সংস্করণটা মনে পড়ছে? এলএ পাশ করার পর ডেপুটি হওয়ার অপেক্ষারত নতুনদা? নতুনদা নামে যদি মনে নাও পড়ে, পাম্পশু থেকে নিশ্চয়ই পড়বে। এই বাবুটিরই নিকট কেউ হওয়ার সম্ভাবনা আছে নতুনদার। নভেম্বর বিপ্লবের বছরে শ্রীকান্ত ছাপা, তার বেশ কিছু বছর আগে ঘটেছিল নতুনদা উপাখ্যান, শ্রীকান্তর কিশোর বয়সে। ১৯০০ সালে শরত্চন্দ্রের বয়স ১৪, তার মানে ১৯০২ নাগাদ ধরে নিতে পারি নতুনদা মাঘের শীতে বরফশীতল নদীর জলে ডুব দিয়ে বসে কুকুরের হাত থেকে বেঁচেছিলেন, তখন যদি তার বয়স বাইশ-চব্বিশ ধরে নিই, তাহলে ১৯৩৮-এ তার বয়স প্রায় ষাট। তাহলে তারাশঙ্করের এই বাবুটির পিতা তিনি হতেই পারেন। এবং এই বংশধারা তো আবহমান ছিলই। শ্রীকান্তর বন্ধু ইন্দ্রর দাদা নতুনদা উপাখ্যান অন্তে একটি অনাবিল অপ্রতিরোধ্য ভাঁড়ে পর্যবসিত হয়েছিলেন, কিন্তু সে তো শরত্চন্দ্রের পোয়েটিক জাস্টিস, কাব্যিক ন্যায়বিচার, আদতে ঘটনাটা ছিল এই যে, যদি এমনকি ভাঁড় হয়েও থাকে, সেই ভাঁড়ই, সেইরকম ভাঁড়েরাই, ফিরে গিয়ে ডেপুটির চাকরি পাবে, ইন্দ্র জানিয়েছিল শ্রীকান্তকে। ডেপুটি মানে বোধহয় ডেপুটি-ম্যাজিস্ট্রেট, নিশ্চিত জানিনা। তার পরেই শরত্চন্দ্রের মন্তব্য ছিল, যতদূর মনে পড়ছে, অনেক বছর হয়ে গেল শ্রীকান্ত পড়েছি, যা সব সরকারি অফিসারদের ক্রিয়াকলাপ দেখছেন, তাতে তিনি নিশ্চিত হতে পারেন, যে নতুনদা নিশ্চয়ই ডেপুটি হয়েছিল। নতুনদা এমনকি নিজের শরীরকে ভুলে শরীরের পোষাককে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, সজ্জাকে নিয়ে, ‘কবি’ ফিল্মে দেখুন পুরো সময়টা জুড়ে কী আড়ষ্ট খাড়া হয়ে বসে থাকেন বাবুটি, তার ছড়ি পোষাক সজ্জা বসার ভঙ্গী সবকিছু দিয়েই তাকে তার চারপাশ থেকে নিজেকে পৃথক করতে হবে, হবেই। নিজেকে আলাদা বলে প্রমাণ করার এই দায়ভার নিয়ে অনেক আলোচনা আছে মার্জিন অফ মার্জিনে, বা ওই দুটো প্রবন্ধে যার উল্লেখ আগেই করলাম। এই আলাদা করার মধ্যে আছে তার নিজেকে চিনতে চাওয়া, নিজের পরিচিতি বা আইডেন্টিটিকে স্পষ্ট করা, কারণ প্রথম থেকেই এই ব্যক্তিত্বের জন্ম একটা নাকচকরণের প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে। এই বাবু সাহেব হতে চায়, যা সে পারে না, তার নিজের আয়নায় নিজের বিম্বই তাকে প্রমাণ করে দেয়, সে অসফল, তাই সে নিজের বিম্বর প্রতিই বিতৃষ্ণ। এখান থেকেই তৈরি হয় নিজের বাইরে নিজের থেকে পৃথক একটা বিম্ব নির্মাণের চেষ্টা। কিন্তু মজাটা এই যে, এই সমস্ত বিম্ব নির্মাণের ভাঁড়ামির পরও, এই বংশধারা কিন্তু প্রবাহিত হয়ে চলে। নতুনদা ডেপুটি হয়। ভাঁড়ের জন্য যথাযোগ্য ভাঁড়িনী খোঁজা হয়, তার মধ্যে ধর্ম জাত জ্যোতিষ লোকাচার থাকে, তার মধ্যে দিয়ে চলে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের সিলেক্টিভ ব্রিডিং, তৈরি হয় ছানাভাঁড়, সে আসে কবি দেখতে, এসে নিতাইকে পোয়েট বলে ডাকে।

দেবাশিসকে ‘কবি’ দেখাতে গিয়ে বলেছিলাম, ওই দৃশ্যে এসে, ওই দেখ তোর পূর্বপুরুষ। ওকে বংশলতিকাটা দেখিয়ে দিয়েছিলাম, ওই বাবুটির ছানা পরে কভেনান্টেড অফিসার হবে, তার ছানা হবে কর্পোরেট সেক্টর, তার ছানাদের কেউ কেউ যাবে আইটি-তে, দেবাশিস যেখানে কাজ করে। দেবাশিস মোটেই গায়ে লাগায়নি কথাটা, আমার ছেলে যেমন বলত তার ছোটবেলায়, মেয়েও বলে এখন, বাবা তুমি ভীষণ আজেবাজে কথা বলো, সেটা দেবাশিসও জানে। তখন ওর অভিজ্ঞতা থেকেই দেখিয়েছিলাম, ও ভারতের আইটি সেক্টরের সবচেয়ে নামকিন প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করে, সেখানের অভিজ্ঞতাই, একজন কম্পুটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়র হয়ে ওর কাজ হল সারাদিন বসে থাকা, আর একটা কল-সেন্টার চালানো। বিদেশ থেকে ফোন আসবে, তাকে জানিয়ে যেতে হবে হ্যাঁ, বিদেশে তৈরি বিদেশ থেকেই চালানো ওই সফটওয়ারগুলি ঠিকঠাকই চলছে। এবং সবচেয়ে রোমহর্ষক এবং বিপদসঙ্কুল (বাংলায় যাকে আমরা চ্যালেঞ্জিং বলি) কাজ হল মাঝে মাঝে কাজ করতে থাকা শেল-স্ক্রিপ্টের ডাম্প নেওয়া, এবং সেগুলি থেকে দেখে নেওয়া ফলাফল যেমন কাঙ্খিত তেমন আসছে কিনা। এবং এই ডাম্পটা ও ঠিকঠাক নিতে পারে বলেই নাকি ওর অনেক সহকর্মী ওর দিকে মুগ্ধ চোখে তাকায়। এই হল কম্পুটার শিক্ষা ও কম্পুটার এনজিনিয়ারিং এর ভারতীয় ক্ষেত্রের একটি উচ্চতম নমুনা। কল সেন্টারের সাইবারকুলি ও সাইবারমজুর হওয়ার জন্যে যা দরকার ওদের ইন্টারভিউয়ে ঠিক সেইসব প্রশ্নই করা হয়, যোগ বিয়োগ ঠিক পারে কিনা, ইংরিজিতে প্রশ্ন করলে বোঝে কিনা, ইত্যাদি। চাকুরিক্ষেত্রে উন্নতির জন্য সেখানে কোনও কম্পিউটার সম্পৃক্ততা নয়, প্রয়োজন পড়ে গলার জাঙ্গিয়া (কোনও অসভ্যতা করছি না, ওটা ইংরিজি টাইয়ের হিন্দুস্থানী ‘কন্ঠো কে লঙ্গোট’ শব্দবন্ধের বাংলা) ব্যবহারের নিখুঁত অভ্যাস। অর্থাত্‍, সেই ভাঁড়ামো সমানে চলিতেছে। এবং সিলেক্টিভ ব্রিডিং-ও। ওর জন্যে পাত্রী দেখে উচ্চঘর কন্যাপক্ষ থেকে আমি দুই পয়সা কামাতেও পারি, বড় দরকার আমার, দুই দশক হতে চলল আমার কোনও প্রোমোশন হয়নি। আইটি সেকটরের সাইবারকুলিগিরি সংক্রান্ত এই ভাঁড়ামোটা বেশ ভাল করে এসেছে আমার শেষ বইয়ে। কম্পুটার ও নেটওয়র্ক এসে যাওয়া মাত্র, পুঁজি পেল অনন্ত গতিশীলতা, শ্রম পেল অনড় স্থবিরতা, এবং বদলে গেল গোটা শ্রম-সম্পর্কের কাঠামোটাই, তার সাপেক্ষে ভারতের আইটি সেক্টরের এই কল সেন্টার চরিত্রকে নিয়ে আমার কাটাছেঁড়াটা নিয়ে কেউ যদি আগ্রহী হন, সেটা পাবেন ‘ফ্লস ও হেজেমনি’ বইয়ে (http://ddts.randomink.org/flossbook/index.html) এবং বিশেষ করে তার সপ্তম অধ্যায়ে। যাকগে, আবার মূল জায়গায় ফেরত যাওয়া যাক। আর বাজে বকা নিয়ে নালিশ করার কিছু নেই, আগেই বলেছি, আমি তৃতীয় প্রজন্মের মাস্টার।

93
00:09:56,800 –> 00:10:00,090
((Disapproval – Balohari Haribol[21]))
Silence, silence, order, order.[22]

সাবটাইটলের এসআরটি ফাইলের গোড়াতেই বলে দেওয়া ছিল, দুই ব্রাকেটের মধ্যে, (()), দেওয়া আছে পরিপ্রেক্ষিত সংক্রান্ত মন্তব্য, যেমন লোটনদাস কবিয়ালের না-আসার সংবাদে তৈরি হওয়া বিরক্তির রব “বলহরি হরিবোল”, যা আবার শবযাত্রার স্লোগানও বটে। তারাশঙ্করের ভাষায়, “অর্থাত্‍ মেলাটির শবযাত্রা ঘোষণা করিয়া দিল।” কিন্তু উপন্যাসে ছিল এই সংক্রান্ত আর একটা মজার উপাদান। ঝুমুর গানের আসরে, যে ঝুমুর হল কবিগানেরই আরও অনেক প্রাকৃত, ‘অশ্লীল’ একটি সংস্করণ, “হরিবোল” ছিল প্রশংসাও।

পয়সা-আনি-দুয়ানি-সিকি-আধুলিতে প্যালার থালাটা ততক্ষণে একেবারে ভরিয়া উঠিয়াছে, গোটা টাকাও পড়িয়াছে দুই-তিনটা। গান শেষ হইতেই শ্রোতারা হরিবোল দিয়া উঠিল—হরি হরি বল ভাই। বিচিত্র, ইহাই উহাদের সাধুবাদ!

ঝুমুরের মধ্যেই গোড়া থেকেই এই বিকৃতি বা সাবভারশনটা আছে। চালু সমাজ ডিসকোর্সের শোকবার্তাটা এখানে একটা সাধুবাদ। তারাশঙ্কর উপন্যাসে ঝুমুরের একটা আলগা সংজ্ঞা দিয়েছেন। এবং সেই বিবৃতির মধ্যেও থাকে লেখকের সেই বিষয়ী-সংস্থান যা ঝুমুর বলে জিনিসটাকে চেনে, কিন্তু কোনও মতেই তার অংশ নয়, তাকে সমর্থনও করে না।

বহু পূর্বকালে ঝুমুর অন্য জিনিস ছিল, কিন্তু এখন নিম্নশ্রেণীর বেশ্যা গায়িকা এবং কয়েকজন যন্ত্রী লইয়াই ঝুমুরের দল। আজ এখান, কাল সেখান করিয়া ঘুরিয়া বেড়ায়, গাছতলায় আস্তানা পাতে, কেহ বায়না না করিলেও সন্ধ্যার পর পথের ধারে নিজেরাই আসর পাতিয়া গান-বাজনা আরম্ভ করিয়া দেয়। মেয়েরা নাচে, গায়—অশ্লীল গান। ভনভনে মাছির মত এ রসের রসিকরা আসিয়া জমিয়া যায়।

অথচ, এই ঝুমুর দলের বেশ্যা বসনই, উপন্যাসের শিল্পের টানে, জীবনের ঘটনার মোচড়ের অভিজ্ঞতাতেই হয়ত, হয়ে দাঁড়ায় উপন্যাসের মূল একটি চরিত্র। শিল্প তার নিজের জোরেই, প্রতিটি ক্ষেত্রেই, শিল্পীকে অতিক্রম করে যায়। যাই হোক, চলে আসা যাক ফিল্মের এই জায়গার অন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটার বিষয়ে।

সাইলেন্স, সাইলেন্স। অর্ডার, অর্ডার।

উঠে দাঁড়িয়ে বলে ওঠার আগের মুহূর্তটি পর্যন্ত আড়ষ্ট ভাবে বসে ডানে বাঁয়ে কলের পুতুলের মত মাথা-নাড়ছিলেন। এবং যে যখন কথা বলছে তখন তার দিকে তাকাচ্ছিলেন। ওইটুকু দূরত্বে দৃষ্টিকোণ বদলাতে বোধহয় অতটা ঘাড় বেঁকানোর দরকার পড়ে না, শুধু চোখ নড়িয়েই দৃশ্যবস্তুর বদলকে ধরা যায়, কিন্তু তাহলে নাড়াচ্ছিলেন কেন? চারপাশটার সঙ্গে তার অনভ্যস্ততার দূরত্বটাকে প্রকট করতে? এবার বাবুটি উঠে দাঁড়ালেন এবং বিচারপতির হাতুড়ির মত করে, বোধহয়, হাতের ছড়িটিকে নাড়াতে নাড়াতে বললেন তার কথাটি। সেই কথাটি যা নিতাইরা বোঝে না। বোঝার দরকারও পড়ে না নিতাইদের। খুব প্রয়োজন পড়লে তারা জিগেশ করে নেন, এবং বাবুরা তখন ভুল অনুবাদ করে সেটা শুনিয়ে দেন। পুরো দৃশ্যটা জুড়ে, সেই মহাদেব কবিয়ালের তানানানা থেকে শুরু করে, বাবুটির ভাঁড়ামোকে দেবকী বসু পুরো একটা চিত্রগত গঠনে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর গোটা আচরণটাকে পর্যবসিত করেছেন কিছু ভঙ্গীতে, যা শ্রবণে এবং দৃষ্টিতে অনুভব করে নেওয়া যায়, তাতেই তার অর্থটা বোধগম্য হয়ে যায়, ভাষার যেখানে আর প্রয়োজন পড়ে না। মাথায় ভেবে দেখুন, বাবুটির গোটা ক্রিয়াটি কিছু ধ্বনি ও চিত্রে বোধযোগ্য, সেটা ভাষার অতীত, তিনি যে ভাষাতেই চেঁচান না কেন, ‘সাইলেন্স’ না বলে ‘সিঁলস’ বা ‘খামোশ’ বা ‘সিলেনজিও’ বলে চেঁচাতেন, ওই ভঙ্গীগুলো একই রেখে, তাহলেও গোটা বিষয়টা থাকত একই।

==========অংশ ৪ শেষ===================

Filed under: ফিল্ম — dd @ 10:15 am

Powered by WordPress