নেটখাতা

August 25, 2010

সিপিএম ও শিক্ষা-সাক্ষরতা

কলেজের ছাত্রদের নিয়ে সাক্ষরতা বিষয়ক একটা কিছু ছিল। তার নোটিস লিখেছিলেন কলেজেরই এক সিপিএম মাস্টারমশাই, যাকে বাংলায় বা ইংরিজিতে কোনও ভাষাতেই একটি বাক্যও আজও অব্দি আমি সঠিক লিখতে দেখিনি — জানিনা, আমার অগোচরে লিখে থাকতেই পারেন। তিনি একটি নোটিস লেখেন, ক্লাসে ক্লাসে পাঠানোর জন্যে।

আর একজন মাস্টারমশাই, তিনিও সিপিএম, এবং আরও একটু নেতা সিপিএম, সেই নোটিসটিকে সংশোধন করেন। প্রথম জন যেখানে সাক্ষরতা দিবস অর্থে ‘লিটারেসি ডে’ লিখেছিলেন, সেটিকে কেটে তিনি ‘লিটারারি ডে’ করেন।

প্রথম জন যেখানে শুধুই পার্টি মেম্বার, দ্বিতীয় জন সেখানে নেতৃস্থানীয়। প্রথম জন যেখানে ভাষা বা সাহিত্য নয়, অন্য বিষয়ের মাস্টারমশাই, দ্বিতীয় জন সেখানে ইংরিজি ভাষারই শিক্ষক। দ্বিতীয় জন আবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটেরও সভ্য, মানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিষয়ক নীতিগুলো যারা নির্ধারণ করেন। এবং খেয়াল করুন, বেখেয়ালি ভুল নয়, তিনি অন্য এক জনের লেখা কেটে করেছেন, মানে তিনি সত্যিই ‘সাক্ষরতা’ শব্দের ইংরিজি ‘লিটারারি’ বলে জানেন।

গত চৌত্রিশ বছরের সিপিএম শাসনের এটা একটা প্রতিনিধিস্থানীয় চিহ্ন। আমি অন্য রাজ্যের কথা জানি না, পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষা বলে একটা কিছু ছিল, ভাল হোক আর মন্দ হোক। আমার নিজের এবং আমার চারপাশের অভিজ্ঞতা থেকে যা দেখেছি, কম বেশি একটা কেজো মাপের ভাষা ও গণিত শিক্ষা পশ্চিমবঙ্গে হত — শেষ অব্দি যে দুটো হল শিক্ষার সবচেয়ে বুনিয়াদি জায়গা। এবং আমার এই অভিজ্ঞতার একটা অর্থ সত্যিই আছে, কারণ, আমার মা ও বাবা দুদিক থেকেই আমি তৃতীয় প্রজন্মের শিক্ষক। আমার মা, বাবা, মায়ের বাবা, এবং বাবার বাবা, সবাই ছিল মাস্টারমশাই। ঠাকুমা আর দিদিমা কোনও চাকরি করত না, সংসার করত।

এই সাড়ে তিন দশকে শিক্ষার এই অধোগতির মূল জায়গাটা খুব সহজ। শিক্ষা ছিল টাকা আয়ের সবচেয়ে সহজ এবং দুর্লক্ষ্য জায়গা। খুব ছোট ছোট মাপের টাকা, তাই চোখেও পড়বে না, এবং নিরবচ্ছিন্ন ভাবে সেটা চালিয়েও যাওয়া যাবে। বছরবিয়োনি মেঘ — বজ্র দেয় বৃষ্টিপাত দেয়, ডোবার রহস্য বাড়ে, পদ্মপাতা দীঘিতে তছনছ। এবং শিক্ষাখাতে বছর বছর টাকাও বাড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সেগুলো খুব অনাবিল ভাবে বিকেন্দ্রীকৃত হওয়ার স্বার্থে, সিপিএম সরকার ও শাসন ও পার্টি শুধু সেই সব প্রশ্নাতীত ভাবে অপদার্থ মানুষদেরই বেছে নিয়েছে, যাদের কোনও নিজস্ব মেরুদণ্ডের কুসংস্কারই নেই, স্বতন্ত্র স্বাধীন চিন্তাভাবনার কথা ছেড়েই দিন। এটা ঘটেছে প্রতিটি স্তরে, বাধ্যতা মূলক ভাবে, বামফ্রন্টের প্রথম দিককার বছরগুলোয়। তারপর আর এটা করতেও হয়নি আলাদা করে। অসত অপদার্থদের যে ভাণ্ডারটা ততদিনে তৈরি হয়ে গেছে তারাই সেটাকে মসৃণ রকমে চালিয়ে নিয়ে গেছে, সতত সঞ্চরমান শৈবালের ছেদহীন ছন্দে।

এটা ঠিক ওই পার্টি প্রক্রিয়ার মত। আমার নিজের পার্টি অভিজ্ঞতায় যেমন দেখেছি, এখনও যেটা বলি, পার্টির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আছে এমন কোনও লোক স্বাভাবিক থাকতে পারে না। দরজার সামনে পাঁঠার মত বাঁধা আছে, কিছুই করে না, মাঝে মাঝে একটু ব্যা করে, এমন কিছু লোক ছাড়া, যদি সে সক্রিয় হয় তাহলে সে বদমাইস হতে বাধ্য। কারণ, সক্রিয় মানেই সে নিচু থেকে উঁচু ক্রমারোহী কমিটিতরতায় উত্তীর্ণ হয়ে এসেছে। এবং কখনওই কোন স্তরেই উচ্চতর কমিটি তো তাকে নেবেনা যদি সে তাদের চুরির অংশ না হয়, চুরি-বিরোধিতা ছেড়েই দিন। চুরি বলতে এখানে বৃহত্তর অর্থে বলছি — ক্ষমতা বা টাকা যে কোনও দিক থেকেই হোক পার্টি-ব্যবসার অংশ তাকে হতেই হবে। ব্রাঞ্চ স্তর থেকে লোকাল, লোকাল থেকে জোনাল, জোনাল থেকে জেলা, জেলা থেকে রাজ্য — স্তরবিন্যস্ত লাইনবাজি ও অসততার সিঁড়ি পেরিয়ে পেরিয়েই সে এসেছে। যদি একটা স্তরেও কখনও তার একটু দিওয়ানাপন গড়ে উঠত, দেখি তো একটু না-বদমাইস হয়ে, কেমন লাগে, পেট গোলায় কিনা — তাহলেই সে সেই স্তরেই আটকে যেত।

পার্টির সব জায়গাতেই তাই হয়েছে, শিক্ষাতেও তাই। তার ফল আমাদের চারপাশে। এবং প্রতিটি জায়গায়, স্কুলে স্কুলে কলেজে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সিপিএমের এত দাপট কেন — এর একটাই কারণ, এই প্রতিটি একককে ঘিরে নিয়মিত একটা টাকার প্রবাহ। এবং প্রতিটি স্তরে বাধ্যতামূলক ভাবে অপদার্থ অসতদের বেছে নেওয়া এই প্রক্রিয়ারই অংশ। কলেজে একজন প্রিন্সিপাল যোগ দিল। তার শিক্ষাক্ষেত্রে অংশগ্রহণের বৃহত্তম যোগ্যতা কী — সে অমুক নেতার বাড়ি রোজ বাজার করে দিত, বা তার শালীর ছেলেমেয়েদের বিনাপয়সার পড়াত। এই ক্রিয়াগুলোর একটা তাৎপর্য আছে। এর মধ্যে দিয়ে বাছাই হয়ে যাচ্ছে, তার কোনও রকম কোনও আত্মসম্মানের পিছুটান আছে কিনা। তা যদি থাকে তাহলে টাকার প্রবাহের ওই মসৃণতা ব্যাহত হবে।

এটা একটানা সাড়ে তিন দশক ধরে চলায় যা হওয়ার তাই হয়েছে। নানা সিপিএম নেতা ভুঁইফোড় নানা স্কুল বা শিক্ষাব্যবসায় কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে। বা, নানা যে প্রাইভেট কলেজ ও ইউনিভার্সিটি গজাচ্ছে তার থেকেও কামিয়ে চলেছে। আবহমান স্কুল কলেজ থেকে ওখানে টাকা কামানোর সম্ভাব্যতাটা আরও একটু বেশি। বা, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ গুলোয় নানা জায়গায় এসএফআই-এর দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াচ্ছে চাঁদার বিনিময়ে পরীক্ষার হলে টুকলি সরবরাহ করা। এগুলোর কোনওটাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সিপিএম আমলের শিক্ষা-সাক্ষরতারই চিহ্ন। এবং মজাটা এই যে এই উত্তরাধিকার মাথায় নিয়েই তৃণমূল আসছে, তাদের হাতে যে এই উত্তরাধিকার বদলাবে, এমন আশা আমি এখনও রাখি না।

Filed under: সামাজিক-রাজনৈতিক — dd @ 6:44 am

5 Comments »

  1. kintu asol engreji taa ki hobe seta to bolle na.. aami kintu emon anek keo chini, je ba jara sakkhortar engreji naa jeneo tomar lekhake darun bolbe ebong appreciate korbe, taader tumi kothay nebe??

    Comment by tapas das — November 24, 2010 @ 12:45 pm

  2. সাক্ষরতা দিবসের ইংরিজি লিটারেসি ডে যে হওয়ার কথা, এটা জানা বা না-জানাটা কি আদৌ গুরুত্বপূর্ণ কিছু? বাঙালি হিসাবে আমার এটা না-জানার পূর্ণ অধিকার আছে। প্রশ্নটা এই যে এটা না জেনেও তিনি আর একজন মাস্টারমশাইয়ের লেখার গায়ে হাত দিচ্ছেন, এবং যিনি দিচ্ছেন তিনি ইংরিজিরই শিক্ষক। অর্থনীতির মাস্টারমশাই হওয়ার দায়ে আমায় এমন অনেক খুঁটিনাটি জানতে হয় আমার বিষয়ের যা জানাটা অন্য কারুর কাছে আদৌ প্রয়োজনীয় কিছু নয়, কিন্তু আমাকে তো সেটা জানতেই হয়। আমার কাজ ওটাই।
    কী ভাবে অপদার্থদের সঙ্কলন চয়ন ও নির্বাচন করে এনে এনে ভাণ্ডার বানানো হয়েছে রাজনৈতিক ব্যবসার স্বার্থে সেটা বুঝতে কি আদৌ ওসব জানার প্রয়োজন আছে? বল তো? চোখ খোলা থাকলেই দেখা যায়, বরং চোখ বুজিয়ে নিতে হয়, আর বেশি দেখা বন্ধ করার স্বার্থে।

    Comment by dd — November 24, 2010 @ 1:19 pm

  3. tumi ekhano ragi i achho dipankar da, bolle bolbe.. naa raag koi, buro hoechhi.. ityadi.. kintu raag taa achhe.. sei cpm er time(jeta ami dekhini) se samayer i.. proyojoniyo.. akinchitkar holeo

    Comment by tapas das — November 25, 2010 @ 10:39 am

  4. সেটা বোধহয় ঠিকই বলছিস। অনেক চেষ্টা করি মুক্ত হওয়ার, কিন্তু মানুষ তার মৌলিক ত্রুটিগুলো থেকে বেরোতে পারে কই। অনেক ভদ্র হয়েছি, চুপচাপ শুনতে শিখেছি, কিন্তু ভিতরের রূঢ়তাটা বোধহয় যায়নি অনেকটাই। আমি চেষ্টা করি — নিজের সঙ্গেই রগড়ারগড়ি করে চলা — সিসিফাসের রূপকথার মত। ওটা হয়তো সেইরকম একটা অসম্ভব স্বপ্নের অংশ — ইয়ে জিন্দেগি কেয়া কোই জিন্দেগি হো জিসমে কোই নামুমকিন স্বপ্নে না হো। তবে স্বপ্ন আমি খুবই দেখি, শান্ত হয়ে গেছি, শান্তি হয়েছে আমার অনেক, বসে আছি শান্ত, পাশে একটা বিরাট পাহাড়, তার পাশে একটা উপত্যকায় বসে আছি। যতদূর দেখতে পাচ্ছি শুধু মাটির ওঠানামা, পাথর, আর দু-একটা একলা গাছ।

    Comment by dd — November 25, 2010 @ 10:58 am

  5. [...] আগেও আলোচনা করেছিলাম এই ব্লগে — সিপিএম এবং শিক্ষা সাক্ষরতা। এখন তাদের যখন ধরে ধরে পেটাচ্ছে, সেটা [...]

    Pingback by নেটখাতা » ব্যাঙতন্ত্র এবং ঠাম্মা-ব্যাঙ — April 22, 2012 @ 9:46 pm

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress