নেটখাতা

January 11, 2011

দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৪

[গুরুচণ্ডালী সাইটে এই লেখাটা প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু ওদের ইউনিকোড থেকে বাংলাপ্লেন কনভার্টারে সমস্যা থাকায় ফরম্যাটিং ঘেঁটে যাচ্ছে। তাই এখানে ওই প্রতিটা অংশ, যেমন যেমন গুরুচণ্ডালীতে প্রকাশ হচ্ছে, সঠিক ইউনিকোড অবয়বে আমি দিয়ে যাব। এটা তার চতুর্থ অংশ। এই ব্লগেরই পুরনো লেখায় পাবেন এর প্রথম, দ্বিতীয়, আর তৃতীয় অং।]

==========অংশ ৪ শুরু===================

61
00:07:29,900 –> 00:07:33,500
And that milkmaid, she too.

আউর ও ছোকরিয়া গাঁওকে — গোয়ালিন।

এখানেই প্রথম উল্লেখ আসছে ঠাকুরঝির। এবং এটা লক্ষণীয় যে সে আসছে ‘গোয়ালিনী’ এই উল্লেখে। গোটা শাস্ত্র লোককথা উপকথা রূপকথা মিলিয়ে রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক আলোচনার, ডিসকোর্সের যে অজস্র সরাসরি তির্যক এবং উপ্ত উল্লেখ বা চিহ্ন ‘কবি’ ফিল্মে আমরা পেতে যাচ্ছি, এটাই তার প্রথম। কবিয়াল নিতাই কয়লা বা কাজলের মত কাল, তার প্রেমিকা অন্য পুরুষের পত্নী এবং গোয়ালিনী, নিতাই তাকে ছেড়ে চলে যায় অন্য রমণীর কাছে, যাকে এই ফিল্মেই সরাসরি চন্দ্রাবলী বলে ডাকা হয়। রাধা-কৃষ্ণ কাহিনীর ছকটা এখানে কোনও মতেই এড়ানো যায় না। তার প্রথম সঙ্কেতটা আমরা পাচ্ছি বালিয়ার এই সংলাপে।

65
00:07:44,600 –> 00:07:47,200
My wife’s sister – ‘thakurjhi’?[17]

আরে ও তো হামারে জরুকে বহিন হ্যায় রে — ও ঠাকুরঝি?

ফিল্মের মূল ছয়টি নারী চরিত্রর ভিতর তিনটি হল ঠাকুরঝি, রাজার স্ত্রী, ঠাকুরঝির শাশুড়ি বা বৃন্দাবনের মা — এদের কারুরই ব্যক্তিনাম আমরা জানতে পারি না গোটা ফিল্ম জুড়েই, একবারও উল্লিখিত হয় না। এরা সকলেই সুব্যবস্থিত নারী, পরিবারকাঠামোর মধ্যে অবস্থিত। যে দুটি নারী চরিত্রের নাম আমরা জানতে পারি, বসন বা বসন্ত এবং নির্মলা — তারা দুজনেই ঝুমুর দলের শিল্পী মানে নর্তকী গায়িকা এবং বেশ্যা, এক কথায় পরিবারতন্ত্রের বাইরে। ছয় নম্বর চরিত্রটি আরও আকর্ষণীয়, গোটা ফিল্মে তারও নাম একবারও উল্লিখিত হয়নি, তিনি ঝুমুর দলের প্রধান, সবাই তাকে ডাকে ‘মাসি’ বলে। আবার একটা সম্পর্কের নাম, কিন্তু যা আর বংশলতিকা সূত্রে আহরিত নয়, কাজের সূত্রে পাতিয়ে তোলা একটা নকল আরামদায়ক পারিবারিকতার অংশ। এরকম পাতিয়ে তোলা আমরা ফিল্মেই একবার দেখব, নির্মলাকে যখন দিদি মানে বোন বলে ডাকবে নিতাই, সঙ্গে সঙ্গেই ভাইফোঁটার উল্লেখ নিয়ে আসবে মাসি, সম্পর্কের প্রত্যয়ীকরণের স্বার্থে। এই সম্পর্কের নাম দিয়ে ডাকা নারীরা সেই সময়ের সমাজে ক্ষমতার মানচিত্রে এবং পরিবারতন্ত্রে নারীর অবস্থানকে এক ভাবে চিহ্নিত করে। এই পরিপ্রেক্ষিতের সাপেক্ষে ঠাকুরঝির প্রেমের আবেগে ব্যক্তি অভিলাষের আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণকে আরও নাটকীয় লাগে। কিন্তু একটুও অবাস্তব হয়ে ওঠে না তার একটি ঘোষণাও। বাংলা ফিল্মে বোধহয় এখনও দুর্লভ এই বাস্তবতাবোধ যার মধ্যে আসীন অবস্থায় এই চরিত্রগুলিকে ‘কবি’ ফিল্মে আমরা পাই।

68
00:08:02,300 –> 00:08:09,200
(Mahadev kabial vocalizing)

মহাদেব কবিয়াল তানা নানা করছে, কবিগানের আসর শুরুর অপেক্ষায়, সম্মুখভূমিতে। এবং পশ্চাত্ভূমিতে একটা জরুরি জিনিস চিহ্নিত হয়ে চলেছে। জায়গা নিয়ে রয়েছে মহান্ত। তার দুই পাশে ফাঁকা জায়গা। জনসাধারণ বসে মাটিতে এবং উচ্চাসন রয়েছে মাত্র হাতে গোনা গুটি কয়েক। দৃশ্য চলছে। মহান্ত ঠাকুরের বাঁপাশে এসে বসলেন ইস্টিশনের স্টেশনমাস্টার। মহান্ত আর স্টেশনমাস্টার দুজনেই বসলেন। এবার এলেন তৃতীয় উপস্থিতি সেই বাঙালি বাবু, যাকে একটু আগে আমরা উল্লেখ থেকে বিরত ছিলাম, তাঁর হাতে কোঁচা ও ছড়িটিও আছে। তিনি সমাগত হওয়ায় মহান্ত উঠে দাঁড়ালেন, বাবু বসলেন মহান্তের ডানপাশে, মহান্ত আবার বসলেন। সেই দুজনকে দুপাশে নিয়ে যাদেরকে মহান্ত পাত্তা দেন, পাত্তা দিতে হয় যাহাদের। ব্রিটিশের রেলের স্টেশনমাস্টার এবং ব্রিটিশের মেকলেশিক্ষার বাবু। এবং ক্ষমতার এই তিন বিন্দুই চিহ্নিত হয় তখনকার চালু ঔপনিবেশিক পুঁজির বাজারের সাপেক্ষে। বাবু ও মহান্ত আসীন হওয়া মাত্র পর্দায় আমরা দেখি পাঁপড়ভাজা বিক্রির ঝুড়ি। “এই, ফুরিয়ে গেল।” দেখা যাক, তারাশঙ্কর এই বাবু-উপস্থিতিকে উপন্যাসে কী ভাবে লিখেছিলেন।

বাবুদলের মধ্যে একজন কলিকাতায় চাকরি করেন, ময়লা কাপড়-জামার গাদার মধ্যে তিনি ধোপদুরস্ত পাটকরা বস্ত্রের মতই শোভমান ছিলেন। চালটিও তাঁহার বেশ ভারিক্কী, তিনি খুব উঁচুদরের পায়াভারী পৃষ্ঠপোষকের মত করুণামিশ্রিত বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিলেন—বল কি, অ্যাঁ? নেতাইচরণের আমাদের এত গুণ! A poet! বাহবা, বাহবা রে নিতাই! তা লেগে যা রে বেটা, লেগে যা।

এ গেল অনুষ্ঠান শুরুর আগে। কবিয়াল যুদ্ধে মহাদেব কবিয়ালের সঙ্গে নিতাইয়ের জয়ের পর সেই জয়ঘোষণাও স্পষ্ট উচ্চারিত ভাবে এল ওই বাবুরই গলায়।

চাকুরে বাবুটি করুণামিশ্রিত প্রশংসার হাসি হাসিয়া বার বার বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিলেন—ইউ আর এ পোয়েট, অ্যাঁ! এ পোয়েট! ইউ আর এ পোয়েট! কথাটার অর্থ বুঝিতে না পারিয়া নিতাই বিনীত সপ্রশ্নভঙ্গীতে বাবুর দিকে চাহিয়া বলিল—আজ্ঞে? বাবু বলিলেন—তুই তো একজন কবি রে।

এবং ঔপনিবেশিক শিক্ষার যে বিকটতাটা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করি আমরা, শিক্ষাশ্রমিকরা, মাস্টারমশাইরা, সেটার একটা বিজ্ঞাপনও এখানে রয়ে গেল, সেটা খেয়াল করেছেন কি? বাবু নিতাইয়ের বোঝার স্বার্থে তার ভুল ইংরিজি বাক্যকে ঠিক অনুবাদ করে শোনালেন নিতাইকে। নিতাইকে যা বললেন সেটা ঠিক, নিতাই কবি, যা শুনে নিতাই বিমুগ্ধও হল। কিন্তু সেই ‘কবি’ শব্দের ইংরিজি তো ‘পোয়েট’ নয়। ‘কবি’ শব্দটা এখানে ‘কবিয়াল’ শব্দের সংক্ষেপ, ‘কবিগান’ ক্রিয়ার সঙ্গে যা সম্পৃক্ত। যা আধুনিক শহুরে বাংলার ‘কবি’ শব্দটায়, বা ইংরিজি ‘পোয়েট’ শব্দটায়, অন্তত তাদের চালু অর্থে কিছুতেই আসে না। ওই শব্দদুটি সংযুক্ত কবিতা বা পোয়েট্রির সঙ্গে, যা পড়া যায়, পাঠ করা যায়, এমনকি আবৃত্তিও করা যায়। কিন্তু, কবি বা পোয়েটকে একটা লড়াইয়ের ময়দানে, সংলাপের রূপারোপে, বিপক্ষের গানের বিপরীতে গান বেঁধে সেই গানে সুর দিয়ে বাজনা সহ গাইতে হয় না। সেই ক্রিয়াটার নামই কবিগান। সেই কবিতা আর আধুনিক শহুরে বাংলায় ‘কবি’ শব্দটা হল ইংরিজি ‘পোয়েট’ শব্দের বাংলা রূপ। তার মানে এখানে আদানপ্রদানটা ঘটছে তিনটে ভাষার মধ্যে, আধুনিক শহুরে বাংলা, পুরনো গ্রামীন বাংলা, এবং ইংরিজি। ইংরিজি শব্দের বাংলা রূপান্তরে ‘কবি’ শব্দটা চলে এল। একই শব্দ দুটো আলাদা ভাষায়, পুরনো গ্রামীন বাংলা এবং আধুনিক শহুরে বাংলা, দুটো আলাদা অর্থ হাজির করল। ‘পোয়েট’ বা তার অনুবাদে শহুরে বাংলায় ‘কবি’ এই শব্দে মূল অর্থটাই হারিয়ে গেল। লস্ট ইন ট্রান্সলেশনের এ এক অন্য জাতের উদাহরণ।

অথচ এই ইংরিজি শব্দে শিক্ষিত এবং ভাষায় অশিক্ষিত ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত বাবুটির হাত ধরেই আসছে নিতাইয়ের স্বীকৃতি। এবং তারাশঙ্করও তাদের জন্যেই লিখছেন যাদের মধ্যে কিছুতেই নিতাই পড়ে না। কারণ নিতাই তো ইংরিজি বর্ণমালাই জানে না। তারাশঙ্কর একাধিকবার ‘পোয়েট’ শব্দটাকে ইংরিজি বর্ণমালায় লিখছেন। বাংলা তো তারাই পড়ে যারা ইংরিজি জানে, মানে, জানে বলে ভাবে, আসলে বেশির ভাগ সময়ই জানে না। তারাশঙ্কর নিজেও তার পাঠককে আলাদা করে দিয়েছেন নিতাই থেকে, যেমন ওই বাবুটিও করেছিলেন। তিনি জানেন নিতাইরা কোনওদিনই ওই উপন্যাস পড়বে না। এটার মধ্যে কোনও নাটকীয়তাও নেই। এটা খুব জানা কথাও। এখানে একটা বড় পার্থক্য করে দেয় ফিল্ম মাধ্যমটা। সেই পার্থক্যের কথায় আমরা পরে আসছি। তার আগে এই জায়গাটা আর একবার খেয়াল করিয়ে দিই, এই দুই স্তরে দুবার নিতাইদের ত্যক্ত বহিষ্কৃত করে দেওয়ার শিক্ষা রাজনীতির প্রসঙ্গটা। এটাও নতুন কিছু নয়। মার্জিন অফ মার্জিনে আমরা আলোচনা করেছিলাম এরকম আর একটা দ্বিস্তর বর্জনের। বঙ্কিম তার কৃষ্ণচরিত্রে কৃষ্ণ তথা হিন্দু ঐতিহ্য বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বেশ কিছু জায়গায় নৈঃশব্দ্য দিয়েছিলেন। জাতিভেদ ইত্যাদি বিষয়কে আনেন নি তাঁর আলোচনায়, কারণ যে পশ্চিমী মনের পাঠকের জন্যে তিনি লিখছিলেন, তাঁর রুচিকর লাগতে নাও পারে ওই আলোচনা। এবার পার্থ চ্যাটার্জি যখন বঙ্কিমকে আনেন তাঁর সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের আলোচনায়, সেখানে তিনি বঙ্কিমের ওই নৈঃশব্দ্যকে চিহ্নিত করেন না। তার মানে জোড়া নৈঃশব্দ্য বুকে নিয়ে গড়ে ওঠে চালু সংস্কৃতিবিদ্যার কৃষ্ণ ডিসকোর্স, কৃষ্ণ বিষয়ক আলোচনা। এটাকে আমরা এনেছিলাম আমাদের এই যুক্তির সমর্থনে যে ঐতিহ্য আর আধুনিকতা কোনও আলাদা বর্গ আর নয়, তারা এ অন্যের বুকের মধ্যেই বসে আছে, ইতিমধ্যেই সদাসর্বদাই। যদি কেউ এই আলোচনাটা পড়তে আগ্রহী হন, তাহলে মার্জিন অফ মার্জিনের উল্লেখ তো আগেই করেছি, এছাড়া আমার বাংলা দুটো প্রবন্ধেও এটা পাবেন, ‘মার্জিন অফ মার্জিন: একটি অটেকনিকাল ভূমিকা’, বা ‘কলোনি যায়নি মরে আজো’। এই দুটো প্রবন্ধই পিডিএফ আকারে রাখা আছে আমার বাংলা প্রবন্ধের নেটপাতায় (http://ddts.randomink.org/bangla/index.html)। এই স্তরবিন্যস্ত নৈঃশব্দ্যকে কী ভাবে একটা ফিল্ম হিসাবে ‘কবি’ এড়িয়ে যেতে পারল, সেটার কথায় আসছি আমরা একটু পরেই।

সেই যে রেলের প্রসঙ্গ থেকে শরত্চন্দ্র আসতে শুরু করল, বারবার মাথায় এসেই যাচ্ছে এগুলো। এই বাবুর শরত্চন্দ্র সংস্করণটা মনে পড়ছে? এলএ পাশ করার পর ডেপুটি হওয়ার অপেক্ষারত নতুনদা? নতুনদা নামে যদি মনে নাও পড়ে, পাম্পশু থেকে নিশ্চয়ই পড়বে। এই বাবুটিরই নিকট কেউ হওয়ার সম্ভাবনা আছে নতুনদার। নভেম্বর বিপ্লবের বছরে শ্রীকান্ত ছাপা, তার বেশ কিছু বছর আগে ঘটেছিল নতুনদা উপাখ্যান, শ্রীকান্তর কিশোর বয়সে। ১৯০০ সালে শরত্চন্দ্রের বয়স ১৪, তার মানে ১৯০২ নাগাদ ধরে নিতে পারি নতুনদা মাঘের শীতে বরফশীতল নদীর জলে ডুব দিয়ে বসে কুকুরের হাত থেকে বেঁচেছিলেন, তখন যদি তার বয়স বাইশ-চব্বিশ ধরে নিই, তাহলে ১৯৩৮-এ তার বয়স প্রায় ষাট। তাহলে তারাশঙ্করের এই বাবুটির পিতা তিনি হতেই পারেন। এবং এই বংশধারা তো আবহমান ছিলই। শ্রীকান্তর বন্ধু ইন্দ্রর দাদা নতুনদা উপাখ্যান অন্তে একটি অনাবিল অপ্রতিরোধ্য ভাঁড়ে পর্যবসিত হয়েছিলেন, কিন্তু সে তো শরত্চন্দ্রের পোয়েটিক জাস্টিস, কাব্যিক ন্যায়বিচার, আদতে ঘটনাটা ছিল এই যে, যদি এমনকি ভাঁড় হয়েও থাকে, সেই ভাঁড়ই, সেইরকম ভাঁড়েরাই, ফিরে গিয়ে ডেপুটির চাকরি পাবে, ইন্দ্র জানিয়েছিল শ্রীকান্তকে। ডেপুটি মানে বোধহয় ডেপুটি-ম্যাজিস্ট্রেট, নিশ্চিত জানিনা। তার পরেই শরত্চন্দ্রের মন্তব্য ছিল, যতদূর মনে পড়ছে, অনেক বছর হয়ে গেল শ্রীকান্ত পড়েছি, যা সব সরকারি অফিসারদের ক্রিয়াকলাপ দেখছেন, তাতে তিনি নিশ্চিত হতে পারেন, যে নতুনদা নিশ্চয়ই ডেপুটি হয়েছিল। নতুনদা এমনকি নিজের শরীরকে ভুলে শরীরের পোষাককে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, সজ্জাকে নিয়ে, ‘কবি’ ফিল্মে দেখুন পুরো সময়টা জুড়ে কী আড়ষ্ট খাড়া হয়ে বসে থাকেন বাবুটি, তার ছড়ি পোষাক সজ্জা বসার ভঙ্গী সবকিছু দিয়েই তাকে তার চারপাশ থেকে নিজেকে পৃথক করতে হবে, হবেই। নিজেকে আলাদা বলে প্রমাণ করার এই দায়ভার নিয়ে অনেক আলোচনা আছে মার্জিন অফ মার্জিনে, বা ওই দুটো প্রবন্ধে যার উল্লেখ আগেই করলাম। এই আলাদা করার মধ্যে আছে তার নিজেকে চিনতে চাওয়া, নিজের পরিচিতি বা আইডেন্টিটিকে স্পষ্ট করা, কারণ প্রথম থেকেই এই ব্যক্তিত্বের জন্ম একটা নাকচকরণের প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে। এই বাবু সাহেব হতে চায়, যা সে পারে না, তার নিজের আয়নায় নিজের বিম্বই তাকে প্রমাণ করে দেয়, সে অসফল, তাই সে নিজের বিম্বর প্রতিই বিতৃষ্ণ। এখান থেকেই তৈরি হয় নিজের বাইরে নিজের থেকে পৃথক একটা বিম্ব নির্মাণের চেষ্টা। কিন্তু মজাটা এই যে, এই সমস্ত বিম্ব নির্মাণের ভাঁড়ামির পরও, এই বংশধারা কিন্তু প্রবাহিত হয়ে চলে। নতুনদা ডেপুটি হয়। ভাঁড়ের জন্য যথাযোগ্য ভাঁড়িনী খোঁজা হয়, তার মধ্যে ধর্ম জাত জ্যোতিষ লোকাচার থাকে, তার মধ্যে দিয়ে চলে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের সিলেক্টিভ ব্রিডিং, তৈরি হয় ছানাভাঁড়, সে আসে কবি দেখতে, এসে নিতাইকে পোয়েট বলে ডাকে।

দেবাশিসকে ‘কবি’ দেখাতে গিয়ে বলেছিলাম, ওই দৃশ্যে এসে, ওই দেখ তোর পূর্বপুরুষ। ওকে বংশলতিকাটা দেখিয়ে দিয়েছিলাম, ওই বাবুটির ছানা পরে কভেনান্টেড অফিসার হবে, তার ছানা হবে কর্পোরেট সেক্টর, তার ছানাদের কেউ কেউ যাবে আইটি-তে, দেবাশিস যেখানে কাজ করে। দেবাশিস মোটেই গায়ে লাগায়নি কথাটা, আমার ছেলে যেমন বলত তার ছোটবেলায়, মেয়েও বলে এখন, বাবা তুমি ভীষণ আজেবাজে কথা বলো, সেটা দেবাশিসও জানে। তখন ওর অভিজ্ঞতা থেকেই দেখিয়েছিলাম, ও ভারতের আইটি সেক্টরের সবচেয়ে নামকিন প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করে, সেখানের অভিজ্ঞতাই, একজন কম্পুটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়র হয়ে ওর কাজ হল সারাদিন বসে থাকা, আর একটা কল-সেন্টার চালানো। বিদেশ থেকে ফোন আসবে, তাকে জানিয়ে যেতে হবে হ্যাঁ, বিদেশে তৈরি বিদেশ থেকেই চালানো ওই সফটওয়ারগুলি ঠিকঠাকই চলছে। এবং সবচেয়ে রোমহর্ষক এবং বিপদসঙ্কুল (বাংলায় যাকে আমরা চ্যালেঞ্জিং বলি) কাজ হল মাঝে মাঝে কাজ করতে থাকা শেল-স্ক্রিপ্টের ডাম্প নেওয়া, এবং সেগুলি থেকে দেখে নেওয়া ফলাফল যেমন কাঙ্খিত তেমন আসছে কিনা। এবং এই ডাম্পটা ও ঠিকঠাক নিতে পারে বলেই নাকি ওর অনেক সহকর্মী ওর দিকে মুগ্ধ চোখে তাকায়। এই হল কম্পুটার শিক্ষা ও কম্পুটার এনজিনিয়ারিং এর ভারতীয় ক্ষেত্রের একটি উচ্চতম নমুনা। কল সেন্টারের সাইবারকুলি ও সাইবারমজুর হওয়ার জন্যে যা দরকার ওদের ইন্টারভিউয়ে ঠিক সেইসব প্রশ্নই করা হয়, যোগ বিয়োগ ঠিক পারে কিনা, ইংরিজিতে প্রশ্ন করলে বোঝে কিনা, ইত্যাদি। চাকুরিক্ষেত্রে উন্নতির জন্য সেখানে কোনও কম্পিউটার সম্পৃক্ততা নয়, প্রয়োজন পড়ে গলার জাঙ্গিয়া (কোনও অসভ্যতা করছি না, ওটা ইংরিজি টাইয়ের হিন্দুস্থানী ‘কন্ঠো কে লঙ্গোট’ শব্দবন্ধের বাংলা) ব্যবহারের নিখুঁত অভ্যাস। অর্থাত্‍, সেই ভাঁড়ামো সমানে চলিতেছে। এবং সিলেক্টিভ ব্রিডিং-ও। ওর জন্যে পাত্রী দেখে উচ্চঘর কন্যাপক্ষ থেকে আমি দুই পয়সা কামাতেও পারি, বড় দরকার আমার, দুই দশক হতে চলল আমার কোনও প্রোমোশন হয়নি। আইটি সেকটরের সাইবারকুলিগিরি সংক্রান্ত এই ভাঁড়ামোটা বেশ ভাল করে এসেছে আমার শেষ বইয়ে। কম্পুটার ও নেটওয়র্ক এসে যাওয়া মাত্র, পুঁজি পেল অনন্ত গতিশীলতা, শ্রম পেল অনড় স্থবিরতা, এবং বদলে গেল গোটা শ্রম-সম্পর্কের কাঠামোটাই, তার সাপেক্ষে ভারতের আইটি সেক্টরের এই কল সেন্টার চরিত্রকে নিয়ে আমার কাটাছেঁড়াটা নিয়ে কেউ যদি আগ্রহী হন, সেটা পাবেন ‘ফ্লস ও হেজেমনি’ বইয়ে (http://ddts.randomink.org/flossbook/index.html) এবং বিশেষ করে তার সপ্তম অধ্যায়ে। যাকগে, আবার মূল জায়গায় ফেরত যাওয়া যাক। আর বাজে বকা নিয়ে নালিশ করার কিছু নেই, আগেই বলেছি, আমি তৃতীয় প্রজন্মের মাস্টার।

93
00:09:56,800 –> 00:10:00,090
((Disapproval – Balohari Haribol[21]))
Silence, silence, order, order.[22]

সাবটাইটলের এসআরটি ফাইলের গোড়াতেই বলে দেওয়া ছিল, দুই ব্রাকেটের মধ্যে, (()), দেওয়া আছে পরিপ্রেক্ষিত সংক্রান্ত মন্তব্য, যেমন লোটনদাস কবিয়ালের না-আসার সংবাদে তৈরি হওয়া বিরক্তির রব “বলহরি হরিবোল”, যা আবার শবযাত্রার স্লোগানও বটে। তারাশঙ্করের ভাষায়, “অর্থাত্‍ মেলাটির শবযাত্রা ঘোষণা করিয়া দিল।” কিন্তু উপন্যাসে ছিল এই সংক্রান্ত আর একটা মজার উপাদান। ঝুমুর গানের আসরে, যে ঝুমুর হল কবিগানেরই আরও অনেক প্রাকৃত, ‘অশ্লীল’ একটি সংস্করণ, “হরিবোল” ছিল প্রশংসাও।

পয়সা-আনি-দুয়ানি-সিকি-আধুলিতে প্যালার থালাটা ততক্ষণে একেবারে ভরিয়া উঠিয়াছে, গোটা টাকাও পড়িয়াছে দুই-তিনটা। গান শেষ হইতেই শ্রোতারা হরিবোল দিয়া উঠিল—হরি হরি বল ভাই। বিচিত্র, ইহাই উহাদের সাধুবাদ!

ঝুমুরের মধ্যেই গোড়া থেকেই এই বিকৃতি বা সাবভারশনটা আছে। চালু সমাজ ডিসকোর্সের শোকবার্তাটা এখানে একটা সাধুবাদ। তারাশঙ্কর উপন্যাসে ঝুমুরের একটা আলগা সংজ্ঞা দিয়েছেন। এবং সেই বিবৃতির মধ্যেও থাকে লেখকের সেই বিষয়ী-সংস্থান যা ঝুমুর বলে জিনিসটাকে চেনে, কিন্তু কোনও মতেই তার অংশ নয়, তাকে সমর্থনও করে না।

বহু পূর্বকালে ঝুমুর অন্য জিনিস ছিল, কিন্তু এখন নিম্নশ্রেণীর বেশ্যা গায়িকা এবং কয়েকজন যন্ত্রী লইয়াই ঝুমুরের দল। আজ এখান, কাল সেখান করিয়া ঘুরিয়া বেড়ায়, গাছতলায় আস্তানা পাতে, কেহ বায়না না করিলেও সন্ধ্যার পর পথের ধারে নিজেরাই আসর পাতিয়া গান-বাজনা আরম্ভ করিয়া দেয়। মেয়েরা নাচে, গায়—অশ্লীল গান। ভনভনে মাছির মত এ রসের রসিকরা আসিয়া জমিয়া যায়।

অথচ, এই ঝুমুর দলের বেশ্যা বসনই, উপন্যাসের শিল্পের টানে, জীবনের ঘটনার মোচড়ের অভিজ্ঞতাতেই হয়ত, হয়ে দাঁড়ায় উপন্যাসের মূল একটি চরিত্র। শিল্প তার নিজের জোরেই, প্রতিটি ক্ষেত্রেই, শিল্পীকে অতিক্রম করে যায়। যাই হোক, চলে আসা যাক ফিল্মের এই জায়গার অন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটার বিষয়ে।

সাইলেন্স, সাইলেন্স। অর্ডার, অর্ডার।

উঠে দাঁড়িয়ে বলে ওঠার আগের মুহূর্তটি পর্যন্ত আড়ষ্ট ভাবে বসে ডানে বাঁয়ে কলের পুতুলের মত মাথা-নাড়ছিলেন। এবং যে যখন কথা বলছে তখন তার দিকে তাকাচ্ছিলেন। ওইটুকু দূরত্বে দৃষ্টিকোণ বদলাতে বোধহয় অতটা ঘাড় বেঁকানোর দরকার পড়ে না, শুধু চোখ নড়িয়েই দৃশ্যবস্তুর বদলকে ধরা যায়, কিন্তু তাহলে নাড়াচ্ছিলেন কেন? চারপাশটার সঙ্গে তার অনভ্যস্ততার দূরত্বটাকে প্রকট করতে? এবার বাবুটি উঠে দাঁড়ালেন এবং বিচারপতির হাতুড়ির মত করে, বোধহয়, হাতের ছড়িটিকে নাড়াতে নাড়াতে বললেন তার কথাটি। সেই কথাটি যা নিতাইরা বোঝে না। বোঝার দরকারও পড়ে না নিতাইদের। খুব প্রয়োজন পড়লে তারা জিগেশ করে নেন, এবং বাবুরা তখন ভুল অনুবাদ করে সেটা শুনিয়ে দেন। পুরো দৃশ্যটা জুড়ে, সেই মহাদেব কবিয়ালের তানানানা থেকে শুরু করে, বাবুটির ভাঁড়ামোকে দেবকী বসু পুরো একটা চিত্রগত গঠনে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর গোটা আচরণটাকে পর্যবসিত করেছেন কিছু ভঙ্গীতে, যা শ্রবণে এবং দৃষ্টিতে অনুভব করে নেওয়া যায়, তাতেই তার অর্থটা বোধগম্য হয়ে যায়, ভাষার যেখানে আর প্রয়োজন পড়ে না। মাথায় ভেবে দেখুন, বাবুটির গোটা ক্রিয়াটি কিছু ধ্বনি ও চিত্রে বোধযোগ্য, সেটা ভাষার অতীত, তিনি যে ভাষাতেই চেঁচান না কেন, ‘সাইলেন্স’ না বলে ‘সিঁলস’ বা ‘খামোশ’ বা ‘সিলেনজিও’ বলে চেঁচাতেন, ওই ভঙ্গীগুলো একই রেখে, তাহলেও গোটা বিষয়টা থাকত একই।

==========অংশ ৪ শেষ===================

Filed under: ফিল্ম — dd @ 10:15 am

1 Comment »

  1. [...] পাবেন এর প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় আর চতুর্থ [...]

    Pingback by নেটখাতা » দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৫ — January 20, 2011 @ 9:07 am

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress