নেটখাতা

October 20, 2007

উবুন্টু থেকে ফেডোরা

বাংলায় গ্নু-লিনাক্স নিয়ে বইটা লেখার সময় ভারি কটূকাটব্য করেছিলাম রেডহ্যাট নিয়ে। কেউ যদি স্লো-মোশনে কম্পিউটার করতে ভালবাসেন, নিশ্চিন্তে রেডহ্যাট করতে পারেন, ইত্যাদি। আরও তখন ইএক্সটিথ্রি সত্যিই ভারি শ্লথ ছিল। আর অন্য কোনও ফাইলসিস্টেম, রাইজার বা এক্সএফএস ইত্যাদি করতে হলে, সে ছিল মহা হ্যাপা। কন্ট্রোল অল্ট এফ ওয়ান/টু ইত্যাদি কিছু একটা করে অন্য ভারচুয়াল কনসোলে যাও, সেখানে mkfs.reiser করে একটা পার্টিশন রাইজার করো, তারপর ফিরে যাও কন্ট্রোল অল্ট এফ সেভেন করে ফিরে যাও চলমান অ্যানাকোন্ডায়, সেটাকে ওয়ান স্টেপ ব্যাক, ওয়ান স্টেপ ফরোয়ার্ড করো, তবে দেখা যাবে ডিস্কড্রুইড তার নিরীহ ছাগল ছাগল ইন্টারফেসে দেখাচ্ছে, রাইজার পার্টিশন। এবং, এর পরেও, যখন এটাকে কোনও সিস্টেম পার্টিশন হিসাবে কোনও মাউন্টপয়েন্ট দেওয়া হবে, সঙ্গে সঙ্গে চিল্লাবে, “এই পার্টিশনের ডেটা অবিকল রেখে দেওয়া হচ্ছে, এসব কিন্তু ধর্মে সইবে না”, ইত্যাদি।

এবং সত্যিই, আমি রেডহ্যাটে কোনওদিনই কাজ করিনি। সবচেয়ে বেশিদিন একটানা করেছি সুজে ৮.২-তে। তিন বছর। এছাড়া কখনো একটু আধটু ম্যানড্রেক, একটু আধটু স্ল্যাকওয়ার, স্ল্যাকওয়ারটা বড় ভাল লেগেছিল। কিন্তু, যতদূর মনে পড়ছে, বাংলা লেখাটেখা নিয়ে কী সব ঝঞ্ঝাট হয়েছিল। মনে আছে, ওই সময়েই আমার বাংলা লেখার জন্যে সৈকৎ ওই জাভা জেআরই দিয়ে একটা বেড়ে সফটওয়ার নামিয়েছিল। পরে যা কাজে লাগল গুরুচণ্ডালী বানানোয়। বাংলায় ওর চেয়ে ভালো লেখার যন্ত্রপাতি দেখলাম ওপনঅফিসের পরই। আরও ঝট করে পিডিএফ করা যায়। আমি ওর জেআরই ছেড়ে ওপনঅফিস ব্যবহার করায় সৈকৎ আমায় আওয়াজ দিয়েছিল, “বাংলায় প্রথম ইউনিকোডে লেখক হতে চাইছ?”

আমার তো কম্পিউটার বা ওএস এসব বড় কথা নয়, একমাত্র দরকার লেখা, বাংলায় এবং ইংরিজিতে। তার সঙ্গে এই “ব্রহ্মাণ্ডের সরেসতম মিডিয়াপ্লেয়ার” এমপ্লেয়ার দিয়ে দুচারখানি সিনেমা দেখা, গান শোনা, এবং গান বা সিনেমা কোথাও পেলেই এনকোড করে নেওয়া এভিআই বা এমপিথ্রিতে। এই নেটখাতাতেই ঘোষণা করা রইল, আমি কোনও সিনেমা বা গান বেআইনি-ভাবে শুনিনা। আইনসম্মত ভাবে ক্রয়িত তো হতেই হবে, উপরন্তু উপরে, মানে সিডি ডিভিডির উপরে গঙ্গাজল-তুলসীপাতা লেগে আছে কিনা দেখে নিই, এমনকি সেটা ঠাকুরদেবতার সিনিমা হলেও।

তাই ওএস নিয়ে আমার বড় মাথাব্যথা নেই। আর সঙ্কর্ষণ যেমন বলেছিল, গেঞ্জি বদলানোর সঙ্গে বা বিকেলে মেয়েবন্ধুর সঙ্গে দেখা না-হলে, সেই বেদনায়, একবার ওএস বদলে নাও, ওসব আমার নেই। (অমন বয়েসই বা কই আর, হায়? গেঞ্জি বদলানোর কথা বলছি না, গেঞ্জি আমি এখনো বদলাই, এই বয়সেও।)

কিন্তু, এবারে বদলাতে অনেকটা বাধ্য হলাম। প্রায় দুবছর হল উবুন্টু ব্যবহার করছিলাম। সবাই জানে, খুবই সুবিধেজনক উবুন্টু। মাঝেমাঝে একটু বড্ড সুবিধেজনক লাগতে পারে, এতটাই সুবিধে। যেমন, আমার ল্যাপটপের সঙ্গে ক্রসওভার কেবল দিয়ে ডেস্কটপটা লাগানো ছিল। ল্যাপটপের ল্যানটায় আইপি আগে থেকেই দেওয়া ছিল। ওটাতেও উবুন্টু। ডেস্কটপের ল্যানটায় আইপি দিয়েছি। অন্য নানা কনফিগারেশন বা নিজের-মত করে-নেওয়ার কাজ করছি, এমন সময় মনে হল, দেখি তো ল্যাপটপ থেকে ব্রাউজার চালালে কী হয়। ভেবে দেখুন, তখনো ডেস্কটপে কোনও আইপি-মাস্কারেড চলছে না, ল্যাপটপে কোনও গেটওয়ে দেওয়া নেই। শুধু ডেস্কটপের সঙ্গে লাগানো ব্রডব্যান্ড বিএসএনএল মোডেম রাউটার হিসাবে কনফিগার করা, তাই ডেস্কটপটা নেটে সংযুক্ত। মজার কথা কী বলুন তো, আমি তো চমকেই ছিলাম, যাদের যাদের বলেছি, তারাও চমকেছে, ল্যাপটপের ফায়ারফক্স নেটে ঢুকে গেল। তথাগতকে গল্পটা বলে বললাম, বল, শালা, এ প্রায় উইনডোজ কিনা। ও বলল, “না, সরি, এ উইনডোজও পারবে না।”

কিন্তু এই নির্বিঘ্ন অনাবিলতার একটা তলার দিকও আছে। সেটা হল অস্বচ্ছতা। এইবার এই শালা কানেকশনের কনফিগারেশনটা আপনি বদলাতে চান। কী ভাবে বদলাবেন? আপনি তো জানেনই না কী করে কানেকটেড হল। আপনাকে প্রথমে /etc ফোল্ডারের গভীর গোপন গাণিতিক সব ফাইল খুঁড়ে খুঁড়ে বার করতে হবে, কী করে, কী করে, আজ ছিল ডাল খালি, কাল ফুলে যায় ভরে, বল্ দেখি তুই মালী, হয় সে কেমন করে?

তো? ফের আমি এই হালুয়ার মধ্যে দিয়ে আঙুল চালানোর চেয়েও অনাবিল উবুন্টু ছেড়ে ফেডোরার গেঞ্জি পরলাম কেন? সেটার একমাত্র কারণ বাংলা। (হায়, এই প্রদেশপ্রেম কে জানল?) প্রায় এগারো বছর ধরে মার্ক্সের ভ্যালুতত্ত্ব নিয়ে কিছু প্রবন্ধ আমি লিখছি, লিখে চলেছি। তার মধ্যে গোটা কয়েক গত তিন বছর ধরে ওপনঅফিসে লিখছি। সুজে, স্ল্যাকওয়ার, উবুন্টু, নানা ওএসের নানা সংস্করণ আমার মেশিনে এসেছে গেছে। সেই অনুযায়ী নানা সিস্টেম থেকে ওপনঅফিসের বিবিধ সংস্করণ দিয়ে তাদের উপর লিখেছি আমি। আমি বাংলা সিরিয়াস লেখালেখিতে একটা ফন্টই ব্যবহার করি এখনও, সেটা হল সোলেইমান লিপি। সেই সোলেমান লিপিরও ভার্শন বদলেছে। এই সব মিলিয়েই চলছিল। হঠাৎ করে, এক পুণ্য প্রভাতে দেখলাম, সেই সমস্ত পুরোনো ফাইলগুলো উবুন্টুতে ঘেঁটে ঘন্ট হয়ে গেছে। তার সমীকরণ সংখ্যাগুলো হিব্রু ভাষায় খুব কড়া কড়া গালাগাল হয়ে গেছে। পাতার সংখ্যাও ঘেঁটে গেছে। বদলে গেছে আরও বহু কিছু।

এরপর? এরপর কত কিছু করলাম। উবুন্টুতে জানালাম, ওপনঅফিসে জানালাম, বেংগালিনাক্সে জানালাম, বাংলা ওপনঅফিস পত্রপ্রবাহে (যাকে বাংলায় বলে মেইলিং লিস্ট) জানালাম, এমনকি আইলাগ কলকাতা আর দিল্লিতেও জানালাম। কেউ বলে ওএস বদলা, কেউ বলে ওপনঅফিসের ভার্শন বদলা, কেউ ব্যাঙ্গ করে বলল এ প্যাঙ্গোর সমস্যা (সায়মিন্দু জানিয়েছিল, প্যাঙ্গো নয়, প্যাঙ্গো নয়, ওপনঅফিস ব্যবহার করে আইবিএম-এর আইসিইউ), কেউ বোধহয় বলল, সাবধানে না তুললে কামড়েও দিতে পারে। কিন্তু কিছুই হল না। আমি একে একে মূল ডিস্ট্রোর জায়গায় তিনটে আলাদা আলাদা ওপনঅফিস সংস্করণ চেষ্টা করে দেখলাম। কিছুতেই কিছু হল না। এইসময়, এই ফাইলগুলো আমি যাকে পেরেছি তাকে পাঠিয়েছি, যদি কিছু করতে পারে, বিল গেটসকেও পাঠিয়ে থাকতে পারি।

সেই ফাইলের একটা নিজের ফেডোরা সাতের ওপনঅফিস দিয়ে খুলে তার স্ক্রিনশট তুলে আমায় আর সায়মিন্দুকে সিসি করে পাঠাল সঙ্কর্ষণ। ফাইল একদম ঠিকই আছে।

দ্বিতীয় আর একটা লিনাক্স ওএস কখনো প্রয়োজন পড়লে ইনস্টল করা যায় যাতে,
জিএলটির জন্যে সেই প্রয়োজন মাঝেমাঝেই পড়ে, আমি একটা পার্টিশন ফাঁকাই রাখি। সেখানে ইনস্টল করলাম ফেডোরা সাত। সেখানে কতকগুলো মজার ঘটনা ঘটল প্রথমেই। সেটা পরে কখনো লিখব। কিন্তু আমার এই উবুন্টু থেকে ফেডোরায় যাওয়ার ব্যাপারটায় একটা বিষয় আমার মাথায় কাজ করছে। সেটা মূলতঃ উবুন্টুর দৃষ্টিভঙ্গী নিয়। উবুন্টু যাকে পহেলা-পোকা বলে ডাকছে, বাগ ওয়ান, মানে মাইক্রোসফটের বাজার শাসন, সেই পোকার চোখে চোখ রেখে এগোচ্ছে উবুন্টু। সেটা উবুন্টুকেই ক্রমে দ্বিতীয় পোকা করে দেবে না তো? রাজাকে আমি চ্যালেঞ্জ করলাম, ডুয়েল লড়লাম, দ্বন্দ্বযুদ্ধ। যুদ্ধে যদি আমি হারি, তাহলে হব রাজার পরাজিত উত্তরাধিকারী, যদি জিতি তো জয়ী উত্তরাধিকারী। অর্থাৎ, জয় বা পরাজয়, উত্তরাধিকারটা থাকছেই।

আমি বলতে চাইছি এটাই যে, আমি শুরু করছি কোথা থেকে, ‘না’ থেকে, না, ‘হ্যাঁ’ থেকে? যদি কাউকে নাকচ করা দিয়ে শুরু করি, তাহলে তাকে আমি শত্রুরূপে ভজনা করছি। সে-ময় হয়ে আছি, যদিও একটা নঞর্থক রকমে। ঘৃণা যেমন ভালোবাসার চেয়েও বেশি করে অবিস্মরণীয় করে রাখে ঘৃণার পাত্রকে। তার চেয়ে আমি ভুলে যাই না কেন এই নাম্বার গেম, কে এক আর কে দুই। আমি আমার মত, আমি কিছু জিনিস ঠিক বলে মনে করি, যেমন ন্যায়পরায়ণতা, আমি কিছু জিনিস ভালোবাসি, যেমন স্বাধীনতা। জানার স্বাধীনতা, জ্ঞানের স্বাধীনতা, গবেষণার স্বাধীনতা। আমি সেই অনুযায়ী কাজ করে চলি। কে এক কে দুই জেনে আমি কী করব?

এমন তো হতেই পারে, এক নম্বর পোকার বিকল্প পোকা হওয়ার বাসনাতেই, আরো তাড়াতাড়ি আরো ঝটপট ডিস্ট্রো প্রকাশ করার দায় এসে গেছিল উবুন্টুর? তাই, এমনকি ত্রুটি জানার পরেও সেই সফটওয়্যার রয়েই গেছিল। রয়ে গেছিল স্ক্যানার না-ব্যবহার করতে পারা। রয়ে গেছিল বাংলা না-ব্যবহার করতে পারা। তার চেয়ে জরুরি নয় কি, একটা লিনাক্স সিস্টেমের সবচেয়ে জোরের জায়গা যেটা, সে শক্তিশালী, সে ভারসাম্যে আছে, স্থির, ব্যবহারকারী ভুল করলেই সে ভুল করে, নয়তো নয়, এই জায়গাটাকে আরো ভালো করে নিয়ে আসা? ফেডোরায় আসার পরপরই তেমন একটা জিনিস ঘটল, যাতে সেই গ্নু-লিনাক্স ব্যবহারের জোরালো জায়গাটা ফের মনে এল, উবুন্টুতে যেটা প্রায়ই ভুলতে বসেছিলাম। ওই অস্বচ্ছতার কথা তো আগেই লিখেছি। যাকগে, সেটা পরে কখনো লিখব।

2 Comments »

  1. এই গেঞ্জি বদলানোর উক্তি কি সত্যিই আমার ? আমার তো মনে হচ্ছে কিছু রং লাগিয়েছ :)

    Comment by সঙ্কর্ষণ — November 12, 2007 @ 8:15 am

  2. রং যদি খুব খারাপ না হয়, রঙিন হওয়া মন্দ নয় তো? স্মৃতি কী? স্মৃতি তো রূপকথা। যদি তুই না-ও বলে থাকিস, হয়তো তোর বলা উচিত ছিল, হয়তো এটা আমার স্মৃতি হয়ে ওঠা উচিত ছিল। নিজের গভীরতম বাল্যের স্মৃতি কখনো খোঁড়ার চেষ্টা করে দেখবি, কিম্বদন্তী জনশ্রুতি এইসব মিলে মাথার ছবিগুলোই কেমন বদলে বদলে যাচ্ছে — নিজেই মেলাতে পারবি না, কোনটা সত্যি, আর কোনটা সত্যি হওয়া উচিত ছিল। স্মৃতি একটা জ্যান্ত জিনিষ, ব্রিটিশ কলোনির মৃত মহাফেজখানায় মৃত ফাইলের ফসিল মথ নয় মোটেই। নন্দীগ্রামের মানুষের স্মৃতিতে এখন এসে যেতে থাকবে সিপিএমের সমাজপতিরা কেমন তাদের খাইয়েছিল, দাইয়েছিল, এমনকি শীতলপাটি আর বিন্নি ধানের খইও দিয়েছিল অবরোধ আর ছাগল-বেঁধে রাখবার দিনগুলিতেও।

    Comment by dd — November 12, 2007 @ 9:02 pm

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress