নেটখাতা

May 25, 2009

কলকাতা এবং আরও নানা কলকাতা

মধ্যমগ্রামকে কিছুদিন আগে বৃহত্তর কলকাতার পোস্টাল নেটওয়ার্কের পিন নম্বর দেওয়া হল। গত বছর দুয়েক মধ্যমগ্রামের পিন ৭০০১২৯, মানে কলকাতার বিভিন্ন এলাকার মত ৭ দিয়ে শুরু। যে সময়টায় হয়েছিল, তখন বেশ কয়েকবার শুনেছি, এ অন্যকে বলছে: কি, মধ্যমগ্রাম তো কলকাতা হয়ে গেল। এবং তার মধ্যে বেশ একটা গৌরববোধ। ছেলে আমেরিকায় চাকরি পেয়ে গেলে যা হয় তার একটা নরমতর প্রতিভাস। যদিও এই কথাও শুনেছি, আদতে নাকি এই কলকাতা হওয়া কোনও কলকাতা হওয়াই নয়, এটা শুধু ডাক-ও-তার বিভাগের জন্য প্রযোজ্য। যাই সত্যি হোক, তাতে মধ্যমগ্রামের পান-বিড়ির দোকানের মাথাতেও উজ্জ্বলতর অক্ষরে কলকাতা ১২৯ লেখা আটকায়নি। উজ্জ্বলতর, কারণ এখানে একটা চলমান বাস্তব সময়ের পদচিহ্ন থাকছে, যখন সাইনবোর্ডটা লেখা হয়েছিল তখনও তো আমরা গরীয়ানতর এই নাগরিকতার অন্তর্গত ছিলাম না।

কিন্তু আমরা কলকাতার নাগরিকই হই, অহো, আর না-ই হই, হায়, তাতে কলকাতার সঙ্গে আমাদের ভৌগোলিক দূরত্বটা বদলায়নি। আমাদের রেলটিকিটের গায়ে লেখা থাকে, কলকাতা ১৯ কিমি, এটা শিয়ালদা ইস্টিশন থেকে মধ্যমগ্রাম। আবার মধ্যমগ্রাম চৌমাথা থেকে উল্টোডাঙ্গা মোড় ২০ কিমি। এই রেলে ১৯ বা বাসে ২০ এর কোনওটাই তো এমন দূরত্ব নয় যা দিয়ে বোঝানো যায়, গত দশ বছর ধরে (প্রতি নির্বাচনের আগে মাসদেড়েক ছেড়ে দিয়ে) দিনে গড়ে ছয়-সাত ঘন্টা এবং কমপক্ষে দুই ঘন্টার লোডশেডিং। এবং যখন কলকাতায় লোডশেডিং হলেই সেটা খবর হয়। সত্যি কথা বলতে কি,  আমার ল্যাপটপে চলে যাওয়াটা একদমই এই লোডশেডিং-এর কারণে। সকালের খাবার খেয়ে কলেজ চলে যাওয়া ল্যাপটপ নিয়ে, এবং অনেক রাতে কলেজ থেকে ফেরা, কারণ কলকাতায় কোনও লোডশেডিং হয় না। এই পার্থক্যটা এতটাই নাটকীয় যে প্রথম দিকে আমার দু-এক সহকর্মী বিশ্বাস করত না। প্রতিহিংসাপরায়ণ ক্রোধে আমি একটা ভয়ঙ্কর জিনিস শুরু করেছিলাম। যেদিন বাড়ি আছি, লোডশেডিং হওয়া মাত্র ফোন করে তাদের সেদিনের বিদ্যুৎচিত্রটা জানানো।

তফাতটা আমাদের সমাজে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা তফাত, কিন্তু এটা মানতে বেশ কষ্ট হত, এখনও হয়, কিন্তু কষ্টটা সয়ে গেছে, নিজেকে নিচু জাতের বলে এতবার মানতে হয়েছে এই গোটা জীবন জুড়ে। কলকাতায় সাংবাদিকরা থাকে, নেতারা থাকে, মিডিয়ার নজরে পড়ে যায়। ক্রাইস্ট হেঁটেছিলেন ইবোলি পর্যন্ত, আর কারেন্ট হাঁটেন কলকাতা পর্যন্ত। এই কিছুদিন আগে যখন কলকাতায় প্রচণ্ড লোডশেডিং প্রচণ্ড লোডশেডিং বলে বিরাট ধুমধাড়াক্কা হচ্ছিল, একটা গোপন মজা খেলা করত মাথায়। বোঝ শালা, আমাদের তো এটা সয়ে গেছে, তোদের তো হয়নি, তাই আমরা নিচু জাতের বলে একটা সুবিধার জায়গায় আছি।

এবং কলকাতা থেকে ১৯ বা ২০ দূরত্বেই যদি এই হয়, তাহলে দূর মফস্বলে, যেখান থেকে এমনকি কোনও ছাগল আমার মত কলকাতায় চাকরি করতেও যায় না, সেখানে কী হয়? বা সেই পুরুলিয়ার গ্রামে, যেখানের কলেজে একসময় আমি পড়াতাম, যেখানে বিদ্যুৎ পেতে গেলেও পঞ্চায়েতের লোককে বলতে হয়, একটা মূল ট্যাপিং থেকে উপশিরা ট্যাপিং লাগিয়ে দিয়ে যেত, কোনও মিটার কানেকশন ইত্যাদির বালাই নেই, শুধু মাসপ্রতি একটা টাকা একজন এসে নিয়ে যেত। এ অবশ্য আজ প্রায় দুই দশক হতে চলল, জানি না এখন ওখানে কী হয়।

পাটনা আগে লোডশেডিং-এর জন্য বিখ্যাত ছিল, রাজগিরে গিয়ে একবার দেড়মাসব্যাপী লোডশেডিং দেখেছিলাম, সেখানেও এখন শুনছি নীতিশকুমারের আমলে লোডশেডিং বেশ কমেছে। তবে একটা রাজ্য নিশ্চয়ই আমাদের পিছনে আছে, কৃষিদারিদ্রবৃদ্ধির হারেও যেমন, সেটা ঝাড়খণ্ড। এই ঝাড়খণ্ডের কারণে আমরা গেঞ্জি উল্টো করে পরেও প্রথম হতে পারছি না, সেই ঢাকাই কুট্টি একজন উল্টো-গেঞ্জি পরা লোককে যেমন বলেছিল, কর্তা আইতাছেন না যাইতাছেন। কর্তা বলতেই পারতেন উল্টোমুখে অগ্রগতি করছি।

আজকে এই গোটাটার অবতারণা আবার এক পিস খচে যাওয়া থেকে। আজ ভারি ঝড় বাদল যাচ্ছে। খুব ভোর থেকে। বা, শেষ রাত থেকে। সকাল সাতটা থেকে আমাদের কারেন্ট নেই। অনেক গাছ পড়েছে। এইমাত্র জানলাম, ট্রান্সফর্মার শাটডাউন করে দিয়ে গেছে, কালকের আগে কিছু হওয়ার আর গল্প নেই। আমাদের ট্যাঙ্কের জল ফুরিয়ে গেছে। নিচের রিজার্ভারে আছে। সেখান থেকে বালতি করে তুলতে হবে এখন, এই লেখাটা শেষ করেই। কোমরে একটা ব্যথা চলছে, কিন্তু বাড়িতে বাবার বয়স আশির উপর, মার প্রায় আশি, মানুর পক্ষে ঝুঁকে পড়ে দড়ি দিয়ে জল তোলা সম্ভব না। আর জল লাগেই অনেক, বাড়িতে বাচ্চা থাকলে যা হয়। বারো ঘন্টা কারেন্ট নেই ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে, কাল যখনই আসুক, চব্বিশ ঘন্টা পেরিয়ে যাবেই।

এর চেয়েও ভয়ানক বিষয়টা আমাদের পাড়ার ফ্ল্যাটবাড়িগুলো। সেখানের একটি মেয়ে এইমাত্র ফোন করল, ওর দুটো ছোট ছোট বাচ্চা, আমাদের বাড়িতে জল আছে কিনা জানতে চাইল। বললাম, ট্যাঙ্ক শেষ হয়ে গেছে, রিজার্ভারে আছে, তুই বালতি নিয়ে আয়, কিছু একটা ব্যবস্থা করছি। এরকম ঘরে ঘরে।

কিন্তু রাগটা এখানেও হয়নি। অনেকটা বুড়ো হয়েছি তো, যে কোনও অশ্লীলতাই কেমন একটা নৈর্ব্যক্তিক দূরত্ব নিয়ে দেখার অভ্যাস হয়ে যাওয়াই তো বুড়ো হওয়া। বিরক্ত হলাম অন্য কারণে। আমার কলেজের একজনকে ফোন করলাম, কাজে। সে কথা প্রসঙ্গে জানাল, কলকাতাতেও আজ ভয়ানক অবস্থা গেছে, মেট্রো বন্ধ, বাস বন্ধ, কারেন্ট নেই, রাস্তায় গাছ পড়ে। কিন্তু সেগুলো তিনটে নাগাদ মিটে গেছে।

আমার মাথায় এল, সত্যিই তো, যা গাছ পড়ার সেগুলো তো ঘটে গেছে দিনের প্রথম অর্ধেকেই, তারপর সারাটা দিন গেল, সন্ধে গেল, সেগুলো ঠিক করা গেল না? বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে একটা অদ্ভুত ভাঁড়ামো করা হয় প্রতিবার, বর্ষা চলে যাওয়ার পর, সেপ্টেম্বরে, বিশ্বকর্মা পুজো নাগাদ গাছ বা গাছের ডাল কাটা হয়, বোধহয় বর্ষার ফলটাই ফলে, একটু দেরিতে। টেনিদা একবার প্যালাকে বলেছিল, বিকট গ্রীষ্মে যখন রাস্তায় আওয়ারা কুকুর আর সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া কেউ বেরোয় না, তখন কবিরা ঘরের দুয়োর বন্ধ করে লেখে, বাদলরাণীর নূপুর বাজে তালপিয়ালের বনে। নইলে বর্ষাকালে ছাপা হবে কী করে? এটা একটা জরুরি পরিষেবা, সেটা কি এইভাবে বন্ধ করে রাখা যায়? আর বিদ্যুৎ না থাকলে জলও থাকেনা, পৌরসভার জলও আসে না, বাড়ির পাম্পও চলে না।

এইমাত্র একটা ভারি প্রাসঙ্গিক ফোন পেলাম। আমার এক ভাই বারুইপুরে থাকে, সে ট্রেন বন্ধ হওয়ায় বাড়ি ফিরতে না-পেরে, কয়েকজন সহযাত্রী যোগাড় করে একটা গাড়ি করে বাড়ি ফিরছিল, নরেন্দ্রপুর আর কামাল গাজীর মাঝখানে গুন্ডারা রাস্তার গাছ সরানো বন্ধ করিয়ে সব গাড়ি থেকে টাকা আদায় করছিল। বারুইপুরের দূরত্ব শিয়ালদা থেকে ট্রেনে যতদূর সম্ভব ২৪ কিমি। বৃহত্তর কলকাতা।

কী অপরিসীম একটা সভ্যতায় বিরাজ করছি, এই অন্য কলকাতারা, পুলিশ বিদ্যুৎকর্মী গুন্ডাদের কী নিদারুণ পারস্পরিকতা। আমরা কলকাতায় থাকি না, তাই আমাদের এই ভাবেই বাঁচতে হয়।

Filed under: কলকাতা, মধ্যমগ্রাম — dd @ 7:02 pm

9 Comments »

  1. আমি একটু আগে আইসক্রীম খুঁজতে বেরিয়েছিলাম।

    সমস্ত রাস্তার বাতি নেভানো – আর দুই একজন ফোন করেছিল, তারা জানালো যেখানে যেখানে overhead wiring, সেখানে বিদ্যুৎ নেই। কোন গাড়ি নেই রাস্তায় – থাকবে কি করে, অন্ধকারে যতদুর চোখ যায়, শুধু ওপড়ানো গাছ উল্টে পড়ে আছে।

    Comment by সায়মিন্দু — May 25, 2009 @ 9:29 pm

  2. গল্পটা তো সেখানেই, সায়মিন্দু, ওভারহেড ওয়ারিং হল সমস্ত এসইবি এলাকায়, মানে পশ্চিমবঙ্গে, শুধু কলকাতা মানে সিইএসসি এলাকা বাদ দিয়ে।

    Comment by dd — May 25, 2009 @ 9:47 pm

  3. নানা – সিইএসসি এলাকাতেও ওভারহেড আছে। যাদবপুর, বেহালা, টালিগঞ্জ, সুইস পার্ক, ইত্যাদি।

    Comment by সায়মিন্দু — May 25, 2009 @ 9:54 pm

  4. আরে তোমাকে কি বলবো,ছোটমামা নৈহাটী থেকে ফোন করে ছিল সেখানেও আজ আর পাওয়ার আসবে না। দেবাশিষদা খবর দিল ওদের ওখানেও তাই। অসম্ভব ব্যাক্তিত্বের সাথে এসইবি এর লোকের জানিয়ে গেছে আজ আর বিদ্যুৎ আসবে না। এমনকি উত্তরবঙ্গ থেকে খবর পেলাম সেখানেও আলো নেই ,সেটা অবশ্য রোজদিনের নিয়মকরে ৫-৬ ঘন্টার লোডসেডিং। সব এসইবি এলাকায় আমি সবসময় দেখেছি এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ল কি পড়লনা, একটু জোরে বাতাস বইল কি বইলনা, আলো বন্ধ। কি অসম্ভব যত্নশীল এরা মানুষের জীবনের প্রতি। বলতে যাও, বলবে “ঝড়ে বিদ্যুৎপৃষ্ঠ হয়ে মারা গেলে তার দায় আপনি নেবেন?” – কিন্তু এই বিদ্যুৎপৃষ্ঠ হবার কলটা এখনো কেন টিকে রয়েছে জানতে চাইলে কিন্তু কোন যত্নশীল জবাব পাবেনা। মানে তুমি ভাব কলকাতা বাদে সারা পশ্চিমবঙ্গে আজ আলো নেই, কোন তাপ উত্তাপও নেই কারো। কি ভয়ানক অশ্লীল। অবশ্য কলকাতাটাই তো পশ্চিমবঙ্গ, তার বাইরে যারা থাকে তাদের বিদ্যুত নাহলেও চলে। বিদ্বজনেরাও থাকেনা, আবার মন্ত্রি আমলা গামলা কেউই থাকেনা। সুতরাং অন্ধকার।

    Comment by buria — May 25, 2009 @ 9:55 pm

  5. @সায়মিন্দু

    তাহলে তো ঠিকই আছে, একই কলকাতার শরীরে আরও নানা বিভিন্ন কলকাতা। যাদবপুর, বেহালা, টালিগঞ্জের কিছু হাতে গোনা এলাকা ঠিক সারা পশ্চিমবঙ্গের মত আজ অন্ধকারে থাকবে।

    Comment by dd — May 25, 2009 @ 10:00 pm

  6. @বুড়িয়া

    তুই ‘গামলা’ শব্দটা আমন তাচ্ছিল্যভরে লিখলি? আমি রু-কে প্রায়ই ‘গামলা’ বলে আদর করে ডেকে থাকি।

    Comment by dd — May 25, 2009 @ 10:01 pm

  7. কারেন্ট নেই — ২৯ ঘন্টা হতে আর কয়েক মিনিট বাকি।তার চেয়ে এখন অনেক বড় সমস্যা — জল নেই।মধ্যমগ্রাম পৌরসভাকে পৌরসভা বলেই ডাকা হয়, অথচ সেখানে জল সরবরাহ বিভাগেও কোনও জেনারেটর নেই। লোডশেডিং হলেই কোনও জল থাকে না। দিনে ছ ঘন্টা মত লোডশেডিং আমাদের গড়, তাই দশ ঘন্টা সেটা মাঝে মাঝেই হয়। সেটা যদি সকালের আর বিকেলের জল আসার সময়টায় ঘটে, যা প্রায়ই ঘটে থাকে, আমাদের কোনও জল আসে না।এবং গতকাল সকাল থেকে ২৯ ঘন্টা কারেন্ট নেই, এর মধ্যে তো আসেই নি, গত পরশু বিকেলের জলও আসেনি, কারণ সেই সময় লোডশেডিং ছিল। ফলতঃ কোথাও কোনও জল নেই। মাল্টিতলা ফ্ল্যাটবাড়িগুলো জেনারেটর চালিয়ে পাম্প চালিয়েছে, কিন্তু নিচের রিজার্ভারে জল ফুরিয়ে গেলে শুধু সেই ফ্ল্যাটবাড়িগুলোই জল পাবে যাদের নিজেদের ডিপ-টিউবওয়েল আছে। আর সাধারণ বাড়িগুলোতে কোনও জলই নেই। আমাদের যেমন, পরশু বিকেল থেকে, মানে, প্রায় আটচল্লিশ ঘন্টা জল আসেনি, রিজারভারের জল প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। জানিনা এর পর কী হবে। যা শুনছি, রাতেও কারেন্ট না-আসতে পারে। ল্যাপটপের ব্যাটারি ইতিমধ্যেই ৭০% হয়ে গেছে, পাওয়ারটপ চালানোর পরও। মোডেম কাল রাত এগারোটা পর্যন্ত চলেছে, ইউপিএসে শুধু ওটাই চালাচ্ছিলাম। এখন ডেটাকার্ড দিয়ে নেটে সংযোগ করলাম। কাল রাত বারোটা থেকে দুটো ফোনই ডেড।সকালে আধঘন্টা মত এল, আবার ডেড।যাদের সেলফোন তাদেরও নিশ্চয়ই এতক্ষণে ব্যাটারি ফুরিয়েছে।

    Comment by dd — May 26, 2009 @ 11:59 am

  8. আজকে, অর্থাৎ ২৭ তারিখ কলকাতার নানা রাস্তায় (তারাতলা, শকুন্তলা পার্ক, কসবা, বালীগঞ্জ…) অবরোধ। এখনো বিদ্যুৎ আসেনি। গাঙ্গুলীবাগানে আজ রাত ২টো নাগাদ আলো এসেছে – ঝড়ের দিন দুপুর বারোটা নাগাদ গেছিল।

    Comment by সায়মিন্দু — May 27, 2009 @ 1:06 pm

  9. আমার এখানে মাত্র ২ ঘন্টা বন্ধ ছিল। :) তবে জল ছিল না।

    Comment by susmit — May 30, 2009 @ 11:40 pm

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress