নেটখাতা

September 29, 2009

পুজোর ব্লগ

আমাদের নিজেদের মেলিং লিস্টে অন্য একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল। তার মধ্যে সুস্মিত লিখল, ‘দীপঙ্করদা, পুজোয় একটা ব্লগ লেখো’। আমরা সকলেই বেশ মজা পেলাম, পুজোয় চাই নতুন ব্লগ। তখন থেকেই মাথায় বিষয়টা নিজের গোচরে অগোচরেই কাজ করছিল, যেন পুজোটাকে লক্ষ্য করছিলাম, সবসময় ভাল করে নিজে না-বুঝেই।

লক্ষ্য করে চলার কিছু সুযোগও আসছিল এবার। আমিই এতটা বুড়ো, আমার বাবা-মা নিশ্চিতভাবেই আরও প্রচুরতর বুড়ো, মানু কিছুদিন ধরে বলছিল, তাদের অনেকদিন ধরে ইচ্ছে রু-এর সঙ্গে পুজোয় ঠাকুর দেখতে যাবে, আর কবে কী হবে না-হবে, সেটাও এবারেই সংগঠিত করা হয়েছিল। রু, বাবা, মা, সঙ্গে সবিতা আর পার্বতী, বহু বছর ধরে আমাদের বাড়িতে কাজ করে, মানু, আর আমি। গাড়ি করে কলকাতা যাওয়া, ঠাকুর দেখা, আর সঙ্গে, যেমন দস্তুর, বাইরে কোথাও খেতে হবে, অ্যাম্বার-এ খাওয়া।

অদ্ভুত লাগছিল নিজের এটা ভাবতে, কিন্তু এটা সত্যি, এটা সে অর্থে আমার প্রথম ঠাকুর দেখতে যাওয়া। খুব ছোটবেলায়, আমাদের ছোটবেলায়, কলোনি থেকে অভ্যস্ত মফস্বল হয়ে উঠতে চাওয়া মধ্যমগ্রামে, বা তারও আগের শিশুবয়সের নিউব্যারাকপুর, সেজেগুজে ঠাকুর দেখতে যাওয়া মণ্ডপে মণ্ডপে তখন কেবল একটু একটু চালু হচ্ছে, কোনওক্রমে টিঁকে থাকা মানুষের একটু একটু করে ক্রমসঞ্চয়মান সময় ও সারপ্লাস, একটু আধটু বোধহয় গেছিও অমন, খুব ছোটবেলার আবছা স্মৃতি ঘেঁটে মনে হচ্ছে। বা এমনও হতে পারে, ওরকমই তো হওয়ার কথা, তাই ওরকম ভেবে নিচ্ছি, অন্য ছবি দিয়ে স্মৃতির ভাঁড়ারের ফুটো মেরামত করার চেষ্টা করছি।

যেটা পুজো সংক্রান্ত স্মৃতি আমার খুব স্পষ্ট ভাবে আছে, সেটা পাঁচ ছয় নাগাদ, নিউব্যারাকপুরের স্মৃতিটা ঠিক পুজোর নয়, পুজো উপলক্ষে ব্যায়ামসমিতির করা শরীরের পেশী প্রদর্শন, আর মামাবাড়িতে, মধ্যমগ্রামের বিধানপল্লীতে, দুলুদার দোকানের সামনে ফাঁকা মাঠে পুজোর মণ্ডপে, খুবই মাঠো সব, বাঁশের বেড়ার গায়ে চটের আবরণ, তার মধ্যে তখনকার ডেকরেটরের কাঠ-পিজবোর্ডের চেয়ারে বসে আমি আর গজো, তখনকার এক সঙ্গী, একটা খেলনা পিস্তল দিয়ে মারামারি করছি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য: যুদ্ধে আমিই জিতেছিলাম। ফিরে এসে আমার মামাতো ভাই লবকে সেই জয়ঘোষণায় আমার করা বাক্যটা আমার এখনও মনে আছে, গজোকে জুতো পালিশ করে দিয়েছি।

এর পরের কয়েকটা বছর জুড়ে, মেয়েদের প্রতি, উজ্জ্বল পোষাকের প্রতি আকর্ষণ ছাড়া পুজোর উৎসবের আর যে জিনিসটা মনে আছে সেটা হল মণ্ডপে বসে থাকা। আমি চিরকালই বেজায় কুঁড়ে, বসে বসে চেয়ে থাকার চেয়ে বেশি সক্রিয় কোনও ক্রিয়া আমায় আজও তেমন একটা টানে না। এই মণ্ডপে বসে থাকা, মণ্ডপের নানা, তেমন সুশ্রী নয় বিষয় আমার মাথায় রয়ে যাওয়া কাজ করেছিল ‘তপন বিশ্বাসের খিদের বত্রিশ ঘন্টা’ লেখার সময়ে। আর লেখায় ওটা চলে আসা নিয়ে বেশ অদ্ভুত এবং কুৎসিত একটা অভিজ্ঞতা আমার প্রায় ওই বয়সেই হয়েছিল। হিন্দুস্কুলে আমাদের ক্লাস সেভেনে বাংলা পড়াতেন যে মাস্টারমশাই, হঠাৎ এই লিখতে গিয়ে দেখছি তার নামটা মনে করতে পারছি না, তিনি বাংলা রচনা লিখতে দিয়েছিলেন, রথের মেলা নিয়ে। আমি সে বছরই রথের মেলায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম, কীর্তন যেখানে হচ্ছে সেই গোটাটা। সেখানের একটা উপাদান আমি রচনায় এনেছিলাম। কীর্তনের খোল বাজাচ্ছে যে লোকটা, মাড়ি আর দাঁত কালো, একটু উঁচু, কোনও নারী এসে কাছে দাঁড়ালেই তার দিকে একটু ঝুঁকে যাচ্ছে আর তার খোলের বাজনার জোরও বাড়ছে একটু। গোটাটা সত্যি, আমার এখনও ছবিটা মনে আছে, ঝাপসা ঝাপসা। কী ভাষায় লিখেছিলাম মনে নেই। আমায় ক্লাসে উনি দাঁড় করিয়ে জিগেশ করলেন এটা কী লিখেছ, রম্যরচনা? আমি শব্দটার মানে জানতাম না, এর অনেক বাদে জেনেছিলাম, এবং কী উত্তর দিয়েছিলাম তা আজ আর মনে নেই, কিন্তু উনি আমায় বেঞ্চ থেকে বার করে এনে মেরেছিলেন। আমি সেই মুহূর্তে ভারি ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে গিয়েছিলাম, এবং মার চলাকালীনই বুঝতে পারছিলাম, আমি যা-ই উত্তর দিতাম উনি বোধহয় মারতেন। এখনকার বাজারে এটা বেশ কঠিন, কিন্তু কাম বা যৌনতা নিয়ে কোনও দূরাণ্বয়ী কথাও তখন কী ভীষণ হিংস্রতা বার করে আনত। তখন সেটা বুঝিনি, লোকটা যে পাঁঠা, মজাটা বুঝল না, এটাও বুঝেছিলাম অনেকটা বাদে।

আর এর মাঝেই শুরু হয়ে গেল রাজনীতি। সেই কৈশোর বয়সেই। তখন তো তত্ত্বটত্ত্ব কিছুই বুঝতাম না। কিন্তু যে লোকগুলো এলাকায় রাজনীতি করত, সিপিএম রাজনীতি, গজোর বাবা তাদের একজন, নিউব্যারাকপুরের অমূল্যজ্যাঠা আর একজন, দেশহিতৈষী নিয়ে আসত আমাদের বাড়িতে, বহুবছর জেল খাটা, দাড়িতে চুলে কিছুটা রূপকথা হয়ে ওঠা সুরেশজ্যাঠা ছিলেন, এরা যে চারপাশের মানুষগুলোর থেকে অনেকটা অন্যরকম, সেটা সেই তখনই বুঝতে পারতাম, কেমন একটা অন্য অনুভূতি হয়, স্বপ্ন দেখানো রকমে একটা কিছু। একটা ভাল অনুভূতি হত, এখনকার সিপিএমদের দেখলে ঠিক যার উল্টোটা হয়। আমি এঁদের নিয়ে কোনও রূপকথা তৈরি করছি না। অতটা ছেলেমানুষ আমি ছেলেবয়সেও ছিলাম না, অনেককিছুই চোখে পড়ত আমার। আটাত্তরের পর থেকে এই লোকগুলোই ক্রমে, তাদের চারপাশ পরিজন পরিবেশ, ক্রমশঃ গেঁজে যেতে শুরু করল, ওই স্বাধীনতা আন্দোলনের পেনশনের মত আত্মত্যাগের বাড়িভাড়া পেতে ও নিতে শুরু করল, দেখলাম। কিন্তু তার আগেই রাজনীতি এসে গেল।

রাজনীতির সেই কিশোরবয়স থেকেই পুজো মানেই হয়ে উঠল অনেক অনেক বই পড়ার অবিমিশ্র ছুটি। শারদীয়া যে কোনও সংখ্যা, বেশ মোটা হলে আমার একদিন ছাড়াত, নয়তো দিনের দিনই নেমে যেত। এর পরপরই এসে গেল পার্টির পুজোর বইয়ের স্টল। বইয়ের সঙ্গে বসে থাকতে, পড়ে থাকতে, এমনকি ঘুমিয়ে থাকতে অব্দি বেজায় ভালবাসতাম চিরকালই। একবার একটা গল্পে একটা চরিত্র লিখেছিলাম যে সঙ্গে বই মানে অক্ষরের কবচকুণ্ডল না থাকলে ট্রেনে উঠতে ভয় পেত, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগত, আত্মপরিচিতি ঘেঁটে যেত তার, সেটা নিজের প্রতিক্রিয়া থেকেই। কম্পিউটার এই উপকারটা করেছে আমার, অন্য অনেক কাজে সাহায্যের পাশাপাশি, বইপ্রতিমার বাতিক দূর করেছে। তবে বোকা ইগোর আত্মঘোষণাটা থাকেই, হয়তো সেটা করে উঠতে নিজেকে অনুমতি দিই না, বা নিজের অগোচরে হয়ত দিয়েও ফেলি, কিন্তু তার প্রতিমাটা অন্তত বদলেছে।

তাই, পুজো ও ঠাকুর দেখতে যাওয়া আমার এই প্রথম। ওরকম শোভাযাত্রা করে দামি জায়গায় খেতে যাওয়াটাও। এখন তো একটু পয়সাটয়সাও হচ্ছে আমার। বুড়ো হতে হতে যেমন হয়েই থাকে।

এবার আরও একটা নতুন জিনিস করলাম। জীবনে প্রথম। বিসর্জনের মিছিলে যাওয়া। রাজনীতির মিছিলে অনেক হেঁটেছি। অনেক রকম। কিন্তু বিসর্জনের মিছিলে এই প্রথম। আর আমার তো সেই খুব ছোটবেলার পর থেকে ভক্তিটা কেমন একটা খসে গিয়েছিল, কোনও কিছুতেই কোনও ভক্তি হত না, লোককে না ঠাকুরকে না। আমার ক্ষেত্রে এটা অন্তত একটা বিষাক্ততা নিয়েই এসেছিল। একটা প্যারানইয়াও হতে পারে, সবাই এটা করছে, আমায় করাতে চাইছে, তার মানেই এটায় কোনও বদমাইসি আছে। কোনও ভক্তি নেই বলে জীবনের খুব একা খুব তিক্ত সময়গুলোয় মাঝে মাঝে নিজেকে খুব একা বোকা এবং বিষণ্ণও লেগেছে, আমার হায় নালিশ জানানোর কোনও জায়গাও নেই। তাই অন্য মানুষগুলোকে, তাদের খুব আবেগ হচ্ছে, ফাঁকা মণ্ডপ দেখে, ঠাকুর চলে যাচ্ছে, কেঁদে ফেলছে, আর সেই লোকগুলোকে তো আমি বেশ ভালই বাসি, পছন্দ করি, তাদের খারাপ লাগায় আমারও লাগছে। এই গোটাটাই আমার বেশ কৌতূহলোদ্দীপক আর আকর্ষণীয় লাগছিল।

এই দুটোকে মিলিয়ে অনেকটা লেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ভূমিকাটা বড্ড বড় হয়ে গেল। আর একটা ঘটনা কাল রাত থেকে ভীষণ খারাপ একটা অনুভূতি দিচ্ছে। সেটা উল্লেখ করে আজকের ব্লগটা শেষ করি। ওগুলো নিয়ে হয়তো পুজোর ব্লগ ২ লিখব এর পর।

এবারের পুজোর কলকাতা দেখে, এবং অন্যদের কাছ থেকে শুনেও যা পেলাম, বেশ শান্তিপূর্ণ ছিল। মাইকের এবং বাজির কদর্যতা বেশ সহনীয় ছিল। গোটা গাদটা এসে জমা হয়েছে মফস্বলে। সারাদিন ধরে প্রবল জোরে মাইক বেজেছে সর্বত্র, রাত্তির এগারোটা নাগাদ মোটামুটি হয়ত বন্ধ হয়েছে, অন্তত মধ্যমগ্রাম নিউব্যারাকপুরে, কিন্তু সারাদিন ধরে সে যে কী কষ্ট হয়েছে। অজস্রবার জানানো হয়েছে গিয়ে, রীতিমত অসুস্থ লাগছিল, কিন্তু কিছু তেমন লাভ হয়নি। আর বাজি ফেটেছে ভয়ঙ্কর। খারাপ অভিজ্ঞতাটা সেই বাজি নিয়েই।

আমার এক বহু পুরোনো ছাত্র, এখন আমার বন্ধু, তার বউ অন্তঃস্বত্তা। সেখানে নানা সমস্যাও আছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আর ওর প্রথম বাচ্চা সাড়ে তিন বছর বয়েস। নিউব্যারাকপুরে ওদের বাড়ির কাছে গতকাল বিসর্জনে এমন বাজি ফেটেছে, সেই সাড়ে তিনের মেয়ে ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে বমি পায়খানা করে ফেলেছে। সেটা শোনা থেকেই এত কষ্ট হচ্ছিল। আমাদের এখানেও, ঘুমন্ত বাচ্চারা কেঁপে কেঁপে উঠছিল। এবং এটা চলে অন্তত রাত একটা দশ পর্যন্ত। আমি ঘুমোতে পারছিলাম না আওয়াজে। ওই সময়ে আমি ওষুধ খেয়ে ঘুমোতে গেছিলাম।

এবার আওয়াজের মাত্রা আবার বেড়েছে, শুনছি যুক্তিটা নাকি শ্রমিকশ্রেণীর হয়ে। যদি শব্দবাজি না হয় এরা কোথায় কাজ পাবে? এ যে কি অদ্ভুত যুক্তি। তাহলে পাইপগান তৈরিকেও স্বীকৃতি দিতে হয়, নইলে শ্রমিকদের কী হবে? বাজি বানাতে কি এতটাই দক্ষতা লাগে, ইতিহাসের মাস্টারমশাই যেমন অঙ্ক শেখাতে পারেন না, যে এই শব্দবাজি-শ্রমিকরা তুবড়ি বা রংমশাল বানাতে পারবেন না?

ছত্রধর মাহাতোকে ধরা হল রাষ্ট্রের বিরোধিতার দায়ে। তাহলে ‘লালা বাংলা ছেড়ে পালা’ আর ভুল ইংরিজিতে ‘ওদের ভাষাতেই ওদের উত্তর দেওয়া হয়েছে’ এই দায়ে বিমান-বুদ্ধকে কেন ধরা হবে না কে জানে? আইনবিভাগকে অপমান করা মানেও রাষ্ট্রবিরোধিতা। বা, মুখ্যমন্ত্রী হয়েও, সংবিধানের ভাষা না বলে দুষ্কৃতীদের ভাষায় কথা বলতে চাওয়া অবশ্যই রাষ্ট্রবিরোধিতা। এরা এই অসভ্যতা গুলো করে করে যা করেছেন তা হল কোনও রকমের কোনও প্রকারের কৌম অস্তিত্ত্বটাই মুছে গিয়েছে, কোনও অনুশাসনের প্রয়োজনীয়তাও। তাই কোনও ক্রমে দম চেপে কলকাতা থেকে তাড়ালেও তা এসে জোরতর হয়ে চেপে বসছে কলকাতার বাইরে, খ্রীষ্ট যেখানে হাঁটেননি।

2 Comments »

  1. নিজেই এটায় একটা মন্তব্য যোগ করা যাক। রাত বারোটা হতে আর মিনিট পাঁচেক। কোনও একটি “সাংস্কিতিক ওনুস্ঠান” এখনও পূর্ণগৌরবে চলছে, বাজি তো আছেই। এবং স্টেশনের খুব কাছেই কোথাও। জয় হোক দূষণ নিয়ন্ত্রণের এবং রাষ্ট্রের।

    Comment by dd — September 29, 2009 @ 11:56 pm

  2. Jai ho ! is a current theme. Hence, it is mandatory that you listen to various remixes of it.

    Comment by sankarshan — October 5, 2009 @ 5:06 pm

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress