নেটখাতা

October 29, 2009

মধ্যমগ্রামের শেষহীন পুজো এবং জলপাইগুড়ির টাটা চা-বাগান

মধ্যমগ্রামের পুজো শেষ হয়না। কালীপুজো যেতে-না-যেতেই, গত কয়েকদিন যাবত ফের আমরা মাইকরবে ঘুমিয়ে পড়ি, মাইকরবে জাগি, কারণ জগদ্ধাত্রী — সেটা চলছে, চলতেই থাকছে। নানা জায়গায়। প্রচুর। তার সঙ্গে বাজি তো আছেই। আমাদের বাড়ি থেকে নিকটতম জগদ্ধাত্রীটা হল মধ্যমগ্রাম বড়রাস্তা, মানে সোদপুর রোডের উপর, ঠিক কালীবাড়ির পাশে। গতকাল সকালে রু-এর সঙ্গে বেরিয়েছিলাম, পল্লীশ্রী বলে একটা মাঠ আছে, সেটায় গিয়ে এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়াতে ও খুব পছন্দ করে, খোলা জায়গা তো আর নেই, গোটা মধ্যমগ্রামটাই একটা বিস্তৃত বস্তি এলাকা হয়ে গিয়েছে — মাঠে গিয়ে বসতেও পারলাম না, জগদ্ধাত্রীর বাচ্চাকাচ্চাদের মাইকের গুঁতোয়, সেখান থেকে বেরিয়ে বিটি-কলেজের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম, পরপর পুজো, দোকানে গিয়ে জিনিসের নাম বলা যাচ্ছে না এত জোরে মাইক। তারপর বিটি-কলেজ থেকে নিউব্যারাকপুরে ঢুকে হাঁটতে হাঁটতে ফিরলাম, নিউব্যারাকপুরে এই নিপীড়নটা বোধহয় কিঞ্চিত কম — কে জানে।

বিস্ময়কর লাগে। মাঝেমাঝে মনে হয়, আমাদের এই এলাকাটা কি ব্রহ্মাণ্ড থেকে বাইরে? মানুষের কোনও দুশ্চিন্তা নেই, কাজ নেই, ব্যস্ততা নেই? শুধু পুজো আছে? গান আর মাইক আর প্যান্ডেল?

সদ্য একটা মেল এসেছে, আমার এক পুরোনো ছাত্রীর কাছ থেকে, শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস, সবাই ডাকে বুড়িয়া বলে। ওরা জলপাইগুড়িতে চা-বাগান নিয়ে এনজিও করেছে। ওখানের চা-বাগানের শ্রমিকদের নিয়ে খুব খাটছে। কম্পিউটার নিয়ে ওদের যা যা দরকার সেগুলো করে দেওয়ার চেষ্টা করি, সেইজন্যে এক ধরণের একটা সক্রিয় যোগাযোগও আছে। ওর চিঠিটা পড়ে মনে হচ্ছিল, সত্যিই তো, কতটা দূরে জলপাইগুড়ি, একই তো পশ্চিমবঙ্গ, তাও কোনওমতেই তো আমাদের মাইক বাজিয়ে গান শোনা বন্ধ হয় না?

বুড়িয়ার চিঠির বিষয়-লাইন ছিল, ‘টাটা গার্ডেন রিপোর্ট’, ওর চিঠি থেকেই উদ্ধৃতি দিই:

“… তোমাকে এই রিপোর্ট টা দিচ্ছি, কারন তুমি তোমার ব্লগে এটাকে নিয়ে লিখতে পারবে। টাটা কি ভয়ানক ভালো তার প্রমাণ থাকবে এতে। সিঙ্গুর নিয়ে যারা টাটা কে প্রায় সমাজসেবী বানিয়ে ফেলেছিল, তাদের জন্য এটা ভালো একটা উদাহরণ হতে পারে। …”

এর সঙ্গে রিপোর্টা সংযুক্ত করা, সেটা ইংরিজিতে। আইইউএফ বা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ ফুড ওয়ার্কার্স-এর জন্য তৈরি করা, তার একটা আলগা অনুবাদ এইরকম:

সংযুক্ত সংস্থা (অ্যামালগামেটেড কোম্পানি) — ‘টাটা টি’ সংস্থার একটি বাগানের রিপোর্ট

ন্যাওড়ানদী চা বাগান, একটি সংযুক্ত সংস্থা — টাটা টি-র একটি বাগান, তাকে ভগবানের নামে ছেড়ে দিয়েছে তার কর্তৃপক্ষ। অনেককাল হল, কোনওমতেই ওখানের কোনও শ্রমিক অসুস্থ হয় না, অসুস্থ হওয়ার সুযোগই পায় না — ওখানকার ডাক্তার কাউকে অসুস্থতার সার্টিফিকেট দিতে নারাজ, তাই তারা অসুস্থতার ছুটিও পায় না। তাদের শরীরের অবস্থা যাই হোক, কাজ করতে বাধ্য করা হয় তাদের। আট মাসের গর্ভবতী আরতি ওরাওঁ হাসপাতালে গিয়ে অসুস্থতা এবং মাতৃত্বের ছুটির আবেদন জানালেও সেই একই প্রতিক্রিয়া হয়েছিল ডাক্তারের। ডাক্তার তাকে ছুটি প্রত্যাখ্যান করে এবং কাজ চালিয়ে যেতে বাধ্য করে। চূড়ান্ত গর্ভের বেদনা ওঠার পর, কাজের জায়গাতেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে আরতি, এবং বাগান থেকে অ্যাম্বুলান্স দিতে নারাজ হওয়ায় সেই প্রসূতিকে ট্রাক্টরে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ব্লক হাসপাতালে। এর পরে শ্রমিকরা গিয়ে ডাক্তারের কাছে ন্যায়ের দাবি জানালে ডাক্তার কোনও উত্তর না দিয়েই পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম করে, এবং ক্রুদ্ধ শ্রমিকরা তাকে মারধোর করে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাগানের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষ চা বাগান ছেড়ে চলে যায়। কয়েকদিন বাদে ফের খোলে বাগান, আদিবাসী-বিকাশ-পরিষদের হস্তক্ষেপের পর, কিন্তু খোলার সঙ্গে সঙ্গেই বাগান কর্তৃপক্ষ সেই আটজন শ্রমিককে ছাঁটাই করে দিতে চায় যারা ওই ঘটনায় গলা তুলেছিল। সমস্ত শ্রমিকরা মিলে এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে। এতে কর্তৃপক্ষ ফের বাগান ছেড়ে চলে যায়। এবং, শ্রমিকদের কথা অনুযায়ী, শ্রমিকদের মূল যে দুটি সংগঠন, সিআইটিইউ এবং আইএনটিইউসি, তারা গোটা সময়টাই নেপথ্যে রয়ে যায় এবং গোপনে কর্তৃপক্ষকেই সাহায্য করে। এবং কর্তৃপক্ষ যখন ওই আট শ্রমিককে ছাঁটাই করাটা বাগান খোলার একটা শর্ত করে তোলে সেই শর্ত এরা মেনেও নেয়। শ্রমিকরা এই শর্ত মেনে নেয়নি — তাদের যুক্তি এই যে, শুধু ওই আট জনের নয়, আপত্তিটা তাদের সকলের, প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিল তারা সবাই মিলে। বাগান তাই আজও বন্ধ, এই শ্রমিকেরা তাদের বোনাস পায়নি, এক সপ্তাহের মজুরিও বকেয়া আছে। আমরা এখানে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি, সাক্ষাতকারও নিয়েছি। …

No Comments »

No comments yet.

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress