নেটখাতা

March 15, 2011

দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৮

[গুরুচণ্ডালী সাইটে এই লেখাটা প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু ওদের ইউনিকোড থেকে বাংলাপ্লেন কনভার্টারে সমস্যা থাকায় ফরম্যাটিং ঘেঁটে যাচ্ছে। তাই এখানে ওই প্রতিটা অংশ, যেমন যেমন গুরুচণ্ডালীতে প্রকাশ হচ্ছে, সঠিক ইউনিকোড অবয়বে আমি দিয়ে যাব। এটা তার অষ্টম অংশ। এই ব্লগেরই পুরনো লেখায় পাবেন এর প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ আর সপ্তম অংশ।]

==========অংশ ৮ শুরু===================

278
00:29:24,850 –> 00:29:30,500
I’m not in caste profession,
Engage in kabi – they dislike.
279
00:29:30,850 –> 00:29:32,900
Gentlemen are angry too.[45]

আমি জাতব্যবসা ছেড়ে গান বাঁধি, কবিগান গাই। তাই ওরা আমার উপর রাগ করেছে।
ভদ্দরলোকেরাও রেগে গেছে আমার উপর।

নিজের ডোম জাতের ভিতরকার বিরূপতার কথা বলা মাত্রই নিতাই বলে ওঠে ভদ্দরলোকদের মানে উঁচু জাতের বিরূপতার কথাও। তার এই দ্বিমুখী দ্বিধার কথা আমরা আগেও একাধিকবার উল্লেখ করেছি, সে আর শূদ্রও নেই, এবং উঁচুজাতও সে হয়ে ওঠেনি, এই নিরালম্ব বায়ুভূত অবস্থানটা চিহ্নিত করে একটা মাধ্যমিক অবস্থিতির কথা। যখন সে কোনও বর্গেই আর পড়ছে না। এবং নতুন অর্থ নতুন দৃষ্টি নতুন সংস্কৃতি জন্ম নেওয়ার ক্ষেত্রে এই বর্গসঙ্করতার তাত্পর্যের কথা আমরা আগেই আলোচনা করেছি।

291
00:30:06,650 –> 00:30:10,300
Rascal, son-of-a-doam, you’re
Lucky enough to be allowed in kabi.
292
00:30:10,550 –> 00:30:18,800
And money too? Mother Goddess
Will now issue you handnote?

ওরে ব্যাটা, ডোমের ছেলে হয়ে মায়ের এখানে গান করতে পেরেছিস, সেই তোর ভাগ্যি।
তার উপরে আবার টাকা? বলিহারি ময়না, বুলি শিখেছিস ভাল। এবার মা চামুণ্ডাকে তোর টাকার জন্যে হ্যান্ডনোট লিখতে হবে, না?

সাংস্কৃতিক স্তরে স্বীকৃতিটা এসেছে, এখনও বাস্তব অর্থে, অর্থকরী জায়গায়, টাকা ও পয়সার অঙ্কে বদলটা চিহ্নিত হতে কিঞ্চিত দেরি আছে। সংস্কৃতিতে বদলটা ঘটেছে, অর্থনীতিতে আসতে আরও একটু দেরি আছে।

301
00:30:44,900 –> 00:30:50,400
Mahadev was right -
_Son of wise doam_
_Started getting stupid_

মহাদেবদা তো ঠিকই বলিছিল, _সুবুদ্ধি ডোমের পো, কুবুদ্ধি ঘটিল_

খেয়াল করুন, মহাদেব কবিয়ালের মূল পংক্তি একটু বদলে গেছে এই উদ্ধৃতিতে, এবং সেটাই স্বাভাবিক। গানের পংক্তি যখন মুখে মুখে ফেরে তখন এই ভাবেই সেটা বক্তার নিজের পংক্তি হয়ে যায়। এই ব্যাপারটা আমার নিজের গদ্যের সাপেক্ষেও বেশ জরুরি একটা কথা। আমার গদ্যে শুধু বহু বাক্য নয়, এমনকি ধরতাই অব্দি অনেক জায়গায় তৈরি করেছি ‘সাতটি তারার তিমির’ ঝাড়েবংশে লোপাট করে করে। লোকে বুঝতে চায়না গদ্যের নিচে নিচে সেই পংক্তিগুলো আসলে জীবনানন্দের না, আমারই লেখা। যাকগে, ও কথা ছেড়ে দিন। জায়গাটা দেখুন, এই ‘ভদ্দরলোক’ শ্রেণীর কুলি খুঁজতে থাকা মানুষটি ইতিমধ্যেই একজন জ্যান্ত সম্পাদকও হয়ে উঠছেন। তিনি চয়ন করছেন সমগ্র কবিয়াল অনুষ্ঠান থেকে নির্বাচিত কিছু পংক্তি, এবং সেগুলো নিজের বাচনের মত করে বদলে নিয়ে তিনি প্রয়োগ করছেন।

তার চয়ন, সঙ্কলন, এবং সম্পাদনের মধ্যে দিয়ে তৈরি হয়ে চলেছে সেই সাংস্কৃতিক বা আলথুসেরের ভাষায়, দি কালচারাল — অর্থ নির্মাণ, নিষ্কাশন, ও আত্মীকরণের প্রক্রিয়া। যেমন তিনটি কমপ্লেক্স বা জটিল-প্রক্রিয়ার অতিনির্ণয়ে সমাজবাস্তবতাকে বুঝেছিলেন আলথুসের। দি ইকনমিক, বা অর্থনৈতিক, মানে উদ্বৃত্ত মূল্য তৈরি হওয়ার, নিষ্কাশন করার এবং আত্মীকরণের প্রক্রিয়া। দি পলিটিকাল, বা রাজনৈতিক, মানে ক্ষমতা তৈরি হওয়ার, নিষ্কাশন করার, এবং আত্মীকরণের প্রক্রিয়া। আর দি কালচারাল, বা সাংস্কৃতিক, যার কথা আমরা আগেই বললাম। অতিনির্ণয় বা বহুমুখী কারণসম্পর্কের কথা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। দাঁড়ান, একটু দু-চারটে কথা এখানে বলে নিই, যারা এমনি, বিনা কাজে পড়ছেন লেখাটা তারা আবার পরের প্রসঙ্গ থেকে শুরু করতে পারেন, এটুকে বাদ দিয়ে। আসলে এটা বলতেই হচ্ছে। এই লেখাটা লিখতে লিখতে অনেককেই ইমেলে পাঠাচ্ছি। সেঁজুতি ইত্যাদি দু-তিনজন ওরকম, ইমেল থেকে পড়ে, এই বিষয়ে কিছু কথা বলছিল, জিগেশ করছিল। আর এরা সব অসম্ভব আলসে, আগেই দুটো প্রবন্ধের উল্লেখ করেছি, সেগুলো ঝপাঝপ একবার পড়ে নিলেই মিটে যায়, তা না করে, নানা কথা জিগেশ করছিল। তাই মনে হল, এখানে একটু দু-চারটে কথা বলে নিলে ওদের বোঝার সুবিধে হয়।

এই যে আলথুসেরের অতিনির্ণয় বলছি, কেন, এটা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? বিশদ আলোচনা ওই প্রবন্ধগুলোয় আছে। তাতে না গিয়েই বলা যায়, চিরাচরিত মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতির চিন্তার গতিমুখকে বদলে দেওয়া হয় এই অতিনির্ণয়ে। যেমন, মার্ক্সবাদী কাঠামোয় থাকে বেস ও সুপারস্ট্রাকচার, ভিত্তি ও উপরিকাঠামো। অর্থনীতি হল ভিত্তি, আর সংস্কৃতি হল উপরিকাঠামো। মানে সহজ কথায়, লেজ। কুত্তা যেখানে যাবে, লেজও সেখানেই যাবে। লক্ষণীয় এই যে, আমি কুত্তা বলেছি, বিল্লি বলিনি। বিল্লি হলেই সে ব্যাটা বা বেটি মাঝেসাঝে চেশায়ার থেকে আসতে পারে, আর চেশায়ার বিল্লির ওইসব অতিলৌকিক ক্ষমতার কথা তো ইতিহাসেই আছে, সে ব্যাটা মিলিয়ে গেল, তার হাসিটা রয়ে গেল। এবার আলথুসেরের তত্ত্বে, কুত্তা থেকে লেজে এই একমুখী নির্ণয় আর রইল না। লেজও কুত্তাকে নির্ণয় করতে পারে, এই সম্ভাবনাটা দর্শনগত ভাবে স্বীকার করে নেওয়া হল। মার্ক্সবাদী তত্ত্বের ওই একমুখী নির্ণয়কে নিয়ে, তার কেলেঙ্কারিগুলো নিয়ে অনেক আলোচনা আছে ওই প্রবন্ধদুটোয়, দুটোই নেটে তোলা আছে, আগেই বলেছি। কিন্তু, আপনারা আমার সত একনিষ্ঠতাটা কি লক্ষ্য করেছেন, বা মনে মনে সেটার প্রশংসা করেছেন? আমি কিন্তু প্রতিশ্রুতি বজায় রেখেছি, গরুকে ঠিক শ্মশানে এনে ফেলেছি। এই শেষ আলোচনায় অর্থের রাজনীতির যে চয়ন সঙ্কলন সম্পাদনের কথা উল্লেখ করলাম, সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে এর ঠিক পরের বিপ্রপদ ঠাকুরের সংলাপে।

303
00:30:55,050 –> 00:31:01,300
Nitai, what Mahadevda said?
_Left-over in garbage,_
_Dreaming to reach heaven._
304
00:31:01,800 –> 00:31:12,200
Ohh – and you replied?
_Abracadabra doodle-dup_
_Mahadev shut up._

হ্যাঁ রে নিতাই, মহাদেবদা তোকে কী বলছিল রে? _আস্তাকুঁড়ের এঁটো পাতা, সগ্গে যাবার আশা গো_, ওঃ হো।
আর তুই তার উত্তরে কী বললি? _উড়ুপ উড়ুপ উঁপ, খ্যাকোর খ্যাকোর উঁপ, চুপ রে বেটা মহাদেবা, চুপ চুপ চুপ_, আঃ হাঃ হাঃ।

একটু আগে আমরা সাংস্কৃতিক বা আলথুসের কথিত দি কালচারালের কথা উল্লেখ করেছিলাম, গোটা সমাজ জুড়ে সাংস্কৃতিক ক্রিয়া বা রচনার অর্থ তৈরি হওয়া, সেই অর্থকে বার করে আনা, এবং সেই অর্থকে নিজের কাজে নিজের মত ব্যবহার করার জটিল ও বহমুখী পদ্ধতিটাকে আলথুসের নাম দিয়েছিলেন দি কালচারাল। আর ক্ষমতা তৈরি হওয়া, বার করে আনা, এবং সেটা ব্যবহার করার নাম দিয়েছিলেন দি পলিটিকাল বা রাজনৈতিক। রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকের নিবিড় পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও অতিনির্মাণের এর চেয়ে ভাল উদাহরণ যে কোনও ভাষার সাহিত্য বা চলচ্চিত্রেই বিরল। ‘মিথস্ক্রিয়া’ শব্দটি কারুর কারুর কাছে অপরিচিত লাগতে পারে, তাই জানাই, ‘মিথঃ’ বা ‘মিথস্’ শব্দের অর্থ ঋগ্বেদ, রামায়ণ বা অভিজ্ঞানশকুন্তল অনুযায়ী অনুযায়ী হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় করেছেন ‘১। সহ, অন্যোন্য, পরস্পর; ২। রহঃ, একান্তে, নিভৃতে’। ওভারডিটারমিনেশন বা অতিনির্ণয় এই প্রক্রিয়ার সমার্থক শব্দ হিসাবে এই শব্দটা বেশ যায়, যদি আমরা প্রথম অর্থটা নিই, ‘পারস্পরিক ক্রিয়া’ এই অর্থে। বাংলা ভাষায় বঙ্কিমচন্দ্র, রাজশেখর, রামেন্দ্রসুন্দর ইত্যাদি দুচারজনের আর কেউ যে তত্ত্বচর্চায় তেমন লিপ্ত হননি তার ফল ভোগ করতে হয় আমাদেরই, দর্শন-বিজ্ঞান-তত্ত্ব চর্চার সঠিক গদ্যই তেমন তৈরি হয়ে উঠতে পারেনি। এখানেও সেই একই সমস্যা, বাংলা ভাষায় লেখালেখি পড়ে কারা, ঘরের বৌয়েরা আর চাকরবাকরেরা। হুবহু মনে নেই কিন্তু প্রায় এরকমই একটা মন্তব্য ছিল বঙ্কিমের লেখায়। যে কোনও লেখায়, প্রবন্ধ হোক বা গল্প বা উপন্যাস, একটু বিশেষ অর্থে কিছু বলতে গেলেই শব্দ অকুলান হয়ে পড়ে।

যা বলছিলাম, রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক এই দুই প্রক্রিয়ার ভিতরকার সম্পর্ক। বিপ্রপদ ঠাকুরের ওই মন্তব্যটা লক্ষ্য করুন। মহাদেব কবিয়ালের পংক্তিটাও হুবহু একই নেই, কিঞ্চিত বদলেছে। কিন্তু যেমন বললাম, আগের ওই কুলি-সন্ধানী ভদ্রলোকের বেলাতেও যা সত্যি, মহাদেব কবিয়ালের পংক্তি থেকে নড়ে যাওয়াটা, দুটি ক্ষেত্রেই একটা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নড়ে যাওয়াকে দেখাচ্ছে, যে স্থানান্তর মহাদেবের পংক্তির মূল ইচ্ছিত ঘাতকে কোনও মৌলিক বদল দিচ্ছে না। ওই ভদ্রলোক আর বিপ্রপদ ঠাকুর দুজনেই মহাদেবের ইচ্ছিত অর্থের সমর্থনই করছেন, এবং সেই হিসাবেই এটা ব্যবহার করছেন। কিন্তু ওই ভদ্রলোক থেকে বিপ্রপদ ঠাকুর, একটা ক্রমনির্মাণ দেখতে পাই আমরা ক্ষমতার প্রক্রিয়া রাজনৈতিক কিভাবে সাংস্কৃতিককে প্রভাবিত করছে তার উদাহরণ হিসাবে। প্রথম ভদ্রলোকের বক্তব্যের গদ্যটুকুকে আমরা হাজির করেছি এখানে তার মুখবিকৃত করা এবং ভ্যাংচানোর প্রক্রিয়াটাকে আমরা এখানে গদ্যে দেখাতে পারিনি, ‘কবি’ চলচ্চিত্র যা অনায়াসে দেখিয়েছিল। সেই ভ্যাংচানোর বিরক্তিটাই তার গদ্যীকৃত রূপটা পেল বিপ্রপদ ঠাকুরের বক্তব্যে, উড়ুপ উড়ুপ উঁপ, খ্যাকোর খ্যাকোর উঁপ, চুপ রে বেটা মহাদেবা, চুপ চুপ চুপ”। এবং খেয়াল করুন, এটাও ভঙ্গী, পরিপূর্ণ গদ্যভাষার রূপ সেটা এখনও পায়নি। গানের সুরের একটা আবহকে ধরে রেখে একটা প্রাকভাষা, ছদ্মভাষা, যা ব্যঙ্গ এবং কটূক্তিকে খুব চমত্কার হাজির করছে। ‘উপ’ জাতীয় নির্মাণ আমাদের খুবই পরিচিত, বানরের ধ্বনিকে সচরাচর অমনই হাজির করা হয় বাংলা গদ্যে। এবং হাজির করার অভ্যস্ত রকমটা এখানে খুবই জরুরি। কারণ, খেয়াল রাখবেন ইংরেজের কুকুর বার্ক করে, বাঙালির কুকুর করে ঘেউ। দুটোই সারমেয়কে চিহ্নিত করছে, কিন্তু দুটো ভাষার অভ্যস্ততার দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমে। এখানে বাঙালি চিন্তনের মধ্যে উপ্ত বানর-রকমটাকে ব্যবহার করছেন বিপ্রপদ ঠাকুর। তার ‘কপি’ মন্তব্যটা মনে আছে নিতাই কবিয়ালকে নিয়ে? তার মানে, এটা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। বিপ্রপদ ঠাকুরের ক্ষমতাসীনতার অভ্যস্ত জায়গার নিরিখে এটা একটা পরিচিত প্রক্রিয়া। নিতাইয়ের বানানো গানের পংক্তির নকল কিছু পংক্তিতে তিনি সেই একই গালাগাল দিচ্ছেন নিতাইকে, যা তিনি আগেও দিয়েছেন।

উপরে তোলা সাবটাইটলের লাইনগুলোর সঙ্গে বিপ্রপদ ঠাকুরের বাংলা বাচনটাকে মেলালে একটা মজা পাবেন। দেখুন, আমার ইংরিজি জ্ঞানগম্যির অপরিসীম সামর্থের কারণে আমি বিপ্রপদ ঠাকুরের বাচনে বানর-ভঙ্গীটাকে অনুবাদ করতে পারিনি, শুধু তার মানবিক অর্থহীনতাটুকু অনুবাদ করতে পেরেছি। তাতে বিপ্রপদর আক্রমণের দাঁতনখ কিন্তু ভোঁতা হয়ে গেছে। বিপ্রপদ শুধু নিতাইয়ের পংক্তিগুলোকে অর্থহীনতাতেই পর্যবসিত করেনি, একই সঙ্গে সেটাকে বানরের মত আকারে হাজির করেছে। উপন্যাসে ভঙ্গীটা ছিল লিখিত আকারে। তাই, বিপ্রপদ ঠাকুরের কথার পরে, নিতাইয়ের কথায় নিহিত অর্থটা আলাদা করে জানিয়ে দিতে পেরেছিলেন লেখক তারাশঙ্কর। কথোপকথনটা ঘটেছিল ঠিক কবির লড়াইয়ের পরদিন প্রথম সকালে নিতাই যখন ইস্টিশনে এসে পৌঁছল।

বিপ্রপদ হৈ হৈ করিয়া উঠিলএই! এই! চোপ, সব চোপ!তারপর তাহাকে সম্বর্ধনা করিয়া বলিল—বলিহার ব্যাটা বলিহার! জয় রামচন্দ্র! কাল নাকি সত্যি সত্যি লঙ্কাকাণ্ড করে দিয়েছিস শুনলাম। ভ্যালা রে বাপ কপিবর।
আশ্চর্যের কথা, বিপ্রপদর পুরানো রসিকতায় নিতাই আজ অত্যন্ত আঘাত অনুভব করিল, মুহূর্তে সে গম্ভীর হইয়া গেল।
বিপ্রপদর সেদিকে খেয়াল নাই, সে উত্তর না পাইয়া আবার বলিল—ধুয়ো কি ধরেছিলি বল দেখি? ‘উঁপ! উঁপ! খ্যাকোর—খ্যাকোর উঁপ! চুপ রে ব্যাটা মহাদেবা চুপ চুপ চুপ’ না কি? বলিয়া সে টানিয়া টানিয়া হাসিতে লাগিল।
নিতাই এবার হাত জোড় করিয়া গম্ভীরভাবে বলিল—আজ্ঞে প্রভু, মুখ্যু-সুখ্যু মানুষ, ছোট জাত; বাঁদর, উল্লুক, হনুমান, জাম্বুমান যা বলেন তা-ই সত্যি।

উপন্যাসের সঙ্গে এখানে চলচ্চিত্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রভেদ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এক, এখানে বিপ্রপদর ভূমিকায় অভিনেতা নৃপতি চট্টোপাধ্যায়ের শরীরে সঙ্কেতেই সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা নিতাইয়ের মুখের কথায় খেয়াল করিয়ে দিতে হয়েছিল তারাশঙ্করকে, ‘বাঁদর, উল্লুক, হনুমান, জাম্বুমান’ ইত্যাদি। আর দুই, এটা আরও বড় একটা তফাত, রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিকের অভ্যন্তরীন মিথস্ক্রিয়াটা উপন্যাসে প্রায় অনুপস্থিত। একটু ব্যাখ্যা করে নেওয়া যাক। চলচ্চিত্রে ঘটনাটা ঘটছে একজন ভদ্রলোকের আদেশ কুলি নিতাই মানতে অস্বীকার করার পর। এবং সেখানে এই রামচন্দ্র-কপি পরিপ্রেক্ষিতটাও আর উচ্চারিত হচ্ছে না। উপন্যাসে যা হচ্ছে, বিপ্রপদর ‘রামচন্দ্র’ ‘লঙ্কাকাণ্ড’ ইত্যাদি উল্লেখে। অর্থাত্‍, ধর্মের ডিসকোর্সে ভগবান ও ভক্তের প্যারাডাইমে বা গঠনে সেখানে আশ্রয় খুঁজে নিতে পারে নিতাই। ‘বাঁদর বা হনুমান’ যেখানে রামচন্দ্রের এক ভক্তের নাম, মানে এক ধরনের একটা সম্মান আছে সেই সম্বোধনের। আর চলচ্চিত্রে সেটা না থাকায়, এবং পরপর দুই ভদ্রলোকের, মানে ক্ষমতার ক্রমবদ্ধতায় হায়েরার্কিতে নিতাইয়ের চেয়ে উচ্চাসীন দুজনের পরপর দুটি আক্রমণে এখানে বাঁদর-পরিপ্রেক্ষিতটা নিতান্তই অপমানজনক, তার থেকে নিস্কৃতির কোনও উপায় নেই। এবং, নিতাইয়ের নিজের গানের পংক্তিকে বিকৃত করে বানর-ডাকে পরিণত করা হচ্ছে। যেখানে, দুই ভদ্রলোকই মহাদেব কবিয়ালের পংক্তিগুলিকে তাদের ইচ্ছিত অর্থেই বজায় রাখলেন। এখানে সাংস্কৃতিকের উপর রাজনৈতিকের আক্রমণ অস্বীকার করার কোনও উপায়ই আর থাকছে না। অর্থাত্‍, ক্ষমতার নির্মাণ/নিষ্কাশন/আত্মীকরণের প্রক্রিয়া, যার নাম রাজনৈতিক, সে অর্থ নির্মাণ/নিষ্কাশন/আত্মীকরণের প্রক্রিয়া বা সাংস্কৃতিককে নিজের মত করে বদলে দিচ্ছে, নিজের সুবিধা মোতাবেক চয়ন, সঙ্কলন, সম্পাদন করে, বা, এক কথায়, স্থানান্তর ঘটিয়ে ফেরত দিচ্ছে। আলথুসেরের এই তাত্ত্বিক কাঠামোর এর চেয়ে সুন্দর উদাহরণ আমি ‘কবি’ চলচ্চিত্র দেখার আগে কখনও পাইনি।

313
00:31:57,900 –> 00:32:03,500
Brahmin, so what?
Can he create songs?
Infuriates me!

হ্যাঁ! ভারি আমার বাম্মন। কই, এমনি মুখে মুখে বেঁধে গান করুক দেকি? আগে আমার সব্বাঙ্গ জ্বলে যায়, হ্যাঁ।

কবি’ উপন্যাস আর চলচ্চিত্র দুটোতেই এটা একটা জোরের জায়গা যে, ঠাকুরঝির নিতাইয়ের প্রেমে পড়া সবরকম অর্থেই একটা প্রেমে পড়া। চলচ্চিত্রে এর আগে মেলার দৃশ্যে মনে করুন, বৃন্দাবন ঠাকুরঝির মালা কেনার সখের কথা শুনে সস্নেহে জিগেশ করছে, “মালা লিবি বউ?” এবং ঠাকুরঝি তাতে আদুরে হাঁসের মত করে ঘাড় নেড়ে (আমি আদুরে হাঁস দেখিনি, বরং আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, কলেজ স্কোয়ারের একটি দুষ্কৃতী রাজহাঁস আমায় রীতিমত তাড়া করে এসেছিল, এবং কামড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু হাঁস আদুরে হলে ওরকমই করে এই বিষয়ে আমি নিশ্চিত) সায় দিচ্ছে। উপন্যাসেও ছিল এই কথা। নিতাইকে রাজনের বৌ বলেছিল বৃন্দাবনকে নিয়ে।

রঙ পেরায় গোরো, বুঝলে ওস্তাদ, তেমনি ললছা-ললছা গড়ন। লোকটিও বড় ভাল। দুজনাতে ভাবও খুব, বুঝলে!

চলচ্চিত্রেও এই বাক্যের আগেই একাধিকবার দেখেছি আমরা বৃন্দাবনকে ঠাকুরঝির প্রতি একটা সস্নেহ প্রশ্রয় নিয়ে একটা আগলে রাখার ক্রিয়ায়। তাই কোনও অসুখী দাম্পত্য থেকে যে পরিপূরণের বা ক্ষতিপূরণের মত করে নিতাইয়ের প্রতি ঠাকুরঝির আগ্রহ এসেছিল তা নয়, এসেছিল ওই যাদু-উপাদান থেকে, “কই এমনি মুখে মুখে বেঁধে গান করুক দেকি?” এর পরের কিছু বাক্যেও একাধিকবার এসেছে ‘কবি’ নিতাইয়ের প্রতি ঠাকুরঝির এই বিস্ময়। পরেও এসেছে। নিতাই একটা কিছু পারে যা সাধারণ নয়, অন্যরকম। নিতাইয়ের সেই অন্যরকমত্বটাকে গোড়া থেকেই সম্মান দিয়ে আসছে কেবল দুইজন, রাজন আর ঠাকুরঝি। ঠাকুরঝি তাকে সবসময়েই ডাকে ‘কবিয়াল’ বলে। ‘কবি’ উপন্যাসে যেমন, চলচ্চিত্রেও তেমনি, কবিকে গোড়া থেকেই কবি বলে চিনে আসছে ঠাকুরঝির এই প্রেম। বারবার ঠাকুরঝিকে নিয়ে বাঁধা পংক্তি চলে আসছে কবিগানে, ‘ছটায় ছটায় ঝিকিমিকি তোমার নিশানা’ বা ‘কাল যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেনে’ এই দুই গানেরই আবিষ্কারের আধার ঠাকুরঝি। আমরা পরে দেখব, এই গানগুলি এতটাই ব্যক্তিগত ঠাকুরঝির কাছে যে নিতাই সেটা কবিগানের আসরে গাওয়ায় ঠাকুরঝি তাকে মন্দ লোক বলে ডাকবে। আমি এটা বলতে চাইছি না যে দাম্পত্য অসুখ থেকে সঞ্জাত প্রেম প্রেম হত না, এটাই বলতে চাইছি যে এই প্রেমটা বরং একটা বাড়তি কিছুর দ্যোতক, চিহ্নিত করছে কবিয়ালের কবিগান গাওয়ার ওই বাড়তি ক্ষমতাকে।

318
00:32:34,200 –> 00:32:41,000
(Remembers that having food or
Drink before men is impolite, and
Goes outside Nitai’s vision.)

(চা বানানোর পরে, নিতাই এবং ঠাকুরঝি দুজনেই চায়ে চুমুক দিতে যায়, এবং ঠাকুরঝির মনে পড়ে যায়, নিতাই সামনে রয়েছে এবং তখন সে উঠে দরজার আড়ালে গিয়ে চায়ে চুমুক দেয়।)

ঠিক এই দৃশ্যটার কথাই আগে আমরা উল্লেখ করেছিলাম। লেখক তারাশঙ্করকে যেটা ঠাকুরঝির জবানিতে বলে বা ভেবে নিতে হয়েছিল, “মেয়েদের ভাল লাগার কথা নাকি বলিতে নাই”, সেটা চলচ্চিত্রকার দেবকী বসু সরাসরি দর্শককে দেখিয়ে নিতে পারেন এই দৃশ্যটা দিয়ে, আলাদা করে কোনও বক্তব্য যোগ করার প্রয়োজনই পড়ে না। এবং মেয়েদের ভোগের প্রতি স্বতঃক্রিয়াশীল এই নিষেধের নিরিখেই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ঠাকুরঝির প্রতি নিতাইয়ের যত্নের ওই বিশেষ তাত্পর্যটা, যার আলোচনা আমরা আগেই করেছি। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে একটা তৃতীয় প্রবাহ হলে ভাল হয়। দ্বিতীয় প্রবাহ শুরু হয়েছিল ১৬ পাতার মাঝামাঝি প্রথমটাকে ভেঙে, আর এখন চলছে ৩৩। শুধু সেদিক দিয়েই নয়, নারী ঠাকুরঝির খুব স্পষ্ট আত্মঘোষণাগুলো এবার আসতে যাচ্ছে। এবং সেটা এতটাই উজ্জ্বল লাগে আমার যে বোধহয় একটা প্রবাহ-ভেদ এখানে ভালই যায়।

==========অংশ ৮ শেষ===================

Filed under: ফিল্ম — dd @ 5:17 pm

1 Comment »

  1. [...] তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম আর অষ্টম [...]

    Pingback by নেটখাতা » দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৯ (শেষ) — July 9, 2011 @ 10:24 am

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress