নেটখাতা

January 20, 2011

দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৫

[গুরুচণ্ডালী সাইটে এই লেখাটা প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু ওদের ইউনিকোড থেকে বাংলাপ্লেন কনভার্টারে সমস্যা থাকায় ফরম্যাটিং ঘেঁটে যাচ্ছে। তাই এখানে ওই প্রতিটা অংশ, যেমন যেমন গুরুচণ্ডালীতে প্রকাশ হচ্ছে, সঠিক ইউনিকোড অবয়বে আমি দিয়ে যাব। এটা তার পঞ্চম অংশ। এই ব্লগেরই পুরনো লেখায় পাবেন এর প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় আর চতুর্থ অংশ।]

==========অংশ ৫ শুরু===================

দেবকী বসুর কবি, ১৯৪৯ — দ্বিতীয় প্রবাহ

অধ্যায় বোঝাতে ‘প্রবাহ’ ব্যবহার আমি কখনও করিনি। তাই বেড়ে লাগছে, শব্দ ব্যবহার করতে করতে বুড়ো হয়ে গেলাম, জীবনে প্রথম কোনও একটা শব্দ ব্যবহার করছি এই মজা এখন দুর্লভের চেয়েও বেশি। সত্যিই প্রথম অংশটা চলছিল একটা প্রবাহের মত। লেখাটার পরিকল্পনাটাও গজিয়ে উঠল সাবটাইটল আর নোটস ফাইল শেষ হওয়ার পর, নানা জনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে। তারপরও ঈপ্সিতা না খোঁচালে শুরুও হত না। বেশ চলছিল। লিখতেও বেশ লাগছিল। এর মধ্যে একটা ছেদ এল শারীরিক ক্লান্তিতে। আমি রসিকতা করেও বলি, আমার ক্লান্তি হয় না, বংশটা তো দাস। কিন্তু দাসও তো বুড়ো হয়। খুব খুব ক্লান্তি হচ্ছিল। প্রথমে ভাবলাম ক্লান্তিটা স্নায়বিক, একটা দিন গোটাটা কাটালাম নানা কিছু রান্নাটান্না করে। মেয়েটা পুরো মাংসাষী হয়েছে, যেদিন পাড়ার যে বাড়িতে মাংস রান্না হয়, সেখানেই খেয়ে আসে। ওর বাবাই যে ব্রহ্মাণ্ডের শ্রেষ্ঠ মাংসরাঁধুনি এটা ওকে আরও একবার প্রত্যয়িত করার প্রয়োজন ছিল। তারপর দেখলাম ক্লান্তিটা তার চেয়েও গভীর, একদিন রাতে ঘুমোতে ঘুমোতে খাট থেকে পড়েই গেলাম। উঠে আবার শুয়েছি যখন ডান হাতের কনুইয়ে তীব্র যন্ত্রণা করছে, ভয় লাগছে আবার হাড় ভাঙল কিনা, কিন্তু তার মধ্যেই ফের সাড়হীন ঘুমিয়ে পড়লাম। একবার ভাবলাম, লেখাটা আর লিখব না, অসমাপ্ত কাজ হাতে থাকলে যেমন হয়, মেজাজ শুধুই খিঁচড়ে যেতে থাকে, তাও পারছিলাম না ফের হাত দেওয়ার উদ্যমটা সংগ্রহ করতে। আর ব্যাটা দেবাশিসও কোনও প্রতিবার্তা (বাংলায় ফিডব্যাক) পাঠাচ্ছিল না। সেই সাতই নভেম্বর ভোরের পর ছয়দিন আর লিখিইনি। কাল ফের উদ্যমটা ফিরে এল সেঁজুতি খোঁচানোয়, ওর একটা লেখার কাজে লাগতে পারে, তাই ফোনে বলল, কী হল, তুমি আর লিখছো না কেন? ছেলেপিলেদের অবস্থা কী? আঠারই, মানে সামনের বেস্পতিবার বিয়ে, এখনও অন্য জিনিসে মনযোগ দিয়ে যাচ্ছে। ছি, ছিছি। বিয়ে বস্তুটা কবে থেকে এমন এলেবেলে হয়ে গেল কে জানে, আরও তার উপরে এই প্রথম ও বিয়ে করছে। কিন্তু উদ্যমটা সত্যিই ফেরত এল। তাই, আসুন দ্বিতীয় প্রবাহে ঢোকা যাক। কিন্তু মাথায় রাখবেন, এটা ‘কবি’ ফিল্মের কোনও মূল্যায়ন নয়, সমালোচনা তো নয়ই। ‘কবি’ ফিল্ম দেখাটা আমি নামক ব্যক্তিকে, তার ব্যক্তি অনুভূতিকে কোন কোন জায়গায় আক্রমণ করেছিল, তার একটা তালিকা বলা যেতে পারে। সেই তালিকাও আবার কোনও সচেতন যত্ন নিয়ে চয়ন করা হয়নি, চালিয়ে দেখতে থাকছি, যে জায়গায় কিছু মাথায় আসছে, থামিয়ে লিখে নিচ্ছি।

আমরা ছেড়েছিলাম বাবুর উপন্যাস-রূপ আর চলচ্চিত্র-রূপে পার্থক্যের প্রশ্নে। খেয়াল করেছেন কী, অনুবাদ ভুল অনুবাদ প্রতি-অনুবাদের গোটা চক্করটা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে ‘কবি’ ফিল্ম, যা ‘কবি’ উপন্যাস পারেনি। উপন্যাস ভাষা-নির্ভর হওয়াতে সেখানে কোন পাঠক উপন্যাসটা পড়ছে, কার জন্য তারাশঙ্কর লিখছেন, এই নির্বাচনটা সক্রিয় ছিল। ভাষাই ঠিক করে দিচ্ছিল, কে লেখাটা পড়বে — ইংরিজি বর্ণমালা এবং ভাষা যার কাছে অবোধ্য নয়। কিন্তু ফিল্মে বাবুর মাঝ-ফ্রেমে বসে থাকা এবং বারবার দুদিকে নাচপুতুলের মত করে তাকাতে থাকা, তারপরে উঠে দাঁড়ানো এবং কথা বলে ওঠা, এই গোটাটা মিলে তৈরি করল একটা ভঙ্গী। যে ভঙ্গীটা যে কোনও দর্শকের কাছেই অত্যন্ত সুবোধ্য, সেখানে ভাষাটা কোনও অন্তরালই নয় আর। এই ভঙ্গীটা, এবং ভঙ্গীটাকে প্রাকৃত বাঙালি কী ভাবে চেনে, কী ভাবে বোঝে, এটা অনেক অজস্র অসংখ্য বার এসেছে বাংলা সাহিত্যে, কিন্তু আমার তো কিছু স্থির শ্মশানভূমির বাধ্যতা আছেই। সেই ‘ইছামতী’ থেকেই তোলা যাক, যে উপন্যাসটা আজ পর্যন্ত একবারও হয়নি যে আমি যে কোনও পাতা একবারও পড়েছি, অথচ রক্তক্ষরণ হয়নি অস্তিত্বের গভীরে কোথাও। আমি যে উদ্ধৃতি দিচ্ছি, সেই উদ্ধৃতিটুকু দিতে দিতেও, উপন্যাস থেকে এই লেখায় টুকতে টুকতেও আমার মধ্যে কী একটা হচ্ছে, পড়তেও ভাল লাগছে। বেশ কয়েক লাইন তোলা যাক ‘ইছামতী’ থেকে।

তিলু হেসে বললে—এই খোকা, তোর শম্ভুদাদা কেমন ইংরিজি বলে রে?
ইট্ সেইস্ট মাট্ ফুট্—ইট সুনটু-ফুট-ফিট্ —
ভবানী বললে—বা রে! কখন শিখলি এত?
টুলু বললে—শুনে শিখিচি। বলে, তাই শুনি কিনা। যা বলে, সেরকম বলি।
ভবানী বললে—সত্যি, ঠিক ইংরিজি শিখেছে দ্যাখো। কেমন বলচে।
নিলু বললে—সত্যি, ঠিক বলচে তো!
তিনজনেই খুব খুশি হোলো খোকার বুদ্ধি দেখে। খোকা উত্সাহ পেয়ে বললে—আমি আরো জানি, বলবো বাবা? সিট্ এ হিপ্-সিট্-ফুট্-এপট্-আই-মাই—ও বাবা এ দুটো কথা খুব বলে আই আর মাই—সত্যি বলছি বাবা—
নিলু অবাক হয়ে ভাবলে—কী আশ্চর্য বুদ্ধিমান তাদের খোকা!

এর মধ্যে একজন, ভবানী নিজে অত্যন্ত শিক্ষিত একটি মানুষ, ভারতীয় শাস্ত্র ও তত্ত্বের ডিসকোর্সে, আলোচনায়। এবং নিলুর শেষ বিস্ময়টা খেয়াল করুন, “কী আশ্চর্য।” এই ওয়ান্ডার বা বিস্ময়টা একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এবং এটা বোধহয় আজও অব্দি একটা ক্রিয়াশীল বিস্ময়। আনন্দ-সাহিত্যের, মানে আনন্দ পাবলিশার্সের ছাপা সাহিত্যের, একটা ব্যাপক অংশে, এত ইংরিজি বাক্যের প্রাদুর্ভাব কেন, এবং একই ঘটনা পুনরাবৃত্ত হয় কেন বাংলা ফিল্মে সিরিয়ালে — আমার ধারণা, এই বিস্ময় আজও ক্রিয়াশীল। খুব ঝিনচাক একটা লোকের, বা তার বউয়ের, বা ছেলেমেয়ের বিশ্বাসযোগ্যতাই নির্মিত হয় এই ইংরিজি প্রয়োগে, কারণে এবং অকারণে। এবং ‘অকারণ’ শব্দটা এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ ‘কারণ’ শব্দটার সঙ্গে। আমি দেখেছি সিরিয়ালগুলো সিনেমাগুলো চলার সময়ে ইংরিজি ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষদেরও কোনও অসুবিধা হয় না, তার মানে কাহিনীর শরীরে এগুলো কোনও অর্থপূর্ণ উপাদানই নয়। বা সম্পূর্ণ ইংরিজি-অজ্ঞ মানুষকেও কোনও আনন্দ-সাহিত্য পড়ার পর প্রশ্ন করে দেখেছি, তার বুঝতে একটুও অসুবিধা হয়নি। এগুলি প্রয়োগ হয়ে চলে একদম সেই বিস্ময়ই উত্পাদনের জন্য, নিলুর যা হত। এগুলো দেখে একটা বিকৃত আনন্দও হয়, ওই সাহিত্যে বা সিরিয়ালে এই প্রয়োগে — সচরাচর এত খারাপ ইংরিজি থাকে সেগুলো যে একটা আরাম হয়, দে দে রে, ইংরেজদের তো নিজে থেকে তাড়াতে পারিনি আমরা, দে ব্যাটাদের ভাষাকেই ধর্ষণ করে দে।

দেবকী বসু ‘কবি’ চলচ্চিত্রে এই ভঙ্গীটাকেই অনুবাদ করে দিচ্ছেন ফিল্মের ভাষায়। এবং তাই করে উপন্যাসের লেখক পাঠকের নির্বাচিত চক্রের চক্কর থেকে বেরিয়ে আসছেন। ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ বা ‘শত্রু’ বা ‘চ্যালেঞ্জ’ জাতীয় ফিল্মে যখন কোনও বড়লোকের বেটাবেটি বা কোনও অফিসার ইংরিজি বলে, এই ভঙ্গীটাই সেখানে পাঠ করে দর্শক, চরিত্রের পোষাক ধরনধারণ সব কিছু মিলিয়ে। এবং তারাশঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাস আর আমাদের উদাহরণের এই ‘ইছামতী’ উপন্যাস দুটোতেই কিন্তু চক্করটা চালু আছে। ‘ইছামতী’ উপন্যাসে প্রচুর কথোপকথন আছে সরাসরি ইংরিজিতে, ভাষায় ও বর্ণমালায়, এমনকি কোনও অনুবাদও পাশাপাশি দেওয়া নেই তার বহু জায়গাতেই। আমি জানিনা, আপনাদের কী হয়, আমার গোড়া থেকেই একটা তীব্র বিরক্তি হত এতে, এই ইংরিজি প্রয়োগে। স্কুলের উঁচুর দিকে উঠে যখন প্রথম এলিয়টের কবিতায় সরাসরি সংস্কৃত ও গ্রীক অক্ষরের ব্যবহার প্রথম যেবার দেখেছিলাম, একটা সান্ত্বনা পেয়েছিলাম, আজও স্পষ্ট মনে আছে। যদিও সেটা অর্থহীন, এলিয়টের ওই ব্যবহার একদম অন্য একটা ব্যাপারকে হাজির করে। যাই হোক, দরকারি জায়গাটা এই যে, নিতাইদের আর বাবুর বক্তব্যকে ভাষা হিসাবে বুঝতে হয়না ‘কবি’ চলচ্চিত্রে, তাই বোঝার ভুলও হয়না, তাই সেই বোঝার ভুল অপনোদন করতে ভুল প্রতি-অনুবাদও আর প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে না। ভাষাগত অর্থের জায়গায় প্রবেশ না করেই বাবু তার সমস্ত ক্ষমতার ঔদ্ধত্য নিয়ে চিহ্নিত হয়ে যান।

102
00:10:39,100 –> 00:10:41,390
‘Absolute cowards, cowards’.[25]

অ্যাবসলিউটলি কাওয়ার্ডস, কাওয়ার্ডস কোথাকারের।

এবারে আর কিছুই আলোচনা করার নেই। শুধু শেষ আলোচনাটার সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

105
00:10:50,300 –> 00:10:52,300
What is a ‘madel’, didi?[26]
106
00:10:52,600 –> 00:10:56,400
A piece of metal, with engraved name.

ম্যাডেল কী দিদি, ম্যাডেল?
পদুক লো পদুক। তাতে নাম ন্যাকা থাকবে।

এবার এল ভারি আকর্ষণীয় একটা জায়গা। বাবু ও ক্ষমতার জগতকে কেন্দ্র করে ইংরিজি শব্দ কত কত স্তরে কত রকমে অনিংরিজিতে পর্যবসিত হতে পারে তার একটা ভারি চমত্কার উদাহরণ। এবং এটা চলেছে গোটা ‘কবি’ চলচ্চিত্র জুড়ে। এই মেডেল নামক শব্দ ও পরিপ্রেক্ষিতটা এখন বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলবে, এবং আবারও ফেরত আসবে চলচ্চিত্রের একদম শেষ দিকে। যখন একদিকে বসনের মৃত্যু হচ্ছে, এবং একটা প্রতিযোগিতায় সোনার মেডেল জয়ের জন্য অংশগ্রহণের নিমন্ত্রণ আসছে নিতাইয়ের কাছে। চলচ্চিত্রের এই জায়গায় যেমন স্টেশনমাস্টার, রাজনের বৌ, ঠাকুরঝি, রাজন, এবং নিতাই, পরের বার এই ‘মেডেল’ শব্দটা তার বিভিন্ন উচ্চারণভেদে উচ্চারিত হবে মহাদেব কবিয়াল, বেহালাদার, মাসি, বসন, আমন্ত্রণকর্তা এবং নিতাইয়ের মুখ দিয়ে। এবং মজাটা এই যে, যে উচ্চারণটা এখানে গৃহীত হচ্ছে, স্টেশনমাস্টার জাতীয় মানুষদের মুখ দিয়ে, সেটা মূল শব্দটার ইংরিজি উচ্চারণ নয় আদৌ, একটা স্পষ্ট বাংলাকরণ রয়ে যাচ্ছে তাতে, -এ একার, -এ একার, ল — এই উচ্চারণে। অর্থাত্‍ এটাই শিক্ষিত বাঙালির কাছে ইংরিজি শব্দটার আকার। এই পার্থক্য রয়েছে অজস্র শব্দের লোক ব্যবহারে, যেমন বাস-স্টপেজ, যা, বোধহয় কোনও ইংরিজি শব্দই নয়। শিক্ষিত বাঙালির জনপ্রিয় ব্যবহারে ‘বাসস্টপ’ শব্দটার ওই আকার দাঁড়িয়েছে। ঠিক তেমনি ‘মেডেল’ এখানে গৃহীত-সঠিক। এবার, সেই গৃহীত-সঠিকের থেকে কতটা দূরবর্তী কারুর উচ্চারণ তার ভিত্তিতে তার সামাজিক অবস্থানটাও চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছে গোটা চলচ্চিত্র জুড়েই। যেমন সবচেয়ে স্পষ্ট ত্রুটিপূর্ণ উচ্চারণটা আসছে ঠাকুরঝির কাছ থেকে। সামাজিক অবস্থানটা ভাবুন। গ্রাম, পরিবারতন্ত্র, নারী। তার চেয়ে সঠিক উচ্চারণ করেন, ‘মেডেল’ নামক সেই স্টেশনমাস্টার উচ্চারণের নিকটতর, মাসি। যা স্বাভাবিক, শ্রমের বাজারের অভ্যস্ততা। এবং বেহালাদার তার চেয়েও সঠিক, কারণ সে ভুয়োদর্শী, সত্যই নানা ঘাটের জল খেয়ে এসেছে সে, এবং একই সঙ্গে পুরুষ। ওই একই জায়গা থেকেই বোধহয়, গ্রামের ডোমনন্দন নিতাইয়ের উচ্চারণের সঙ্গেও তার একটা পার্থক্য থাকে। হয়ত এতটা সত্যিই সচেতন নির্মাণ নাও হতে পারে, কিন্তু হতেও পারে। কারণ এই গোটা ‘মেডেল’ পরিপ্রেক্ষিতটাই চলচ্চিত্রের নিজস্ব, উপন্যাসে এটা আদৌ নেই। চলচ্চিত্রের এই জায়গায় এসে এটা শুরু হল, চলবে একদম শেষ অব্দি, কাহিনীধারার মূল একটা প্রবাহ। তাই সেটা অনেক ভেবেচিন্তেই প্রযুক্ত হয়েছিল, এটাই স্বাভাবিক। তারাশঙ্করের লেখায় ভাষাভিত্তিক এই অবস্থান এবং বর্গসঙ্করতার কিছু ভাবনার ভ্রূণ ছিল, কিন্তু যে আকারে সেটা উপস্থিত হল চলচ্চিত্রে তার সঙ্গে তার তুলনা করাই যায় না। আমরা সেই কথায় পরে আসছি, বালিয়ার প্রসঙ্গে। এই মেডেল-পদুক পরিপ্রেক্ষিতে আর দু-একটা কথা যোগ করে নেওয়া যাক।

খেয়াল করুন, ‘মেডেল’ উচ্চারণটাকে যদি আমরা সেই অর্থে বাঙালি-সঠিক বলে ধরে নিই, তাহলে, ঠাকুরঝি সেখান থেকেও নড়ে গেল, হয়ে গেল ‘ম্যাডেল’। এবং সেই বিদেশী ধারণাকে দেশী ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজনের বৌ বলল, ‘পদুক’। যা একই সঙ্গে আর একটা পুরনো শব্দের থেকে নড়ে যাওয়া। ‘পদক’ একটি সংস্কৃত শব্দ, শিক্ষিত তত্সম বাঙলায় এর ব্যবহার বহুল, কিন্তু এই তদ্ভব আকারটা তার থেকে পৃথক। একসময়ের শাসকদের হাত ধরে এসেছিল ‘পদক’, বদলে তার অপভ্রংশ হয়ে গেল ‘পদুক’। নতুনতর শাসকের হাত ধরে এল ‘মেডেল’, সেটাও গেল বদলে। আমার ভারি মজা লেগেছিল এই কথোপকথনটায়। মনে পড়ে গিয়েছিল, একাদশ শতকে লেখা কৃষ্ণ মিশ্রের ‘প্রবোধচন্দ্রোদয়’ সংস্কৃত নাটকে ‘আর্যপুত্র’ বদলে অপভ্রংশ বাচনে ‘অজ্জউত্ত’ হয়ে যাওয়া, নাটকে নটীর প্রথম সংলাপেই ছিল। মুরারিমোহন সেন তাঁর অনুবাদের সঙ্গে দেওয়া মূল সংস্কৃত নাটকে প্রতিটি অমন অপভ্রংশ সংলাপের নিচেই ব্রাকেটে সঠিক সংস্কৃত শব্দগুলো দিয়ে দিয়েছিলেন, মনে আছে। ব্রাকেটের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে ওগুলো দেখতে দেখতে জ্যান্ত ইতিহাসের শরীরে ঘটতে থাকা বদলের একটা ছাপ পেয়েছিলাম, মনে আছে। এখানে ‘কবি’ চলচ্চিত্রে ঠিক তাই ঘটে। দাসী ও শূদ্রদের অপভ্রংশে ছড়িয়ে যেতে থাকে তার নানা বিভিন্ন আকারে মূল ইংরিজি শব্দটি। এই বাস্তবকে ধরে উঠতে পারে চলচ্চিত্রটি, কোনও বাড়তি মন্তব্য না করেই।

148
00:14:58,090 –> 00:15:07,800
_The son of the wise ‘doam’_[31]
_Started getting stupid_

সুবুদ্ধি ডোমের পোয়ের কুবুদ্ধি ধরিল।

ঠিক আগের দৃশ্যই ছিল নিচু-জাতের দুজন মানুষ, মুচি ও ডোম, পরস্পরকে জড়িয়ে ধরছে। আর তার পরের দৃশ্যই হল এই জাত তুলেই গালি দিচ্ছে মহাদেব কবিয়াল। এবং এখানে দেবকী বসু একটা অদ্ভুত সুযোগ পেয়ে গেলেন, পড়ে পাওয়া আঠারো আনার মত, একটা দুষ্প্রাপ্য সুযোগ। জাতপাতের স্তরে একটা জ্যান্ত যুদ্ধ সেটা ইতিমধ্যেই সদাসর্বদাই এসে গেছে আলোচনা বা ডিসকোর্সের স্তরে, কবিগানের দৌলতে। এবং সেই আলোচনায় স্থানান্তরিত কবিগান-যুদ্ধের অনেকগুলো উপাদানই হল যে মাধ্যমটি দেবকী বসু নির্মাণ করছেন তার সঙ্গে এক। কবিগানের মধ্যেই আছে গান, নাচ, অভিনয়ের কিছু উপাদান, এবং কোথাও কোথাও ভ্রূণাকার কাহিনীসূত্র। এই কবিগানটার মধ্যেও ভাবুন, যখনই মহাদেব কবিয়াল গরুড়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ, এবং নিতাই মশার ভূমিকায়, তার মধ্যেই চলে আসছে একটা আলগা কাহিনীসূত্র যা উপ্ত রকমে ব্যবহার করছে রামায়ণের কাহিনীসূত্রর একটা ছায়াকে। ফিল্মে মনোরঞ্জনের জন্যে নাচ-গান যোগ করা হয়, আমরা রোজই দেখি। আর এখানে, কাহিনীর একটা মূল উপাদান, জাতপাতের যুদ্ধ, ইতিমধ্যেই স্থানান্তরিত হয়েছে কবিগানের পালায়, যে কবিগানের মধ্যেই রয়েছে সামাজিক ভাবে পরীক্ষিত ও উত্তীর্ণ মনোরঞ্জনের নানা উপাদান। এবং সেটা কাহিনীর মূল ধারাটিকে, জাতপাতের যুদ্ধকে একটুও দুর্বল করছে না, বরং সংঘাতটাকে এনে দিচ্ছে সরাসরি প্রদর্শনীমঞ্চের উপর, প্রদর্শনযোগ্যতায়, শিল্পমাধ্যমে অনুবাদ করে। এই জাতপাতের সংঘাতের জায়গাটা, একটু অন্য চেহারায়, এই কবিগানের আকারেই উপস্থিত হয়েছিল আর একটা জনপ্রিয় বাঙলা চলচ্চিত্রে, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’। মনে করুন, ‘খ্রীষ্ট আর কৃষ্টে কিছু ফারাক নাই রে ভাই’ কবিগানের সেই তীব্রতা। দেবকী বসুর সুযোগ বলতে এটাকেই বোঝাচ্ছি যে সামাজিক বাস্তবতার চিত্রায়ন করতে গিয়ে নাচ-গান ইত্যাদিতে সরে যাওয়া নয়, সেই নাচ-গানের মধ্যে দিয়েই সেটা উপস্থিত হচ্ছে। সরাসরি এর রাজনৈতিক প্রয়োগের একটা উদাহরণ নিবারণ পণ্ডিত। গণনাট্যের গানে তার জনপ্রিয় হয়ে ওঠা সেই ‘পাপী তো কৃষ্ণ বলে না’ অনেকদিন পরে ফের শুনেছিলাম দোহারের গানে।

মহাদেব কবিয়ালের গানে এর পরবর্তী অংশে যে প্রসঙ্গগুলি এসেছে তার দু-একটা এখানে উল্লেখ করে রাখি। এর পরেই মহাদেব কবিয়াল উল্লেখ করবে নিতাইয়ের জাত-ব্যবসার কথা। সেটা বলতে এখানে চুরি-ডাকাতির কথা তুলেছে মহাদেব। যেমন নিতাইয়ের বাবার কথা বলেছে সে, সিঁদ কেটে বাড়ি বাড়ি চুরি করত, বা তার ঠ্যাঙাড়ে ঠাকুর্দার কথা, এবং তার মায়ের বাবার কথাও যে কিনা দ্বীপান্তরে মরেছে। এছাড়া নানা জায়গায়, ডোমদের আর একটা পেশা ছিল শ্মশানে। ডোমদের এই ধরনের পেশাগুলির একটা ইতিহাস ছিল। বাংলার সামাজিক ইতিহাস নিয়ে কোনও খুব স্পষ্ট মতামত দেওয়ার যোগ্যতা আমার নেই। কিন্তু নানা সময় যা কিছু শুনেছি বা পড়েছি, তার থেকে এইটুকু মাথায় আসছে যে, বোধহয় ব্রিটিশ আমলে ডোমদের এইসব অপরাধ ও মৃত্যুকেন্দ্রিক পেশার সূচনা প্রাকব্রিটিশ বাংলায়। সেখানে ডোমরা ছিল একটি যোদ্ধা জাতি। বিভিন্ন রাজার হয়ে যুদ্ধ করত এই ডোমরাই। এই ইতিহাসই বোধহয় ধরা আছে ওই ছেলেভোলানো ছড়ায়: “আগে ডোম, বাগে ডোম, ঘোড়াডোম সাজে”। আগে এবং পিছনে ডোম সৈন্যদের নিয়ে, অশ্বারোহী ডোম যোদ্ধাদের নিয়ে, “ঢাক মেঘর ঘাঘর” ইত্যাদিতে যুদ্ধের বাজনা বাজাতে বাজাতে যুদ্ধে যেতেন তখনকার বাংলার রাজারা। তারপর রুল ব্রিটানিয়ার দোর্দণ্ডপ্রতাপে, রাজশেখরের ভাষায়, “আন্ডার দি সুদিং ইনফ্লুয়েন্স অফ দি বিগ রড”, রাজারা ভ্যানিশ, রাজায় রাজায় যুদ্ধও ভ্যানিশ। ফলত বহু জায়গাতেই ডোমরা তাদের যুদ্ধবিদ্যা সম্পৃক্ততা থেকে সহজেই রত হল চুরি-ডাকাতি ইত্যাদি পেশায়। ডোমদের যেটা পোষাকি নাম, ‘রাজবংশী’ বা ‘বীরবংশী’, যার একটি মহাদেব কবিয়ালের গানে এর পরেই এসেছে, অন্যটিও এসেছে চলচ্চিত্রের অন্যত্র, তারও শিকড়টা তাই রাজা বা বীর, যা এদের সেই লুপ্ত হয়ে যাওয়া পেশাকেই চিহ্নিত করে।

==========অংশ ৫ শেষ===================

Filed under: ফিল্ম — dd @ 9:06 am

January 11, 2011

দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৪

[গুরুচণ্ডালী সাইটে এই লেখাটা প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু ওদের ইউনিকোড থেকে বাংলাপ্লেন কনভার্টারে সমস্যা থাকায় ফরম্যাটিং ঘেঁটে যাচ্ছে। তাই এখানে ওই প্রতিটা অংশ, যেমন যেমন গুরুচণ্ডালীতে প্রকাশ হচ্ছে, সঠিক ইউনিকোড অবয়বে আমি দিয়ে যাব। এটা তার চতুর্থ অংশ। এই ব্লগেরই পুরনো লেখায় পাবেন এর প্রথম, দ্বিতীয়, আর তৃতীয় অং।]

==========অংশ ৪ শুরু===================

61
00:07:29,900 –> 00:07:33,500
And that milkmaid, she too.

আউর ও ছোকরিয়া গাঁওকে — গোয়ালিন।

এখানেই প্রথম উল্লেখ আসছে ঠাকুরঝির। এবং এটা লক্ষণীয় যে সে আসছে ‘গোয়ালিনী’ এই উল্লেখে। গোটা শাস্ত্র লোককথা উপকথা রূপকথা মিলিয়ে রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক আলোচনার, ডিসকোর্সের যে অজস্র সরাসরি তির্যক এবং উপ্ত উল্লেখ বা চিহ্ন ‘কবি’ ফিল্মে আমরা পেতে যাচ্ছি, এটাই তার প্রথম। কবিয়াল নিতাই কয়লা বা কাজলের মত কাল, তার প্রেমিকা অন্য পুরুষের পত্নী এবং গোয়ালিনী, নিতাই তাকে ছেড়ে চলে যায় অন্য রমণীর কাছে, যাকে এই ফিল্মেই সরাসরি চন্দ্রাবলী বলে ডাকা হয়। রাধা-কৃষ্ণ কাহিনীর ছকটা এখানে কোনও মতেই এড়ানো যায় না। তার প্রথম সঙ্কেতটা আমরা পাচ্ছি বালিয়ার এই সংলাপে।

65
00:07:44,600 –> 00:07:47,200
My wife’s sister – ‘thakurjhi’?[17]

আরে ও তো হামারে জরুকে বহিন হ্যায় রে — ও ঠাকুরঝি?

ফিল্মের মূল ছয়টি নারী চরিত্রর ভিতর তিনটি হল ঠাকুরঝি, রাজার স্ত্রী, ঠাকুরঝির শাশুড়ি বা বৃন্দাবনের মা — এদের কারুরই ব্যক্তিনাম আমরা জানতে পারি না গোটা ফিল্ম জুড়েই, একবারও উল্লিখিত হয় না। এরা সকলেই সুব্যবস্থিত নারী, পরিবারকাঠামোর মধ্যে অবস্থিত। যে দুটি নারী চরিত্রের নাম আমরা জানতে পারি, বসন বা বসন্ত এবং নির্মলা — তারা দুজনেই ঝুমুর দলের শিল্পী মানে নর্তকী গায়িকা এবং বেশ্যা, এক কথায় পরিবারতন্ত্রের বাইরে। ছয় নম্বর চরিত্রটি আরও আকর্ষণীয়, গোটা ফিল্মে তারও নাম একবারও উল্লিখিত হয়নি, তিনি ঝুমুর দলের প্রধান, সবাই তাকে ডাকে ‘মাসি’ বলে। আবার একটা সম্পর্কের নাম, কিন্তু যা আর বংশলতিকা সূত্রে আহরিত নয়, কাজের সূত্রে পাতিয়ে তোলা একটা নকল আরামদায়ক পারিবারিকতার অংশ। এরকম পাতিয়ে তোলা আমরা ফিল্মেই একবার দেখব, নির্মলাকে যখন দিদি মানে বোন বলে ডাকবে নিতাই, সঙ্গে সঙ্গেই ভাইফোঁটার উল্লেখ নিয়ে আসবে মাসি, সম্পর্কের প্রত্যয়ীকরণের স্বার্থে। এই সম্পর্কের নাম দিয়ে ডাকা নারীরা সেই সময়ের সমাজে ক্ষমতার মানচিত্রে এবং পরিবারতন্ত্রে নারীর অবস্থানকে এক ভাবে চিহ্নিত করে। এই পরিপ্রেক্ষিতের সাপেক্ষে ঠাকুরঝির প্রেমের আবেগে ব্যক্তি অভিলাষের আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণকে আরও নাটকীয় লাগে। কিন্তু একটুও অবাস্তব হয়ে ওঠে না তার একটি ঘোষণাও। বাংলা ফিল্মে বোধহয় এখনও দুর্লভ এই বাস্তবতাবোধ যার মধ্যে আসীন অবস্থায় এই চরিত্রগুলিকে ‘কবি’ ফিল্মে আমরা পাই।

68
00:08:02,300 –> 00:08:09,200
(Mahadev kabial vocalizing)

মহাদেব কবিয়াল তানা নানা করছে, কবিগানের আসর শুরুর অপেক্ষায়, সম্মুখভূমিতে। এবং পশ্চাত্ভূমিতে একটা জরুরি জিনিস চিহ্নিত হয়ে চলেছে। জায়গা নিয়ে রয়েছে মহান্ত। তার দুই পাশে ফাঁকা জায়গা। জনসাধারণ বসে মাটিতে এবং উচ্চাসন রয়েছে মাত্র হাতে গোনা গুটি কয়েক। দৃশ্য চলছে। মহান্ত ঠাকুরের বাঁপাশে এসে বসলেন ইস্টিশনের স্টেশনমাস্টার। মহান্ত আর স্টেশনমাস্টার দুজনেই বসলেন। এবার এলেন তৃতীয় উপস্থিতি সেই বাঙালি বাবু, যাকে একটু আগে আমরা উল্লেখ থেকে বিরত ছিলাম, তাঁর হাতে কোঁচা ও ছড়িটিও আছে। তিনি সমাগত হওয়ায় মহান্ত উঠে দাঁড়ালেন, বাবু বসলেন মহান্তের ডানপাশে, মহান্ত আবার বসলেন। সেই দুজনকে দুপাশে নিয়ে যাদেরকে মহান্ত পাত্তা দেন, পাত্তা দিতে হয় যাহাদের। ব্রিটিশের রেলের স্টেশনমাস্টার এবং ব্রিটিশের মেকলেশিক্ষার বাবু। এবং ক্ষমতার এই তিন বিন্দুই চিহ্নিত হয় তখনকার চালু ঔপনিবেশিক পুঁজির বাজারের সাপেক্ষে। বাবু ও মহান্ত আসীন হওয়া মাত্র পর্দায় আমরা দেখি পাঁপড়ভাজা বিক্রির ঝুড়ি। “এই, ফুরিয়ে গেল।” দেখা যাক, তারাশঙ্কর এই বাবু-উপস্থিতিকে উপন্যাসে কী ভাবে লিখেছিলেন।

বাবুদলের মধ্যে একজন কলিকাতায় চাকরি করেন, ময়লা কাপড়-জামার গাদার মধ্যে তিনি ধোপদুরস্ত পাটকরা বস্ত্রের মতই শোভমান ছিলেন। চালটিও তাঁহার বেশ ভারিক্কী, তিনি খুব উঁচুদরের পায়াভারী পৃষ্ঠপোষকের মত করুণামিশ্রিত বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিলেন—বল কি, অ্যাঁ? নেতাইচরণের আমাদের এত গুণ! A poet! বাহবা, বাহবা রে নিতাই! তা লেগে যা রে বেটা, লেগে যা।

এ গেল অনুষ্ঠান শুরুর আগে। কবিয়াল যুদ্ধে মহাদেব কবিয়ালের সঙ্গে নিতাইয়ের জয়ের পর সেই জয়ঘোষণাও স্পষ্ট উচ্চারিত ভাবে এল ওই বাবুরই গলায়।

চাকুরে বাবুটি করুণামিশ্রিত প্রশংসার হাসি হাসিয়া বার বার বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিলেন—ইউ আর এ পোয়েট, অ্যাঁ! এ পোয়েট! ইউ আর এ পোয়েট! কথাটার অর্থ বুঝিতে না পারিয়া নিতাই বিনীত সপ্রশ্নভঙ্গীতে বাবুর দিকে চাহিয়া বলিল—আজ্ঞে? বাবু বলিলেন—তুই তো একজন কবি রে।

এবং ঔপনিবেশিক শিক্ষার যে বিকটতাটা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করি আমরা, শিক্ষাশ্রমিকরা, মাস্টারমশাইরা, সেটার একটা বিজ্ঞাপনও এখানে রয়ে গেল, সেটা খেয়াল করেছেন কি? বাবু নিতাইয়ের বোঝার স্বার্থে তার ভুল ইংরিজি বাক্যকে ঠিক অনুবাদ করে শোনালেন নিতাইকে। নিতাইকে যা বললেন সেটা ঠিক, নিতাই কবি, যা শুনে নিতাই বিমুগ্ধও হল। কিন্তু সেই ‘কবি’ শব্দের ইংরিজি তো ‘পোয়েট’ নয়। ‘কবি’ শব্দটা এখানে ‘কবিয়াল’ শব্দের সংক্ষেপ, ‘কবিগান’ ক্রিয়ার সঙ্গে যা সম্পৃক্ত। যা আধুনিক শহুরে বাংলার ‘কবি’ শব্দটায়, বা ইংরিজি ‘পোয়েট’ শব্দটায়, অন্তত তাদের চালু অর্থে কিছুতেই আসে না। ওই শব্দদুটি সংযুক্ত কবিতা বা পোয়েট্রির সঙ্গে, যা পড়া যায়, পাঠ করা যায়, এমনকি আবৃত্তিও করা যায়। কিন্তু, কবি বা পোয়েটকে একটা লড়াইয়ের ময়দানে, সংলাপের রূপারোপে, বিপক্ষের গানের বিপরীতে গান বেঁধে সেই গানে সুর দিয়ে বাজনা সহ গাইতে হয় না। সেই ক্রিয়াটার নামই কবিগান। সেই কবিতা আর আধুনিক শহুরে বাংলায় ‘কবি’ শব্দটা হল ইংরিজি ‘পোয়েট’ শব্দের বাংলা রূপ। তার মানে এখানে আদানপ্রদানটা ঘটছে তিনটে ভাষার মধ্যে, আধুনিক শহুরে বাংলা, পুরনো গ্রামীন বাংলা, এবং ইংরিজি। ইংরিজি শব্দের বাংলা রূপান্তরে ‘কবি’ শব্দটা চলে এল। একই শব্দ দুটো আলাদা ভাষায়, পুরনো গ্রামীন বাংলা এবং আধুনিক শহুরে বাংলা, দুটো আলাদা অর্থ হাজির করল। ‘পোয়েট’ বা তার অনুবাদে শহুরে বাংলায় ‘কবি’ এই শব্দে মূল অর্থটাই হারিয়ে গেল। লস্ট ইন ট্রান্সলেশনের এ এক অন্য জাতের উদাহরণ।

অথচ এই ইংরিজি শব্দে শিক্ষিত এবং ভাষায় অশিক্ষিত ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত বাবুটির হাত ধরেই আসছে নিতাইয়ের স্বীকৃতি। এবং তারাশঙ্করও তাদের জন্যেই লিখছেন যাদের মধ্যে কিছুতেই নিতাই পড়ে না। কারণ নিতাই তো ইংরিজি বর্ণমালাই জানে না। তারাশঙ্কর একাধিকবার ‘পোয়েট’ শব্দটাকে ইংরিজি বর্ণমালায় লিখছেন। বাংলা তো তারাই পড়ে যারা ইংরিজি জানে, মানে, জানে বলে ভাবে, আসলে বেশির ভাগ সময়ই জানে না। তারাশঙ্কর নিজেও তার পাঠককে আলাদা করে দিয়েছেন নিতাই থেকে, যেমন ওই বাবুটিও করেছিলেন। তিনি জানেন নিতাইরা কোনওদিনই ওই উপন্যাস পড়বে না। এটার মধ্যে কোনও নাটকীয়তাও নেই। এটা খুব জানা কথাও। এখানে একটা বড় পার্থক্য করে দেয় ফিল্ম মাধ্যমটা। সেই পার্থক্যের কথায় আমরা পরে আসছি। তার আগে এই জায়গাটা আর একবার খেয়াল করিয়ে দিই, এই দুই স্তরে দুবার নিতাইদের ত্যক্ত বহিষ্কৃত করে দেওয়ার শিক্ষা রাজনীতির প্রসঙ্গটা। এটাও নতুন কিছু নয়। মার্জিন অফ মার্জিনে আমরা আলোচনা করেছিলাম এরকম আর একটা দ্বিস্তর বর্জনের। বঙ্কিম তার কৃষ্ণচরিত্রে কৃষ্ণ তথা হিন্দু ঐতিহ্য বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বেশ কিছু জায়গায় নৈঃশব্দ্য দিয়েছিলেন। জাতিভেদ ইত্যাদি বিষয়কে আনেন নি তাঁর আলোচনায়, কারণ যে পশ্চিমী মনের পাঠকের জন্যে তিনি লিখছিলেন, তাঁর রুচিকর লাগতে নাও পারে ওই আলোচনা। এবার পার্থ চ্যাটার্জি যখন বঙ্কিমকে আনেন তাঁর সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের আলোচনায়, সেখানে তিনি বঙ্কিমের ওই নৈঃশব্দ্যকে চিহ্নিত করেন না। তার মানে জোড়া নৈঃশব্দ্য বুকে নিয়ে গড়ে ওঠে চালু সংস্কৃতিবিদ্যার কৃষ্ণ ডিসকোর্স, কৃষ্ণ বিষয়ক আলোচনা। এটাকে আমরা এনেছিলাম আমাদের এই যুক্তির সমর্থনে যে ঐতিহ্য আর আধুনিকতা কোনও আলাদা বর্গ আর নয়, তারা এ অন্যের বুকের মধ্যেই বসে আছে, ইতিমধ্যেই সদাসর্বদাই। যদি কেউ এই আলোচনাটা পড়তে আগ্রহী হন, তাহলে মার্জিন অফ মার্জিনের উল্লেখ তো আগেই করেছি, এছাড়া আমার বাংলা দুটো প্রবন্ধেও এটা পাবেন, ‘মার্জিন অফ মার্জিন: একটি অটেকনিকাল ভূমিকা’, বা ‘কলোনি যায়নি মরে আজো’। এই দুটো প্রবন্ধই পিডিএফ আকারে রাখা আছে আমার বাংলা প্রবন্ধের নেটপাতায় (http://ddts.randomink.org/bangla/index.html)। এই স্তরবিন্যস্ত নৈঃশব্দ্যকে কী ভাবে একটা ফিল্ম হিসাবে ‘কবি’ এড়িয়ে যেতে পারল, সেটার কথায় আসছি আমরা একটু পরেই।

সেই যে রেলের প্রসঙ্গ থেকে শরত্চন্দ্র আসতে শুরু করল, বারবার মাথায় এসেই যাচ্ছে এগুলো। এই বাবুর শরত্চন্দ্র সংস্করণটা মনে পড়ছে? এলএ পাশ করার পর ডেপুটি হওয়ার অপেক্ষারত নতুনদা? নতুনদা নামে যদি মনে নাও পড়ে, পাম্পশু থেকে নিশ্চয়ই পড়বে। এই বাবুটিরই নিকট কেউ হওয়ার সম্ভাবনা আছে নতুনদার। নভেম্বর বিপ্লবের বছরে শ্রীকান্ত ছাপা, তার বেশ কিছু বছর আগে ঘটেছিল নতুনদা উপাখ্যান, শ্রীকান্তর কিশোর বয়সে। ১৯০০ সালে শরত্চন্দ্রের বয়স ১৪, তার মানে ১৯০২ নাগাদ ধরে নিতে পারি নতুনদা মাঘের শীতে বরফশীতল নদীর জলে ডুব দিয়ে বসে কুকুরের হাত থেকে বেঁচেছিলেন, তখন যদি তার বয়স বাইশ-চব্বিশ ধরে নিই, তাহলে ১৯৩৮-এ তার বয়স প্রায় ষাট। তাহলে তারাশঙ্করের এই বাবুটির পিতা তিনি হতেই পারেন। এবং এই বংশধারা তো আবহমান ছিলই। শ্রীকান্তর বন্ধু ইন্দ্রর দাদা নতুনদা উপাখ্যান অন্তে একটি অনাবিল অপ্রতিরোধ্য ভাঁড়ে পর্যবসিত হয়েছিলেন, কিন্তু সে তো শরত্চন্দ্রের পোয়েটিক জাস্টিস, কাব্যিক ন্যায়বিচার, আদতে ঘটনাটা ছিল এই যে, যদি এমনকি ভাঁড় হয়েও থাকে, সেই ভাঁড়ই, সেইরকম ভাঁড়েরাই, ফিরে গিয়ে ডেপুটির চাকরি পাবে, ইন্দ্র জানিয়েছিল শ্রীকান্তকে। ডেপুটি মানে বোধহয় ডেপুটি-ম্যাজিস্ট্রেট, নিশ্চিত জানিনা। তার পরেই শরত্চন্দ্রের মন্তব্য ছিল, যতদূর মনে পড়ছে, অনেক বছর হয়ে গেল শ্রীকান্ত পড়েছি, যা সব সরকারি অফিসারদের ক্রিয়াকলাপ দেখছেন, তাতে তিনি নিশ্চিত হতে পারেন, যে নতুনদা নিশ্চয়ই ডেপুটি হয়েছিল। নতুনদা এমনকি নিজের শরীরকে ভুলে শরীরের পোষাককে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, সজ্জাকে নিয়ে, ‘কবি’ ফিল্মে দেখুন পুরো সময়টা জুড়ে কী আড়ষ্ট খাড়া হয়ে বসে থাকেন বাবুটি, তার ছড়ি পোষাক সজ্জা বসার ভঙ্গী সবকিছু দিয়েই তাকে তার চারপাশ থেকে নিজেকে পৃথক করতে হবে, হবেই। নিজেকে আলাদা বলে প্রমাণ করার এই দায়ভার নিয়ে অনেক আলোচনা আছে মার্জিন অফ মার্জিনে, বা ওই দুটো প্রবন্ধে যার উল্লেখ আগেই করলাম। এই আলাদা করার মধ্যে আছে তার নিজেকে চিনতে চাওয়া, নিজের পরিচিতি বা আইডেন্টিটিকে স্পষ্ট করা, কারণ প্রথম থেকেই এই ব্যক্তিত্বের জন্ম একটা নাকচকরণের প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে। এই বাবু সাহেব হতে চায়, যা সে পারে না, তার নিজের আয়নায় নিজের বিম্বই তাকে প্রমাণ করে দেয়, সে অসফল, তাই সে নিজের বিম্বর প্রতিই বিতৃষ্ণ। এখান থেকেই তৈরি হয় নিজের বাইরে নিজের থেকে পৃথক একটা বিম্ব নির্মাণের চেষ্টা। কিন্তু মজাটা এই যে, এই সমস্ত বিম্ব নির্মাণের ভাঁড়ামির পরও, এই বংশধারা কিন্তু প্রবাহিত হয়ে চলে। নতুনদা ডেপুটি হয়। ভাঁড়ের জন্য যথাযোগ্য ভাঁড়িনী খোঁজা হয়, তার মধ্যে ধর্ম জাত জ্যোতিষ লোকাচার থাকে, তার মধ্যে দিয়ে চলে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের সিলেক্টিভ ব্রিডিং, তৈরি হয় ছানাভাঁড়, সে আসে কবি দেখতে, এসে নিতাইকে পোয়েট বলে ডাকে।

দেবাশিসকে ‘কবি’ দেখাতে গিয়ে বলেছিলাম, ওই দৃশ্যে এসে, ওই দেখ তোর পূর্বপুরুষ। ওকে বংশলতিকাটা দেখিয়ে দিয়েছিলাম, ওই বাবুটির ছানা পরে কভেনান্টেড অফিসার হবে, তার ছানা হবে কর্পোরেট সেক্টর, তার ছানাদের কেউ কেউ যাবে আইটি-তে, দেবাশিস যেখানে কাজ করে। দেবাশিস মোটেই গায়ে লাগায়নি কথাটা, আমার ছেলে যেমন বলত তার ছোটবেলায়, মেয়েও বলে এখন, বাবা তুমি ভীষণ আজেবাজে কথা বলো, সেটা দেবাশিসও জানে। তখন ওর অভিজ্ঞতা থেকেই দেখিয়েছিলাম, ও ভারতের আইটি সেক্টরের সবচেয়ে নামকিন প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করে, সেখানের অভিজ্ঞতাই, একজন কম্পুটার সায়েন্স ইঞ্জিনিয়র হয়ে ওর কাজ হল সারাদিন বসে থাকা, আর একটা কল-সেন্টার চালানো। বিদেশ থেকে ফোন আসবে, তাকে জানিয়ে যেতে হবে হ্যাঁ, বিদেশে তৈরি বিদেশ থেকেই চালানো ওই সফটওয়ারগুলি ঠিকঠাকই চলছে। এবং সবচেয়ে রোমহর্ষক এবং বিপদসঙ্কুল (বাংলায় যাকে আমরা চ্যালেঞ্জিং বলি) কাজ হল মাঝে মাঝে কাজ করতে থাকা শেল-স্ক্রিপ্টের ডাম্প নেওয়া, এবং সেগুলি থেকে দেখে নেওয়া ফলাফল যেমন কাঙ্খিত তেমন আসছে কিনা। এবং এই ডাম্পটা ও ঠিকঠাক নিতে পারে বলেই নাকি ওর অনেক সহকর্মী ওর দিকে মুগ্ধ চোখে তাকায়। এই হল কম্পুটার শিক্ষা ও কম্পুটার এনজিনিয়ারিং এর ভারতীয় ক্ষেত্রের একটি উচ্চতম নমুনা। কল সেন্টারের সাইবারকুলি ও সাইবারমজুর হওয়ার জন্যে যা দরকার ওদের ইন্টারভিউয়ে ঠিক সেইসব প্রশ্নই করা হয়, যোগ বিয়োগ ঠিক পারে কিনা, ইংরিজিতে প্রশ্ন করলে বোঝে কিনা, ইত্যাদি। চাকুরিক্ষেত্রে উন্নতির জন্য সেখানে কোনও কম্পিউটার সম্পৃক্ততা নয়, প্রয়োজন পড়ে গলার জাঙ্গিয়া (কোনও অসভ্যতা করছি না, ওটা ইংরিজি টাইয়ের হিন্দুস্থানী ‘কন্ঠো কে লঙ্গোট’ শব্দবন্ধের বাংলা) ব্যবহারের নিখুঁত অভ্যাস। অর্থাত্‍, সেই ভাঁড়ামো সমানে চলিতেছে। এবং সিলেক্টিভ ব্রিডিং-ও। ওর জন্যে পাত্রী দেখে উচ্চঘর কন্যাপক্ষ থেকে আমি দুই পয়সা কামাতেও পারি, বড় দরকার আমার, দুই দশক হতে চলল আমার কোনও প্রোমোশন হয়নি। আইটি সেকটরের সাইবারকুলিগিরি সংক্রান্ত এই ভাঁড়ামোটা বেশ ভাল করে এসেছে আমার শেষ বইয়ে। কম্পুটার ও নেটওয়র্ক এসে যাওয়া মাত্র, পুঁজি পেল অনন্ত গতিশীলতা, শ্রম পেল অনড় স্থবিরতা, এবং বদলে গেল গোটা শ্রম-সম্পর্কের কাঠামোটাই, তার সাপেক্ষে ভারতের আইটি সেক্টরের এই কল সেন্টার চরিত্রকে নিয়ে আমার কাটাছেঁড়াটা নিয়ে কেউ যদি আগ্রহী হন, সেটা পাবেন ‘ফ্লস ও হেজেমনি’ বইয়ে (http://ddts.randomink.org/flossbook/index.html) এবং বিশেষ করে তার সপ্তম অধ্যায়ে। যাকগে, আবার মূল জায়গায় ফেরত যাওয়া যাক। আর বাজে বকা নিয়ে নালিশ করার কিছু নেই, আগেই বলেছি, আমি তৃতীয় প্রজন্মের মাস্টার।

93
00:09:56,800 –> 00:10:00,090
((Disapproval – Balohari Haribol[21]))
Silence, silence, order, order.[22]

সাবটাইটলের এসআরটি ফাইলের গোড়াতেই বলে দেওয়া ছিল, দুই ব্রাকেটের মধ্যে, (()), দেওয়া আছে পরিপ্রেক্ষিত সংক্রান্ত মন্তব্য, যেমন লোটনদাস কবিয়ালের না-আসার সংবাদে তৈরি হওয়া বিরক্তির রব “বলহরি হরিবোল”, যা আবার শবযাত্রার স্লোগানও বটে। তারাশঙ্করের ভাষায়, “অর্থাত্‍ মেলাটির শবযাত্রা ঘোষণা করিয়া দিল।” কিন্তু উপন্যাসে ছিল এই সংক্রান্ত আর একটা মজার উপাদান। ঝুমুর গানের আসরে, যে ঝুমুর হল কবিগানেরই আরও অনেক প্রাকৃত, ‘অশ্লীল’ একটি সংস্করণ, “হরিবোল” ছিল প্রশংসাও।

পয়সা-আনি-দুয়ানি-সিকি-আধুলিতে প্যালার থালাটা ততক্ষণে একেবারে ভরিয়া উঠিয়াছে, গোটা টাকাও পড়িয়াছে দুই-তিনটা। গান শেষ হইতেই শ্রোতারা হরিবোল দিয়া উঠিল—হরি হরি বল ভাই। বিচিত্র, ইহাই উহাদের সাধুবাদ!

ঝুমুরের মধ্যেই গোড়া থেকেই এই বিকৃতি বা সাবভারশনটা আছে। চালু সমাজ ডিসকোর্সের শোকবার্তাটা এখানে একটা সাধুবাদ। তারাশঙ্কর উপন্যাসে ঝুমুরের একটা আলগা সংজ্ঞা দিয়েছেন। এবং সেই বিবৃতির মধ্যেও থাকে লেখকের সেই বিষয়ী-সংস্থান যা ঝুমুর বলে জিনিসটাকে চেনে, কিন্তু কোনও মতেই তার অংশ নয়, তাকে সমর্থনও করে না।

বহু পূর্বকালে ঝুমুর অন্য জিনিস ছিল, কিন্তু এখন নিম্নশ্রেণীর বেশ্যা গায়িকা এবং কয়েকজন যন্ত্রী লইয়াই ঝুমুরের দল। আজ এখান, কাল সেখান করিয়া ঘুরিয়া বেড়ায়, গাছতলায় আস্তানা পাতে, কেহ বায়না না করিলেও সন্ধ্যার পর পথের ধারে নিজেরাই আসর পাতিয়া গান-বাজনা আরম্ভ করিয়া দেয়। মেয়েরা নাচে, গায়—অশ্লীল গান। ভনভনে মাছির মত এ রসের রসিকরা আসিয়া জমিয়া যায়।

অথচ, এই ঝুমুর দলের বেশ্যা বসনই, উপন্যাসের শিল্পের টানে, জীবনের ঘটনার মোচড়ের অভিজ্ঞতাতেই হয়ত, হয়ে দাঁড়ায় উপন্যাসের মূল একটি চরিত্র। শিল্প তার নিজের জোরেই, প্রতিটি ক্ষেত্রেই, শিল্পীকে অতিক্রম করে যায়। যাই হোক, চলে আসা যাক ফিল্মের এই জায়গার অন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটার বিষয়ে।

সাইলেন্স, সাইলেন্স। অর্ডার, অর্ডার।

উঠে দাঁড়িয়ে বলে ওঠার আগের মুহূর্তটি পর্যন্ত আড়ষ্ট ভাবে বসে ডানে বাঁয়ে কলের পুতুলের মত মাথা-নাড়ছিলেন। এবং যে যখন কথা বলছে তখন তার দিকে তাকাচ্ছিলেন। ওইটুকু দূরত্বে দৃষ্টিকোণ বদলাতে বোধহয় অতটা ঘাড় বেঁকানোর দরকার পড়ে না, শুধু চোখ নড়িয়েই দৃশ্যবস্তুর বদলকে ধরা যায়, কিন্তু তাহলে নাড়াচ্ছিলেন কেন? চারপাশটার সঙ্গে তার অনভ্যস্ততার দূরত্বটাকে প্রকট করতে? এবার বাবুটি উঠে দাঁড়ালেন এবং বিচারপতির হাতুড়ির মত করে, বোধহয়, হাতের ছড়িটিকে নাড়াতে নাড়াতে বললেন তার কথাটি। সেই কথাটি যা নিতাইরা বোঝে না। বোঝার দরকারও পড়ে না নিতাইদের। খুব প্রয়োজন পড়লে তারা জিগেশ করে নেন, এবং বাবুরা তখন ভুল অনুবাদ করে সেটা শুনিয়ে দেন। পুরো দৃশ্যটা জুড়ে, সেই মহাদেব কবিয়ালের তানানানা থেকে শুরু করে, বাবুটির ভাঁড়ামোকে দেবকী বসু পুরো একটা চিত্রগত গঠনে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর গোটা আচরণটাকে পর্যবসিত করেছেন কিছু ভঙ্গীতে, যা শ্রবণে এবং দৃষ্টিতে অনুভব করে নেওয়া যায়, তাতেই তার অর্থটা বোধগম্য হয়ে যায়, ভাষার যেখানে আর প্রয়োজন পড়ে না। মাথায় ভেবে দেখুন, বাবুটির গোটা ক্রিয়াটি কিছু ধ্বনি ও চিত্রে বোধযোগ্য, সেটা ভাষার অতীত, তিনি যে ভাষাতেই চেঁচান না কেন, ‘সাইলেন্স’ না বলে ‘সিঁলস’ বা ‘খামোশ’ বা ‘সিলেনজিও’ বলে চেঁচাতেন, ওই ভঙ্গীগুলো একই রেখে, তাহলেও গোটা বিষয়টা থাকত একই।

==========অংশ ৪ শেষ===================

Filed under: ফিল্ম — dd @ 10:15 am

December 20, 2010

দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ৩

[গুরুচণ্ডালী সাইটে এই লেখাটা প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু ওদের ইউনিকোড থেকে বাংলাপ্লেন কনভার্টারে সমস্যা থাকায় ফরম্যাটিং ঘেঁটে যাচ্ছে। তাই এখানে ওই প্রতিটা অংশ, যেমন যেমন গুরুচণ্ডালীতে প্রকাশ হচ্ছে, সঠিক ইউনিকোড অবয়বে আমি দিয়ে যাব। এটা তার তৃতীয় অংশ। এই ব্লগেরই পুরনো লেখায় পাবেন এর প্রথম অংশ আর দ্বিতীয় অংশ।]

==========অংশ ৩ শুরু===================

42
00:05:39,190 –> 00:05:49,590
_Let me be an ape, and write_
_Rama in gold on my ribs._ [12]

আহা, কপি যেন হতে পারি।/ যেন এ বুকের পাঁজরে,/ রামনামটি লেখা থাকে সোনার আখরে।

ব্রাহ্মণ বিপ্রপদ ঠাকুরের আক্রমণের বিপরীতে নিতাইয়ের এই উত্তরটির মধ্যে সেই টানাপোড়েন এবং স্ববিরোধটা নিহিত রয়েছে, এবং সেটা আগাগোড়াই থাকবে গোটা ‘কবি’ ফিল্মে, সব সময়ই খুঁজে বেড়ানো এবং কখনওই খুব স্পষ্ট করে নিজের জায়গাটা খুঁজে না পাওয়া। সে নিচু জাত, ডোম বলে নিগৃহীত যে জাতিব্যবস্থার হাতে, সেই তার কাছেই তাকে স্বীকৃতি নিতে হবে কবিয়াল হয়ে ওঠার। নিজের সামাজিক অর্থনৈতিক পেশাগত জায়গা থেকে যে বর্গ-সঙ্করতাটা অর্জন করে রাজা, কবিকে সেটা পেতে হয় নিজের শিল্পীসত্তার নির্ণয়ের প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে। যে ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থা তাকে নিচু জাত ডোম করে, সেই রামায়ণের আলোচনা বা ডিসকোর্সকে নির্ভর করেই তাকে কবিয়াল হয়ে উঠতে হয়। এই স্ববিরোধ অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠবে একটু বাদে, যখন কবিগানের আসরে তার ডোম জাতি তুলে নানা গালিগালাজের পর, নিতাইয়ের কাকা-মামা জাতভাইরা তাকে উঠে আসতে বলবে। নিতাই জানাবে যে তা সে পারে না, তাতে দেবী চণ্ডীর অপমান হবে। তখন জাতের অপমানের নিতাই তোয়াক্কা করছে না বলে তার জাতভাইরা তাকে পরিত্যাগ করবে। নিতাইয়ের ঘরের লোকেরা তাকে তখন এনে ছুঁড়ে দেবে তার বইগুলো। সেই বইয়ের সংগ্রহের মধ্যেও স্পষ্ট হয়ে উঠবে ওই স্ববিরোধ। আমরা সেই কথায় আসছি। এখানে ব্রাহ্মণ বিপ্রপদ ঠাকুরকে যে ছড়াটা বানিয়ে শোনায় নিতাই তাও রামায়ণ-নির্ভর, যে রামায়ণ ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থার একটা স্তম্ভ। নিতাইকে জাতিব্যবস্থার নিগ্রহের নিরাকরণ করতে হবে জাতিব্যবস্থার মধ্যে দিয়েই, তাকে মেনেই, তাকে অস্বীকার করে নয়। ঠাকুরঝি আর বসন, শুধু এই দুই মেরুই নয়, নিতাই আসলে নড়ে বেড়িয়েছে তার জাতিব্যবস্থার প্রত্যয়ীকৃত কবিয়াল পরিচিতি আর তার ডোম এই পরিচিতি এই দুইয়েরই ভিতর। তারাশঙ্কর তার উপন্যাসে নিতাইয়ের বিদ্যাসন্ধানের নিজস্ব রকমকে আলাদা করে দিয়েছিলেন। সেই বিবরণটার মধ্যে কলকাতা থেকে দূরে তখনকার বাংলার গ্রামাঞ্চলে শিক্ষা-সংস্কৃতির একটা আলগা ছবিও পাওয়া যায়, যা বোধহয় এখনও তেমন বদলায়নি।

এই দুই বত্সরে পুরস্কার হিসাবে কাপড়, জামা, গামছা, লণ্ঠন, ছাড়াও নিতাই পাইয়াছিল খানকয়েক বই—শিশুবোধ রামায়ণ, মহাভারতের কথা, জানোয়ারের গল্প। সেগুলি নিতাইয়ের কণ্ঠস্থ। নিতাই সুযোগ পাইলে আরও পড়িত, কিন্তু একমাত্র নিতাই ছাড়া পাঠশালায় আর দ্বিতীয় ছাত্র না থাকায় পাঠশালাটিই উঠিয়া গেল। অগত্যা নিতাই পাঠশালা ছাড়িতে বাধ্য হইল। ততদিনে তাহার বিদ্যানুরাগ আর এক পথে শাখা বিস্তার করিয়াছে। এ দেশে কবির গানের পাল্লার সে মস্ত ভক্ত হইয়া উঠিয়াছে। বাংলার সমগ্র অশিক্ষিত সম্প্রদায়ই কবিগানের ভক্ত। কিন্তু সে ভক্তি তাহাদের অশ্লীল রসিকতার প্রতি আসক্তি। নিতাইয়ের আসক্তি অন্যরূপ। পুরাণ-কাহিনী, কবিতার ছন্দমিল এবং উপস্থিত বুদ্ধির চমক-দেওয়া কৌতুকও তাহার ভাল লাগে।

এবং এখানে তারাশঙ্করের নিজের শিক্ষা-সংস্কৃতি ধারণাটাও খেয়াল করবেন। ‘অশ্লীল’ শব্দটার মধ্যে একটা বিচার ও মূল্যবোধ আছে। অর্থাত্‍ আত্মঅনুকারী বা সেল্ফরিকার্সিভ রকমে নিতাইয়ের টানাপোড়েনটা তারাশঙ্করের নিজেরও টানাপোড়েন — নিচুজাতের কবিয়াল হয়ে ওঠার গল্পটা হবে নিচুজাতের গল্প নাকি জাতে ওঠার গল্প। এই টানাপোড়েন থেকে মুক্ত ছিলেন না দেবকী বসুও। পরে, ঠাকুরঝির ঝাঁড়ফুকের দৃশ্যে অনেকটাই স্পষ্ট একটা অবস্থান নিচ্ছেন দেবকী বসু, এবং সেটাও উপন্যাস থেকে নড়ে গিয়ে, যে অবস্থানটা তারাশঙ্করের ওই নবজাগরণবাদী অবস্থানের সঙ্গে খুব মেলে, ‘অশ্লীল’ শব্দটায় যা উপস্থিত।

45
00:05:59,400 –> 00:06:03,100
A ‘doam’ by caste,[13]
And a porter in this station -
46
00:06:03,250 –> 00:06:08,900
He is kapi, k a p i, not a kabi.
Do you get it?

আরে, কবি নয় রে মূর্খ, কপি। কপি। ব্যাটা জাতে ডোম, তাতে আবার ইস্টিশনের কুলি। সে কি কখনও কবি হতে পারে? কপি। ক, -এ হসসি কার। মানে বুঝলি?

বিপ্রপদ ঠাকুরের সংলাপের এই নাটকটা দিয়েই ‘কবি’ উপন্যাস শুরু হয়েছিল। ‘কবি’ ফিল্মে সেটা এল ঠিক ৫ মিনিট ৫৯ সেকেন্ডে, মানে নামঘোষণা বা টাইটলের পর ২ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে চিত্রাংশ শুরুর ৩ মিনিট ২৯ সেকেন্ডের মাথায়। জাতিব্যবস্থার শরীরে এই আঘাতটার কথা আমরা ‌আগেই উল্লেখ করেছি। এবং আর এক বার আমরা দেখে নিই ‘কবি’ উপন্যাসের সেই প্রাথমিকতম প্যারাগ্রাফটা।

শুধু দস্তুরমত একটা বিস্ময়কর ঘটনাই নয়, রীতিমত এক সংঘটন। চোর ডাকাত বংশের ছেলে হঠাত্‍ কবি হইয়া গেল।

ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা উপাদান কি এখানে খেয়াল করতে পেরেছেন? যদি না পেরে থাকেন, তাহলে দেবাশিস হলে আপনি বকা তো খেতেনই, এমনকি আমার মুড ভাল থাকলে বলতাম, থাক শালা, কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক। তাতে অবশ্য হারগিস কর্ণপাত মানে কর্ণহাত করার ছেলেই নয় এসব। বলত, যা বলছ বলো তো। বিপ্রপদ ঠাকুরের সংলাপ আর উপন্যাসের প্রথম প্যারাগ্রাফটা পাশাপাশি আর এক বার পড়ে দেখুন তো। খুব চিত্তাকর্ষক উপাদানটা হল সেই হাইব্রিড স্পেস বা সঙ্কর ভূমি যাকে আমরা মার্জিন অফ মার্জিনে সিন্থেটিক স্পেস বা কৃত্রিম ভূমি বলে ডেকেছিলাম। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ব্রিটিশের কালো বুটের কাজলকালো ছায়ায় নির্মীয়মান ঔপনিবেশিক পুঁজির মরডান (অনেক লোকেই দেখেছি, কিছুতেই র-টা ড-এর পরে বলে না, শত ধরিয়ে দিলেও, একটু ডর লাগে বলে? সেরকম বানানই লিখলাম।) হতে থাকে ভারতরাষ্ট্রে যে ঐতিহ্যটা আমরা পাচ্ছি তা আর আধুনিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন বিশ্লিষ্ট কর্তিত কিছু নয়, তারা এ অন্যের মধ্যে প্রথম থেকেই বসে আছে, সম্রাট কণিষ্ক যার নাম দিয়েছিলেন অতিনির্ণয় বা ওভারডিটারমিনেশন। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার এই গোড়া থেকেই শোয়াশুয়িটা উপন্যাস ‘কবি’ ধরতে পারেনি, কিন্তু ফিল্ম ‘কবি’ পেরেছিল। উপন্যাস যেখানে শুধু বংশ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেই থেমে গেছিল, ফিল্মকে সেখানে ঠিক তার পাশাপাশি উল্লেখ করে দিতে হয় তার আধুনিকতার তকমা মানে চাকরির পদকেও। শুধু তার ডোম বংশ নয় কুলিগিরির চাকরিকে একই সঙ্গে জানিয়ে দিয়ে সেই একই নাটককে নতুন চেহারায় হাজির করে দেয় ‘কবি’ ফিল্ম। একটু পরে ঠিক এটাই দেখব আমরা কবিগানের আসরে। চণ্ডীর থানের মহান্ত আর স্টেশনমাস্টার তারা পাশাপাশি চেয়ারে আসীন থাকবেন। কর্তৃত্ব এবং ক্ষমতা আর ঐতিহ্য দিয়ে হচ্ছে না, তাকে আধুনিকতার আশ্রয় নিতেই হচ্ছে। তার পাশাপাশি আরও একজন থাকবেন। বর্গসঙ্করের কুলতালিকায় আমাদের বাঙালিদের আর একটা নিজস্ব সংযোজন। সে কথায় পরে আসছি।

57
00:07:03,500 –> 00:07:10,800
They all went to kabigan,
In Chandi-Mother’s fair.[16]

তুমহারে বহু, তুমহারে বেটোয়া, চণ্ডীমাই কি মেলোয়া পর গইলন হ্যায়, গানা সুননে লে।

এই সংলাপটা, এবং পরবর্তী বালিয়ার পরপর সংলাপগুলি সবই তির্যক ভাবে, সেই ভাষাগত বর্গসঙ্করতারই চিহ্ন। এটা একটা বাংলা ফিল্ম, অথচ তার দর্শক নিশ্চয়ই প্রস্তুত এই হিন্দি বাক্য কটির অর্থ অনুধাবনে। এবং ফিল্মেও একাধিকবার আমরা দেখব হিন্দি কথার উত্তরে বাঙালি মানুষ ঠিকভুল হিন্দি বাংলা মিশিয়ে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছে। মানে, এক কথায় হিন্দি যে আছে সেই অস্তিত্বটা চিহ্নিত হচ্ছে এই বাস্তবতায়, এবং ‘কবি’ ফিল্ম সেই বাস্তবতাটাকেই হাজির করে দিচ্ছে তার নিজের শরীরেই।

==========অংশ ৩ শেষ===================

Filed under: ফিল্ম — dd @ 11:16 am

December 14, 2010

দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ২

[গুরুচণ্ডালী সাইটে এই লেখাটা প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু ওদের ইউনিকোড থেকে বাংলাপ্লেন কনভার্টারে সমস্যা থাকায় ফরম্যাটিং ঘেঁটে যাচ্ছে। তাই এখানে ওই প্রতিটা অংশ, যেমন যেমন গুরুচণ্ডালীতে প্রকাশ হচ্ছে, সঠিক ইউনিকোড অবয়বে আমি দিয়ে যাব। এটা তার দ্বিতীয় অংশ। প্রথম অংশ প্রকাশিত হয়েছিল এই ব্লগেরই পুরনো লেখায়।]

==========অংশ ২ শুরু===================

11
00:03:00,030 –> 00:03:02,789
Beware, folks.
Train is coming.

ধরমপায়ে যাও ভাই, গাড়ি আওত হ্যায়।” আমি খুব নিশ্চিত নই, সাউন্ডট্র্যাকের সমস্যার কথা তো আগেই বলেছি, বাংলায় যে আন্দাজটা আমি অনেকটা করতে পারছি, অন্য ভাষায় সেটা হচ্ছে না। তবে আমি আমার হিন্দিভাষী সহকর্মীদেরও শুনিয়ে দেখেছি। তাদেরও বাক্যটা ওরকমই লাগছে। তবে বাক্যটা এখানে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়ও। কী বলতে চাইছে সেটা বোঝা যাচ্ছে খুব সহজেই। গুরুত্বপূর্ণ এখানে গোড়া থেকেই এই অবাংলাভাষী রেলকর্মীর অস্তিত্বটা উচ্চারিত হয়ে যাওয়া। উপন্যাস থেকে চিত্রনাট্যে খুব সচেতন বদলগুলোর এটা একটা। উপন্যাসে এই চরিত্রটাই নেই। এমনকি উপন্যাসের শেষে নিতাই যখন ফের ফিরে এল চণ্ডীতলা ইস্টিশনে, সেখানের লোকজন তাকে ঘিরে এল। এক সময় মিছে শিরোপার গল্পে যে সম্মান নিজেই নিজেকে দিতে চেয়েছিল, সেই সম্মান এল আপনা থেকেই। উপন্যাসে এটা উল্লেখিত আছে নিতাইয়ের নিজের কেনা মিছে শিরোপা, ফিল্মে সেটা আর বলা হয়নি, শুধু শিরোপাটাই দেখানো হয়েছে। এটাও একটা বদল, কিন্তু তেমন জরুরি কিছু নয়।

নিতাই দাঁড়াইয়া আছে। তাহার চারদিকে বিস্মিত একটি জনতা। নিতাই এমনটি প্রত্যাশা করে নাই। এত স্নেহ, এত সমাদর তাহার জন্য সঞ্চিত হইয়া আছে এখানে? রাজার মুখে পর্যন্ত কথা নাই। বেনে মামা, দেবেন, কেষ্ট দাস, রামলাল, কয়েকজন ভদ্রলোক পর্যন্ত তাহাকে ঘিরিয়া দাঁড়াইয়া আছে। সম্মুখে সেই কৃষ্ণচূড়ার গাছটি।

এখানে ‘কয়েকজন ভদ্রলোক পর্যন্ত’ শব্দবন্ধটা খেয়াল রাখুন। পরে আমরা এই প্রসঙ্গে ফিরে আসব। এবার খেয়াল করুন ইস্টিশনে সমাগত লোকের নামের তালিকাটা। সেখানে ‘বালিয়া’ নামটা তো নেইই, এমনকি খুব উচ্চারিত ভাবে অবাংলাভাষী কোনও নামই নেই। এর মধ্যে বেনেমামা চরিত্রটি ফিল্মে বেশ কয়েক বার এসেছে। কিন্তু ফিল্মে খুব উচ্চারিত যে বালিয়া, যার বাক্য আমরা উদ্ধৃত করলাম এই প্রসঙ্গটার শুরুতে, তার নাম না থাকার অর্থ এটাই। এই বালিয়া চরিত্রটি ফিল্মে একটি সচেতন সংযোজন। এবং বালিয়া চরিত্রটির গুরুত্ব ফিল্মে কতটা সে তো আমরা দেখতেই পাই। ঝুমুর দলের সঙ্গে বাইরে জেলায় জেলায় ঘুরতে যাওয়ার বাইরে চণ্ডীতলার জীবনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাতেই আমরা বালিয়াকে পাই ফিল্মে। বালিয়া ‘কবি’ ফিল্মে একটি ভোজপুরি লোকগীতিও গায়। অবাংলাভাষী শ্রমিকদের উপস্থিতি, যা খুব প্রবল ভাবে ঘটতে শুরু করে দুই মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে, তারই একটা প্রতীক বালিয়া। শুধু বালিয়াই নয়, বালিয়ার সংলাপে আমরা আরও অবাংলাভাষী চরিত্রের উল্লেখও পাই। এই জায়গাটাকে নিয়ে আমরা ফের কথা বলব, যখন রাজন, উপন্যাসে যার নাম রাজালাল বায়েন, ফিল্মে যাকে স্টেশনমাস্টার ছাড়া আর সবাই, নিতাইয়ের দেখাদেখি ‘রাজন’ বলে ডাকে, তার সূত্রে আমরা সঙ্কর পরিচিতি, হাইব্রিড আইডেন্টিটির আলোচনায় আসব।

21
00:03:48,790 –> 00:03:53,790
Son of a Bengali cobbler,
Went to war that long ago -
22

00:03:53,790 –> 00:03:58,990
- Still speaking millitary Hindi?
That too 90% mistakes![04]

ব্যাটা বাঙালি মুচির সন্তান — কবে গিয়েছিল লড়াইয়ে, এখনও মুখে মিলিটারি হিন্দি, তাও পনেরো আনা ভুল।

এটি বলেন স্টেশনমাস্টার, যাকে কোট ছেড়ে পিরান পরে আমরা কবিগানের আসরেও একটা কর্তৃত্বের ভূমিকা নিতে দেখব। হিন্দি এবং বাংলার প্রসঙ্গে ‘মুচি’ শব্দটাকে খেয়াল করতে ভুলবেন না। নিতাই এবং রাজা, সংস্কৃত সম্বোধনের নিয়মে যাকে ‘রাজন’ বলে ডাকে নিতাই, অত্যন্ত ভাল বন্ধু, এবং দুজনেই নিচু জাতের। নিতাই ডোম, এবং রাজন মুচি। সেই নিতাই কবিয়াল হয়ে উঠছে, যা গোটাটাই উঁচু জাতের এক্তিয়ারে, এই নাটকটাই হল ‘কবি’ ফিল্ম এবং উপন্যাসের একটা মূল চালিকাশক্তি। ‘কবি’ উপন্যাসের শুরুর প্যারাটাই হল:

শুধু দস্তুরমত একটা বিস্ময়কর ঘটনাই নয়, রীতিমত এক সংঘটন। চোর ডাকাত বংশের ছেলে হঠাত্‍ কবি হইয়া গেল।

এবং ‘কবি’ ফিল্মও তার দ্বিতীয় সংলাপেই, রাজন যেখানে ড্রাইভারকে তাড়া দিচ্ছে কবিগানের আসরের কথা তুলে, উল্লেখ করে নেয় এই কবিগানের কথা। কিন্তু এই প্রসঙ্গে আমরা পরে আসছি। তার আগে রাজনের প্রসঙ্গে কিছু বলে নিই। ‘আমার সাহিত্য-জীবন’ দ্বিতীয় খণ্ডে তারাশঙ্করের একটা ভাষ্য আছে এই রাজা চরিত্রটির মূল বাস্তব ঠিকানা নিয়ে। সেটা আগে একটু পড়ে নেওয়া যাক।

রাজার নাম রাজা মিয়া, সে জাতিতে মুসলমান এবং হিন্দীও সে বলেও না, যুদ্ধেও যায় নি, মেজাজেও মিলিটারি নয়—ওটুকু আমার চড়ানো পোষাক বা রঙ যাই হোক না কেন।

মুসলমান মূল চরিত্রের সঙ্গে হিন্দি এসে যাওয়াটা খুব একটা বিস্ময়কর লাগে না। এই গত মাসেও, পুজোর ঠিক আগে আগে, একদিন শেয়ারের ট্যাক্সিতে ফিরছিলাম। কী একটা কথায় বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের কথা ওঠে। এবং আমি তাদের বাঙালি বলে উল্লেখ করায় ড্রাইভারটি ভারি অবাক হয়ে আমায় জিগেশ করলেন, “বাঙালি কোথায়, ওরা তো মুসলমান।” এবং এ ভারী দীর্ঘস্থায়ী একটি পশ্চিম-বাঙালি ভুল। ‘শ্রীকান্ত’ প্রথম পর্ব প্রকাশিত হয় ১৯১৭-র ফেব্রুয়ারিতে, মানে যে সব বইটই পড়তে পড়তে তারাশঙ্করের লেখকজীবন শুরু হচ্ছে। তার প্রথম পাতায়, পঞ্চম প্যারাগ্রাফেই ছিল:

ইস্কুলের মাঠে বাঙালী ও মুসলমান ছাত্রদের ‘ফুটবল ম্যাচ’। সন্ধ্যা হয়-হয়। মগ্ন হইয়া দেখিতেছি। আনন্দের সীমা নাই।

মূল প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটা ছোট্ট জিনিস লক্ষ্য করিয়ে রাখা যাক। ওই ‘ফুটবল ম্যাচ’ শব্দবন্ধটা, শরত্চন্দ্র একক উদ্ধৃতিচিহ্নের মধ্যে দিয়েছেন। আজকের কোনও বাংলা লেখায় প্রবন্ধে পত্রিকায় উপন্যাসে যা আর হয় না, কারণ তখন ওই শব্দবন্ধ বাংলা বাচনে কেবল আসতে শুরু করেছিল। ঠিক অমনই একটা জিনিস একটু বাদে আমরা ঘটতে দেখব ‘মেডেল’ শব্দটাকে নিয়ে। যাই হোক, মূল জায়গা রাজা-য় ফেরা যাক। রাজা মিয়া মুসলমান, মুসলমান মানে না-বাঙালি, সেখান থেকে এক লপ্তে হিন্দিটা এসেই যেতে পারে, শিল্পী মনের একটা খেয়ালে। যদি সেটা এসেও থাকে, যুদ্ধটা এল কেন? এবং খেয়াল রাখুন যুদ্ধটা মেসোপটেমিয়া যুদ্ধ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশের মূল ফ্রন্ট। এবং যে যুদ্ধটায় কিছু অফিসার ছিল ব্রিটিশ, কিন্ত সেক্সপিয়ারের হেনরি ফোর নাটকের ফলস্টাফ কথিত সেই ‘কামানের খাদ্য’, ক্যানন ফডার, সরবরাহ করেছিল ভারতীয়রাই।

মেসোপটেমিয়া যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী

ছবিটায় দেখুন, মূল অফিসারটি সাহেব, সামনে সারি সারি নেটিভ সৈন্য, পাশের মধ্যপদস্থ কটিও কালা-চামড়া। ছবিটা পাওয়া মেসোপটেমিয়া যুদ্ধ (১৯১৪-১৮) নিয়ে একটি লেখায় (http://www.greatwardifferent.com/Great_War/Mesopotamia/Fall_of_Kut_01.htm)। ছবিটা দেখতে দেখতে আমার একটু রাগও হচ্ছিল। এর আগে ব্রিটেনের দ্বিতীয় আফগান যুদ্ধে (১৮৭৮-৮০) প্রাপ্ত একটি যেজাইল বুলেটক্ষত কত বিরাট একটা জায়গা করে নিল ইংরিজি সাহিত্যে, যদিও গোটা শার্লক হোমসের কাহিনীমালা জুড়ে ওয়াটসনের ওই বুলেটক্ষত বারবার জায়গা বদল করেছে, কখনও হাতে কখনও পায়ে। ইংরেজরা বোধহয় নিশ্চিত ছিল না ক্ষতটা তাদের ঠিক কোথায়। ভারতীয়দের জিগেশ করলেই জানতে পারত, কত নিশ্চিত মৃত্যু তারা সমর্পণ করে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যে, ভারতীয়রা সেটা নিশ্চিত ভাবে জানত।

মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি যুদ্ধের মত এই মেসোপটেমিয়া যুদ্ধেও একটা বিরাট সংখ্যক যুদ্ধশ্রমিকই, কুলি থেকে সৈনিক, ছিল মূলত ভারতীয়। রাজনকে তারই একজন কুলি বানালেন তারাশঙ্কর। কেন? মেসোপটেমিয়া যুদ্ধের, সামগ্রীক ভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধেরই, একটা বিরাট প্রভাব পড়েছিল ভারতীয় অর্থনীতিতে সমাজে সংস্কৃতিতে। তার একটা ছায়া আছেই। আর সবচেয়ে বড় কথা সমাজবদলের একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছিল। হোমি ভাভা উত্তরআধুনিক উত্তরঔপনিবেশিক সংস্কৃতিবিদ্যায় একটা কোমের বা কমিউনিটির নিজের পরিচিতিবোধ বা আইডেন্টিটি নিয়ে খুব মনোজ্ঞ আলোচনা করেছিলেন। আমাদের মার্জিন অফ মার্জিন বইয়ে (http://ddts.randomink.org/english/mom-book/index.html) তার অনেক আলোচনা করেছি আমরা, তার সূত্রে রাজনৈতিক অর্থনীতির নানা জায়গাকে ধরার চেষ্টাও করেছি। এই লেখাটা কোনও মতেই তার সঠিক ক্ষেত্র নয়। কিন্তু মোদ্দা বিষয়টা এই যে, বাঙালি আপনা থেকে বাঙালি হয়ে ওঠে না, নিজেকে বাঙালি বলে চেনে না। লাজবাব ওটা লিখেছিলেন বিবেকানন্দ, গোরার বুটের লাথিতে আমরা সব এক আনা দুই আনা তিন পাইয়ের বিভিন্ন আর্যমাত্রার ভিন্নতা ছেড়ে এক লাথিভিত্তিক মহান ঐক্যে প্রোথিত হলাম — একই পরিচিতি — কালা চামড়া। মানে, তৈরি হল ভারত ও ভারতীয় এই পরিচিতি। ওই যুদ্ধগুলো যেমন, যুদ্ধেই তো লাথিগুলো সবচেয়ে উচ্চারিত হয়ে ওঠে, অ্যাকাডেমিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনাসভায় যে লাথিগুলো গোপন থাকে। ব্রিটিশ বুটের চামড়াও কালো হত, তখনও বিচিত্রবর্ণ মার্কিন স্নিকার চালু হয়নি। সেই কালো চামড়া ভারতরাষ্ট্রের সূচনা হওয়া মাত্রই তা খুলে দিল আরও নানা পরিচিতির দিকনির্দেশ, ভারতীয় বলেই তো সব এক নয়, সেখানে বিহারী আছে পাঞ্জাবি আছে গুজরাতি আছে। বিহারী পাঞ্জাবি গুজরাতিদের সম্মুখীনতায় এসে বাঙালি নিজেকে বাঙালি বলে চিনল জানল। মনে পড়ছে, ‘আরণ্যক’-, ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলে, সত্যচরণকে দেখে, বাঙালি বলে চিনতে না পেরে, অন্য বাঙালিরা তাকে ‘আমব্রেলু’ মানে ‘ছাতু’ বলে ডেকেছিল? নিজের পরিচিতিকে নিজের বাইরে গিয়ে দেখতে পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল সত্যচরণ, লবটুলিয়া বইহারের জঙ্গলকে ন্যাড়া করে দিতে দিতে। এইখানটায় একটা ব্যাপক ভাঙচুর আছে বিভূতিতে। লবজাগরলের বাঙালি যেমন, ‘নৌকাডুবি’-র রমেশকে ধরুন, বা ‘চরিত্রহীন’-এর সতীশ, যতবার পশ্চিমে যায়, শুধু বাঙলাভাষীদের সঙ্গে, বাঙলা ভাষাতেই কথা বলে। ‘শেষ প্রশ্ন’ ভাবুন, গোটাটা ঘটতে শুরু করছে আগ্রায়, কিন্তু আগ্রার জীবন ভাষা সমাজ কিছুই নেই। শরত্চন্দ্রের উপন্যাসের পর উপন্যাসে এরকমই চলে। পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন ‘পথের দাবী’ উপন্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে। সেখানে রেঙ্গুন বার্মা দক্ষিন এশিয়া অনেকটাই এসেছে, এসেছে ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসেও। অথচ বাঙালি ব্যতিরেকে অবশিষ্ট ভারত আসেনি কোথাও। আজকের মার্কিনকে যেমন রসিকতায় বলা হয়, তার কাছে রেস্ট অফ দি ওয়ার্ল্ড, অবশিষ্ট ভুবন, পৌঁছয়ই না মোটে তার কাছে, সে জানেই না ওরকম কিছু যে আছে কোথাও, বাঙালির কাছেও বোধহয় পৌঁছত না অবশিষ্ট ভারত।

এবার এর নিরিখে ‘কবি’ ভাবুন। প্রথমেই তো একটা কেলেঙ্কারি দিয়ে শুরু হচ্ছে। এক ব্যাটা ডোম, সে হল নায়ক, আর তার নিকটতম বন্ধু তথা মূল চরিত্র একটা মুচি। সেটা আবার যুদ্ধের কুলি ছিল। একই বাঙলার মধ্যে অন্য অন্য নানা বাঙলা জেগে উঠছে। শুধু বাঙলাই না, জেগে উঠছে ভারতও। একটা কোমের পরিচিতিবোধ বা আইডেন্টিটি তৈরি একটা মিশ্র সঙ্কর হাইব্রিড সাংস্কৃতিক ভূমিতে। ওই বোধটা তৈরি হয় দুটো পরিচিতি বা আইডেন্টিটির সংলাপে পারস্পরিকতায়, দুটো বর্গের মাধ্যমিক ভূমিতে, ইন্টারস্টিসে। দুটো মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ের জ্যান্ত ইতিহাসে এই ভূমিটা তৈরি হচ্ছিল, এবার তাকে ফিল্মে জায়গা করে দিল ‘কবি’। এবং দেখুন, উপন্যাস ও ফিল্মের মধ্যবর্তী দশকটায় এই পরিবর্তমান অর্থনীতির চাপটা আরও ঘনীভূত হচ্ছিল, তার প্রতিনিধি হয়ে যোগ হল সম্পূর্ণ নতুন একটি চরিত্র, বালিয়া। যে শুধু এলই না, একটা ভোজপুরী গানও গাইল, ফিল্মের প্রথম সংলাপটিও বলল। রাজন বালিয়া ইত্যাদিরা মিলে রেলপথ ও রেল ইস্টিশনকে কেন্দ্র করে রচনা করল বিভিন্ন পরিচিতিগুলির একটি সঙ্কর ভূমি। যে সঙ্কর ভূমিতে এবার রচিত হল ‘কবি’ ফিল্মের প্রেক্ষাপট। রেল এই গোটাটার আধারভূমি হয়ে ওঠাটা সেই দিক দিয়ে ভারি সঙ্গত। রেল অবশ্যই একটি প্রথমতম মাতৃক্রোড় এই সঙ্কর পরিচিতির ভূমিতে ভারতের রাষ্ট্রীয় সত্তার জন্মে ওঠার। বাঙালি বিহারী গুজরাতি সবাই যেখানে এক, রেল কর্মচারী। শুধু এই নয়, আরও নানা ভিন্ন ধরনের সঙ্কর ভূমিকে চিহ্নিত করে দেয় ‘কবি’ ফিল্ম, শিল্পের অর্থ নির্মাণের আরও কিছু বৈশিষ্টকেও নির্দিষ্ট করে দেয়, আমরা দেখতে পাব একটু পরেই। এবং রাজা সেই অর্থে একাধিক ধরনের বর্গ-সঙ্করতার আকর, যেগুলি গজিয়ে উঠছে তার ‘মুচি’ নামক প্রদত্ত আবহমান কৌম পরিচয়ের চারপাশে — সে হিন্দি বলে, সে যুদ্ধফেরত কুলি, এবং সে রেলের পয়েন্টসম্যান। এবং এই নানা ধরনের বর্গ-সঙ্করতা তাকে সামাজিক ক্রিয়ার চিরাচরিত অর্থগুলির বাইরে এসে তাকানোর সামর্থও দিয়েছিল, যা শুদ্ধ বর্গীয় অবস্থান থেকে সম্ভব ছিল না। ঠাকুরঝি ও নিতাইয়ের সম্পর্ক নয় শুধু, আরও বহু জায়গাতেই সে প্রদত্ত ছক থেকে বাইরে এসে তাকাতে পারত, আমরা ক্রমে দেখতে পাব। যে প্রশ্নটা সে পরে করবে নিতাইকে, “পেয়ারমে জাত কেয়া হ্যায়”, সেটা শুধু যে সেই নতুন অর্থকেই দেখাচ্ছে তাই নয়, প্রশ্নের গঠনটাকে ভাবুন, ‘জাত’ নামক শব্দের শব্দার্থগত অস্তিত্বের জায়গা থেকে সে প্রশ্ন করছে। শুধু বর্গটাকে অস্বীকার করা বা না মানার প্রশ্ন নয়, বর্গটাকেই সে আর খুঁজে পাচ্ছে না, সেটা তার কাছে ইতিমধ্যেই ‘কেয়া হ্যায়’ হয়ে গেছে।

==========অংশ ২ শেষ===================

Filed under: ফিল্ম — dd @ 7:59 am

November 28, 2010

Mirror Printing: A Unicode DTP Problem in FLOSS

Let me first state the problem that was nagging us for around four years or so. I was first aware of the problem when in 2005 my Bangla book on GNU-Linux was getting published. All the chapters were in PDF, with page setup and graphics and layout complete. And now to proceed into Offset printing the next step was to take ‘tracing’, as they call it, that is, mirror print of the pages on tracing paper. From these tracing-s, the blocks or something are created, which are then used in printing.

This is an apparently small problem, but, in OOo, it is not possible, at least within my knowledge, to take a mirror print. Manoj De, the publisher of the book, came up with the solution. He had a postscript printer, and so, the printer on its own gave us mirror prints of the pages.

Some time after that, Arnab Sengupta and Dibakar Sarkar, when they took some texts from me in soft copy, written in Unicode Bangla, the usual thing in any FLOSS distribution, to publish them in their little magazine ‘Akshar-Jatra’, and reported me the same problem, in a more difficult version. The added difficulty came from this that in Calcutta (or, in the decolonized version, Kolkata) printing industry has some particular custom, that is fitting with economy of printing. They set two pages side by side on some page, usually A4 sized, and then the blocks are created fitting with this A4 sized physical pages. So, two logical pages are kept side by side on one physical A4 sized page. This leads to optimum use of paper, the major component of cost in printing industry. This problem was not there in my Bangla book on GNU-Linux, because, for writing them, from the very start, for the sake getting space for elaborate diagrams, or things like that, I used A4 sized page layout. And so, each A4 size physical piece of paper was holding only one logical page, and this made the whole thing easier.

Now, to do this positing of two logical pages on one physical page, they use some page-layout software like Pagemaker. The problem is here, that for any word-processor like OOo-Writer or MS-Word or something, a page means a physical page and a logical page both together. So, even if someone makes columns appropriately to look like two logical pages side by side on the same A4 sized page layout, the word-processor would still consider these two together as one page, and number them accordingly. But, page-layout packages like Pagemaker can do this. They take the whole text as a flow, and go on dividing them into page-units, indifferent to the size of physical piece of paper, and number them accordingly.

In FLOSS, or, Free-Libré-Opensource-Software, the page layout package is Scribus. But, the problem with Scribus is that, it cannot handle Indic complex text layouts, and so, all the vowel marks and all get mangled when the Unicode Bangla text is imported into Scribus. So, now their added difficulty was bringing two logical pages into one physical page, as we elaborated above, to the original problem of taking mirror prints. Let us number these two problems:

1. Mirror print

2. Logical layout

Over the last three years or so, I had repeated conversations with my younger (and hence brighter) friends in FLOSS, about these two problems, and engaged in many hours of search on the Net about some solution. But nothing came up.

And another problem got added about this doing DTP on FLOSS, that was page number in Indic. In Hindi books, a lot of which are printed in Unicode Hindi, this problem is not there. The usual custom for a lot of books in Hindi is using page numbers in Roman. And so, the third problem was adding page numbers in Bangla, which we never could do, however hard we tried it in OOo. And we did not try things like Abiword or Kword as a word-processor because, we were so used to OOo, and everything about Bangla text can be done so easily with that. So, we list here another problem.

3. Page numbering in Bangla.

The package pdfjam, and a component of it, pdfnup solved the problem of bringing two logical pages into one physical page. But, problem 1, printing in mirror, and problem 3, page number in Bangla, remained. In fact, solving the problem 2 actually made problem 1 harder. Because till now, Arnab was importing page by page into some graphics package as a picture, and then flipping them horizontally. And this could not be done any more.

When we are making two pages side by side, and importing them into graphics software, the mirror flipping is being done with a pair and hence the order of the pages is changing. The order 1, 2, 3, 4, 5, 6 is becoming 2, 1, 4, 3, 6, 5. And so, this did not work. We tried hard. We tried with transferring the whole page into graphics, and flipping that with Inkscape or Gimp or something. But none of them worked.

And at last, at late night, two days back, I came up with a solution, that solves both 1 and 2, though 3 remains, and Arnab or Dibakar are inserting them manually. I have a feeling that somewhere I have heard that 3 can be done in OOo, but none of us could find it out in help documents on OOo.

For this solution we are going to use OOo in the first place in creating the documents, and then applying pdfjam and ‘convert’ on that document. ‘Convert’ is a binary that is a part of the package ImageMagick.

Let me elaborate the process step by step, if it helps anybody doing it.

Step 1. Ensuring if the packages are available in the system.
OOo and ImageMagick and pdfjam were all available in Fedora repository, and I just installed them with yum. OOo is an omnipresent package in GNU-Linux distributions these days, so it is no problem. One will need to install ImageMagick and pdfjam on the system. ‘Pdfjam’ is small in itself but it uses ‘pdflatex’ in its backend, and so, this becomes a bit heavy an installation. ‘ImageMagick’ is also usually a regular part of a GNU-Linux distro.

Step 2. Creating and formatting the pages in OOo.
You will need to measure the physical sizes of a page, as it will happen in the book and provide this to OOo Format–>Page… window. Lke in our case, where we measured a similar book page with a scale and provided the measurements:

Paper format: User
Width: 14 cm.
Height: 21 cm.
Left, Right, Top, Bottom: 1.5 cm. each

Then we went to Header and Footer flap and set the measurements there.

Header: On
Header Spacing and Height: 0.3 cm. each
Footer: On
Footer Spacing and Height: 0.3 cm. each

So, now we got each page measuring 14×21cm. We now use the File –> Export to PDF… dialog to export this into a PDF, say test.pdf.

Step 3. Using ‘convert’ to transform the pages into images.
We issue the command ‘convert test.pdf test.jpg’ to do this. In this case it was an eleven page document. And so, we get eleven JPG images of the individual pages.

[dd@mamdo x]$ ls
test.pdf
[dd@mamdo x]$ convert test.pdf test.jpg
[dd@mamdo x]$ ls
test-0.jpg   test-11.jpg  test-2.jpg  test-4.jpg  test-6.jpg  test-8.jpg  test.pdf
test-10.jpg  test-1.jpg   test-3.jpg  test-5.jpg  test-7.jpg  test-9.jpg

Now, we have to rename the images. ‘Convert’ names them from 0 to 11, but it will create problems later. Because it does not use two digits for the images from 0 to 9, this disturbs the order. As we can see in the list, images 1 to 9 are listed after images 10 and 11. But to renumber them, first we have to get rid of the ‘test-’ part before the number. And so, we do the usual bash thing to do this.

[dd@mamdo x]$ for i in *.jpg ; do mv $i ${i##test-}; done
[dd@mamdo x]$ ls
0.jpg  10.jpg  11.jpg  1.jpg  2.jpg  3.jpg  4.jpg  5.jpg  6.jpg  7.jpg  8.jpg  9.jpg  test.pdf

So, now they are all just named in numbers, followed by the JPG suffix. Because they are numbered this way, with a wrong order among them, later, when we recompose them into a PDF, they will have a wrong order. So, to correct the order we have to add a 0 before all the single digit numbers. This we do with bash.

[dd@mamdo x]$ for i in ?.jpg ; do mv $i 0$i ; done
[dd@mamdo x]$ ls
00.jpg  01.jpg  02.jpg  03.jpg  04.jpg  05.jpg  06.jpg  07.jpg  08.jpg  09.jpg  10.jpg  11.jpg  test.pdf

Now, see, the order is restored among the files. They are listed in the regular number system way. This step is complete. Our PDF is now a series of page-pictures numbered properly.

Step 4. Getting the mirror images of the page-pictures.
For this we use ‘convert’ again. We employ bash again to pick every page-image individually and convert them into mirror image. ‘Convert’ does this with the ‘-flop’ option. ‘Convert’ can also flip vertically, for that we use ‘-flip’ option. Here we don’t need that. Read ‘man convert’ for all the details. Now we tell bash to convert the images and name the mirror images with a ‘mirror-’ prefix added to their name.

[dd@mamdo x]$ for i in *.jpg ; do convert -flop $i mirror-$i ; done
[dd@mamdo x]$ ls
00.jpg  03.jpg  06.jpg  09.jpg  mirror-00.jpg  mirror-03.jpg  mirror-06.jpg  mirror-09.jpg  test.pdf
01.jpg  04.jpg  07.jpg  10.jpg  mirror-01.jpg  mirror-04.jpg  mirror-07.jpg  mirror-10.jpg
02.jpg  05.jpg  08.jpg  11.jpg  mirror-02.jpg  mirror-05.jpg  mirror-08.jpg  mirror-11.jpg

As we can see in the list, eleven mirror-images are there, created from the eleven page images. So, this step is complete. Now we get back our PDF from the mirror-images.

Step 5. Recomposing the page-images into a PDF
To do this we use ‘convert’ and bash shell. And we needed the naming order among the files for this step. If the order is not proper among the names of the files, then pages in the PDF will have a wrong order.

[dd@mamdo x]$ convert mirror-*.jpg mirror-test.pdf
[dd@mamdo x]$ ls
00.jpg  03.jpg  06.jpg  09.jpg  mirror-00.jpg  mirror-03.jpg  mirror-06.jpg  mirror-09.jpg  mirror-test.pdf
01.jpg  04.jpg  07.jpg  10.jpg  mirror-01.jpg  mirror-04.jpg  mirror-07.jpg  mirror-10.jpg  test.pdf
02.jpg  05.jpg  08.jpg  11.jpg  mirror-02.jpg  mirror-05.jpg  mirror-08.jpg  mirror-11.jpg

All the mirror images had the ‘mirror-’ prefix added to them, and now used all the files with ‘mirror-’ prefix to create a new PDF with a ‘mirror-’ prefix. The difference between the original test.pdf and mirror-test.pdf is that, here all the pages will be in their respective mirror images.

Step 6. Bringing two logical pages into a single page.
Here we come to the final step. We use ‘pdfnup’ here, which is a part of the ‘pdfjam’ package to do this. But, first let us get rid of all the images in the directory, we don’t need them any more.

[dd@mamdo x]$ rm *jpg
[dd@mamdo x]$ ls
mirror-test.pdf  test.pdf
[dd@mamdo x]$

So, we are now left with just the two PDF files. So we run ‘pdfnup’ now. We use some options with ‘pdfnup’. They are quite easy to understand. Read ‘pdfnup –help’ for farther clarifications and other options.

[dd@mamdo x]$ pdfnup –nup 2×1 –frame false –paper a4paper –landscape mirror-test.pdf
—-
pdfjam: This is pdfjam version 2.07.
pdfjam: Reading any site-wide or user-specific defaults…
(none found)
pdfjam: Effective call for this run of pdfjam:
/usr/bin/pdfjam –suffix nup –nup ‘2×1′ –landscape –nup ‘2×1′ –frame ‘false’ –paper a4paper –landscape — mirror-test.pdf -
pdfjam: Calling pdflatex…
pdfjam: Finished.  Output was to ‘/home/dd/Desktop/mirror/x/mirror-test-nup.pdf’.
[dd@mamdo x]$ ls
mirror-test-nup.pdf  mirror-test.pdf  test.pdf

The lines displayed by ‘pdfnup’ shows ‘pdflatex’ working in the background. So, now, the file that was created by ‘pdfnup’ and named as ‘mirror-test-nup.pdf’ is finally there that contains all the mirror images of the individual pages, in proper order, and two pages ready to be printed in a single physical piece of paper. Now check this new PDF with any reader like ‘evince’ or ‘xpdf’ to ensure that it’s page number is half of the original. In this case it was six, while there were eleven pages in test.pdf.

So, our problems 1 and 2 are solved. But, still Arnab or Dibakar or I have to insert the Bangla page numbers manually. I call for help here from everyone concerned.

Filed under: গ্নু-লিনাক্স — dd @ 8:50 am

November 25, 2010

দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — পাঠ ১

[এই ব্লগে আগের লেখাতেই আছে, গুরুচণ্ডালী সাইটে এই লেখাটা প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু ওদের ইউনিকোড থেকে বাংলাপ্লেন কনভার্টারে সমস্যা থাকায় (যা নিয়ে আগের লেখাটার মন্তব্যে উল্লেখ আছে) ফরম্যাটিং ঘেঁটে যাচ্ছে। এবং কোনও কোনও জায়গায় লেখাটা পড়ার পক্ষে সেটা অত্যন্ত জরুরি। যেমন উদ্ধৃতিগুলোর ব্লককোট। আর ওই কনভার্টারের গন্ডগোলে অনেক যুক্তাক্ষরও ভেঙে যাচ্ছে, কিছু অক্ষর উড়ে যাচ্ছে, দু-একটা অক্ষর বদলেও যাচ্ছে। তাই এখানে ওই প্রতিটা অংশ, যেমন যেমন গুরুচণ্ডালীতে প্রকাশ হচ্ছে, সঠিক ইউনিকোড অবয়বে আমি দিয়ে যাব। এটা তার প্রথম অংশ]

==========অংশ ১ শুরু===================

দেবকী বসুর ‘কবি’, ১৯৪৯ — একটি অটেকনিকাল পাঠ

দেবকী বসুর ‘কবি’ ফিল্মটার একটা সাবটাইটল বানালাম, এই ২০১০-এর পুজোর আগে পরে, ছুটির দিনগুলোয়, দিনে পনেরো ষোল ঘন্টা করে পরিশ্রম করে। আমার এক পুরনো ছাত্র জিগেশ করল, এত পরিশ্রম করলাম কেন? কী আছে সিনেমাটায়? সিনেমায় তো সিনেমাই থাকে, কিন্তু তা থেকে কী পাই, এটাই বোধহয় প্রশ্ন। ‘কবি’ থেকে আমি বহুকিছু পাই। যতবার দেখি, ততবারই পাই। ‘কবি’ উপন্যাস থেকেও পাই, কিন্তু ‘কবি’ ফিল্ম থেকে পাওয়াটা শুধু উপন্যাসনির্ভর পাওয়াটা নয়। তার চেয়েও বেশি কিছু কিনা নিশ্চিত নই, কিন্তু অন্যরকম তো বটেই। এবং বোধহয় কোনও কোনও জায়গায় ‘কবি’ ফিল্ম ‘কবি’ উপন্যাসকেও পেরিয়ে গেছে।

কবি আমি প্রথম পড়ি ক্লাস সিক্সে বা সেভেনে। হিন্দুস্কুলে পড়তাম আর মধ্যমগ্রামে বাড়ি, বাড়ির লোকেরা রমেশদা বলে একজনের সঙ্গে আমায় ফিরতে বলত। রমেশদা কাজ করত এস কে লাহিড়ি বলে একটা বইয়ের দোকানে। প্রেসিডেন্সির উল্টোদিকের ফুটে। ‘কবি’ উপন্যাসটা পড়েছিলাম ওখানে বসে। আরও অনেক বই আমি প্রথমবার পড়ি ওই এস কে লাহিড়িতে বসেই, ‘রামতনু লাহিড়ি ও তত্কালীন বঙ্গসমাজ’, বা ‘আরণ্যক’। দোকানে বসে বই পড়াটা, এখন আর কলকাতায় তেমন দেখি না, বিদেশে নাকি হয়, বা আমাদের বোম্বাই টোম্বাইয়ে। কিন্তু তখন কলকাতায় এটা বেশ চলত। শুধু রমেশদার সূত্রে ওই এস কে লাহিড়ি দোকানটাতেই নয়, আমাদের স্কুলের নিচু ক্লাসের ছেলেদের আক্রমণ বেজায় সহ্য করতে হত কলেজ স্ট্রিটের দাশগুপ্ত দোকানটাকেও। এটা সত্তরের দশকের একদম গোড়ার কথা বলছি। মানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংলাপে যে সময়টাকে বারবার ‘সত্তর থেকে সাতাত্তর’ বলে উল্লেখ করা হয়। দাশগুপ্তর ওই ভদ্রলোককে সেদিনও দেখলাম, হঠাত্‍ করে এক বন্ধুর সঙ্গে একটা বই কিনতে গিয়ে। খুব ইচ্ছে করল একটু কথা বলি, তারপর সঙ্কোচ হল। ওনার কাছে তো আমি ছিলাম অনেক বাচ্চার একজন, আমাকে আর মনে করতে পারবেন না। খুব বয়স্ক হয়ে গেছেন, কিন্তু টাক ছিল ওঁর সেই তরুণ বয়সেও, এবং মোটা কাঁচের চশমা, ভারি সুন্দর লাগত মুখটা সেই ক্লাস সিক্স সেভেন এইট বয়সে। হয়তো আরও ওই স্নেহপ্রবণতার কারণেই ভাল লাগত। একই সঙ্গে তিন জন চার জন ছেলে আমরা নাক ডুবিয়ে বই পড়ে যাচ্ছি কমিকস থেকে উপন্যাস, এরকম প্রায়ই ঘটত। বিশেষ করে কমিকস, ইংরিজি কমিকস কেনা তখন আমাদের মত নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে অচিন্তনীয় ছিল।

এস কে লাহিড়িতে বসে ‘কবি’ উপন্যাসটা পড়ার মুহূর্তটা আমার আজও মনে আছে। উঁচু টুলে বসে পড়ে যাচ্ছি, ডানদিকে কাউন্টারে কাত হয়ে, বইয়ের আলমারিতে হেলান দিয়ে। বসনের ঝুমুর নাচের যৌনতাটা আমি অনুভব করছিলাম, উত্তেজনাও হচ্ছিল একটা, একটু আশঙ্কাও হয়ত, অন্য কারুর চোখে পড়ে যাচ্ছে না তো। কিছু শব্দও ছিল, সেই অর্থে যা দেখলেই নিষিদ্ধ শব্দ মনে হয়, অন্ততঃ সেই কলকাতায় হত, যেমন ‘উলঙ্গবাহার শাড়ী’। সেটা আমায় সচেতন করে দিয়েছিল, মনে আছে, অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে না তো, আমি কী পড়ছি। চোখে ছটা লাগিল তোমার আয়না বসা চুড়িতে — এই গানটাও একটা অন্য রকম উচ্ছাস দিয়েছিল, মনে আছে। আমি এখনও যেন ওই বইটা ওই পাতাটা ওই লাইনগুলো দেখতে পাই। এটা ভয়ানক ভাবে আছে ‘আরণ্যক’ উপন্যাসেও। ওই কালোর উপর সবুজ সাদা গাছের প্রচ্ছদ, লবটুলিয়া বইহার নাড়া বইহার, সত্যচরণের মেস — এই গোটা স্মৃতিটাই যেন আলাদা করে উপন্যাসের স্মৃতি নয়, ঢুকে আছে ওই এস কে লাহিড়ি, তার সারি সারি কালচে সবুজ আলমারি, তার উঁচু টুল এইসবের মধ্যে। ‘আরণ্যক’ মনে পড়লেই ওটা মাথায় এসে যায়।

যাকগে। বুড়ো বয়সের এইসব বাহুল্য ছেড়ে ‘কবি’-র কথায় ফেরা যাক। ‘কবি’ ফিল্মটায়, আমার যা লাগে, উপন্যাসের একটা বিরাট গতিবিজ্ঞানই সম্পূর্ণ এসেছে, এবং হয়ত বাড়তি কিছুও এসেছে। সেই জায়গাটা আমি ঠিক কী পাই, সেটা দেখানোর জন্যেই এই লেখাটা। এবং এই অভিধায় এই ‘অটেকনিকাল’ শব্দটা লাগানো একদমই আত্মসম্মান বাঁচানোর তাগিদে। দিন চারেক আগে লেখাটায় হাত দিলে, বোধহয়, শব্দটা থাকত না। যদিও ‘অটেকনিকাল’ শব্দটা ব্যবহার করে আমার আগেও প্রবন্ধ আছে, এবং একই নাম বারবার ব্যবহারের একটা অভ্যাস আছে আমার। একই ‘মনোজ’ বা ‘ত্রিদিব’ নামও ব্যবহার করে গেছি আমার গল্পের পর গল্পে, বা উপন্যাসে, বারবার। ওই অভ্যাসেই হয়ত, নাম দিতাম ‘দেবকী বসুর কবি — একটি পাঠ’, ঠিক অমনই নামে, ‘নওলপুরার বাঘ: বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ‘বাঘ বাহাদুর’ — একটা পাঠ’ নামে প্রবন্ধ লিখেছিলাম ‘প্রতিক্ষণ’ পত্রিকায়, আজ থেকে একুশ বা বাইশ বছর আগে। কী লিখেছিলাম তাও ভাল মনে নেই। এই লেখাটার নামে ‘অটেকনিকাল’ শব্দটা গুঁজে দিতে হল অনিন্দ্যর গুঁতোয়। সেই গল্পটা বলে নিই আগে।

অনিন্দ্য (সেনগুপ্ত) আর ওর বৌ সেঁজুতি (দত্ত), মানে এখন বিয়েটা হচ্ছে, যতদিনে লেখাটা আপনারা পড়বেন, ততদিনে বৌ হয়েই যাবে, এসেছিল এই ‘কবি’ ফিল্মের সাবটাইটল, নোটস আর ফিল্মটা নিতে। অনিন্দ্য চলচ্চিত্রবিদ্যা পড়ায় যাদবপুরে। সেদিন আমরা তিনজনে একবার সাবটাইটল সহ ‘কবি’ দেখছিলাম। একটা জায়গায় একটা দীর্ঘ নাচের দৃশ্য আছে। কথা নেই গান নেই, শুধু নীলিমা দাশের নেচে চলা। বেশ দীর্ঘ একটা দৃশ্য, তিরিশ সেকেন্ড জুড়ে, ১ ঘন্টা ৪ মিনিট ১৪ সেকেন্ড থেকে ১ ঘন্টা ৪ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড। বারবারই দৃশ্যটা দেখতে দেখতে আমার লাগে কী একটা বাড়তি চাপ দৃশ্যটায় আসছে, আমায় খুব টানে দৃশ্যটা। সেদিন দেখতে দেখতে ওদেরও বললাম এই টানার ব্যাপারটা। অনিন্দ্য দৃশ্যটা দেখার পরে বলল, কেন তোমায় টানে বলো তো, দাঁড়াও দেখাচ্ছি। ও ফিরিয়ে নিয়ে গেল দৃশ্যটার মাঝামাঝির একটু আগে। বলল এই দেখো এখানে একটা ফাঁকা জায়গা, জায়গাটা ফাঁকা রাখা হয়েছে ওখানে এসে অনুভা গুপ্তা দাঁড়াবে বলে, ক্যামেরা যেন পূর্বানুমান করছে। এবং দেখো যেই এসে দাঁড়াচ্ছে, তার দৃষ্টিকে ধরে ক্যামেরা ফেরত আসছে নীলিমা দাশে। অর্থাত্‍, এই দুই নারীর আবেগের টানাপোড়েনটা দৃশ্যে ঢুকে আসছে। এরকম আরও কিছু সেঁজুতিও বলল। এবং দেখলাম, একদম ঠিকই তো, মোক্ষম সব জিনিস বলছে। একদম ঠিক।

কিন্তু ওরা চলে যাওয়ার পরে মেজাজ বেশ খিঁচড়ে গেল। ওরা সব পুঁচকে ছেলেমেয়ে। তারা বুঝছে, অথচ আমি বুঝতে পারছি না, কী কাণ্ড। একবার ভাবলাম, লিখব না আর লেখাটা। তারপরে আর একটা সমস্যাও ছিল। বাংলায় লিখব, না ইংরিজিতে? আমি যা লিখতে যাচ্ছি তা বাংলা-দর্শকদের তো এমনিতেই মাথায় আসবে। কিন্তু অন্য ভাষার লোকদের আসবে না। আবার মনে হল, বাংলায় দেখা লোকদের একটা আবেগ তৈরি হবে ফিল্মটা দেখে, আর একটু খতিয়ে দেখার ইচ্ছেও জাগবে। এর মধ্যে গুরুচণ্ডালী সাইটের ঈপ্সিতা আমায় চিঠি দিল — একটা লেখা লেখো না। সঙ্গে পেদ্রো আলমোদোভারের দুটো ছবির উল্লেখ, যেগুলো আবার অনেক দিন আগে আমিই ওকে পাঠিয়েছিলাম, ওগুলো নিয়ে লিখতে বলেছিলাম। সেটা আমাকেই ফেরত পাঠাল। বলল, তুমি লেখো। তখন ওকে লিখলাম, তুই জানিস না, আমি একটু ঘেঁটে গেছি এই বাচ্চাদের সঙ্গে আমার ফিল্ম বোঝার পার্থক্যটা এমন বিচ্ছিরি ভাবে আবিষ্কার করে। ‘কবি’ নিয়ে লেখাটা আর আদৌ লিখব কিনা তাই ভাবছি। এত এত ফিল্ম দেখি আমি, গুষ্টি গুষ্টি, দিনরাত, তারপরেও এইটুকু বুঝতে পারিনা। ওরা কী সুন্দর টকাটক সব বুঝে ফেলল। তারপর, ঈপ্সিতাকে চিঠিটা লিখেই মনে হল, নাঃ, লেখাটা লিখেই ফেলি।

তাই প্রথম থেকেই এটা বুঝে নিন, এটা কোনও ফিল্ম-সমঝদার লোকের লেখা নয়। আমি প্রচুর ফিল্ম দেখি, সেগুলো দেখতে দেখতে কোনও কোনওটা আমায় প্রচণ্ড টানে, কোনও কোনওটা টানে না। যেটা টানে সেটা কেন টানে তা আমি বোঝার চেষ্টা করি নিজেই। এই লেখাটা সেই চেষ্টারই একটা লিখিত রূপ। প্রত্যেক লেখাই লেখা হয় একটা বা কয়েকটা মুখকে কপালের মধ্যে রেখে। এটায় সেই মুখটা আমার ওই পুরনো ছাত্রের, যেন তাকে আমি এটা বুঝিয়ে বুঝিয়ে বলছি। আর আমার ফিল্ম বোঝার দৃষ্টান্ত তো আগেই দিলাম, কোনও চলচ্চিত্রবোধের আশা করলে এই লেখাটা পড়বেন না। আমি রাজনীতি, আর তার সূত্রে রাজনৈতিক অর্থনীতি, নিয়ে খুব মাথা ঘামাই। ওটা একটা অসুখের মত। কিছুতেই না-ভেবে পারিনা। যে কোনও গরুই, শেষ অব্দি, আমার হাতে পড়লে এসে হাজির হয় ওই শ্মশানেই। এটা শুধু যে আমার কাজের জায়গা তাই নয়, এটা সত্যিই কোথাও একটা আমার নিজের কাছে নিজের অর্থ খোঁজারও একটা পরিসর। গল্প উপন্যাস লিখি আমায় সেগুলো পায় বলে, একটা ভরগ্রস্ততার চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করার দায় থাকে, আর একটা থাকে মাথায় থাকা কিছু সন্নিবিষ্ট আধা-এলোমেলো আবেগ-অনুভূতি-চিন্তার শেষ অব্দি লিপিবদ্ধ আকারটা কী দাঁড়ায় এটা খুঁজে পাওয়ার একটা উল্লাস বা আরাম। আবার বহু বছর ধরে এই গল্প উপন্যাস আখ্যানগুলো লিখতে লিখতে এই সাহিত্য-জীবন-বাস্তবতা এই ভাবনাগুলোও মাথায় এক ভাবে বিন্যস্ত হয়ে গেছে। তারও কিছু উপাদান উত্তেজিত হয়ে পড়ে ‘কবি’ ফিল্মটা দেখতে দেখতে, নিতাইয়ের জীবন আর তার সাহিত্যরচনা, মানে তার কবিয়াল গানগুলি বা ওই কাঠামোতেই তাত্ক্ষণিক ভাবে রচনা করে তোলা ছড়াগুলো — এই দুয়ের ভিতরকার কিছু অতিনিয়ন্ত্রণ বা পারস্পরিক কার্যকারণ সম্পর্ক, এটাও মাথায় চলে আসে। তারাশঙ্করের উপন্যাসটায় এটা রয়েছে আরও অব্যর্থ রকমে, কিন্তু ‘কবি’ ফিল্মেও যতটুকু এসেছে সেটাও বিরাট। সেই ভাবনাগুলোও কিছু চলে আসবে এই লেখাটায়।

যে সব হাতে গোনা বইয়ের উল্লেখ আসবে আলোচনার সূত্রে, সেগুলো লেখার মধ্যে মধ্যেই দেব। আর খুব আসবে ওই সাবটাইটল আর নোটসের কথা, এখনও যা মনে হচ্ছে। আমার ব্লগে (http://ddts.randomink.org/blog/?=153) সবকটা সাবটাইটল ফাইল আর নোটস ফাইলই পেয়ে যাবেন। ফিল্মটা এমনিতে ভিসিডিতে পাওয়া যায়, দেখবেন তার নামঠিকানা দেওয়া আছে ওখানে। আর কারাগার্গা (http://karagarga.net) এবং বাংলা-টরেন্টস (http://www.banglatorrents.com) এই দুটো টরেন্ট সাইটেও সেই এভিআই-গুলো আছে যার সঙ্গে এই সাবটাইটল ম্যাচ করে। কোনও ভাবেই যদি না পান, আমায় (dipankard@gmail.com) ঠিকানায় মেল করুন, কিছু একটা ব্যবস্থা করা যাবে।

যাই হোক ফেরত আসা যাক ‘কবি’ ফিল্মের প্রসঙ্গে। মজার কথা এই যে, ‘কবি’ ফিল্মের সঙ্গে আমার মোলাকাত খুব বেশি দিনের নয়। হেমোপমদা (দস্তিদার) জয়পুরিয়া কলেজের মাস্টারমশাই ছিলেন, অবসর নিয়েছিলেন আমি যোগ দেওয়ার সামান্য দিন পরেই, যদিও মজার কথা, আজ পর্যন্ত কলেজ সূত্রে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠতা যার সাথে হয়েছে আমার, সে ওই হেমোপমদাই। হেমোপমদা প্রথম যেবার আমার বাড়ি আসেন, অন্তত তেরো চোদ্দ বছর আগে, আমাকে একটা ক্যাসেট দেন। সেটা ওই ‘কবি’ ফিল্মের সম্পাদিত সাউন্ডট্রাক, বা, কোনও শ্রুতিনাটক, ওই চিত্রনাট্যের উপর ভিত্তি করে, ওই একই শিল্পীদের দিয়ে। ঠিক কোনটা তা আমি নিশ্চিত নই। ক্যাসেটটা কালের গর্ভে হজম হয়ে গেছে তাও আজ বহুকাল, এমনকি সেই ক্যাসেট প্লেয়ারও। কোনও ক্যাসেট প্লেয়ারই নেই ঘরে তাও আজ বছর বারো তো বটেই। কম্পিউটার আসার থেকেই, যা হয়, সবই কম্পিউটার-নির্ভর হয়ে গেছে।

কিন্তু যা হজম হয়নি তা হল নীলিমা দাসের ওই বসনের চরিত্রের শ্রুতি-অভিনয়। বাপরে বাপ। কী দম আটকানো লাগত, “কেন করব আমি গোবিন্দের নাম, সে কী দিয়েছে আমায়?” এতটাই চাপ তৈরি করত যে আমি বারবার শুনতেও পারতাম না। মধুর ভান্ডারকরের ‘চাঁদনী বার’ বা বার্গম্যানের ‘ভার্জিন স্প্রিং’ ফিল্মে যেমন হয়েছিল আমার, কিছুতেই একবারে পুরোটা দেখতে পারতাম না। বা আরও অনেক কিছুতেই হয়েছে, ওই দুটোর নামই মাথায় এল এই মুহূর্তে। তারপর মাঝে মাঝেই ভাবতাম নীলিমা দাশের সঙ্গে একবার দেখা করতে গেলে হয়। আমার এক বন্ধু বেলঘরিয়ায় নাটক করে, ওকে দিয়ে ওনার নাম-ঠিকানা যোগাড়ও করলাম, তারপর যাব যাব করতাম, সঙ্কোচও হত, কী বলব, নাটক অভিনয় এসবের কিছুই তো জানিনা, কী বলব গিয়ে। তারপর একদিন জানলাম, নীলিমা দাশ মারাই গেছেন। এরকম আমার আরও বেশ কয়েকবার হয়েছে।

এরপর হঠাত্‍ করে, গত বছরে মানু একদিন পুজোর ঠিক আগে আগে আমায় এনে দিল, ‘কবি’ ফিল্মের জোড়া ভিসিডির কালেক্টর এডিশন, এঞ্জেল ভিডিও-র। কী ছাইয়ের কালেক্টর এডিশন, ভাগ্যিস প্রথমেই এমপ্লেয়ার দিয়ে স্ট্রিম-ডাম্পটা নিয়ে নিয়েছিলাম হার্ড ডিস্কে, এই সাবটাইটল করাকালীন একদিন বার করে দেখলাম, সেই একবার চালানোতেই, এই এক বছরেই সেটা নষ্ট হয়ে গেছে। তা যাক, যা বলছিলাম, ডাম্পটা চালানোর আগেই আমার গা শিরশির করছিল, চালানোর পরে আমি সত্য অর্থেই নেশাগ্রস্ত হয়ে গেলাম। প্রচুর জায়গার অডিও খুব খারাপ, যেমন ভিসিডি-গুলোয় প্রায়ই হয়ে থাকে। হার্ডডিস্কে থাকায় যতবার খুশি চালিয়ে চালিয়ে উদ্ধার করতে পেরেছি পরে। কিন্তু সেসব সমস্যা নিয়েই আমার উপর যেন ভর হল ‘কবি’ ফিল্মটার। তখন থেকেই সাবটাইটল করব ভেবেছিলাম, কিন্তু কিছুতেই সময় পাচ্ছিলাম না। আমার শেষ বইটা, কম্পিউটিং ও সফটওয়ার জগতের রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে, আগেই তো বলেছি ওটা আমার স্থায়ী শ্মশান, কিছুতেই শেষ হতে চাইছিল না। শেষ হল এসে অগাস্টের শেষ দিকে। সেপ্টেম্বরেই হাত দিলাম সাবটাইটলে। প্রচণ্ড সময় লাগছিল। একটা আলগা হিসাবে দেখেছিলাম, গড়ে প্রতি মিনিট ফিল্ম-সময়ের জন্য আমার শ্রম লাগছে তিন ঘন্টারও বেশি। এবার দুই ঘন্টা পাঁচ মিনিট ফিল্মে মোট শ্রমের পরিমাণটা ভাবুন। তাই পুজোর ছুটি পড়বার মুহূর্ত থেকে একদম ঝাঁপ দিয়ে পড়লাম। পুজোর দিন দশেক ষোল সতরো আঠারো ঘন্টা কাজ করে সমাপ্ত করেছি ওটা।

কিন্তু অত শ্রম করেও একটা অদ্ভুত আরাম হয়েছে। বোরহেস যেমন লিখেছিলেন, কাফকার সূত্রেই বোধহয়, আমাদের পিতা আমরা নিজেরাই নির্বাচন করি। আমাদের ঐতিহ্য কী তা খুঁজে নেওয়া আমাদেরই হাতে। ‘কবি’ ফিল্মটা যে সেই ঐতিহ্যের একটা খুব জোরালো জ্যান্ত জায়গা এই নিয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই। তাই বরং এটা আমার কাছে ছিল একটা সুযোগ, সম্মান জানানোর। দেবকী বসু মরে ফৌত হয়ে গেছেন, বোধহয় সমস্ত শিল্পীরাও তাই, তারাশঙ্কর তো বটেই। তাই তাদের আর কোনও ক্ষতিবৃদ্ধি নেই এতে, কিন্তু আমার আছে, আমি তো এখনও মরে যাইনি। এই সাবটাইটল করে, বা তারপরে, আমার এই লেখায় যদি ‘কবি’ ফিল্মটা দশটা বাড়তি লোকের কাছেও পৌঁছয়, আমার বেশ একটা আরাম হয় তাতে, যাক, কিছু একটা করলাম, এইরকম বিরাট একটা কাজের একটা হোর্ডিং লেখার তো সুযোগ পেলাম। কলেজের মাস্টারমশাইরা তো আজকাল শেয়ার বা গাড়ি/কোটের ব্রান্ড ছাড়া কিছু বোঝে না, লেখাপড়ার কাজ তো বহু আগেই পুরনো দিনের প্রাচীন কুসংস্কারের মত লুপ্ত হয়ে গেছে। যা টিকে আছে তা কিছু ব্যক্তি মানুষের আত্মরতিরত পাগলামিতে। ঠিক সেই মন্তব্যটাই করেছিলেন আমার এক সহকর্মী, আমার বৌয়ের কাছে, “কী, ওই সেই পাগলামি চালিয়ে যাচ্ছে তো, এই কাজে মালকড়ি তো কিছুই হবে না।” বিশ্বাস করুন, আমি একটুও নাটকীয় করছি না, ওই ‘মালকড়ি’ শব্দটাই তিনি ব্যবহার করেছিলেন।

সত্যিই ‘কবি’ ফিল্মটা আমার বিরাট একটা কিছু লেগেছে। তুলসী চক্রবর্তীর অলৌকিক ওই অভিনয় নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই, সবসময়ই তিনি ওইরকম অভিনয়ই করে এসেছেন। কিন্তু, তার চোখের মুদ্রায়, কদর্য নাচের ভঙ্গীতে, যে ভাবে উঁচু জাতের দম্ভ এবং হিংস্রতাটা এসেছে, সেটা বোধহয় তুলসী চক্রবর্তীর পক্ষেই সম্ভব। নীলিমা দাশের কথা আগেই বললাম। অনুভা গুপ্তা, নীতিশ মুখোপাধ্যায়, হরিধন, এদের সকলেরই অভিনয়, সঙ্গে রবীন মজুমদারের গান, এবং অনিল বাগচীর সঙ্গীত পরিচালনা, এর একটাও যদি সঠিক মানে না-পৌঁছত, ‘কবি’ বোধহয় তার নিজের জায়গায় পৌঁছতে পারত না। নৃত্য পরিচালকের নাম দেখলাম প্রহ্লাদ দাস। তাঁর সম্পর্কে আর কিছুই আমি জানি না, কিন্তু প্রত্যেক বারই তুলসী চক্রবর্তীর ওই বিকট নাচ দেখতে দেখতে আমার নৃত্যপরিচালকের কথা মাথায় আসে। একজন পঞ্চাশোর্ধ ভারি চেহারার মানুষের শরীরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ওই নাচের ভঙ্গীর উদ্ভাবন তো সহজ কাজ ছিল না। এই রকম অজস্র টুকরো টুকরো কথা মাথায় আসে আমার। আক্ষরিক অর্থেই এগিয়ে পিছিয়ে এগিয়ে পিছিয়ে ‘কবি’ ফিল্ম আমি অজস্রবার দেখেছি। আপনারা দেখুন, আমার প্রতিক্রিয়া যদি আপনাদের প্রতিক্রিয়ায় স্থানান্তরিত হতে পারে, সেটাই এই কাজের সাফল্য।

এবার ফিল্ম নিয়ে কথা শুরু করব আমরা। ব্যাপারটা সবচেয়ে সরল, একরেখ, এবং কম পরিশ্রমসাধ্য করার স্বার্থে, আমি ফিল্মটার সঙ্গে সঙ্গে এগোব, এবং ব্যবহার করে চলব আমার ওই সাবটাইটল ফাইল থেকে উদ্ধৃতি। এতে সময়রেখাটাও স্পষ্ট থাকবে, এবং দরকার মত আপনারা সঙ্গের নোটস ফাইলও পড়ে নিতে পারবেন। আগেই আমার ব্লগের ঠিকানা দিয়েছি, যেখান থেকে আপনারা ওই সাবটাইটল ফাইল দুটো, kabi-1.srt এবং kabi-2.srt, আর তার সঙ্গে পড়ার নোটসগুলো, kabi-1.notes.pdf এবং kabi-2.notes.pdf নামিয়ে নিতে পারবেন। সাবটাইটল ফাইলগুলো হল সরল টেক্সট ফাইল, যে কোনও প্লেইন টেক্সট এডিটরে খুলতে পারবেন, আর পিডিএফের জন্য কোনও একটা পিডিএফ রিডার লাগবে। দেবাশিস (দাস), আমার যে ছাত্রের কথা আগেই বলেছি, তার সঙ্গে বসেই যেন আমি আবার দেখছি ফিল্মটা, এবং মাঝেমাঝেই থামিয়ে কিছু কথা বলে নিচ্ছি। কথার শুরুতেই থাকছে সাবটাইটল ফাইল থেকে উদ্ধৃতি, পুরো সেই এন্ট্রি বা নথীটাই, প্রথমে সাবটাইটলের ক্রমিক সংখ্যা, তারপর সময়রেখা, তারপর পর্দায় দৃশ্য লেখাটুকু। এটুকু ইংরিজিতে। তার নিচে বাংলায় আমাদের আলোচনা। এবং, যেমন বলেছি, ফিল্মবিদ্যাগত ভাবে লেখাটা হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ অটেকনিকাল এবং অশিক্ষিত, কারণ আমিই তাই। আর আমার ছাত্রদের সঙ্গে আমি যে ভাবে কথা বলি, যা মাথায় আসে তাই কোনও একটা সম্পর্কিত রকমে বলে যাই, একটা অ্যাকাডেমিক লেখায় যে দায়িত্বপালনটা অন্তঃশীলা থাকে সেটার আদৌ পরোয়া না করে, এই লেখাটাও হতে যাচ্ছে তাই। আমার এক ছাত্রের সঙ্গে আমার কথা বলে চলা। আমি কেন ‘কবি’ ফিল্মে উত্তেজিত হয়েছি সেটাই তাকে আমি পৌঁছে দিতে চাইছি, সঙ্গে সঙ্গে নিজেও বুঝে উঠতে চাইছি। আর সবাই জানে মাস্টারমশাইরা একটু বক্তিয়ার খিলজি হয়, তাই কিছু অতিকথনও থাকতেই পারে। লেখার সঙ্গে একটু একটু নুন লাগিয়ে পড়বেন। সেই অর্থে এটা কোনও গম্ভীর ও তাত্পর্যপূর্ণ লেখাই নয়, একবার সিনেমাটা চালিয়ে চালিয়ে দেখছি সেই ছাত্র আর আমি, এবং দেখাকালীন ফিল্ম থামিয়ে যা মাথায় আসছে, যতটুকু মাথায় আসছে বলে যাচ্ছি। এমনকি কোথায় কোথায় থামাচ্ছি তাও খুব নির্দিষ্ট কিছু নয়। অন্য আর এক বার দেখাকালীন হয়ত অন্য আরও কোথাও থামতাম।

শুরু করা যাক প্রথম সাবটাইটল ফাইল kabi-1.srt থেকে। একদম উপরে নম্বরটা হল সাবটাইটল ফাইলের এটা কত নম্বর এন্ট্রি, তারপর সময়রেখা, ঠিক কোন জায়গায় সাবটাইটলটাকে ফুটিয়ে তুলতে হবে, আর একদম নিচে কী ফুটিয়ে তুলতে হবে। যার সঙ্গে দেখুন একটা নম্বরও দেওয়া আছে, নোটস ফাইলে এটা কত নম্বর নোটস।

8
00:02:32,990 –> 00:02:35,789
((Train whistle))[01]

ফিল্মটার সাবটাইটল দেখে আমার এক বন্ধু জিগেশ করেছিলেন, এরকম গর্দভের মত আমি ট্রেনের ভোঁ-টাও চিহ্নিত করে দিয়েছি কেন। আসলে স্ট্রেস মানেই তো ওভারস্ট্রেস। চিহ্নিত করে দেওয়া মানেই অবশিষ্টের থেকে পৃথক একটা সত্তায় জেগে ওঠা। কিন্তু চিহ্নিত করতে খুব বেশি করেই চেয়েছিলাম, এতে কোনও সন্দেহ নেই। নোটসেও যেমন লিখেছি, ট্রেন এবং রেলওয়ে এক কথায় বললে ব্রিটিশ আমলে বাংলায় তথা ভারতে সামাজিক গতিবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় প্রতীক। শরত্চন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের তৃতীয় পর্ব প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে, শরৎ সমিতি সংস্করণের গ্রন্থপরিচয় অনুযায়ী। তারাশঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪২-, কিন্তু তার আগে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছিল পাটনার ‘প্রভাতী’ পত্রিকায়, ১৯৩৮ থেকে, মিত্র ও ঘোষ সংস্করণের গ্রন্থপরিচয় অনুযায়ী। এবং পরে আমরা যেমন দেখব, ‘কবি’ উপন্যাসের তথা ফিল্মের ঘটনাগুলি ঘটছে দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে, তার মানে ১৯১৯ থেকে ১৯৩৯-এর মধ্যে। তার মানে, ‘শ্রীকান্ত’ আর ‘কবি’ এই দুই উপন্যাসই প্রকাশকাল অনুযায়ী যথেষ্ট নিকট। ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের এগার অধ্যায় থেকে রেলওয়ে বিষয়ে একটু পড়া যাক।

রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্তকে না জানিয়ে বক্রেশ্বর তীর্থদর্শনে চলে যাওয়ায় অভিমানী শ্রীকান্ত বাড়তি উত্সাহে বেরিয়ে পড়ে তার বন্ধু সতীশ ভরদ্বাজ অসুস্থ জেনে। সতীশ রেলওয়ের কন্সট্রাকশন ইনচার্জ। তার ক্যাম্পে গিয়ে কলেরাক্রান্ত সতীশের শুশ্রূষা তথা তার প্রেম ও মৃত্যুর উপাখ্যান ভারি জমকালো, সেই বিষয়ে আর যাচ্ছি না। সতীশ এবং সেই ক্যাম্পের আরও অনেকের মৃত্যুর পর, সতীশের “অমর কীর্তি তাড়ির দোকান অক্ষয়” দেখে, শ্রীকান্ত একসময় ফিরতি পথে রওনা হল। পথে দুজন ছাতা মাথায় ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হল, যাঁরা সতীশ সম্পর্কে জানালেন, “মাতাল, বদমাইস, জোচ্চোর।” পরে এও বললেন, “দোষ নেই মশায় কোম্পানি বাহাদুরের সংস্পর্শে যে আসবে সে-ই চোর না হয়ে পারবে না। এমনি এদের ছোঁয়াচের গুণ!” পরে হাঁটতে হাঁটতে কথা প্রসঙ্গে আরও অনেক কিছু জানালেন এই রেল কোম্পানির ব্রিটিশ ব্যবসা সম্পর্কে।

কর্তারা আছেন শুধু রেলগাড়ি চালিয়ে কোথায় কার ঘরে কি শষ্য জন্মেছে শুষে চালান করে নিয়ে যেতে। সমস্ত অনিষ্টের গোড়া হচ্ছে এই রেলগাড়ি। শিরার মত দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রেলের রাস্তা যদি না ঢুকতে পেত, খাবার জিনিস চালান দিয়ে পয়সা রোজগারের এত সুযোগ না থাকত, আর সেই মানুষ যদি এমন পাগল হয়ে না উঠত, এত দুর্দশা দেশের হোতো না। মশাই, এই রেল, এই কল, এই লোহা-বাঁধানো রাস্তা—এই তো হল পবিত্র vested interestএই গুরুভারেই তো সংসারে কোথাও গরীবের নিঃশ্বাস ফেলবার জায়গা নেই।

এই গোটা আলোচনাটা আমাদের একটুও অপরিচিত নয়। আমি শুধু একটু মনে করিয়ে দিলাম। এই বেদনার জায়গাটা এবং এর বিপরীতে ক্রমপ্রসারমান যুদ্ধ আর বাণিজ্যের বেলোয়ারি রৌদ্রের ছটা ওই আলোচনার পরিসরেও এসেছে, এবং ব্যাপক ভাবে এটা এসেছে মার্ক্সের প্রচুর লেখায়। যেমন, দি ফিউচার রেজাল্টস অফ ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া, প্রকাশিত নিউ ইয়র্ক ডেইলি ট্রিবিউনে, ১৮৫৩-(http://www.marxists.org/archive/marx/works/1853/07/22.htm)। এরকম আরও অনেক আছে। মার্ক্স খুব ভাল ভাবে ব্রিটিশ ভারতে শিরা-উপশিরার মত বিস্তৃত রেলপথজালের অভ্যন্তরীন গতিবিজ্ঞানটাকে চিহ্নিত করেছেন। তার সার্বিক ঘাতটাকে, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক স্তরেও, অনেক দূর অব্দি লক্ষ্য করেছেন। কী ভাবে ভারতীয় সমাজকে সেটা ভিতর থেকে বদলে দিচ্ছে, সেটাকে মার্ক্স লক্ষ্য করেছিলেন। ভারত রাষ্ট্র বলে আজ যাকে আমরা চিনি, তা অনেকটাই সৃষ্টি হয়েছে ব্রিটিশের এই রেলের হাতে। বাজারের নিরিখে, আদানপ্রদানের নিরিখে, ভূমি ও ভূগোলের বোধের নিরিখে। বিভূতির অজস্র গল্পে এটা এসেছে। খুব প্রতিনিধিস্থানীয় এরকম একটা চিহ্ন রয়েছে ‘ক্ষণভঙ্গুর’ সঙ্কলনের ‘সিঁদুরচরণ’ গল্পে। “এই পিথিমির কি কোনও সিমেমুড়ো নেই” জাতীয় বিস্ময়কে তার আঞ্চলিকতার ধারণায় আচ্ছন্ন বলে আমরা সহজেই চিনে নিতে পারি, যখন দেখি তার বিস্ময় তৈরি হওয়ার রসদ রেলপথের মাপে দাঁড়ায়, চব্বিশ পরগনা থেকে নদীয়া, বনগাঁ থেকে কৃষ্ণনগর। “আপনি কেষ্টলগর চেন? … বাহাদুরপুর কেষ্টলগরের দু’ইস্টিশনের পরে” — আমাদের পরিচিত ভূগোলে সিঁদুরচরণের বিস্ময়ের পৃথিবীকে অনুবাদ করে দিচ্ছেন লেখক। আর সেই ভূগোলটা নিতান্তই রেলপথ-নির্ভর, দূরত্বের একক ‘ইস্টিশন’। আবার ‘ইছামতী’ উপন্যাসের শেষে এসে আমরা দেখি, সমাজজীবনে নতুন ধরনের সব গতিময়তার সূচনা হচ্ছে। তিলু বিলু নীলুদের স্থানান্তর এবং যানের ধারণাটাই বদলে যাচ্ছে, রেলপথের অভিঘাতে তৈরি হচ্ছে একটা উল্লসিত বিস্ময়।

আর ছোট মা তো কিছু জানেই না। কলের গাড়ীতে উঠে সেদিন দেখলে না? পান সাজতে বসলো। রানাঘাট থেকে কলের গাড়ী ছাড়লো তো টুক করে এলো আড়ংঘাটা। আর ছোট মার কি কষ্ট! বললে, দুটো পান সাজতি সাজতি গাড়ী এসে গেল তিনকোশ রাস্তা! হি হি—।

শরত্চন্দ্র অসুখ ও বেদনাটাকে ধরেছিলেন, কিন্তু এই সৃষ্টিশীল গতিমুখটাকে ধরতে পারেননি, বা চাননি ধরতে। শরত্চন্দ্রের মধ্যে ওই বিষয়ী-অবস্থানটা (যাকে বাংলায় বলে সাবজেক্ট পোজিশন) থাকতই। বাস্তবতাকে তার নিজের মতামত ও মূল্যায়ন দিয়ে সাজিয়ে নেওয়া তো বটেই, এমনকি তার বিপরীত-যাত্রাতেও পাঠিয়ে দেওয়া। যেমন, কলকাতার ও জেলার আদালতগুলিতে যখন পরের পর একান্নবর্তী পরিবার ও সম্পত্তিভাগের মামলা বেড়ে উঠছে, ব্রিটিশ আমলের শেষ ভাগে নতুন ধরনের পুঁজি ও বাজার সৃষ্টির গতিতে, ঠিক সেই সময়ই শরত্চন্দ্র লিখে যাচ্ছেন ‘বিন্দুর ছেলে’, ‘রামের সুমতি’ জাতীয় আখ্যান, যাতে পরিবার ও সম্পত্তি ফের জোড়া লেগে যাচ্ছে। এটার মধ্যে ব্যক্তি লেখকের নিজের ভাল লাগা মন্দ লাগা ঔচিত্য অনৌচিত্য বোধের ছাপ থাকছে। হয়ত ব্যক্তি লেখকের নিজের স্বপ্নপূরণ থাকছে, যা ঘটুক বলে তিনি চাইতেন। আমি জানিনা, বাস্তবতার চিত্রণ থেকে এই বিচ্যুতি কোনও সমস্যা বলে ডাকা যায় কিনা। আমার এক নাট্য-পরিচালক বন্ধু যেমন বলে, অভিনয়ের কথা যদি বলো, তাহলে এই গ্রহের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত অভিনয় করেছে ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ সিনেমায়, না সরি, উত্তমকুমার নয়, ওই গরুটা যেটা ঘাস খাচ্ছিল বাড়ির বাইরে। তাই বাস্তবতার চিত্রণটা গুরুত্বপূর্ণ, নাকি তার ভিতর অনুপ্রবেশটা, তা বলতে পারি না। এবং যা দেখছি ক্রমে, যত দিন যাচ্ছে, যা যা জানতাম বা বুঝতাম বলে ভাবতাম, তা সবই ক্রমে আরও ঘেঁটে যাচ্ছে। আমার যুবক বয়সে, মার্ক্সবাদী রাজনীতির সক্রিয়তার বয়সে যেমন মনে হত, এ তো এক রকমের ইচ্ছাপূরণ, যার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটবে, আরও কিছু পরে, হাফপ্যান্ট পরা নাতি-হয়ে-যাওয়া ধর্মেন্দ্র আর ফ্রক-পরা অন্যূন-বয়স্কা যোগিতা বালির ইস্কুলের সিলিপ ঘিরে নাচ-গানে। আমার তখনকার এক বামপন্থী বন্ধু লিখেছিল রাজ কাপুরের একটা মতামতের কথা, পরে আমি বহু খুঁজেও আর সেটা কখনও পাইনি, তাই জানিনা সেটা খুব সঠিক কিনা, আর সেই বন্ধুও মারা গেছে। তার লেখায় ছিল, রাজ কাপুর বলেছেন, আমি চাইলেই একজন বেশ্যাকে ফোনে ডাকতে পারি, ভারতের খুব কম মানুষেরই সেটা সামর্থের মধ্যে পড়ে, তাই তাদের এই যৌন আনন্দ দেওয়ার জন্যেই আমি ফিল্ম বানাই। আজ মনে হয়, রাজ কাপুর তো ভুল কিছু বলেন নি, ক্ষতি কী এমনধারা ফিল্মে? বাংলা ‘শিল্প’ শব্দটার ইংরিজি তো ‘আর্ট’ আর ‘ইন্ডাস্ট্রি’ দুইই। তাহলে অসুবিধা কোথায়? ইচ্ছাপূরণের ইন্ডাস্ট্রিতে? সেটা গ্রেট আর্ট হয়ত হবে না, কিন্তু তাতে তো ইতিহাস এক ভাবে বিধৃত থাকবেই। আর্ট আর ইন্ডাস্ট্রি দুই-ই তো শেষ অব্দি যায় একই ইতিহাসের চাঁড়িতে।

কিন্তু এটুকু বলাই যায়, শরত্চন্দ্রের অনেক অবেক্ষণই প্রবলভাবে তার মনোভঙ্গী দ্বারা আক্রান্ত থাকত। যেমন ওই শ্রীকান্ততেই, ব্রাহ্ম ও হিন্দু ধর্মের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ আছে তাঁর যার তীক্ষ্ণতাটা অনস্বীকার্য, কিন্তু তার ইতিহাস-সম্মতিটা বিচারের অপেক্ষায় থাকে। রেল সম্পর্কে তার মতামতটা একটু একপেশে লাগে। আরও সেই ‘শ্রীকান্ত’ লেখকের যার চতুর্থ পর্ব তথা গোটা উপন্যাসটাই শেষ হবে বিষন্নতার ওই অলৌকিক চিত্রণে, কমললতা প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে রইল, ট্রেনটা চলতে শুরু করল, একের পর এক কামরার আলো তার মুখে পড়ছে, আলোকিত হচ্ছে, আবার অন্ধকারে চলে যাচ্ছে — এবং অস্পষ্ট হতে হতে ক্রমে সে অদৃশ্য হয়ে গেল। এই রূপকল্পটা যাঁর হাতে তৈরিই হতে পারত না, যদি রেল না থাকত। কিন্তু ‘কবি’ ফিল্মে আমরা দেখব, রেলপথ আসছে পুরো একটা নতুন ধাঁচের গতিময় উন্মুক্ততার প্রতীক হয়ে। এবং ‘কবি’ উপন্যাসে যতটা এসেছে তার চেয়েও বেশি করে এসেছে ‘কবি’ ফিল্মে। রেল/রেলপথ/রেল-ইস্টিশন/রেলযাত্রার প্রসঙ্গ বা উল্লেখ বা ছবি বা শব্দ ফিল্মটায় এসেছে কয়েকশো বার। শুরুও হচ্ছে রেলগাড়ির ভোঁ দিয়ে, আবার শেষও হচ্ছে রেল লাইনের ছবি দিয়ে, দুই সমান্তরাল রেখা চলে গেছে সোজা অনন্তের দিকে ক্রমে কাছে আসছে, কিন্তু মিলছে না কখনওই। এমনকি প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটমানতাতেই বদলের সচেতনতা এনে দিচ্ছে ট্রেনের আওয়াজ বা উল্লেখ। এটা এত বেশি সংখ্যায় যে প্রতিবার খেয়াল করানো সম্ভবও নয়, কোনও মানেও হয় না। তাই, একদম প্রথমেই এটা উল্লেখ করে দেওয়া। রেলের এই উপস্থিতি সেই সময়ের ঘটমান ভারতীয় সমাজ জীবনের একটা নিরবচ্ছিন্ন চিহ্নের মত রয়েছে গোটা ‘কবি’ ফিল্ম জুড়ে, উপন্যাসে যতটা আছে ফিল্মে তার চেয়ে অনেক বেশি করে।

বিভূতিভূষণের ‘ইছামতী’ উপন্যাসে, ঐতিহাসিক ভাবেই, আমরা কেবল রেল-উপস্থিতির শুরুটা দেখছি। তাও বেশ কয়েকটি মন্তব্যে সেটা ধরা আছে উপন্যাসের শেষের দিকটায়। আর অপ্রতিরোধ্য ভাবে সেটা এসেছে ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে। ‘পথের পাঁচালী’ ফিল্মটির নাম ‘পথের পাঁচালী’ হলেও, তার গোটা ‘বল্লালী বালাই’ অংশটি বাদ দিয়ে ফিল্মের শুরু ‘আম আঁটির ভেঁপু’ থেকে। তাতেও, ‘পথের পাঁচালী’ ফিল্মে রেলের সেই জীবন্ত দৃশ্যটা আমরা সকলেই জানি, কাশফুলের বন পেরিয়ে অপুর রেল দেখা। তাও, আমার বারবারই মনে হয়, ঠিক ‘বল্লালী বালাই’-এর মত, সমাজ ইতিহাসের জ্যান্ত বাস্তবতাটা বেশ বড় রকমেই বাদ পড়ে গেছে ‘পথের পাঁচালী’ ফিল্মে। সত্যজিত রায় বোধহয় সমাজ বাস্তবতার চেয়ে ব্যক্তি আবেগ-অনুভূতির টানাপোড়েনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এই রেল নিয়েই যে তীব্রতা ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে এসেছিল, তার খুব কাছাকাছি ছিল বরং ‘অপরাজিত’ ফিল্মের একটি দৃশ্য। দৃশ্যটার শুরু ‘অপরাজিত’ ফিল্মের ৩৯ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড থেকে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সর্বজয়া দেখলেন, মনিব-বাড়ির কাজেরই অংশ হিসাবে তামাকের টিকায় ফুঁ দিচ্ছে অপু। ৩৯ মিনিট ৫৬ সেকেন্ড থেকে এই গোটাটা নিয়ে ত্রস্ত দুশ্চিন্তিত সর্বজয়া নিজের ভিতরে ডুবে গেলেন, ৪০ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে গিয়ে রেলের ভোঁ শুরু হল, সর্বজয়া বাইরের দিকে তাকালেন, ৪০ মিনিট ২২ সেকেন্ডে পর্দায় চলে এল ট্রেন, ৪০ মিনিট ২৭ সেকেন্ডে এসে দেখা গেল ট্রেনে আসীন সর্বজয়া অপুদের। পুরো বাহান্ন সেকেন্ড জুড়ে তৈরি এই বিপন্নতাটা, সর্বজয়ার আঁকড়ে থাকার একমাত্র আশ্রয় অপু ঠিক মানুষ হবে তো, তার চাপ, তার নাটক, তার থেকে তৈরি কাশী থেকে নিশ্চিন্দিপুরে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত — এই গোটা মোচড়টা হাজির হয়ে গেল এই ট্রেন দৃশ্যে। যে গতিশীলতার অভাব আমি অনুভব করি ‘পথের পাঁচালী’ ফিল্মে। শুধু ট্রেন না, পরিবারকে অসম্ভব বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলে পরিবারের বাইরের বাস্তবতাটাকে খুব লঘু করে দেওয়া হয়েছে, ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের তুলনায় ফিল্মে, এরকমই লাগে। বরং ‘কবি’ ফিল্মে ঠিক তার উল্টোটা মাথায় আসে। এই ফিল্মের চিত্রনাট্য এবং সংলাপ তারাশঙ্করেরই করা। ধরে নিচ্ছি ১৯৪৯-এর ফিল্মের চিত্রনাট্য তিনি ১৯৪৮-এ লিখেছিলেন। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৮ এই দশ বছর সময় পেয়েছিলেন তারাশঙ্কর আরও পরিণত হয়ে ওঠার। চিত্রনাট্য করার সময়ে যে বেমক্কা রকমের ভাল করে খুঁটিয়ে পড়তে হয়েছিল তাঁর নিজেরই উপন্যাসটা, তার ছাপ ছড়িয়ে আছে গোটা ফিল্মে। যে গানগুলো মূল উপন্যাসে আছে, তার অনেকগুলোই বদলেছেন, ঘটনার সংস্থানকে বদলেছেন, নতুন অনেক উপাদান এনেছেন। যার অনেকগুলোই আমার অত্যন্ত লাগসই লেগেছে। কয়েক জায়গায় আমি চিহ্নিতও করব কোনও কোনও বিশেষ বিষয় উপন্যাস থেকে চিত্রনাট্যে প্রকটতর হওয়ার বিষয়টি। বিশেষ করে রেলকেন্দ্রিক গতি ও ঘাতটার বেলায় যা খুব বেশি করে সত্যি। তাই আমার যে বন্ধু আমায় গর্দভ বলেছিল ওই রেলের ভোঁ-টা আলাদা করে খেয়াল করানোয়, সে এটা বোঝেনি গর্দভের মত ডাকছিলাম হয়ত, কিন্তু প্রয়োজনীয় জায়গাতেই ডাকছিলাম।

==========অংশ ১ শেষ===================

Filed under: ফিল্ম — dd @ 9:21 am

November 24, 2010

দেবকী বসুর ‘কবি’ ১৯৪৯ — একটি অটেকনিকাল পাঠ

এই উপরের নামেই একটা লেখা লিখলাম গুরুচণ্ডালী সাইটের জন্য। ওরা টুকরো টুকরো করে ছাপাবে লেখাটা সাইটে। একবারে ছাপানোর পক্ষে বড্ড বড়।

প্রথম লেখাটা গেছে আজ। তার লিংকটা দিলাম।

আর গুরচণ্ডালী সাইটের একটা সমান্তরাল ইউনিকোড সংস্করণ আছে, তাতে ওই একই লিংক

গুরুচণ্ডালী সাইটে লেখার দ্বিতীয় অংশের লিংক

Filed under: ফিল্ম — dd @ 1:34 pm

October 27, 2010

Debaki Basu’s Film: Kabi

First, let me quote a paragraph.

Noted novelist Tarashankar Bannerjee’s book addressed the desire for immorality through art. In his own screen adaptation, the railway porter Nitai (Robin Majumdar) develops a reputation as a poet through participating in the kabigan (musical debate between poets who improvise in a question-answer contest). The married thakurjhee (Anubha Gupta) falls in love with him. To avert a scandal he leaves his village and travels with a nomadic Jhumur troops of dancers and musicians. The prostitute Basan (Nilima Das), whose advances the hero initially rejects, eventually comes to embody the unity of art and desire. Her death forces him to return home, where he finds Thakurjhee also dead. The performances of the two women, the mute suffering of the mundane Thakurjhee, counterposed by Basan’s delicate frame crippled by venereal disease, and seen as the two sensuous opposites evoked by the hero’s poetry, allow some graceful moments in the film. The film was known for its music, esp. Tarashankar’s lyrics Kalo jodi manda tobe, Ei khed mor mone mone, jibon eito chhoto kane, sung by male lead Majumdar, one of the last actors in the Saigal mould. Bose’s ecstatic soft close-ups, his signature, are available in profusion. He remade the film in Hindi (1954) with Geeta Bali, Nalini Jaywant and Bharat Bhushan.

(From Encyclopaedia of Indian Cinema, ed. Ashish Rajadhyaksha and Paul Willemen, BFI, OUP revised edition 1999, pp. 313-14)

This Bangla film Kabi hardly gets its importance what is due to it. I, backed by both the passion that I get from this film, and the motto of correcting this error, spent more than three hundred hours of my time to create English subtitle for both VCD one and two of this film in Angel VCD edition, AVVCD755/CE, released by Angel Video, Calcutta, email: info@angelvideo.in, website: angelvideo.in.

And for viewers that do not know Bangla, I have written notes too. I am putting them here for anyone to download and use them.

Right-click on any of the following links and click ’save’.

Subtitle for VCD One in SRT
Subtitle for VCD Two in SRT
Notes for VCD one SRT in PDF
Notes for VCD two SRT in PDF

Filed under: ফিল্ম — dd @ 12:14 am

September 18, 2010

একটা বই শেষ হল

প্রায় ছবছর লাগল। এতটা সময় অবশ্য লাগত না। চারের মধ্যে হয়ে যেত, যদি প্রাত্যহিক কাজের থেকে একটু ছাড় পাওয়া যেত, বা মধ্যে অন্য ব্যস্ততা না এসে যেত। বইটার পুরো নাম ‘হেজেমনি, রেজিস্টান্স অ্যান্ড কম্পিউটিং: এ স্টাডি ইন পোস্টকলোনিয়াল পলিটিকাল ইকনমি’। যদিও আমার বন্ধুরা ও আমি এটাকে এই ছবছর ধরে ‘ফ্লস অ্যান্ড হেজেমনি’ বলে ডাকতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছি, প্রতিটি খসড়ায়, আবার খসড়ায়, চিঠিতে, আলোচনায়। নেটেও তুলে দিলাম, একটা প্রাক-প্রকাশ সংস্করণ। এটা এখন আমার ওই বন্ধুদের কাছে গেছে। তাদের পরামর্শ মত যদি টুকটাক কিছু বদলাই, তার পরেই এটা চূড়ান্ত খসড়া হয়ে যাবে।
এই বইয়ের ভাবনার সূত্রপাত একটা ক্লাস-লেকচার থেকে। ক্লাসটা নিতে হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের রিফ্রেশার কোর্সে। তারপর সেটা অবশ্য বহু বহু বদলে গেছে। চলে এসেছে হেগেলের যুক্তিবিজ্ঞান, এসেছে হেজেমনি সংক্রান্ত উত্তরাধুনিক উত্তরঔপনিবেশিক আলোচনা।
এসেছে আমার রাজনৈতিক জীবন থেকে বহন করে আনা, এবং তারপরে আরও বেড়ে ওঠা রাজনৈতিক হতাশা। কেন অমন হয়ে গেল আমাদের সব প্রচেষ্টাগুলো। সেই সন্ধানটা, মার্ক্সবাদের সমস্যাগুলো বুঝতে চাওয়া — সেটা তো আমার মধ্যে ছিলই। সেটাও এসে গেল এই বইয়ে।
বইটা বাংলায় লেখার কাজ শুরু করেছি। শেষ হওয়া মাত্রই সেটাও নেটে তুলে দেব।

September 10, 2010

Opening Port in Nokia Siemens 1600 Residential Router for Azureus or Vuze on Fedora 13

For running BT clients like Azureus (or, as it is called now Vuze) needs opening a port, or forwarding a port to the router. This becomes more difficult for the BSNL ISP because it assigns a new port every time the router is powered on. My router is Nokia Siemens Residential Router 1600. I faced a lot of problems. So I am writing here all the steps that it may help others. Here we describe, Fixing the internal IP, then opening the port, and then readjusting the firewall rules for a Fedora 13 system.

There is a guide on Port Forwarding Azureus on the NokiaSiemens C2110. This gives some ideas. But, the problem is, the tools given there are for MS-Windows systems, and the Simens Nokia 1600 Residential router is quite different from the one given there. This router that was provided by the ISP — BSNL Dataone, and this is much cheaper than the C2110 model, and hence with a much less and cryptic functionality. And the obnoxious thing is that, the ISP, while giving me the router did not give any manual, only an MS-Windows driver CD that no GNU-Linux user does ever need. Let me give here the details for anyone in the same kind of fix.

These were the steps taken to open the port for Azureus (or, Vuze, as you call it) and readjust the firewall rules on a Fedora 13 system with Nokia Siemens Residential Router 1600 (with WL). I am writing here in a bit detailed way, such that people like me, not conversant in network things, can get some help.

Step 1.

The first problem was the fluid or dynamic IP. The ISP makes it that way. Every time my router powers on it gets a new IP. This assigns an IP to my machine. This can be dynamic too, if configured the DHCP way. But, this internal IP has to be made ‘fixed’ if to enable port forwarding. This was already done in my machine, because I regularly use some ‘rsync’ backup scripts between my desktop (internal IP 192.168.1.2) and my laptop (192.168.1.3). There are many ways to do this, like using ‘ifconfig’ and ‘route add default gw’, which I used before. But, these days I use ’system-config-network’ — a GUI frontend for all these things.

So first I become superuser and run ’system-config-network’. This brings up this window.
system-config-network

Here in default, the ethernet card should be eth0, but my original one with the motherboard was giving problems, so I added this ethernet-card, and it is shown as eth1. Now I click on this connection and click ‘Edit’ on the topbar, this brings up this card configuration window.
Ethernet Configuration

As we can see, here ‘Statically Set IP’ is clicked, and the IP of this desktop is given to 192.168.1.2, subnet mask 255.255.255.0 and the gateway, the router, is set to be 192.168.1.1. We make here OK and come out. So, our first task, setting a fixed internal IP 192.168.1.2 for the machine was done under the router as 192.168.1.1.

Step 2.
Now we enter the router by issuing ‘http://192.168.1.1′, without the quotes, in the browser. This shows this window for Nokia Siemens Residential Router 1600 (with WL). This opens this window.
Nokia Siemens 1600 Residential Router

Here, as we can see, the IP of the router is shown to be 192.168.1.1. And ISP has provided it with the dynamic IP 59.93.240.1. The two lines below it show the Google DNS 8.8.8.8 and 8.8.4.4 — these two DNS were fed into the router because it helps to access some sites that are not at times blocked by ISP assigned DNS.

Step 3.

Now we go to the page ‘http://192.168.1.1/scvrtsrv.cmd?action=view’ without the quotes. This page I could get in the manual that BSNL never gave me. I got the address of the page from the Net, just like another very necessary page of the router; ‘http://192.168.1.1/main.html’ — this page gives all very necessary things like the DNS set-up and all, and many other things, by clicking ‘Advanced Setup’.

Now, after I have forwarded my port, this page ‘http://192.168.1.1/scvrtsrv.cmd?action=view’ has this look.
Router NAT Table

As we can see, two ports are already setup here: 6881 and 61640.

Step 4.

This 6881 port is fixed for Azureus, but the other port we get from Azurues options. We open Azureus — Tools — Options — Connection, and this gives this window.
Azureus/Vuze Port Option

As we can see, 61640 is given there. This we can change too, by clicking Azureus — Tools — Configuration Wizard, and going step by step. Azureus or Vuze (as it is called these days) Wiki will give us some idea. We can very well choose the port that was automatically selected by Azureus as we got in the option. We write down this number.

Step 5.

We go to this page ‘http://192.168.1.1/scvrtsrv.cmd?action=view’ of our router and click ‘Add’ there. This gives us this window.
Adding NAT

Here we select ‘Custom Server’ and give a name, say, like ‘custom1′. Then we put ‘6881′ in both ‘External Port Start’ and ‘External Port End’. And choose ‘TCP/UDP’ in ‘Protocol’. Then click ‘Save’. We repeat the same step for the port we have chosen in Azureus options. Again we click ’save’ and we get the ports opened.

Step 6. Now we go to Azureus and go to Tools — Configuration Wizard. In the third step we come to the ‘Port Test’ window. If we did the earlier steps correctly we should get an ‘OK’ here when we test for the port we chose.

Step 6.

Now we change the firewall rules. As superuser we start ’system-config-firewall’. This opens the firewall window. Now we click ‘Other Ports’. Then we click ‘Add’ and this opens this window.
system-config-firewall

Here we have clicked ‘User Defined’, and we add ‘6881′ for ‘TCP’, then again ‘6881′ for ‘UDP’. We repeat the same step for the port we chose from Azureus Options.
Then we click ‘OK’ and come out.

Step 7.

Now we activate the firewall rules by becoming root and issuing ’service iptables start && service ip6tables start’. Most probably ’system-config-firewall’ did already look after this, but there is no harm in doing it once again.

Hope it helps.

Filed under: গ্নু-লিনাক্স — dd @ 12:31 pm
« Previous PageNext Page »

Powered by WordPress