নেটখাতা

December 6, 2014

কুকুরের কান্না, চিৎকার

আজ সকালে আমাদের পাড়ার কুকুরগুলোর একটা অনেকক্ষণ ধরে হাউ হাউ করে চীৎকার করছিল। শুনছিলাম, আর ভাবছিলাম, কেন করে? এটা ঘটছিল একটা দেজাভুর, ফিরে-দেখার, মত। এই পাড়ায় আমরা এসেছিলাম বাহাত্তর সাল নাগাদ, তখন আমি ছেলেমানুষ, ইশকুলে পড়ি। সেই সময় একদিন এই পাড়াতে আসার পরপরই ঠিক এমনটা ঘটেছিল। জীবনে প্রথমবার, খেয়াল করে, এই কান্নার আওয়াজটা শুনেছিলাম। কান্না না ডাক না চীৎকার — সবকিছুই। শুনতে খুব করুণ লাগে। কিন্তু কুকুরগুলোর পরিস্থিতেতে খুব করুণাকর কোনও উপাদান থাকে না বোধহয়, কোনও যন্ত্রণা বা বেদনা বা অমন কিছু, অন্তত জানতে বা বুঝতে পারিনি কখনো।

সেই ছোটবেলাতে খুব অবাক হয়েছিলাম, কুকুরটা এমন করছে কেন। কুকুর খুব ভালবাসি বলে নিজের বুকে কেমন মোচড়াচ্ছিল। তারপর থেকে কত বার কত জনকে জিগেশ করেছি, কুকুরেরা অমন করে কেন মাঝে মাঝে, কোনও প্রশ্ন মিটে যাওয়ার মত উত্তর পাইনি। বহু পরে, তখন আমি বিয়ে করেছি, যুবক, সমরেশদা বা লাডলিদা, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরিতে ছিলেন, লিখতেনও প্রতিক্ষণ-এ, বলেছিলেন, সে নব্বই টব্বই হবে, কুকুরেরা চাঁদ ওঠা ব্যাপারটাকে ঠিক বুঝতে পারে না, তাই জ্যোৎস্না উঠলে অমন করে।

তারপরে আবার কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। কুকুরকে বা কুকুরদের অমন করতে শুনলে প্রশ্নটা মাঝেমাঝেই ফেরত এসেছে। লাডলিদার উত্তরটা, যেদিন শুনেছিলাম, সেদিনের মতই, খুব একটা সঠিক লাগেনি। কিন্তু চাঁদের সঙ্গে কোনও একটা সম্পর্ক নিশ্চয়ই উনি অভিজ্ঞতায় পেয়েছেন, তাই বলেছিলেন।

তারপর আবার বহুবছর কেটে গেছে। লাডলিদা কোথায় আছেন কেমন আছেন সেই প্রসঙ্গও মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে বহুবছর, পরবর্তী অনেক বছরের ভিড়ে। যেমন হয়। আজ সকালে আবার শুনলাম ওই কান্না। ছোটবেলার সেই সকালেরই যেন একটা ফিরে দেখা।

শীত পড়ছে। ঠান্ডায় আমার কষ্ট হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে শরীরটা যেন নড়তেই চায় না। আড়ষ্ট ব্যথাব্যথা, যেমন আমার চিরকালই। গত পনরো কুড়ি বছর আবার অভ্যেস দাঁড়িয়ে গেছে, সকালে ঘুম থেকে উঠেই এসে কম্পিউটারের সামনে বসা, রাতে কোনও মেল এসে থাকলে সেটা পড়া, আর সব কাজই তো আজকাল করি মোটামুটি এই কম্পিউটারকেন্দ্রিক, সেই সবে ক্রমে ঢুকে যাওয়া। তেমনি বসেছিলাম, মেশিন তো চালানোই থাকে, মাউস ঘুরিয়ে জাগালাম, দুটো ব্যক্তিগত মেল এসেছিল, তার উত্তর দিলাম। নিজের এই জবুথবুপনাকে একটা আলগা বিরক্তি সহ অনুভব করছিলাম, তখনই কুকুরটা ডাকতে শুরু করল।

বাংলায় কোনও শব্দ আছে বলে তো জানি না, ইংরিজিতে বোধহয় এটাকেই হাউল বলে। নেকড়েরাও নাকি করে। শুনিনি কখনও, পড়েছি, নেকড়ে আর কোথায় দেখব? কোথাওই তো তেমন যাইনি আমি কখনও। আজকে হঠাৎ মাথায় এল, ছোটবেলায় সে উপায় ছিল না, তখন তো কম্পিউটারের কেউ নামই শোনেনি, ছোটদের পত্রিকায় কল্পবিজ্ঞান জাতীয় বিষয়ে ছাপা হত কখনও কখনও, আমরা বাচ্চারা পড়তাম। আজ নেটে খুঁজলাম একটু। তেমন কিছু একটা পেলামও না। শুধু এটাই কেউ কেউ বলছে যে নেকড়ে থেকে কুকুরেরা আসায় তাদের প্রাগৈতিহাসিক অভ্যেশ থেকে করে। কেন করে?

আর একটা জিনিসও মাথায় এল। বাংলায় কোনও শব্দ বোধহয় নেই। নেই কেন? কম্পিউটারেই রাখা অভিধান থেকে দেখলাম, ইংরিজি হাউল শব্দটা এসেছে মধ্যযুগের ইংরিজি শব্দ হুলেন থেকে। তার মানে খুব প্রাচীন শব্দ নয়। তাহলে বাংলায় নেই কেন? রেখা টেখাকে জিগেশ করে দেখতে হবে, হিন্দিতে আছে কিনা। ওদের বিশেষ্য ভাঁড়ারটা তো বোধহয় বাংলার চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ। থাকতে পারে।

যতদূর জানি, সেই কৌষিতকী উপনিষদের শ্লোকের আলোচনা থেকে, একাধিক লেখায় ব্যবহারও করেছি, সালাবৃক বা হায়না বলে ওখানে উল্লেখ করা হয়েছিল কুকুরকেই। যারা ঘোড়া এবং লোহার সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল ভারতে, আর্যদের পোষা। ইন্দ্র যে কুকুরদের মুখে সিন্ধু সভ্যতার তিনশিংযুক্ত দেবতার অনুগামী যোগীদের মেরে মেরে রক্তাক্ত শরীরে বিতরণ করেছিলেন।

তাহলে? যথেষ্ট প্রাচীন যুগেই ভারতে কুকুর এসেছে। ওই কান্নার কোনও প্রতিশব্দ বাংলায় নেই কেন? বাঙালি কুত্তা কি কাঁদে না? তা তো ঠিক নয়। আমার গোটা জীবনটা তার সাক্ষী, আমি নিজেই শুনেছি। আজও কাঁদছিল। আবার বছর চল্লিশেক আগেও কাঁদত। আমার স্মৃতি আছে।

জীবনের বোধহয় এটাই ভাঁড়ার। এই সব না মেটা রহস্যরা। এখন তো খুব সমাপ্তির কথা মাথায় আসে। তাই ভাবছিলাম, এটা নিয়েই বোধহয় শেষ হতে হবে। তারপর কী হবে, তাও জানি না। আমার কোনও ধর্মবিশ্বাসও নেই। পোড়াবে না কবর দেবে, কী করবে, তাতে কিছু এসেও যায় না, ভাবিও না। কিন্তু সমাপ্তিটাকে মাঝেমাঝেই ভাবি। মাথার মধ্যে এই রহস্য বোধহয় ভরাই থাকবে।

কুকুরেরা যদি তাদের জিনগত প্রাগৈতিহাসিকতা থেকে কাঁদে, কাঁদে আজও, তাহলে আমরা কী করি? দাঁত খেঁচাই, মুখব্যাদান করি? নিজের মুখ ভেটকে ভেটকে একটু খেয়াল করার চেষ্টা করলাম, আমি কি অমন করে থাকি, যখন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কখনও কথা বলি, বা আমার কলেজের প্রিন্সিপালের সঙ্গে, কে জানে? বোধহয় না। কিন্তু জিনগত স্মৃতি তো আমারও আছে, নিশ্চয়ই, আমাদের পাড়ার ওই কুকুরটার মতই। কী সেগুলো?

1 Comment »

  1. চন্দনের দেওয়া অকাদেমি বাংলা অভিধান দেখে, শিরোনামের ‘চীৎকার’ বানানটা ‘চিৎকার’ করলাম। কিন্তু লেখাটায় দেখছি ভুল বানান রয়েই গেছে। আসলে এত বছরের অভ্যেশ, এটাও বোধহয় আমার সঙ্গে চিতায় বা কবরে যাবে। বা হয়তো জলে। মাঝে মাঝে খুব ভাবতে ভাল লাগে, আমার শবটা জলে ভেসে ভেস অন্তহীন অনির্দেশ্যতায় চলে যাচ্ছে।

    Comment by dd — December 6, 2014 @ 10:22 am

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress