নেটখাতা

December 13, 2009

মধ্যমগ্রামের শব্দচিত্র এবং বারাসাত কলোনি মোড়ের ক্যারাটে

যখন এই ব্লগটা লিখছি, কোথাও একটা প্রচুর বাজি ফাটছে। আমার কানে কোনও ডেসিবেল-মাপক নেই, কিন্তু শুনে মনে হচ্ছে বেশ জোরালো সোচ্চারতা। আগে বাজি ফাটত শুধু কালীপুজোয়, আমাদের ছোটবেলায়, তার অনেক পর অব্দিও। আমাদের সেই সময়ে টাকাপয়সার খুব টানাটানি, মা আমার এক মাসির কাছ থেকে পাঁচটাকা ধার করে এনেছিল, সেই টাকা থেকে আমার বাজি কেনা হয়েছিল, আমি তখন ইশকুলে পড়ি — মনে আছে। কিন্তু এখন কোনও কালীপুজোর দরকার পড়ে না। প্রতিদিন প্রত্যহই ফাটে।

কেন? অবশ্যই শব্দবাজি শিল্পে বেকার শ্রমিকদের হয়ে ট্রেড-ইউনিয়ন আন্দোলন চলছে, এ তো সবাই জানে। এরকম ভাবার কোনও কারণ নেই, শব্দবাজি শিল্পের শ্রমিকদের দক্ষতার মান কতটা যে অন্য শিল্পে তারা স্থানান্তরিত হতে পারে না কেন, যেমন আতশবাজি বা সম্পূর্ণ অন্য কিছু? ওরকম হলে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের এসেনসে বা সারে আঘাত পড়ে, যার অন্য নাম তোলা এবং হিসসা। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ট্রেডের জন্যে চলছে না, শ্রমিকের জন্যে চলছে না, চলছে ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের স্বার্থে।

যাইহোক, যা নিয়ে মূল লেখা, মধ্যমগ্রামের শব্দচিত্র। কিছুদিন আগে আমাদের এক প্রতিবেশী অতিষ্ঠ হতে হতে শেষে, কিছু হবে কিনা এটা না-জেনেই, একটা অনলাইন পিটিশন করেছিলেন, এই ব্লগেই আগে আছে, পুরোনো লেখা

এবং মজার কথা, যা আমরা আশাই করিনি, সত্যিই কিছু ফল হয়েছিল। তা নিয়েও এই ব্লগে আগে আলোচনা আছে। অনেক যুগ, মানে প্রায় দু-মাস পরে, আবার গতকাল ফাংশনের অত্যাচার ফেরত এল। রাত বারোটা বাজতে দশে থানায় ফোন করলেন আমার এক প্রতিবেশী। তাকে সরল পুলুসভাই অমায়িকভাবে জিগেশ করলেন, আচ্ছা, বুঝব কী করে বলুন তো কোথায় হচ্ছে, আমরা জানব কী করে? তার আগে নাম কী ইত্যাদি প্রশ্ন তো ছিলই। যাই হোক, তবু, শেষ অব্দি, মাত্র মধ্যরাতের মানে বারোটার একটু পরেই আওয়াজ বন্ধ হয়।

আজকে গেছিলাম আমার ডাক্তারবাবুর কাছে, বারাসাত হেলা-বটতলা মোড়ে, কদিন ধরে পেটের একটা ব্যথা চলছে। আর সেটা এমনই যুগবিরোধী আন্দোলনবিরোধী পেটব্যথা যে, জোরে আওয়াজ হলেই সেটা বেড়ে যায়। ওখানের বাসটা যায় বারাসাত কলোনি মোড় পেরিয়ে। কলোনি মোড়ে পৌঁছনোর বেশ একটু আগে থেকেই, মানে, এক বাসস্টপেরও বেশি, ফায়ার ব্রিগেড থেকেই, পেটে পুরো মোচড় দিতে শুরু করল, আওয়াজের এমন দাপট। মাইকে মাইকে ছয়লাপ, নাম ইত্যাদি ঘোষণার সে কী নাদ।

কলোনি মোড়ের মাঠে হচ্ছে ক্যারাটের কোনও প্রদর্শনী। কে এক ডব্লুবিকেএ, ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্যারাটে অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে। তাতে জ্যামও হচ্ছে, তাই বাসে বসেই এদের অনেকের নাম ইত্যাদি জেনে গেলাম। এরপর ডাক্তারখানায় পৌঁছে দেখি, সেটাও এক বাসস্টপ দূরে, কলোনি মোড় থেকে, হেলা-বটতলায়। সেখানেও কারুরই কোনও কথাই শোনা যাচ্ছে না, ক্যারাটে মাইকের দাপটে। আমি প্রায় দেড় ঘন্টা ওখানে রইলাম, আটটা নাগাদ বেরোলাম, তখনও চলছে। ভ্যানে চড়ে আসতে আসতে প্রায় লেভেল ক্রসিং অব্দি শুনতে পাচ্ছিলাম ক্যারাটে।

বারবার মনে হচ্ছিল, এরা কারা? রাজ্যের নাম দিয়ে নাম, তার মানে একটা রাজ্যজোড়া সংগঠন। অনুশাসন ও প্রশাসনহীনতা কত দূর পৌঁছলে এই জংলি অসভ্যতা হয়ে চলতে পারে একটা রাজ্য সংগঠনের নাম নিয়ে? এবং বাস থেকেই দেখলাম একটা প্রকাণ্ড স্টেজে সারি সারি চেয়ার, সব ফাঁকা, একটি পিংপিঙে লোক বসে ঝিমোচ্ছেন, আর একজন কেউ স্টেজের সামনে দাঁড়িয়ে মাইকে চেঁচাচ্ছে। ক্যারাটে করছে, বেশ করছে, খুবই ভাল কথা, কিন্তু তার জন্য এত মাইক কেন? এক বাসস্টপেরও বেশি ব্যাসার্ধের বৃত্তের মধ্যে সমস্ত মানুষকে বিরক্ত ব্যতিব্যস্ত না-করে কি কিছুতেই ক্যারাটে করা যায় না? আর প্রশাসন, সে নিশ্চয়ই মধ্যমগ্রাম থানার পুলিশের মত, আচ্ছা জানব কী করে বলুন তো কোথায় হচ্ছে? এবং যে জানাতে যাচ্ছে তাকেই ধমকাবে, নাম কী, নিবাস কোথায়, ইত্যাদি।

বাসের মধ্যের মানুষকে দেখছিলাম, তাদের খারাপ লাগছে, কষ্ট হচ্ছে, ডাক্তারখানাতেও তাই। কেউই অবশ্য জানেন না, কী করার আছে, সাহসটাও নেই। আমি মাঝে মাঝে করি, কোনও ফল হয় না, তাও করি। ট্রেনে ফেরার সময়, ক্লান্ত থাকি, আর সেলফোনের পর সেলফোন শকুনের কান্নার ওই কোরাসে অসহ্য হয়ে করি, প্রায় কোনওদিনই কোনও ফল হয় না। তাও করি। এই ব্লগেও লিখে চলি। কেন কে জানে?

No Comments »

No comments yet.

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress