নেটখাতা

January 7, 2010

মাইকনির্ভর শ্রেণীসংগ্রামে বিজয়ী বাম

জানিনা, বোধহয়, ওইসব চিঠিটিঠির পর, আগেকার ব্লগে আছে, তৃণমূলের সবুজ মাইক মধ্যমগ্রামে অনেকটাই এখন শান্ত। কিন্তু বিপ্লবী দাপট যদি দেখতে চান মাইকের তো মধ্যমগ্রামে আসুন।

কদিন ধরে চলল একটি গনতরফ্রন্ট মাস, মানে এমএএসএস, মধ্যমগ্রাম অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশাল সার্ভিসের মাইক। তারা আবার অপসংস্কৃতি করে না, ভারি গণসংস্কৃতি শোনায়, মাসের ব্যাপার  তো। কিন্তু মাইকটা চলেই। এই গনতরফ্রন্টের ধারণাটা প্রথম এসেছিল এই ব্লগেই ২০০৭ সালের শেষ ব্লগে, ২০০৭ শেষ, ফেডোরা ৮, সিপিএম, এবং আমাদের পিতৃশ্রাদ্ধ। সেখানে ছিল সিপিএমের গণফ্রন্ট ডিওয়াইএফআই, এবং তার গণতরফ্রন্ট দেবীগড় সাংস্কৃতিক চক্রের কথা। গণতরফ্রন্টের সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে, কখনও চক্র, কখনও মাস। তবে মাস গণতরফ্রন্ট হিসাবে অনেক নরমপন্থী, রাত দশটার পরে লোককে ঘুমোতে বা কথা বলতে বা লেখাপড়া করতে দেয় বটে।

গত দুদিন ধরে সরাসরি যে সিপিএম ভাঁড়ামিটা দেখছি সেটা এমনকি আমাকেও বেশ অবাক করে দিয়েছে। মফস্বল এলাকায়, এই বেলঘরিয়া সোদপুর মধ্যমগ্রাম ইত্যাদি এলাকায় দেখেছি, নানা বিজ্ঞাপনের ক্যাসেট চলে, মানে আগে ক্যাসেট চলত, আজকাল নিশ্চয়ই সিডি চলে। কোনও গেঞ্জি জাঙিয়ার দোকান খুলছে, কি কোনও নতুন মলম, ইত্যাদির জন্যে। ভারি অতিকৃত রোমান্টিক গলায়, ভাসিয়ে ভাসিয়ে, একটি মেয়ে একবার কিছু বলে, আবার একটি ছেলে, মধ্যে মধ্যে জুড়ে দেওয়া থাকে গানের লাইন, ধরুন কোনও রবীন্দ্রসঙ্গীত, বা জীবনমুখী, যা আপনাকে ওই গেঞ্জি জাঙিয়ায় বা মলমে উৎসাহিত করবে। বারবার নানা ছলে, কখনও কথোপকথন, কখনও নাটকীয়তা, ওই ব্রান্ডনাম বা দোকাননামটা উল্লিখিত হতে থাকে।

গত কদিন ধরে এইটা চলছে, করছে সরাসরি সিপিএম উত্তর ২৪ পরগনা জেলা কমিটি। আমাদের ঘুম ভাঙছে এবং ঘুমোতে যাচ্ছি আমরা এই শেষহীন লয়হীন ঘোষণার মধ্যে। এবং হুবহু ওই বিজ্ঞাপনের ক্যাসেটের গলা, ভঙ্গী ও ভাষা।

তারা সারাদিন ধরে জানিয়ে চলেছে, হুবহু ওই গেঞ্জি-রোমান্টিক রকমে, আজ রাজ্য জুড়ে যে অরাজকতার আগুন, তার সলতে পাকানো শুরু হয়েছে অনেকদিন আগে … কখনও জানাচ্ছে, কিন্তু প্রতিরোধ শুরু হয়ে গেছে, লাখো মানুষের প্রতিরোধ … সঙ্গে সঙ্গে গান শুরু হয়ে যাচ্ছে ‘আহ্বান, শুনি আহ্বান, আসে মাঠ ঘাট বন পেরিয়ে’, দুলাইনের পর আবার ফেরত আসছে লাখো মানুষের প্রতিরোধ, কখনও কাব্যিকরা পুরুষের গলায়, কখনো ন্যাকা নারীর গলায়।প্রতি বাক্যের শেষেই ফিরে আসছে একটা ব্রান্ড নাম, ব্রান্ড বুদ্ধ। বুদ্ধ বক্তৃতা দেবেন বারাসাত কাছারি ময়দানে, উত্তর ২৪ পরগনা জেলা কমিটির মিটিং-এ। তারই বিজ্ঞাপন চলছে এই অহোরাত্র।

আমি জানি না, আমার তো আর কোনও রকম কোনও সম্পর্কই নেই সিপিএমের সঙ্গে, তবু আমার কেমন লজ্জা আর ঘেন্না লাগছিল। সেই রাজনীতি যেটা আমরা করতাম, সেটার শেষ অব্দি মানে ছিল এই? ঠিক আগের ব্লগে আমি এসএফআইয়ের যে ভাষার কথা লিখেছিলাম, সেটার সঙ্গে এই গেঞ্জি-রোমান্টিক রাজনীতি একটা জায়গায় এক, দুটোই একটা ধর্ষণের সংস্কৃতি। অনেক আগেকার বটুক নন্দী দেবব্রতর পরে, প্রথমে হেমাঙ্গ বিশ্বাস, পরে সলিল চৌধুরী, এই লোকগুলোর একটা মানে ছিল, অর্থ ছিল, আবেগ ছিল। এখনও সুদূর সমুদ্দুর শুনলে আমার মাথার ভিতর কোথাও একটা নড়ে। কাছাকাছি থাকা কোনও বাচ্চাকে শোনাতে ইচ্ছে করে। সেই সবটাকে এরকম গেঞ্জি বিক্রি করায় নামিয়ে না-আনলে কি এদের কিছুতেই চলছিল না? এর চেয়ে বড় ধর্ষণ আর কি হয়? আইডেন্টিটি, পরিচয়, কেড়ে নেওয়া, ওই সময় ওই শিল্পের মুখটাই মুছে দেওয়া।

No Comments »

No comments yet.

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress