নেটখাতা

January 2, 2010

সাহেবদের পিণ্ডদান আর কেন?

সেই পঁচিশে ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে এখনও চলছে সাহেবদের পিণ্ডদান। কবে সাহেবরা এসেছিল, চলে গেছে, তাদের কিছু বাল-বাচ্চা আর বেজম্মা পয়দা করে, এখনও চলছে তাদের পিণ্ডদান। কত হাজার টাকার বাজি যে পুড়ল, কত মদের বোতল ইত্যাদিতে কত টাকা যে গেল, তার ইয়ত্তা নেই।

আর আজ সকালেই এলেন বিমলবাবু বলে এক জন। তিনি আমার কাছে মাঝেসাঝে আসেন প্রায় সতের আঠার বছর হল। প্রথমবার তাদের কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর, শ্রমিকদের জন্য সাহায্য চাইতে এসেছিলেন। তারপর কতগুলো বছর গড়িয়ে গেল। তিন তিনবার সোদপুরের কাছেই তাদের বস্ত্র-কারখানা বন্ধ হল, এবং খোলার নাটক, আবার বন্ধ।

ওনার প্রতি আমার একটা অপরাধবোধও আছে। বছর দশেক আগে ওনার মেয়ের বিয়ের জন্য কিছু দিতে পারি কিনা জানতে এসেছিলেন, মেয়ের বিয়েতে যেতে বলেছিলেন। আমি ঠিকও করেছিলাম যাব, সোদপুর যাওয়ার পথে গির্জাতে নেমে তার পাশে ওনার বাড়ির রাস্তার নির্দেশ লিখে নিয়েছিলাম, পুরোনো খাতার পিছনে সেই নির্দেশ আজও আছে। আমি ঠিক করেছিলাম, একটা বেশ লাল শাড়ি কিনে, যদি কিছু টাকাও দিতে পারি তাই নিয়ে যাব।

তারপর সেই বছরেই, এই শীতেই, ডিসেম্বরে হল আমার সেই পেটব্যথা। অসহ্য একটা ব্যথা, দম অব্দি বন্ধ হয়ে আসে, আমি ভ্রূণর ভঙ্গীতে কুঁকড়ে শুয়ে থাকি, কিছু করার থাকে না আর। অনেক ডাক্তার দেখানো হয়েছে। সবারই এক মত, ওটা মন থেকে আসে। অনেক ভেবেছি। দুটো কারণ থাকতে পারে, এই ডিসেম্বরে শীতের কারণে পেটে একটা খারাপ অবস্থা সৃষ্টি হয়, তার সঙ্গে বোধহয় যুক্ত হয় আমার দুটো মূল স্মৃতি। এক, আমার ছোটবেলায় প্রতিটি বড়দিন ছিল খুব বেদনার।

পঁচিশে ডিসেম্বর বড়দিন, আর তার দুদিন বা এক দিন আগে রেজাল্ট বেরোত। আমার রেজাল্ট বেরোনো মানেই একটা ভয়ঙ্করতা, মা পুরো তাণ্ডব করত, কেন আমি যত ভাল ছেলে তত ভাল রেজাল্ট করিনি — কান্নাকাটি, চেঁচামেচি, অনেক প্রতিশ্রুতি — সেই প্রতিশ্রুতি দেওয়াকালীনই, যে সামনের বছর ভাল করে পড়ব, আমার অপরাধবোধ, কারণ সেই মুহূর্তেই আমি জানি, যে সামনের বছরও একই ভাবে বিড়াল দেখলে আমি লাফাব, একই ভাবে রাস্তার দিকে লোকের দিকে আমি চেয়ে থাকব, একই ভাবে পড়ার খাতায় বন্দুকের ছবি আঁকব — মানে, এক কথায়, একই ভাবে আমি ফাঁকি মারব। ক্রমে, ছোটবেলা আর কৈশোর জুড়ে আমি বড়দিন, ওই হলদে কমলা সিনকাগজ মোড়া কেক, এগুলোকেই কেমন একটা বিতৃষ্ণা নিয়ে দেখতে শুরু করেছিলাম।

এরপরের একটা বড় ডিসেম্বর-স্মৃতি হল মহম্মদের জন্ম। মহম্মদ যখন পেটে এল, ঠিক সেই সময়টায় ওর জন্মটা আমি চেয়েছিলাম না। তখনও তো আমি ওই ম্যাজিকটা আমি টের পাইনি। মহম্মদ আমার প্রথম বাচ্চা। তারপর যখন পেটের মধ্যে নড়তে শুরু করল, সেই অদ্ভুত আবছায়া সোনোগ্রাফি ছবিতেই আমি ফুলোফুলো গাল আর গাবদা কান আবিষ্কার করতে শুরু করলাম, তার আবার কোনও মানেই নেই, কারণ ওসব বোঝা যায় না, তখন তো গল্পটা একদম অন্য। মহম্মদ জন্মেছিল সাতই জানুয়ারি, তাই ৯১-এর ডিসেম্বরে চলছিল তারই তোড়জোড়। সেই আনন্দিত উত্তেজনাটা ঘটছিল, আর মাঝেমাঝে মনেও পড়ছিল, এই জন্মটাই গোড়ার দিকে আমি চাইনি।

যখন থেকে মহম্মদ আমার থেকে আলাদা থাকতে শুরু করল, সেই আলাদা থাকাটাও এল একটা শীতে, ওই ডিসেম্বরের একটু একটু অপরাধবোধ মেশা উত্তেজনাটা আমার বারবার মনে পড়ত। আর হয়ত এইসব মিলিয়েই ওই পেটের ব্যথাটা আসে, যেবার যেবার আসে, এই ডিসেম্বরেই। বিমলবাবুর মেয়ের বিয়ের সময়েও তাই হল, পেটের ব্যথাটা এমন লাট করে দিল আমায় যে আমার মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল। অনেকদিন বাদে ফের উনি আসা অব্দি মনেই পড়েনি।

আজ সকালে এসেছিলেন ওই ষাট বছরের বৃদ্ধ, দারিদ্র আর সময়ের অত্যাচারে আশি বছরেরও বেশি লাগে দেখতে। বৌ মারা গেছেন, মেয়েটা অবশ্য জামাইয়ের কাছে শান্তিতেই আছে। একটা দোকান করেছেন, সেটা কিনে রেখেছিলেন দুই দশক আগে, যখন চাকরি করতেন, খুব সস্তায় চেনা একজনের কাছে পেয়েছিলেন। এক শালা মারা গেছেন, তার বৌ লোকের বাড়ি কাজ করে, তার ছেলেটাকে এনে নিজের কাছে রেখেছেন। সেও খেতে পায়, ওনারও দোকানের কাজে সাহায্য করে।

ট্রেড ইউনিয়ন নিয়েও কত কিছু বললেন, কী ভাবে নেতারা সব টাকা মেরে দিল। ওরা শ্রমিকরা কিছু করতেও পারলেন না। সংগঠিত ট্রেড ইউনিয়ন পৃথিবীর দেশে দেশে মাফিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের ক্ষমতার কাছে ওরা শ্রমিকরা আর কী-ই বা পারেন। কিছু টাকাই পেলেন না ওরা। এখন একটা টিমটিমে দোকানে বিস্কুট আর লজেন্স বিক্রি করে দুটো মানুষের গ্রাসাচ্ছাদন করেন।আমার কাছে এসেছিলেন যদি কিছু সাহায্য করতে পারি: তার “ক্যাপিটাল তো নেই, কী হবে?” আমি আর কী-ই বা সাহায্য পারি?

এগুলো শুনতে শুনতেই মাথায় আসছিল, গত দুদিনের এই ফুটানি, আর সাহেবচাটা বর্ষশেষে মাঝরাত্তিরে বাজি ফাটিয়ে ‘হ্যাপপি নিউইয়ার’ করা। সকালে প্রদীপ্তকে ফোন করেছিলাম, ও তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি বেলা আটটাতেও। আমায় বলল, গতকাল রাত সাড়ে তিনটে অব্দি মদ খেয়েছিলাম। সেটা শুনেও মন খারাপ হল। কত টাকা নষ্ট, শরীর নষ্ট, সময় নষ্ট। কী বলব বুঝতে পারলাম না, পরে মনে হল, আজ বিকালে ও কলেজে আসবে আমার সঙ্গে দেখা করতে, তখন বলব, এখন থেকে মদ খাওয়ার কথা মনে এলেই সেই টাকাটা রেখে দিতে, ওর বাগবাজারের পার্কটার পাশেপাশেই কত বাচ্চাকাচ্চা এই শীতে বিনা খাবারে বিনা জামাকাপড়ে রাত কাটায়, পরে ওই টাকাটা থেকে তাদের কিছু কিনে দিতে পারবে। একটা মানুষের হলেও, এক মিলিমিটার হলেও, সেই কষ্টটুকু তো কমবে।

আমাদের এই মধ্যমগ্রাম এলাকা তো ছিল কলোনি এলাকা। সেখানে আমাদের কৈশোর প্রথম যৌবন অব্দিও তো দেখেছি সম্প্রদায়ের একটা বোধ কাজ করত। সেই লোকগুলো তো সব মরে যায়নি, তাহলে সেই বোধটা অন্তর্হিত হয়ে গেল কেন, কী করে, কবে? চলে যাওয়া সাহেবদের পিণ্ডদান না করে এই টাকাটা এই বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার শ্রমিকদের, দুঃস্থদের জন্য কিছু করা যায় না? আমাদের কলেজের সামনে শোভাবাজার মেট্রো ইস্টিশনের চারদিকে ফুটপথে বাস করে কত মানুষ। সেই রকম এক বৃদ্ধাকে দেখি রোজই, কত বাচ্চা। কাল আমার বাচ্চা যখন ঢাকুরিয়া ইস্টিশনে ললিপপ খাচ্ছিল, আর একটা বাচ্চা ওই শীতেই প্ল্যাটফর্মে হেঁটে বেড়াচ্ছিল, পাছা থেকে গোটাটা ল্যাংটো। সাহেবদের ওই পিণ্ডিটা এদের স্থানান্তরিত করা যায় না কোনও মতেই? আমরা এরকম অমানুষ হয়ে গেলাম কেন?

1 Comment »

  1. এই উত্তরবঙ্গে যেখানে কিছুদিন আগে বাঙলা ও বাঙলাভাষা বাচানোর দাবিতে বাঙালীর আবেগ ফেটে পড়ছিল, সফল বন্ধ পালন করলেন তাঁরা ওই দাবিতে, সেখানেও ২৫শে ডিসেম্বর যিশু দিবস পালনের সেকি ধুম। আর ৩১শে ডিসেম্বর তো মোচ্ছব।মদ-মাংসের অঢেল ছড়াছড়ি। পরদিন বন্ধ বাগানের এক শ্রমিকও আমাকে ফোন করে বলেছিলেন হ্যাপপি নিউ ইয়ার। আমি ভাবলাম এই তো দুদিন আগেই বলছিলেন ওঁরা যে শীতে ওঁদের অবস্থা খুব খারাপ। আজ কি ভাবে হ্যাপপি হয়ে গেল! তারপর চিন্তা করে বুঝলাম যে ওটা ঈশ্বর বিশ্বসের মতই একটা বিষয়।

    Comment by বুড়িয়া — January 3, 2010 @ 12:29 pm

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress