নেটখাতা

January 20, 2011

দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৫

[গুরুচণ্ডালী সাইটে এই লেখাটা প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু ওদের ইউনিকোড থেকে বাংলাপ্লেন কনভার্টারে সমস্যা থাকায় ফরম্যাটিং ঘেঁটে যাচ্ছে। তাই এখানে ওই প্রতিটা অংশ, যেমন যেমন গুরুচণ্ডালীতে প্রকাশ হচ্ছে, সঠিক ইউনিকোড অবয়বে আমি দিয়ে যাব। এটা তার পঞ্চম অংশ। এই ব্লগেরই পুরনো লেখায় পাবেন এর প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় আর চতুর্থ অংশ।]

==========অংশ ৫ শুরু===================

দেবকী বসুর কবি, ১৯৪৯ — দ্বিতীয় প্রবাহ

অধ্যায় বোঝাতে ‘প্রবাহ’ ব্যবহার আমি কখনও করিনি। তাই বেড়ে লাগছে, শব্দ ব্যবহার করতে করতে বুড়ো হয়ে গেলাম, জীবনে প্রথম কোনও একটা শব্দ ব্যবহার করছি এই মজা এখন দুর্লভের চেয়েও বেশি। সত্যিই প্রথম অংশটা চলছিল একটা প্রবাহের মত। লেখাটার পরিকল্পনাটাও গজিয়ে উঠল সাবটাইটল আর নোটস ফাইল শেষ হওয়ার পর, নানা জনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে। তারপরও ঈপ্সিতা না খোঁচালে শুরুও হত না। বেশ চলছিল। লিখতেও বেশ লাগছিল। এর মধ্যে একটা ছেদ এল শারীরিক ক্লান্তিতে। আমি রসিকতা করেও বলি, আমার ক্লান্তি হয় না, বংশটা তো দাস। কিন্তু দাসও তো বুড়ো হয়। খুব খুব ক্লান্তি হচ্ছিল। প্রথমে ভাবলাম ক্লান্তিটা স্নায়বিক, একটা দিন গোটাটা কাটালাম নানা কিছু রান্নাটান্না করে। মেয়েটা পুরো মাংসাষী হয়েছে, যেদিন পাড়ার যে বাড়িতে মাংস রান্না হয়, সেখানেই খেয়ে আসে। ওর বাবাই যে ব্রহ্মাণ্ডের শ্রেষ্ঠ মাংসরাঁধুনি এটা ওকে আরও একবার প্রত্যয়িত করার প্রয়োজন ছিল। তারপর দেখলাম ক্লান্তিটা তার চেয়েও গভীর, একদিন রাতে ঘুমোতে ঘুমোতে খাট থেকে পড়েই গেলাম। উঠে আবার শুয়েছি যখন ডান হাতের কনুইয়ে তীব্র যন্ত্রণা করছে, ভয় লাগছে আবার হাড় ভাঙল কিনা, কিন্তু তার মধ্যেই ফের সাড়হীন ঘুমিয়ে পড়লাম। একবার ভাবলাম, লেখাটা আর লিখব না, অসমাপ্ত কাজ হাতে থাকলে যেমন হয়, মেজাজ শুধুই খিঁচড়ে যেতে থাকে, তাও পারছিলাম না ফের হাত দেওয়ার উদ্যমটা সংগ্রহ করতে। আর ব্যাটা দেবাশিসও কোনও প্রতিবার্তা (বাংলায় ফিডব্যাক) পাঠাচ্ছিল না। সেই সাতই নভেম্বর ভোরের পর ছয়দিন আর লিখিইনি। কাল ফের উদ্যমটা ফিরে এল সেঁজুতি খোঁচানোয়, ওর একটা লেখার কাজে লাগতে পারে, তাই ফোনে বলল, কী হল, তুমি আর লিখছো না কেন? ছেলেপিলেদের অবস্থা কী? আঠারই, মানে সামনের বেস্পতিবার বিয়ে, এখনও অন্য জিনিসে মনযোগ দিয়ে যাচ্ছে। ছি, ছিছি। বিয়ে বস্তুটা কবে থেকে এমন এলেবেলে হয়ে গেল কে জানে, আরও তার উপরে এই প্রথম ও বিয়ে করছে। কিন্তু উদ্যমটা সত্যিই ফেরত এল। তাই, আসুন দ্বিতীয় প্রবাহে ঢোকা যাক। কিন্তু মাথায় রাখবেন, এটা ‘কবি’ ফিল্মের কোনও মূল্যায়ন নয়, সমালোচনা তো নয়ই। ‘কবি’ ফিল্ম দেখাটা আমি নামক ব্যক্তিকে, তার ব্যক্তি অনুভূতিকে কোন কোন জায়গায় আক্রমণ করেছিল, তার একটা তালিকা বলা যেতে পারে। সেই তালিকাও আবার কোনও সচেতন যত্ন নিয়ে চয়ন করা হয়নি, চালিয়ে দেখতে থাকছি, যে জায়গায় কিছু মাথায় আসছে, থামিয়ে লিখে নিচ্ছি।

আমরা ছেড়েছিলাম বাবুর উপন্যাস-রূপ আর চলচ্চিত্র-রূপে পার্থক্যের প্রশ্নে। খেয়াল করেছেন কী, অনুবাদ ভুল অনুবাদ প্রতি-অনুবাদের গোটা চক্করটা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে ‘কবি’ ফিল্ম, যা ‘কবি’ উপন্যাস পারেনি। উপন্যাস ভাষা-নির্ভর হওয়াতে সেখানে কোন পাঠক উপন্যাসটা পড়ছে, কার জন্য তারাশঙ্কর লিখছেন, এই নির্বাচনটা সক্রিয় ছিল। ভাষাই ঠিক করে দিচ্ছিল, কে লেখাটা পড়বে — ইংরিজি বর্ণমালা এবং ভাষা যার কাছে অবোধ্য নয়। কিন্তু ফিল্মে বাবুর মাঝ-ফ্রেমে বসে থাকা এবং বারবার দুদিকে নাচপুতুলের মত করে তাকাতে থাকা, তারপরে উঠে দাঁড়ানো এবং কথা বলে ওঠা, এই গোটাটা মিলে তৈরি করল একটা ভঙ্গী। যে ভঙ্গীটা যে কোনও দর্শকের কাছেই অত্যন্ত সুবোধ্য, সেখানে ভাষাটা কোনও অন্তরালই নয় আর। এই ভঙ্গীটা, এবং ভঙ্গীটাকে প্রাকৃত বাঙালি কী ভাবে চেনে, কী ভাবে বোঝে, এটা অনেক অজস্র অসংখ্য বার এসেছে বাংলা সাহিত্যে, কিন্তু আমার তো কিছু স্থির শ্মশানভূমির বাধ্যতা আছেই। সেই ‘ইছামতী’ থেকেই তোলা যাক, যে উপন্যাসটা আজ পর্যন্ত একবারও হয়নি যে আমি যে কোনও পাতা একবারও পড়েছি, অথচ রক্তক্ষরণ হয়নি অস্তিত্বের গভীরে কোথাও। আমি যে উদ্ধৃতি দিচ্ছি, সেই উদ্ধৃতিটুকু দিতে দিতেও, উপন্যাস থেকে এই লেখায় টুকতে টুকতেও আমার মধ্যে কী একটা হচ্ছে, পড়তেও ভাল লাগছে। বেশ কয়েক লাইন তোলা যাক ‘ইছামতী’ থেকে।

তিলু হেসে বললে—এই খোকা, তোর শম্ভুদাদা কেমন ইংরিজি বলে রে?
ইট্ সেইস্ট মাট্ ফুট্—ইট সুনটু-ফুট-ফিট্ —
ভবানী বললে—বা রে! কখন শিখলি এত?
টুলু বললে—শুনে শিখিচি। বলে, তাই শুনি কিনা। যা বলে, সেরকম বলি।
ভবানী বললে—সত্যি, ঠিক ইংরিজি শিখেছে দ্যাখো। কেমন বলচে।
নিলু বললে—সত্যি, ঠিক বলচে তো!
তিনজনেই খুব খুশি হোলো খোকার বুদ্ধি দেখে। খোকা উত্সাহ পেয়ে বললে—আমি আরো জানি, বলবো বাবা? সিট্ এ হিপ্-সিট্-ফুট্-এপট্-আই-মাই—ও বাবা এ দুটো কথা খুব বলে আই আর মাই—সত্যি বলছি বাবা—
নিলু অবাক হয়ে ভাবলে—কী আশ্চর্য বুদ্ধিমান তাদের খোকা!

এর মধ্যে একজন, ভবানী নিজে অত্যন্ত শিক্ষিত একটি মানুষ, ভারতীয় শাস্ত্র ও তত্ত্বের ডিসকোর্সে, আলোচনায়। এবং নিলুর শেষ বিস্ময়টা খেয়াল করুন, “কী আশ্চর্য।” এই ওয়ান্ডার বা বিস্ময়টা একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এবং এটা বোধহয় আজও অব্দি একটা ক্রিয়াশীল বিস্ময়। আনন্দ-সাহিত্যের, মানে আনন্দ পাবলিশার্সের ছাপা সাহিত্যের, একটা ব্যাপক অংশে, এত ইংরিজি বাক্যের প্রাদুর্ভাব কেন, এবং একই ঘটনা পুনরাবৃত্ত হয় কেন বাংলা ফিল্মে সিরিয়ালে — আমার ধারণা, এই বিস্ময় আজও ক্রিয়াশীল। খুব ঝিনচাক একটা লোকের, বা তার বউয়ের, বা ছেলেমেয়ের বিশ্বাসযোগ্যতাই নির্মিত হয় এই ইংরিজি প্রয়োগে, কারণে এবং অকারণে। এবং ‘অকারণ’ শব্দটা এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ ‘কারণ’ শব্দটার সঙ্গে। আমি দেখেছি সিরিয়ালগুলো সিনেমাগুলো চলার সময়ে ইংরিজি ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষদেরও কোনও অসুবিধা হয় না, তার মানে কাহিনীর শরীরে এগুলো কোনও অর্থপূর্ণ উপাদানই নয়। বা সম্পূর্ণ ইংরিজি-অজ্ঞ মানুষকেও কোনও আনন্দ-সাহিত্য পড়ার পর প্রশ্ন করে দেখেছি, তার বুঝতে একটুও অসুবিধা হয়নি। এগুলি প্রয়োগ হয়ে চলে একদম সেই বিস্ময়ই উত্পাদনের জন্য, নিলুর যা হত। এগুলো দেখে একটা বিকৃত আনন্দও হয়, ওই সাহিত্যে বা সিরিয়ালে এই প্রয়োগে — সচরাচর এত খারাপ ইংরিজি থাকে সেগুলো যে একটা আরাম হয়, দে দে রে, ইংরেজদের তো নিজে থেকে তাড়াতে পারিনি আমরা, দে ব্যাটাদের ভাষাকেই ধর্ষণ করে দে।

দেবকী বসু ‘কবি’ চলচ্চিত্রে এই ভঙ্গীটাকেই অনুবাদ করে দিচ্ছেন ফিল্মের ভাষায়। এবং তাই করে উপন্যাসের লেখক পাঠকের নির্বাচিত চক্রের চক্কর থেকে বেরিয়ে আসছেন। ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ বা ‘শত্রু’ বা ‘চ্যালেঞ্জ’ জাতীয় ফিল্মে যখন কোনও বড়লোকের বেটাবেটি বা কোনও অফিসার ইংরিজি বলে, এই ভঙ্গীটাই সেখানে পাঠ করে দর্শক, চরিত্রের পোষাক ধরনধারণ সব কিছু মিলিয়ে। এবং তারাশঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাস আর আমাদের উদাহরণের এই ‘ইছামতী’ উপন্যাস দুটোতেই কিন্তু চক্করটা চালু আছে। ‘ইছামতী’ উপন্যাসে প্রচুর কথোপকথন আছে সরাসরি ইংরিজিতে, ভাষায় ও বর্ণমালায়, এমনকি কোনও অনুবাদও পাশাপাশি দেওয়া নেই তার বহু জায়গাতেই। আমি জানিনা, আপনাদের কী হয়, আমার গোড়া থেকেই একটা তীব্র বিরক্তি হত এতে, এই ইংরিজি প্রয়োগে। স্কুলের উঁচুর দিকে উঠে যখন প্রথম এলিয়টের কবিতায় সরাসরি সংস্কৃত ও গ্রীক অক্ষরের ব্যবহার প্রথম যেবার দেখেছিলাম, একটা সান্ত্বনা পেয়েছিলাম, আজও স্পষ্ট মনে আছে। যদিও সেটা অর্থহীন, এলিয়টের ওই ব্যবহার একদম অন্য একটা ব্যাপারকে হাজির করে। যাই হোক, দরকারি জায়গাটা এই যে, নিতাইদের আর বাবুর বক্তব্যকে ভাষা হিসাবে বুঝতে হয়না ‘কবি’ চলচ্চিত্রে, তাই বোঝার ভুলও হয়না, তাই সেই বোঝার ভুল অপনোদন করতে ভুল প্রতি-অনুবাদও আর প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে না। ভাষাগত অর্থের জায়গায় প্রবেশ না করেই বাবু তার সমস্ত ক্ষমতার ঔদ্ধত্য নিয়ে চিহ্নিত হয়ে যান।

102
00:10:39,100 –> 00:10:41,390
‘Absolute cowards, cowards’.[25]

অ্যাবসলিউটলি কাওয়ার্ডস, কাওয়ার্ডস কোথাকারের।

এবারে আর কিছুই আলোচনা করার নেই। শুধু শেষ আলোচনাটার সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

105
00:10:50,300 –> 00:10:52,300
What is a ‘madel’, didi?[26]
106
00:10:52,600 –> 00:10:56,400
A piece of metal, with engraved name.

ম্যাডেল কী দিদি, ম্যাডেল?
পদুক লো পদুক। তাতে নাম ন্যাকা থাকবে।

এবার এল ভারি আকর্ষণীয় একটা জায়গা। বাবু ও ক্ষমতার জগতকে কেন্দ্র করে ইংরিজি শব্দ কত কত স্তরে কত রকমে অনিংরিজিতে পর্যবসিত হতে পারে তার একটা ভারি চমত্কার উদাহরণ। এবং এটা চলেছে গোটা ‘কবি’ চলচ্চিত্র জুড়ে। এই মেডেল নামক শব্দ ও পরিপ্রেক্ষিতটা এখন বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলবে, এবং আবারও ফেরত আসবে চলচ্চিত্রের একদম শেষ দিকে। যখন একদিকে বসনের মৃত্যু হচ্ছে, এবং একটা প্রতিযোগিতায় সোনার মেডেল জয়ের জন্য অংশগ্রহণের নিমন্ত্রণ আসছে নিতাইয়ের কাছে। চলচ্চিত্রের এই জায়গায় যেমন স্টেশনমাস্টার, রাজনের বৌ, ঠাকুরঝি, রাজন, এবং নিতাই, পরের বার এই ‘মেডেল’ শব্দটা তার বিভিন্ন উচ্চারণভেদে উচ্চারিত হবে মহাদেব কবিয়াল, বেহালাদার, মাসি, বসন, আমন্ত্রণকর্তা এবং নিতাইয়ের মুখ দিয়ে। এবং মজাটা এই যে, যে উচ্চারণটা এখানে গৃহীত হচ্ছে, স্টেশনমাস্টার জাতীয় মানুষদের মুখ দিয়ে, সেটা মূল শব্দটার ইংরিজি উচ্চারণ নয় আদৌ, একটা স্পষ্ট বাংলাকরণ রয়ে যাচ্ছে তাতে, -এ একার, -এ একার, ল — এই উচ্চারণে। অর্থাত্‍ এটাই শিক্ষিত বাঙালির কাছে ইংরিজি শব্দটার আকার। এই পার্থক্য রয়েছে অজস্র শব্দের লোক ব্যবহারে, যেমন বাস-স্টপেজ, যা, বোধহয় কোনও ইংরিজি শব্দই নয়। শিক্ষিত বাঙালির জনপ্রিয় ব্যবহারে ‘বাসস্টপ’ শব্দটার ওই আকার দাঁড়িয়েছে। ঠিক তেমনি ‘মেডেল’ এখানে গৃহীত-সঠিক। এবার, সেই গৃহীত-সঠিকের থেকে কতটা দূরবর্তী কারুর উচ্চারণ তার ভিত্তিতে তার সামাজিক অবস্থানটাও চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছে গোটা চলচ্চিত্র জুড়েই। যেমন সবচেয়ে স্পষ্ট ত্রুটিপূর্ণ উচ্চারণটা আসছে ঠাকুরঝির কাছ থেকে। সামাজিক অবস্থানটা ভাবুন। গ্রাম, পরিবারতন্ত্র, নারী। তার চেয়ে সঠিক উচ্চারণ করেন, ‘মেডেল’ নামক সেই স্টেশনমাস্টার উচ্চারণের নিকটতর, মাসি। যা স্বাভাবিক, শ্রমের বাজারের অভ্যস্ততা। এবং বেহালাদার তার চেয়েও সঠিক, কারণ সে ভুয়োদর্শী, সত্যই নানা ঘাটের জল খেয়ে এসেছে সে, এবং একই সঙ্গে পুরুষ। ওই একই জায়গা থেকেই বোধহয়, গ্রামের ডোমনন্দন নিতাইয়ের উচ্চারণের সঙ্গেও তার একটা পার্থক্য থাকে। হয়ত এতটা সত্যিই সচেতন নির্মাণ নাও হতে পারে, কিন্তু হতেও পারে। কারণ এই গোটা ‘মেডেল’ পরিপ্রেক্ষিতটাই চলচ্চিত্রের নিজস্ব, উপন্যাসে এটা আদৌ নেই। চলচ্চিত্রের এই জায়গায় এসে এটা শুরু হল, চলবে একদম শেষ অব্দি, কাহিনীধারার মূল একটা প্রবাহ। তাই সেটা অনেক ভেবেচিন্তেই প্রযুক্ত হয়েছিল, এটাই স্বাভাবিক। তারাশঙ্করের লেখায় ভাষাভিত্তিক এই অবস্থান এবং বর্গসঙ্করতার কিছু ভাবনার ভ্রূণ ছিল, কিন্তু যে আকারে সেটা উপস্থিত হল চলচ্চিত্রে তার সঙ্গে তার তুলনা করাই যায় না। আমরা সেই কথায় পরে আসছি, বালিয়ার প্রসঙ্গে। এই মেডেল-পদুক পরিপ্রেক্ষিতে আর দু-একটা কথা যোগ করে নেওয়া যাক।

খেয়াল করুন, ‘মেডেল’ উচ্চারণটাকে যদি আমরা সেই অর্থে বাঙালি-সঠিক বলে ধরে নিই, তাহলে, ঠাকুরঝি সেখান থেকেও নড়ে গেল, হয়ে গেল ‘ম্যাডেল’। এবং সেই বিদেশী ধারণাকে দেশী ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজনের বৌ বলল, ‘পদুক’। যা একই সঙ্গে আর একটা পুরনো শব্দের থেকে নড়ে যাওয়া। ‘পদক’ একটি সংস্কৃত শব্দ, শিক্ষিত তত্সম বাঙলায় এর ব্যবহার বহুল, কিন্তু এই তদ্ভব আকারটা তার থেকে পৃথক। একসময়ের শাসকদের হাত ধরে এসেছিল ‘পদক’, বদলে তার অপভ্রংশ হয়ে গেল ‘পদুক’। নতুনতর শাসকের হাত ধরে এল ‘মেডেল’, সেটাও গেল বদলে। আমার ভারি মজা লেগেছিল এই কথোপকথনটায়। মনে পড়ে গিয়েছিল, একাদশ শতকে লেখা কৃষ্ণ মিশ্রের ‘প্রবোধচন্দ্রোদয়’ সংস্কৃত নাটকে ‘আর্যপুত্র’ বদলে অপভ্রংশ বাচনে ‘অজ্জউত্ত’ হয়ে যাওয়া, নাটকে নটীর প্রথম সংলাপেই ছিল। মুরারিমোহন সেন তাঁর অনুবাদের সঙ্গে দেওয়া মূল সংস্কৃত নাটকে প্রতিটি অমন অপভ্রংশ সংলাপের নিচেই ব্রাকেটে সঠিক সংস্কৃত শব্দগুলো দিয়ে দিয়েছিলেন, মনে আছে। ব্রাকেটের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে ওগুলো দেখতে দেখতে জ্যান্ত ইতিহাসের শরীরে ঘটতে থাকা বদলের একটা ছাপ পেয়েছিলাম, মনে আছে। এখানে ‘কবি’ চলচ্চিত্রে ঠিক তাই ঘটে। দাসী ও শূদ্রদের অপভ্রংশে ছড়িয়ে যেতে থাকে তার নানা বিভিন্ন আকারে মূল ইংরিজি শব্দটি। এই বাস্তবকে ধরে উঠতে পারে চলচ্চিত্রটি, কোনও বাড়তি মন্তব্য না করেই।

148
00:14:58,090 –> 00:15:07,800
_The son of the wise ‘doam’_[31]
_Started getting stupid_

সুবুদ্ধি ডোমের পোয়ের কুবুদ্ধি ধরিল।

ঠিক আগের দৃশ্যই ছিল নিচু-জাতের দুজন মানুষ, মুচি ও ডোম, পরস্পরকে জড়িয়ে ধরছে। আর তার পরের দৃশ্যই হল এই জাত তুলেই গালি দিচ্ছে মহাদেব কবিয়াল। এবং এখানে দেবকী বসু একটা অদ্ভুত সুযোগ পেয়ে গেলেন, পড়ে পাওয়া আঠারো আনার মত, একটা দুষ্প্রাপ্য সুযোগ। জাতপাতের স্তরে একটা জ্যান্ত যুদ্ধ সেটা ইতিমধ্যেই সদাসর্বদাই এসে গেছে আলোচনা বা ডিসকোর্সের স্তরে, কবিগানের দৌলতে। এবং সেই আলোচনায় স্থানান্তরিত কবিগান-যুদ্ধের অনেকগুলো উপাদানই হল যে মাধ্যমটি দেবকী বসু নির্মাণ করছেন তার সঙ্গে এক। কবিগানের মধ্যেই আছে গান, নাচ, অভিনয়ের কিছু উপাদান, এবং কোথাও কোথাও ভ্রূণাকার কাহিনীসূত্র। এই কবিগানটার মধ্যেও ভাবুন, যখনই মহাদেব কবিয়াল গরুড়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ, এবং নিতাই মশার ভূমিকায়, তার মধ্যেই চলে আসছে একটা আলগা কাহিনীসূত্র যা উপ্ত রকমে ব্যবহার করছে রামায়ণের কাহিনীসূত্রর একটা ছায়াকে। ফিল্মে মনোরঞ্জনের জন্যে নাচ-গান যোগ করা হয়, আমরা রোজই দেখি। আর এখানে, কাহিনীর একটা মূল উপাদান, জাতপাতের যুদ্ধ, ইতিমধ্যেই স্থানান্তরিত হয়েছে কবিগানের পালায়, যে কবিগানের মধ্যেই রয়েছে সামাজিক ভাবে পরীক্ষিত ও উত্তীর্ণ মনোরঞ্জনের নানা উপাদান। এবং সেটা কাহিনীর মূল ধারাটিকে, জাতপাতের যুদ্ধকে একটুও দুর্বল করছে না, বরং সংঘাতটাকে এনে দিচ্ছে সরাসরি প্রদর্শনীমঞ্চের উপর, প্রদর্শনযোগ্যতায়, শিল্পমাধ্যমে অনুবাদ করে। এই জাতপাতের সংঘাতের জায়গাটা, একটু অন্য চেহারায়, এই কবিগানের আকারেই উপস্থিত হয়েছিল আর একটা জনপ্রিয় বাঙলা চলচ্চিত্রে, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’। মনে করুন, ‘খ্রীষ্ট আর কৃষ্টে কিছু ফারাক নাই রে ভাই’ কবিগানের সেই তীব্রতা। দেবকী বসুর সুযোগ বলতে এটাকেই বোঝাচ্ছি যে সামাজিক বাস্তবতার চিত্রায়ন করতে গিয়ে নাচ-গান ইত্যাদিতে সরে যাওয়া নয়, সেই নাচ-গানের মধ্যে দিয়েই সেটা উপস্থিত হচ্ছে। সরাসরি এর রাজনৈতিক প্রয়োগের একটা উদাহরণ নিবারণ পণ্ডিত। গণনাট্যের গানে তার জনপ্রিয় হয়ে ওঠা সেই ‘পাপী তো কৃষ্ণ বলে না’ অনেকদিন পরে ফের শুনেছিলাম দোহারের গানে।

মহাদেব কবিয়ালের গানে এর পরবর্তী অংশে যে প্রসঙ্গগুলি এসেছে তার দু-একটা এখানে উল্লেখ করে রাখি। এর পরেই মহাদেব কবিয়াল উল্লেখ করবে নিতাইয়ের জাত-ব্যবসার কথা। সেটা বলতে এখানে চুরি-ডাকাতির কথা তুলেছে মহাদেব। যেমন নিতাইয়ের বাবার কথা বলেছে সে, সিঁদ কেটে বাড়ি বাড়ি চুরি করত, বা তার ঠ্যাঙাড়ে ঠাকুর্দার কথা, এবং তার মায়ের বাবার কথাও যে কিনা দ্বীপান্তরে মরেছে। এছাড়া নানা জায়গায়, ডোমদের আর একটা পেশা ছিল শ্মশানে। ডোমদের এই ধরনের পেশাগুলির একটা ইতিহাস ছিল। বাংলার সামাজিক ইতিহাস নিয়ে কোনও খুব স্পষ্ট মতামত দেওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। কিন্তু নানা সময় যা কিছু শুনেছি বা পড়েছি, তার থেকে এইটুকু মাথায় আসছে যে, বোধহয় ব্রিটিশ আমলে ডোমদের এইসব অপরাধ ও মৃত্যুকেন্দ্রিক পেশার সূচনা প্রাকব্রিটিশ বাংলায়। সেখানে ডোমরা ছিল একটি যোদ্ধা জাতি। বিভিন্ন রাজার হয়ে যুদ্ধ করত এই ডোমরাই। এই ইতিহাসই বোধহয় ধরা আছে ওই ছেলেভোলানো ছড়ায়: “আগে ডোম, বাগে ডোম, ঘোড়াডোম সাজে”। আগে এবং পিছনে ডোম সৈন্যদের নিয়ে, অশ্বারোহী ডোম যোদ্ধাদের নিয়ে, “ঢাক মেঘর ঘাঘর” ইত্যাদিতে যুদ্ধের বাজনা বাজাতে বাজাতে যুদ্ধে যেতেন তখনকার বাংলার রাজারা। তারপর রুল ব্রিটানিয়ার দোর্দণ্ডপ্রতাপে, রাজশেখরের ভাষায়, “আন্ডার দি সুদিং ইনফ্লুয়েন্স অফ দি বিগ রড”, রাজারা ভ্যানিশ, রাজায় রাজায় যুদ্ধও ভ্যানিশ। ফলত বহু জায়গাতেই ডোমরা তাদের যুদ্ধবিদ্যা সম্পৃক্ততা থেকে সহজেই রত হল চুরি-ডাকাতি ইত্যাদি পেশায়। ডোমদের যেটা পোষাকি নাম, ‘রাজবংশী’ বা ‘বীরবংশী’, যার একটি মহাদেব কবিয়ালের গানে এর পরেই এসেছে, অন্যটিও এসেছে চলচ্চিত্রের অন্যত্র, তারও শিকড়টা তাই রাজা বা বীর, যা এদের সেই লুপ্ত হয়ে যাওয়া পেশাকেই চিহ্নিত করে।

==========অংশ ৫ শেষ===================

Filed under: ফিল্ম — dd @ 9:06 am

1 Comment »

  1. [...] এর প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ আর পঞ্চম [...]

    Pingback by নেটখাতা » দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৬ — February 22, 2011 @ 5:41 pm

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress