নেটখাতা

December 14, 2010

দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ২

[গুরুচণ্ডালী সাইটে এই লেখাটা প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু ওদের ইউনিকোড থেকে বাংলাপ্লেন কনভার্টারে সমস্যা থাকায় ফরম্যাটিং ঘেঁটে যাচ্ছে। তাই এখানে ওই প্রতিটা অংশ, যেমন যেমন গুরুচণ্ডালীতে প্রকাশ হচ্ছে, সঠিক ইউনিকোড অবয়বে আমি দিয়ে যাব। এটা তার দ্বিতীয় অংশ। প্রথম অংশ প্রকাশিত হয়েছিল এই ব্লগেরই পুরনো লেখায়।]

==========অংশ ২ শুরু===================

11
00:03:00,030 –> 00:03:02,789
Beware, folks.
Train is coming.

ধরমপায়ে যাও ভাই, গাড়ি আওত হ্যায়।” আমি খুব নিশ্চিত নই, সাউন্ডট্র্যাকের সমস্যার কথা তো আগেই বলেছি, বাংলায় যে আন্দাজটা আমি অনেকটা করতে পারছি, অন্য ভাষায় সেটা হচ্ছে না। তবে আমি আমার হিন্দিভাষী সহকর্মীদেরও শুনিয়ে দেখেছি। তাদেরও বাক্যটা ওরকমই লাগছে। তবে বাক্যটা এখানে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়ও। কী বলতে চাইছে সেটা বোঝা যাচ্ছে খুব সহজেই। গুরুত্বপূর্ণ এখানে গোড়া থেকেই এই অবাংলাভাষী রেলকর্মীর অস্তিত্বটা উচ্চারিত হয়ে যাওয়া। উপন্যাস থেকে চিত্রনাট্যে খুব সচেতন বদলগুলোর এটা একটা। উপন্যাসে এই চরিত্রটাই নেই। এমনকি উপন্যাসের শেষে নিতাই যখন ফের ফিরে এল চণ্ডীতলা ইস্টিশনে, সেখানের লোকজন তাকে ঘিরে এল। এক সময় মিছে শিরোপার গল্পে যে সম্মান নিজেই নিজেকে দিতে চেয়েছিল, সেই সম্মান এল আপনা থেকেই। উপন্যাসে এটা উল্লেখিত আছে নিতাইয়ের নিজের কেনা মিছে শিরোপা, ফিল্মে সেটা আর বলা হয়নি, শুধু শিরোপাটাই দেখানো হয়েছে। এটাও একটা বদল, কিন্তু তেমন জরুরি কিছু নয়।

নিতাই দাঁড়াইয়া আছে। তাহার চারদিকে বিস্মিত একটি জনতা। নিতাই এমনটি প্রত্যাশা করে নাই। এত স্নেহ, এত সমাদর তাহার জন্য সঞ্চিত হইয়া আছে এখানে? রাজার মুখে পর্যন্ত কথা নাই। বেনে মামা, দেবেন, কেষ্ট দাস, রামলাল, কয়েকজন ভদ্রলোক পর্যন্ত তাহাকে ঘিরিয়া দাঁড়াইয়া আছে। সম্মুখে সেই কৃষ্ণচূড়ার গাছটি।

এখানে ‘কয়েকজন ভদ্রলোক পর্যন্ত’ শব্দবন্ধটা খেয়াল রাখুন। পরে আমরা এই প্রসঙ্গে ফিরে আসব। এবার খেয়াল করুন ইস্টিশনে সমাগত লোকের নামের তালিকাটা। সেখানে ‘বালিয়া’ নামটা তো নেইই, এমনকি খুব উচ্চারিত ভাবে অবাংলাভাষী কোনও নামই নেই। এর মধ্যে বেনেমামা চরিত্রটি ফিল্মে বেশ কয়েক বার এসেছে। কিন্তু ফিল্মে খুব উচ্চারিত যে বালিয়া, যার বাক্য আমরা উদ্ধৃত করলাম এই প্রসঙ্গটার শুরুতে, তার নাম না থাকার অর্থ এটাই। এই বালিয়া চরিত্রটি ফিল্মে একটি সচেতন সংযোজন। এবং বালিয়া চরিত্রটির গুরুত্ব ফিল্মে কতটা সে তো আমরা দেখতেই পাই। ঝুমুর দলের সঙ্গে বাইরে জেলায় জেলায় ঘুরতে যাওয়ার বাইরে চণ্ডীতলার জীবনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাতেই আমরা বালিয়াকে পাই ফিল্মে। বালিয়া ‘কবি’ ফিল্মে একটি ভোজপুরি লোকগীতিও গায়। অবাংলাভাষী শ্রমিকদের উপস্থিতি, যা খুব প্রবল ভাবে ঘটতে শুরু করে দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে, তারই একটা প্রতীক বালিয়া। শুধু বালিয়াই নয়, বালিয়ার সংলাপে আমরা আরও অবাংলাভাষী চরিত্রের উল্লেখও পাই। এই জায়গাটাকে নিয়ে আমরা ফের কথা বলব, যখন রাজন, উপন্যাসে যার নাম রাজালাল বায়েন, ফিল্মে যাকে স্টেশনমাস্টার ছাড়া আর সবাই, নিতাইয়ের দেখাদেখি ‘রাজন’ বলে ডাকে, তার সূত্রে আমরা সঙ্কর পরিচিতি, হাইব্রিড আইডেন্টিটির আলোচনায় আসব।

21
00:03:48,790 –> 00:03:53,790
Son of a Bengali cobbler,
Went to war that long ago -
22

00:03:53,790 –> 00:03:58,990
- Still speaking millitary Hindi?
That too 90% mistakes![04]

ব্যাটা বাঙালি মুচির সন্তান — কবে গিয়েছিল লড়াইয়ে, এখনও মুখে মিলিটারি হিন্দি, তাও পনেরো আনা ভুল।

এটি বলেন স্টেশনমাস্টার, যাকে কোট ছেড়ে পিরান পরে আমরা কবিগানের আসরেও একটা কর্তৃত্বের ভূমিকা নিতে দেখব। হিন্দি এবং বাংলার প্রসঙ্গে ‘মুচি’ শব্দটাকে খেয়াল করতে ভুলবেন না। নিতাই এবং রাজা, সংস্কৃত সম্বোধনের নিয়মে যাকে ‘রাজন’ বলে ডাকে নিতাই, অত্যন্ত ভাল বন্ধু, এবং দুজনেই নিচু জাতের। নিতাই ডোম, এবং রাজন মুচি। সেই নিতাই কবিয়াল হয়ে উঠছে, যা গোটাটাই উঁচু জাতের এক্তিয়ারে, এই নাটকটাই হল ‘কবি’ ফিল্ম এবং উপন্যাসের একটা মূল চালিকাশক্তি। ‘কবি’ উপন্যাসের শুরুর প্যারাটাই হল:

শুধু দস্তুরমত একটা বিস্ময়কর ঘটনাই নয়, রীতিমত এক সংঘটন। চোর ডাকাত বংশের ছেলে হঠাত্‍ কবি হইয়া গেল।

এবং ‘কবি’ ফিল্মও তার দ্বিতীয় সংলাপেই, রাজন যেখানে ড্রাইভারকে তাড়া দিচ্ছে কবিগানের আসরের কথা তুলে, উল্লেখ করে নেয় এই কবিগানের কথা। কিন্তু এই প্রসঙ্গে আমরা পরে আসছি। তার আগে রাজনের প্রসঙ্গে কিছু বলে নিই। ‘আমার সাহিত্য-জীবন’ দ্বিতীয় খণ্ডে তারাশঙ্করের একটা ভাষ্য আছে এই রাজা চরিত্রটির মূল বাস্তব ঠিকানা নিয়ে। সেটা আগে একটু পড়ে নেওয়া যাক।

রাজার নাম রাজা মিয়া, সে জাতিতে মুসলমান এবং হিন্দীও সে বলেও না, যুদ্ধেও যায় নি, মেজাজেও মিলিটারি নয়—ওটুকু আমার চড়ানো পোষাক বা রঙ যাই হোক না কেন।

মুসলমান মূল চরিত্রের সঙ্গে হিন্দি এসে যাওয়াটা খুব একটা বিস্ময়কর লাগে না। এই গত মাসেও, পুজোর ঠিক আগে আগে, একদিন শেয়ারের ট্যাক্সিতে ফিরছিলাম। কী একটা কথায় বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের কথা ওঠে। এবং আমি তাদের বাঙালি বলে উল্লেখ করায় ড্রাইভারটি ভারি অবাক হয়ে আমায় জিগেশ করলেন, “বাঙালি কোথায়, ওরা তো মুসলমান।” এবং এ ভারী দীর্ঘস্থায়ী একটি পশ্চিম-বাঙালি ভুল। ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্ব প্রকাশিত হয় ১৯১৭-র ফেব্রুয়ারিতে, মানে যে সব বইটই পড়তে পড়তে তারাশঙ্করের লেখকজীবন শুরু হচ্ছে। তার প্রথম পাতায়, পঞ্চম প্যারাগ্রাফেই ছিল:

ইস্কুলের মাঠে বাঙালী ও মুসলমান ছাত্রদের ‘ফুটবল ম্যাচ’। সন্ধ্যা হয়-হয়। মগ্ন হইয়া দেখিতেছি। আনন্দের সীমা নাই।

মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটা ছোট্ট জিনিস লক্ষ্য করিয়ে রাখা যাক। ওই ‘ফুটবল ম্যাচ’ শব্দবন্ধটা, শরত্চন্দ্র একক উদ্ধৃতিচিহ্নের মধ্যে দিয়েছেন। আজকের কোনও বাংলা লেখায় প্রবন্ধে পত্রিকায় উপন্যাসে যা আর হয় না, কারণ তখন ওই শব্দবন্ধ বাংলা বাচনে কেবল আসতে শুরু করেছিল। ঠিক অমনই একটা জিনিস একটু বাদে আমরা ঘটতে দেখব ‘মেডেল’ শব্দটাকে নিয়ে। যাই হোক, মূল জায়গা রাজা-য় ফেরা যাক। রাজা মিয়া মুসলমান, মুসলমান মানে না-বাঙালি, সেখান থেকে এক লপ্তে হিন্দিটা এসেই যেতে পারে, শিল্পী মনের একটা খেয়ালে। যদি সেটা এসেও থাকে, যুদ্ধটা এল কেন? এবং খেয়াল রাখুন যুদ্ধটা মেসোপটেমিয়া যুদ্ধ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশের মূল ফ্রন্ট। এবং যে যুদ্ধটায় কিছু অফিসার ছিল ব্রিটিশ, কিন্ত সেক্সপিয়ারের হেনরি ফোর নাটকের ফলস্টাফ কথিত সেই ‘কামানের খাদ্য’, ক্যানন ফডার, সরবরাহ করেছিল ভারতীয়রাই।

মেসোপটেমিয়া যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী

ছবিটায় দেখুন, মূল অফিসারটি সাহেব, সামনে সারি সারি নেটিভ সৈন্য, পাশের মধ্যপদস্থ কটিও কালা-চামড়া। ছবিটা পাওয়া মেসোপটেমিয়া যুদ্ধ (১৯১৪-১৮) নিয়ে একটি লেখায় (http://www.greatwardifferent.com/Great_War/Mesopotamia/Fall_of_Kut_01.htm)। ছবিটা দেখতে দেখতে আমার একটু রাগও হচ্ছিল। এর আগে ব্রিটেনের দ্বিতীয় আফগান যুদ্ধে (১৮৭৮-৮০) প্রাপ্ত একটি যেজাইল বুলেটক্ষত কত বিরাট একটা জায়গা করে নিল ইংরিজি সাহিত্যে, যদিও গোটা শার্লক হোমসের কাহিনীমালা জুড়ে ওয়াটসনের ওই বুলেটক্ষত বারবার জায়গা বদল করেছে, কখনও হাতে কখনও পায়ে। ইংরেজরা বোধহয় নিশ্চিত ছিল না ক্ষতটা তাদের ঠিক কোথায়। ভারতীয়দের জিগেশ করলেই জানতে পারত, কত নিশ্চিত মৃত্যু তারা সমর্পণ করে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যে, ভারতীয়রা সেটা নিশ্চিত ভাবে জানত।

মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি যুদ্ধের মত এই মেসোপটেমিয়া যুদ্ধেও একটা বিরাট সংখ্যক যুদ্ধশ্রমিকই, কুলি থেকে সৈনিক, ছিল মূলত ভারতীয়। রাজনকে তারই একজন কুলি বানালেন তারাশঙ্কর। কেন? মেসোপটেমিয়া যুদ্ধের, সামগ্রীক ভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধেরই, একটা বিরাট প্রভাব পড়েছিল ভারতীয় অর্থনীতিতে সমাজে সংস্কৃতিতে। তার একটা ছায়া আছেই। আর সবচেয়ে বড় কথা সমাজবদলের একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছিল। হোমি ভাভা উত্তরআধুনিক উত্তরঔপনিবেশিক সংস্কৃতিবিদ্যায় একটা কোমের বা কমিউনিটির নিজের পরিচিতিবোধ বা আইডেন্টিটি নিয়ে খুব মনোজ্ঞ আলোচনা করেছিলেন। আমাদের মার্জিন অফ মার্জিন বইয়ে (http://ddts.randomink.org/english/mom-book/index.html) তার অনেক আলোচনা করেছি আমরা, তার সূত্রে রাজনৈতিক অর্থনীতির নানা জায়গাকে ধরার চেষ্টাও করেছি। এই লেখাটা কোনও মতেই তার সঠিক ক্ষেত্র নয়। কিন্তু মোদ্দা বিষয়টা এই যে, বাঙালি আপনা থেকে বাঙালি হয়ে ওঠে না, নিজেকে বাঙালি বলে চেনে না। লাজবাব ওটা লিখেছিলেন বিবেকানন্দ, গোরার বুটের লাথিতে আমরা সব এক আনা দুই আনা তিন পাইয়ের বিভিন্ন আর্যমাত্রার ভিন্নতা ছেড়ে এক লাথিভিত্তিক মহান ঐক্যে প্রোথিত হলাম — একই পরিচিতি — কালা চামড়া। মানে, তৈরি হল ভারত ও ভারতীয় এই পরিচিতি। ওই যুদ্ধগুলো যেমন, যুদ্ধেই তো লাথিগুলো সবচেয়ে উচ্চারিত হয়ে ওঠে, অ্যাকাডেমিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনাসভায় যে লাথিগুলো গোপন থাকে। ব্রিটিশ বুটের চামড়াও কালো হত, তখনও বিচিত্রবর্ণ মার্কিন স্নিকার চালু হয়নি। সেই কালো চামড়া ভারতরাষ্ট্রের সূচনা হওয়া মাত্রই তা খুলে দিল আরও নানা পরিচিতির দিকনির্দেশ, ভারতীয় বলেই তো সব এক নয়, সেখানে বিহারী আছে পাঞ্জাবি আছে গুজরাতি আছে। বিহারী পাঞ্জাবি গুজরাতিদের সম্মুখীনতায় এসে বাঙালি নিজেকে বাঙালি বলে চিনল জানল। মনে পড়ছে, ‘আরণ্যক’-, ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলে, সত্যচরণকে দেখে, বাঙালি বলে চিনতে না পেরে, অন্য বাঙালিরা তাকে ‘আমব্রেলু’ মানে ‘ছাতু’ বলে ডেকেছিল? নিজের পরিচিতিকে নিজের বাইরে গিয়ে দেখতে পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল সত্যচরণ, লবটুলিয়া বইহারের জঙ্গলকে ন্যাড়া করে দিতে দিতে। এইখানটায় একটা ব্যাপক ভাঙচুর আছে বিভূতিতে। লবজাগরলের বাঙালি যেমন, ‘নৌকাডুবি’-র রমেশকে ধরুন, বা ‘চরিত্রহীন’-এর সতীশ, যতবার পশ্চিমে যায়, শুধু বাঙলাভাষীদের সঙ্গে, বাঙলা ভাষাতেই কথা বলে। ‘শেষ প্রশ্ন’ ভাবুন, গোটাটা ঘটতে শুরু করছে আগ্রায়, কিন্তু আগ্রার জীবন ভাষা সমাজ কিছুই নেই। শরত্চন্দ্রের উপন্যাসের পর উপন্যাসে এরকমই চলে। পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে। সেখানে রেঙ্গুন বার্মা দক্ষিন এশিয়া অনেকটাই এসেছে, এসেছে ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসেও। অথচ বাঙালি ব্যতিরেকে অবশিষ্ট ভারত আসেনি কোথাও। আজকের মার্কিনকে যেমন রসিকতায় বলা হয়, তার কাছে রেস্ট অফ দি ওয়ার্ল্ড, অবশিষ্ট ভুবন, পৌঁছয়ই না মোটে তার কাছে, সে জানেই না ওরকম কিছু যে আছে কোথাও, বাঙালির কাছেও বোধহয় পৌঁছত না অবশিষ্ট ভারত।

এবার এর নিরিখে ‘কবি’ ভাবুন। প্রথমেই তো একটা কেলেঙ্কারি দিয়ে শুরু হচ্ছে। এক ব্যাটা ডোম, সে হল নায়ক, আর তার নিকটতম বন্ধু তথা মূল চরিত্র একটা মুচি। সেটা আবার যুদ্ধের কুলি ছিল। একই বাঙলার মধ্যে অন্য অন্য নানা বাঙলা জেগে উঠছে। শুধু বাঙলাই না, জেগে উঠছে ভারতও। একটা কোমের পরিচিতিবোধ বা আইডেন্টিটি তৈরি একটা মিশ্র সঙ্কর হাইব্রিড সাংস্কৃতিক ভূমিতে। ওই বোধটা তৈরি হয় দুটো পরিচিতি বা আইডেন্টিটির সংলাপে পারস্পরিকতায়, দুটো বর্গের মাধ্যমিক ভূমিতে, ইন্টারস্টিসে। দুটো মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ের জ্যান্ত ইতিহাসে এই ভূমিটা তৈরি হচ্ছিল, এবার তাকে ফিল্মে জায়গা করে দিল ‘কবি’। এবং দেখুন, উপন্যাস ও ফিল্মের মধ্যবর্তী দশকটায় এই পরিবর্তমান অর্থনীতির চাপটা আরও ঘনীভূত হচ্ছিল, তার প্রতিনিধি হয়ে যোগ হল সম্পূর্ণ নতুন একটি চরিত্র, বালিয়া। যে শুধু এলই না, একটা ভোজপুরী গানও গাইল, ফিল্মের প্রথম সংলাপটিও বলল। রাজন বালিয়া ইত্যাদিরা মিলে রেলপথ ও রেল ইস্টিশনকে কেন্দ্র করে রচনা করল বিভিন্ন পরিচিতিগুলির একটি সঙ্কর ভূমি। যে সঙ্কর ভূমিতে এবার রচিত হল ‘কবি’ ফিল্মের প্রেক্ষাপট। রেল এই গোটাটার আধারভূমি হয়ে ওঠাটা সেই দিক দিয়ে ভারি সঙ্গত। রেল অবশ্যই একটি প্রথমতম মাতৃক্রোড় এই সঙ্কর পরিচিতির ভূমিতে ভারতের রাষ্ট্রীয় সত্তার জন্মে ওঠার। বাঙালি বিহারী গুজরাতি সবাই যেখানে এক, রেল কর্মচারী। শুধু এই নয়, আরও নানা ভিন্ন ধরনের সঙ্কর ভূমিকে চিহ্নিত করে দেয় ‘কবি’ ফিল্ম, শিল্পের অর্থ নির্মাণের আরও কিছু বৈশিষ্টকেও নির্দিষ্ট করে দেয়, আমরা দেখতে পাব একটু পরেই। এবং রাজা সেই অর্থে একাধিক ধরনের বর্গ-সঙ্করতার আকর, যেগুলি গজিয়ে উঠছে তার ‘মুচি’ নামক প্রদত্ত আবহমান কৌম পরিচয়ের চারপাশে — সে হিন্দি বলে, সে যুদ্ধফেরত কুলি, এবং সে রেলের পয়েন্টসম্যান। এবং এই নানা ধরনের বর্গ-সঙ্করতা তাকে সামাজিক ক্রিয়ার চিরাচরিত অর্থগুলির বাইরে এসে তাকানোর সামর্থও দিয়েছিল, যা শুদ্ধ বর্গীয় অবস্থান থেকে সম্ভব ছিল না। ঠাকুরঝি ও নিতাইয়ের সম্পর্ক নয় শুধু, আরও বহু জায়গাতেই সে প্রদত্ত ছক থেকে বাইরে এসে তাকাতে পারত, আমরা ক্রমে দেখতে পাব। যে প্রশ্নটা সে পরে করবে নিতাইকে, “পেয়ারমে জাত কেয়া হ্যায়”, সেটা শুধু যে সেই নতুন অর্থকেই দেখাচ্ছে তাই নয়, প্রশ্নের গঠনটাকে ভাবুন, ‘জাত’ নামক শব্দের শব্দার্থগত অস্তিত্বের জায়গা থেকে সে প্রশ্ন করছে। শুধু বর্গটাকে অস্বীকার করা বা না মানার প্রশ্ন নয়, বর্গটাকেই সে আর খুঁজে পাচ্ছে না, সেটা তার কাছে ইতিমধ্যেই ‘কেয়া হ্যায়’ হয়ে গেছে।

==========অংশ ২ শেষ===================

Filed under: ফিল্ম — dd @ 7:59 am

1 Comment »

  1. [...] [গুরুচণ্ডালী সাইটে এই লেখাটা প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু ওদের ইউনিকোড থেকে বাংলাপ্লেন কনভার্টারে সমস্যা থাকায় ফরম্যাটিং ঘেঁটে যাচ্ছে। তাই এখানে ওই প্রতিটা অংশ, যেমন যেমন গুরুচণ্ডালীতে প্রকাশ হচ্ছে, সঠিক ইউনিকোড অবয়বে আমি দিয়ে যাব। এটা তার তৃতীয় অংশ। এই ব্লগেরই পুরনো লেখায় পাবেন এর প্রথম অংশ আর দ্বিতীয় অংশ।] [...]

    Pingback by নেটখাতা » দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৩ — January 31, 2012 @ 7:26 pm

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress