নেটখাতা

October 24, 2007

ফেডোরায় আসার পরপরই

নেটখাতায় আগের লেখায় লিখেছিলাম, উবুন্টু থেকে ফেডোরা সাতে আসার পরপরই দুচারটে এমন জিনিস ঘটল যাতে গ্নু-লিনাক্স আবহাওয়ার অনুভূতিটা বেশ জোরদার হয়ে উঠল। তার দুটো ঘটনা আজ লিখি।

প্রথম ঘটল আমার নিজের দোষে ফেডোরা সাত সিস্টেমটা ঘেঁটে ফেলা। পরে দেখেছিলাম, নেটে বারবার নানা জনের আলোচনায় এটা এসেছে, রিপোজিটরি যোগ করার সময় লিভনা আর ফ্রেশআরপিএম এই দুটোকে কখনো এক সঙ্গে করতে নেই। দুটোতেই থাকে ফেডোরায় ইনস্টল করার প্যাকেজ। কিন্তু দুই জায়গায় সম্পূর্ণ দুই ভাবে এটা করা হয়। পিছনে ডিপেন্ডেন্সিগুলোর, যে ফাইলগুলোর উপর নির্ভর করে এই দুই জায়গার দুই ধরনের প্যাকেজ। তাই দুটো থেকে আসা প্যাকেজ একই সঙ্গে একই সিস্টেমে ইনস্টল করলে গোটাটাই গন্ডগোল পাকিয়ে যায়।

নেটে এই পুনঃপুনঃ উচ্চারিত সাবধানবাণী আমার নজর এড়িয়ে গেছিল। আমি দুটো থেকেই একসঙ্গে প্যাকেজ ইনস্টল করেছিলাম, সিস্টেম ইনস্টল করার পরপরই। তাতে যা ঘটল তা এই যে, এর চেয়ে বিকট কোনও অবস্থা আমি কদাচ দেখিনি। এক্স-উইনডোজের তো গল্পই নেই। কীরকম ভুতুড়ে ধূসর ধূসর আবছায়াপরায়ণ সমস্ত জিনিষ দেখতে পাচ্ছিলাম, startx করে ঢুকলেই। পুরো ধূ ধূ ধূসর। মাউস ক্লিক করলে সেখানে রুট উইন্ডোর গায়ে সব চৌকো চৌকো দাগ দাগ আসছে। আর কেহ নাই, কিছু নাই গো।

তাই এক্স-এর গল্প তো দূর-অস্ত, এমনকি বহু ইউজার বাইনারিই আমি চালাতে পারছিলাম না। /bin বা /usr/bin এর বাইনারিগুলোরও লাইব্রেরি, পাথ, সব ঘেঁটে একাকার। এমন যাচ্ছেতাই অবস্থা যার বিবরণ দেওয়া যায় না। কাঁদো কাঁদো মুখে কলেজ চলে গেলাম। সেদিন আবার ক্লাসটেস্ট ছিল ছাত্রদের। এখন এক সার্কাস চালু হয়েছে, সাড়ে চারশো ছেলের ক্লাসটেস্ট। যাই হোক সে অন্য গল্প।

পরের দিন রবিবার ছিল। আমি সকাল থেকে পড়লাম সিস্টেম নিয়ে। নেটে ঢোকা যাচ্ছিল। রাউটার হিসাবে ওটা কনফিগার করা। এবার ifconfig দিয়ে আইপি আর নেটমাস্ক দিয়ে, তারপর route কে ডিফল্ট গেটওয়ে যোগ করে দিলেই নেটসংযোগ হয়ে যাচ্ছিল। এটাই ছিল বাঁচোয়া। ইয়াম চালানো যাবে। কিন্তু আমি তো ইয়াম কিছুই জানিনা। শেষ বছর দুয়েক উবুন্টুতে কাজ করেছি apt-get দিয়ে, তার আগে সুজেতে সরাসরি ইয়াস্ট থেকে। এমনকি সিস্টেমে ম্যানুয়াল পেজও ঠিকমত পড়া যাচ্ছে না। নেট থেকেই যতটুকু পারি ইয়াম শিখলাম। জিনোম নতুন করে ইনস্টল করতে হবে, তার আগে সব কেঁচে গণ্ডূষ করতে হবে। এইসময়ে এই পার্টিশনে ইউজার ডেটা কিছুই নেই। চাইলেই রি-ইনস্টল করতে পারতাম, কিন্তু চাইছিলাম না। আসলে একটু পরখ করে নিতেও চাইছিলাম। কেজো অবস্থায় ফেরত আসা যায় কিনা। উবুন্টুতে এই অভিজ্ঞতাটা আমার বেশ খারাপ ছিল। উবুন্টু ইউজারের জন্যে সবকিছুই খুব সহজলভ্য করে রাখে। কিন্তু সহজলভ্য করার এই প্রক্রিয়াটা একেবারেই সহজ নয়। আগেই লিখেছি, ওই অস্বচ্ছতা। গ্নু-লিনাক্সে সবকিছুই করতে পারার কথা কনফিগারেশন ফাইল পড়ে আর ম্যানুয়াল পড়ে। সেরকমটা আমি বেশ কয়েকবার উবুন্টুতে পারিনি। অবশ্য এটা ঠিক, উবুন্টুর কাঠামো মানে ডেবিয়ানের কাঠামো, লিনাক্সের সার্বিক কাঠামোর বাইরে ডেবিয়ানের কাঠামো আলাদা করে কিছু জানিনা বললেও কম বলা হয়। কিন্তু লিনাক্সের কাঠামো সম্পর্কে একটা ধারণা থাকলেই ম্যানুয়াল পড়ে পড়ে কাজ তো করতে পারার কথা। সেটাই ফেডোরায় পারি কিনা আমি দেখতে চাইছিলাম।

এবং মজার কথা, সত্যিই সেটা হল। আমি সিস্টেমে ফেরত যেতে পারলাম।

রবিবার, সকাল থেকে গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে, রাত নটা নাগাদ আমি আবার একটা কড়াই থেকে সদ্য তোলা মুচমুচে ভাজার মত ঝরঝরে একপিস ফেডোরা পেয়ে গেলাম। তার মধ্যে কম বেদনা যায়নি। যেমন নেট থেকে পাচ্ছিলাম, yum groupinstall gnome কাজ করার কথা। কিন্তু করেনি। এইটায় যেটা করেছিল সেটা হল yum install gnome-desktop, এই রকম প্রতি পদে পদে। যাই হোক, দাঁড়াল তো শেষ অব্দি। এবং সবচেয়ে বড় কথা আলাদা করে ফেডোরার ঘাঁতঘোঁত কিছু না-জেনেই। যেটা আমি নেটখাতার আগের লেখাটাতেও বলতে চেয়েছিলাম। একটা সরল স্বচ্ছতা। এটা উবুন্টু অভিজ্ঞতায় আমি পাচ্ছিলাম না। কিন্তু ফেডোরায় আবার সেটা ফেরত এলাম।

আমার কম্পিউটারের সঙ্গে কোন নির্মাণ-সংযোগ নেই, না যন্ত্রপাতির, না সফটওয়ারের। আমি লেখাপড়া করতাম কম্পিউটারে। তারপর একসময়, প্রাথমিক ভাবে ভাইরাসভীতি থেকে মুক্তির চেষ্টাতেই লিনাক্সে আসা। আসার পর, সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি সংক্রান্ত ভাবনাগুলো তো অনেক পরের, প্রথম যে উত্তেজনাটা হয়েছিল, সেটা হল বুঝতে পারার। উইনডোজ করার সময়ে, আমার মনে আছে, আমি উইনডোজ করারও আগে, ডস ৬ থেকে শুরু করেছিলাম, তার ওয়ার্ড-প্রসেসর ছিল ওয়ার্ডস্টার। মজা পেয়েছিলাম এর বেশ কিছু দিন বাদে, রোমান পোলানস্কির ‘বিটার মুন’ সিনেমায় ডসের ওয়ার্ডস্টারে লেখককে লিখতে দেখে। তারপর উইন্ডোজ এল, ৩.১ আমি খুব ব্যবহার করেছি। যখন win কমান্ড দিয়ে উইনডোজে ঢুকতাম। এই কনসোল প্রম্পট অনেকদিন অব্দি ধরে রেখেছিলাম, উইনডোজ নাইন্টিফাইভ অব্দি, msdos.sys ফাইল এডিট করে, bootgui=0 করে দিয়ে। যাইহোক, যা বলছিলাম, অনেক তখন বোঝার চেষ্টা করেছি। কী দুর্দান্ত আবিষ্কার মনে হয়েছিল তখন যেদিন দেখেছিলাম, যে কোনও ডস কমান্ডের পরে ‘/?’ লাগিয়ে এন্টার মারলে সেই কমান্ডটাকে জানা যায়। কিন্তু কিছু দূরের পরে আর কিছুতেই এগোতে পারতাম না, যে বস্তুটা নিয়ে সারাদিন কাজ করছি তার প্রায় গোটাটাই প্রহেলিকা বলে মনে হত।

গ্নু-লিনাক্সে আসার পর সবচেয়ে উত্তেজক লেগেছিল এই চাইলে শিখতে পারার স্বাধীনতা। চাইলে আর পরিশ্রম করলে। অর্থাৎ, ওটা আর প্রহেলিকা নয়, চাইলে এবং খাটলে জানা যায়, বোঝা যায়। এবং একটু পরিশ্রম করার পরই যে কোনও লিনাক্স ওএসে একটা ন্যূনতম ঢুকতে পারা। এইটা যেন ভেঙে যাচ্ছিল ফের উবুন্টুতে এসে।

কেন হঠাৎ /etc/inittab ফাইলটা হাওয়া করে দেওয়া হল? এবং তার চেয়েও বড় কথা তার যথাযোগ্য ডকুমেন্টেশন সিস্টেমের মধ্যে তো নেই-ই, নেটে বেশ কিছুটা খুঁজেও আমি পাইনি। আগেই যেমন বলেছি, আমার মেশিনে প্রায় সবসময়ই আমার একের বেশি লিনাক্স রাখতে হয়। বিশেষতঃ জিএলটির পর থেকে। এতে কোনওদিন কোনও সমস্যা হত না। কিন্তু উবুন্টুর সঙ্গে কোনও কিছু রাখা, উবুন্টুর গ্রাব দিয়ে, আমি কখনো পারিনি। গ্রাব কেন, গ্রাব আসার আগে, যখন লিলো ছিল, তখন যেটা করতাম, যে সিস্টেম থেকে lilo.conf ফাইলটা দেখছি, তার নিজের কারনেল ইমেজটা হুবহু তার পথের ঠিকানায়, আর অন্য লিনাক্সের কারনেল ইমেজটা দিয়ে দিতে হত এই ওএসের ভিতর ওটা যেখানে মাউন্ট হয়ে আছে সেই পথ ঠিকানায়। তারপর মাউন্ট করা অবস্থায় একবার lilo চালিয়ে দেওয়া। তারপর গ্রাব এসে তো আরও সহজ হয়ে গেল। কোনও মাউন্ট টাউন্টের বালাই নেই। শুধু কাঁচা পার্টিশনটা দিয়ে দাও।

উবুন্টুতে এসে দেখলাম, এটা করা যায় না। আমি কখনো পারিনি। এবং এটা পারতে এতটা ঝঞ্ঝাট নিতে হবেই বা কেন? উবুন্টু যে হ্যাশ সংখ্যাটা ব্যবহার করে menu.lst ফাইলে, সেটার কারণেই হোক, বা অন্য কোনও কারণে, উবুন্টুর মধ্যে থেকে অন্য লিনাক্স রাখতে মহা ঝামেলা। শেষ অব্দি আমি যেটা করতাম তা হল, পরের লিনাক্সটা থেকে আবার গ্রাব ইনস্টল করে, তার menu.lst ফাইলে উবুন্টুর menu.lst ফাইল থেকে প্রয়োজনীয় অংশটা কপি পেস্ট করা। এই এখনো তো, আমার একটা পার্টিশনে উবুন্টু আছে, সেটার গ্রাবে আমি ফেডোরা রেখে বুট করতে পারিনি। শেষে ফেডোরার গ্রাব থেকে উবুন্টু যোগ করে দিয়েছি।

উবুন্টু ওই হ্যাশ সংখ্যাগুলো দিয়ে লেখে তার /etc/fstab ফাইলও। তাই অন্য যে কোনও লিনাক্সের অভ্যস্ততা দিয়ে সেটাকে ব্যবহার করা ভয়ানক শক্ত। শুধু উবুন্টু ব্যবহার করা খুব সহজ, কিন্তু উবুন্টুর সঙ্গে নিজের মর্জি মত একচুল কিছু চাইলেও সেটা মহা শক্ত। এটা কেন হবে? এটা গোটা গ্নু-লিনাক্স সংস্কৃতির থেকে ভীষণ আলাদা লাগে, উবুন্টুর পরিভাষায় সেই এক নম্বর পোকার কথা মনে পড়ে।

ফেডোরায় আসার পরই অন্য অভিজ্ঞতাটা রাইজারএফএস এবং সেখানে অধিকারের সমস্যা। কিন্তু আজ আর নয়, ওটা নেটখাতার পরের কোনও পাতায় লেখা যাবে।

Filed under: গ্নু-লিনাক্স — dd @ 12:59 am

No Comments »

No comments yet.

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress