নেটখাতা

January 4, 2010

একটা মিশ্র দুপুর

আজ আমার ক্লাস ছিল না। দুপুরে গেছিলাম ইনসিওরেন্সের প্রিমিয়াম জমা দিতে, চৌরঙ্গি রোডে। সেখান থেকে বেরিয়ে রাস্তার উপরেই একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। কয়েকটি বছর ত্রিশ পঁয়ত্রিশের ছেলে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল, পরিকল্পনা করছিল একটি পিকনিকের। এবং অনবরত মুখ খারাপ করছিল। ছেলেগুলির পোষাক আশাক বেশ মহার্ঘ, এবং কথা থেকে যা বুঝছিলাম, ওই সামনাসামনি অফিসগুলোয় কাজ করে, কোনও গাড়ির সেলসে যতদূর সম্ভব। ওখানে একটা বেজায় বড় গাড়ির সেলস সেন্টার আছেও, ঠিক রেমন্ডস-এর আগে, এক্সাইডের মোড় থেকে এগোতে। ছেলেগুলি সকলেই বাঙালি। এবং ইংরিজি উচ্চারণও মোটেই শিক্ষিত কিছু নয়, অত্যন্ত গড়, অথচ ইংরিজি শব্দ বলছিল বড়ই বেশি। সে তো অবশ্য বলেই আজকাল। এবং পিকনিকের পরিকল্পনার সূত্রে শুধুই নানা খাবার, আরও খাবার, আরও আরও তৈলাক্ত এবং তৈলাক্ততর খাবার, এগুলোই যেন উচ্চারণের মাধ্যমে অনুভব করে চলছিল ছেলেগুলো। অথচ প্রত্যেকেরই গোটা সম্মুখভাগ জুড়ে এক একটি বেশ নধর আকারের ভুঁড়ি।

তিনটি মেয়ে, এরা বরং অনেক স্বাভাবিক, এরাও বাঙালি এসে দাঁড়াল ওই চায়ের দোকানেই। এরাও কথা বলছিল বাংলাতেই। এবং এতটা কাছে প্রায় গায়ের পাশে মেয়ে তিনটির উপস্থিতি সত্ত্বেও এদের মুখখারাপের দিকচক্রবাল একটুও বদলাল না, খাবারের আলোচনার কামুক যৌনতায় এরা তখন এতটাই মগ্ন। বেশ বিরক্তি লাগছিল আর গা-রিরি করছিল। আবার এটা যে মূর্খতা সেটাও বুঝছিলাম। এরকমই হয় সেলসের ছেলেপিলেরা, ছেলে তো নয় ঠিক, বর্তুল পিলেরা। একমাত্র দেখেছি ওষুধের সেলসের ছেলেরা, মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ নাম ওদের পেশার, কখনও কখনও একটু আলাদা হয়।

যা হয়, বিরক্তিটা ক্রমে ভিতরে চারিয়ে যেতে থাকে, নিজের উপরেই রাগ হতে থাকে। কিন্তু কিছু করারও থাকে না, নিজেদের এই ক্ষয় ও জীর্ণতা নিয়ে আর একবার একটু বিষণ্ণ, দুঃখিত এবং ক্লান্ত হওয়া ছাড়া। ওই নিয়েই এসে রবীন্দ্রসদন ইস্টিশনে মেট্রোয় উঠলাম। সেখানে একটা ছেলেকে দেখলাম, তার কাঁধের ব্যাগের গোটা ফিতে জুড়ে খাকির উপর নীল মার্কারে রেখা রাহুল রাহুল। আবার ব্যাগের অন্য দুটো উল্লম্ব ভাবে ঝোঝুল্যমান ফিতেতে লেখা এসটিওপি-ও, অন্যটিতে এসটিওপি-কে। মানে দুটো মিলিয়ে হচ্ছে দুবার স্টপ এবং একবার ওকে। আবার ব্যাগের গায়েও লেখা অনেককিছু, রাহুল ইজ গোয়িং ওকে, ইত্যাদি।

ছেলেটি অনকেক্ষণ ধরেই খেয়াল করছিল আমি ওকে দেখছি, এবং বোধহয় আমার মুখের রেখায় কিঞ্চিত মজার উপস্থিতিও টের পাচ্ছিল, একটা অস্বস্তিও পাচ্ছিল। ক্রমে আমি ওর সঙ্গে আলাপ জমালাম, ‘তোমার নাম কি রাহুল’ এই দিয়ে শুরু করে। ছেলেটি দমদম মেট্রোপলিটান স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ে। ওকে আমি ওর ব্যাগলিখনের একটু ইংরিজির ত্রুটিও সংশোধন করে দিলাম। জিগেশ করলাম, ব্যাগে এত কিছু লিখেছিস, মা বকেনি? ও হেসেই বলল, না, মাথা নাড়িয়ে।

অবাক হলাম আমি দমদমে নামতে নামতে। ছেলেটি যাওয়ার আগে, তার আগে বেশ কিছুক্ষণ আমি এসে দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, আমায় বলল, “আসি”। আমি তো ছেলেপিলেই চরাই, সত্যিই এতটা সৌজন্য আমি আশাই করিনি ওই বয়সের একটি ছেলের কাছে। বেশ লাগল। অবাকও হলাম। অবাক হওয়ার মত আর একটা জিনিস আমার জন্য অপেক্ষা করছিল তখনও, দমদম পাঁচ নম্বর প্লাটফর্মে। মেট্রো থেকে নেমে দেখলাম মাঝেরহাট-দত্তপুকুর লোকাল দিয়েছে ওখানে। সিঁড়ির দিকে হাঁটলাম।

ট্রেনে উঠে একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসলাম। খুব নিকটে কোনও চৈনিক সেলফোনের সাঙ্গীতিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত নেই এটা দেখেও ভারি আরাম হল। এই সময় দেখছিলাম, একটি মেয়ে, আর তার সঙ্গে তার মা, খুব খুঁজে বেড়াচ্ছে কিছু একটা ট্রেনে। মা সম্পর্কটা ডাক থেকে মালুম হল, মেয়েটি বেশ উজ্জ্বল দেখতে, ছাপা সিন্থেটিক হলুদ সাদা সালওয়ার কুর্তা পরনে, সঙ্গে মায়ের চেহারায় বরং কায়িক শ্রম ও ক্লেশের ছাপটা বেশ প্রকট, প্রথম দেখলে মা-মেয়ে বলে মনেই হয় না। মেয়েটার মুখটা ভারি মিষ্টি, নরম। ছোটখাট চেহারা, বাঙালি সৌন্দর্য বলতে ঠিক যেমনটা ছোটবেলা থেকে মাথায় গেঁথে আছে একদম সেরকম। ওরা কী খুঁজছে এত সেটা ভাবছিলাম।

এইসময় ওরা উঠে এল, আমাদের কামরাতেই। এবং একটি মানুষ, সামনে ঝুড়ি আর বস্তাটা না-থাকলেও যাকে ওই ধরনের একজন ছোট পুঁজির ব্যবসায়ী বলে আন্দাজ করে নিতে পারতাম এমনই চেহারা তার। লুঙ্গি পরনে, মুখটা একটু ভাঙাচোরা, কাঁচাপাকা গোঁফ। তরকারির ভেন্ডার, কমলালেবু বিক্রেতা এমনটা বললেই যে ধরনের চেহারা মাথায় আসে।

ওই মেয়েটি এবং তার মা দুজনেই এসে এই লোকটির সঙ্গে বসল। এই লোকটি এবং মায়ের সঙ্গে, তখনও মা বলে আমি নিশ্চিত নই, মেয়েটির মুখ চোখের শিক্ষা ও উজ্জ্বলতার এতটাই ফারাক যে আমি বেশ সকৌতূহল দেখছিলাম। মেয়েটির মা কয়েকটি কমলালেবু কিনলেন, ওর বাবাকে দিলেন, বাবা ঝুড়িটায় ঢোকাতে যাচ্ছেন দেখে মা-টি বললেন, “এখন খাইলে দুইটা পাইতা, বাড়ি গ্যালে তো একটা পাবা কেবল”, অন্যান্য কথাতেও ওদের ফরিদপুরের দেশের ভাষার, পরে জানলাম সেটা কথার সূত্রে, পরিপূর্ণ উপস্থিতি। অথচ মেয়েটির কথায় ওরকম কোনও টানই নেই। কলকাতার যে কোনও একটা কলেজের যে কোনও একটি ছাত্রীর মত তার কথোপকথন।

এই যে মেয়েটির সঙ্গে এত ফারাক বাবা-মার, এটা আমায় এতটাই সপ্রশ্ন করছিল যে শেষ অব্দি আমার ঠিক সামনে বসা ওর মা-কে জিগেশ করলাম, আপনার মেয়ে? মা সায় দিলেন। জিগেশ করলাম কী পড়ে? আলাপ শুরু হল। মেয়েটিকে জিগেশ করায় উত্তর দিল, ও মতিঝিল কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। কী বিষয়, জিগেশ করলাম আমি। ও বলল, ফিলসফি। বিষয়ের নামটা বাংলায় বললে আমার আর একটু পছন্দ হত, কিন্তু ফিলসফি শব্দটা ও সত্যিই ফিলসফিই বলল, সচরাচর অভ্যস্ত ফিলজফি নয়। পাস কী জিগেশ করায় সেগুলোর নামের উচ্চারণও বেশ সুন্দর।

ওর মা পাশ থেকে বললেন যে, ওই ফুলের ব্যবসা করেই ছেলেমেয়েদের মানুষ করার চেষ্টা করেন। তারা থাকেন ক্যান্টনমেন্টের রেল লাইনের পাশের ঝুপড়িতে।

আমি ওনাকে না-বলে পারলাম না, মেয়ে আপনার সত্যিই মানুষ হচ্ছে দিদি। এত সুন্দর একটা মেয়ে, আমার সত্যিই মনে হচ্ছিল, বাড়িতে কোনও তেমন বয়সের ভাইপো টাইপো থাকলে তার সঙ্গে সম্মন্ধ করতাম। লেখাপড়াটায় যথাযথ হওয়াটাই বড় কথা না, মা-বাবার বাস্তবতায় কায়িক শ্রমের উপস্থিতিটা এতটাই প্রকট যে মেয়েটি সেটা জানে না তা হতেই পারে না, অথচ তা নিয়ে কোনও সঙ্কোচ নেই। সত্যিই মনটা পুরো ভরে উঠছিল। লেখাপড়াটাও যে ভাল করেই করে নিজের এই দুই দশকের মাস্টারির অভিজ্ঞতায় সেটা ভালই বুঝতে পারছিলাম। মনে মনে আশীর্বাদ করছিলাম, ভাল বাঙালি মেয়ে হ, ভাল বাঙালি মা হ, তোর বাচ্চারাও শিক্ষিত হোক, ইত্যাদি।

লাবণি হালদার বলে মেয়েটিকে আমার নাম, কলেজের নাম দিতেও খুব ভাল লাগল। যদি কখনও ওর কোনও কাজে লাগতে পারি। তখনই ভাবছিলাম, ভাল কিছু তো ব্লগে লেখাই হয় না, আজ ওকে নিয়ে ব্লগ লিখব, ওকে আর রাহুলকে নিয়ে। ভাল ব্লগ। তখনও আমি জানিনা, এর পরে আরও একটা অভিজ্ঞতা আছে যা আমায় উল্লেখ করতে হবে ব্লগে।

বেশ ভাল ফুরফুরে মনে ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরছিলাম। ঠিক গলির মুখে এসে রাস্তার উল্টোদিকে আটকে গেলাম। এসএফআইয়ের একটা মিছিল যাচ্ছে। বোধহয় এপিসি কলেজের, বা মধ্যমগ্রাম বয়েজের ছেলেপিলেও হতে পারে, যেরকম সব কম বয়সের ছেলে। তাদের একদম প্রথমদিকের দুই সারি ছেলে স্বাধীনতা গনতন্ত্র সমাজতন্ত্র ইত্যাদি নিয়ে স্লোগান দিচ্ছে। এবং অন্যরা ঠিক কী করছে সেটা বলা খুব কঠিন। সবচেয়ে কাছাকাছি এটাই আসবে যে তারা একটা প্রতিযোগিতায় নেমেছে, একটা বাংলা বাক্যে কতবার পুং যৌনাঙ্গ ভরে দেওয়া যায়, এবং তার খুব নিকটাত্মীয় শব্দদের। লাকাঁ একবার লিখেছিলেন সমাজতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষার কথা। আর এটা শুনতে শুনতে এটাই আমার মাথায় এল, তাপসী মালিক বা অন্য এই জাতীয় ধর্ষণগুলো তো বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। এই ভাষার রূপারোপ যে রাজনৈতিক সক্রিয়তায় ঘটবে তাতে তো ওগুলোই ঘটার কথা।

কিন্তু শেষ অব্দি তো এটাই সত্য যে এই শিক্ষার আবহ, রাজনীতির প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়েও তো রাহুল তার সৌজন্য হারিয়ে না-ফেলার, এবং আমি তাকে সমালোচনার পরও, দায়িত্বশীলতা ধরে রাখতে পারে। লাবণি পারে তিন ভাইবোনের দিদি হয়ে তাদের পড়ানোর পরেও, তাদের দারিদ্রের পরও, তার জীবন্ততা বজায় রাখতে। কোথাও বোধহয় সব কিছু এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

4 Comments »

  1. ‘লাবণি’ নাম-টা খাঁটি, নাকি বদলেছ? যদি খাঁটি হয়, তাহলে বলব বদলালেই ভাল হত। কত রকম লোকই তো ব্লগ পড়ে, তার মধ্যে ওর চেনা কোনো চ্যাংড়া ছোঁড়া যদি ওকে harass করে, তাহলে পারিবারিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ওর স্বাচ্ছন্দ্য বিঘ্নিত হতে পারে।

    তোমাকে premium জমা দিতে যেতে হয় কেন? আমার agent তো বাড়িতে এসে নিয়ে যেত, যখন আমার policy ছিল। বিয়ের সময় দিয়ে অবশ্য ভাঙিয়ে ফেলেছিলাম, জানিনা আজকাল অন্যরকম ব্যবস্থা কিনা।

    Comment by তথাগত — January 5, 2010 @ 1:45 pm

  2. এটা ঠিকই বলেছিস। আমার আগে মাথায় আসেনি। এর পর থেকে খেয়াল রাখব।

    আর এই ইনশিওরেন্সটা ভারি চমৎকার, সিএইচএনএইচবি বলে, বহু বছরের, ব্রিটিশ আমলের কোম্পানি। খুব ভাল ভাবে সব কিছু পাওয়াও যায়। কিন্তু গিয়ে চেকে জমা দিতে হয় প্রিমিয়াম। ওদের ওসব এজেন্ট টেজেন্ট নেই।

    Comment by dd — January 6, 2010 @ 5:03 pm

  3. অামি অনেক জনকেই দর্শন শব্দটির ইংরেজী ওয়ার্ড বলতে বলে ছিলাম তাতে সবাই ফিলজফি বলল।
    অামি তো ভূল উচ্চারন করতামই। তবে এখন শুধরে নিয়েছি।

    Comment by দেবাশিস দাস — January 9, 2010 @ 4:18 pm

  4. বলেছিলাম হবে।

    Comment by দেবাশিস দাস — January 9, 2010 @ 4:19 pm

RSS feed for comments on this post. TrackBack URI

Leave a comment

Powered by WordPress