নেটখাতা

February 22, 2011

দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৬

[গুরুচণ্ডালী সাইটে এই লেখাটা প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু ওদের ইউনিকোড থেকে বাংলাপ্লেন কনভার্টারে সমস্যা থাকায় ফরম্যাটিং ঘেঁটে যাচ্ছে। তাই এখানে ওই প্রতিটা অংশ, যেমন যেমন গুরুচণ্ডালীতে প্রকাশ হচ্ছে, সঠিক ইউনিকোড অবয়বে আমি দিয়ে যাব। এটা তার ষষ্ঠ অংশ। এই ব্লগেরই পুরনো লেখায় পাবেন এর প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ আর পঞ্চম অংশ।]

==========অংশ ৬ শুরু===================

161
00:16:16,850 –> 00:16:19,500
Pointsman – go to your place.

পয়েন্টসম্যান, যাও নিজের জায়গায়।

আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক সামাজিক সমস্ত রকমে পরিবর্তমান বাস্তবতার একটা চিত্র ‘কবি’ চলচ্চিত্র, ‘কবি’ উপন্যাস থেকে আরও অনেক বেশি যুগোপযোগী রকমে, যেখানে রাজনের জাতিগত পরিচিতি ‘মুচি’ আমরা আগেই স্টেশনমাস্টারের কাছ থেকেই শুনেছি। তাই স্টেশনমাস্টার ভালই অবগত আছেন সেটা, কিন্তু তাকে ছাপিয়ে উঠছে এই পেশাগত পরিচিতি। এই পেশাগত পরিচিতি এসেছে আধুনিকতার শরীর বেয়ে, রেলতন্ত্রের একটি উপাদান এই পরিচিতি, ঐতিহ্যগত পরিচিতিকে যা ছাপিয়ে যাচ্ছে। কারণ ক্ষমতার প্রকরণের শরীরেও ছায়া ফেলছে এই আধুনিকতা। স্টেশনমাস্টার জানেন, রেলতন্ত্রের অভ্যন্তরে রেলতন্ত্রের নিজস্ব ক্রমবদ্ধতার, হায়েরার্কির ভিতর থেকে আসা আদেশই সবচেয়ে বেশি ক্রিয়াশীল, যা ঐতিহ্যের সামাজিক আদেশের চেয়ে ইতিমধ্যেই বেশি সক্রিয়। যদি খ্যাপাটে রাজনকে চুপ করিয়ে বসাতেই হয়, শান্ত করতেই হয়, তাহলে রেলতন্ত্রের অভ্যস্ত আদেশই, যেখানে উচ্চতর স্টেশনমাস্টারের আদেশ পয়েন্টসম্যানকে মানতেই হয়, কাজ করবে, এটা ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন স্টেশনমাস্টার।

167
00:16:53,500 –> 00:16:59,400
_Coming from such a caste,_
_You want to sing kabi?_
168
00:16:59,600 –> 00:17:02,400
Boy, want to be a kabi?
169
00:17:03,500 –> 00:17:05,800
_Coming from such a caste,_
_You want to sing kabi?_
170
00:17:06,300 –> 00:17:10,100
_Like legendary Ratnakar_[34]
_A carp in a prawn’s womb._

ওরে সেই বংশের ছেলে ব্যাটা,
কবি গাইবি তুই।

কী রে ব্যাটা, কবি গাইবি, অ্যাঁ?

ওরে সেই বংশের ছেলে ব্যাটা,
কবি গাইবি তুই।
ব্যাটা ডোমের ছেলে রত্নাকর,
চিংড়ির পোনা রুই।

যতদূর সম্ভব তারাশঙ্করের শ্রেষ্ঠ কাজ, ‘গণদেবতা’-‘পঞ্চগ্রাম’-এও বোধহয় ছিল না জাতপাতের রাজনীতির এত তীব্র এবং কুত্‍‍‍সিত প্রকাশ, যা এই কবিগানে দেখি আমরা। একদম সেই সম্ভাব্য বিস্ফোরণটাকে, জাতপাতের ক্রমবদ্ধতার আবহমান সমাজে যা ঘটতে যাচ্ছে। এবং এই প্রকাশের বিশেষতাটা কোথায়, কোথায় একটা সম্পূর্ণ নিজস্ব চেহারা এটা পেয়ে গেল ‘কবি’ চলচ্চিত্রে সেই প্রসঙ্গটা বুঝতে আমাদের ১ মিনিট ২০ সেকেন্ড পিছিয়ে ১৫ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে যেতে হবে, যেখানে রাজা উঠে পড়ছে, এবং তাকে নিরস্ত করছে স্টেশনমাস্টার।

155
00:15:50,600 –> 00:15:56,400
See, how mean and abusive -
See how vulgar his dance is.

বাবুমশাই, বাবুমশাই, দেখুন, দেখুন, ব্যাটা কিরকম অন্যায্য গালাগাল দিচ্ছে দেখুন। আবার, আবার দেখুন, কিরকম করে নাচছে।

খেয়াল করুন, চলচ্চিত্র মাধ্যমের বাড়তি জোরের জায়গাটা, এবং কবিয়ালের সঙ্গে তার উপাদানের একদেশতার বাড়তি জোর যেটা দেবকী বসু পেয়ে গিয়েছিলেন, যা তারাশঙ্কর পাননি। রাজন যখন বাবুমশাইকে দেখায় যা সে দেখাতে চাইছে, একই সঙ্গে সে সেটা আমাদেরও দেখায়, আমরাও দেখি সেই একই জিনিস কবিগানের আসর যা দেখছে। প্রদর্শন এবং প্রদর্শনী এক হয়। তারাশঙ্কর যখন দেবু ঘোষ ও ছিরু পালের লড়াই, রক্তাক্ততাকেও বিবৃত করেন, সেটা থাকে বিবরণ, ‘গণদেবতা’ উপন্যাসে যেমন, কিন্তু এখানে আমরা সেটা সরাসরি দেখছি। যখন বলেছিলাম এই ‘কবি’ চলচ্চিত্রের পড়ে পাওয়া আঠারো আনার কথা, এটার কথাই বলেছিলাম আমরা। এবং চলচ্চিত্র মাধ্যমের নিজস্ব কায়দায় এর পরের অংশটা একটা বাড়তি গুরুত্বও পেয়ে যায়। রাজন উঠে এই কথা জানানোর পরে, আমরাও বাবুমশাইয়ের সঙ্গে একই ভাবে খেয়াল করতে থাকি মহাদেব কবিয়ালের জাতিগত আক্রমণের অন্যায্য কদর্যতার কথা, এর পরের ১ মিনিট ২০ সেকেন্ড জুড়ে কবিগানের যে আক্রমণটাকে প্রত্যক্ষ করি আমরা, ঠিক এর আগেই যে অংশটা আমরা উদ্ধৃত করলাম চলচ্চিত্র থেকে।

দাঁড়ান, ‘কবি’ নিয়ে আলোচনায় আর এগোনোর আগে, ব্যক্তিগত একটা প্রসঙ্গ ফয়সালা করে নেওয়া যাক, সেই ব্যাটা অনিন্দ্যর সঙ্গে, যার তৈরি করা বেদনা থেকে এই লেখাটাই আর লিখব না ঠিক করেছিলাম। এইমাত্র, ঠিক এর আগের প্যারাগ্রাফের আলোচনাটুকুতে আমরা এমন কিছু একটা করলাম যা পনেরো বছর আগে সত্য অর্থেই অসম্ভব ছিল। অনিন্দ্য ইত্যাদি সব অর্বাচীন ছেলেপুলেরা বারবার প্রমাণ করে চেষ্টা করে, এবারেও ফিল্ম ফেস্টিভালের টিকিট দিয়ে প্রলুব্ধ এবং বিপথগামী করার চেষ্টা করেছিল। যুক্তি ছিল এই যে, কম্পিউটারে দেখে কী সেই অনুভূতিটা আদৌ আসে যা বড় পর্দায় আসে? আমি জানিনা সেই গুষ্টির পিন্ডির অনুভূতিটা কী, কিন্তু এটুকু বুঝি যে সত্যকারের ফিল্ম দেখা এবং ফিল্ম পড়ার সূত্রপাত হয়েছে কম্পিউটার আসার পরেই। যেমন গতকালই আমি একটা ফিল্ম দেখলাম, জন জস্টের ‘দি বেড ইউ স্লিপ ইন’, ১৯৯৩-এর ছবি। জানিনা দেখার কিছুদিন পরে উত্তেজনাটা কতটা থাকবে, কতদিন থাকবে, কারণ একটা শিল্প সত্যিই কত বড় শিল্প (এই, আমি কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি না আর্টের কথা বলছি) সেটা বোঝা যায় ওটা থেকেই। দেখার কত বছর পরেও সেটা মাথায় ফিরে ফিরে আসতেই থাকবে। সেই ব্যাপারটা তাই এখনই বলতে পারছি না, সদ্য গত কালই দেখেছি, কিন্তু দেখা মাত্র যে প্রাথমিক উত্তেজনাটা হয়েছে সেটা বোধহয় বার্গম্যানের ‘অটাম সোনাটা’ বা কুব্রিকের ‘ব্যারি লিন্ডন’ থেকে একটুও কম নয়। এই ফিল্মটা এবারের ফেস্টিভালেও দেখিয়েছে, এটা এবং দেবকী বসুর ‘বিদ্যাপতি’ এই দুটো দিয়ে আমায় লোভ দেখাচ্ছিল। এবং ‘দি বেড ইউ স্লিপ ইন’ চলচ্চিত্রটায় এত এত ফ্রেম ও দৃশ্য আছে যা এত বেশি অপ্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম রকমে উত্পন্ন, যে বহু জায়গায় থামিয়ে থামিয়ে, ফিরে দেখে দেখে ছাড়া ঠিক করে বোঝাই যায় না। এই আলোচনায় যেমন দেখুন, মহাদেব কবিয়ালে উঁচু জাতের মতাদর্শ ও শাসনকে ‘কবি’ চলচ্চিত্রে বাড়তি রকমে নির্দিষ্ট ও চিহ্নিত করে দেওয়াটা খেয়ালই করা যেত না, যদি আমরা মিনিট দেড়েক পিছিয়ে না যেতাম। এই দেখা, চলচ্চিত্রের এই পড়া, পাঠ, অধ্যয়ন ব্যাপারটাই বোধহয় সম্ভব ছিল না কম্পিউটারে সিনেমা দেখার আগে। আমি একটা সফটওয়ারের ফিল্ম দেখছি, দেখতে দেখতে আর একটায় লিখছি, সেই করতে করতেই আর একটায় নেটে খুঁজে দেখছি, যেমন করে ওই মেসোপটেমিয়া যুদ্ধের ছবিটা পেলাম। একই স্ক্রিনে পাশাপাশি আমি ‘কবি’ চলচ্চিত্রটা দেখছি, আর কবি উপন্যাসের স্ক্যানটা পড়ছি (আমার কিন্তু আদৌ তা নয়, আমার ‘কবি’ একদম ঝুরো পাঁপড়ভাজা হয়ে গেছে, মানুকে কিনে দেওয়ার আর্জি জানাতেই ও বলল, এ মাসে আর বই কেনা যাবে না, আর কিনে কী হবে, এই লেখাটা শেষ হওয়ার পর কত বছর বাদে ফের লাগবে তার কোনও ঠিক আছে, তখনই কিনো), এইটাই শেষ অব্দি জ্ঞানের সেই উন্মুক্ততাকে খুলে দিল। ভাবুন তো কত বছর হয়ে গেল রবীন্দ্রনাথ স্বপ্ন দেখে গেছিলেন ইন্টারনেটে এবং ওপনসোর্সে জানা ও খুঁজে দেখার এই উন্মুক্ততার কথা — জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর আপন প্রাঙ্গনতলে দিবসশর্বরী, বসুধারে রাখে নাই খণ্ডক্ষুদ্র করি। মোদ্দা কথাটা এই, আমার ইমেল আইডি আছে, যদি আপনি আমার পক্ষে হন, এবং অনিন্দ্যর বিপক্ষে, আমায় একটা মেল পাঠাবেন, আমি সেটা ওকে ফরওয়ার্ড করে দেব। আর যদি আমার বিপক্ষে হন, তাহলে আর অত পরিশ্রম করে মেল করে কী হবে?

চলচ্চিত্র ‘কবি’ যে জাতপাতের সংঘাতের জায়গাটাকে নাটকীয় এবং উচ্চারিততর করে তুলল শুধু সেটুকুতেই পরিবর্তমান সময়ের, এবং উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্রের মধ্যে পেরিয়ে যাওয়া সময়টুকুর ছাপ আছে তাই নয়, আছে গোটা কবিগানের আসরের ফলাফলেও। সংঘাতের ফলাফল কী দাঁড়াচ্ছে তাতে ‘কবি’ উপন্যাসের বিবরণ ছিল একেবারেই পৃথক।

লোকের কিন্তু তখন এ বিনীত মিষ্ট রস উপভোগ করিবার মত অবস্থা নয়। মহাদেব গালিগালাজের মত্তরসে আসরকে মাতাল করিয়া দিয়া গিয়াছে, এবং মহাদেবের তুলনায় নিতাই সত্যই নিষ্প্রভ। সুতরাং তাহার হার হইল। তাহাতে অবশ্য নিতাইয়ের কোনও গ্লানি ছিল না। বরং অকস্মাত্‍ সে নিজেকে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বলিয়াই অনুভব করিল।

উপন্যাস থেকে চলচ্চিত্রে এই শেষ বদলটার একটা কারণ হতে পারে দৈর্ঘজনিতও। ঠিক এইরকম একটা বদল একটু বাদেই আমরা দেখব, নিতাই যেখানে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যে সে আর কুলিগিরি করবে না। সেখানে চলচ্চিত্রের শরীরে একটা সমস্যা তৈরি হয়েছে বলেই আমার মনে হয়েছে। সেই কথায় আসছি একটু বাদে। তবে কবিগানের ফলাফলের নিরিখে উপরের বদলটা তারাশঙ্করের সঙ্গে দেবকী বসুর সমাজ বাস্তবতার বিচারের পার্থক্যের কারণেও হয়ে থাকতে পারে। তবে ফলাফলের ব্যাপারটা যাই হোক, জাতপাতের সংঘাতটা নাটকীয়তর হয়ে ওঠার মধ্যে অন্য একটা উপাদান আছেই, সেটা হল উপন্যাস আর চলচ্চিত্রের গঠনগত পার্থক্য। উপন্যাসের লেখক অনেকটা জায়গা পান, নিজের কথা বলে নেওয়ার। যেমনটা বলেছিলেন তারাশঙ্কর, ‘কবি’ উপন্যাসের একদম শুরুর বাক্য থেকেই বারবার দেখেছি আমরা। চলচ্চিত্র ঘটে বাস্তব সময়ে, ঠিক যতটুকু বাস্তব ঘটনা সে দেখাচ্ছে, সেটুকুই তার সুযোগ এই বিষয়ে বিচারের। কিন্তু সেই জায়গাটুকু যে অত্যন্ত সঠিক ভাবে ব্যবহার করেছিলেন দেবকী বসু, তাই নিয়ে কোনও প্রশ্নই নেই। উপন্যাসে যা ছিল অনেক বিস্তৃত পরিসরে, অনেকটা উপ্ত অবস্থায়, তাকে একটা স্পষ্ট নাটকীয় উচ্চারিত আকার দিয়েছিলেন দেবকী বসু সফল ভাবে। উপন্যাসের প্রথম বাক্যের “রীতিমত এক সংঘটন” মন্তব্যের মধ্যে নিহিত অবস্থানকে কবিগানের আসরের নাটকে পুরোপুরি অনুবাদ করতে পেরেছিলেন চলচ্চিত্রকার।

193
00:18:57,450 –> 00:19:01,250
No. Going away from kabi[36]
Violates the Mother’s temple.
194
00:19:01,450 –> 00:19:05,650
Violating the caste is nothing -
Remember it on your way home.

না, শান্তিদা। কবি গাইতে এসে উঠে গেলে মায়ের স্থানের অপমান করা হবে।

বটে? আর বাপদাদার বেইজ্জতটা কিছু না? আচ্ছা, গান ভাঙলে বাড়ি আসিস।

এইটা আর একটা ভারি আকর্ষণীয় জায়গা। যেহেতু চলচ্চিত্রকার দেবকী বসু আর উপন্যাসকার তারাশঙ্কর, তাই এই উপাদানটার অথর বা সৃষ্টিকর্তা ঠিক যেই হোন, উপাদানটি যে অত্যন্ত মোক্ষম তাতে কোনও সন্দেহই নেই। উঁচুজাতের নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিচুজাতের ব্যক্তি নিতাইয়ের যুদ্ধটা যে প্রথম থেকেই একটা দ্বিধায় আক্রান্ত সেটা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। তাকে জয়ী হতে গেলে উঁচুজাতের ব্যাকরণে উঁচুজাতের মত করেই উঁচুজাতের যুদ্ধটা করতে হবে। সেই দ্বিধাটাই এখানে এসে একটা স্পষ্টতা পাচ্ছে অন্য একটা আকারে। হরিশ মুখোপাধ্যায়ের ইংরাজ বিরোধিতা মূর্ত হয়ে উঠল শুধু সংবাদপত্র পড়ে পড়ে তার দক্ষ ইংরিজি লেখক হয়ে ওঠায়, বা মধুসূদনের ইংরেজ কবিদের চেয়েও বড় কবি হতে চাওয়া ইংরিজি ভাষাতেই লিখে — তারই যেন আর একটা চেহারা আমরা দেখতে পাচ্ছি এখানে। এই স্পষ্টতা টেনে আনে আর একটা মহাকাব্যিক তুলনাও। হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের অনুবাদে রামায়ণের উত্তরকাণ্ডে চতুঃসপ্ততিতম সর্গে, এক ব্রাহ্মণের অসময়ে অকালমৃত পুত্রের মৃত্যু কোন পাপে ঘটল তার ব্যাখ্যায় নারদ বললেন।

সত্য, ত্রেতা ও দ্বাপর এই তিন যুগে তপস্যা ক্রমাণ্বয়ে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এই তিন বর্ণকেই আশ্রয় করিয়াছিল। কিন্তু এই তিন যুগে শূদ্রের তাহাতে অধিকার হয় নাই। এই নীচ বর্ণ ভবিষ্যতে ঘোরতর তপস্যা করিবে। কলিযুগই তাহার প্রকৃত সময়। শূদ্রজাতির দ্বাপরে তপস্যা করা অতিশয় অধর্ম। সেই শূদ্র আজ নির্বুদ্ধিতাবশতঃ তোমার অধিকারে তপস্যা করিতেছে। সেই জন্য এই বিপ্রবালক অকালে কালগ্রাসে পতিত হইয়াছে।

রাজা রাম তখন এর নিরসনে গেলেন পঞ্চসপ্ততিতম সর্গে। কোথায় ঘটছে এই শূদ্রের তপস্যা তার তদন্তে গিয়ে রাম শেষ অব্দি খুঁজে পেলেন।

দেখিলেন শৈবল পর্বতের উত্তর পার্শ্বে একটি সুপ্রশস্ত সরোবরের তীরে কোন এক তাপস বৃক্ষে লম্বমান হইয়া আছেন এবং তিনি অধোমুখে অতিকঠোর তপস্যা করিতেছেন। তদ্দৃষ্টে রাম তাঁহার সন্নিহিত হইয়া জিজ্ঞাসিলেন, তাপস! তুমি ধন্য, বল, কোন্ যোনিতে জন্মিয়াছ।

ষট্সপ্ততিতম সর্গে আমরা পাই কাহিনীর শেষটুকু।

তাপস কহিল, রাজন্! আমি শূদ্রযোনিতে জন্মিয়াছি। এইরূপ কঠোর তপস্যা দ্বারা সশরীরে দেবত্বলাভ করা আমার ইচ্ছা। যখন আমার দেবত্বলাভের ইচ্ছা তখন নিশ্চয় জানিও মিথ্যা কহিতেছি না। আমি শূদ্রজাতি, আমার নাম শম্বুক। তাপস এইরূপ কহিবামাত্র রাম দিব্যদর্শন খড়্গ নিষ্কোষিত করিয়া তাহার শিরশ্ছেদন করিলেন। শূদ্র শম্বুক নিহত হইলে সুরগণ বারংবার রামকে সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। বায়ুসহযোগে সুগন্ধি পুষ্প চতুর্দিকে বর্ষিত হইতে লাগিল।

হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের বিবরণে একটা মজার জিনিস খেয়াল করুন। তাপসের ঝোলার বিষয়ে ব্যবহৃত হয়েছে সম্মানবাচক ক্রিয়াপদ ‘আছেন’ এবং সর্বনাম ‘তাঁহার’, কিন্তু রাম যখন শম্বুকের মুন্ডু কাটছে তখন শম্বুককে উল্লেখ করা হয়েছে ‘তাহার’ এই সর্বনাম দিয়ে, ‘তাঁহার’ নয়। রামায়ণের সংস্কৃত তো চাইলেও দাঁত ফোটাতে পারব বলে মনে হয় না, নইলে দেখতাম, এর কতটুকু হেমচন্দ্রের আর কতটুকু বাল্মীকি উবাচ। ঠিক এই জাতীয় একটা অপরাধবোধ মোচন, তাপসের সম্মান থেকে তাকে জড়বস্তুর জড়তায় নিয়ে আসার একদম সমগোত্রীয়, পেয়েছিলাম চে গুয়েভারার ‘রেমিনিসেন্সেস অফ দি কিউবান রেভলিউশনারি ওয়র’ বইয়ে। বৌদ্ধবাচনের ‘ওরা-আমরা’ রূপকল্প ব্যবহার করে বলা যায়, যখনই ‘ওরা’ মারে, তখনই সেটা ‘মার্ডার’ বা ‘কিল’, আর যখনই মারছে ‘আমরা’, তখনই সেটা ‘একজিকিউট’ বা ‘পানিশ’। যাকগে, মূল প্রসঙ্গে ফেরত আসা যাক। রামায়ণ এখানে নির্বাক, শম্বুকের স্বজাতীয়রা ঠিক কিভাবে নিয়েছিল এই নিধন, তাদের শ্রেণীসচেতনতার নিরিখে তারাও ওই সাধুবাদ আর সুগন্ধি পুষ্পে অংশ নিয়েছিল কিনা। আমাদের ঔপনিবেশিক ইতিহাসে বহু উপাদান আছে যেখান থেকে শম্বুক ও তার স্বজাতীয়দের মধ্যেকার সম্পর্কের জটিলতাকে আমরা খুঁজতে পারি, সেটা অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু এখানে উল্লেখ্য এটাই যে, ‘কবি’ উপন্যাস বা চলচ্চিত্র দুয়েরই এটা একটা জোরের জায়গা যে এই উপাদানটা সেখানে বিস্মৃত হয় না। এবং, কবিগানের আসরে, যেখানে এটা ঘটছে, সেখানে যে জয়টা একটু বাদেই ঘটবে নিতাইয়ের, সেটা এখনও ঘটেনি। নিতাই সম্মান পেয়ে ফিরে আসার পরে তার স্বজাতীয়দের তার প্রতি কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তার উল্লেখ উপন্যাসেও নেই।

==========অংশ ৬ শেষ===================

Filed under: ফিল্ম — dd @ 5:41 pm

Powered by WordPress