নেটখাতা

January 12, 2010

আওয়াজ আর আত্মঘোষণা

“আওয়াজ আর আত্মঘোষণা — পাড়া, ট্রেন, নিউব্যারাকপুর”, এইরকম ভেবেছিলাম এই ব্লগের নামটা। কিন্তু গোটাটা মিলিয়ে বড্ড বড়।

এইমাত্র লেখাপড়া করছিলাম, সেটা থেকে উঠে দরজা জানলা বন্ধ করে নিলাম, তাতেও আওয়াজটা আটকাতে পারিনি। এইমাত্র আবার ব্লগ লেখা স্থগিত করে, এই আগের বাক্যটার পরে, আওয়াজটা যেখান থেকে আসছিল, পাড়ার সেই কম্পিউটার সেন্টারে গিয়ে বললাম। ছেলেটি ভদ্র, কমাল আওয়াজটা।

কাল ট্রেনে ফিরছিলাম। ক্লান্ত ছিলাম। আমার এক বন্ধুর বিষয়ে একটা দুশ্চিন্তাও ছিল। তার মধ্যে ওই কর্কশ সস্তা উঁচু আওয়াজের বাজনা, চৈনিক সেলফোন থেকেই বোধহয়, আর নিতে পারছিলাম না। ছেলেগুলি এক আধবার কমাল, কিন্তু আসলে বাজিয়েই চলল।আসলে ওরাও না বাজিয়ে পারছিল না, ওরা তো আসলে গানবাজনা শুনছিল না, ওরা যে আছে, বেঁচে আছে সেই আত্মঘোষণা করছিল। আমরা টের পাচ্ছিলাম যে সত্যিই ওরা আছে।

এই টের পাওয়ার আত্মঘোষণার রাজনীতির চূড়ান্তটা দেখলাম গত শনিবার রাতে। নিউব্যারাকপুরে। সেখানে যাওয়ার পথেই, বিটি কলেজের মোড় থেকে হেঁটে যখন যাচ্ছি, বিটি কলেজের গায়ে দেখলাম কালীপুজোর মত লাইট, এবং, কলেজের বাইরে কলেজের কোনায়, দু-দুটো মাইক লাগানো, দুটোরই মুখ বাইরের দিকে। বাইরে ব্যানারও দেখলাম, নিউব্যারাকপুর বিটি কলেজের পুনর্মিলন উৎসব। এই মিলনের আনন্দ বাইরে বিতরণ করার বাসনা যদি তাদের হয়ও, এটা তো শেষ অব্দি একটা ইনস্টিটিউশন, একটা সামাজিক প্রতিষ্ঠান, এরকম অসামাজিক কাজ সেখানে প্রশাসনিক ভাবে করা হচ্ছে। অবাক হতে গিয়েও হলাম না। নিউব্যারাকপুরের রাজনীতির কথা আগেই শুনেছি অনেকের মুখে। গোটাটাই সেখানে দুর্বৃত্তদের হাতে। এতদিন ছিল সিপিএমের দুর্বৃত্ত, এতদিনে নিশ্চয়ই তারা তৃণমূলের দুর্বৃত্ত হতে শুরু করেছে। নিউব্যারাকপুরে যেটা চলে সেটা অবশ্য সিপিএমের দুর্বৃত্ত না বলে দুর্বৃত্তের সিপিএম বলাই ভাল। কোয়ান্টিটি কোয়ালিটির ডায়ালেক্টিক্সে।

তারপর যা দেখলাম, সে আরও চমৎকার। যে বাড়িটায় গেছিলাম সেটা নিউব্যারাকপুরের বড় স্কুল মাঠের পাশেই, চিত্ররথ সিনেমার ধারে। সেই মাঠে পুষ্পমেলা চলছে। তার আগে বেশ কিছু দিন চলেছে সংস্কৃতি মেলা। সংগঠক নিউব্যারাকপুর পৌরসভা। এবং তাতে মুম্বইয়া গানের মাইকে ঘরের মধ্যে খাবারের প্লেট অব্দি কেঁপে কেঁপে উঠছে। আমার ভাবতেই আতঙ্ক হল। এটা হচ্ছে ওখানের সিপিএম পৌরসভার তত্ত্বাবধানে। এটাই নিউব্যারাকপুরের সিপিএম।

আমার ছোটবেলাটা কেটেছে নিউব্যারাকপুরে। তাই বহু ঘটনাই মনে আছে ছোটবেলার স্মৃতি থেকে। পরে যে জুয়াচুরিটাই সামগ্রীক সিপিএম রাজনীতি হয়ে দাঁড়াল তার গোড়াপত্তন হয়েছিল আদতে সাতাত্তরে ক্ষমতায় আসার আগেই, শুধু তখন সেটাকে একটা গতির চিহ্ন বলে ধরতে পারিনি, ছড়ানো ছেটানো কিছু টুকরো গল্প বলে ভেবেছি। আমার মনে আছে বাবার সঙ্গে এসে দেখা করেছিলেন, বাবা ছিল মাস্টারমশাই, তৎকালীন নিউব্যারাকপুরের পৌরপ্রধান এবং ওই গোটা এলাকার অবিসংবাদিত সিপিএম নেতা। তাঁরা চাইছিলেন বাবাকে পার্টি মেম্বারশিপ দিতে, এবং তার জন্যে প্রয়োজনীয় নথী ইত্যাদি তারা সঙ্গেই এনেছিলেন, যা দিয়ে বাবার অক্সিলিয়ারি গ্রুপের সভ্য হওয়া, এবং ক্যান্ডিডেট মেম্বার হওয়া, ব্যাগডেটেই তৈরি করে দেওয়া যাবে। এই এজি এক বছর থাকা, এবং প্রার্থী সভ্য এক বছর থাকা সিপিএমের সংবিধান অনুযায়ী নিয়ম, পূর্ণ সভ্য হওয়ার আগে। ওই নেতাদের এটা করার উদ্দেশ্য একটাই, একটা ভোট নিজেদের পক্ষে বাড়ানো, যাতে নিজেদের পছন্দ মোতাবেক কমিটি কনফারেন্স থেকে বার করে আনা যায়।

এবং গোটাটাই, এখন দেখলে মজা লাগে, কী অদ্ভুত ভাবেই, গনতন্ত্রের মধ্যে ফ্যাসিবাদ বাঁচিয়ে রাখার জুয়াচুরি। পরে সিপিএম রাজনীতি এটাই হয়ে দাঁড়াল, প্রতিটি জায়গাতেই, আপাত গনতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখার ভণ্ডামি, এবং ভিতরে ভিতরে একটা চুরির জমিদারি বানিয়ে তোলা, এবং বাঁচিয়ে রাখা। এই রাজনীতিটাই পরে চারিয়ে গেছে সমাজ জীবনের প্রতিটা স্তরে।

অন্য মানুষকে, নিজের বাইরে, নিজের প্রভুদের বা নেতাদের, বা নিজের সঙ্গে সংযোজিত অন্য জুয়াচোরদের মিলিত চক্রের বাইরে, সম্মান করার বা মর্যাদা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন যে পড়ে না, এটাই সামাজিক সাফল্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিল সিপিএম। এবং আজ এটাই আমাদের জ্যান্ত ট্রাডিশন। সমাজের, রাজনীতির। সবকিছুই ওই দিয়ে স্থির হয় এখন।

সেদিন আমার এক পুরোনো ছাত্র, সে নিজেও ব্যবসায়ী, তাই অনেক কিছু খোঁজখবরও রাখে, আমায় বলল, কী বলব স্যার, যেখান অব্দি গিয়ে মানব মুখার্জিরা ছেড়েছে ঠিক সেইখান থেকেই ধরছে শুভেন্দু অধিকারীরা। আর একটু স্মার্ট হতে হবে অবশ্য। আর একটু দু-চার পাতা ইংরিজি বলাও। তা মহাশ্বেতা দেবীরা আছেন টাছেন, ও সবও হয়ে যাবে।

এবং আর একটু পিছন ফিরে যদি তাকাই, মানুষকে মর্যাদা না-দেওয়া, তাদের যে কোনও অধিকার এবং প্রাপ্য নিয়ে ছিনিমিনি করা, সেখানে আবার আইনকে কাজে লাগানো — এর গোটাটাই আমাদের ইতিহাসে আছে। ইংরাজ প্রভুদের গোমস্তা ও কেরানিদের রাজনৈতিক সামাজিক ভূমিকাই ছিল এটা। যে খোপটায় খাপে খাপে ঢুকে গেছিল সিপিএম। এবার তৃণমূল যাবে। মোট রাজনীতিটা বদলাবে না।

আর কতদিন আমরা কলোনির ইতিহাস বয়ে বেড়াব?

2 Comments »

  1. ওই মাদুরের টেকনিকটা টেস্ট রান করে দেখো তো, অদৌ কাজে দেয় কিনা।

    Comment by সায়মিন্দু — January 19, 2010 @ 7:27 pm

  2. এই লেখাটা চোখ এড়িয়ে গেছিল বোধ হয়। লেখাটা খুব ভালো হয়েছে। স্কুল থেকে ফিরে শান্ত হয়ে নতুন কম্পিউটারের সামনে বসেছি। তার ওপর ফেদোরা-য় কাঠখড় পুড়িয়ে বাংলা ফন্ট ইন্সটল করেছি, তার ভাবাবেগ তো কিছুটা হলেও এখনও বয়ে বেড়াচ্ছি, সেই জন্য বোধ হয় একটু বেশি মাত্রায় শান্ত। স্কুলে এবিটিএ-এর রাজনীতিটা আপাদমস্তক খুব এলোমেলো গুটিকয়েক গর্দভ সিপিএম-এর জন্য। আবার একই মুদ্রার ওপিঠে ডব্লিউবিটিএ-এর বিচরণ। সমস্যাটা যা, তা-ই রয়ে যায়। আসলে এতগুলো বছর ধরে ভয়ংকর খারাপ বিদ্যালয়-শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্রছাত্রীদের একাংশ শিক্ষক হবার পরও আসলে খারাপ সিপিএম-ই রয়ে গেছে। কেন জানি না, গোটাটাই আসলে সিপিএম-এর বহুরূপতা। ডব্লিউবিটিএ-ও সিপিএম-এর শাখা।

    মূল সমস্যাটা হয় আমাদের। লড়াই করতে করতে, নির্মম কাজগুলোর বিরোধিতা করতে করতে, দ্বন্দ্ব-সংঘাত সামলাতে সামলাতে – একটা সময় খুব ক্লান্ত লাগে। শেষ পর্যন্ত রয়ে যায়, আমরা আর ওরা। আমরা মানে প্রতিবাদমুখর আমরা। ওরা মানে প্রতিবাদমুখর আমরা-র বিরোধী জনগোষ্ঠী – সিপিএম + তৃণমূল + এটাসেটামিক্স…।

    স্কুলের রাজনীতি সবে আমার ওপর থাবা রেখেছে। বহুকাল সেই থাবার ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াতে হবে। অমানুষদের জমিদারিতে শুরু হয়েছে অবমাননা, অপমান, মর্যাদা না দেওয়ার খেলা।

    Comment by দিবাকর সরকার — April 5, 2010 @ 7:49 pm

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress