নেটখাতা

November 24, 2009

একটি প্রায়স্প্যাম পিডিএফ এবং অগ্রদানী বামুনেরা

আজ দুপুরে সাতবার পেলাম একই ফাইল, প্রায় পরপর, একটি পিডিএফ। প্রথমে মনে হল কেউ স্প্যাম করছে? তারপর, পিডিএফ-টা খুলে দেখলাম, নিচে যার নাম, ‘তপন দাস’, এবং পিডিএফ-টিতে যা লেখা আছে তারও নিচে সেই একই নাম, ‘তপন দাস’, এবং লেখাটার যা চরিত্র তাতে স্প্যাম বলে মনেও হল না। যতদূর মনে হয়, কেউ একটা আবেগের আতিশয্যে, বা কম্পিউটারে অত্যধিক দক্ষতাবশত এটা করে থাকবেন।

লেখাটার শিরোনাম, ‘এই জন্যই কি আমরা সিঙ্গুর নন্দীগ্রামে একসাথে পথ হেঁটেছিলাম?’ লেখাটা থেকে এখানে প্রতিলিপি করে সেঁটে দেওয়া যেত, অন্তত কিছুটা অংশ, কিন্তু কোনও এক অদ্ভুত প্রাক-ইউনিকোড রকমে লেখা সেটা, পিডিএফ থেকে এইচটিএমএলে পরিবর্তিত করে নিলে সেটা জঞ্জাল হয়ে যাচ্ছে, ইউনিকোডে যা আমরা প্রায়ই করে থাকি। মানে নিজস্ব ফন্টে নিজস্ব নিয়মে লেখা টেক্সটা। আমি পরে দেখছি, মন্তব্যে পিডিএফটা জুড়ে দেওয়া যায় কিনা। কলকাতা ৩২ থেকে তপন দাসের পাঠানো পিডিএফটার মধ্যে একটা আবেগ আছে যে আবেগটা আমাকেও ছুঁচ্ছে। আসছি সেই কথায়। এর আগেও আমার ব্লগে আগেই লিখেছিলাম মাউন্ট ব্যাটন সাহেব-অ, সাধের ব্যাটন কার হাতে থুইয়া গেলা-অ, ২২শে জুলাই, ২০০৯, সেই প্রসঙ্গটাই আর এক বার প্রখরতর হয়ে ফিরে এল এই অগ্রদানী বামুনদের আলোচনায়।

খুব কম লোকের সঙ্গেই আমার রাজনীতি নিয়ে সরাসরি কথা হয়, নিজে নিজে একা একা বাঁচি প্রায়। তাই আমার কোনও রাজনৈতিক মতামতের কতটুকু মূল্য আছে জানি না, কিন্তু আমার যা মনে হয়েছে আমার চেনা একজন মানুষও খুব আশা করে, মানে সেই অর্থে ‘সদর্থক’ রকমে তৃণমূলকে ভোট দেননি। বা এগারোতেও দেওয়ার কথা তেমন ভাবছেন না। এখানে একটা শব্দই অর্থপূর্ণ, তা হল সিপিএম। সিপিএম-এর প্রতি ঘেন্না, যে কোনও মূল্যে সিপিএম তাড়াও — এই জায়গা থেকেই তাঁরা ভোট দিয়েছেন বলে আমার মনে হয়েছে। বা এগারোতেও দেবেন বলে ভাবছেন। লোকজনের মন সরাসরি প্রশ্ন করে জানা যায় না, বরং একদম অন্যরকম কোনও মন্তব্যে তার প্রতিক্রিয়া কী হচ্ছে এখান থেকে তাদের মন বোঝা যায়।

এই উপনির্বাচনের ফল ঘোষণার দিন আমাদের টিচার্স রুমে আমি একটা মন্তব্য করেছিলাম একদমই ওই লোকের মন পরখ করার উদ্দেশ্যে। একজন যেই জানাল, সিপিএম দশে গোল্লা, এক আধজন পুরো সংবাদটা শুনতে চাইল, একজন আমার দিকে চেয়ে আমার কোনও মতামত চাইল। আমি বললাম, ধুর, এই বাই ইলেকশন নিয়ে আমার কোনও আগ্রহ নেই, এগারোর বাইবাই ইলেকশনে কী হয় সেটাই আগ্রহ। এবং আমি নিশ্চিত, এটা শোনামাত্র টিচার্স রুমের প্রত্যেকের মুখই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

এবং ওই বাক্যে বলুন, বা, বাক্যের পরবর্তী আলোচনায় বা উত্তেজনায়, আসলে কোথাও তৃণমূল নেই। সিপিএম আছে। ভয়ানক বিকট এবং কুৎসিত রকমে। আগেকার দিনে যেমন বলা হত, সিপিএমের পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়ে গেছে — এই বাক্যটা দিয়েই কেবলমাত্র মানুষের সিপিএম-ঘেন্নার সেই অনিবার্যতাটা প্রকাশ করা যায়।

এবং ষোলই মে লোকসভা নির্বাচনের ওই ফলাফল কোথাও একটা গতি সৃষ্টি করেছিল, সমাজজীবনের। সেটা এমনকি আমার মত সমাজবিমুখ মানুষও বুঝতে পারছিল। একটা বড় জায়গায় বক্তৃতা করার নেমন্তন্ন, যারা করল তারা জানাল, দেখো ষোলই মের আগে হলে তো তোমায় করতে পারতাম না, প্লিজ এসো। বহুদিনের বকেয়া কিছু প্রোমোশন হয়ে গেল, যাদের চেষ্টায় হল তাদের একজন বলল, এই ষোলই মের আগে হলে কি হত নাকি এরকম? এই ধরনের।

এবং সেখানেও কোথাও তৃণমূল নেই। আছে সিপিএম। সিপিএম-এর বিরুদ্ধে জনসমক্ষে মুখ খুলতে পারছি — এই আরাম দেখতে পাচ্ছিলাম আমি লোকের মুখেচোখে। সবাই-ই তো বীর হতে চায়, শুধু ভয়ে হতে পারে না।

এবং ষোলই মের পরে তো সত্যিই সিপিএমের কুষ্ঠ থেকে পাবলিক রকমেই মাংস খসে খসে পড়তে শুরু করল। বহু জায়গায় জোনাল কমিটি অব্দি জুড়ে দিতে হচ্ছে, কারণ লোক নেই। পার্টির মধ্যে শুদ্ধীকরণ প্রক্রিয়া চালু করা হবে — স্থগিত হয়ে গেল, কারণ, সেই প্রক্রিয়া চালু করা হবে যাদের হাত দিয়ে এমন সর্বসম্মত রকমে শুদ্ধ গুটিকয়েক লোকও যোগাড় হচ্ছে না। জমি মাফিয়ার টাকা কে নিয়েছে আর কে নেয়নি তাই নিয়ে যুদ্ধ। নানা খবরই কানে আসছিল। এর মধ্যে আবার যোগ হল বুদ্ধকে বলি করা। হুগলীর এক নেতা সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণা করলেন, তিনি কারুর চুলের মুঠি ধরে কালীঘাট নিয়ে যেতে পারতেন চাইলেই। এই আপাতদৃষ্টিতে গালাগালের বক্তব্যটাকে দ্বিতীয়বার পড়লেই টের পাওয়া যায় তিনি ঝিকে মেরে বৌকে শিক্ষা দিতে চাইছেন, চুলের মুঠিটা তিনি যার টানতে চান তিনি আর যাই হোক কালীঘাটে থাকেন না।

এই রকম সব হচ্ছিল। আর কেমন একটা ঘাবড়ে যাচ্ছিলাম ভিতরে ভিতরে। ‘৮৯-এ পার্টি যখন ছাড়লাম তখনই সেটা অবাসযোগ্য রকমের দূষিত হয়ে গেছে, ব্যবসায়ীদের দালালদের কাছ থেকে টাকা খাওয়ার ঘটনায় কেউ আর রাগ তো দূরের কথা অবাকও হয় না, ততদিনেই। কিন্তু এরকমটা ঠিক ভাবিনি। এ কেমন ওয়াকওভার। এবং ভেবে দেখুন, তৃণমূল তো কোথাও নেই-ই, তার মানে এটা সিপিএম-ঘেন্নার শূন্যতার কাছে সিপিএমের ওয়াকওভার। এবং এই শূন্যতাই তো তাই যা সিপিএমকে এরকম করেছে। সেটা তো তবু এসেছিল একটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে। শুধু মাত্র ঘেন্নার শূন্যতা থেকে তৃণমূল এত বড় একটা ওয়াকওভার পেয়ে যাচ্ছে — কেমন একটা বুদ্ধু লাগছিল নিজেকেই, এরকমটা যে হবে তা তো কোনওদিন ভাবিনি।

সেই শূন্যতার রানী হওয়া থেকে তৃণমূলকে হয়তো বাঁচিয়ে দিল এই অগ্রদানী বামুনেরা। বাংলা সাহিত্যে দুটো জায়গায় খুব বড় আকারে রাজানুগৃহীত ব্রাহ্মণের প্রতি বিতৃষ্ণা উচ্চারিত হওয়ার কথা এই মুহূর্তেই মনে পড়ছে। একটা শ্রীকান্ত উপন্যাসে, রাজলক্ষ্মীর সেই জমিদারি কেনার রাঙামাটি গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের প্রতি সশ্রদ্ধতা। আর একটা তো অবশ্যেই তারাশঙ্করের গণদেবতা-পঞ্চগ্রামে। বিশ্বেশ্বরের পিতামহের প্রতি সশ্রদ্ধতা। বিশ্বেশ্বর-ই তো ছিল সেই কমুনিস্ট যুবকের নাম, না কি বিশ্বনাথ? ভাল মনে করতে পারছি না।

এই সশ্রদ্ধতা আমার মধ্যেও আছে। রাজানুগৃহীত ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণ-ই নয় বলে আমি নিজেই মনে করি। আর অগ্রদানী বামুন আরও এক কাঠি বাড়া, সে পিণ্ড ভোগ করে। এই পিণ্ডটা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় নন্দীগ্রাম আর সিঙ্গুরে সিপিএম-নিহত মানুষের পিণ্ড।

যে চারজনের পরামর্শের বিনিময়ে মাসে পঞ্চাশ হাজার বেতন এবং আরও নানা উপরি বখশিশ পাওয়ার কথা শুনলাম, তা যদি সত্যিও হয়, এ নিয়ে সিপিএমের কিছু বলার নেই। সিপিএম রাজনীতির সমান স্তরের ভয়ানকতার কাছাকাছিও নয় এইসব উঞ্ছবৃত্তি। কিন্তু আমরা যারা সিপিএম-ও নই, তৃণমূলই নই, ওই তপন দাসের মত আমাদের অনেকেরই এটা বেশ খারাপ লেগেছে, সমস্ত অর্থেই। এবং সেখানে টাকার অঙ্কটা গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই, আমাদের মত গরিব দেশে। প্রায় দুই দশক চাকরি করার পরও আমার মাইনে, আমি তো ভাল চাকরি করি, ওর থেকে অনেক কম। এবং সেটা পাওয়া যাচ্ছে পরামর্শ দিয়ে। অন্য কারুর কী মনে হচ্ছে জানি না, ব্যক্তিগত ভাবে আমার এটাকে একরকম হাড় বলেই মনে হচ্ছে, রাজনীতির টেবিল থেকে পায়ায় বাঁধা ব্রাহ্মণের দিকে হাড় ফেলা হচ্ছে।

যে চারজনকে নিয়ে এই প্রশ্ন উঠছে, তার মধ্যে অর্পিতা পালের নাম আমি কখনও শুনিনি, এখন শুনেছি, কিন্তু এই মুহূর্তেও মনে করতে পারছি না, কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে আমার এটা সত্যিই খুব অভাবিত এবং বেদনার লেগেছে শাঁওলি মিত্রের বেলাতেই। তার কারণের অনেকটাই নিতান্ত ব্যক্তিগত। আমি চিরদিনেরই পাষণ্ড। খুব ছোটবেলার পর থেকেই আমার কোনও ঠাকুর দেবতা নেই। কিন্তু সেখানে খুব স্থায়ী এবং অনড় দুটো চেয়ারে আসীন দুইজন মানুষ শাঁওলি মিত্রের মা আর বাবা। জানি এর মত বোকামো কিছু হয় না, বাবা-মা দিয়ে সন্তানকে বোঝার চেষ্টা করা, কিন্তু এটা ঠিক যুক্তি দিয়ে হচ্ছে না। আমার কষ্ট হচ্ছে। কষ্ট তো যুক্তি মেনে হয় না। জানি না, ওই দুজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন তো জানি না, হয়তো জানলে সেখানেও নানা ভাঙচুর থাকত, জানি না। এই জন্যেই খুব বেশি জানতে নেই। এর পর থেকেই শম্ভু মিত্রের অয়দিপাউসের কথা মনে পড়লেই, আমাদের স্মৃতি তো ওরকমই হয়, নানা নানা সংযোগের সূত্র ধরে চলে, আমার মনে পড়ে যাবে রেলের কথা, তৃণমূলের কথা — কী বিশ্রী।

তবে মোটের উপর এটা বোধহয় ভালই হল। শূন্যতার ফাঁকা মাঠে ওয়াকওভারের জয় কোনও গনতন্ত্রের পক্ষেই ভাল নয়।

1 Comment »

  1. কিছুতেই ফাইল তোলা যাচ্ছে না, পেরেন্ট ডিরেক্টরিতে মালিকানার কোনও সমস্যা হচ্ছে। পরে দেখতে হবে। কেউ পড়তে চাইলে dipankard AT gmail DOT com (অবশ্যই ছোট হাতে এবং মধ্যের স্পেসগুলো বাদ দিয়ে) মেল করুন।

    Comment by dd — November 24, 2009 @ 6:41 pm

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress