নেটখাতা

March 30, 2009

মাল্যবান ও খবরের কাগজ

মাল্যবানবাবুকে নিয়ে অনেকদিন আগে একটা লেখা লিখেছিলাম। ঠিক লেখা নয়, সাহিত্য আকাদেমিতে একটা সেমিনার হয়েছিল, তার আলোচনার একটা লিখিত রূপ। পরে সেটা অপর পত্রিকাতেও বেরিয়েছিল। ‘নিজের লেখা’ এই ব্যাপারটাই বেশ অদ্ভুত। প্রথম দু-চারদিন নিজের থেকে আলাদা করা যায়না লেখাটাকে, তাই আসলে  পড়াই যায় না লেখাটা, লেখার প্রক্রিয়াটা তখনও মাথার মধ্যে চালু থাকে, তাই পড়াটা হয়ে দাঁড়ায় পাঠ, বা নিদেন, সম্পাদনা। কিন্তু পড়া মানে যদি হয় লেখকের চিন্তার একটা স্তব্ধ আকারের সঙ্গে মুখোমুখি আসা, সেটা হয়ই না। এই দু-চারদিন লেখাটাকে মনে হয়, ‘ওঃ, যা লিখেছি না, অসাধারণ’। তারপর ধীরে ধীরে লেখাটা মাথায় মরে যায়, নতুন স্মৃতি এসে জায়গা নেয়, কেউ কখনো নিজের লেখার কোনও লাইন বা প্রসঙ্গ টেনে আনলে, এমনও হয় যে প্রথমে মনে হয়, আরে এটা তো চেনা চেনা, তারপর মনে পড়ে। অনেকদিন বাদে ‘নিজের লেখা’ পড়তে গেলে প্রায়ই বেশ একটা উদ্ভট পরিস্থিতি হয়। এক, পড়াটার মধ্যে কোনও লড়াই থাকে না, এই অর্থে যে, পড়তে শুরু করলেই মূল গতিটা অন্তত মনে পড়ে যায়, তাই কোনও অজানা বিষয় অজানা চিন্তা চলে আসার সম্ভাবনাটা প্রায় নেই হয়ে যায়। দুই, নিজের মাথার চিন্তাগুলো, যদি ওই পুরোনো চিন্তাগুলো তখনও মাথার মধ্যে বেঁচে থাকে, হয়ে দাঁড়ায় ওই পুরোনো চিন্তার একটা সুপারসেট, তাই প্রায়ই, যদি ভুলভাল একান্ত নাও মনে হয়, অন্তত একঘেয়ে তো লাগেই।

খুব কম লেখাই, ‘নিজের লেখা’, অনেকদিন পরে পড়লেও খুব একটা বিরক্তি লাগে না। বেয়াল্লিশ বয়স্ক মাল্যবানবাবুকে নিয়ে প্রায় ওই বয়স্ক ত্রিদিবের ওই লেখাটা মাঝে একদিন অনেকটাই পড়লাম। তুলনামূলক সাহিত্যের আমার এক পণ্ডিত বন্ধুর জন্যে, তার খুব দরকার ছিল, ওই পুরোনো লেখাটার পাতাগুলো স্ক্যান করে একটা ডিজেভিউ ফাইল বানালাম। তারপর তার থেকে একটা পিডিএফ। পিডিএফ ফাইল আর ডিজেভিউ ফাইল দুটোই তুললাম নেটে (লিংকদুটো এখানে দিয়ে দিলাম, কেউ পড়তে চাইলে যাতে ক্লিক করলেই পেয়ে যান, আগে দু-একজন চেয়েছে)। তখন বেশ অনেকটা অংশ পড়লাম। তখন ফুকোর ‘বর্ডার অফ ডিসকোর্স’ দিয়ে ঠিক যে ভাবে ভাবতাম, সেটা এখন কিছুটা বদলেছে, সদ্যসমাপ্ত (প্রথম খসড়া) কম্পিউটার সায়েন্সের রাজনৈতিক অর্থনীতির বইটা লেখার সূত্রে আরও বদলেছে সেটা, প্রতিরোধকে রাজনৈতিক দর্শনে জায়গা দেওয়ার একটা নতুন রকম মাথায় আসছে আজকাল, কিন্তু তাও লেখাটা বেশ ভাল লাগল, বেশ কিছু জায়গা।

কিন্তু মজাটা মাথায় এল তারপর। যেমন বললাম, লেখাটা যখন লিখেছি, আমি মাল্যবানদার চেয়ে মৃদু ছোট ছিলাম, গত চোদ্দ বছরে আমার বয়স বেড়ে গেছে। আর মাল্যবানের (এখন ও আমার চেয়ে ছোট, বরং ওরই আমায় দাদা বলা উচিত) বয়স তো বাড়েনি, ওর জীবনীর প্রথম পাতাতেই ছিল, বেয়াল্লিশ বছরের জন্মদিন থেকে শুরু, তারপর আর কয়েক মাসের ঘটনা মাত্র এসেছে, মানে ম্যাক্সিমাম সাড়ে-বেয়াল্লিশ। কিন্তু এই গত বছরগুলোয়, নিজের অচেতনেই, আমি ব্যাটাকে নকল করেছি। অন্তত ঠিক নকল বলতে যদি সত্যে বা সম্মানে একটু লাগে, প্রভাব তো ছিলই।

গত বেশ কিছু বছর, সেই পাঞ্জাবের উগ্রপন্থীরা একবার একবাস মানুষকে গুলি করে মেরে ফেলার পর থেকে, আমি খবরের কাগজ পড়া ছেড়ে দিয়েছিলাম। জানি ওগুলো সত্যি, কিন্তু নেওয়া যায় না। রাজীব গান্ধী হত্যার পরে, কী একটা  পত্রিকায়, খবরটা পড়তে হয়েছিল আমায় মধ্যের ছবির পাতাগুলো স্টেপল করে নিয়ে। খবরের কাগজ, রোজকার, বা খবরের পত্রিকা আমি স্থায়ী ভাবেই ছেড়ে দিয়েছিলাম, শরীরে চাপ পড়ছিল। তার জন্যে বেঁচেও গিয়েছিলাম, গুজরাটে মোদির ব্যাপারগুলোও আমায় পড়তে হয়নি।

মাঝে মাঝে টিভিতে খবর বা আলোচনা দেখতাম। আমার কাছে টিভি মানেই সিনেমা। হিন্দি সিনেমায় বড্ড বেশি বিজ্ঞাপন থাকে বলে এইচবিও বা স্টারটিভি এইসব দেখতাম। মানু আবার খুব সংবাদ দেখতে ভালবাসে। তাই বাধ্যতই, মাঝে মাঝে, ‘বাবা কী ইন্টারেস্টিং’ মুখ করে সেসব দেখতে হত। পাঞ্জাবের উগ্রপন্থীরা কাগজ থেকে বাঁচিয়েছিল, টিভি থেকে বাঁচিয়ে দিলেন বুদ্ধ। মোদিরটা তো দেখিই নি, বুদ্ধরটা দেখে, সিঙ্গুরে, পরপর দুদিন খুব বমি পেটব্যথা হল। ব্যাস, খেল খতম পয়সা হজম। বেশ বছর দেড়েক আমাদের টিভিটা চালানোই হত না, মানু মাঝে সাঝে আমি বাড়ি না-থাকলে চালিয়ে দেখত, সেটাও এই শর্তে যে আমায় কখনও কিচ্ছু বলবে না কী দেখল। বাড়িতে বাবা আর মানু খবরের কাগজ পড়ে, ওদের বলা আছে, আমায় কখনও কিছু জানায় না। মাঝে অশোকদা এসে একদিন বলল, তোমাদের টিভি খারাপ হয়ে যাবে, অনেকদিন না-চালালে নাকি তাই হয়, আর্দ্রতায়, মানে গতরে শুঁয়োপোকা ধরে যায় টিভির। তারপর থেকে মানু কিঞ্চিত বাড়িয়েছে, দু-তিন দিনে এক আধ বার চালায়, তাও আমি বাড়ি না-থাকলে।

অর্থাত, এখন, বেশ কিছু দিন, বছর তিনেক, আমি সভ্যতার দুটো কুসংস্কার থেকেই মুক্ত, খবরের কাগজ আর টিভি। মানে এক কথায় সংবাদ আর কি। সেদিন দেখলাম, এই গোটাটা নিয়েই বেশ কিছুটা আলোচনা ছিল মাল্যবানের ওই লেখাটায়। জীবনানন্দ, সজনীকান্ত দাশ, কামু, অনেকগুলো প্রসঙ্গ টেনে এনে। তখনই মাথায় এল, নিজের খেয়াল পড়েনি আগে, উৎসাহটা বোধহয় মাল্যবান থেকেই পাওয়া। আলোকপ্রাপ্তির বিপরীত গতিতে, একের পর এক একটা একটা করে আলো নেভাতে থাকা। বয়স হচ্ছে তো, চোখে ছটা লাগে বড়। কবি-তে একটা গান ছিল, বেশ উচ্ছল যৌনতার, চোখে ছটা লাগিল তোমার আয়না বসা চুড়িতে। ওই বয়সে ছটাটা বোধহয় ভালই লাগে।

3 Comments »

  1. আপনার মাল্যবান লেখাটা পড়তে পারলাম না। নেটে ও পেলাম না। কিভাবে পড়তে পারবো ?

    Comment by Samit — April 22, 2009 @ 5:26 pm

  2. ‘মাল্যবান ও খবরের কাগজ’ লেখাটার দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফের পঞ্চম বাক্যের গোড়ার অংশটা খেয়াল করুন, “পিডিএফ ফাইল আর ডিজেভিউ ফাইল দুটোই তুললাম নেটে … “, এর মধ্যে ‘পিডিএফ ফাইল’ এবং ‘ডিজেভিউ ফাইল’ এই অংশদুটোয় হাইপারলিংক করা আছে। যে কোনও ব্রাউজারে নিম্নরেখ বা আন্ডারলাইন করে অথবা অন্য রঙে দেখানোর কথা। আপনারটায় কেন দেখাচ্ছে না, বুঝলাম না। আপনি কোন ব্রাউজার ব্যবহার করেন? যাইহোক, ব্রাউজার দেখাক আর নাই-দেখাক, ওই ‘পিডিএফ ফাইল’ অংশটা লেফ্ট-ক্লিক করে ‘সেভ অ্যাজ’ করে আপনি পিডিএফ ফাইলটা পেয়ে যাবেন, বা, ‘ডিজেভিউ ফাইল’ অংশটা থেকে ডিজেভিউ ফাইল পাবেন। পিডিএফ খুলতে গেলে পিডিএফ রিডার লাগবে, বা ডিজেভিউর জন্যে ডিজেভিউ রিডার।

    আপনার মন্তব্যটা পড়ে আমি এইমাত্র পরীক্ষা করে দেখে নিলাম, malyaban.pdf এবং malyaban.djvu দুটো ফাইলই পাওয়া যাচ্ছে, ডাউনলোডও করা যাচ্ছে। আপনার যদি না-হয়, প্লিজ জানাবেন। তারপর দরকার হয় আমি মেল করে পাঠিয়ে দেব। কিন্তু হওয়ার কথা।

    Comment by dd — April 22, 2009 @ 5:44 pm

  3. দাঁড়ান, আমি নিজে বাঁ-হাতে মাউস নাড়াই বলে, আমি লিখতে গিয়ে ঘেঁটে ফেললাম, ওটা হবে ‘রাইট-ক্লিক’ মানে সচরাচর যেটা করা হয়, তার উল্টোটা। একটা মেনু আসবে। তার মধ্যে একটা থাকবে ‘সেভ অ্যাজ’। আর আমি বাঁহাতে মাউস চালাই অথচ সেটা সেট করা থাকে ডান হাতের জন্যে, অন্য সবার জন্যে। প্রথম থেকেই ওই ভাবে অভ্যেশ হয়ে গেছে।

    Comment by dd — April 22, 2009 @ 5:49 pm

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress