নেটখাতা

April 22, 2012

ব্যাঙতন্ত্র এবং ঠাম্মা-ব্যাঙ

আমার এক সহকর্মী দিন চারেক আগে আমায় রাতে ফোন করলেন, “দেখছিলে আজ সিপিএমদের, টিচার্স-রুমে — আজ কেমন গলা বেরিয়েছিল, এতদিন পর?” আমি বললাম, “হ্যাঁ, নতুন বর্ষার জল পড়ায় এঁদো পুকুরের ব্যাঙের মত তো?” সে অবাক হয়ে জানাল, “ওমা তোমারও ব্যাঙের কথা মাথায় এল? আমারও তাই এসেছিল।”

ব্যাঙের তুলনাটা মাথায় আসা খুব বিচিত্র কিছু নয়। দলবদ্ধ আস্ফালন তৈরি করা, যার থেকে কিছুই বোঝা যাবে না। বোঝা যাবে না কারুরই একার আস্ফালন। বোঝার কিছু বোধহয় নেইও। সিপিএম-এর যে কারুরই কথা শুনলে বোঝা যায়, তিনি সবচেয়ে বুদ্ধিমান, সব চক্রান্ত তৈরি হওয়ার আগে থেকে সমাধা হওয়ার পর অব্দি তার জানা, এবং তাঁর এই কথন আর কিছুই নয়, গর্দভ জনগণ যারা নানাবিধ অপপ্রচারে ফেঁসে আছে, তাদের একটু সত্যিকারের সত্যি বুঝিয়ে দেওয়ার লোকশিক্ষা তৈরি করার চেষ্টা করছেন তিনি। সাহেব সৈন্যরা যেমন সাদা-মানুষের-দায়ভার, হোয়াইট-মেনস-বার্ডেন, নিয়ে ‌এইসব ভারত ইত্যাদি কলোনিতে আসত, পুণ্য অর্জনের জন্যে, অন্য কিছু নয়। তেমনি এই সিপিএমরাও এই মাটির পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন আমাদের একটু বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যে, আসল সত্যটা কী।

আগে এসব শুধু বুদ্ধ, গৌতম ইত্যাদি নেতাদের মধ্যে দেখতাম। তাদের সন্তানাদিতে ক্রমে পরিকীর্ণ হয়েছিল এই পৃথিবী, যদিও বিধানসভায় তৃণমূল জেতার পর থেকে তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না একেবারেই। সত্যিই তারা বর্ষার নবধারাজলে সিঞ্চিত ও রোমাঞ্চিত হয়ে তাদের ব্যক্তিগত সব কুয়ো থেকে বেরিয়ে আসছেন, একদম দিগ্বিদিক পুরো ডেকে ডেকে হেজে দিচ্ছেন। টেলিভিশন চ্যানেল থেকে কলেজের টিচার্স-রুম অব্দি। তবে এটা ঠিকই, গৌতম-বুদ্ধবাদীরা আজকাল তেমন মারধর করছেন না, বা, পারছেন না, শুধু ডেকে যাচ্ছেন। এবং এইখানটাতেই ভারি চটে যাচ্ছি।

কলেজের টিচার্স রুমেও সেদিন না বলে পারলাম না, “কোন ইতরামিটা তৃণমূল করছে, যার শুরুটা তোমাদের হাতে নয়?” একজন বললেন, “এতটা কিন্তু হয়নি কখনও।” তাকে না-বলে পারলাম না, “তোমাদের হাতে তোমাদের ক্ষমতায় যদি পাঁচটা খুন হয়ে থাকে তোমাদের উত্তরসূরী শুরু করছে ছয় নম্বর থেকে, সংখ্যাজগতে তো পাঁচের পরে ছয়ই আসে, সংখ্যার লজিকে”। আমার এক সহকর্মী বললেন, “চৌঁত্রিশের পরে ফের এক থেকে না-গুণে, পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ করে গুণে দেখো, পুরোটা মিলে যাবে।” আমি যোগ করার চেষ্টা করলাম, দেখো, এই আলোচনাটা যে টিচারদের মত নখদন্তহীন লোলচর্মদের মধ্যে ঘটতে পারছে, এটাও এই পঁয়ত্রিশতম বছরের অবদান। এর আগে কলকাতার সিকি দুয়ানি নয়া পয়সা নেতাদের দেখেও প্রিন্সিপালদের উঠে দাঁড়াতে হত। যা‌, মোটের উপর প্রিন্সিপাল জাতিটাকেই ঠেলে দিয়েছিল একটা অন্ধকার অপদার্থ অশিক্ষার মধ্যে, এমন অবস্থায় যেখানে আমার সব পরিচিতরাই মাস্টারমশাই হওয়া সত্ত্বেও আমি এমন একজনকেও চিনিনা, আত্মসম্মানবোধ এবং প্রিন্সিপাল হওয়ার বাসনা একই সঙ্গে যার মধ্যে বহমান। এই নিয়ে আগেও আলোচনা করেছিলাম এই ব্লগে — সিপিএম এবং শিক্ষা সাক্ষরতা। এখন তাদের যখন ধরে ধরে পেটাচ্ছে, সেটা মন্দ না ভাল তা স্থিরনিশ্চিত হওয়া খুবই কঠিন। কারণ, এক, ঘোমটার ভিতর থেকে উলঙ্গ সত্যটা বাইরে আসছে, হেগেলীয় ভাষায় যাকে বলে ইমানেন্ট এক্সপ্লিসিট হচ্ছে, লোকের কাছ থেকে চৌঁত্রিশ বছর ধরে গোপন রাখা সত্যটা প্রকাশিত হচ্ছে, আর দুই, যে সব লোক সিপিএমের নেতাদের বাড়ির বাজার করে দিয়ে প্রিন্সিপাল হয়েছে, এবং এখন সেই একই অনায়াস দক্ষতায় অন্য অনেক নেতাদের বাড়ির বাজার করে দিচ্ছে, তাদের পেটানো হয়ত আইনবিরোধী হতে পারে, কিন্তু অভ্যন্তরীন অন্য নৈতিকতায় তাকে খুব অন্যায় বলে বোধ হয় না, যেমন, গীতায় আছে যে আত্মীয়কে হত্যা করে তাকে মেরে ফেলাটা নিধন নয়, বধ, যেমন পশুবধ হয়, তা বেআইনি বটে, কিন্তু আমরা খুব অন্যায় মনে করি কি? বরং চৌত্রিশ বছরের অবরুদ্ধ অনুভূতি প্রকাশিত হোক না সমাজের নিউরোসিস-এর আকারে, বরং তা এবার চিকিৎসিত হতে পারবে।

কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই, ওই তুমুল ব্যাঙ ডাকার শব্দে কাউকেই কিছু শোনানো গেল না। সেই সশব্দ ব্যাঙতন্ত্র কোথাও তো একটা গণতন্ত্রেরও চিহ্ন, কারণ, আগেই বললাম, তৃণমূল ইত্যাদি নিয়ে যে আলোচনাটা চলছিল, সিপিএম আমলে সিপিএমকে নিয়ে তার ধারে কাছে কিছুও টিচার্সরুমে চলাটা ছিল কল্পনারও বাইরে। তাই, গণতন্ত্র না হোক, ব্যাঙতন্ত্রই সই।


আমার ওই সহকর্মীর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতেই, ওই ব্যাঙের প্রসঙ্গে মাথায় এসে গেল, এটা নিয়ে একটা ব্লগ লেখা যায়। আর তার একটু পরেই, চলে এল আমাদেরই একটা চিরাচরিত গল্প। কোথায় পড়েছি, ছোটবেলায়, পঞ্চতন্ত্রে না ঈশপে, তাও মনে করতে পারছি না।

গল্পটা এক ব্যাঙ-ঠাম্মাকে নিয়ে। তার নাতি-নাতনিরা তাঁকে দেখে অবাক হত, ওমা এত বড় কখনও হওয়া যায়, হওয়া সম্ভব? কিন্তু সেই ঠাম্মার আয়তনগত হেজেমনি একদিন আক্রান্ত ও চূর্ণ হল, যখন নাতিনাতনিরা কাছের মাঠে একদিন একটি বলদকে দেখল এবং ফিরে এসে ঠাম্মাকে জানাল। ঠাম্মা বিস্মিত হয়ে গেলেন, তাঁর চেয়েও বড় কিছু কি সত্যিই হওয়া সম্ভব? ঠাম্মার এটা সততই মনে হল, কারণ ঠাম্মা ব্যাঙ কোনওদিনই তাঁর কুয়োর বাইরে যান নি। কিছুই দেখেননি। তিনি পেটের ভিতর দম আটকে আটকে নিজের ভুঁড়ি ক্রমে ফোলাতেই থাকলেন। এর চেয়েও বড়? এর চেয়েও বড়? …

শেষে ফুলতে ফুলতে তিনি ফেটেই গেলেন।

শেষ কিছুদিন মমতার ক্রিয়াকলাপ দেখে মনে হচ্ছে, বোধহয়, যা শুনেছি, অধীর চৌধুরী যা বলেছেন, হার্মাদ থেকে উন্মাদদের হাতে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ, তার সঙ্গে একমত হওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। আজকে এঁদোপুকুরের ব্যাঙেরা তাদের পাঁকমাখা চীৎকার ফের শুরু করার জোরটা পেয়ে গেল এত তাড়াতাড়ি তার জন্যে ইতিহাসের কাছে দায়ী থাকবেন মমতা নিজেই। ঔদ্ধত্য আর আত্মরতিতে ঋদ্ধ সিপিএমের গৌতম বুদ্ধের এই নয়া বৌদ্ধধর্ম তিনি যত বেশি প্রসারিত প্রবাহিত ও উচ্চারিত করে তুলবেন, ততই তিনি এগোতে থাকবেন নিজের বিনাশের দিকে, এবং রাজ্যেরও। পার্ক স্ট্রিট থেকে কাটোয়া, নোনাডাঙ্গা থেকে বন্ধ-রোখা, ঠিক সেই একই রকম শরীরি বলপ্রয়োগে যেমন করে সিপিএম বন্ধ করত, তিনি কী প্রমাণ করতে চাইছেন — তিনি গৌতমবুদ্ধের চেয়েও বেশি বৌদ্ধ? তা হলে কী হল এত কিছু করে সিপিএম জমানার বিরুদ্ধে এত বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়ায়? ব্যাঙ-ঠাম্মা হতে চাইছেন? তিনি কেন এই আত্মবিনাশের পথে হাঁটছেন, আমি জানি না।

ভয় লাগছে হয়তো ইতিহাসে আমাদের জন্যে বরাদ্দ আছে এখন হয় হার্মাদ নয় উন্মাদ কোনও এক ধরনের স্বৈরতন্ত্রই। আতঙ্ক হচ্ছে এই কারণে যে সিপিএম তো নিজেকে বিশ্বাসই করিয়ে ফেলেছে, নিজের কোনও কারণে নয়, করাতের চালনাতেই সমস্যা, কংগ্রেস থেকে কেন্দ্রে সমর্থন তুলে নেওয়াতেই সে হেরেছে, ওটা না ঘটলে সে তো হারতও না, শাসনটা তো সে ঠিকই চালাচ্ছিল। অর্থাৎ, এই সিপিএম ফিরে আসবে আরও আরও নতুন নন্দীগ্রাম সিঙ্গুরের প্রতিশ্রুতি, এবং অমিতাভ নন্দী ও লক্ষ্মণ শেঠদের নিয়েই, কারণ সে তো তাদের মিথ্যা মামলায় আক্রান্ত বলে মনে করে। সে কোন সিপিএম যা আমাদের চেনা সিপিএম-এর চেয়েও ভয়ঙ্কর?

No Comments »

No comments yet.

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress