নেটখাতা

December 20, 2010

দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৩

[গুরুচণ্ডালী সাইটে এই লেখাটা প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু ওদের ইউনিকোড থেকে বাংলাপ্লেন কনভার্টারে সমস্যা থাকায় ফরম্যাটিং ঘেঁটে যাচ্ছে। তাই এখানে ওই প্রতিটা অংশ, যেমন যেমন গুরুচণ্ডালীতে প্রকাশ হচ্ছে, সঠিক ইউনিকোড অবয়বে আমি দিয়ে যাব। এটা তার তৃতীয় অংশ। এই ব্লগেরই পুরনো লেখায় পাবেন এর প্রথম অংশ আর দ্বিতীয় অংশ।]

==========অংশ ৩ শুরু===================

42
00:05:39,190 –> 00:05:49,590
_Let me be an ape, and write_
_Rama in gold on my ribs._ [12]

আহা, কপি যেন হতে পারি।/ যেন এ বুকের পাঁজরে,/ রামনামটি লেখা থাকে সোনার আখরে।

ব্রাহ্মণ বিপ্রপদ ঠাকুরের আক্রমণের বিপরীতে নিতাইয়ের এই উত্তরটির মধ্যে সেই টানাপোড়েন এবং স্ববিরোধটা নিহিত রয়েছে, এবং সেটা আগাগোড়াই থাকবে গোটা ‘কবি’ ফিল্মে, সব সময়ই খুঁজে বেড়ানো এবং কখনওই খুব স্পষ্ট করে নিজের জায়গাটা খুঁজে না পাওয়া। সে নিচু জাত, ডোম বলে নিগৃহীত যে জাতিব্যবস্থার হাতে, সেই তার কাছেই তাকে স্বীকৃতি নিতে হবে কবিয়াল হয়ে ওঠার। নিজের সামাজিক অর্থনৈতিক পেশাগত জায়গা থেকে যে বর্গ-সঙ্করতাটা অর্জন করে রাজা, কবিকে সেটা পেতে হয় নিজের শিল্পীসত্তার নির্ণয়ের প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে। যে ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থা তাকে নিচু জাত ডোম করে, সেই রামায়ণের আলোচনা বা ডিসকোর্সকে নির্ভর করেই তাকে কবিয়াল হয়ে উঠতে হয়। এই স্ববিরোধ অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠবে একটু বাদে, যখন কবিগানের আসরে তার ডোম জাতি তুলে নানা গালিগালাজের পর, নিতাইয়ের কাকা-মামা জাতভাইরা তাকে উঠে আসতে বলবে। নিতাই জানাবে যে তা সে পারে না, তাতে দেবী চণ্ডীর অপমান হবে। তখন জাতের অপমানের নিতাই তোয়াক্কা করছে না বলে তার জাতভাইরা তাকে পরিত্যাগ করবে। নিতাইয়ের ঘরের লোকেরা তাকে তখন এনে ছুঁড়ে দেবে তার বইগুলো। সেই বইয়ের সংগ্রহের মধ্যেও স্পষ্ট হয়ে উঠবে ওই স্ববিরোধ। আমরা সেই কথায় আসছি। এখানে ব্রাহ্মণ বিপ্রপদ ঠাকুরকে যে ছড়াটা বানিয়ে শোনায় নিতাই তাও রামায়ণ-নির্ভর, যে রামায়ণ ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থার একটা স্তম্ভ। নিতাইকে জাতিব্যবস্থার নিগ্রহের নিরাকরণ করতে হবে জাতিব্যবস্থার মধ্যে দিয়েই, তাকে মেনেই, তাকে অস্বীকার করে নয়। ঠাকুরঝি আর বসন, শুধু এই দুই মেরুই নয়, নিতাই আসলে নড়ে বেড়িয়েছে তার জাতিব্যবস্থার প্রত্যয়ীকৃত কবিয়াল পরিচিতি আর তার ডোম এই পরিচিতি এই দুইয়েরই ভিতর। তারাশঙ্কর তার উপন্যাসে নিতাইয়ের বিদ্যাসন্ধানের নিজস্ব রকমকে আলাদা করে দিয়েছিলেন। সেই বিবরণটার মধ্যে কলকাতা থেকে দূরে তখনকার বাংলার গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা-সংস্কৃতির একটা আলগা ছবিও পাওয়া যায়, যা বোধহয় এখনও তেমন বদলায়নি।

এই দুই বত্সরে পুরস্কার হিসাবে কাপড়, জামা, গামছা, লণ্ঠন, ছাড়াও নিতাই পাইয়াছিল খানকয়েক বই—শিশুবোধ রামায়ণ, মহাভারতের কথা, জানোয়ারের গল্প। সেগুলি নিতাইয়ের কণ্ঠস্থ। নিতাই সুযোগ পাইলে আরও পড়িত, কিন্তু একমাত্র নিতাই ছাড়া পাঠশালায় আর দ্বিতীয় ছাত্র না থাকায় পাঠশালাটিই উঠিয়া গেল। অগত্যা নিতাই পাঠশালা ছাড়িতে বাধ্য হইল। ততদিনে তাহার বিদ্যানুরাগ আর এক পথে শাখা বিস্তার করিয়াছে। এ দেশে কবির গানের পাল্লার সে মস্ত ভক্ত হইয়া উঠিয়াছে। বাংলার সমগ্র অশিক্ষিত সম্প্রদায়ই কবিগানের ভক্ত। কিন্তু সে ভক্তি তাহাদের অশ্লীল রসিকতার প্রতি আসক্তি। নিতাইয়ের আসক্তি অন্যরূপ। পুরাণ-কাহিনী, কবিতার ছন্দমিল এবং উপস্থিত বুদ্ধির চমক-দেওয়া কৌতুকও তাহার ভাল লাগে।

এবং এখানে তারাশঙ্করের নিজের শিক্ষা-সংস্কৃতি ধারণাটাও খেয়াল করবেন। ‘অশ্লীল’ শব্দটার মধ্যে একটা বিচার ও মূল্যবোধ আছে। অর্থাত্‍ আত্মঅনুকারী বা সেল্ফরিকার্সিভ রকমে নিতাইয়ের টানাপোড়েনটা তারাশঙ্করের নিজেরও টানাপোড়েন — নিচুজাতের কবিয়াল হয়ে ওঠার গল্পটা হবে নিচুজাতের গল্প নাকি জাতে ওঠার গল্প। এই টানাপোড়েন থেকে মুক্ত ছিলেন না দেবকী বসুও। পরে, ঠাকুরঝির ঝাঁড়ফুকের দৃশ্যে অনেকটাই স্পষ্ট একটা অবস্থান নিচ্ছেন দেবকী বসু, এবং সেটাও উপন্যাস থেকে নড়ে গিয়ে, যে অবস্থানটা তারাশঙ্করের ওই নবজাগরণবাদী অবস্থানের সঙ্গে খুব মেলে, ‘অশ্লীল’ শব্দটায় যা উপস্থিত।

45
00:05:59,400 –> 00:06:03,100
A ‘doam’ by caste,[13]
And a porter in this station -
46
00:06:03,250 –> 00:06:08,900
He is kapi, k a p i, not a kabi.
Do you get it?

আরে, কবি নয় রে মূর্খ, কপি। কপি। ব্যাটা জাতে ডোম, তাতে আবার ইস্টিশনের কুলি। সে কি কখনও কবি হতে পারে? কপি। ক, -এ হসসি কার। মানে বুঝলি?

বিপ্রপদ ঠাকুরের সংলাপের এই নাটকটা দিয়েই ‘কবি’ উপন্যাস শুরু হয়েছিল। ‘কবি’ ফিল্মে সেটা এল ঠিক ৫ মিনিট ৫৯ সেকেন্ডে, মানে নামঘোষণা বা টাইটলের পর ২ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে চিত্রাংশ শুরুর ৩ মিনিট ২৯ সেকেন্ডের মাথায়। জাতিব্যবস্থার শরীরে এই আঘাতটার কথা আমরা ‌আগেই উল্লেখ করেছি। এবং আর এক বার আমরা দেখে নিই ‘কবি’ উপন্যাসের সেই প্রাথমিকতম প্যারাগ্রাফটা।

শুধু দস্তুরমত একটা বিস্ময়কর ঘটনাই নয়, রীতিমত এক সংঘটন। চোর ডাকাত বংশের ছেলে হঠাত্‍ কবি হইয়া গেল।

ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা উপাদান কি এখানে খেয়াল করতে পেরেছেন? যদি না পেরে থাকেন, তাহলে দেবাশিস হলে আপনি বকা তো খেতেনই, এমনকি আমার মুড ভাল থাকলে বলতাম, থাক শালা, কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক। তাতে অবশ্য হারগিস কর্ণপাত মানে কর্ণহাত করার ছেলেই নয় এসব। বলত, যা বলছ বলো তো। বিপ্রপদ ঠাকুরের সংলাপ আর উপন্যাসের প্রথম প্যারাগ্রাফটা পাশাপাশি আর এক বার পড়ে দেখুন তো। খুব চিত্তাকর্ষক উপাদানটা হল সেই হাইব্রিড স্পেস বা সঙ্কর ভূমি যাকে আমরা মার্জিন অফ মার্জিনে সিন্থেটিক স্পেস বা কৃত্রিম ভূমি বলে ডেকেছিলাম। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ব্রিটিশের কালো বুটের কাজলকালো ছায়ায় নির্মীয়মান ঔপনিবেশিক পুঁজির মরডান (অনেক লোকেই দেখেছি, কিছুতেই র-টা ড-এর পরে বলে না, শত ধরিয়ে দিলেও, একটু ডর লাগে বলে? সেরকম বানানই লিখলাম।) হতে থাকে ভারতরাষ্ট্রে যে ঐতিহ্যটা আমরা পাচ্ছি তা আর আধুনিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন বিশ্লিষ্ট কর্তিত কিছু নয়, তারা এ অন্যের মধ্যে প্রথম থেকেই বসে আছে, সম্রাট কণিষ্ক যার নাম দিয়েছিলেন অতিনির্ণয় বা ওভারডিটারমিনেশন। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এই গোড়া থেকেই শোয়াশুয়িটা উপন্যাস ‘কবি’ ধরতে পারেনি, কিন্তু ফিল্ম ‘কবি’ পেরেছিল। উপন্যাস যেখানে শুধু বংশ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেই থেমে গেছিল, ফিল্মকে সেখানে ঠিক তার পাশাপাশি উল্লেখ করে দিতে হয় তার আধুনিকতার তকমা মানে চাকরির পদকেও। শুধু তার ডোম বংশ নয় কুলিগিরির চাকরিকে একই সঙ্গে জানিয়ে দিয়ে সেই একই নাটককে নতুন চেহারায় হাজির করে দেয় ‘কবি’ ফিল্ম। একটু পরে ঠিক এটাই দেখব আমরা কবিগানের আসরে। চণ্ডীর থানের মহান্ত আর স্টেশনমাস্টার তারা পাশাপাশি চেয়ারে আসীন থাকবেন। কর্তৃত্ব এবং ক্ষমতা আর ঐতিহ্য দিয়ে হচ্ছে না, তাকে আধুনিকতার আশ্রয় নিতেই হচ্ছে। তার পাশাপাশি আরও একজন থাকবেন। বর্গসঙ্করের কুলতালিকায় আমাদের বাঙালিদের আর একটা নিজস্ব সংযোজন। সে কথায় পরে আসছি।

57
00:07:03,500 –> 00:07:10,800
They all went to kabigan,
In Chandi-Mother’s fair.[16]

তুমহারে বহু, তুমহারে বেটোয়া, চণ্ডীমাই কি মেলোয়া পর গইলন হ্যায়, গানা সুননে লে।

এই সংলাপটা, এবং পরবর্তী বালিয়ার পরপর সংলাপগুলি সবই তির্যক ভাবে, সেই ভাষাগত বর্গসঙ্করতারই চিহ্ন। এটা একটা বাংলা ফিল্ম, অথচ তার দর্শক নিশ্চয়ই প্রস্তুত এই হিন্দি বাক্য কটির অর্থ অনুধাবনে। এবং ফিল্মেও একাধিকবার আমরা দেখব হিন্দি কথার উত্তরে বাঙালি মানুষ ঠিকভুল হিন্দি বাংলা মিশিয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছে। মানে, এক কথায় হিন্দি যে আছে সেই অস্তিত্বটা চিহ্নিত হচ্ছে এই বাস্তবতায়, এবং ‘কবি’ ফিল্ম সেই বাস্তবতাটাকেই হাজির করে দিচ্ছে তার নিজের শরীরেই।

==========অংশ ৩ শেষ===================

Filed under: ফিল্ম — dd @ 11:16 am

1 Comment »

  1. [...] লেখায় পাবেন এর প্রথম, দ্বিতীয়, আর তৃতীয় [...]

    Pingback by নেটখাতা » দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৪ — January 11, 2011 @ 10:15 am

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress