নেটখাতা

April 14, 2012

শিক্ষা শিক্ষাহীনতা ও কুশিক্ষা

আমার নিজের ভিতর থেকেই একটা গভীর বিরূপতা আমি চিরকালই বোধ করি শিক্ষার প্রতি। মুখে যেটা বলি প্রায়ই, শিক্ষা দিয়ে মানুষ শিক্ষিত বদমাইস হয়, শিক্ষিত রকমে চুরি করতে এবং পা চাটতে পারে। এটা তো আপাতত একটা গোদা এবং গাজোয়ারি যুক্তি বলে শোনাচ্ছে। কিন্তু আদতে এটা ততটা গাজোয়ারি এবং গোদা নয়। অনেক ভেবেছিও আমি এটা নিয়ে। আমার পরিচিত শিক্ষিত বদমাইসদের প্রতি আমার যতটা গা-ঘিনঘিন করে, কখনওই সেটা অশিক্ষিতদের প্রতি করে না।

আমার মাস্টারিজীবনের একদম গোড়ায় আমি কিছুদিন পড়িয়েছিলাম, পুরুলিয়ার মানবাজার কলেজে। সেখানের অনেককে, কলেজের ক্যাজুয়াল কর্মী প্রফুল্লকে, ওখানের আমার এক প্রাক্তন ছাত্রের বাবা-মাকে মনে করে আমার এই শিক্ষাবিরোধিতার পক্ষে আমি উজ্জ্বল সব উদাহরণও পেয়ে যেতাম, আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি মানুষ যাদের দেখেছি, ভালবাসায় যত্নে আতিথেয়তায় — এবং এই গোটাটা মিলিয়ে মানবিক সংস্কৃতিতে — তার মধ্যেই পড়েন এই মানুষগুলো। অথচ যাকে শিক্ষা বলি আমরা তার নিরিখে এরা যথার্থ শূন্য। বিশুদ্ধ নিরক্ষর। আমার খুব নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বা পরিজনদের মধ্যে যে কজন মানুষকে সত্যিই নকল করার মত লাগে, আবার নকল করা অসম্ভবও লাগে, তাদেরও কারুরই শিক্ষাটা কোনও মুখ্য জায়গা নয় একেবারেই।

মমতা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই, বেশ কয়েকবার নিজের মধ্যেই মনে হচ্ছিল নিজের এই অভ্যস্ত শিক্ষাবিরোধী অবস্থান থেকে কি শিক্ষাপন্থী হয়ে উঠতে হবে এই বুড়ো বয়সে? তাহলে কি নিজের ভিতর থেকেই কোথাও একটা মেনে নিতে হবে যে মানুষ হয়ে ওঠায় শিক্ষারও একটা গুরুত্বের জায়গা আছে? এবং এতদিন ধরে একটা চিন্তার সঙ্গে ঘর করার পর সেটার অনুপস্থিতিটাও তো একটা বেদনার হয়ে দাঁড়ায়। তাই একটু খারাপও লাগছিল এটা ভেবে।

চূড়ান্ত উত্তরটা পেলাম এই মিনিট পাঁচেক আগে। টেলিভিশনে অম্বিকেশ মহাপাত্রর, সেই মাস্টারমশাই যাকে প্রহার মৃত্যুভয় ও জেল দিয়েছিল গতকাল রাত্রে এই তৃণমূল শাসন ও সরকার, একটি ইমেল ফরোয়ার্ড করার দোষে, সঙ্গে কথা বলছিলেন এক সাংবাদিক। সাংবাদিকটি জিগেশ করলেন, আপনার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে সেই তৃণমূল কর্মীরা যারা আপনাকে মেরেছিল ও পুলিশে দিয়েছিল। আপনার এতে প্রতিক্রিয়া?

মাস্টারমশাই মাত্র দুতিনটে বাক্যে উত্তর দিলেন। তার মধ্যে একটা মাথায় গেঁথে গেল। দেখুন, যারা গ্রেপ্তার হয়েছিল, তারা তো আমার পরিচিত ও প্রতিবেশী — এতে তো আনন্দ পাওয়ার কিছু নেই।

আমরা সকলেই জানি পরশু রাত থেকে মাস্টারমশাইয়ের উপর কী চলছে। তার পরেও এই প্রতিক্রিয়াটা আমায় কেমন স্তম্ভিত করে দিল। এটাকে কী বলব? এটা তো শিক্ষা নয়, শিক্ষিত মানুষ তো রোজই দেখি কোটি কোটি। তাহলে এটা কী? হয়তো এটাই শিক্ষা।

আর এর উল্টোদিকে যে তৃণমূল শাসন ও সরকার — সে অর্থে তো তারাও কেউ অশিক্ষিত নয়। শিক্ষিত না হলে তো অন্তত কম্পিউটার চালানো, ইমেল খোলা, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, বা মাইকে বক্তৃতা করে চেঁচানো যায় না, “অন্যায় করেছে তো তার শাস্তি পাবে”। অনেকে টিভিতে বলছিলেন এটা মমতার তথা তৃণমূলের অশিক্ষা। না অশিক্ষা নয়, ওটা কুশিক্ষা।

মাস্টারমশাই অম্বিকেশবাবু, আমিও মাস্টারমশাই, বেশ বয়সও হয়ে গেছে, তাও আমাকেও আপনি আজ শেখালেন, কী ভাবে ভাবতে হয়, সারারাত পুলিশের লক-আপে কাটানোর পরের দিনও। আমি এখন থেকে আপনাকে নকল করার চেষ্টা করব। তবে কতটা পারব জানি না।

No Comments »

No comments yet.

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress